📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 মসুল-আলেপ্পো একক রাজ্য!

📄 মসুল-আলেপ্পো একক রাজ্য!


ফিরে যাই আলেপ্পোবাসীর কাছে!
শত্রুবাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ আলেপ্পোবাসী নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ে। তারা স্পষ্টতই অনুভব করে যে, তাদের না আছে শক্তিশালী কোনো নেতা, না আছে নির্ভরযোগ্য বহিঃসংযোগ। শাসক হিসেবে যিনি তাদের ওপর চেপে বসেছেন, সেই হুসামুদ্দিন তামারতাশ শাসনকাজে যথেষ্ট দুর্বল। তিনি অবস্থান করছেন আক্রান্ত এলাকা থেকে নিরাপদ দূরত্বে। আর যদি তিনি তার বাহিনী নিয়ে বেরিয়েও আসেন, তবুও তার দুর্বল শক্তি নিয়ে কিছুতেই প্রতিপক্ষকে প্রতিরোধ করতে পারবেন না। আর বাস্তব কথা হলো, তার ক্রুসেডারদের মোকাবিলা করার কোনো আগ্রহই নেই। অথচ জিহাদ এক কঠিন সংগ্রামের নাম; এ পথে কেবল সে-ই অবিচল থাকতে পারে, যার শুধু আগ্রহ নয়; আছে জিহাদ-অনুরাগ ও শাহাদাতের দুর্নিবার আকর্ষণ।
সবকিছু বিবেচনা করে আলেপ্পোবাসী বাইরের এমন কোনো নেতার কাছে সাহায্যপ্রার্থনার সিদ্ধান্ত নেয়, যিনি আলেপ্পো রাজ্যের লাগাম হাতে তুলে নিলে শত্রুপক্ষ সুরক্ষিত আলেপ্পো হতে অবরোধ প্রত্যাহার করে প্রস্থান করতে বাধ্য হবে।
প্রশ্ন হলো—তারা সাহায্যপ্রার্থনা করবে কার কাছে?! চারপাশের অধিকাংশ নেতাই যে ভীরু-উদাসীন, নিতান্তই দুর্বল! আলেপ্পোবাসীর সামনে তুলনামূলক উপযুক্ত দুটি বিকল্প ছিল। এক. দামেশকের অধিপতি তুগতেকিন। দুই. মসুলের প্রশাসক আক সুনকুর আল-বুরসুকি।
তুগতেকিন যদিও উল্লেখযোগ্য সামরিক শক্তির অধিকারী ছিলেন এবং দীর্ঘকাল ধরে দামেশকের শাসনভার আগলে রেখেছিলেন; কিন্তু তাকে কাঙ্ক্ষিত নেতা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ আলেপ্পোবাসীর ছিল না। কারণ, সব সময়ই তিনি বহিঃসাহায্যের মুখাপেক্ষী থাকতেন। এমনকি ইতিপূর্বে তিনি দুর্বল পরিস্থিতিতে ক্রুসেডারদের সঙ্গেও মিত্রতা করেছিলেন। এখন যে ক্রুসেডার বাহিনী আলেপ্পো অবরোধ করেছে, তারা তো আলেপ্পোর কাছেই অবস্থানকারী তুগতেকিনের সামরিক শক্তিকে গোনায় না ধরেই এখানে এসেছে। এসব দিক বিবেচনা করে আলেপ্পোবাসী উপলব্ধি করে যে, তুগতেকিনের প্রভাব কিছুতেই ক্রুসেডারদের সন্ত্রস্ত করতে পারবে না এবং তাদেরকে বিফল মনোরথে ফিরে যেতে বাধ্য করতেও পারবে না।
সম্ভাব্য দ্বিতীয় বিকল্প আক সুনকুরের অবস্থা ছিল এর বিপরীত। যদিও এ অঞ্চলে তার সমৃদ্ধ অতীত ইতিহাস ছিল না, উল্টো প্রথমবারের প্রশাসক আমলে ক্রুসেডারদের কাছে পরাজিত হওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল; কিন্তু তিনি এমন কিছু ব্যতিক্রমী গুণ-বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন, যা তুগতেকিনের তুলনায় তার পাল্লা ভারী করেছিল। যেমন :
১. সুউচ্চ সততা ও তাকওয়া গুণের অধিকারী হওয়ায় আক সুনকুর জনসাধারণের সঙ্গে ন্যায়, উদার ও অনুগ্রহপূর্ণ আচরণ করতেন। আলেপ্পোর জনসাধারণ তো বিগত কয়েক দশক ধরে তাদের নেতাদের মাঝে এসব গুণের অভাবই অনুভব করে আসছিল।
২. তার অধীনে ছিল মসুলের শক্তিশালী সেনাদল। মসুলবাহিনীর শক্তিমত্তার এটিও অন্যতম প্রমাণ যে, এ বাহিনীর সদস্য ছিলেন সমকালীন প্রসিদ্ধ সেনাপতি ইমাদুদ্দিন জিনকি, যার বীরত্বের খ্যাতি তৎকালীন মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল।
৩. তার অধীনে ছিল মসুলের জিহাদ-অনুরাগী সচেতন জনসাধারণ। এ কারণেই তার বাহিনী ছিল সমকালীন অন্যান্য বাহিনীর চেয়ে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। মসুলের যোদ্ধারা জানত কীভাবে ক্ষমতা ও অর্থের মোহ উপেক্ষা করে আল্লাহর জন্য লড়াই করতে হয়।
৪. সেলজুক সুলতান মাহমুদের সঙ্গে আক সুনকুরের চমৎকার সম্পর্ক ছিল, ছিল ব্যক্তিগত সম্পর্কও। এদিক থেকে বিবেচনা করলে সমকালীন মুসলিম বিশ্বের সর্ববৃহৎ ও সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের সমর্থন আক সুনকুরের পক্ষে ছিল।
৫. আক সুনকুরের হাতে আলেপ্পোর শাসনভার তুলে দেওয়া হলে তুগতেকিনের সমরশক্তির সঙ্গে নতুন শক্তির সম্মিলনে এ অঞ্চলে মুসলমানদের শক্তি মজবুত হবে। ইতিপূর্বে মওদুদের আমলেও দামেশক-মসুল ঐক্যবদ্ধ সম্পর্কের কারণে এ অঞ্চলে মুসলমানদের মজবুত অবস্থান সৃষ্টি হয়েছিল। আবারও যদি সেই ঐক্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে আর তার সঙ্গে যুক্ত হয় আলেপ্পোর সামরিক শক্তি, তাহলে ক্রুসেডাররা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে প্রস্থান করবে এবং এতে মুসলমানদের বিজয় নিশ্চিত হবে বলেই প্রতীয়মান হয়।
সার্বিক বিচারে আক সুনকুরের পাল্লা ভারী হওয়ায় আলেপ্পোবাসী তৎক্ষণাৎ তার কাছে সাহায্যবার্তা পাঠিয়ে তাকে ঐতিহ্যবাহী আলেপ্পো নগরীর শাসনভার গ্রহণে আগমনের আহ্বান জানায়।
আক সুনকুর চিন্তা করে দেখেন যে, এটি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখার এক 'বিনামূল্য' সুযোগ। এদিকে সুলতান মাহমুদও ইতিপূর্বে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাই তিনি আলেপ্পোবাসীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে দ্রুত মসুল থেকে রওনা হন এবং ৫১৮ হিজরির জিলহজ মাসে (১১২৫ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে) আলেপ্পোতে পৌঁছে রাজ্যটিকে মসুলের সঙ্গে যুক্ত করে নেন। বড় দুটি রাজ্য মিলে এবার গঠিত হয় একক বৃহৎ রাজ্য।
মালাতিয়া মারদিন আহলাত সুমাইসাত মারআশ আলবেরা মপসুয়েসটিয়া এডেসা আদানা তিল-বাশির সারুজ সিনজার মসুল হাররান ইসকানদারুন হারিম এন্টিয়ক মাআ’রাতুন- আসারিব দুর্গ কারমানবিজ ইরবিল লাতাকিয়া জাবালা নোমান আলেপ্পো ভূমধ্যসাগর কিননাসরিন বানিয়াস শাইজার হামা তারতুস ইরকা হিমস আলেপ্পো রাজ্য মসুল রাজ্য
মানচিত্র নং-২৬ মসুল-আলেপ্পো একক রাজ্য
মহান মুজাহিদ বাল্ক বিন বাহরামের শাহাদাত, উল্লেখযোগ্য কোনো বিনিময় ছাড়াই ২য় বল্ডউইনের মুক্তি, এরপর বল্ডউইন ও তার সহযোগীদের আলেপ্পো অবরোধ ইত্যাদি দুঃখজনক ঘটনাপ্রবাহ ও অনিষ্টের আড়ালেই নিহিত ছিল এক কল্যাণের বার্তা-গুরুত্বপূর্ণ দুই অঞ্চল আলেপ্পো ও মসুলের ঐক্য। প্রাথমিক পর্যায়ে এ ঐক্য যদিও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল বয়ে আনতে পারেনি; কিন্তু এর মাধ্যমে রাজ্যদুটির ঐক্যের মূল্য ও গুরুত্ব সকলের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে যায়। আর তাই এই ঘটনাকে পরবর্তীকালে সংঘটিত উভয় রাজ্যের অতি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ঐক্যের বীজরূপে বিবেচনা করা যেতে পারে।
যদি প্রশ্ন করা হয়, উভয় রাজ্যের একীভূতকরণকে এতটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবার কারণ কী, তাহলে তার উত্তর হচ্ছে-বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকেই এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেমন:
১. যেহেতু মসুল ও আলেপ্পো রাজ্য ভৌগোলিক দিক থেকে পরস্পর সংযুক্ত ছিল এবং মাঝে অন্য কোনো রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল না, তাই এই একীকরণকে অভিহিত করা যায় 'ইরাকের সঙ্গে সামরিক সংযোগ-সেতু' হিসেবে। শুধু ইরাক নয়; এর মাধ্যমে সেলজুকদের মূলকেন্দ্র পারস্যসহ ইসলামি বিশ্বের পুরো প্রাচ্য অংশের সঙ্গে ক্রুসেডারদের বিচরণভূমি শাম অঞ্চলের সংযোগ স্থাপিত হয়।
২. মসুলে জাগ্রত ছিল প্রকৃত জিহাদের আহ্বান। মসুলের সঙ্গে আলেপ্পো যুক্ত হওয়ায় আলেপ্পোতেও জিহাদি চেতনা বিস্তারের আশা তৈরি হয়। শুধু আলেপ্পো নয়; হতে পারে একে কেন্দ্র করে অনেক বছর ধরে এ জাতীয় চেতনাশূন্য পুরো শাম অঞ্চলে এক নতুন জোয়ার সৃষ্টি হবে।
৩. রাজ্যদুটির ছিল প্রচুর জনবল ও সামরিক শক্তি। তাই এ ঐক্যের মাধ্যমে ক্রুসেডারদের মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী বাহিনী গঠিত হওয়া নিশ্চিত হয়।
৪. যেহেতু মসুল ছিল সেলজুক সালতানাত ও আব্বাসি খিলাফতের অধীনস্থ, তাই মসুলের সঙ্গে আলেপ্পোর সংযুক্তির ফলে আলেপ্পোর দায়িত্ব কাগজে-কলমে সেলজুক সালতানাত ও আব্বাসি খিলাফতের ওপরও অর্পিত হয়। কারণ, এটি কেবল সহায়তা চুক্তি বা জিহাদের অঙ্গনে স্বেচ্ছা-সহযোগিতা ছিল না; ছিল পুরোপুরি রাজ্যভুক্তি।
৫. ইরাকের সামরিক শক্তি সব সময়ই শাম অঞ্চলে কোনো অগ্রবর্তী ঘাঁটি না থাকার অভাব বোধ করে আসছিল। আমাদের নিশ্চয়ই স্মরণ আছে যে, মওদুদ রহ. যখন এ অঞ্চলে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসেছিলেন আর আলেপ্পোর শাসক রিজওয়ান তার সামনে নগরদ্বার বন্ধ করে দিয়েছিলেন, তখন মওদুদ এ অঞ্চলে একটি ঘাঁটির অভাব রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুভব করেছিলেন। এই একীকরণের মাধ্যমে এ সমস্যারও সমাধান হয়।
৬. এর মাধ্যমে আলেপ্পো ও শাম অঞ্চলের জনসাধারণের আকিদা ও চিন্তাগত পরিশুদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষ করে মসুল ও বাগদাদসহ পুরো ইরাক অঞ্চল থেকে উলামায়ে কেরামের আগমনের বিরাট সুযোগ সৃষ্টি হয়। পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে—শামের দুই বৃহৎ নগরী আলেপ্পো ও দামেশকের বিভিন্ন অঙ্গনে শিয়া বাতিনিদের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে অঞ্চলদুটির জনসাধারণের চিন্তা-চেতনায় ব্যাপক বিকৃতি সাধিত হয়েছিল।
এই হলো মসুল-আলেপ্পো একীকরণের ইতিবাচক কিছু দিক। আর এ কারণেই সমকালীন নিষ্ঠাবান মুসলমানগণ এই পদক্ষেপকে সাদরে স্বাগত জানায়। অতীত ঐতিহাসিকগণের কলমে যেমন বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে, উঠে এসেছে সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত সব যুগের লেখক-ঐতিহাসিকদের বিশ্লেষণেই। ঐক্য যখন যেখানেই হোক, নিঃসন্দেহে তা গুরুত্ব ও উদ্যাপনের দাবিদার!

টিকাঃ
১৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৩০।
১৭১. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২১১-২১২ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২২৮।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 আক সুনকুর আল-বুরসুকির শহিদি মৃত্যু

📄 আক সুনকুর আল-বুরসুকির শহিদি মৃত্যু


দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার জন্য আক সুনকুর আলেপ্পোতে প্রবেশ করতেই ক্রুসেডাররা ইরাকি সেলজুক বাহিনীর শক্তিমত্তা এবং ইরাকি বাহিনীর প্রতি আলেপ্পোর জনগণের সমর্থনের বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরে অবরোধ প্রত্যাহার করে প্রস্থান করে। এ কারণে উভয় পক্ষের মধ্যে কোনো সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেনি।
আক সুনকুর নতুন করে আলেপ্পোর প্রশাসনব্যবস্থা বিন্যস্ত করার পর সেখানে নিজের অনুগত একজন প্রশাসক নিযুক্ত করে মসুলে ফিরে আসেন। এর কিছুদিন পরই ৫১৯ হিজরি সনের শুরুতে (১১২৫ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে) তিনি পুনরায় এ অঞ্চলে আগমন করেন। এবার তিনি শাইজারে গিয়ে শাইজারের আমির সুলতান বিন মুনকিযের কাছ থেকে জিম্মি ক্রুসেডারদের নিজের দায়িত্বে নিয়ে নেন। কারণ, চুক্তিতে সুস্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে, চুক্তির কোনো ধারা অমান্য করা হলে মধ্যস্থতাকারী জিম্মিদেরকে আলেপ্পোর শাসকের হাতে তুলে দিতে বাধ্য থাকবেন।
এরপর আক সুনকুর ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সরাসরি রণাঙ্গনে অবতীর্ণ হন। তিনি যুদ্ধের মাধ্যমে কাফারতাব দুর্গ দখল করে নেন। বল্ডউইনের সঙ্গে কৃত চুক্তিতে এ দুর্গটিও মুসলমানদের হাতে তুলে দেওয়ার কথা ছিল। এরপর তিনি যারদানা দুর্গ অবরোধ করেন। আক সুনকুরের অব্যাহত অভিযানে উদ্বিগ্ন হয়ে এন্টিয়ক ২য় বল্ডউইনের কাছে সাহায্যবার্তা পাঠালে বল্ডউইন দ্রুত এ অঞ্চলে ছুটে আসেন। আক সুনকুরের হাতে নিজের কন্যা জিম্মি থাকার বিষয়টিও তাকে দ্রুত আগমনে উদ্বুদ্ধ করে। বল্ডউইনের সঙ্গে পন্সের নেতৃত্বে ত্রিপোলির বাহিনী এবং জোসেলিনের নেতৃত্বে এডেসার সেনাদলও যুক্ত হয়। লড়াই অবশ্যম্ভাবী দেখে আক সুনকুর যারদানার অবরোধ প্রত্যাহার করে যুদ্ধের লক্ষ্যে আলেপ্পোর উত্তরে আযায অঞ্চলে চলে আসেন। আযাযে দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। মুসলিম বাহিনীর সদস্যগণ প্রচণ্ড বিক্রমে লড়াই করলেও দুঃখজনকভাবে পরাজিত হয়। যদিও কিছু কিছু ইতিহাসগ্রন্থে মুসলমানদের শোচনীয় পরাজয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তবে প্রকৃত বিচারে এ যুদ্ধে নিরঙ্কুশ জয়-পরাজয়ের কোনো ঘটনা ঘটেনি। ঐতিহাসিক ইবনুল আছিরের ভাষ্য অনুসারে এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর নিহতের সংখ্যা ছিল মাত্র এক হাজার। তা ছাড়া যুদ্ধের পর উভয় পক্ষের সমঝোতা বৈঠকে মিলিত হওয়ার ঘটনাও দু-পক্ষের তুলনামূলক শক্তি-ভারসাম্য বজায় থাকার বিষয়টি প্রমাণ করে।
সমঝোতা বৈঠকে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তসমূহ গৃহীত হয়।
১. আক সুনকুর জিম্মি ক্রুসেডারদের ২য় বল্ডউইনের কাছে হস্তান্তর করবেন।
২. কাফারতাব দুর্গের নিয়ন্ত্রণ মুসলমানদের হাতে থাকবে।
৩. নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে।
ঐতিহাসিক বর্ণনাসমূহে যুদ্ধবিরতির সময়সীমার সুস্পষ্ট বিবরণ পাওয়া যায় না। অবশ্য এটি নিশ্চিত যে, চুক্তিতে অতি সামান্য সময়ের জন্যই যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কারণ, এর পরপরই আক সুনকুর তার পুত্র ইযযুদ্দিন মাসউদকে আলেপ্পোর দায়িত্ব দিয়ে নিজে দ্রুত মসুলে ফিরে যান এবং নতুন যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বাহিনীর বিন্যাস ও সেনাসমাবেশ শুরু করেন।
আযাযের যুদ্ধে পরাজয় এবং তৎপরবর্তী সমঝোতা-চুক্তি যদিও আপাতদৃষ্টিতে আক সুনকুরের ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল; কিন্তু এ ঘটনা তার নেতৃত্বে কোনো প্রভাব ফেলেনি, এতে তার অবস্থানও সামান্য দুর্বল হয়নি। এ কারণে তার প্রতি সুলতান মাহমুদের আস্থাও নষ্ট হয়নি, জনসাধারণের মনেও তার নিষ্ঠা ও যোগ্যতা নিয়ে কোনো দ্বিধা তৈরি হয়নি। আর তাই এ ঘটনার পরও ক্রুসেডারদের অপবিত্র নখর থেকে ইসলামি ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের অভিযানে তিনি আপামর মুসলিম জনগণের আশার প্রদীপ হয়ে ছিলেন।
যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলে নতুন যুদ্ধ শুরু করার জন্য আক সুনকুর যখন পূর্বপ্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন শাম অঞ্চল থেকে সংবাদ আসে যে, ত্রিপোলির শাসক পন্স মুসলমানদের কাছ থেকে রাফানিয়া (Raphanea) দুর্গ ছিনিয়ে নিয়েছেন। যেহেতু দুর্গটি ছিল হিমস রাজ্যভুক্ত আর হিমস তখন দামেশকের অধিপতি তুগতেকিনের অধিকারে ছিল, তাই প্রকারান্তরে এ ঘটনা ছিল তুগতেকিনের ওপর আঘাত। মৌলিক দুটি কারণে রাফানিয়া দুর্গের নিয়ন্ত্রণ ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত দুর্গটি থেকে ত্রিপোলি নগরীর ওপর নজর রাখা যেত। তাই মুসলমানদের কর্তৃত্বে থাকা দুর্গটিকে ক্রুসেড রাজ্য ত্রিপোলির নিরাপত্তার জন্য হুমকি বিবেচনা করা হতো। দ্বিতীয়ত দুর্গটির অবস্থান ছিল এন্টিয়ক-বাইতুল বাইতুল মুকাদ্দাস যোগাযোগপথের সন্নিকটে। আর তাই দুর্গটির ওপর ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে এন্টিয়কে প্রেরিত যেকোনো সহায়তার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। এ বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য যে, রাফানিয়া দুর্গের পতনে রাজা ২য় বল্ডউইনও পন্সের সঙ্গে শরিক ছিলেন, যা ছিল তার ও আক সুনকুরের মধ্যে সম্পাদিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ফলে উভয়ের মধ্যকার চুক্তিও কার্যত বাতিল হয়ে যায়। এটি ৫২০ হিজরি সনের মধ্যভাগের (১১২৬ খ্রিষ্টাব্দের) ঘটনা।
তুগতেকিন আক সুনকুরের কাছে সহায়তা কামনা করলে তিনি তৎক্ষণাৎ তার বাহিনী নিয়ে ছুটে আসেন। আক সুনকুর তার পুত্র ইযযুদ্দিন মাসউদকে রাফানিয়ায় ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রেরণ করেন আর নিজে রওনা হন এন্টিয়কের অধিভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ আসারিব দুর্গের অবরোধে।
বল্ডউইনও দ্রুত এডেসার শাসক জোসেলিনকে নিয়ে ছুটে আসেন। সন্দেহ নেই, আক সুনকুরের ক্রমবর্ধমান শক্তি, অব্যাহত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প ও দৃঢ়তা, তার প্রতি মুসলিম জনসাধারণের সহানুভূতি ও শাম অঞ্চলের নেতৃবর্গের সমর্থন বল্ডউইনের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল। এ কারণেই তিনি নতুন করে যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রস্তাব দেন। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে নতুন চুক্তি সম্পন্ন হয়। তবে এবার তো তার মূল্য চুকানোর পালা! চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তিনি গুরুত্বপূর্ণ রাফানিয়া দুর্গের নিয়ন্ত্রণ মুসলমানদের হাতে সমর্পণ করেন!
নিঃসন্দেহে এ ফলাফল ছিল আক সুনকুরের জন্য অত্যন্ত সন্তোষজনক। কারণ, বিনা যুদ্ধে কোনো প্রকার শক্তি ক্ষয় না করেই অতি গুরুত্বপূর্ণ রাফানিয়া দুর্গের নিয়ন্ত্রণ মুসলমানদের হাতে ফিরে আসছে। তা ছাড়া যুদ্ধবিরতিকে কাজে লাগিয়ে মুসলমানরা এ সময় নিজেদের পুনঃসেনাবিন্যাস ও অন্যান্য সংস্কারকর্মের সুযোগ পাবে। আর তাই আক সুনকুর বল্ডউইনের প্রস্তাবে সম্মত হয়ে রাফানিয়া দুর্গ গ্রহণ করে নেন। এরপর তিনি পুত্র ইযযুদ্দিন মাসউদকে আলেপ্পোতে রেখে নিজে মসুলে ফিরে যান।
সমকালীন মুসলিম জনসাধারণের প্রত্যাশার দৃষ্টি তখন আক সুনকুরের দিকেই নিবদ্ধ। তিনিই সেই কাঙ্ক্ষিত নেতা, যিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বুক চিতিয়ে টিকে আছেন। নিঃসন্দেহে তার এ ভূমিকা মুসলমানদের হৃদয়ে অনেক বেশি সুখকর অনুভূতি সৃষ্টি করেছিল। তবে ঘটনাপ্রবাহে চোখ-রাখা সকলের হৃদয়েই কিন্তু সুখকর অনুভূতি ছিল না! বিষে-ভরা কিছু দৃষ্টিও তাকে অনুসরণ করছিল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে জ্বলেপুড়ে ছারখার হচ্ছিল বিদ্বেষে পূর্ণ কিছু অন্তর। মহান মুজাহিদ আক সুনকুরের প্রতি ক্রমবর্ধমান জনসমর্থন এবং তাকে ঘিরে মুসলমানদের বুকবাঁধা আশার জোয়ার সবই তারা লক্ষ করছিল।
নিষ্ঠাবান মুসলমানদের উন্নতি ও অগ্রগতিতে কাদের দৃষ্টি ও অন্তর জ্বলতে পারে?! তারা ছিল দুষ্ট বাতিনি শিয়াগোষ্ঠী!
উম্মাহর ঐক্য প্রতিষ্ঠা, জিহাদের ঝান্ডা উত্তোলন ও ক্রুসেডারদের বিতাড়নের লক্ষ্যে সুন্নি মুসলমানদের নিষ্ঠাপূর্ণ প্রচেষ্টায় বাতিনি নামক ইসমাইলি শিয়াদের এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি কখনোই সুস্থির বা আনন্দিত হতে পারেনি। তাই দুষ্ট হৃদয় ও কুটিল মানসিকতার অধিকারী বাতিনিরা এবার জাতির এই নব-আদর্শকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ইতিপূর্বে যেমন তারা সরিয়ে দিয়েছিল আক সুনকুরেরই পূর্বসূরি মওদুদ রহ.-কে, থামিয়ে দিয়েছিল মহান আলিম উজির নিজামুল মুলকের অগ্রযাত্রা!
৫২০ হিজরি সনের ৮ জিলকদ (১১২৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ নভেম্বর) শুক্রবার আক সুনকুর মসুলে ফিরে আসেন। মসুলে ফিরেই তিনি জুমার নামাজ আদায়ের জন্য জামে মসজিদে উপস্থিত হন। আক সুনকুর রহ. সাধারণ জনগণের সঙ্গে প্রথম কাতারে নামাজ পড়ছিলেন। হঠাৎ করেই দশের অধিক বাতিনি ঘাতক একযোগে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ছুরি ও খঞ্জর দ্বারা তাকে উপর্যুপরি আঘাত করতে থাকে। উম্মাহর এই ক্ষণজন্মা বীরপুরুষ তখনই শাহাদাত বরণ করেন। অথচ প্রত্যাশা ছিল মুসলমানরা সেদিন রাফানিয়া দুর্গ পুনরুদ্ধারের আনন্দ উদযাপন করবে!
এ তো জিহাদের পথ! যেমন দুর্গম, তেমনই সুদীর্ঘ! এ পথে পদে পদে হাজারো বাধা, বাধার হিমাদ্রি যেন! কষ্ট ও ক্লেশে ভরা এ পথের দুর্যোগ কখনো শেষ হওয়ার নয়! কিন্তু তারপরও এ জিহাদই চিরদিন ইসলামের সর্বোচ্চ চূড়া ও শ্রেষ্ঠতম আমল হিসেবে বহাল থাকবে।
যে জাতি অন্বেষণ করে সম্মান ও মর্যাদা এবং পুরো পৃথিবীর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব, তাদের কর্তব্য এ জাতীয় দুর্যোগ ও বিপর্যয়ে অভ্যস্ত হওয়া এবং সংগ্রামী অঙ্গনের কোনো প্রবাদপুরুষের বিয়োগে হতাশ না হয়ে অটল-অবিচল থাকা। কারণ, আল্লাহ তাআলা যখন মুসলমানদের হৃদয়ে সততা-নিষ্ঠা ও নির্ভেজাল জিহাদি স্পৃহা প্রত্যক্ষ করেন, তখন তিনি ঝান্ডা বহনের উপযুক্ত বিকল্প তৈরি করে দেন। অনেক সময় এই নতুন ঝান্ডাবাহী হয়ে থাকেন প্রয়াত মহান ব্যক্তির চেয়ে হাজার গুণ মহান ও প্রভাবশালী। এ তো সেই মহান সত্তার নিখুঁত ব্যবস্থাপনা, যিনি যাবতীয় ত্রুটি হতে পবিত্র; তন্দ্রা-উদাসীনতা কিছুই তাঁকে আচ্ছন্ন করতে পারে না!
অবশ্য এরপরও জিহাদ ও পুণ্যের অঙ্গনের মহান কোনো প্রতীক-পুরুষের অন্তর্ধানের পর সাময়িক সংকট সৃষ্টি হতেই পারে। আক সুনকুর রহ.-এর শাহাদাতের প্রায় কাছাকাছি সময়ে এমন আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়, যা মুসলিম বিশ্বের অস্থিরতা ও সংকট আরও ঘনীভূত করে তোলে।
উদাহরণস্বরূপ আক সুনকুরের মৃত্যুর দু-মাসেরও কম সময় পর খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ ও সুলতান মাহমুদের মধ্যে প্রচণ্ড বিরোধ সৃষ্টি হয়। বিরোধরত দু-পক্ষ একসময় যুদ্ধের জন্য মুখোমুখি অবস্থানে চলে যায়। আল্লাহ তাআলা যদি এ ফিতনার মূলোৎপাটন না করতেন, নিশ্চিত করেই উভয় পক্ষে প্রচুর হতাহতের ঘটনা ঘটত। শেষ পর্যন্ত খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ শক্তিশালী সুলতান মাহমুদের কাছে নতি স্বীকার করলে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত হয়ে আসে।

টিকাঃ
১৭০. Guillaume de Tyr, I, p.557.
১৭৪, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৩০।
১৭৫. Runciman:op.cit.,II,p.173
১৭৬. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৩১ ও Foucher de Chartres, p. 471.
১৭৭. Guillaume de Tyr, I, p. 580.
১৭৮. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৩১।
১৭৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৩৪।
১৮০. Guillaume de Tyr,1,p.580.
১৮১. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৩১-২৩২।
১৮২. Grousset: Hist, des Croisades 1, p. 641.
১৮০. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২১৬, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৩২ ও Foucher de Chartres, p.480.
১৮৪. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৩৩।
১৮৫. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২১৪।
১৮৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৩৬ ও শিহাবুদ্দিন আহমাদ বিন আবদুল ওয়াহহাব নুওয়াইরি, নিহায়াতুল আরাব ফী ফুনুনিল আদাব, ২৭/২৬।
১৮৭. আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'সবকিছুর মূল হলো ইসলাম। ইসলামের খুঁটি হলো নামাজ আর সর্বোচ্চ চূড়া হলো জিহাদ।' সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২৬১৬, আস-সুনানুল কুবরা লিন-নাসায়ি, হাদিস নং ১১৩৯৪ ও মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২২০৬৯। [অনুবাদক]
১৮৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৩৭-২৩৯ ও আত-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ২৯-৩০।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 দুয়ারে এসেছে নবপ্রভাত!

📄 দুয়ারে এসেছে নবপ্রভাত!


আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, এন্টিয়ক ক্রুসেড রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত বোহেমন্ডের পুত্র ২য় বোহেমন্ড পরিণত বয়সে উপনীত হয়ে ৫২১ হিজরি সনের শাওয়াল মাসে (১১২৭ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে) এন্টিয়কে পৌঁছান। বর্বরতা ও নৃশংসতায় তিনি ছিলেন যোগ্য পিতার যোগ্য উত্তরসূরি। এমনকি ঐতিহাসিক উসামা বিন মুনকিয তাকে মুসলমানদের জন্য এক 'দুর্যোগ-আতঙ্ক' হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
২য় বোহেমন্ডের আগমনে ক্রুসেডাররা অনেকটা স্থিতিশীলতা ফিরে পায়। বাইতুল মুকাদ্দাসে ২য় বল্ডউইন, এডেসায় জোসেলিন, ত্রিপোলিতে পন্স আর এন্টিয়কে সদ্য আগত ২য় বোহেমন্ড; প্রতিটি রাজ্যেই এখন আলাদা আলাদা শাসক।
২য় বল্ডউইন এ সময় এন্টিয়ক রাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ়করণে উদ্যোগী হন। তিনি ২য় বোহেমন্ডকে উষ্ণ সংবর্ধনা প্রদান করেন এবং তাকে নিজের দ্বিতীয় কন্যা এলিস (Alice)-কে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন। বোহেমন্ড এ প্রস্তাব গ্রহণ করে নিলে বাইতুল মুকাদ্দাস ও এন্টিয়ক রাজ্যের মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ়তা লাভ করে।
প্রায় একই সময়ে সংঘটিত এক বিস্ময়কর ঘটনা মুসলমানদের অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে তোলে। আক সুনকুরের শাহাদাতের পর সুলতান মাহমুদ আলেপ্পো ও মসুলের শাসনভার আক সুনকুরের পুত্র ইযযুদ্দিন মাসউদকে প্রদান করেছিলেন। পিতার মতো তিনিও বীর, সাহসী ও খোদাভীরু ছিলেন এবং জিহাদের পথে পূর্ণতায় পৌঁছতে দৃঢ়প্রত্যয়ী ছিলেন। দায়িত্বলাভের পর তিনি আলেপ্পোর পার্শ্ববর্তী একটি দুর্গ অধিকারের চেষ্টা চালান। কিন্তু অবরোধ চলাকালে হঠাৎ কোনো আঘাত ছাড়াই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
তরুণ এই শাসকের আকস্মিক প্রয়াণে নতুন করে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। জাওলি নামক জনৈক মামলুক এ সময় ইযযুদ্দিনের অল্প বয়সী ভাইকে মসনদে বসাতে উঠে পড়ে লাগেন। জাওলি অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুটির তত্ত্বাবধায়ক সেজে নিজেই ক্ষমতার কলকাঠি নাড়ার পরিকল্পনা করছিলেন। নিজের মনোবাঞ্ছা বাস্তবায়ন করার জন্য জাওলি সুলতান মাহমুদের কাছে দুজন দূত প্রেরণ করেন। জনমনে আতঙ্ক নেমে আসে—না জানি সুলতান তার প্রস্তাব মেনে নেন। তাহলে তো রাজ্য ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবে। পরিস্থিতি বড় গুরুতর। সুবিস্তৃত আলেপ্পোকে গ্রাস করে নিতে ক্রুসেডাররা দরজায় কড়া নাড়ছে। এ সময় মুসলমানদের প্রয়োজন এমন কোনো অপরিণত শিশু-শাসক দ্বারা পূর্ণ হবে না, যাকে একজন উচ্চাভিলাষী ধূর্ত ব্যক্তি পরিচালিত করবে; বরং প্রয়োজন একজন শক্তিশালী-অবিচল মুজাহিদ নেতা।
জাওলি যে দুজন দূতকে সুলতানের কাছে প্রেরণ করেন তারা হলেন আলেপ্পোর কাজি বাহাউদ্দিন শাহরাযুরি ও ইযযুদ্দিন মাসউদের হাজিব সালাহুদ্দিন মুহাম্মাদ। উদ্দেশ্য সাধনে সুলতানকে রাজি করাতে পারলে জাওলি তাদেরকে ক্ষমতা ও আরও উচ্চ পদ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন।
যদিও দূতদ্বয়কে প্রলুব্ধকর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু আল্লাহ তাআলা তো আপন বান্দাদের প্রতি অতি দয়ালু! আর তাই আল্লাহর ইচ্ছায় জাওলি এমন দুজন সৎ ব্যক্তিকে দূত হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, যাদের হৃদয়ে ছিল উম্মাহ-দরদ এবং আল্লাহ, রাসুল ও মুমিনদের প্রতি কল্যাণকামিতার গুণ। আর তাই দূতদ্বয় জাওলির পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করার পরিবর্তে পদ ও ক্ষমতার লোভ বিসর্জন দিয়ে সুলতানকে দ্বীন ও শরিয়তের আলোকে সদুপদেশ প্রদানের সিদ্ধান্ত নেন।
দূতদ্বয় প্রথমে সুলতান মাহমুদের উজির শারফুদ্দিন আনুশেরওয়া বিন খালিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং পূর্ণাঙ্গ বিশ্বস্ততার সঙ্গে তাকে বলেন—
“জনাব, আপনি ও সুলতান জানেন যে, শাম ও জাযিরা অঞ্চলে ফিরিঙ্গিরা জেঁকে বসেছে এবং দিন দিন তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বেড়েই চলেছে। ইতিমধ্যে তারা অধিকাংশ ভূখণ্ড দখল করে নিয়েছে। মারদিন-সীমান্ত থেকে মিশরের আরিশ পর্যন্ত তাদের দখলে চলে গেছে। বুরসুকি (আক সুনকুর) আপন বীরত্ব, অভিজ্ঞতা ও অনুগত বাহিনীর মাধ্যমে তাদের বিভিন্ন প্রচেষ্টায় বাধা দিয়েছিলেন এবং তাদের অনিষ্টের লাগাম কিছুটা হলেও টেনে ধরেছিলেন। তিনি নিহত হওয়ার পর ক্রুসেডারদের লালসা আরও বেড়ে গেছে। তার যে পুত্র আমাদের এখানে আছে, সে নিতান্তই শিশু। এখন রাজ্যের প্রয়োজন পৌরুষদীপ্ত, বীরযোদ্ধা, অভিজ্ঞতা ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন শাসক; যিনি ক্রুসেডারদের তাড়িয়ে দিয়ে রাজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। আমরা সার্বিক পরিস্থিতির সুস্পষ্ট বিবরণ আপনার সামনে তুলে ধরলাম, যেন ইসলাম ও মুসলমানদের ওপর নতুন কোনো বিপর্যয় নেমে না আসে। তখন তো আমাদের তিরস্কার করে বলা হবে, 'তোমরা কি আমাদেরকে প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত করনি?””
উজির শারফুদ্দিন এই গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো সুলতানকে জানালে তিনি অত্যন্ত খুশি হন। সুলতান দূতদ্বয়কে ডেকে এনে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এরপর তিনি তাদের কাছে জানতে চান, তারা কাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদের উপযুক্ত মনে করছেন। দূতদ্বয় সম্ভাব্য কয়েকজনের নাম উল্লেখ করলেও বিশেষভাবে একটি নাম প্রশংসাবাক্যসহ উল্লেখ করেন এবং তাকে নির্বাচনের বিষয়ে সুলতানকে উদ্বুদ্ধ করেন।
সুলতান সানন্দে তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করে নেন। কারণ, তিনি নিজেও উক্ত প্রার্থীর শক্তি ও রণদক্ষতা, বীরত্ব ও যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা এবং নিষ্ঠা ও তাকওয়াগুণ সম্পর্কে অবগত ছিলেন। ফলে সুলতানের অনুমোদনক্রমে সেই নতুন ব্যক্তিই মসুল ও আলেপ্পোর পরবর্তী শাসক নির্বাচিত হন। নবনির্বাচিত ও প্রতীক্ষিত সেই নেতা হলেন ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ.।
ইমাদুদ্দিন জিনকি এমন এক মহান নেতা, যার কীর্তি-আলোচনায় প্রয়োজন অনেক অনেক পৃষ্ঠা, প্রচুর গবেষণা ও বিশ্লেষণ। কারণ, তিনি ছিলেন উম্মাহর ইতিহাসে এক অত্যুজ্জ্বল নক্ষত্র, জিহাদি অঙ্গনের এক প্রবাদপুরুষ।
তাহলে এখন জানার বিষয়— কে এই ইমাদুদ্দিন জিনকি? কী তার ইতিহাস? কীভাবে এই মহান মুজাহিদের আবির্ভাব এবং কীভাবে খ্যাতির শীর্ষতম চূড়ায় আরোহণ? কী ছিল জাতির সংস্কার ও সংশোধনে তার পদক্ষেপ এবং কী ছিল পরিবর্তনের লক্ষ্যে তার কর্মপদ্ধতি? তার কর্মপ্রচেষ্টায় কেমন ছিল জনসাধারণের আচরণ এবং কেমন ছিল তার প্রতি অধীনস্থ প্রশাসক ও রাজন্যবর্গের অবস্থান? আর ক্রুসেড-বিরোধী সমরাঙ্গনে এই নবতারকার আত্মপ্রকাশে কী ছিল ক্রুসেডারদের প্রতিক্রিয়া? প্রতিটি বিষয়ের জন্য প্রয়োজন বিস্তৃত গবেষণাধর্মী আলোচনা। আর এটিই আমাদের পরবর্তী পরিচ্ছেদের আলোচ্য বিষয়।
***

টিকাঃ
১৮৯. Foucher de Chartres, pp. 481-483.
১৯০. উসামা বিন মুনকিয, আল-ই'তিবার, পৃষ্ঠা : ১২১।
১৯১. Foucher de Chartres, pp. ৪৮৫.
১৯২. বাহাউদ্দিন আবুল হাসান আলি ইবনুল কাসিম শাহরাযুরি। জিনকি সাম্রাজ্যের অন্যতম মর্যাদাবান কাজি। তিনি ছিলেন দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ, উন্নত, অভিজাত এক জাগ্রত পুরুষ। ৫৩২ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন, সিফফিনে তাকে সমাহিত করা হয়। [অনুবাদক]
১৯৩. তৎকালে প্রধান রাজপ্রহরীকে 'হাজিব' বলা হতো। হাজিব পদধারী ব্যক্তি শাসকের মূল পরামর্শক ও উপদেষ্টা বিবেচিত হতেন। হাজিবের পদমর্যাদা ছিল অনেকটা বর্তমান সময়ের (প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির রাষ্ট্রব্যবস্থার) প্রধানমন্ত্রীর সমপর্যায়ের। [সম্পাদক]
১৯৪. সালাহুদ্দিন মুহাম্মাদ বিন আইয়ুব ইয়াগিসিয়ানি। ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রশাসনের অন্যতম সেনাপতি। প্রচণ্ড কৌশলী ও কূটনীতিবিদ ছিলেন। কিছুদিন তিনি হামা নগরীর প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। [অনুবাদক]
১৯৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৪২।
১৯৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৪৩।
১৯৭. প্রাগুক্ত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00