📄 [চার] ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতা
যেকোনো সৎ শাসকের জন্য ন্যায়পরায়ণতা একটি অপরিহার্য গুণ। কারণ, একজন শাসক তার ইচ্ছেমতো শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা রাখেন। তিনি যদি জুলুম-অবিচার করতে চান, তাকে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই। পক্ষান্তরে তিনি যদি ন্যায়প্রত্যাশী হন, তবে জনগণ সুখী হয়; বরং পৃথিবীব্যাপী সৌভাগ্য ছড়িয়ে পড়ে।
ন্যায়পরায়ণতা ছিল ইমাদুদ্দিন জিনকির অন্যতম লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। তার শাসনামলের বিবরণ দিতে গিয়ে ইবনুল আছির বলেন, '(তার শাসনামলে) শক্তিশালী দুর্বলের ওপর জুলুম করতে পারত না।' তিনি তার অধীনস্থ রাজন্যবর্গকে সর্বদা জনসাধারণের সঙ্গে কঠোরতা পরিহার করে কোমল আচরণ করার নির্দেশ দিতেন। এ নীতির ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত অটল ছিলেন। জনগণের সম্পদে অন্যায় হস্তক্ষেপ করার অপরাধে তিনি তার উজির আবুল মাহাসিন আল-আজমিকে বন্দি করেন। এক্ষেত্রে তিনি তার কোনো কৈফিয়তকে পাত্তা দেননি। কারণ, তার কাছে জনগণের অধিকার সেনাপতি ও প্রশাসকদের অধিকারের তুলনায় অগ্রবর্তী ছিল। সহজ-সরল সাধারণ কৃষকদের অধিকার রক্ষায়ও তিনি যথেষ্ট। যত্নবান ছিলেন। পথ চলাকালে কেউ যেন কোনো কৃষকের ফসল মাড়িয়ে না যায়, এজন্য তিনি তার সৈন্যদের কৃষিক্ষেতের মাঝ দিয়ে চলার সময় পূর্ণ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিতেন। তার শাসনামলে কোনো সৈন্য নিজের ঘোড়ার জন্য কৃষকের ক্ষেত থেকে একটি খড়ও বিনামূল্যে নেওয়ার সাহস করত না। যদিও এসব খড়কুটা পরবর্তী সময়ে যুদ্ধে ব্যবহৃত ঘোড়ার খাদ্য হিসেবেই নেওয়া হবে; তবে অবশ্যই সেটা হতে হবে মূল্যের বিনিময়ে।
বিনামূল্যে সামান্য খড়কুটা গ্রহণের ক্ষেত্রেও যিনি এতটা সতর্ক ছিলেন, তার সৈন্যরা কি তাহলে কারও ঘরবাড়ি, ভূ-সম্পদ বা অর্থসম্পদে হাত দেওয়ার কথা কল্পনা করতে পারত?!
তার পূর্বের শাসকদের নীতি ছিল, তারা যখন অন্যের অধিকারে থাকা কোনো নগর-জনপদে বিজয়ীবেশে প্রবেশ করতেন, তখন পুরো এলাকাটির কর্তৃত্ব গ্রহণ করে তা সৈন্যদের মাঝে বণ্টন করে দিতেন। এর ফলে জমির মূল মালিকের মালিকানা শেষ হয়ে যেত। কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি শাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর মালিকানা প্রথা বাতিল করে জায়গির প্রথা চালু করেন। অর্থাৎ তিনি রাজন্য ও সৈন্যদেরকে বিজিত অঞ্চলের নির্দিষ্ট কিছু জমির জায়গির দায়িত্ব প্রদান করতেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি জমির মালিক হতো না; বরং তত্ত্বাবধান ও নিরাপত্তার দায়িত্ব লাভ করত। মালিকানা থেকে যেত মূল মালিকের হাতেই। মূল মালিক তার জমির নিরাপত্তা ও তত্ত্বাবধানের বিনিময়ে সরকারকে যৎসামান্য সুনির্দিষ্ট কর প্রদান করত। সেই করের কিছু অংশ জায়গিরপ্রাপ্ত আমির বা সৈন্য লাভ করত। জমির মালিকানা মূল মালিকের হাতেই থাকত এবং বংশানুক্রমে তার সন্তানরাই এর উত্তরাধিকারী হতো।
একবার কয়েকজন রাজন্য ও উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা ইমাদুদ্দিন জিনকিকে পূর্বের শাসকদের ন্যায় ভূ-মালিকানা প্রদানের অনুরোধ জানালে তিনি তাদেরকে এক চমৎকার উত্তর প্রদান করেন। তিনি তাদেরকে বলেন, 'দেশ যদি আমাদের হাতেই থাকে (আমরাই শাসন করি), তাহলে আলাদা করে তোমাদের ভূ-মালিকানার কী প্রয়োজন? জায়গির অধিকার দিয়েই তো তোমাদের প্রয়োজন পূরণ হয়ে যাচ্ছে। আর যদি দেশের শাসনাধিকার আমাদের হাত থেকে ছুটে যায়, তখন তো ভূ- মালিকানাও চলে যাবে (অর্থাৎ ক্রুসেডাররা ইসলামি ভূখণ্ড দখল করে নিলে তখনও তো তোমাদের দাবিকৃত ভূ-মালিকানা দিয়ে কোনো লাভ হবে না)।' এরপর তিনি তার বক্তব্য এই বলে শেষ করেন, 'ভূ-মালিকানা প্রশাসন ও ক্ষমতাবানদের হাতে চলে এলে তারা জনগণের ওপর অত্যাচার করে, সীমালঙ্ঘন করে এবং জনগণের জায়গা-জমি অন্যায়ভাবে ছিনিয়ে নেয়।
ইমাদুদ্দিন জিনকির এই ন্যায়ানুগ নীতিতে সাধারণ জনগণ, দরিদ্র, অসহায়, দুর্বল ও দিনমজুর শ্রেণির স্বার্থকে রাজন্য, সেনাপতি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়েছিল। তবে একই সঙ্গে তিনি জায়গির অধিকার বা মূল তত্ত্বাবধান অধিকার প্রদানের মাধ্যমে রাজন্যদের মনও খুশি রেখেছিলেন। এর ফলে জায়গিরের আয়তন অনুপাতে তারা ভারসাম্যপূর্ণ কর্তৃত্ব-অধিকার লাভ করত এবং জনতার অধিকারে হস্তক্ষেপ করা ছাড়াই প্রচুর মুনাফা অর্জন করতে পারত। এমনকি তিনি জায়গিরের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার নীতিও চালু করেছিলেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি কোনো রাজন্যের মৃত্যুর পর তার পুত্রকে সেই জায়গিরের তত্ত্বাবধায়ক পদে স্থলাভিষিক্ত করতেন। এর ফলে রাজন্যবর্গ তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকত এবং জীবদ্দশায় সন্তানদের ভবিষ্যৎ চিন্তায় জনগণের সম্পদে অন্যায় হস্তক্ষেপ করত না।
মালিকানা ও জায়গির নীতির ক্ষেত্রে ইমাদুদ্দিন জিনকির অনন্যসাধারণ অবস্থানের চমৎকার দৃষ্টান্ত হতে পারে মাআ'ররা বিজয়পরবর্তী ঘটনা। দীর্ঘ কয়েক বছর ক্রুসেডারদের দখলে থাকার পর তিনি মাআ'ররা নগরী পুনরুদ্ধার করেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকি হানাফি মতাদর্শী ছিলেন। হানাফি মাজহাব মতে কোনো ভূখণ্ড অমুসলিম শত্রুপক্ষের দখলে চলে গেলে তা 'দারুল হারব' ও শত্রুভূমিতে পরিণত হয়। পরবর্তী সময়ে মুসলমানরা ভূখণ্ডটি পুনরুদ্ধার করলে তা রাষ্ট্রীয় সম্পদে পরিণত হয় এবং বাইতুল মাল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) উক্ত ভূখণ্ডের অধিকার গ্রহণ করে সুবিবেচনা অনুযায়ী যাদেরকে ইচ্ছা বণ্টন করে দিতে পারে। এক্ষেত্রে উক্ত ভূখণ্ডের সাবেক মালিকদের কোনো অধিকার থাকে না।
মাআ'ররা বিজিত হলে নগরীটির সাবেক অধিবাসীরা বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে এসে নিজেদের পুরোনো ভূ-অধিকার দাবি করে। তখন ইমাদুদ্দিন জিনকি রাজ্যের উলামায়ে কেরামকে সমবেত করে এ বিষয়ে তাদের মতামত জানতে চান। যেহেতু তারা সকলে ছিলেন ইরাক অঞ্চলের আলিম আর ইরাকে হানাফি মাজহাব অনুসৃত ছিল, তাই তারা সকলে ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মতানুযায়ী সমাধান প্রদান করেন এবং বলেন, 'ভূ-মালিকানা সাবেক মালিকরা পাবে না; বরং পুরোটাই এখন বাইতুল মালের (অর্থাৎ রাষ্ট্রের) সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে।'
ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ. কী করেছিলেন?
তিনি সুগভীর দ্বীনি প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে উত্তর দেন, 'ফিরিঙ্গিরা (ক্রুসেডাররা) তাদের ভূমি-অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছিল; এখন আমরাও তাদের ভূমি-অধিকার ছিনিয়ে নিচ্ছি। তাহলে আমাদের ও ফিরিঙ্গিদের মধ্যে পার্থক্য থাকল কোথায়?! যারাই ভূমির মালিকানা প্রমাণে উপযুক্ত কাগজপত্র নিয়ে আসবে, তারা মালিকানা ফিরে পাবে।'
এভাবে তিনি সামান্য ভূমির অধিকারও না রেখে প্রত্যেককে আপন আপন ভূ-মালিকানা ফিরিয়ে দেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকির নীতি ছিল সমাজে কোনো অরাজকতা বা নৈরাজ্য টিকে থাকতে না দেওয়া। তিনি সব স্থানে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন বলে রাজ্যের সর্বত্র শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ. দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে এ অঞ্চলের পরিস্থিতি ছিল চরম বিশৃঙ্খলাপূর্ণ। নিরাপত্তাপ্রহরা ছাড়া মানুষ দীর্ঘ পথের সফরে বের হতে পারত না। এমনকি নিরাপত্তাপ্রহরা ব্যতীত চলাচলে আশঙ্কা থাকায় খোদ মসুলবাসী মূল নগরীর বাইরে নির্মিত জামে মসজিদে জুমার দিন ব্যতীত যেতে পারত না। কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি দায়িত্ব গ্রহণের পর সামগ্রিক চিত্র বদলে যায় এবং সর্বত্র শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। শুধু তা-ই নয়; তার শাসনামলে নগরায়ণ, কল্যাণ ও সমৃদ্ধি ব্যাপকতর হয় এবং জনসাধারণের বাড়িঘর নির্মাণের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পায়।
এভাবেই ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ. নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ সচেষ্ট ছিলেন। ফলে তার প্রত্যাশা পূরণের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তাআলা তাকে ও তার জনগণকে অকল্পনীয় বরকত ও কল্যাণ দান করেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ.-এর ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতা কেবল মুসলিম প্রজাদের সঙ্গেই ছিল না; ইহুদি-খ্রিষ্টানসহ নির্বিশেষে সকল প্রজা তার ন্যায়ানুগ বিচার লাভ করত। একবার তিনি সসৈন্য জাযিরা ইবনে উমরে অবস্থান করছিলেন। এ সময় স্থানীয় এক ইহুদি নাগরিক তার কাছে উপস্থিত হয়ে তার প্রশাসনের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আমির ইযযুদ্দিন আবু বকর আদ-দুবাইসির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করল যে, মুসলিম বাহিনী যতদিন উক্ত এলাকায় অবস্থান করবে, ইযযুদ্দিন নিজে বসবাসের উদ্দেশ্যে ততদিনের জন্য তার বাড়িটি দখল করে নিয়েছেন। অভিযোগ শুনে ইমাদুদ্দিন জিনকি প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে ইযযুদ্দিনের দিকে তাকালেন; মুখে কিছু বললেন না। দরবারে উপস্থিত প্রচণ্ড ভীত ইযযুদ্দিনের উল্টো দিকে ফেরারও সাহস ছিল না। তিনি তৎক্ষণাৎ দরজার দিকে পিঠ করে বের হয়ে গেলেন এবং তুমুল বৃষ্টি উপেক্ষা করে শহরে ফিরে তার তাঁবু নিয়ে শহরের বাইরে স্থাপন করলেন। ইহুদির প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে এক রাত বিলম্ব করার সাহসও তার ছিল না।
টিকাঃ
২৫২. প্রাগুক্ত, ৯/৩৪০।
২৫৩. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২৬৩।
২৫৪. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৮৩-২৮৪।
২৫৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৭৭।
২৫৬. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৭৫।
২৫৭, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৭৭।
২৫৮. জাযিরা ইবনে উমর: আধুনিক তুরস্কের শিরনাক প্রদেশ (Şırnak Province)-এর একটি নগরী। তুরস্ক, ইরাক ও সিরিয়া তিন দেশের সীমান্তরেখার নিকটে অবস্থিত নগরীটির আশেপাশে যদিও কোনো সাগর বা দ্বীপের অস্তিত্ব নেই; কিন্তু উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব তিন দিক থেকে দজলা নদী দ্বারা পরিবেষ্টিত বলে নগরীটি রূপকার্থে 'জাযিরা' নামে পরিচিতি লাভ করে। নগরীটির আধুনিক নাম কিজরা (Cizre)। [সম্পাদক]
২৫৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৭৭।
📄 [পাঁচ] হৃদয়-কোমলতা ও সংবেদনশীলতা
হয়তো অনেকেই ইমাদুদ্দিন জিনকির স্বভাবে এই গুণটির উপস্থিতিতে আশ্চর্য হবেন; চমকে উঠবেন ইমাদুদ্দিন জিনকিকে দৃষ্টান্ত হিসেবে গণ্য করে একজন মুসলিম শাসকের গুণ ও বৈশিষ্ট্য নির্ণয়-শীর্ষক আমাদের এ আলোচনায় এই গুণটির উপস্থাপনে।
বিস্ময়ের কারণ হলো, সামরিক অঙ্গনে নেতৃত্বদানকারী শাসকগণ সাধারণত রূঢ়তা, রুক্ষতা, স্বভাবজাত কঠোরতা ইত্যাদি গুণে প্রসিদ্ধ হয়ে থাকেন। যেহেতু দায়িত্ব পালনের খাতিরে তাদের শরিয়তের বিভিন্ন দণ্ডবিধান কার্যকর করতে হয় এবং কখনো কখনো শাস্তিদানের বিভিন্ন মাধ্যম গ্রহণ করতে হয়, তাই তাদের কোমলতাবিবর্জিত চিত্রই সাধারণত আমাদের সামনে ফুটে ওঠে।
আফসোসের বিষয়, স্বয়ং ইমাদুদ্দিন জিনকিকে নিয়ে রচিত কিছু ঐতিহাসিক গ্রন্থে তাকে কঠোর, নির্দয় ও রুক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বাস্তবতা হলো, দয়ার্দ্রতা, হৃদয়-কোমলতা ইত্যাদি একজন মুসলিম শাসকের অত্যাবশ্যকীয় গুণ। স্বয়ং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন সর্বোচ্চ স্তরের শাসক, সেনাপতি ও মুজাহিদ ছিলেন, ছিলেন মানবজগতের শ্রেষ্ঠতম কোমল-দয়ালু মানব। সৎ শাসকদের অপরিহার্য এই গুণটি ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ.-এর মাঝেও বিদ্যমান ছিল। কিন্তু কর্মমুখর সংগ্রামী জীবন, আজীবন বিভিন্ন কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মব্যস্ততা, দখলদার ক্রুসেডারদের হাত থেকে ইসলামি ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের অব্যাহত প্রচেষ্টা ইত্যাদি কারণে তার প্রকৃত স্বভাবের বিপরীত রুক্ষ ও কঠোর একটি চিত্র অঙ্কিত হয়েছে।
আমরা ইতিপূর্বে কৃষকদের প্রতি তার মহানুভবতা প্রত্যক্ষ করেছি। দেখেছি কৃষকের ফসল, সম্পদ, ক্ষেত-খামার এমনকি তুচ্ছ খড়-কুটার বিষয়ে তার সতর্কতা ও সংবেদনশীলতা। এমনটি একজন সহৃদয় ও অতিমাত্রায় সংবেদনশীল ব্যক্তি ছাড়া কারও পক্ষেই করা সম্ভব নয়।
তিনি একবার ভুল করলেই কাউকে পাকড়াও করতেন না; বরং বারবার ক্ষমা করতেন, যথাসম্ভব শেষ সীমা পর্যন্ত ছাড় দিতেন। তিনি তার প্রশাসনের এমন কোনো দায়িত্বশীলকেই কেবল বরখাস্ত করতেন, যে বারবার ভুল করত বা ক্ষমার অযোগ্য বড় কোনো অন্যায় করত। এ কারণেই তিনি যাদেরকে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন, তাদের অধিকাংশই আমৃত্যু বা খোদ ইমাদুদ্দিন জিনকির মৃত্যু পর্যন্ত নিজ পদে বহাল ছিল। এর কারণ একটাই; ইমাদুদ্দিন সর্বদা যথাসম্ভব তাদের ভুলত্রুটি উপেক্ষা করে চলতেন।
প্রতি শুক্রবার প্রকাশ্যে একশ দিনার দান করা ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ.-এর স্বভাব-রীতি ছিল। দরিদ্র-অসহায়দের প্রতি দয়ার অনুভূতি থেকে তিনি এ দান করতেন। প্রকাশ্যে দান করতেন, যেন সমাজের ধনী ব্যক্তিরা তার অনুকরণে দান করতে উদ্বুদ্ধ হয় এবং দানের কল্যাণচর্চা ব্যাপকতর হয়। এর বাইরে তিনি প্রতিদিন গোপনে বড় অঙ্কের দান করতেন, যা তার উজির ছাড়া কেউ জানত না। এ সম্পর্কিত একটি চমকপ্রদ ঘটনা ইতিহাসগ্রন্থে পাওয়া যায়।
ইমাদুদ্দিন জিনকি একদিন ঘোড়ায় চড়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। হঠাৎ ঘোড়াটি লাফিয়ে উঠলে তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলেন। এ সময় তিনি তার সঙ্গে থাকা জনৈক আমিরকে ডেকে বিষণ্ণ বা ক্রোধান্বিত স্বরে কিছু বললেন। লোকটি তার কথা বুঝতে পারল না; তবে এতটুকু অনুভব করতে পারল যে, ইমাদুদ্দিন জিনকি মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে আছেন। সে মনে করল, ইমাদুদ্দিন তার ওপরই রাগ করেছেন। কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকিকে প্রশ্ন করে অসন্তুষ্টির কারণ জিজ্ঞেস করার সাহস তার হলো না। লোকটি ত্রস্তপদে বাড়িতে ফিরে স্ত্রীকে নিজের ভয়ের কথা জানাল যে, তার হয়তো কোনো ভুল হয়ে গেছে। স্ত্রী তাকে বলল, 'আপনি ইমাদুদ্দিন জিনকির নায়েব (সহকারী) নাসিরুদ্দিন জাকারের সঙ্গে কথা বলুন; তিনি হয়তো আপনাকে কোনো সমাধান বাতলে দেবেন।' উক্ত আমির কালবিলম্ব না করে নাসিরুদ্দিনের কাছে গিয়ে ঘটনাটি জানাল। নাসিরুদ্দিন তাকে বললেন, 'তিনি তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট হননি; তিনি আসলে তোমার কাছে এই থলেটি চাচ্ছিলেন!' এ কথা বলে নাসিরুদ্দিন জাকার একটি থলে বের করে লোকটিকে দিলেন। লোকটি তা ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে নিয়ে গেলে তিনি খুশি মনে তা গ্রহণ করলেন। এরপর লোকটি পুনরায় নাসিরুদ্দিন জাকারের কাছে ফিরে এসে জিজ্ঞেস করল, 'আপনি কী করে বুঝলেন যে, তিনি এই থলেটিই চাচ্ছিলেন?' নাসিরুদ্দিন উত্তর দিলেন, 'তিনি প্রতিদিন এই পরিমাণ সম্পদ দান করেন এবং রাতেই লোক পাঠিয়ে আমার কাছ থেকে তা নিয়ে নেন। আজ তিনি কাউকে পাঠাননি। এরই মধ্যে খবর পেলাম যে, ঘোড়া হঠাৎ লাফিয়ে ওঠায় তিনি পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিলেন। এরপরই তিনি তোমাকে আমার কাছে পাঠালেন। বুঝতে পারলাম যে, তিনি তোমাকে দানের কথাই বলেছেন।'
ইমাদুদ্দিন জিনকি দানে বিলম্ব বা বিস্মৃতির সঙ্গে ঘোড়ার হোঁচট খাওয়ার যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে এটি তার তীব্র সংবেদনশীলতা, অনুভূতির কোমলতা এবং ঘটনা-দুর্ঘটনায় শিক্ষাগ্রহণে মনোযোগী হওয়ার দলিল। আর এ সবকিছু হৃদয় কোমল ও নমনীয় হলেই হয়ে থাকে। এ বিষয়টিও লক্ষণীয় যে, তিনি অব্যাহত যুদ্ধ, যুদ্ধ-পরিকল্পনা ও একটি রাষ্ট্রের পূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বের ব্যস্ততা সত্ত্বেও প্রতিদিন গরিব-অসহায়দের দান করতে ভুলতেন না।
নিঃসন্দেহে দয়া ও দানদক্ষিণা তার কৃত্রিম গুণ নয়; বরং হৃদয়ে প্রোথিত গুণ ছিল।
ইমাদুদ্দিন জিনকির দয়ার্দ্রচিত্ততার আরেকটি নিদর্শন হলো, তিনি দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার পরও তার প্রতি কারও অনুগ্রহপূর্ণ আচরণের কথা ভুলে যেতেন না। নাজমুদ্দিন আইয়ুবের সঙ্গে তার এ সংক্রান্ত ঘটনা তো অতি প্রসিদ্ধ।
নাজমুদ্দিন আইয়ুব ৫২৬ হিজরি সনে (১১৩১ খ্রিষ্টাব্দে) ইমাদুদ্দিন জিনকির একটি উপকার করেছিলেন। এ সময় ইমাদুদ্দিন জিনকি এক যুদ্ধে পরাজিত হলে নাজমুদ্দিন আইয়ুব তাকে তিকরিত দুর্গে আশ্রয় দেন। দীর্ঘ আট বছর পর ৫৩৪ হিজরি সনে (১১৩৯ খ্রিষ্টাব্দে) বালাবাক্কু নগরী বিজয়ের পর ইমাদুদ্দিন নাজমুদ্দিনকে নগরীটির প্রশাসক পদে অধিষ্ঠিত করে এই সদাচরণের প্রতিদান দেন। যে ব্যক্তি দীর্ঘ আট বছর পরও তার প্রতি কারও অনুগ্রহপূর্ণ আচরণের কথা স্মরণ রাখেন, তিনি যে একজন বিশ্বস্ত ও মহানুভব ব্যক্তি, তা কারও কাছে অস্পষ্ট থাকার কথা নয়।
ইমাদুদ্দিন জিনকি তার প্রতি মসুলের সাবেক প্রশাসক জাকারমিশের অনুগ্রহের কথাও ভুলেননি। জাকারমিশের সযত্ন তত্ত্বাবধানের প্রতিদানে তিনি এর পঁচিশ বছরেরও অধিক সময় পর তার পুত্র নাসিরুদ্দিন কুরিকে একটি জায়গির-দায়িত্ব প্রদান করেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকি ছিলেন একজন বিশ্বস্ত, মহানুভব ও কোমল হৃদয়-বিশিষ্ট মানুষ। তবে তার সারা জীবনের কর্মমুখর অক্লান্ত পরিশ্রম ও সংগ্রামী পদচারণার কারণে অনেকেই ভুলবশত মনে করে যে, তিনি কঠোর ও রুক্ষ স্বভাবের মানুষ ছিলেন। বাস্তবে তিনি ছিলেন এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা সামনে তার যে গুণ-বৈশিষ্ট্যটি আলোচনা করব, তার মাধ্যমে কতিপয় ঐতিহাসিকের এই মতভিন্নতার কার্যকারণ আমাদের সামনে সুস্পষ্ট হবে বলে আশা করা যায়।
টিকাঃ
২৬০, নবী-চরিত্রের অনুপম দয়া-অনুগ্রহ সম্পর্কে জানতে পাঠ করতে পারেন মাকতাবাতুল হাসান থেকে প্রকাশিতব্য ড. রাগিব সারজানির 'আর-রাহমাহ ফি-হায়াতির রাসুল'।
২৬১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৮১।
২৬২. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/১০৫।
২৬০. নাজমুদ্দিন আইয়ুব বিন শাযি হলেন মহাবীর সালাহুদ্দিন আইয়ুবির পিতা। তিনি নিজেও ছিলেন ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম মহান বীরযোদ্ধা। প্রথমে তিনি সেলজুক সুলতান মুহাম্মাদ বিন মালিকশাহর সেবক ছিলেন। তার সততা, বিশ্বস্ততা, বীরত্ব ও সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে সুলতান মুহাম্মাদ তাকে তিকরিত দুর্গের প্রশাসক নিযুক্ত করেন। নাজমুদ্দিন সেখানে ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ই একদিন সুলতান ইমাদুদ্দিন জিনকি এক যুদ্ধে শত্রুবাহিনীর কাছে পরাজিত হয়ে তিকরিতে আগমন করেন। নাজমুদ্দিন তাকে আশ্রয় দেন, তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন এবং তার=পূর্ণ সেবা-শুশ্রূষা করেন। পনেরো দিন তার কাছে অবস্থান করার পর ইমাদুদ্দিন মসুলে ফিরে যান। পরবর্তী সময়ে সেলজুক সুলতান গিয়াসুদ্দিন মাসউদ বিন মুহাম্মাদ তাকে সরিয়ে ইরাকের পুলিশ বিভাগের প্রধান মুজাহিদুদ্দিন নাহরুযকে তিকরিত দুর্গের দায়িত্ব প্রদান করেন। নাজমুদ্দিনও তিকরিতেই বসবাস করতে থাকেন। এর কিছুদিন পর কোনো কারণে নাহরুয নাজমুদ্দিনের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে দুর্গ থেকে বের করে দেন। তখন নাজমুদ্দিন আইয়ুব ও তার ভাই আসাদুদ্দিন শিরকুহ তিকরিত ছেড়ে মসুলে সুলতান ইমাদুদ্দিনের খেদমতে হাজির হন এবং নিজেদের যোগ্যতা ও নিষ্ঠাপূর্ণ কর্মদক্ষতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে জিনকি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন। [সম্পাদক]
২৬৪, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬৩।
২৬৫. প্রাগুক্ত, ১০/১৬
২৬৬, ইমাদুদ্দিন খলিল, ইমাদুদ্দিন জিনকি, পৃষ্ঠা: ২২০।
📄 [ছয়] গাম্ভীর্য ও রাশভারিত্ব
যে সময়ে, যে পরিস্থিতিতে ইমাদুদ্দিন জিনকির জন্ম ও বেড়ে ওঠা- সার্বিক বিচারে সে সময়টা ছিল সংগ্রামের। পরিস্থিতিই তাকে গম্ভীর ও রাশভারী করে তুলেছিল। তিনি জন্মগ্রহণ করেন চরম দুর্যোগপূর্ণ এক পরিস্থিতিতে। সে সময় মুসলিম নেতাদের পারস্পরিক বিরোধ ছিল একান্ত স্বাভাবিক বিষয়! তার পিতাও এমনই এক সংঘাতের নির্মম শিকার হয়ে নিহত হন। ফলে ইমাদুদ্দিন জিনকি বেড়ে ওঠেন পিতৃহীন-নিঃসঙ্গ অবস্থায়। তার কোনো সহোদর ভাই ছিল না। পিতার মৃত্যুর পর তিনি শৈশব-ভূমি আলেপ্পো থেকে মসুলে চলে যান। শৈশবের কচি বয়সেই তিনি বেছে নেন সৈনিকজীবন। শৈশবেই তিনি দেখেন, ক্রুসেডাররা একের পর এক ইসলামি ভূখণ্ড জবরদখল করে নিচ্ছে। ফলে সে বয়স থেকেই তিনি ক্রুসেড আগ্রাসনের গতিপ্রকৃতি ও প্রতিটি বাঁকের প্রতি তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখতে থাকেন। তিনি মুহূর্তের জন্যও ভুলে যাননি যে, মসজিদুল আকসা ক্রুসেডারদের দখলে আছে; এন্টিয়ক, এডেসা, বৈরুত, আক্কা ও ত্রিপোলিসহ ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন মুসলিম নগরী তাদের আগ্রাসনে রক্তাক্ত হয়েছে, রাতদিন মুসলমানদের রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে; অব্যাহত মুসলমানদের মানসম্মান ও ধনসম্পদ লুণ্ঠন করা হচ্ছে।
এ সকল পরিস্থিতি তাকে পুরোদস্তুর গম্ভীর ও সংগ্রামী করে তোলে। এমন বিপর্যস্ত পরিস্থিতিও যাকে গম্ভীর করতে পারে না; সে তো প্রকৃতপক্ষে মানবতাহীন, দ্বীন ও আকিদার চূড়ান্ত মিসকিন!
এই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সংগ্রামী মনোভাব তাকে কখনোই নিশ্চিন্ত হতে দেয়নি। এ কারণেই তিনি বিশ্রাম ও বিলাসী জীবন খুঁজতেন না। এর অর্থ এই নয় যে, তিনি কখনো মৃদু হাসতেনও না। আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন পৃথিবীর সর্বাধিক সহাস্য-বদন ছিলেন, তেমনই ছিলেন সবচেয়ে গম্ভীর মানুষ। নবীজি ছিলেন অধিক কৌতুক- হাস্যরস পরিহারকারী সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। নবীজীবনে যৎসামান্য যে নির্দোষ-নির্মল হাস্যরসের বিবরণ পাওয়া যায়, তাতে মিথ্যা ও অতিরঞ্জনের লেশমাত্র ছিল না। ইমাদুদ্দিন জিনকির জীবনাদর্শও এমনই ছিল। তিনি ছিলেন সদা-ভাবুক ও অতি নিশ্চুপ। তার মনমস্তিষ্ক সর্বদা উম্মাহর কল্যাণচিন্তা ও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কাজ সম্পাদনের পরিকল্পনায় ব্যস্ত থাকত বলে তিনি মানুষের সঙ্গে কথা খুব কম বলতেন। এই সদা-চিন্তাই তার ব্যক্তিত্বকে সকলের সামনে রাশভারী করে তুলেছিল। ঠিক একই বিষয় ঘটেছিল ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর রাযি.-এর ক্ষেত্রেও। যেহেতু এই গাম্ভীর্যে কোনো জুলুম-অবিচার, অনাচার বা অহংকার নেই, তাই এটি মোটেও আপত্তিকর নয়।
মহান ব্যক্তিগণ সব সময় রাশভারী, গম্ভীর ও প্রভাবসম্পন্নই হয়ে থাকেন। নবীজীবনের এ সংক্রান্ত একটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলে আমরা উপলব্ধি করতে পারব যে, ধর্মীয় নীতিমালার আলোকে এ জাতীয় গাম্ভীর্য মোটেও অপছন্দনীয় কিছু নয়।
ইমাম ইবনে মাজা রহ. আবু মাসউদ রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি নবীজির দরবারে উপস্থিত হলে নবীজি তার সঙ্গে কথা বললেন। এ সময় (ভয়ে) লোকটির কাঁধের গোশত কাঁপছিল। নবীজি তাকে অভয় দিয়ে বললেন, 'শান্ত হও; আমি তো রাজা-বাদশা নই। আমি সাধারণ শুকনো গোশত আহার করে জীবন অতিবাহিত করা এক মায়ের সন্তান!
লক্ষ করুন! নবীজিকে দেখে লোকটি ভয়ে কাঁপছিল। যদিও নবীজি ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে কোমল ও দয়ালু মানুষ; কিন্তু নবীজির ব্যক্তিত্ব, গাম্ভীর্য ও তার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ লোকটিকে প্রকম্পিত করে তুলেছিল। আর তাই নবীজি তাকে স্বাভাবিক হতে বলে তার অন্তর প্রশান্ত করেন।
আমাদের মহানায়ক ইমাদুদ্দিন জিনকিও এমনই ছিলেন।
একদিন তিনি দুর্গ থেকে বের হলেন। এ সময় দুর্গের দ্বাররক্ষী ঘুমাচ্ছিল। ইমাদুদ্দিন জিনকির ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে ঘুম থেকে জাগাল। চোখ খুলেই ইমাদুদ্দিন জিনকিকে দাঁড়ানো দেখে বেচারা ভয়ে ভূপাতিত হলো! তাকে ধরাধরি করে ওঠালে দেখা গেল, প্রচণ্ড ভয়ের কারণে সে তৎক্ষণাৎ মারা গেছে!
এর অর্থ এই নয় যে, ইমাদুদ্দিন জিনকি বদরাগী, কঠোর বা রুক্ষ স্বভাববিশিষ্ট ছিলেন। প্রজা ও সাধারণ জনতার সঙ্গে কখনোই কোনো বিষয়ে তাকে ক্রুদ্ধ হতে বা সীমালঙ্ঘন করতে দেখা যায়নি। কিন্তু তার স্বভাব-গাম্ভীর্যই জনমানুষের হৃদয়ে তার জন্য বিশেষ শ্রদ্ধাপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে দিয়েছিল।
ইমাদুদ্দিন জিনকির জীবন ছিল লৌকিকতামুক্ত সংগ্রামমুখর জীবন। নিজেকে তিনি সংগ্রাম ও কর্মমুখর জীবনে জোর করে বাধ্য করেননি; বরং এ জীবন তিনি উপভোগ করতেন। এমনকি ইবনুল আছির তার সম্পর্কে বলেন, 'তার কাছে গায়িকার গানের চেয়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি বেশি মধুময় মনে হতো। অন্যরা যেখানে গীত-সংগীতে মনের শান্তি খুঁজে বেড়াত, তিনি সেখানে মনের প্রশান্তি খুঁজে পেতেন রণাঙ্গনে বা অনুশীলনের ময়দানে যুদ্ধাস্ত্রের ঘর্ষণধ্বনিতে।
গাম্ভীর্য ও সংগ্রামী জীবন তার ব্যক্তিত্ব ও শখেও প্রভাব ফেলেছিল। মাঝেমধ্যে সুকঠিন ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি হ্রাস করতে তিনি যখন একটু প্রশান্তি খুঁজতেন, তখন তিনটি কাজের যেকোনো একটি বেছে নিতেন।
১. পাখি বা বন্য প্রাণী শিকারে বের হতেন। স্বভাবতই এর দ্বারা তির চালনা, আক্রমণ পরিচালনা ও নিজেকে আড়াল করার অনুশীলন হয়ে যেত। এর মাধ্যমে তিনি নিজের রণদক্ষতা আরও শানিত করতেন, যা রণাঙ্গনে কাজে লাগত। তার কাছে সবচেয়ে প্রিয় উপহার ছিল শিকারকৃত প্রাণী। তিনি নিজেও শাসক ও রাজন্যবর্গকে চিতা, ইগলসহ নিজের শিকার করা বিভিন্ন প্রাণী উপহার পাঠাতেন।
২. অশ্বচালনার অনুশীলন করতেন এবং ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করতেন। তিনি নিজে একজন সুদক্ষ ও অভিজ্ঞ অশ্বারোহী ছিলেন।
৩. নৌকায় চড়ে একাকী দজলার বুকে বিচরণ করতেন এবং মহান আল্লাহর সৃষ্টি-রহস্য নিয়ে ভাবতেন; আসমান-জমিন ও সৃষ্টিজগৎ নিয়ে চিন্তা করতেন কিংবা সমকালীন ঘটনা, দুর্যোগ ও বিপর্যয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতেন। নির্জনের এই চিন্তামগ্নতা তাকে দান করত বিভিন্ন চমৎকার চিন্তা ও পরিকল্পনা, বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল, অন্তরের বিনম্রতা কিংবা দৈহিক প্রশান্তি।
হ্যাঁ, এই ছিলেন মহান মুজাহিদ ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ.-এর বিনোদন ও আমোদ-প্রমোদের বিবরণ!
টিকাঃ
২৬৭. আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস রাযি. বলেন, 'রাসুলের চেয়ে সহাস্যবদন কোনো মানুষ আমি দেখিনি।' ইমাম তিরমিজি, সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৩৬৪১ ও ইমাম আহমাদ, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১৭৭৪০। [অনুবাদক]
২৬৮. ইমাম ইবনে মাজা, সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস নং ৩৩১২।
২৬৯. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/১০৫।
২৭০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ১৮।
২৭১. দেখুন: উসামা বিন মুনকিয, আল-ই'তিবার, পৃষ্ঠা: ১৯২-১৯৩।
২৭২. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬৩।
২৭৩. ইমাদুদ্দিন খলিল, ইমাদুদ্দিন জিনকি, পৃষ্ঠা: ১৮১।
📄 [সাত] দৃঢ় সংকল্প ও স্থির সিদ্ধান্ত
এটি একজন সচেতন শাসকের অতি আবশ্যকীয় গুণ। ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ.-এরও অন্যতম গুণ ছিল এটি। যুগে যুগে শাসক-প্রশাসকদের দ্বিধা ও সিদ্ধান্তহীনতা মুসলমানদের কত সুযোগ নষ্ট করেছে! জাতি-জীবনে দুর্যোগ-বিপর্যয় ত্বরান্বিত করেছে! কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি ছিলেন প্রতিটি বিষয়ে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। কোনো কাজ প্রয়োজন ও উপকারী মনে করলে তিনি অবিলম্বে সিদ্ধান্ত নিতেন এবং দ্বিধাহীন চিত্তে বাস্তবায়ন শুরু করতেন।
শাসনামলের শুরুতে তিনি উপলব্ধি করেন যে, যথার্থ প্রস্তুতি গ্রহণের পূর্বে তার পক্ষে এখন ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া সম্ভব নয়। তাই তিনি তাদের সঙ্গে সাময়িক যুদ্ধবিরতির চুক্তি করেন। সেই সময়কাল শেষ হতেই আমরা দেখেছি তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছেন এবং তা চালিয়ে গেছেন; ক্রুসেডারদের কোনো শান্তিপ্রস্তাবই আর গ্রহণ করেননি। প্রথমে শান্তিচুক্তির প্রস্তাব, এরপর অনবরত লড়াই-উভয় ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সংকল্প ও সিদ্ধান্তগ্রহণে স্থির-দ্বিধাহীন। পরিস্থিতি বিবেচনা করে অনেক সময় তিনি শেষে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিতেন, আবার কখনো পরিস্থিতি যুদ্ধের অনুকূল না হলে প্রস্থানের সিদ্ধান্ত নিতেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তিনি জিদ দেখিয়ে লড়াই করার জন্য গোয়ার্তুমি করতেন না; বরং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতেন এবং তৎক্ষণাৎ তার বাস্তবায়ন ঘটাতেন। তার এই স্থিরচিত্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে সঙ্গীরাও অপ্রয়োজনীয় কষ্টক্লেশ থেকে বেঁচে যেত।
সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধাহীনতার দৃষ্টান্ত তার জীবনে অসংখ্য; বরং তার পুরো জীবনই ছিল এর দৃষ্টান্ত! ইতিহাসের পরবর্তী অংশের ধারাবিবরণীতে আমরা যখন তার প্রশাসনিক ও সামরিক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করব, তখন বিষয়টি সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হবে।