📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ইমাদুদ্দিন জিনকির অবস্থান

📄 ইমাদুদ্দিন জিনকির অবস্থান


এই পুরো সময়ে ইমাদুদ্দিন জিনকি সেলজুক সুলতান ও সুলতান-নির্ধারিত রাজন্যদের আনুগত্য করেছেন; আব্বাসি খিলাফতের নয়। তিনি বাগদাদে খলিফার বিরুদ্ধে সংঘটিত বিদ্রোহ দমনে অংশ নিয়েছিলেন, কারণ সেক্ষেত্রে সালতানাত ও খিলাফতের স্বার্থ এককেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু যখন খিলাফত ও সালতানাতের স্বার্থে সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে, যেমন ৫১৯ হিজরি সনে সুলতান মাহমুদ ও খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর মধ্যকার সংঘাতের সময় তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে সুলতানের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। এ কারণে কখনো কখনো তাকে নিজ বাহিনী নিয়ে খলিফার মুখোমুখিও হতে হয়েছে।
বাহ্যত তার এই অবস্থানের তাৎপর্য অনুধাবন জটিল মনে হলেও আমার মতে এটিই ছিল স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত অবস্থান। শান্তভাবে বিষয়টির তাৎপর্য অনুধাবন করা হলে আশা করা যায়, আগামীর বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের সঠিক মর্ম উপলব্ধি সহজতর হবে।
আব্বাসি খলিফাগণ বিগত দুই শতাব্দীরও অধিক সময় ধরে অন্যদের সামরিক প্রভাব-নিয়ন্ত্রিত ছিলেন। প্রথমে তাদের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তার করে তুর্কি মামলুকগণ, এরপর শিয়া বুওয়াইহি পরিবার এবং সবশেষে সেলজুক পরিবার। এ সময়ে খিলাফত শব্দটি কার্যত তার দাবি ও প্রভাব হারিয়ে ফেলেছিল এবং খলিফা পদ নিছক আনুষ্ঠানিক সম্মানজনক পদে পরিণত হয়েছিল। (সুলতান পদবিধারী) সামরিক শাসকই যাবতীয় ক্ষমতার অধিকারী হতেন; সেনাবাহিনী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, রাষ্ট্রীয় কোষাগার, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নিয়োগ-বিয়োগ, আন্তঃরাষ্ট্র চুক্তি সম্পাদন, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ইত্যাদি যাবতীয় বিষয় তিনিই নিয়ন্ত্রণ করতেন। খলিফাগণ বংশানুক্রমে কেবল খলিফা উপাধি ও ব্যক্তিগত সম্পদের অধিকারী।
হতেন। প্রত্যেক খলিফার স্বপ্নের পরিধি সর্বোচ্চ এত দূর বিস্তৃত হতো যে, কোনোক্রমে যদি বাগদাদে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়। হ্যাঁ, জ্ঞাতসারেই ইরাকের পরিবর্তে বাগদাদ বলা হয়েছে! অর্থাৎ নিজের সুবর্ণ সময়ে একজন খলিফা কেবল বাগদাদের প্রহরী হতে পারতেন।
অপরদিকে প্রকৃত ক্ষমতা যার হাতে থাকত, সেই সুলতান শাসন করতেন চীন থেকে শাম অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল সাম্রাজ্য; বাগদাদসহ ইরাকও যার অন্তর্ভুক্ত থাকত। অবশ্য বিশেষ করে সেলজুক সুলতানগণ মুসলিম উম্মাহকে এক পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ করতে এবং উম্মাহর মনমস্তিষ্কে 'এক উম্মাহ'র চেতনা সদা জাগ্রত রাখতে প্রতীকীরূপে হলেও খলিফা ও খিলাফতের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে যত্নবান ছিলেন। তৎকালীন ইসলামি সাম্রাজ্যের খলিফা পদ ছিল অনেকটা বর্তমান ইংল্যান্ড, স্পেন, কানাডা ও হল্যান্ডসহ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় পরিচালিত বিভিন্ন রাষ্ট্রের রাজা-রানির পদের ন্যায় নিছক প্রতীকী পদ, যা জনসাধারণকে কিছু শুভ বার্তা উপহার দিতে পারে; কিন্তু প্রশাসন, শাসনব্যবস্থা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো প্রভাব রাখতে পারে না।
তবে মাঝেমধ্যে কোনো খলিফা কিছুটা শক্তির অধিকারী হলে খলিফা পদের হৃত শৌর্য পুনরুদ্ধারে উদ্যোগী হয়ে উঠতেন। তিনি বাগদাদ ও পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে একটি বাহিনী তৈরি করতেন এবং সুলতানের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে তার ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতেন। এমনটি আমরা খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু এটি তো সম্পূর্ণই বাস্তবতা-বিবর্জিত প্রচেষ্টা। কারণ, কার উপাধি কী, তা এক্ষেত্রে মুখ্য নয়; মুখ্য হলো— সালতানাত ও খিলাফতের এই সংঘাতের কারণে সকলের কাছে আনুগত্যের আবেদন কমে যেত এবং রাজ্যজুড়ে অনাকাঙ্ক্ষিত গোলযোগ- অস্থিরতা সৃষ্টি হতো। তা ছাড়া খলিফা-অনুগত বাহিনী যদিও ক্ষেত্রবিশেষে আঞ্চলিকভাবে শক্তিশালী হতো এবং বাগদাদ বা আশপাশের এলাকায় স্থানীয় সুলতান-বাহিনীর বিরুদ্ধে জয়লাভ করত; কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই প্রাধান্য ও জয়ের প্রভাব নির্দিষ্ট এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকত। এসব দিক বিবেচনা করে খিলাফত-সালতানাত সংঘাতে ইমাদুদ্দিন জিনকি সর্বদা সালতানাতের পক্ষে ও খিলাফতের বিপক্ষে শক্ত অবস্থান নিতেন।

টিকাঃ
২০৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৩৮-১৩৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00