📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 আক সুনকুর মুসলমানদের দৃষ্টিতে

📄 আক সুনকুর মুসলমানদের দৃষ্টিতে


আক সুনকুর যখন ইন্তেকাল করেন তখনও তার পুত্র ইমাদুদ্দিনের বয়স দশ পেরোয়নি! নিতান্ত শিশুকালেই তিনি তার পিতাকে হারান। নিশ্চয়ই সমকালীন অনেকেই এই পিতৃহারা শিশুটির নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছিল। পিতৃহারা কত শিশুই তো সুষ্ঠু প্রতিপালনের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে! হারিয়ে যাবে আরও কত শিশু! কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি কালের গর্ভে হারিয়ে যাননি। বরং মহান আল্লাহ তাকে সাহায্য করেছেন, তাকে মর্যাদার অধিকারী করেছেন। আর তাই তিনি যখন ইন্তেকাল করেন, তখন তিনি এক বিস্তৃত রাজ্যের শাসক; জনহৃদয়ের প্রিয়তম ব্যক্তি।
কাসিমুদ্দৌলা আক সুনকুর যদিও তার পুত্রের জন্য অঢেল সম্পদ বা অত্যুচ্চ কোনো পদ রেখে যাননি; কিন্তু তিনি পুত্রের জন্য এমন কিছু অমূল্য সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন, যা পদ ও সম্পদের চেয়ে বহুগুণ মূল্যবান।
১. সন্তানের জন্য তিনি রেখে গিয়েছিলেন আল্লাহ পাকের তত্ত্বাবধান ও রক্ষণাবেক্ষণ। নিঃসন্দেহে এ বড় উত্তম মিরাস! কাসিমুদ্দৌলা ছিলেন মুত্তাকি-খোদাভীরু এবং সর্বদা ন্যায় ও সঠিক বক্তব্য প্রদানকারী। ঐতিহাসিক ইবনুল আদিম তার সম্পর্কে বলেন, 'কাসিমুদ্দৌলা ছিলেন অগাধ তাকওয়া ও সুগভীর ঈমানের অধিকারী। পিতার এই তাকওয়াই দুর্বল শিশুপুত্রের সর্বাঙ্গীন হিফাজত করেছে। আল্লাহ তাআলা তো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন— وَ لْيَخْشَ الَّذِيْنَ لَوْ تَرَكُوا مِنْ خَلْفِهِمْ ذُرِّيَّةً ضِعْفًا خَافُوْا عَلَيْهِمْ فَلْيَتَّقُوا اللهَ وَ لْيَقُوْلُوْا قَوْلًا سَدِيْدًا )
তাদের ভয় করা উচিত, যারা নিজেদের পশ্চাতে দুর্বল অক্ষম সন্তানসন্ততি ছেড়ে গেলে তাদের জীবন শঙ্কাগ্রস্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করে; সুতরাং তারা যেন আল্লাহকে ভয় করে এবং সরল- সঠিক কথা বলে। [সুরা নিসা: ০৯]
২. পুত্রের জন্য তিনি রেখে গিয়েছিলেন শরিয়ত ও নীতি-নৈতিকতার প্রতি অগাধ ভক্তি ও অনুরাগ এবং শরিয়তের বিধিবিধান ও আদেশ- নিষেধের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাবোধ। শৈশবে ইমাদুদ্দিন জিনকি স্বচক্ষে শরিয়ত বাস্তবায়নের অভাবনীয় বরকত ও কল্যাণ প্রত্যক্ষ করেছেন। তাই জীবনে কখনোই তিনি একে ত্যাগ করেননি।
৩. কাসিমুদ্দৌলা তার পুত্রের জন্য আরও রেখে গিয়েছিলেন ন্যায়বিচারের সুউচ্চ মূল্যমানের উপলব্ধি। আর তাই ইমাদুদ্দিন জিনকির হৃদয় ও মানসে গেঁথে গিয়েছিল ন্যায়-ইনসাফের গুণ। তিনি যেকোনো ধরনের অন্যায় ও জুলুম অপছন্দ করতেন। এ কারণেই পরবর্তী সময়ে ইমাদুদ্দিন জিনকি পিতার মতো মুসলিম ইতিহাসের অন্যতম ন্যায়বিচারক শাসকে পরিণত হন।
৪. তিনি পুত্রের জন্য রেখে গিয়েছিলেন জনগণের প্রতি স্বভাবসুলভ নমনীয়তার গুণ। তাই তো ইমাদুদ্দিন জিনকি নিজের স্বার্থের ওপর জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিতেন, কেউ তার অধিকার আদায়ে ত্রুটি করলে তাকে ক্ষমা করে এড়িয়ে যেতেন, দুর্বল ও দরিদ্রদের প্রতি দয়া করতেন এবং বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন ছাড়া প্রত্যেকের প্রাপ্য তাকে পৌঁছিয়ে দিতেন।
৫. পুত্রের জন্য আক সুনকুর সম্পদ হিসেবে রেখে গিয়েছিলেন অত্যুচ্চ বিনয় গুণ। আর তাই ইমাদুদ্দিন সুলতানের চাকচিক্য বা মসনদের ক্ষমতায় সামান্য প্রভাবিত না হয়ে সর্বদা আল্লাহর সামনে বিনয়ী ছিলেন। তিনি নিজের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ অনুভব করতেন বলে কারও প্রতি উদ্ধত আচরণ করতেন না এবং নিজের বিজয় ও ক্ষমতায় আত্মমুগ্ধ হতেন না।
৬. তিনি পুত্রের জন্য রেখে গিয়েছিলেন প্রশাসনিক যোগ্যতা ও সহজাত নেতৃত্ব-দক্ষতা। এ কারণেই ইমাদুদ্দিন জিনকি জনগণকে তার প্রতি অনুগত বানাতে এবং প্রয়োজনে তাদেরকে আন্দোলিত করতে সক্ষম হন। আর একই কারণে তিনি ছিলেন ঐক্য-চিন্তা ও সকলকে এক পতাকাতলে সমবেত করার প্রতি অনুরাগী।
৭. পুত্রের জন্য তিনি রেখে গিয়েছিলেন জিহাদ-অনুরাগ ও জিহাদের মর্যাদাবোধ। আক সুনকুরের পুরো জীবনই ছিল জিহাদময়। তার রেখে যাওয়া আদর্শে অনুপ্রাণিত পুত্র ইমাদুদ্দিন জিনকির জীবনও ছিল সংগ্রাম ও জিহাদমুখর। আক সুনকুর তার পুত্রকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে সম্পদ ও ক্ষমতার লালসা উপেক্ষা করে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় লড়াই করতে হয়। পুত্রকে তিনি শিক্ষা দিয়েছিলেন অশ্বারোহণ, অশ্বচালনা ও যুদ্ধবিদ্যার অভিনব নানা কলাকৌশল। কারণ, কাসিমুদ্দৌলা নিজে ছিলেন সমকালীন শ্রেষ্ঠতম যোদ্ধা ও কুশলী মুজাহিদ।
৮. আক সুনকুর তুর্কমানি তার পুত্রের জন্য রেখে গিয়েছিলেন আলেপ্পোবাসীর হৃদয়ভরা ভালোবাসা। রাজ্যের প্রতিটি মানুষ তাদের এই ন্যায়বান-দয়ালু শাসককে ভালোবাসত। ঐতিহাসিক ইবনুল আছির আক সুনকুরের প্রতি আলেপ্পোবাসীর ভালোবাসার বিবরণ এক আশ্চর্য বাক্যে তুলে ধরেছেন—‘শেষ সময় পর্যন্ত আলেপ্পোবাসী উত্তরাধিকার সূত্রে তার প্রতি হৃদ্যতা ও অনুরাগ পোষণ করে গেছে!’ অর্থাৎ প্রত্যেক পিতা তার সন্তানদের কাসিমুদ্দৌলার প্রতি অনুরাগী ও অনুগত থাকার অসিয়ত করে যেত। এভাবেই চলেছে তার শাসনামলের শেষ পর্যন্ত! মুগ্ধতা ও ভালোবাসা কত গভীর স্তরের হলে এমনটি হতে পারে! নিঃসন্দেহে এ বিষয়টিও ইমাদুদ্দিন জিনকির জীবনে অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।
৯. কাসিমুদ্দৌলা আক সুনকুর তার পুত্রের জন্য আরও রেখে গিয়েছিলেন সেলজুক সাম্রাজ্যের ন্যায়পরায়ণ ও শক্তিশালী সুলতানদের প্রতি সুস্পষ্ট হৃদ্যতার অনুভূতি। তিনি নিজে প্রথমে মালিকশাহ ও পরে তার পুত্র বারকিয়ারুকের প্রতি পূর্ণ বিশ্বস্ত ও অনুগত ছিলেন। পিতার এই নীতি ইমাদুদ্দিন জিনকির জন্য সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে দিয়েছিল। জীবনে কখনোই তিনি কোনো উপাধি লাভ বা স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করেননি; বরং ন্যায়পরায়ণ সুলতানের প্রতি আনুগত্য বজায় রেখে গেছেন এবং শক্তি দেখে ভক্তি বদল না করে সর্বদা এক নেতৃত্বের প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন। এ গুণটি ইমাদুদ্দিন জিনকির জীবনে প্রভূত কল্যাণ নিশ্চিত করেছিল।
১০. আক সুনকুর তার এতিম সন্তানের জন্য সর্বশেষ যে সম্পদটি রেখে গিয়েছিলেন, তা হলো-বিশ্বস্ত-অনুগত একদল বন্ধু ও সুহৃদ, যারা তাকে একমাত্র আল্লাহর জন্য ভালোবাসত; যারা তার পদ বা ক্ষমতাকে নয়; ব্যক্তিত্বকে ভালোবাসত। আক সুনকুরের মৃত্যুর পর তারা তার এতিম পুত্রের তত্ত্বাবধান করে। আক সুনকুরও এমন করেই সুলতান মালিকশাহর মৃত্যুর পর তার পুত্র বারকিয়ারুকের তত্ত্বাবধান করেছিলেন। কারণ, তিনিও সুলতানকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসতেন। পৃথিবীর বিধিবদ্ধ রীতিমতে সর্বদা এমনটিই ঘটে থাকে; সৎকর্মের প্রতিদান সমজাতীয়ই হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
هَلْ جَزَاءُ الْإِحْسَانِ إِلَّا الْإِحْسَانُ সৎ কাজের প্রতিদান উত্তম পুরস্কার ব্যতীত আর কী হতে পারে? [সুরা আর-রাহমান: ৬০]
এই হলো পূর্ণ দশ!
এই দশটি অমূল্য সম্পদ কাসিমুদ্দৌলা তার শিশুপুত্র ইমাদুদ্দিন জিনকির জন্য রেখে গিয়েছিলেন। মুসলিম সমাজে এমন পিতা কয়জন আছে, যারা কাসিমুদ্দৌলার মতো করে সন্তানের জন্য এমন অমূল্য সম্পদ রেখে যেতে পেরেছে?!
মানুষ সারা জীবন সন্তানের জন্য কাড়ি কাড়ি অর্থসম্পদ রেখে যেতে, প্লট-ফ্লাট ও গাড়ি-বাড়ির বীমা করে যেতে এবং একে-ওকে সন্তানের প্রতি লক্ষ রাখার অসিয়ত করে যেতে চেষ্টা করে। কাসিমুদ্দৌলা রহ. তার পুত্রের জন্য যেমন আদর্শ সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন, তেমনটি খুব কম মানুষই করে থাকে। অবশ্য খুব কম সন্তানও তো পরবর্তীকালে একজন ইমামুদ্দিন জিনকি হয়ে ওঠে!
সুতরাং হে বিবেকবান, একটু ভাবুন এবং শিক্ষা গ্রহণ করুন।
***

টিকাঃ
২২২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ১৫।
২২০. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১০৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00