📄 [এক] আল্লাহর জন্য একাগ্রতা ও একনিষ্ঠতা
এই গুণটি তার পুরো জীবনজুড়ে জড়িয়ে ছিল। এর ওপর নির্ভর করেই তিনি বিজয় ও কর্তৃত্ব লাভ করতেন। পাঠক হয়তো ইমাদুদ্দিন জিনকির জীবনের একটি সুস্পষ্ট গুণ হিসেবে ইখলাস ও একনিষ্ঠতার উল্লেখে আশ্চর্য হয়েছেন। ইখলাস ও নিষ্ঠা তো একটি আত্মিক গুণ; যার অস্তিত্ব সম্পর্কে জানেন কেবল আল্লাহ ও গুণের অধিকারী ব্যক্তি। অন্যরা তো নিষ্ঠাবান ব্যক্তির হৃদয়-নিষ্ঠা সম্পর্কে অবগত হতে পারে না!
এর উত্তর হলো—নিষ্ঠা যদিও একান্ত আত্মিক বিষয়; কিন্তু এর কিছু বাহ্যিক লক্ষণ ও নিদর্শন আছে; যেগুলো একজন ব্যক্তির মুখলিস ও নিষ্ঠাবান হওয়ার সাক্ষ্য প্রদান করে। সেসব লক্ষণ ও নিদর্শনের সবগুলোই আমরা ইমাদুদ্দিন জিনকির জীবন ও কর্মে প্রত্যক্ষ করেছি বলে তার নিষ্ঠার সাক্ষ্য প্রদান করছি। আল্লাহ তাআলা তার সমস্ত সৎকর্ম কবুল করে নিন।
তার জীবনে নিষ্ঠার একটি নিদর্শন হলো, সারাজীবন আপন নীতিতে অটল থাকা। ইসলামি ভূখণ্ড থেকে ক্রুসেডার বিতাড়ন সংগ্রামকে তিনি জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে নিয়েছিলেন। যে বিশ বছর তিনি মুসলমানদের শাসক ছিলেন, পুরোটা সময় তিনি এ লক্ষ্যে অবিচল সংগ্রাম করে গেছেন। কেবল এ বিশ বছরই নয়; প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বেও তিনি বিভিন্ন শাসকের অধীনে ক্রুসেডবিরোধী জিহাদে অংশগ্রহণ করেছেন।
একজন ব্যক্তির হৃদয়জগৎ যখন নিষ্ঠা ও ব্যক্তিচিন্তার মাঝে দোদুল্যমান থাকে, তখন অনেক সময়ই সে পরিস্থিতির অনুগামী হয়ে নিজের নীতি ও লক্ষ্য থেকে ছিটকে পড়ে। ইমাদুদ্দিন জিনকির বছরের পর বছর আপন লক্ষ্য ও কর্তব্যে অবিচল থাকাই প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে কাজ করতেন।
তার ইখলাস ও একনিষ্ঠতার আরেকটি লক্ষণ হলো, তিনি সব সময় জাতিস্বার্থকে ব্যক্তিস্বার্থের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন। মুসলিম উম্মাহর বিজয়ের স্বার্থে তিনি বহুবার ব্যক্তিস্বার্থ ও ব্যক্তিক্ষমতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছেন। তার এরূপ মহত্ত্ব ও আত্মত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত হলো, ৫৩২ হিজরি সনে (১১৩৭ খ্রিষ্টাব্দে) ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধে তিনি যখন সামরিক সংকটের মুখোমুখি হন, তখন সেলজুক সুলতান মাসউদের বাহিনীর সাহায্য গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় তার জনৈক উপদেষ্টা তাকে বলেন, ‘এ সিদ্ধান্ত সুলতান মাসউদকে আলেপ্পো দখলে প্ররোচিত করতে পারে, যা জিনকি রাষ্ট্রের পতন ত্বরান্বিত করবে।’ উত্তরে ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ. বলেন, ‘শত্রু ক্রুসেডাররা রাজ্য দখলে লালায়িত হয়ে উঠেছে। তারা আলেপ্পো দখল করে নিলে শাম অঞ্চলে ইসলামের অস্তিত্বই থাকবে না। আর শাম অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ কাফিরদের হাতে না থেকে যেকোনোভাবে মুসলমানদের হাতে থাকা আমার কাম্য।’
ক্রুসেড ইতিহাসে আমরা ইতিপূর্বে যেসব মুসলিম রাজন্যকে প্রত্যক্ষ করেছি, তাদের দৃষ্টিভঙ্গির তুলনায় ইমাদুদ্দিন জিনকির এই সমুন্নত দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণই ব্যতিক্রম। পেছনের ইতিহাসে আমরা দেখেছি, একজন আমির অন্য আমিরের সাহায্য কামনা করতে ভয় পেতেন; পাছে তার রাজ্য বেদখল হয়ে যায়। বরং কোনো কোনো রাজন্য তো নিজের রাজক্ষমতা রক্ষা করতে ক্রুসেডারদের সাহায্য কামনা করতেও কুণ্ঠিত হয়নি। এমনকি কোনো কোনো অথর্ব মুসলিম শাসক নিজের রাজ্য কোনো মুজাহিদ নেতার কর্তৃত্বে চলে যাবে—এই আশঙ্কায় তাকে হত্যা করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নেও দ্বিধা করেনি। মওদুদ রহ.-এর হত্যাকাণ্ড তো বেশি আগের কথা নয়!
ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ.-এর ইখলাস ও আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতার আরেকটি নিদর্শন হলো, তিনি রণাঙ্গনে জীবন বাজি রেখে লড়াই করতেন। তিনি কখনো পেছনের সারিতে থাকতেন না, থাকতেন না রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কেন্দ্র হতে নিরাপদ দূরত্বে; বরং সব সময় তিনি সবার সামনে থাকতেন। এমনকি অনেক সময় তিনি চলে যেতেন শত্রুপক্ষের একেবারে সন্নিকটে। একবার তিনি এডেসা অবরোধকালে রাতের বেলা বিরাট দস্তরখান বিছিয়ে তাতে খাবার সাজান; এরপর সৈন্যদের মাঝে ঘোষণা করেন, 'আমার এই দস্তরখানে আজ কেবল সে-ই শরিক হতে পারবে, যে আগামীকাল আমার সঙ্গে এডেসার নগরদ্বারে আক্রমণ চালাতে শরিক থাকবে!' অর্থাৎ পরদিন তিনি যুদ্ধ করতে করতে দুর্গের একেবারে নিকটতম স্থানে চলে যাবেন এবং নিজেই সরাসরি নগরদ্বার ভেঙে ফেলার চেষ্টা করবেন। নিশ্চিত করেই এতে তিনি শত্রুপক্ষের তিরের লক্ষ্যে পরিণত হবেন; এমনকি এতে তার জীবনও বিপন্ন হতে পারে। কিন্তু তিনি এমন ঝুঁকিই নিতেন।
তার এমন দ্বীপ্ত আহ্বানে সে রাতে একজন আমির ও অচেনা একটি শিশু ছাড়া কেউ সাড়া দেয়নি। কারণ, ইমাদুদ্দিন জিনকির দুঃসাহসিকতা ও শাহাদাতের নিষ্ঠাপূর্ণ আগ্রহের কথা সকলের জানা ছিল, জানা ছিল তিনি কতটা ঝুঁকি নিতে পারেন। সেই আমির বাচ্চাটিকে জিজ্ঞেস করেন, 'তুমি বাছা এখানে কেন?!' ছোট বলে তিনি তার দৃঢ়তা নিয়ে সন্দেহ করছিলেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি তাকে বলেন, 'ওকে থাকতে দিন। আল্লাহর শপথ, আমি ওর চেহারার ভাষা পড়তে পারছি; ও পিছপা হবে না।' বাস্তবেও তা-ই ঘটে। পরদিন সত্যিই ছেলেটি অবিচল চিত্তে তাকে সঙ্গ দিয়ে যায়।
মহান আল্লাহর প্রতি তার একনিষ্ঠতার আরেকটি প্রমাণ তার প্রতি জনসাধারণের সম্মিলিত ভালোবাসা। মানবহৃদয় তো আল্লাহ তাআলার নিয়ন্ত্রণাধীন। ইতিহাসের পাতায় আমরা দেখেছি, বিভিন্ন রাজ্য ও রাষ্ট্রের অধিবাসীরা নির্বিশেষে তাকে ভালোবাসত। সমকালীন উজির, কাজি, আলিমসমাজ সকলে তার প্রতি হৃদ্যতা পোষণ করত। এভাবে কারও প্রতি সকলের সম্মিলিত ভালোবাসা সৃষ্টি মূলত তার প্রতি আল্লাহ তাআলার ভালোবাসা থাকার প্রমাণ। আর আল্লাহ কেবল মুখলিস ও নিষ্ঠাবান বান্দাদেরকেই ভালোবাসেন।
নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِذَا أَحَبَّ اللَّهُ الْعَبْدَ نَادَى جِبْرِيلَ : إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ فُلَانًا فَأَحْبِبْهُ، فَيُحِبُّه جِبْرِيلُ، فَيُنَادِي جِبْرِيلُ فِي أَهْلِ السَّمَاءِ : إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ فُلَانًا فَأَحِبُّوْهُ، فَيُحِبُّه أَهْلُ السَّمَاءِ، ثُمَّ يُوْضَعُ لَهُ الْقَبُوْلُ فِي الْأَرْضِ»
আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তিনি জিবরাইলকে ডেকে বলেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালোবাসেন; তুমিও তাকে ভালোবাসো।' তখন জিবরাইলও তাকে ভালোবাসেন। এরপর জিবরাইল আকাশবাসীদের মধ্যে ঘোষণা করেন, 'আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালোবাসেন; তোমরাও তাকে ভালোবাসো।' তখন আকাশের অধিবাসীরা তাকে ভালোবাসতে থাকে। এরপর জমিনে তার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে দেওয়া হয়।
সুতরাং কোনো শাসক যদি পৃথিবীতে জনপ্রিয় ও বরণীয় হয়; জনসাধারণ নির্বিশেষে তাকে ভালোবাসে, তাহলে নিঃসন্দেহে তা উক্ত শাসকের নিষ্ঠা ও আল্লাহর ভালোবাসা প্রাপ্তির নিদর্শন।
তার ইখলাস ও নিষ্ঠার আরেকটি লক্ষণ হলো, আল্লাহ তাআলা তাকে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে অধিকাংশ যুদ্ধে বিজয় দান করেছেন। আর আল্লাহ কেবল তাদেরকেই বিজয় দান করেন, যারা তার প্রিয়, তার দ্বীনের সহযোগী এবং তার প্রতি একনিষ্ঠ। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে এর ঘোষণা রয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করছি।
وَلَيَنْصُرَنَّ اللَّهُ مَنْ يَنْصُرُهُ যে আল্লাহর (দ্বীনের) সহযোগী হয়, তিনিও নিশ্চিত তার সহযোগী হন। [সুরা হাজ্ব: ৪০]
إِنْ يَنْصُرُكُمُ اللَّهُ فَلَا غَالِبَ لَكُمْ আল্লাহ তোমাদের বিজয়ী করলে কেউ তোমাদের হারাতে পারবে না। [সুরা আলে-ইমরান: ১৬০]
وَمَنْ يَتَوَلَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا فَإِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْغَلِبُونَ আর যারা আল্লাহ, তার রাসুল ও বিশ্বাসীদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারাই আল্লাহর দল; তারাই বিজয়ী। [সুরা মায়িদা: ৫৬]
ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ.-এর সততা ও নিষ্ঠার সর্বশেষ নিদর্শন তার সুপরিণতি, সুন্দরতম মৃত্যু! সামনের আলোচনায় আমরা প্রত্যক্ষ করব; তিনি জিহাদের ময়দানে শহিদি মৃত্যুর অধিকারী হবেন। আর রণাঙ্গনের মৃত্যুই হলো মানবজীবনের পরম সৌভাগ্যজনক সমাপ্তি। শহিদি মৃত্যু তো প্রত্যেক পুণ্যবান মুমিনের হৃদয়ের তামান্না।
উমর আল-জুমায়ি হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ যখন কোনো বান্দার কল্যাণ কামনা করেন, তাকে তার জীবনের শেষ মুহূর্তে কাজে লাগান।' উপস্থিত জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করে, 'কী কাজে লাগান?' নবীজি উত্তর দেন, 'আল্লাহ তাকে সৎকর্মের প্রতি পরিচালিত করেন; এরপর সে অবস্থায় তাকে তুলে নেন।
এগুলো তার ইখলাস ও নিষ্ঠার কিছু নিদর্শন এবং এগুলোই তার মহান ও অনন্য হয়ে ওঠার মূল রহস্য। তার প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহ তার সঙ্গে ছিলেন। তিনি যখন পিতৃহারা ও নিঃস্ব হয়ে পড়েন, তখন আল্লাহই তার তত্ত্বাবধান ও প্রতিপালনের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়োজিত করে দেন এবং এমন উপযুক্ত করে গড়ে তোলেন, যার ফলাফল উম্মাহর ইতিহাসের পাতায় আজও সমুজ্জ্বল।
টিকাঃ
২৪২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০৩।
২৪০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩৩১।
২৪৪, ইমাম বুখারি, সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩০৩৭ ও ইমাম মুসলিম, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৬৩৭ ও ইমাম নাসায়ি, আস-সুনানুল কুবরা, হাদিস নং ৭৭৪৭।
২৪৫. ইমাম তিরমিজি, সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২১৪২, ইমাম আহমাদ, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১৭২৫৬ ও ইমাম ইবনে হিব্বান আল-বুসতি, সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৩৪১।
📄 [দুই] দ্বীন ও শরিয়তের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধাবোধ
এ গুণটি তার জীবনে ভোরের সূর্যের মতো প্রোজ্জ্বল। তিনি তার শাসনাধীন প্রতিটি অঞ্চলে শরিয়ত নির্ধারিত দণ্ডবিধি চালুকরণে সচেষ্ট ছিলেন। তিনি নিজে শরিয়তের বিধিবিধান কঠোরভাবে মেনে চলতেন, জনগণকেও মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করতেন। জীবনে কতবার তিনি বিভিন্ন মাসআলার সমাধানের জন্য আলিম-ফকিহদের সমবেত করেছেন! তিনি তার রাজ্যে আলিমসমাজের সমুন্নত মর্যাদা প্রদান করতেন। ঐতিহাসিক ইবনুল আছির কাজি বাহাউদ্দিন শাহরাযুরি সম্পর্কে বলেন, ‘ইমাদুদ্দিন জিনকি তার মতামত না নিয়ে কোনো আইন জারি করতেন না’। একই ধরনের মন্তব্য ইমাদুদ্দিন জিনকির সমসাময়িক অন্যান্য আলিমের ক্ষেত্রেও পাওয়া যায়। ইমাদুদ্দিন জিনকি বিভিন্ন স্থান থেকে আলিমদের সমবেত করে তাদেরকে জনসাধারণের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দিতেন; এমনকি নিজের সন্তানদের প্রতিপালনের দায়িত্বও তিনি আলিমদের হাতে ন্যস্ত করেছিলেন। এ কারনেই তার পুত্ররা তার মতোই যোগ্য বরং আরও অধিক যোগ্য হয়ে গড়ে ওঠে। এক্ষেত্রে বিশেষ করে উল্লেখ করা যেতে পারে তার দুই পুত্র নুরুদ্দিন মাহমুদ ও সাইফুদ্দিন গাজির কথা।
দ্বীনের প্রতি তার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধের এটিও একটি প্রমাণ যে, তিনি তার সব পুত্রের নামের সঙ্গে ‘দ্বীন’ শব্দটি জুড়ে দিয়েছিলেন। তার পুত্রদের নাম ছিল যথাক্রমে সাইফুদ্দিন, নুরুদ্দিন, কুতুবুদ্দিন ও নুসরাতুদ্দিন। আল্লাহর শোকর, এটি সেই প্রজন্মের ব্যাপক রীতিতে পরিণত হয়েছিল। হয়তো দ্বীনের প্রতি এমন অনুরাগের ফলেই আল্লাহ তার জন্য বিজয়ভাগ্য লিখে দিয়েছিলেন। আক সুনকুর তার পুত্রের নাম রাখেন ইমাদুদ্দিন। একই যুগে জন্ম নেন সালাহুদ্দিন আইয়ুবি। ইমাদুদ্দিন জিনকির কাজি ছিলেন বাহাউদ্দিন; নায়েব ছিলেন নাসিরুদ্দিন। এভাবে চলে দ্বীনের প্রতি সম্বন্ধিত নামের ধারা। অথচ উক্ত প্রজন্মের পূর্বে এমনটি ছিল না। বরং এর পূর্বে শাসক ও রাজন্যবর্গ শারফুদ্দৌলা, জানাহুদ্দৌলা, আযদুদ্দৌলা, বাহাউদ্দৌলা, তাজুল-মুলুক, শামসুল-মুলুক ইত্যাদি ‘দৌলা’ ও ‘মুলুক’ শব্দযুক্ত নাম পছন্দ করত। এ জাতীয় নাম দ্বীনের প্রতি সম্পৃক্তি নয়, বরং রাজত্ব ও ক্ষমতার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করত।
ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ. আলিমসমাজের প্রতি এই অত্যুচ্চ ভক্তি-শ্রদ্ধার পাশাপাশি তাদেরকে যথাসাধ্য সদুপদেশ ও নির্দেশনা প্রদানে কার্পণ্য করতেন না। বিদগ্ধ আলিম হিবাতুল্লাহ বিন আবু জারাদাকে আলেপ্পোর বিচারক পদে অধিষ্ঠিত করার সময় তিনি কী চমৎকার উক্তি করেছিলেন! তিনি এ সময় তাকে বলেন, ‘এই গুরুভার আমি নিজের কাঁধ থেকে নামিয়ে আপনার কাঁধে তুলে দিলাম। আপনার কর্তব্য আল্লাহকে ভয় করে দায়িত্ব পালন করা।
দ্বীন ও শরিয়তের প্রতি সুগভীর শ্রদ্ধাবোধের কারণেই তিনি আলিমসমাজকেও খোদাভীতির নসিহত করতেন।
টিকাঃ
২৪৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৪৩।
২৪৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৯৭।
২৪৮. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৭৪-২৭৫।
📄 [তিন] বীরত্ব ও সাহসিকতা
সামরিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে নেতৃত্বপিয়াসী প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য বীরত্ব একটি অত্যাবশ্যকীয় গুণ। জাতির লাগাম যদি ভীরু-কাপুরুষ কোনো ব্যক্তির হাতে চলে যায়, তখন পুরো জাতিই দুর্দশা ও দুর্ভাগ্যের শিকার হয়।
বীরত্ব ও সাহসিকতা কেবল যুদ্ধের ময়দানেই প্রয়োজন হয় না; সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও বীরত্বের প্রয়োজন হয়। অনেক শাসক ও রাষ্ট্রনেতা এতটা ভীরু-কাপুরুষ হয় যে, জিহাদ শুরু করবে কী, জিহাদের সিদ্ধান্তই নিতে পারে না। নিজেদের কাপুরুষতাকে আড়াল করার জন্য তারা অজুহাত দেখায়, 'আমরা চাই না জাতি যুদ্ধের ভয়াবহতার শিকার হোক।' অথচ জাতির 'কল্যাণকামী' এসব নেতার রাষ্ট্র অধিকৃত হয়ে গেছে, জাতির মর্যাদা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে, জন-অধিকার বিলীন হয়ে গেছে, সেদিকে তাদের ভ্রূক্ষেপই নেই।
ইমাদুদ্দিন জিনকি ছিলেন সর্বাবস্থায় সর্বক্ষেত্রে বীরত্ব ও সাহসিকতার অধিকারী। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, গুরুতর পরিস্থিতি ও রণাঙ্গনের সঙ্গিনতম মুহূর্ত—সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন বীর-সাহসী। শুরু জীবন থেকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বীরত্ব ছিল তার অনন্য ভূষণ।
প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে যখন তিনি মসুলের আমির কারবুগা, জাকারমিশ, মওদুদ ও আক সুনকুরের সঙ্গে ছিলেন; তখনও আমরা তার বীরত্বের বিভিন্ন বহিঃপ্রকাশ দেখেছি। এরপর যখন তিনি প্রশাসক পদে অধিষ্ঠিত হন, তখনও তিনি ছিলেন পূর্বের ন্যায় বীরত্বে সমুজ্জ্বল; বরং পূর্বের চেয়েও উজ্জ্বল। ঐতিহাসিক আবু শামা কী চমৎকার ভাষায় ইমাদুদ্দিন জিনকির বীরত্বের বর্ণনা দিয়েছেন! তিনি বলেন, 'ইমাদুদ্দিন জিনকির বীরত্ব ও নির্ভীকতা এত উচ্চ স্তরের ছিল যে, এই দুটি গুণ যেন তার কাছে এসেই চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছেছিল। আর তাই বীরত্বের দৃষ্টান্ত হিসেবে তার নাম উচ্চারিত হতো।
ইবনে কাছির তার সম্পর্কে বলেন, 'তিনি ছিলেন চূড়ান্ত স্তরের সাহসিকতার অধিকারী।' আরেক স্থানে তিনি বলেন, 'তিনি ছিলেন সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠতম বীর!'
এমনটিই ছিল তার পুরো জীবনের দাস্তান; যা প্রমাণ করে যে, তিনি পরিস্থিতির দাবিতে বা ক্ষেত্রবিশেষে সাময়িক সাহসিকতা প্রদর্শনকারী ছিলেন না; বীরত্ব ছিল তার স্বভাবজাত গুণ।
টিকাঃ
২৪৯, আবু শামা আল-মাকদিসি, আর-রাওযাতাইন ফি তারীখিদ দাওলাতাইন আন-নুরিয়া ওয়াস-সালাহিয়া, ১/১৬০।
২৫০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৫৩।
২৫১. প্রাগুক্ত, ৯/৩৪০।
📄 [চার] ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতা
যেকোনো সৎ শাসকের জন্য ন্যায়পরায়ণতা একটি অপরিহার্য গুণ। কারণ, একজন শাসক তার ইচ্ছেমতো শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা রাখেন। তিনি যদি জুলুম-অবিচার করতে চান, তাকে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই। পক্ষান্তরে তিনি যদি ন্যায়প্রত্যাশী হন, তবে জনগণ সুখী হয়; বরং পৃথিবীব্যাপী সৌভাগ্য ছড়িয়ে পড়ে।
ন্যায়পরায়ণতা ছিল ইমাদুদ্দিন জিনকির অন্যতম লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। তার শাসনামলের বিবরণ দিতে গিয়ে ইবনুল আছির বলেন, '(তার শাসনামলে) শক্তিশালী দুর্বলের ওপর জুলুম করতে পারত না।' তিনি তার অধীনস্থ রাজন্যবর্গকে সর্বদা জনসাধারণের সঙ্গে কঠোরতা পরিহার করে কোমল আচরণ করার নির্দেশ দিতেন। এ নীতির ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত অটল ছিলেন। জনগণের সম্পদে অন্যায় হস্তক্ষেপ করার অপরাধে তিনি তার উজির আবুল মাহাসিন আল-আজমিকে বন্দি করেন। এক্ষেত্রে তিনি তার কোনো কৈফিয়তকে পাত্তা দেননি। কারণ, তার কাছে জনগণের অধিকার সেনাপতি ও প্রশাসকদের অধিকারের তুলনায় অগ্রবর্তী ছিল। সহজ-সরল সাধারণ কৃষকদের অধিকার রক্ষায়ও তিনি যথেষ্ট। যত্নবান ছিলেন। পথ চলাকালে কেউ যেন কোনো কৃষকের ফসল মাড়িয়ে না যায়, এজন্য তিনি তার সৈন্যদের কৃষিক্ষেতের মাঝ দিয়ে চলার সময় পূর্ণ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিতেন। তার শাসনামলে কোনো সৈন্য নিজের ঘোড়ার জন্য কৃষকের ক্ষেত থেকে একটি খড়ও বিনামূল্যে নেওয়ার সাহস করত না। যদিও এসব খড়কুটা পরবর্তী সময়ে যুদ্ধে ব্যবহৃত ঘোড়ার খাদ্য হিসেবেই নেওয়া হবে; তবে অবশ্যই সেটা হতে হবে মূল্যের বিনিময়ে।
বিনামূল্যে সামান্য খড়কুটা গ্রহণের ক্ষেত্রেও যিনি এতটা সতর্ক ছিলেন, তার সৈন্যরা কি তাহলে কারও ঘরবাড়ি, ভূ-সম্পদ বা অর্থসম্পদে হাত দেওয়ার কথা কল্পনা করতে পারত?!
তার পূর্বের শাসকদের নীতি ছিল, তারা যখন অন্যের অধিকারে থাকা কোনো নগর-জনপদে বিজয়ীবেশে প্রবেশ করতেন, তখন পুরো এলাকাটির কর্তৃত্ব গ্রহণ করে তা সৈন্যদের মাঝে বণ্টন করে দিতেন। এর ফলে জমির মূল মালিকের মালিকানা শেষ হয়ে যেত। কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি শাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর মালিকানা প্রথা বাতিল করে জায়গির প্রথা চালু করেন। অর্থাৎ তিনি রাজন্য ও সৈন্যদেরকে বিজিত অঞ্চলের নির্দিষ্ট কিছু জমির জায়গির দায়িত্ব প্রদান করতেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি জমির মালিক হতো না; বরং তত্ত্বাবধান ও নিরাপত্তার দায়িত্ব লাভ করত। মালিকানা থেকে যেত মূল মালিকের হাতেই। মূল মালিক তার জমির নিরাপত্তা ও তত্ত্বাবধানের বিনিময়ে সরকারকে যৎসামান্য সুনির্দিষ্ট কর প্রদান করত। সেই করের কিছু অংশ জায়গিরপ্রাপ্ত আমির বা সৈন্য লাভ করত। জমির মালিকানা মূল মালিকের হাতেই থাকত এবং বংশানুক্রমে তার সন্তানরাই এর উত্তরাধিকারী হতো।
একবার কয়েকজন রাজন্য ও উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা ইমাদুদ্দিন জিনকিকে পূর্বের শাসকদের ন্যায় ভূ-মালিকানা প্রদানের অনুরোধ জানালে তিনি তাদেরকে এক চমৎকার উত্তর প্রদান করেন। তিনি তাদেরকে বলেন, 'দেশ যদি আমাদের হাতেই থাকে (আমরাই শাসন করি), তাহলে আলাদা করে তোমাদের ভূ-মালিকানার কী প্রয়োজন? জায়গির অধিকার দিয়েই তো তোমাদের প্রয়োজন পূরণ হয়ে যাচ্ছে। আর যদি দেশের শাসনাধিকার আমাদের হাত থেকে ছুটে যায়, তখন তো ভূ- মালিকানাও চলে যাবে (অর্থাৎ ক্রুসেডাররা ইসলামি ভূখণ্ড দখল করে নিলে তখনও তো তোমাদের দাবিকৃত ভূ-মালিকানা দিয়ে কোনো লাভ হবে না)।' এরপর তিনি তার বক্তব্য এই বলে শেষ করেন, 'ভূ-মালিকানা প্রশাসন ও ক্ষমতাবানদের হাতে চলে এলে তারা জনগণের ওপর অত্যাচার করে, সীমালঙ্ঘন করে এবং জনগণের জায়গা-জমি অন্যায়ভাবে ছিনিয়ে নেয়।
ইমাদুদ্দিন জিনকির এই ন্যায়ানুগ নীতিতে সাধারণ জনগণ, দরিদ্র, অসহায়, দুর্বল ও দিনমজুর শ্রেণির স্বার্থকে রাজন্য, সেনাপতি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়েছিল। তবে একই সঙ্গে তিনি জায়গির অধিকার বা মূল তত্ত্বাবধান অধিকার প্রদানের মাধ্যমে রাজন্যদের মনও খুশি রেখেছিলেন। এর ফলে জায়গিরের আয়তন অনুপাতে তারা ভারসাম্যপূর্ণ কর্তৃত্ব-অধিকার লাভ করত এবং জনতার অধিকারে হস্তক্ষেপ করা ছাড়াই প্রচুর মুনাফা অর্জন করতে পারত। এমনকি তিনি জায়গিরের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার নীতিও চালু করেছিলেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি কোনো রাজন্যের মৃত্যুর পর তার পুত্রকে সেই জায়গিরের তত্ত্বাবধায়ক পদে স্থলাভিষিক্ত করতেন। এর ফলে রাজন্যবর্গ তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকত এবং জীবদ্দশায় সন্তানদের ভবিষ্যৎ চিন্তায় জনগণের সম্পদে অন্যায় হস্তক্ষেপ করত না।
মালিকানা ও জায়গির নীতির ক্ষেত্রে ইমাদুদ্দিন জিনকির অনন্যসাধারণ অবস্থানের চমৎকার দৃষ্টান্ত হতে পারে মাআ'ররা বিজয়পরবর্তী ঘটনা। দীর্ঘ কয়েক বছর ক্রুসেডারদের দখলে থাকার পর তিনি মাআ'ররা নগরী পুনরুদ্ধার করেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকি হানাফি মতাদর্শী ছিলেন। হানাফি মাজহাব মতে কোনো ভূখণ্ড অমুসলিম শত্রুপক্ষের দখলে চলে গেলে তা 'দারুল হারব' ও শত্রুভূমিতে পরিণত হয়। পরবর্তী সময়ে মুসলমানরা ভূখণ্ডটি পুনরুদ্ধার করলে তা রাষ্ট্রীয় সম্পদে পরিণত হয় এবং বাইতুল মাল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) উক্ত ভূখণ্ডের অধিকার গ্রহণ করে সুবিবেচনা অনুযায়ী যাদেরকে ইচ্ছা বণ্টন করে দিতে পারে। এক্ষেত্রে উক্ত ভূখণ্ডের সাবেক মালিকদের কোনো অধিকার থাকে না।
মাআ'ররা বিজিত হলে নগরীটির সাবেক অধিবাসীরা বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে এসে নিজেদের পুরোনো ভূ-অধিকার দাবি করে। তখন ইমাদুদ্দিন জিনকি রাজ্যের উলামায়ে কেরামকে সমবেত করে এ বিষয়ে তাদের মতামত জানতে চান। যেহেতু তারা সকলে ছিলেন ইরাক অঞ্চলের আলিম আর ইরাকে হানাফি মাজহাব অনুসৃত ছিল, তাই তারা সকলে ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মতানুযায়ী সমাধান প্রদান করেন এবং বলেন, 'ভূ-মালিকানা সাবেক মালিকরা পাবে না; বরং পুরোটাই এখন বাইতুল মালের (অর্থাৎ রাষ্ট্রের) সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে।'
ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ. কী করেছিলেন?
তিনি সুগভীর দ্বীনি প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে উত্তর দেন, 'ফিরিঙ্গিরা (ক্রুসেডাররা) তাদের ভূমি-অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছিল; এখন আমরাও তাদের ভূমি-অধিকার ছিনিয়ে নিচ্ছি। তাহলে আমাদের ও ফিরিঙ্গিদের মধ্যে পার্থক্য থাকল কোথায়?! যারাই ভূমির মালিকানা প্রমাণে উপযুক্ত কাগজপত্র নিয়ে আসবে, তারা মালিকানা ফিরে পাবে।'
এভাবে তিনি সামান্য ভূমির অধিকারও না রেখে প্রত্যেককে আপন আপন ভূ-মালিকানা ফিরিয়ে দেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকির নীতি ছিল সমাজে কোনো অরাজকতা বা নৈরাজ্য টিকে থাকতে না দেওয়া। তিনি সব স্থানে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন বলে রাজ্যের সর্বত্র শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ. দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে এ অঞ্চলের পরিস্থিতি ছিল চরম বিশৃঙ্খলাপূর্ণ। নিরাপত্তাপ্রহরা ছাড়া মানুষ দীর্ঘ পথের সফরে বের হতে পারত না। এমনকি নিরাপত্তাপ্রহরা ব্যতীত চলাচলে আশঙ্কা থাকায় খোদ মসুলবাসী মূল নগরীর বাইরে নির্মিত জামে মসজিদে জুমার দিন ব্যতীত যেতে পারত না। কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি দায়িত্ব গ্রহণের পর সামগ্রিক চিত্র বদলে যায় এবং সর্বত্র শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। শুধু তা-ই নয়; তার শাসনামলে নগরায়ণ, কল্যাণ ও সমৃদ্ধি ব্যাপকতর হয় এবং জনসাধারণের বাড়িঘর নির্মাণের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পায়।
এভাবেই ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ. নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ সচেষ্ট ছিলেন। ফলে তার প্রত্যাশা পূরণের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তাআলা তাকে ও তার জনগণকে অকল্পনীয় বরকত ও কল্যাণ দান করেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ.-এর ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতা কেবল মুসলিম প্রজাদের সঙ্গেই ছিল না; ইহুদি-খ্রিষ্টানসহ নির্বিশেষে সকল প্রজা তার ন্যায়ানুগ বিচার লাভ করত। একবার তিনি সসৈন্য জাযিরা ইবনে উমরে অবস্থান করছিলেন। এ সময় স্থানীয় এক ইহুদি নাগরিক তার কাছে উপস্থিত হয়ে তার প্রশাসনের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আমির ইযযুদ্দিন আবু বকর আদ-দুবাইসির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করল যে, মুসলিম বাহিনী যতদিন উক্ত এলাকায় অবস্থান করবে, ইযযুদ্দিন নিজে বসবাসের উদ্দেশ্যে ততদিনের জন্য তার বাড়িটি দখল করে নিয়েছেন। অভিযোগ শুনে ইমাদুদ্দিন জিনকি প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে ইযযুদ্দিনের দিকে তাকালেন; মুখে কিছু বললেন না। দরবারে উপস্থিত প্রচণ্ড ভীত ইযযুদ্দিনের উল্টো দিকে ফেরারও সাহস ছিল না। তিনি তৎক্ষণাৎ দরজার দিকে পিঠ করে বের হয়ে গেলেন এবং তুমুল বৃষ্টি উপেক্ষা করে শহরে ফিরে তার তাঁবু নিয়ে শহরের বাইরে স্থাপন করলেন। ইহুদির প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে এক রাত বিলম্ব করার সাহসও তার ছিল না।
টিকাঃ
২৫২. প্রাগুক্ত, ৯/৩৪০।
২৫৩. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২৬৩।
২৫৪. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৮৩-২৮৪।
২৫৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৭৭।
২৫৬. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৭৫।
২৫৭, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৭৭।
২৫৮. জাযিরা ইবনে উমর: আধুনিক তুরস্কের শিরনাক প্রদেশ (Şırnak Province)-এর একটি নগরী। তুরস্ক, ইরাক ও সিরিয়া তিন দেশের সীমান্তরেখার নিকটে অবস্থিত নগরীটির আশেপাশে যদিও কোনো সাগর বা দ্বীপের অস্তিত্ব নেই; কিন্তু উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব তিন দিক থেকে দজলা নদী দ্বারা পরিবেষ্টিত বলে নগরীটি রূপকার্থে 'জাযিরা' নামে পরিচিতি লাভ করে। নগরীটির আধুনিক নাম কিজরা (Cizre)। [সম্পাদক]
২৫৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৭৭।