📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 সেলজুক পরিবারের প্রতি ইমাদুদ্দিনের পূর্ণ বিশ্বস্ততা

📄 সেলজুক পরিবারের প্রতি ইমাদুদ্দিনের পূর্ণ বিশ্বস্ততা


৫০০ হিজরি সনে (১১০৬ খ্রিষ্টাব্দে) জাকারমিশকে বরখাস্ত করে জাওলি সাকাউকে মসুলের প্রশাসক নির্বাচিত করা হয়। কিন্তু পূর্ববর্তী প্রশাসকদের তুলনায় বিপরীত প্রকৃতির জাওলি ছিলেন অত্যাচারী ও দুরাচারী। তিনি কেবল ব্যক্তিস্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পরই ৫০১ হিজরি সনে (১১০৭ খ্রিষ্টাব্দে) জাওলি সেলজুক সুলতান মুহাম্মাদের অধীনতা প্রত্যাখ্যান করে মসুলে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন। ৪৯৪ হিজরি সনে (১১০০ খ্রিষ্টাব্দে) ভাই বারকিয়ারুকের মৃত্যুর পর সুলতান মুহাম্মাদ সেলজুক সাম্রাজ্যের হাল ধরেছিলেন। এ সময় ইমাদুদ্দিন জিনকি এক বিস্ময়কর অবস্থান গ্রহণ করেন। মাত্র চব্বিশ বছর বয়সী যুবক ইমাদুদ্দিন তখন সেলজুক সুলতান মুহাম্মাদের পক্ষাবলম্বন করে তার সরাসরি উপরস্থ নেতা জাওলির বাহিনী থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন। যদিও এ পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ; কিন্তু পনেরো বছর পূর্বে তার পিতা যেমনটি করেছিলেন, তিনিও নির্দ্বিধায় একই কাজ করেন। ইমাদুদ্দিন জিনকির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল একেবারে সুস্পষ্ট। তিনি মৌলিকভাবে ন্যায়বান সেলজুক সুলতান মুহাম্মাদের অনুগত; অত্যাচারী প্রশাসক জাওলির নয়। আর তাই নিজের পদ বা নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে হলেও তিনি সেই আনুগত্যের ঘোষণা জরুরি মনে করেছিলেন।
অবশ্য আল্লাহ তাআলা ইমাদুদ্দিন জিনকিকে রক্ষা করেন। জাওলির বিদ্রোহ-প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে সুলতান মুহাম্মাদ তার পিতা সুলতান মালিকশাহর প্রিয়পাত্র কাসিমুদ্দৌলা আক সুনকুরের সুপুত্র নতুন এই তরুণ সেনাপতির সাহসিকতা ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কে অবগত হন। সুলতান মুহাম্মাদ তার সৎসাহসের প্রশংসা করেন। এর ফলে সকলের মাঝে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
এরপর আসে ইমাদুদ্দিন জিনকির জীবনের টার্নিং পয়েন্ট ও বাঁক পরিবর্তনের মুহূর্ত; মসুলের প্রশাসক পদে অধিষ্ঠিত হন ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম মহান পুরুষ মওদুদ বিন তুনতেকিন রহ.। তার সমৃদ্ধ জীবনের কীর্তি-অবদানের কিয়দাংশ আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি। মসুলে তার শাসনকাল ছিল ছয় বছর। এই পুরোটা সময় ইমাদুদ্দিন জিনকি ছিলেন তার একান্ত নিকটজন।
পাঠক! আপনার কি মনে আছে মওদুদ বিন তুনতেকিনের পরিচয়!
আমরা পূর্বে যেমন উল্লেখ করেছি, মওদুদ বিন তুনতেকিন ছিলেন ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম পুণ্যবান শাসক। তার সত্তাজুড়ে ছিল আল্লাহ-ভীতি ও ইবাদত-প্রীতি। জনসাধারণের জন্য তিনি ছিলেন অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ শাসক, জিহাদের ময়দানে ছিলেন নিষ্ঠাবান শক্তিশালী সেনাপতি। তিনি ছিলেন মুসলিম ঐক্যের একান্ত অনুরাগী এবং ক্রুসেডারদের প্রতি প্রচণ্ড বিরাগী। ইমাদুদ্দিন জিনকি তার জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময়ে যৌবনের প্রারম্ভে মওদুদ রহ.-এর সাহচর্য লাভ করেন। মওদุด যখন মসুলে আগমন করেন, তখন তার বয়স চব্বিশ বছর আর মওদুদ যখন নিহত হন, তখন তার বয়স ত্রিশ বছর।
নিঃসন্দেহে এই ছয়টি বছর ছিল মহান মুজাহিদ ইমাদুদ্দিন জিনকির জীবনের প্রকৃত পরিপক্বতা ও পূর্ণতাপ্রাপ্তির সময়। এ সময়ই তার অস্থিমজ্জায় মিশে যায় শরিয়তের পূর্ণ মূল্যায়ন ও মর্যাদাবোধ।
এ সময়ই তার হৃদয়ে-মননে গেঁথে যায়, কীভাবে পৃথিবীতে আল্লাহর দ্বীনের কালিমা সমুন্নত করার জন্য আপন জান-মাল, সময় ও সাধনা ব্যয় করতে হয়।
এ সময়ই তিনি আয়ত্ত করে নেন মওদুদ রহ.-এর যাবতীয় সামরিক, প্রশাসনিক ও শাস্ত্রীয় কলা-কৌশল এবং নেতৃত্বদক্ষতা।
তিনি গ্রহণ করেন বীরত্ব, দুঃসাহস ও সুসংহত সমর পরিকল্পনার পাঠ।
এ সময়ই তার মনমানসে প্রচণ্ড ঘৃণা বদ্ধমূল হয়ে যায় ক্রুসেডারদের প্রতি, যারা নির্বিচারে ইসলামি ভূখণ্ডে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছিল; ঘৃণা তৈরি হয় বাতিনি শিয়াদের প্রতি, যারা মওদুদের ন্যায় মহান শাসককে হত্যা করেছিল; তিনি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন সেসব অথর্ব নেতার ওপর, যারা মওদুদকে কঠিন সংকটে ফেলে রণাঙ্গন ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল; বরং তাকে হত্যা করার জন্য শত্রুদের প্ররোচিত করেছিল।
৫০৭ হিজরি সনে (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দে) ইমাদুদ্দিন জিনকি মওদুদের সঙ্গে সিন্নাবরার যুদ্ধে অংশ নেন। এ যুদ্ধে তিনি শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে বিজয় ও মর্যাদার স্বাদ আস্বাদন করেন। বরং এ যুদ্ধেই তিনি অপূর্ব বীরত্বের স্বাক্ষর রাখেন এবং অনন্য রণদক্ষতা ও বিরল সাহসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটান। ফলে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে তার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি জনমানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন। ইতিপূর্বে এমন করেই ঘরে ঘরে আলোচিত ছিল তার পিতা কাসিমুদ্দৌলা আক সুনকুরের কীর্তিগাথা!
এর কদিন পরই নিহত হন মওদুদ বিন তুনতেকিন রহ.।
মওদুদের বিয়োগ ছিল ইমাদুদ্দিন জিনকির জন্য প্রচণ্ড আঘাত। কারণ, তিনি তাকে হৃদয়ের গভীর থেকে ভালোবাসতেন। আঘাত আরও গভীরতর হয় যখন তার সামনে মুসলিম বিশ্বে চলমান ঘৃণ্য চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের রূপ ও প্রকৃতি এবং গভীরতা ও ভয়াবহতা সুস্পষ্ট হয়ে যায়। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উপলব্ধি করেন, এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত রাখা কার্যত অসম্ভব এবং বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বেই অভ্যন্তরীণ সংস্কারের আশু পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
এরপর মসুলের প্রশাসক পদে অধিষ্ঠিত হন আক সুনকুর আল-বুরসুকি। তার প্রথম মেয়াদের শাসনকাল ছিল ৫০৭ হিজরি থেকে ৫০৯ হিজরি সন (১১১৩-১১১৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত দুই বছর ব্যাপ্ত। ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে আক সুনকুর আল-বুরসুকির পরিচালিত অভিযানগুলোতে ইমাদুদ্দিন জিনকি পূর্ণ উদ্যমে অংশগ্রহণ করেন এবং এডেসা, সুমাইসাত ও সারুজ অবরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এতে সকলের কাছে জিনকি আরও বেশি পরিচিত ও প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠেন।
৫০৯ হিজরি সনে (১১১৫ খ্রিষ্টাব্দে) আক সুনকুর আল বুরসুকিকে অপসারণ করে জুয়ুশ বেগকে মসুলের প্রশাসক পদে নিয়োগ দেওয়া হলে ইমাদুদ্দিন জিনকির জীবনেও নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটে। ৫১৪ হিজরি সনে (১১২১ খ্রিষ্টাব্দে) জুয়ুশ বেগ সেলজুক সুলতান মাহমুদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ প্রচেষ্টা চালালে ইমাদুদ্দিন জিনকি তার নিকটতম নেতার নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করে সর্বোচ্চ নেতা সুলতান মাহমুদের আনুগত্যে অটল থাকেন। জুয়ুশ বেগের বিদ্রোহ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং এর ফলে সুলতান মাহমুদের কাছে ইমাদুদ্দিন জিনকির মর্যাদা ও গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়।
৫১৫ হিজরি সনে আক সুনকুর আল-বুরসুকিকে মসুলের প্রশাসক পদে পুনঃবহাল করা হলে ইমাদুদ্দিন জিনকি আবারও তার অধীনে চলে আসেন। ৫১৬ হিজরি সনে (১১২২ খ্রিষ্টাব্দে) শিয়া দুরাচারী দুবাইস বিন সাদাকা বাগদাদে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিদ্রোহের ডাক দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আক সুনকুর আল-বুরসুকিকে বাগদাদে আহ্বান করা হয়। ইমাদুদ্দিন জিনকির সামরিক-প্রশাসনিক দক্ষতার প্রতি পূর্ণ আস্থা থাকায় তিনি এ সময় তাকেও সঙ্গে নিয়ে যান। এমনকি এর অব্যবহিত পরেই তিনি দুবাইস বিন সাদাকার সরাসরি মোকাবিলা করার জন্য ইমাদুদ্দিন জিনকিকে দুবাইসের মূল ঘাঁটি ওয়াসিত অঞ্চলের দায়িত্ব প্রদান করেন। এটি ছিল মহান সেনাপতি ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রতি আক সুনকুরের অগাধ আস্থার সুস্পষ্ট প্রকাশ। ইমাদুদ্দিন জিনকিও তার আস্থার মর্যাদা দিতে সক্ষম হন এবং দুবাইস বিন সাদাকাকে পরাজিত করে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনেন।
এ সময় বেদুইনদের উপর্যুপরি আক্রমণে বসরা নগরীর পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে আক সুনকুর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইমাদুদ্দিন জিনকিকে বসরার প্রশাসকের দায়িত্ব প্রদান করেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বল্পতম সময়ের মধ্যে আগ্রাসী বেদুইনদের নিয়ন্ত্রণে আনেন। এভাবে একের পর এক সফল দায়িত্ব পালন করে ইমাদুদ্দিন জিনকি সেলজুক সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন।

টিকাঃ
২২৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১০৩।
২৩০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আত-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ১৭ ওআবু শামা আল-মাকদিসি, আর-রাওযাতাইন ফি তারীখিদ দাওলাতাইন আন-নূরিয়া ওয়াস-সালাহিয়া, ১/৬৮।
২৩১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৯-১৫০।
২৩২. ঐতিহাসিক ইবনুর আছির এই যুদ্ধের পর তার সম্পর্কে বলেন, 'এ যুদ্ধে তিনি চূড়ান্ত সাহসিকতা প্রদর্শন করেন।' আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৫৩।
২০০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ১৯-২০।
২০৪. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২৪।
২৩৫. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২৬-২৮।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ইমাদুদ্দিন জিনকির অবস্থান

📄 ইমাদুদ্দিন জিনকির অবস্থান


এই পুরো সময়ে ইমাদুদ্দিন জিনকি সেলজুক সুলতান ও সুলতান-নির্ধারিত রাজন্যদের আনুগত্য করেছেন; আব্বাসি খিলাফতের নয়। তিনি বাগদাদে খলিফার বিরুদ্ধে সংঘটিত বিদ্রোহ দমনে অংশ নিয়েছিলেন, কারণ সেক্ষেত্রে সালতানাত ও খিলাফতের স্বার্থ এককেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু যখন খিলাফত ও সালতানাতের স্বার্থে সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে, যেমন ৫১৯ হিজরি সনে সুলতান মাহমুদ ও খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর মধ্যকার সংঘাতের সময় তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে সুলতানের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। এ কারণে কখনো কখনো তাকে নিজ বাহিনী নিয়ে খলিফার মুখোমুখিও হতে হয়েছে।
বাহ্যত তার এই অবস্থানের তাৎপর্য অনুধাবন জটিল মনে হলেও আমার মতে এটিই ছিল স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত অবস্থান। শান্তভাবে বিষয়টির তাৎপর্য অনুধাবন করা হলে আশা করা যায়, আগামীর বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের সঠিক মর্ম উপলব্ধি সহজতর হবে।
আব্বাসি খলিফাগণ বিগত দুই শতাব্দীরও অধিক সময় ধরে অন্যদের সামরিক প্রভাব-নিয়ন্ত্রিত ছিলেন। প্রথমে তাদের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তার করে তুর্কি মামলুকগণ, এরপর শিয়া বুওয়াইহি পরিবার এবং সবশেষে সেলজুক পরিবার। এ সময়ে খিলাফত শব্দটি কার্যত তার দাবি ও প্রভাব হারিয়ে ফেলেছিল এবং খলিফা পদ নিছক আনুষ্ঠানিক সম্মানজনক পদে পরিণত হয়েছিল। (সুলতান পদবিধারী) সামরিক শাসকই যাবতীয় ক্ষমতার অধিকারী হতেন; সেনাবাহিনী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, রাষ্ট্রীয় কোষাগার, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নিয়োগ-বিয়োগ, আন্তঃরাষ্ট্র চুক্তি সম্পাদন, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ইত্যাদি যাবতীয় বিষয় তিনিই নিয়ন্ত্রণ করতেন। খলিফাগণ বংশানুক্রমে কেবল খলিফা উপাধি ও ব্যক্তিগত সম্পদের অধিকারী।
হতেন। প্রত্যেক খলিফার স্বপ্নের পরিধি সর্বোচ্চ এত দূর বিস্তৃত হতো যে, কোনোক্রমে যদি বাগদাদে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়। হ্যাঁ, জ্ঞাতসারেই ইরাকের পরিবর্তে বাগদাদ বলা হয়েছে! অর্থাৎ নিজের সুবর্ণ সময়ে একজন খলিফা কেবল বাগদাদের প্রহরী হতে পারতেন।
অপরদিকে প্রকৃত ক্ষমতা যার হাতে থাকত, সেই সুলতান শাসন করতেন চীন থেকে শাম অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল সাম্রাজ্য; বাগদাদসহ ইরাকও যার অন্তর্ভুক্ত থাকত। অবশ্য বিশেষ করে সেলজুক সুলতানগণ মুসলিম উম্মাহকে এক পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ করতে এবং উম্মাহর মনমস্তিষ্কে 'এক উম্মাহ'র চেতনা সদা জাগ্রত রাখতে প্রতীকীরূপে হলেও খলিফা ও খিলাফতের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে যত্নবান ছিলেন। তৎকালীন ইসলামি সাম্রাজ্যের খলিফা পদ ছিল অনেকটা বর্তমান ইংল্যান্ড, স্পেন, কানাডা ও হল্যান্ডসহ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় পরিচালিত বিভিন্ন রাষ্ট্রের রাজা-রানির পদের ন্যায় নিছক প্রতীকী পদ, যা জনসাধারণকে কিছু শুভ বার্তা উপহার দিতে পারে; কিন্তু প্রশাসন, শাসনব্যবস্থা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো প্রভাব রাখতে পারে না।
তবে মাঝেমধ্যে কোনো খলিফা কিছুটা শক্তির অধিকারী হলে খলিফা পদের হৃত শৌর্য পুনরুদ্ধারে উদ্যোগী হয়ে উঠতেন। তিনি বাগদাদ ও পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে একটি বাহিনী তৈরি করতেন এবং সুলতানের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে তার ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতেন। এমনটি আমরা খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু এটি তো সম্পূর্ণই বাস্তবতা-বিবর্জিত প্রচেষ্টা। কারণ, কার উপাধি কী, তা এক্ষেত্রে মুখ্য নয়; মুখ্য হলো— সালতানাত ও খিলাফতের এই সংঘাতের কারণে সকলের কাছে আনুগত্যের আবেদন কমে যেত এবং রাজ্যজুড়ে অনাকাঙ্ক্ষিত গোলযোগ- অস্থিরতা সৃষ্টি হতো। তা ছাড়া খলিফা-অনুগত বাহিনী যদিও ক্ষেত্রবিশেষে আঞ্চলিকভাবে শক্তিশালী হতো এবং বাগদাদ বা আশপাশের এলাকায় স্থানীয় সুলতান-বাহিনীর বিরুদ্ধে জয়লাভ করত; কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই প্রাধান্য ও জয়ের প্রভাব নির্দিষ্ট এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকত। এসব দিক বিবেচনা করে খিলাফত-সালতানাত সংঘাতে ইমাদুদ্দিন জিনকি সর্বদা সালতানাতের পক্ষে ও খিলাফতের বিপক্ষে শক্ত অবস্থান নিতেন।

টিকাঃ
২০৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৩৮-১৩৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00