📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 কাসিমুদ্দৌলা আক সুনকুর হত্যাকাণ্ড

📄 কাসিমুদ্দৌলা আক সুনকুর হত্যাকাণ্ড


আপন কর্মগুণে আক সুনকুর সকল মানুষের আলোচনায় পরিণত হন। তিনি আলেপ্পোবাসীর অগাধ ভালোবাসা লাভ করেন; বরং লাভ করেন পুরো মুসলিম বিশ্বের জনসাধারণের অন্তরে শ্রদ্ধার আসন।
ইবনুল কালানিসি আক সুনকুর সম্পর্কে বলেন, 'তিনি জনসাধারণের সঙ্গে সদাচরণ করেন। পুরো রাজ্যে ছড়িয়ে দেন ন্যায়বিচার। শঙ্কিত পথিকের পথযাত্রা নিরাপদ করেন। সামাজিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনেন। জনতার প্রতি সুবিচার করেন। অন্যায়কারীদের খুঁজে খুঁজে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করেন। অনিষ্টকারীদের ঝেটিয়ে বিদায় করেন। এতে দ্রুত তার সুনাম, সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে; প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা বাড়তে থাকে। ফলে পথিকরা নিশ্চিন্তে সফর করে; সর্বদিক থেকে পণ্যের আমদানি বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটে।'
ইবনুল আছির তার সম্পর্কে বলেন, 'কাসিমুদ্দৌলা ছিলেন প্রজার প্রতি সদাচরণ ও জন-অধিকার রক্ষার বিবেচনায় শ্রেষ্ঠতম রাজন্য। তার রাজ্যে ছিল পণ্যের সহজলভ্যতা, পূর্ণ ন্যায়বিচার ও বিস্তৃত নিরাপত্তা।'
ইবনে কাছির বলেন, 'কাসিমুদ্দৌলা ছিলেন শ্রেষ্ঠতম সদাচারী, নিষ্কলুষ ও সত্যনিষ্ঠ শাসক। তার আমলে জনজীবনে ছিল নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও পণ্যের সুলভ ব্যবস্থা।'
প্রখ্যাত ঐতিহাসিকগণ এভাবেই কাসিমুদ্দৌলা আক সুনকুর রহ.-এর জীবনকে তুলে ধরেছেন।
কিন্তু এই বর্ণাঢ্য ও সৌন্দর্যমণ্ডিত জীবনও সকলকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। কিছু লোক তার এ কল্যাণকামিতা পছন্দ করছিল না; রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণে তার এ অসামান্য অবদান তাদের সহ্য হচ্ছিল না। তার সততা ও খোদাভীতি তাদের মনে হিংসার আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
এ জাতীয় ব্যক্তিদের সর্বশীর্ষে ছিলেন সুলতান মালিকশাহর ভাই তুতুশ বিন আলপ আরসালান। তুতুশ পুরো শাম অঞ্চলে তার আধিপত্য বিস্তার করতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু আলেপ্পোতে এমন ন্যায়বান শাসকের উপস্থিতি তার লক্ষ্য পূরণ জটিল করে তুলেছিল। কারণ, এ অঞ্চলের জনগণ যেমন আক সুনকুরকে অসম্ভব ভালোবাসে, তেমনই তার প্রতি হৃদ্যতা রাখেন সুলতান মালিকশাহ। তাহলে তুতুশের সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্ন কীভাবে বাস্তবায়িত হবে?!
তুতুশ ছিলেন ধূর্ততায় অতি সেয়ানা! তিনি জানতেন সুলতান মালিকশাহ আক সুনকুরকে পছন্দ করেন। সুতরাং তার বিরুদ্ধে সুলতানকে বিক্ষুব্ধ করার কোনো পথ খোলা নেই। তাই তিনি আলেপ্পো বাদে শামের অন্যান্য রাজ্যকে কর্তৃত্বভুক্ত করতে সচেষ্ট হন। এরপর তিনি সুলতান মালিকশাহকে জানান যে, শাম অঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্য উবায়দিদের হুমকির মুখে আছে। তাই উবায়দিদের প্রতিরোধ করার জন্য তার সুলতানের সহায়তা প্রয়োজন। তখন সুলতান মালিকশাহ আক সুনকুরসহ শাম অঞ্চলের সকল প্রশাসককে শিয়া উবায়দিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তুতুশকে সহায়তা করতে নির্দেশ দেন।
কাসিমুদ্দৌলা ভালোভাবেই উপলব্ধি করেন যে, তুতুশের মতলব উবায়দিদের প্রতিরোধ নয়; বরং নিজের একচ্ছত্র ক্ষমতার লালসা বাস্তবায়ন করা। এদিকে তিনি তো সুলতান মালিকশাহর পূর্ণ অনুগত। আবার তুতুশ সুলতান মালিকশাহর সহোদর হওয়ায় সরাসরি তিনি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতেও পারছিলেন না। সবদিক বিবেচনা করে তিনি তুতুশকে সহায়তা করেন; তবে কোনোমতে দায়সারাভাবে। এতে তুতুশ তার প্রতি আরও বেশি বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং ভাই মালিকশাহর কাছে বার্তা পাঠিয়ে কাসিমুদ্দৌলার বিরুদ্ধে সেলজুক পরিবারের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ আনেন।
সুলতান মালিকশাহ যেহেতু কোনো পক্ষকেই বিক্ষুব্ধ করতে চাচ্ছিলেন না, তাই তিনি কোমল পন্থায় পরিস্থিতির সমাধান করার মনস্থ করেন। তিনি পারস্পরিক আলোচনার জন্য আক সুনকুর ও তুতুশসহ শাম অঞ্চলের সকল রাজন্যকে পারস্যে তার বাসভবনে আহ্বান করেন। আলোচনাসভায় তুতুশ সুস্পষ্ট ভাষায় আক সুনকুরের বিরুদ্ধে সেলজুক পরিবারের প্রতি আনুগত্যে অবহেলার অভিযান উত্থাপন করেন। বাধ্য হয়ে আক সুনকুর আত্মপক্ষ সমর্থন করেন এবং তুতুশকে মিথ্যাবাদী আখ্যা দেন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সুলতান মালিকশাহ আক সুনকুরের কথা মেনে নেন এবং তাকে অপসারণে তুতুশের আবেদন নাকচ করে দেন। এরপর তিনি ভাই তুতুশকে আক সুনকুরের পেছনে না লাগার নির্দেশ দেন!
আক সুনকুর আলেপ্পোর দায়িত্ব গ্রহণ করার পাঁচ বছর পর ৪৮৪ হিজরি সনের রমজান মাসে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এর পরের বছরই এক বেদনাদায়ক ঘটনা সংঘটিত হয়; ৪৮৫ হিজরি সনের শাওয়াল মাসে (১০৯২ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে) সুলতান মালিকশাহ ইন্তেকাল করেন। মালিকশাহর মৃত্যুর পর তার জ্যেষ্ঠ পুত্র বারকিয়ারুক সুবিশাল সেলজুক সাম্রাজ্যের সুলতান পদে অধিষ্ঠিত হন। যেহেতু তুতুশ এই সর্বোচ্চ পদের প্রতি লালায়িত ছিলেন, তাই তিনি এতে প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হন এবং ভ্রাতুষ্পুত্র বারকিয়ারুকের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে জোরপূর্বক সালতানাতের অধিকার অর্জনের সিদ্ধান্ত নেন।
তুতুশ জানতেন, তিনি যদি বারকিয়ারুকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন, আক সুনকুর পেছন থেকে তার ওপর হামলে পড়তে পারেন। তাই তিনি এক ঢিলে দুই পাখি শিকারের মনস্থ করেন। তিনি বারকিয়ারুকের বিরুদ্ধে অভিযানে তাকে সহায়তা করার জন্য আক সুনকুরকে তার বাহিনী নিয়ে যোগ দিতে নির্দেশ দেন। এর ফলে একদিকে যেমন আক সুনকুরের সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকা যাবে, অপরদিকে আক সুনকুরের বিরাট সামরিক শক্তিকে বারকিয়ারুকের পতনে কাজে লাগানো যাবে।
কাসিমুদ্দৌলা আক সুনকুর কঠিন বিপাকে পড়ে যান। তিনি জানতেন, তুতুশের সামরিক শক্তির তুলনায় তার শক্তি ও সামর্থ্য অনেক কম। তা ছাড়া যত কিছু হোক, তুতুশ প্রয়াত সুলতান মালিকশাহর সহোদর এবং বর্তমান সুলতান বারকিয়ারুকের চাচা। তার আদেশ তিনি অমান্য করেন কীভাবে। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি তো প্রয়াত মহান সুলতান মালিকশাহর পূর্ণ বিশ্বস্ত ছিলেন। তিনি তো সুলতানের অবর্তমানে তার পুত্র বারকিয়ারুকের যথার্থ তত্ত্বাবধান ও কল্যাণ কামনা করেন। অধিকন্তু তিনি তুতুশের উগ্র লালসা সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলেন। তিনি জানতেন, তুতুশ মুসলমানদের শাসক হওয়ার মতো উপযুক্ত ব্যক্তি নন। অতএব, এখন তিনি কী করবেন?
অনেক ভেবে-চিন্তে আক সুনকুর এমন এক ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা করেন যে, হয়তো একদিন তাকে জীবন দিয়ে এর মূল্য চুকাতে হবে। কিন্তু সেই মুহূর্তে তিনি এ ছাড়া ভিন্ন কোনো সমাধানও দেখছিলেন না।
কাসিমুদ্দৌলা সিদ্ধান্ত নেন, তিনি তার বাহিনী নিয়ে তুতুশের সঙ্গে বের হবেন এবং তাকে বোঝাবেন যে, তিনি তুতুশের পক্ষে যুদ্ধ করবেন। কিন্তু দু-পক্ষ মুখোমুখি হলে তিনি তুতুশকে ছেড়ে বারকিয়ারুকের বাহিনীতে যোগ দেবেন!
নিঃসন্দেহে এটি ছিল অতি বিপজ্জনক এক পরিকল্পনা। যুদ্ধে তুতুশ জয়লাভ করলে আক সুনকুরের সব শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু তার চিন্তাধারা ছিল সুস্পষ্ট। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, চলমান সংঘাতে বারকিয়ারুকই ন্যায়ের পক্ষে আছেন। এর কারণ কেবল এই নয় যে, বারকিয়ারুক এ পদের বৈধ উত্তরাধিকারী; বরং এটিও আক সুনকুরের বিবেচনায় ছিল যে, সততা ও খোদাভীতির গুণে বারকিয়ারুক তুতুশের চেয়ে হাজার গুণ বেশি উপযুক্ত। আর তাই আক সুনকুর তুর্কমানি রহ. নিজের জীবন ও নিরাপত্তা উৎসর্গ করে ন্যায়ের পক্ষে প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালনের সিদ্ধান্ত নেন।
নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন মুসলিম উম্মাহর এক দৃষ্টান্ত-বিরল মহান পুরুষ! ৪৮৬ হিজরি সনে তুতুশ ও বারকিয়ারুকের বাহিনী পারস্যের রায় নগরীতে পরস্পর মুখোমুখি হয়। আক সুনকুর তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন এবং তার বাহিনী নিয়ে সটকে পড়ে বারকিয়ারুকের বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হন। এডেসার তৎকালীন মুসলিম আমির বুজানও একই কাজ করেন। তিনিও প্রয়াত সুলতান মালিকশাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বস্ত ছিলেন।
আলেপ্পো ও এডেসার বাহিনী সরে যাওয়ায় তুতুশের বাহিনীর শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রায় থেকে পরাজিত হয়ে প্রস্থান করে। তুতুশ বিফল মনোরথে শামে ফিরে আসেন। এ ঘটনায় আক সুনকুরের প্রতি তার বিদ্বেষ ও ক্ষোভ আরও প্রকট আকার ধারণ করে।
নতুন সুলতান বারকিয়ারুক আক সুনকুরকে আলেপ্পোর প্রশাসক পদে বহাল রাখেন। পাশাপাশি তিনি আক সুনকুরের সহায়তায় অতিরিক্ত সামরিক সাহায্যও প্রেরণ করেন। তিনি তুতুশের পক্ষ থেকে আক সুনকুরের ওপর ত্বরিত প্রতিশোধ-আঘাতের আশঙ্কা করছিলেন। এটি ৪৮৬ হিজরি সনের জিলকদ মাসের ঘটনা।
দ্রুতই এ আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নেয়। তুতুশ বিভিন্ন বাহিনীকে সমবেত করে আলেপ্পো দখলের উদ্দেশে রওনা হন। আক সুনকুর এ সময় বারকিয়ারুকের অনুগত বিভিন্ন রাজন্যের কাছে সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন। কিন্তু তাদের আগমনে দেরি হওয়ায় আক সুনকুর একাই তার বাহিনী নিয়ে তুতুশের মোকাবিলায় বেরিয়ে পড়েন। অসম লড়াই শেষে আক সুনকুর পরাজিত ও বন্দি হন। দুরাচারী তুতুশ তৎক্ষণাৎ তাকে হত্যা করেন।
৪৮৭ হিজরি সনের ৯ জুমাদাল উলা (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) শনিবার এই হৃদয়বিদারক ঘটনা সংঘটিত হয়। এর মধ্য দিয়ে আক সুনকুরের আট বছরের আলেপ্পো শাসনের অবসান ঘটে। সম্মিলিত সাক্ষ্যমতে এই আটটি বছর ছিল আলেপ্পোর ইতিহাসের অন্যতম উন্নত ও সমৃদ্ধ কাল।
এই হলো ইসলামি ইতিহাসের এক মহান পুরুষ কাসিমুদ্দৌলা আক সুনকুরের দাস্তান!
তাহলে কেমন হতে পারে এই মহান ব্যক্তির গৃহে তারই প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত ইমাদুদ্দিন জিনকির গল্প!

টিকাঃ
২১২. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৯৬।
২১৩. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪৯৫।
২১৪. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১২/১৪৭।
২১৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪৭৭।
২১৬. সুহাইল যাক্কার, মাদখালুন ইলা তারীখিল হুরূবিস-সালিবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ২১৬।
২১৭. ইবনুল আদিম, বুগইয়াতুত-তালাব ফী তারীখি হালাব, ৪/১৯৫৬।
২১৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪৮৪।
২১৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪৮৮।
২২০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪৮৮-৪৮৯ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১০৯-১১০।
২২১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪৯৪ ও ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/২৭।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 আক সুনকুর মুসলমানদের দৃষ্টিতে

📄 আক সুনকুর মুসলমানদের দৃষ্টিতে


আক সুনকুর যখন ইন্তেকাল করেন তখনও তার পুত্র ইমাদুদ্দিনের বয়স দশ পেরোয়নি! নিতান্ত শিশুকালেই তিনি তার পিতাকে হারান। নিশ্চয়ই সমকালীন অনেকেই এই পিতৃহারা শিশুটির নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছিল। পিতৃহারা কত শিশুই তো সুষ্ঠু প্রতিপালনের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে! হারিয়ে যাবে আরও কত শিশু! কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি কালের গর্ভে হারিয়ে যাননি। বরং মহান আল্লাহ তাকে সাহায্য করেছেন, তাকে মর্যাদার অধিকারী করেছেন। আর তাই তিনি যখন ইন্তেকাল করেন, তখন তিনি এক বিস্তৃত রাজ্যের শাসক; জনহৃদয়ের প্রিয়তম ব্যক্তি।
কাসিমুদ্দৌলা আক সুনকুর যদিও তার পুত্রের জন্য অঢেল সম্পদ বা অত্যুচ্চ কোনো পদ রেখে যাননি; কিন্তু তিনি পুত্রের জন্য এমন কিছু অমূল্য সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন, যা পদ ও সম্পদের চেয়ে বহুগুণ মূল্যবান।
১. সন্তানের জন্য তিনি রেখে গিয়েছিলেন আল্লাহ পাকের তত্ত্বাবধান ও রক্ষণাবেক্ষণ। নিঃসন্দেহে এ বড় উত্তম মিরাস! কাসিমুদ্দৌলা ছিলেন মুত্তাকি-খোদাভীরু এবং সর্বদা ন্যায় ও সঠিক বক্তব্য প্রদানকারী। ঐতিহাসিক ইবনুল আদিম তার সম্পর্কে বলেন, 'কাসিমুদ্দৌলা ছিলেন অগাধ তাকওয়া ও সুগভীর ঈমানের অধিকারী। পিতার এই তাকওয়াই দুর্বল শিশুপুত্রের সর্বাঙ্গীন হিফাজত করেছে। আল্লাহ তাআলা তো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন— وَ لْيَخْشَ الَّذِيْنَ لَوْ تَرَكُوا مِنْ خَلْفِهِمْ ذُرِّيَّةً ضِعْفًا خَافُوْا عَلَيْهِمْ فَلْيَتَّقُوا اللهَ وَ لْيَقُوْلُوْا قَوْلًا سَدِيْدًا )
তাদের ভয় করা উচিত, যারা নিজেদের পশ্চাতে দুর্বল অক্ষম সন্তানসন্ততি ছেড়ে গেলে তাদের জীবন শঙ্কাগ্রস্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করে; সুতরাং তারা যেন আল্লাহকে ভয় করে এবং সরল- সঠিক কথা বলে। [সুরা নিসা: ০৯]
২. পুত্রের জন্য তিনি রেখে গিয়েছিলেন শরিয়ত ও নীতি-নৈতিকতার প্রতি অগাধ ভক্তি ও অনুরাগ এবং শরিয়তের বিধিবিধান ও আদেশ- নিষেধের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাবোধ। শৈশবে ইমাদুদ্দিন জিনকি স্বচক্ষে শরিয়ত বাস্তবায়নের অভাবনীয় বরকত ও কল্যাণ প্রত্যক্ষ করেছেন। তাই জীবনে কখনোই তিনি একে ত্যাগ করেননি।
৩. কাসিমুদ্দৌলা তার পুত্রের জন্য আরও রেখে গিয়েছিলেন ন্যায়বিচারের সুউচ্চ মূল্যমানের উপলব্ধি। আর তাই ইমাদুদ্দিন জিনকির হৃদয় ও মানসে গেঁথে গিয়েছিল ন্যায়-ইনসাফের গুণ। তিনি যেকোনো ধরনের অন্যায় ও জুলুম অপছন্দ করতেন। এ কারণেই পরবর্তী সময়ে ইমাদুদ্দিন জিনকি পিতার মতো মুসলিম ইতিহাসের অন্যতম ন্যায়বিচারক শাসকে পরিণত হন।
৪. তিনি পুত্রের জন্য রেখে গিয়েছিলেন জনগণের প্রতি স্বভাবসুলভ নমনীয়তার গুণ। তাই তো ইমাদুদ্দিন জিনকি নিজের স্বার্থের ওপর জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিতেন, কেউ তার অধিকার আদায়ে ত্রুটি করলে তাকে ক্ষমা করে এড়িয়ে যেতেন, দুর্বল ও দরিদ্রদের প্রতি দয়া করতেন এবং বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন ছাড়া প্রত্যেকের প্রাপ্য তাকে পৌঁছিয়ে দিতেন।
৫. পুত্রের জন্য আক সুনকুর সম্পদ হিসেবে রেখে গিয়েছিলেন অত্যুচ্চ বিনয় গুণ। আর তাই ইমাদুদ্দিন সুলতানের চাকচিক্য বা মসনদের ক্ষমতায় সামান্য প্রভাবিত না হয়ে সর্বদা আল্লাহর সামনে বিনয়ী ছিলেন। তিনি নিজের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ অনুভব করতেন বলে কারও প্রতি উদ্ধত আচরণ করতেন না এবং নিজের বিজয় ও ক্ষমতায় আত্মমুগ্ধ হতেন না।
৬. তিনি পুত্রের জন্য রেখে গিয়েছিলেন প্রশাসনিক যোগ্যতা ও সহজাত নেতৃত্ব-দক্ষতা। এ কারণেই ইমাদুদ্দিন জিনকি জনগণকে তার প্রতি অনুগত বানাতে এবং প্রয়োজনে তাদেরকে আন্দোলিত করতে সক্ষম হন। আর একই কারণে তিনি ছিলেন ঐক্য-চিন্তা ও সকলকে এক পতাকাতলে সমবেত করার প্রতি অনুরাগী।
৭. পুত্রের জন্য তিনি রেখে গিয়েছিলেন জিহাদ-অনুরাগ ও জিহাদের মর্যাদাবোধ। আক সুনকুরের পুরো জীবনই ছিল জিহাদময়। তার রেখে যাওয়া আদর্শে অনুপ্রাণিত পুত্র ইমাদুদ্দিন জিনকির জীবনও ছিল সংগ্রাম ও জিহাদমুখর। আক সুনকুর তার পুত্রকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে সম্পদ ও ক্ষমতার লালসা উপেক্ষা করে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় লড়াই করতে হয়। পুত্রকে তিনি শিক্ষা দিয়েছিলেন অশ্বারোহণ, অশ্বচালনা ও যুদ্ধবিদ্যার অভিনব নানা কলাকৌশল। কারণ, কাসিমুদ্দৌলা নিজে ছিলেন সমকালীন শ্রেষ্ঠতম যোদ্ধা ও কুশলী মুজাহিদ।
৮. আক সুনকুর তুর্কমানি তার পুত্রের জন্য রেখে গিয়েছিলেন আলেপ্পোবাসীর হৃদয়ভরা ভালোবাসা। রাজ্যের প্রতিটি মানুষ তাদের এই ন্যায়বান-দয়ালু শাসককে ভালোবাসত। ঐতিহাসিক ইবনুল আছির আক সুনকুরের প্রতি আলেপ্পোবাসীর ভালোবাসার বিবরণ এক আশ্চর্য বাক্যে তুলে ধরেছেন—‘শেষ সময় পর্যন্ত আলেপ্পোবাসী উত্তরাধিকার সূত্রে তার প্রতি হৃদ্যতা ও অনুরাগ পোষণ করে গেছে!’ অর্থাৎ প্রত্যেক পিতা তার সন্তানদের কাসিমুদ্দৌলার প্রতি অনুরাগী ও অনুগত থাকার অসিয়ত করে যেত। এভাবেই চলেছে তার শাসনামলের শেষ পর্যন্ত! মুগ্ধতা ও ভালোবাসা কত গভীর স্তরের হলে এমনটি হতে পারে! নিঃসন্দেহে এ বিষয়টিও ইমাদুদ্দিন জিনকির জীবনে অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।
৯. কাসিমুদ্দৌলা আক সুনকুর তার পুত্রের জন্য আরও রেখে গিয়েছিলেন সেলজুক সাম্রাজ্যের ন্যায়পরায়ণ ও শক্তিশালী সুলতানদের প্রতি সুস্পষ্ট হৃদ্যতার অনুভূতি। তিনি নিজে প্রথমে মালিকশাহ ও পরে তার পুত্র বারকিয়ারুকের প্রতি পূর্ণ বিশ্বস্ত ও অনুগত ছিলেন। পিতার এই নীতি ইমাদুদ্দিন জিনকির জন্য সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে দিয়েছিল। জীবনে কখনোই তিনি কোনো উপাধি লাভ বা স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করেননি; বরং ন্যায়পরায়ণ সুলতানের প্রতি আনুগত্য বজায় রেখে গেছেন এবং শক্তি দেখে ভক্তি বদল না করে সর্বদা এক নেতৃত্বের প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন। এ গুণটি ইমাদুদ্দিন জিনকির জীবনে প্রভূত কল্যাণ নিশ্চিত করেছিল।
১০. আক সুনকুর তার এতিম সন্তানের জন্য সর্বশেষ যে সম্পদটি রেখে গিয়েছিলেন, তা হলো-বিশ্বস্ত-অনুগত একদল বন্ধু ও সুহৃদ, যারা তাকে একমাত্র আল্লাহর জন্য ভালোবাসত; যারা তার পদ বা ক্ষমতাকে নয়; ব্যক্তিত্বকে ভালোবাসত। আক সুনকুরের মৃত্যুর পর তারা তার এতিম পুত্রের তত্ত্বাবধান করে। আক সুনকুরও এমন করেই সুলতান মালিকশাহর মৃত্যুর পর তার পুত্র বারকিয়ারুকের তত্ত্বাবধান করেছিলেন। কারণ, তিনিও সুলতানকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসতেন। পৃথিবীর বিধিবদ্ধ রীতিমতে সর্বদা এমনটিই ঘটে থাকে; সৎকর্মের প্রতিদান সমজাতীয়ই হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
هَلْ جَزَاءُ الْإِحْسَانِ إِلَّا الْإِحْسَانُ সৎ কাজের প্রতিদান উত্তম পুরস্কার ব্যতীত আর কী হতে পারে? [সুরা আর-রাহমান: ৬০]
এই হলো পূর্ণ দশ!
এই দশটি অমূল্য সম্পদ কাসিমুদ্দৌলা তার শিশুপুত্র ইমাদুদ্দিন জিনকির জন্য রেখে গিয়েছিলেন। মুসলিম সমাজে এমন পিতা কয়জন আছে, যারা কাসিমুদ্দৌলার মতো করে সন্তানের জন্য এমন অমূল্য সম্পদ রেখে যেতে পেরেছে?!
মানুষ সারা জীবন সন্তানের জন্য কাড়ি কাড়ি অর্থসম্পদ রেখে যেতে, প্লট-ফ্লাট ও গাড়ি-বাড়ির বীমা করে যেতে এবং একে-ওকে সন্তানের প্রতি লক্ষ রাখার অসিয়ত করে যেতে চেষ্টা করে। কাসিমুদ্দৌলা রহ. তার পুত্রের জন্য যেমন আদর্শ সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন, তেমনটি খুব কম মানুষই করে থাকে। অবশ্য খুব কম সন্তানও তো পরবর্তীকালে একজন ইমামুদ্দিন জিনকি হয়ে ওঠে!
সুতরাং হে বিবেকবান, একটু ভাবুন এবং শিক্ষা গ্রহণ করুন।
***

টিকাঃ
২২২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ১৫।
২২০. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১০৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00