📄 দুয়ারে এসেছে নবপ্রভাত!
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, এন্টিয়ক ক্রুসেড রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত বোহেমন্ডের পুত্র ২য় বোহেমন্ড পরিণত বয়সে উপনীত হয়ে ৫২১ হিজরি সনের শাওয়াল মাসে (১১২৭ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে) এন্টিয়কে পৌঁছান। বর্বরতা ও নৃশংসতায় তিনি ছিলেন যোগ্য পিতার যোগ্য উত্তরসূরি। এমনকি ঐতিহাসিক উসামা বিন মুনকিয তাকে মুসলমানদের জন্য এক 'দুর্যোগ-আতঙ্ক' হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
২য় বোহেমন্ডের আগমনে ক্রুসেডাররা অনেকটা স্থিতিশীলতা ফিরে পায়। বাইতুল মুকাদ্দাসে ২য় বল্ডউইন, এডেসায় জোসেলিন, ত্রিপোলিতে পন্স আর এন্টিয়কে সদ্য আগত ২য় বোহেমন্ড; প্রতিটি রাজ্যেই এখন আলাদা আলাদা শাসক।
২য় বল্ডউইন এ সময় এন্টিয়ক রাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ়করণে উদ্যোগী হন। তিনি ২য় বোহেমন্ডকে উষ্ণ সংবর্ধনা প্রদান করেন এবং তাকে নিজের দ্বিতীয় কন্যা এলিস (Alice)-কে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন। বোহেমন্ড এ প্রস্তাব গ্রহণ করে নিলে বাইতুল মুকাদ্দাস ও এন্টিয়ক রাজ্যের মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ়তা লাভ করে।
প্রায় একই সময়ে সংঘটিত এক বিস্ময়কর ঘটনা মুসলমানদের অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে তোলে। আক সুনকুরের শাহাদাতের পর সুলতান মাহমুদ আলেপ্পো ও মসুলের শাসনভার আক সুনকুরের পুত্র ইযযুদ্দিন মাসউদকে প্রদান করেছিলেন। পিতার মতো তিনিও বীর, সাহসী ও খোদাভীরু ছিলেন এবং জিহাদের পথে পূর্ণতায় পৌঁছতে দৃঢ়প্রত্যয়ী ছিলেন। দায়িত্বলাভের পর তিনি আলেপ্পোর পার্শ্ববর্তী একটি দুর্গ অধিকারের চেষ্টা চালান। কিন্তু অবরোধ চলাকালে হঠাৎ কোনো আঘাত ছাড়াই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
তরুণ এই শাসকের আকস্মিক প্রয়াণে নতুন করে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। জাওলি নামক জনৈক মামলুক এ সময় ইযযুদ্দিনের অল্প বয়সী ভাইকে মসনদে বসাতে উঠে পড়ে লাগেন। জাওলি অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুটির তত্ত্বাবধায়ক সেজে নিজেই ক্ষমতার কলকাঠি নাড়ার পরিকল্পনা করছিলেন। নিজের মনোবাঞ্ছা বাস্তবায়ন করার জন্য জাওলি সুলতান মাহমুদের কাছে দুজন দূত প্রেরণ করেন। জনমনে আতঙ্ক নেমে আসে—না জানি সুলতান তার প্রস্তাব মেনে নেন। তাহলে তো রাজ্য ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবে। পরিস্থিতি বড় গুরুতর। সুবিস্তৃত আলেপ্পোকে গ্রাস করে নিতে ক্রুসেডাররা দরজায় কড়া নাড়ছে। এ সময় মুসলমানদের প্রয়োজন এমন কোনো অপরিণত শিশু-শাসক দ্বারা পূর্ণ হবে না, যাকে একজন উচ্চাভিলাষী ধূর্ত ব্যক্তি পরিচালিত করবে; বরং প্রয়োজন একজন শক্তিশালী-অবিচল মুজাহিদ নেতা।
জাওলি যে দুজন দূতকে সুলতানের কাছে প্রেরণ করেন তারা হলেন আলেপ্পোর কাজি বাহাউদ্দিন শাহরাযুরি ও ইযযুদ্দিন মাসউদের হাজিব সালাহুদ্দিন মুহাম্মাদ। উদ্দেশ্য সাধনে সুলতানকে রাজি করাতে পারলে জাওলি তাদেরকে ক্ষমতা ও আরও উচ্চ পদ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন।
যদিও দূতদ্বয়কে প্রলুব্ধকর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু আল্লাহ তাআলা তো আপন বান্দাদের প্রতি অতি দয়ালু! আর তাই আল্লাহর ইচ্ছায় জাওলি এমন দুজন সৎ ব্যক্তিকে দূত হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, যাদের হৃদয়ে ছিল উম্মাহ-দরদ এবং আল্লাহ, রাসুল ও মুমিনদের প্রতি কল্যাণকামিতার গুণ। আর তাই দূতদ্বয় জাওলির পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করার পরিবর্তে পদ ও ক্ষমতার লোভ বিসর্জন দিয়ে সুলতানকে দ্বীন ও শরিয়তের আলোকে সদুপদেশ প্রদানের সিদ্ধান্ত নেন।
দূতদ্বয় প্রথমে সুলতান মাহমুদের উজির শারফুদ্দিন আনুশেরওয়া বিন খালিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং পূর্ণাঙ্গ বিশ্বস্ততার সঙ্গে তাকে বলেন—
“জনাব, আপনি ও সুলতান জানেন যে, শাম ও জাযিরা অঞ্চলে ফিরিঙ্গিরা জেঁকে বসেছে এবং দিন দিন তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বেড়েই চলেছে। ইতিমধ্যে তারা অধিকাংশ ভূখণ্ড দখল করে নিয়েছে। মারদিন-সীমান্ত থেকে মিশরের আরিশ পর্যন্ত তাদের দখলে চলে গেছে। বুরসুকি (আক সুনকুর) আপন বীরত্ব, অভিজ্ঞতা ও অনুগত বাহিনীর মাধ্যমে তাদের বিভিন্ন প্রচেষ্টায় বাধা দিয়েছিলেন এবং তাদের অনিষ্টের লাগাম কিছুটা হলেও টেনে ধরেছিলেন। তিনি নিহত হওয়ার পর ক্রুসেডারদের লালসা আরও বেড়ে গেছে। তার যে পুত্র আমাদের এখানে আছে, সে নিতান্তই শিশু। এখন রাজ্যের প্রয়োজন পৌরুষদীপ্ত, বীরযোদ্ধা, অভিজ্ঞতা ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন শাসক; যিনি ক্রুসেডারদের তাড়িয়ে দিয়ে রাজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। আমরা সার্বিক পরিস্থিতির সুস্পষ্ট বিবরণ আপনার সামনে তুলে ধরলাম, যেন ইসলাম ও মুসলমানদের ওপর নতুন কোনো বিপর্যয় নেমে না আসে। তখন তো আমাদের তিরস্কার করে বলা হবে, 'তোমরা কি আমাদেরকে প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত করনি?””
উজির শারফুদ্দিন এই গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো সুলতানকে জানালে তিনি অত্যন্ত খুশি হন। সুলতান দূতদ্বয়কে ডেকে এনে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এরপর তিনি তাদের কাছে জানতে চান, তারা কাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদের উপযুক্ত মনে করছেন। দূতদ্বয় সম্ভাব্য কয়েকজনের নাম উল্লেখ করলেও বিশেষভাবে একটি নাম প্রশংসাবাক্যসহ উল্লেখ করেন এবং তাকে নির্বাচনের বিষয়ে সুলতানকে উদ্বুদ্ধ করেন।
সুলতান সানন্দে তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করে নেন। কারণ, তিনি নিজেও উক্ত প্রার্থীর শক্তি ও রণদক্ষতা, বীরত্ব ও যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা এবং নিষ্ঠা ও তাকওয়াগুণ সম্পর্কে অবগত ছিলেন। ফলে সুলতানের অনুমোদনক্রমে সেই নতুন ব্যক্তিই মসুল ও আলেপ্পোর পরবর্তী শাসক নির্বাচিত হন। নবনির্বাচিত ও প্রতীক্ষিত সেই নেতা হলেন ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ.।
ইমাদুদ্দিন জিনকি এমন এক মহান নেতা, যার কীর্তি-আলোচনায় প্রয়োজন অনেক অনেক পৃষ্ঠা, প্রচুর গবেষণা ও বিশ্লেষণ। কারণ, তিনি ছিলেন উম্মাহর ইতিহাসে এক অত্যুজ্জ্বল নক্ষত্র, জিহাদি অঙ্গনের এক প্রবাদপুরুষ।
তাহলে এখন জানার বিষয়— কে এই ইমাদুদ্দিন জিনকি? কী তার ইতিহাস? কীভাবে এই মহান মুজাহিদের আবির্ভাব এবং কীভাবে খ্যাতির শীর্ষতম চূড়ায় আরোহণ? কী ছিল জাতির সংস্কার ও সংশোধনে তার পদক্ষেপ এবং কী ছিল পরিবর্তনের লক্ষ্যে তার কর্মপদ্ধতি? তার কর্মপ্রচেষ্টায় কেমন ছিল জনসাধারণের আচরণ এবং কেমন ছিল তার প্রতি অধীনস্থ প্রশাসক ও রাজন্যবর্গের অবস্থান? আর ক্রুসেড-বিরোধী সমরাঙ্গনে এই নবতারকার আত্মপ্রকাশে কী ছিল ক্রুসেডারদের প্রতিক্রিয়া? প্রতিটি বিষয়ের জন্য প্রয়োজন বিস্তৃত গবেষণাধর্মী আলোচনা। আর এটিই আমাদের পরবর্তী পরিচ্ছেদের আলোচ্য বিষয়।
***
টিকাঃ
১৮৯. Foucher de Chartres, pp. 481-483.
১৯০. উসামা বিন মুনকিয, আল-ই'তিবার, পৃষ্ঠা : ১২১।
১৯১. Foucher de Chartres, pp. ৪৮৫.
১৯২. বাহাউদ্দিন আবুল হাসান আলি ইবনুল কাসিম শাহরাযুরি। জিনকি সাম্রাজ্যের অন্যতম মর্যাদাবান কাজি। তিনি ছিলেন দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ, উন্নত, অভিজাত এক জাগ্রত পুরুষ। ৫৩২ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন, সিফফিনে তাকে সমাহিত করা হয়। [অনুবাদক]
১৯৩. তৎকালে প্রধান রাজপ্রহরীকে 'হাজিব' বলা হতো। হাজিব পদধারী ব্যক্তি শাসকের মূল পরামর্শক ও উপদেষ্টা বিবেচিত হতেন। হাজিবের পদমর্যাদা ছিল অনেকটা বর্তমান সময়ের (প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির রাষ্ট্রব্যবস্থার) প্রধানমন্ত্রীর সমপর্যায়ের। [সম্পাদক]
১৯৪. সালাহুদ্দিন মুহাম্মাদ বিন আইয়ুব ইয়াগিসিয়ানি। ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রশাসনের অন্যতম সেনাপতি। প্রচণ্ড কৌশলী ও কূটনীতিবিদ ছিলেন। কিছুদিন তিনি হামা নগরীর প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। [অনুবাদক]
১৯৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৪২।
১৯৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৪৩।
১৯৭. প্রাগুক্ত।