📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 সুর নগরীর পতন

📄 সুর নগরীর পতন


বাল্ক বিন বাহরামের মোকাবিলায় ২য় বল্ডউইনের উত্তরে আগমন, বাহরামের হাতে পাকড়াও, কারাগারে বন্দি জীবনযাপন—এই পুরোটা সময় ক্রুসেডারদের একটি বাহিনী ভেনিস থেকে আগত একটি বিশাল নৌবহরের সহায়তায় লেবাননের সুর নগরী অবরোধ করে রেখেছিল।
পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সুর ছিল ভূমধ্যসাগরের শাম উপকূলের সেই দুই ইসলামি নগরীর একটি, যা তখনও মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অপর নগরীটি হলো আসকালান। এভাবেও বলা চলে যে, সাগরপথে অবশিষ্ট ইসলামি বিশ্ব হতে প্রেরিত যাবতীয় সহায়তা এ অঞ্চলে পৌঁছার মাত্র দুটি করিডোর তখনও খোলা ছিল, সুর ছিল তার একটি। আর তাই কেবল দুর্ভেদ্য নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণেই নয়; এ বিবেচনায়ও মুসলমানদের কাছে সুর নগরীর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
সুর নগরীর পতন
৫০৬ হিজরি সন (১11২ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে সুর নগরী দামেশকের আমির তুগতেকিনের তত্ত্বাবধানে ছিল। কিন্তু মিশরের নিকৃষ্ট উবায়দি প্রশাসন এ সময় শাম অঞ্চলে মুসলমানদের দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বারবার সুর দখলের চেষ্টা চালায়। তারা ষড়যন্ত্র করে তুগতেকিন নিযুক্ত সুরের আমির মাসউদকে সরিয়ে দেয়। অথচ উন্নত সামরিক দক্ষতা ও জিহাদি চেতনার অধিকারী মাসউদ দীর্ঘ এগারো বছর বীরত্বের সঙ্গে ক্রুসেডারদের প্রতিটি আক্রমণ প্রতিহত করে নগরীটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিলেন। উবায়দি শিয়ারা নগরীটি অধিকার করার পর এর নিরাপত্তা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়। ক্রুসেডাররা সুর নগরী ঘিরে কঠিন অবরোধ আরোপ করে। পানাহারদ্রব্য ফুরিয়ে যেতে থাকায় নগরীটি পতনোন্মুখ হয়ে পড়ে। সংবাদ পেয়ে তুগতেকিন দ্রুত অগ্রসর হলে ত্রিপোলির শাসক পন্স তার বাহিনী নিয়ে তুগতেকিনের পথরোধ করেন। অবশ্য তুগতেকিন শেষ পর্যন্ত ক্রুসেডারদের সঙ্গে সমঝোতা করতে সক্ষম হন। সিদ্ধান্ত হয় নগরীটির নিয়ন্ত্রণ ক্রুসেডারদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে; বিনিময়ে নগরীটির সকল নাগরিককে নিরাপত্তা প্রদান করা হবে। চুক্তি সম্পন্ন হলে ক্রুসেডাররা সুর নগরীতে প্রবেশ করে নগরবাসীকে বের করে দেয়। ক্রুসেডাররা শাম অঞ্চলে আগমনের দীর্ঘ পঁচিশ বছরেরও অধিক সময় পর ৫১৮ হিজরির ২৩ জুমাদাল উলা মাসে (১১২৪ খ্রিষ্টাব্দের জুলাইয়ের শুরুতে) মুসলমানদের বেদখল হয়ে যায় সুরক্ষিত সুর নগরী !
মুসলমানদের জন্য এটি ছিল অনেক বড় এক আঘাত। এদিকে বল্ডউইনের মুক্তি-চুক্তির শর্তপূরণে গড়িমসি আর ওদিকে সুরক্ষিত সুর নগরীর পতন একই সময়ে সংঘটিত দুটি ঘটনায় আঘাত আরও গভীর হয়। মুসলমানরা হেলায় হারিয়ে ফেলে হাতে থাকা অতি মূল্যবান এক সুযোগ!
সুর নগরীর পতনে বল্ডউইনের মনোবল অনেক বেড়ে যায়। তিনি এবার মুসলমানদেরকে প্রদত্ত দুর্গ হস্তান্তরের অঙ্গীকার ভঙ্গ করার পাশাপাশি পুরো চুক্তিই প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত নেন। বল্ডউইন এ সময় তামারতাশের প্রতিপক্ষ দুবাইস বিন সাদাকার সঙ্গে মিত্রতা করেন। অথচ চুক্তিতে তিনি দুবাইসকে দমনে তামারতাশকে সহযোগিতা করার অঙ্গীকার করেছিলেন। এরপর বল্ডউইন বাইতুল মুকাদ্দাস ও এন্টিয়কের বাহিনীকে একসঙ্গে জড়ো করেন। জোসেলিনের নেতৃত্বে এডেসার বাহিনী তাদের সঙ্গে যোগ দেয়, যুক্ত হয় দুবাইস বিন সাদাকার শিয়া বাহিনীও। এই সম্মিলিত বাহিনী আলেপ্পো অবরোধের লক্ষ্যে অগ্রসর হয়। আলেপ্পোর শাসক হুসামুদ্দিন তামারতাশ তখন সম্ভাব্য সংঘাতকেন্দ্র থেকে বহু দূরে মারদিনে অবস্থান করছেন!
নিশ্চিত করেই বলা যায়, বল্ডউইন এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন যে, তার প্রতিপক্ষ মুসলিম নেতা ভুলেও জিম্মিদের হত্যা করবেন না। এর কারণ শুধু এই নয় যে, তামারতাশ শক্তির দিক থেকে দুর্বল ছিলেন কিংবা তিনি জানেন যে, ইসলামি শরিয়তে শিশুহত্যা বৈধ নয়; বরং বল্ডউইন জানতেন যে, তামারতাশ প্রতিপক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগের এমন মূল্যবান ঘুঁটি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাতে রাখতে চেষ্টা করবেন। আর তাই বল্ডউইন পরিকল্পনা করেন, তিনি উল্টো তামারতাশের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবেন এবং চাপ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য শেষ পর্যন্ত তাকে জিম্মিদের ছেড়ে দিতে বাধ্য করবেন।
আলেপ্পোবাসীর অবস্থা তখন চরম শোচনীয়। ২য় বল্ডউইন, জোসেলিন ও দুবাইস বিন সাদাকার সম্মিলিত বাহিনী যখন আলেপ্পোকে ঘিরে ফেলেছে, আলেপ্পোতে তখন এমন কোনো নেতা নেই, যিনি এই বিরাট বাহিনীর মোকাবিলা করে নগরীটির প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করবেন।
সত্যিই আলেপ্পো তখন এক কঠিন সংকটের মুখোমুখি!

টিকাঃ
১৬৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২৭।
১৬৫. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২১১।
১৬৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২৮-২২৯।
১৬৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৩০, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২২১ ও Setton: op. cit., 1,p. 423-424.

বাল্ক বিন বাহরামের মোকাবিলায় ২য় বল্ডউইনের উত্তরে আগমন, বাহরামের হাতে পাকড়াও, কারাগারে বন্দি জীবনযাপন—এই পুরোটা সময় ক্রুসেডারদের একটি বাহিনী ভেনিস থেকে আগত একটি বিশাল নৌবহরের সহায়তায় লেবাননের সুর নগরী অবরোধ করে রেখেছিল।
পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সুর ছিল ভূমধ্যসাগরের শাম উপকূলের সেই দুই ইসলামি নগরীর একটি, যা তখনও মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অপর নগরীটি হলো আসকালান। এভাবেও বলা চলে যে, সাগরপথে অবশিষ্ট ইসলামি বিশ্ব হতে প্রেরিত যাবতীয় সহায়তা এ অঞ্চলে পৌঁছার মাত্র দুটি করিডোর তখনও খোলা ছিল, সুর ছিল তার একটি। আর তাই কেবল দুর্ভেদ্য নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণেই নয়; এ বিবেচনায়ও মুসলমানদের কাছে সুর নগরীর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
সুর নগরীর পতন
৫০৬ হিজরি সন (১11২ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে সুর নগরী দামেশকের আমির তুগতেকিনের তত্ত্বাবধানে ছিল। কিন্তু মিশরের নিকৃষ্ট উবায়দি প্রশাসন এ সময় শাম অঞ্চলে মুসলমানদের দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বারবার সুর দখলের চেষ্টা চালায়। তারা ষড়যন্ত্র করে তুগতেকিন নিযুক্ত সুরের আমির মাসউদকে সরিয়ে দেয়। অথচ উন্নত সামরিক দক্ষতা ও জিহাদি চেতনার অধিকারী মাসউদ দীর্ঘ এগারো বছর বীরত্বের সঙ্গে ক্রুসেডারদের প্রতিটি আক্রমণ প্রতিহত করে নগরীটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিলেন। উবায়দি শিয়ারা নগরীটি অধিকার করার পর এর নিরাপত্তা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়। ক্রুসেডাররা সুর নগরী ঘিরে কঠিন অবরোধ আরোপ করে। পানাহারদ্রব্য ফুরিয়ে যেতে থাকায় নগরীটি পতনোন্মুখ হয়ে পড়ে। সংবাদ পেয়ে তুগতেকিন দ্রুত অগ্রসর হলে ত্রিপোলির শাসক পন্স তার বাহিনী নিয়ে তুগতেকিনের পথরোধ করেন। অবশ্য তুগতেকিন শেষ পর্যন্ত ক্রুসেডারদের সঙ্গে সমঝোতা করতে সক্ষম হন। সিদ্ধান্ত হয় নগরীটির নিয়ন্ত্রণ ক্রুসেডারদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে; বিনিময়ে নগরীটির সকল নাগরিককে নিরাপত্তা প্রদান করা হবে। চুক্তি সম্পন্ন হলে ক্রুসেডাররা সুর নগরীতে প্রবেশ করে নগরবাসীকে বের করে দেয়। ক্রুসেডাররা শাম অঞ্চলে আগমনের দীর্ঘ পঁচিশ বছরেরও অধিক সময় পর ৫১৮ হিজরির ২৩ জুমাদাল উলা মাসে (১১২৪ খ্রিষ্টাব্দের জুলাইয়ের শুরুতে) মুসলমানদের বেদখল হয়ে যায় সুরক্ষিত সুর নগরী !
মুসলমানদের জন্য এটি ছিল অনেক বড় এক আঘাত। এদিকে বল্ডউইনের মুক্তি-চুক্তির শর্তপূরণে গড়িমসি আর ওদিকে সুরক্ষিত সুর নগরীর পতন একই সময়ে সংঘটিত দুটি ঘটনায় আঘাত আরও গভীর হয়। মুসলমানরা হেলায় হারিয়ে ফেলে হাতে থাকা অতি মূল্যবান এক সুযোগ!
সুর নগরীর পতনে বল্ডউইনের মনোবল অনেক বেড়ে যায়। তিনি এবার মুসলমানদেরকে প্রদত্ত দুর্গ হস্তান্তরের অঙ্গীকার ভঙ্গ করার পাশাপাশি পুরো চুক্তিই প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত নেন। বল্ডউইন এ সময় তামারতাশের প্রতিপক্ষ দুবাইস বিন সাদাকার সঙ্গে মিত্রতা করেন। অথচ চুক্তিতে তিনি দুবাইসকে দমনে তামারতাশকে সহযোগিতা করার অঙ্গীকার করেছিলেন। এরপর বল্ডউইন বাইতুল মুকাদ্দাস ও এন্টিয়কের বাহিনীকে একসঙ্গে জড়ো করেন। জোসেলিনের নেতৃত্বে এডেসার বাহিনী তাদের সঙ্গে যোগ দেয়, যুক্ত হয় দুবাইস বিন সাদাকার শিয়া বাহিনীও। এই সম্মিলিত বাহিনী আলেপ্পো অবরোধের লক্ষ্যে অগ্রসর হয়। আলেপ্পোর শাসক হুসামুদ্দিন তামারতাশ তখন সম্ভাব্য সংঘাতকেন্দ্র থেকে বহু দূরে মারদিনে অবস্থান করছেন!
নিশ্চিত করেই বলা যায়, বল্ডউইন এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন যে, তার প্রতিপক্ষ মুসলিম নেতা ভুলেও জিম্মিদের হত্যা করবেন না। এর কারণ শুধু এই নয় যে, তামারতাশ শক্তির দিক থেকে দুর্বল ছিলেন কিংবা তিনি জানেন যে, ইসলামি শরিয়তে শিশুহত্যা বৈধ নয়; বরং বল্ডউইন জানতেন যে, তামারতাশ প্রতিপক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগের এমন মূল্যবান ঘুঁটি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাতে রাখতে চেষ্টা করবেন। আর তাই বল্ডউইন পরিকল্পনা করেন, তিনি উল্টো তামারতাশের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবেন এবং চাপ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য শেষ পর্যন্ত তাকে জিম্মিদের ছেড়ে দিতে বাধ্য করবেন।
আলেপ্পোবাসীর অবস্থা তখন চরম শোচনীয়। ২য় বল্ডউইন, জোসেলিন ও দুবাইস বিন সাদাকার সম্মিলিত বাহিনী যখন আলেপ্পোকে ঘিরে ফেলেছে, আলেপ্পোতে তখন এমন কোনো নেতা নেই, যিনি এই বিরাট বাহিনীর মোকাবিলা করে নগরীটির প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করবেন।
সত্যিই আলেপ্পো তখন এক কঠিন সংকটের মুখোমুখি!

টিকাঃ
১৬৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২৭।
১৬৫. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২১১।
১৬৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২৮-২২৯।
১৬৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৩০, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২২১ ও Setton: op. cit., 1,p. 423-424.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 জনসাধারণের পরিচর্যা

📄 জনসাধারণের পরিচর্যা


শেষের কয়েক দশক ধরে আলেপ্পোর সংকট কেবলই ঘনীভূত হয়েছে। প্রথমে রিজওয়ান বিন তুতুশের শাসনামলে, তারপর রিজওয়ান-পুত্র আলপ আরসালান ও ভৃত্য বদরুদ্দিন লুলুর শাসনামলে এবং শেষে ইলগাজি, বাল্ক বিন বাহরাম ও হুসামুদ্দিন তামারতাশের ন্যায় উরতুক শাসকদের আমলে এই পুরোটা সময়ের মধ্যে আলেপ্পোবাসী কখনোই শান্ত-স্থিতিশীল পরিস্থিতির দেখা পায়নি।
অত্যাচারী শাসক রিজওয়ান, তার পুত্র আলপ আরসালান ও বদরউদ্দিন লুলুর আমলের বেদনাদায়ক পরিস্থিতি তো যৌক্তিক ও বোধগম্যই ছিল; প্রশ্ন থেকে যায়-উরতুক পরিবারের শাসকদের রাজত্বকালে আলেপ্পো কেন স্থিতিশীলতার দেখা পায়নি? অথচ আমরা দেখেছি, উরতুক পরিবারের শাসকগণ ছিলেন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জিহাদ-প্রীতি ও ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অধিকারী।
জনসাধারণের পরিচর্যা
বাস্তবতা হলো, ক্রুসেড ইতিহাসে সুকমান বিন উরতুক থেকে শুরু করে ইলগাজি বিন উরতুক হয়ে বাল্ক বিন বাহরাম পর্যন্ত আমরা উরতুক পরিবারের যেসব 'দুর্ভাগা' মুজাহিদ নেতার পদচারণা প্রত্যক্ষ করেছি, তারা সকলেই ছিলেন অযোগ্য-ব্যর্থ জাতির যোগ্য-সফল নেতা!
একজন মহান ও সফল নেতারও ভরাডুবি হতে পারে, যদি তার অধীনস্থ সেনাদল বা জনগণ হয় পরাজিত মানসের অধিকারী। উরতুকি শাসকদের যোদ্ধাবাহিনী বরং জনসাধারণও এসব যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল যুদ্ধলব্ধ সম্পদসহ বিভিন্ন প্রাপ্তির লালসায়, জীবনযাত্রার মান আরও উন্নত ও বিলাসী করার তাড়নায় এবং ছোট ছোট নগর-জনপদ ছেড়ে হাররান ও আলেপ্পোর মতো বৃহৎ নগরীতে বসবাসের লক্ষ্যে। এ জাতীয় মানসিকতা লালনকারী সেনাদল কালেভদ্রে দু-একবার হয়তো সাময়িক বিজয়ের দেখা পায়; কিন্তু চূড়ান্ত ও স্থায়ী বিজয় তাদের ভাগ্যে জোটে না। কোনো ভূখণ্ড বা নগরীতে হয়তো সাময়িক দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়; স্থায়ী কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব কখনোই অর্জিত হয় না। কারণ, বিজয় ও দখলদারিত্বের অব্যবহিত পরেই যখন জান-মালের ওপর কোনো ধরনের হুমকি সৃষ্টি হয়, এ জাতীয় যোদ্ধাবাহিনী তখন কালবিলম্ব না করে বিক্ষিপ্ত ছুটে পালায়।
আর তাই মুসলমানরা যদি স্থায়ী সফলতা, টেকসই কর্তৃত্ব, স্থিতিশীল রাজত্ব ও দুর্যোগকালে দৃঢ় প্রভাবশক্তির অধিকারী হতে চায়, তাহলে প্রথম কর্তব্য হলো, জনসাধারণকে ধর্মীয় অনুরাগ ও জিহাদি চেতনার দীক্ষায় গড়ে তোলা। তখন সুশিক্ষিত-উজ্জীবিত জনগণই এমন বুদ্ধিদীপ্ত সেনাবাহিনী ও দূরদর্শী নেতা গড়ে তুলবে, যারা পারবে জিহাদের কণ্টকাকীর্ণ পথে পদচারণা অব্যাহত রেখে দুর্গম গিরি কান্তার মরু পাড়ি দিতে।
আমরা যদি খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি., সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস রাযি., তারিক বিন যিয়াদ, সালাহুদ্দিন আইয়ুবি, সাইফুদ্দিন কুতুজ ও মুহাম্মাদ আল-ফাতিহের ন্যায় মহান বিজেতাগণের বিজয় ও বিজয়াভিযানের ইতিহাস অধ্যয়ন করি, পর্যালোচনা করি তাদের দিগ্বিজয়ের দাস্তান, তাহলে অবশ্যই প্রত্যক্ষ করব যে, তাদের সমর্থনে ছিল একদল মহৎপ্রাণ জনসাধারণ; যারা লাভ করেছিল উন্নত দীক্ষা ও সমুন্নত পরিচর্যা, যাদের ছিল অনন্যসাধারণ ঈমানি চেতনা ও চারিত্রিক কুশলতা এবং উন্নত সামরিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দক্ষতা।
মূলত সমাজ ও সমাজব্যবস্থার এরূপ পূর্ণাঙ্গ ও বিন্যস্ত কাঠামোই চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত করতে পারে। এক-দুজন চেতনাদীপ্ত বীর সেনাপতি বা আত্মোৎসর্গে উজ্জীবিত ব্যক্তির উত্থানে কখনোই স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ বিজয় অর্জন করা সম্ভব নয়।
এটিই নির্মম বাস্তবতা যে, ক্রুসেড যুদ্ধ ইতিহাসে এখনো পর্যন্ত আমরা এমন কোনো নেতার দেখা পাইনি, যিনি বিষয়টিকে এভাবে বিবেচনা করেছেন। এ পর্যন্ত আমরা যেসব সত্যনিষ্ঠ মহান নেতাকে প্রত্যক্ষ করেছি, তারা সকলেই আপতিত সংকটের সাময়িক সমাধান নিয়ে চিন্তা করেছেন, জরুরি অবস্থার জরুরি সমাধান বাস্তবায়নে সচেষ্ট থেকেছেন। সন্দেহ নেই, এ ধরনের কর্মপন্থায় আপতিত সংকট থেকে উত্তরণের একনিষ্ঠ ও সর্বোচ্চ প্রচেষ্টাই থাকে; কিন্তু তাতে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে গঠনমূলক কোনো পরিকল্পনা থাকে না, থাকে না সুদীর্ঘকাল রাষ্ট্রকে এ জাতীয় সমস্যা হতে নিরাপদ রাখার নিশ্চয়তাদানকারী কোনো সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ।
আমাদের যাপিত কালেও আমরা মুসলিম উম্মাহ এই একই সমস্যায় আক্রান্ত। বর্তমানে আমরা যাদেরকে ফিলিস্তিন, ইরাক বা অধিকৃত অন্যান্য ইসলামি ভূখণ্ডের বিষয়ে উদ্যোগী হতে দেখি, তারাও তাদের চিন্তা-পরিকল্পনা ও কর্মতৎপরতা মজলুম ভাইদের কাছে অর্থ, খাদ্য ও চিকিৎসা-সহায়তা পৌঁছানো কিংবা সর্বোচ্চ আক্রান্ত অঞ্চলে গিয়ে লড়াই ও শাহাদাতের প্রতি উদ্বুদ্ধকরণে সীমাবদ্ধ রাখেন। নিঃসন্দেহে এসব কর্মতৎপরতাও কাম্য ও প্রশংসনীয়; কিন্তু কেবল এতটুকুকেই যথেষ্ট মনে করা উচিত নয়। বরং এর পাশাপাশি প্রয়োজন এমন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা প্রণয়ন, যার মাধ্যমে আমরা জাতির জাগরণ ও প্রজন্মের পুনর্গঠনের নিশ্চয়তা লাভ করব। দীক্ষিত সেই প্রজন্মই পারবে স্বপ্ন ও বাস্তবতার মিলন ঘটাতে। মনে রাখতে হবে, কেবল অধিকৃত ভূখণ্ডের স্বাধিকার পুনরুদ্ধার করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রতিটি অর্জনকে ধরে রাখার অব্যাহত প্রচেষ্টা এবং স্থায়ী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার টেকসই পরিকল্পনা; প্রয়োজন পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দ্বীন প্রচারের দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা।
দেখুন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কি জীবনে কত গভীর ও মর্মসমৃদ্ধ শব্দে মুষ্টিমেয় সাহাবায়ে কেরামের জামাতকে উজ্জীবিত করেছেন, শাণিত করেছেন তাদের সাহসের ধার, সমুন্নত করেছেন তাদের আকাঙ্ক্ষা ও সংকল্প! নবীজি তাদেরকে কেবল মক্কাবাসীর নিপীড়ন থেকে নিষ্কৃতি লাভের সম্ভাবনার আশা শুনিয়েই ক্ষান্ত হননি; বরং এ বিষয়ে তাদেরকে নিশ্চিন্ত করেছেন এবং আরও অগ্রসর হয়ে তাদেরকে চমৎকার স্বপ্নের কথা শুনিয়েছেন। নবীজি তাদেরকে বলেছেন-
«وَاللَّهِ لَيُتِمَّنَّ هَذَا الأَمْرَ، حَتَّى يَسِيرَ الرَّاكِبُ مِنْ صَنْعَاءَ إِلَى حَضْرَمَوْتَ، لَا يَخَافُ إِلَّا اللَّهَ، أَوِ الذِّئْبَ عَلَى غَنَمِهِ، وَلَكِنَّكُمْ تَسْتَعْجِلُوْنَ»
আল্লাহর শপথ, তিনি অবশ্যই এ দ্বীনকে পূর্ণতা দান করবেন। তখন একজন মুসাফির সানআ থেকে হাজরামাউত পর্যন্ত (নিরাপদে) সফর করবে। পথিমধ্যে সে তার মেষপালে নেকড়ের আক্রমণের আশঙ্কা ছাড়া (কোনো মানুষের) অন্য কোনো অনিষ্টতার আশঙ্কা করবে না এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করবে না। কিন্তু তোমরা (ওই সময়ের জন্য প্রতীক্ষা না করে) তাড়াহুড়া করছ।
এমনকি নবীজি তাদেরকে সুস্পষ্ট ভাষায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—
يَا أَيُّهَا النَّاسُ قُوْلُوا: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، تُفْلِحُوا»
লোকসকল, বলো—আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই; নিশ্চিত সফলতা লাভ করবে।
প্রিয়নবী তার চাচা আবু তালিবকে বলেছিলেন, 'আমি তাদের কাছে কেবল একটি কালিমার স্বীকৃতি দাবি করছি। তারা আমার আহ্বানে সাড়া দিলে পুরো আরবজাতি তাদের বশীভূত হয়ে যাবে আর অনারবরা তাদেরকে জিজিয়া প্রদান করবে।'
আবু তালিব অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করেছিলেন, 'মাত্র একটি বাক্য?!'
-হ্যাঁ, একটি বাক্য। চাচা! আপনারা কেবল বলুন, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।' নবীজি নিষ্কম্প কন্ঠে উত্তর দিয়েছিলেন।
আল্লাহর নবী কখন এই নিশ্চিত ঘোষণা করেছিলেন?! যখন তিনি ও তার গুটিকয়েক সঙ্গী ছিলেন মক্কায় অবরুদ্ধ; বিজয় ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার যাবতীয় বাহ্যিক উপায় ও বস্তু-উপকরণশূন্য!
সুতরাং জাতিগঠনে ও প্রজন্মের বিনির্মাণে এমন কিছু নেতা, সংস্কারক, পথপ্রদর্শক ও আলিমের প্রয়োজন, যারা বিশ্বাসীদের স্বপ্নের পরিধি বিস্তৃত করবেন এবং সুদৃঢ় ভিত্তির আলোকে জনসাধারণের দীক্ষা ও পরিচর্যায় উদ্যোগী হবেন। তারা নিজেদের কর্মপদ্ধতি আহরণ করবেন প্রিয় নবীজির সিরাত এবং উম্মাহর ইতিহাসের মহান সংস্কারক ও সংগ্রামী যোদ্ধাদের জীবনাদর্শ হতে। তারাই পারবেন পৃথিবীতে ইসলামকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে।
তবে স্বীকার করতেই হবে যে, চলমান সংকটকালে উরতুকিরা যতটুকু অবদান রেখেছে, তারও প্রয়োজন ছিল। তাদের কর্মপ্রচেষ্টা সাময়িক ও অপূর্ণ হলেও নিঃসন্দেহে প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা লাভের উপযুক্ত। অন্য অনেকে যখন দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য প্রদর্শন করেছিল, উরতুক পরিবারের মহান নেতৃবৃন্দ তখন প্রতিরোধের ঝান্ডা উড্ডীন করেছেন এবং শত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও জিহাদের বন্ধুর পথে পদচারণা অব্যাহত রেখেছেন। তারা বিভিন্ন যুদ্ধে ক্রুসেডারদের পরাজিত করে ইসলামি ভূখণ্ডে ক্রুসেডারদের আগ্রাসী সম্প্রসারণ প্রচেষ্টায় কিছুটা হলেও বাধা সৃষ্টি করতে পেরেছেন। মহান উরতুকি নেতৃবৃন্দ নিজেরা যদিও মনজিলে পৌঁছতে পারেননি; কিন্তু পরবর্তীদের জন্য মনজিলে পৌঁছার পথ সুগম করেছেন। তাদের এ অবদানও অনস্বীকার্য যে, ক্রুসেড আগ্রাসনের শিকার হতে পারত এমন হাজারো প্রাণ তাদের ওসিলায় বেঁচে গেছে এবং বিভিন্ন জনপদ সম্ভাব্য ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। জাতির শিক্ষা-দীক্ষা ও পরিচর্যায় কোনো সচেতন নেতার নিষ্ঠাপূর্ণ কর্মপ্রচেষ্টার পরবর্তীকালে যদি উরতুকিদের আবির্ভাব ঘটত, তাহলে হয়তো তাদের কর্ম-অবদান আরও ব্যাপক-বিস্তৃত হতো এবং তাদের ইতিহাসও ভিন্নভাবে লেখা হতো। কিন্তু পৃথিবীর সবকিছু তো সুনির্ধারিত নিয়তির অদৃশ্য মায়াজালে আবদ্ধ!

টিকাঃ
১৬৮. ইমাম বুখারি, সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৪১৬, ইমাম আহমাদ, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২১১১০, ইমাম আবু দাউদ, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২৬৪৯, ইমাম ইবনে হিব্বان আল-বুসতি, সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ২৮৯৭।
১৬৮. ইমাম আহমাদ, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১৬০৬৬, হাকিম, মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস নং ৪২১৯, ইবনে খুযায়মা, সহিহ ইবনে খুযায়মা, হাদিস নং ১৫৯ ও ইমাম ইবনে হিব্বান আল-বুসতি, সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৬৫৬২।
১৭০. ইমাম তিরমিজি, সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৩২৩২। তিরমিজি রহ. হাদিসটিকে 'হাসান' বলেছেন।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 মসুল-আলেপ্পো একক রাজ্য!

📄 মসুল-আলেপ্পো একক রাজ্য!


ফিরে যাই আলেপ্পোবাসীর কাছে!
শত্রুবাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ আলেপ্পোবাসী নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ে। তারা স্পষ্টতই অনুভব করে যে, তাদের না আছে শক্তিশালী কোনো নেতা, না আছে নির্ভরযোগ্য বহিঃসংযোগ। শাসক হিসেবে যিনি তাদের ওপর চেপে বসেছেন, সেই হুসামুদ্দিন তামারতাশ শাসনকাজে যথেষ্ট দুর্বল। তিনি অবস্থান করছেন আক্রান্ত এলাকা থেকে নিরাপদ দূরত্বে। আর যদি তিনি তার বাহিনী নিয়ে বেরিয়েও আসেন, তবুও তার দুর্বল শক্তি নিয়ে কিছুতেই প্রতিপক্ষকে প্রতিরোধ করতে পারবেন না। আর বাস্তব কথা হলো, তার ক্রুসেডারদের মোকাবিলা করার কোনো আগ্রহই নেই। অথচ জিহাদ এক কঠিন সংগ্রামের নাম; এ পথে কেবল সে-ই অবিচল থাকতে পারে, যার শুধু আগ্রহ নয়; আছে জিহাদ-অনুরাগ ও শাহাদাতের দুর্নিবার আকর্ষণ।
সবকিছু বিবেচনা করে আলেপ্পোবাসী বাইরের এমন কোনো নেতার কাছে সাহায্যপ্রার্থনার সিদ্ধান্ত নেয়, যিনি আলেপ্পো রাজ্যের লাগাম হাতে তুলে নিলে শত্রুপক্ষ সুরক্ষিত আলেপ্পো হতে অবরোধ প্রত্যাহার করে প্রস্থান করতে বাধ্য হবে।
প্রশ্ন হলো—তারা সাহায্যপ্রার্থনা করবে কার কাছে?! চারপাশের অধিকাংশ নেতাই যে ভীরু-উদাসীন, নিতান্তই দুর্বল! আলেপ্পোবাসীর সামনে তুলনামূলক উপযুক্ত দুটি বিকল্প ছিল। এক. দামেশকের অধিপতি তুগতেকিন। দুই. মসুলের প্রশাসক আক সুনকুর আল-বুরসুকি।
তুগতেকিন যদিও উল্লেখযোগ্য সামরিক শক্তির অধিকারী ছিলেন এবং দীর্ঘকাল ধরে দামেশকের শাসনভার আগলে রেখেছিলেন; কিন্তু তাকে কাঙ্ক্ষিত নেতা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ আলেপ্পোবাসীর ছিল না। কারণ, সব সময়ই তিনি বহিঃসাহায্যের মুখাপেক্ষী থাকতেন। এমনকি ইতিপূর্বে তিনি দুর্বল পরিস্থিতিতে ক্রুসেডারদের সঙ্গেও মিত্রতা করেছিলেন। এখন যে ক্রুসেডার বাহিনী আলেপ্পো অবরোধ করেছে, তারা তো আলেপ্পোর কাছেই অবস্থানকারী তুগতেকিনের সামরিক শক্তিকে গোনায় না ধরেই এখানে এসেছে। এসব দিক বিবেচনা করে আলেপ্পোবাসী উপলব্ধি করে যে, তুগতেকিনের প্রভাব কিছুতেই ক্রুসেডারদের সন্ত্রস্ত করতে পারবে না এবং তাদেরকে বিফল মনোরথে ফিরে যেতে বাধ্য করতেও পারবে না।
সম্ভাব্য দ্বিতীয় বিকল্প আক সুনকুরের অবস্থা ছিল এর বিপরীত। যদিও এ অঞ্চলে তার সমৃদ্ধ অতীত ইতিহাস ছিল না, উল্টো প্রথমবারের প্রশাসক আমলে ক্রুসেডারদের কাছে পরাজিত হওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল; কিন্তু তিনি এমন কিছু ব্যতিক্রমী গুণ-বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন, যা তুগতেকিনের তুলনায় তার পাল্লা ভারী করেছিল। যেমন :
১. সুউচ্চ সততা ও তাকওয়া গুণের অধিকারী হওয়ায় আক সুনকুর জনসাধারণের সঙ্গে ন্যায়, উদার ও অনুগ্রহপূর্ণ আচরণ করতেন। আলেপ্পোর জনসাধারণ তো বিগত কয়েক দশক ধরে তাদের নেতাদের মাঝে এসব গুণের অভাবই অনুভব করে আসছিল।
২. তার অধীনে ছিল মসুলের শক্তিশালী সেনাদল। মসুলবাহিনীর শক্তিমত্তার এটিও অন্যতম প্রমাণ যে, এ বাহিনীর সদস্য ছিলেন সমকালীন প্রসিদ্ধ সেনাপতি ইমাদুদ্দিন জিনকি, যার বীরত্বের খ্যাতি তৎকালীন মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল।
৩. তার অধীনে ছিল মসুলের জিহাদ-অনুরাগী সচেতন জনসাধারণ। এ কারণেই তার বাহিনী ছিল সমকালীন অন্যান্য বাহিনীর চেয়ে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। মসুলের যোদ্ধারা জানত কীভাবে ক্ষমতা ও অর্থের মোহ উপেক্ষা করে আল্লাহর জন্য লড়াই করতে হয়।
৪. সেলজুক সুলতান মাহমুদের সঙ্গে আক সুনকুরের চমৎকার সম্পর্ক ছিল, ছিল ব্যক্তিগত সম্পর্কও। এদিক থেকে বিবেচনা করলে সমকালীন মুসলিম বিশ্বের সর্ববৃহৎ ও সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের সমর্থন আক সুনকুরের পক্ষে ছিল।
৫. আক সুনকুরের হাতে আলেপ্পোর শাসনভার তুলে দেওয়া হলে তুগতেকিনের সমরশক্তির সঙ্গে নতুন শক্তির সম্মিলনে এ অঞ্চলে মুসলমানদের শক্তি মজবুত হবে। ইতিপূর্বে মওদুদের আমলেও দামেশক-মসুল ঐক্যবদ্ধ সম্পর্কের কারণে এ অঞ্চলে মুসলমানদের মজবুত অবস্থান সৃষ্টি হয়েছিল। আবারও যদি সেই ঐক্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে আর তার সঙ্গে যুক্ত হয় আলেপ্পোর সামরিক শক্তি, তাহলে ক্রুসেডাররা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে প্রস্থান করবে এবং এতে মুসলমানদের বিজয় নিশ্চিত হবে বলেই প্রতীয়মান হয়।
সার্বিক বিচারে আক সুনকুরের পাল্লা ভারী হওয়ায় আলেপ্পোবাসী তৎক্ষণাৎ তার কাছে সাহায্যবার্তা পাঠিয়ে তাকে ঐতিহ্যবাহী আলেপ্পো নগরীর শাসনভার গ্রহণে আগমনের আহ্বান জানায়।
আক সুনকুর চিন্তা করে দেখেন যে, এটি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখার এক 'বিনামূল্য' সুযোগ। এদিকে সুলতান মাহমুদও ইতিপূর্বে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাই তিনি আলেপ্পোবাসীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে দ্রুত মসুল থেকে রওনা হন এবং ৫১৮ হিজরির জিলহজ মাসে (১১২৫ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে) আলেপ্পোতে পৌঁছে রাজ্যটিকে মসুলের সঙ্গে যুক্ত করে নেন। বড় দুটি রাজ্য মিলে এবার গঠিত হয় একক বৃহৎ রাজ্য।
মালাতিয়া মারদিন আহলাত সুমাইসাত মারআশ আলবেরা মপসুয়েসটিয়া এডেসা আদানা তিল-বাশির সারুজ সিনজার মসুল হাররান ইসকানদারুন হারিম এন্টিয়ক মাআ’রাতুন- আসারিব দুর্গ কারমানবিজ ইরবিল লাতাকিয়া জাবালা নোমান আলেপ্পো ভূমধ্যসাগর কিননাসরিন বানিয়াস শাইজার হামা তারতুস ইরকা হিমস আলেপ্পো রাজ্য মসুল রাজ্য
মানচিত্র নং-২৬ মসুল-আলেপ্পো একক রাজ্য
মহান মুজাহিদ বাল্ক বিন বাহরামের শাহাদাত, উল্লেখযোগ্য কোনো বিনিময় ছাড়াই ২য় বল্ডউইনের মুক্তি, এরপর বল্ডউইন ও তার সহযোগীদের আলেপ্পো অবরোধ ইত্যাদি দুঃখজনক ঘটনাপ্রবাহ ও অনিষ্টের আড়ালেই নিহিত ছিল এক কল্যাণের বার্তা-গুরুত্বপূর্ণ দুই অঞ্চল আলেপ্পো ও মসুলের ঐক্য। প্রাথমিক পর্যায়ে এ ঐক্য যদিও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল বয়ে আনতে পারেনি; কিন্তু এর মাধ্যমে রাজ্যদুটির ঐক্যের মূল্য ও গুরুত্ব সকলের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে যায়। আর তাই এই ঘটনাকে পরবর্তীকালে সংঘটিত উভয় রাজ্যের অতি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ঐক্যের বীজরূপে বিবেচনা করা যেতে পারে।
যদি প্রশ্ন করা হয়, উভয় রাজ্যের একীভূতকরণকে এতটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবার কারণ কী, তাহলে তার উত্তর হচ্ছে-বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকেই এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেমন:
১. যেহেতু মসুল ও আলেপ্পো রাজ্য ভৌগোলিক দিক থেকে পরস্পর সংযুক্ত ছিল এবং মাঝে অন্য কোনো রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল না, তাই এই একীকরণকে অভিহিত করা যায় 'ইরাকের সঙ্গে সামরিক সংযোগ-সেতু' হিসেবে। শুধু ইরাক নয়; এর মাধ্যমে সেলজুকদের মূলকেন্দ্র পারস্যসহ ইসলামি বিশ্বের পুরো প্রাচ্য অংশের সঙ্গে ক্রুসেডারদের বিচরণভূমি শাম অঞ্চলের সংযোগ স্থাপিত হয়।
২. মসুলে জাগ্রত ছিল প্রকৃত জিহাদের আহ্বান। মসুলের সঙ্গে আলেপ্পো যুক্ত হওয়ায় আলেপ্পোতেও জিহাদি চেতনা বিস্তারের আশা তৈরি হয়। শুধু আলেপ্পো নয়; হতে পারে একে কেন্দ্র করে অনেক বছর ধরে এ জাতীয় চেতনাশূন্য পুরো শাম অঞ্চলে এক নতুন জোয়ার সৃষ্টি হবে।
৩. রাজ্যদুটির ছিল প্রচুর জনবল ও সামরিক শক্তি। তাই এ ঐক্যের মাধ্যমে ক্রুসেডারদের মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী বাহিনী গঠিত হওয়া নিশ্চিত হয়।
৪. যেহেতু মসুল ছিল সেলজুক সালতানাত ও আব্বাসি খিলাফতের অধীনস্থ, তাই মসুলের সঙ্গে আলেপ্পোর সংযুক্তির ফলে আলেপ্পোর দায়িত্ব কাগজে-কলমে সেলজুক সালতানাত ও আব্বাসি খিলাফতের ওপরও অর্পিত হয়। কারণ, এটি কেবল সহায়তা চুক্তি বা জিহাদের অঙ্গনে স্বেচ্ছা-সহযোগিতা ছিল না; ছিল পুরোপুরি রাজ্যভুক্তি।
৫. ইরাকের সামরিক শক্তি সব সময়ই শাম অঞ্চলে কোনো অগ্রবর্তী ঘাঁটি না থাকার অভাব বোধ করে আসছিল। আমাদের নিশ্চয়ই স্মরণ আছে যে, মওদুদ রহ. যখন এ অঞ্চলে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসেছিলেন আর আলেপ্পোর শাসক রিজওয়ান তার সামনে নগরদ্বার বন্ধ করে দিয়েছিলেন, তখন মওদুদ এ অঞ্চলে একটি ঘাঁটির অভাব রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুভব করেছিলেন। এই একীকরণের মাধ্যমে এ সমস্যারও সমাধান হয়।
৬. এর মাধ্যমে আলেপ্পো ও শাম অঞ্চলের জনসাধারণের আকিদা ও চিন্তাগত পরিশুদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষ করে মসুল ও বাগদাদসহ পুরো ইরাক অঞ্চল থেকে উলামায়ে কেরামের আগমনের বিরাট সুযোগ সৃষ্টি হয়। পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে—শামের দুই বৃহৎ নগরী আলেপ্পো ও দামেশকের বিভিন্ন অঙ্গনে শিয়া বাতিনিদের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে অঞ্চলদুটির জনসাধারণের চিন্তা-চেতনায় ব্যাপক বিকৃতি সাধিত হয়েছিল।
এই হলো মসুল-আলেপ্পো একীকরণের ইতিবাচক কিছু দিক। আর এ কারণেই সমকালীন নিষ্ঠাবান মুসলমানগণ এই পদক্ষেপকে সাদরে স্বাগত জানায়। অতীত ঐতিহাসিকগণের কলমে যেমন বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে, উঠে এসেছে সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত সব যুগের লেখক-ঐতিহাসিকদের বিশ্লেষণেই। ঐক্য যখন যেখানেই হোক, নিঃসন্দেহে তা গুরুত্ব ও উদ্যাপনের দাবিদার!

টিকাঃ
১৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৩০।
১৭১. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২১১-২১২ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২২৮।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 আক সুনকুর আল-বুরসুকির শহিদি মৃত্যু

📄 আক সুনকুর আল-বুরসুকির শহিদি মৃত্যু


দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার জন্য আক সুনকুর আলেপ্পোতে প্রবেশ করতেই ক্রুসেডাররা ইরাকি সেলজুক বাহিনীর শক্তিমত্তা এবং ইরাকি বাহিনীর প্রতি আলেপ্পোর জনগণের সমর্থনের বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরে অবরোধ প্রত্যাহার করে প্রস্থান করে। এ কারণে উভয় পক্ষের মধ্যে কোনো সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেনি।
আক সুনকুর নতুন করে আলেপ্পোর প্রশাসনব্যবস্থা বিন্যস্ত করার পর সেখানে নিজের অনুগত একজন প্রশাসক নিযুক্ত করে মসুলে ফিরে আসেন। এর কিছুদিন পরই ৫১৯ হিজরি সনের শুরুতে (১১২৫ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে) তিনি পুনরায় এ অঞ্চলে আগমন করেন। এবার তিনি শাইজারে গিয়ে শাইজারের আমির সুলতান বিন মুনকিযের কাছ থেকে জিম্মি ক্রুসেডারদের নিজের দায়িত্বে নিয়ে নেন। কারণ, চুক্তিতে সুস্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে, চুক্তির কোনো ধারা অমান্য করা হলে মধ্যস্থতাকারী জিম্মিদেরকে আলেপ্পোর শাসকের হাতে তুলে দিতে বাধ্য থাকবেন।
এরপর আক সুনকুর ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সরাসরি রণাঙ্গনে অবতীর্ণ হন। তিনি যুদ্ধের মাধ্যমে কাফারতাব দুর্গ দখল করে নেন। বল্ডউইনের সঙ্গে কৃত চুক্তিতে এ দুর্গটিও মুসলমানদের হাতে তুলে দেওয়ার কথা ছিল। এরপর তিনি যারদানা দুর্গ অবরোধ করেন। আক সুনকুরের অব্যাহত অভিযানে উদ্বিগ্ন হয়ে এন্টিয়ক ২য় বল্ডউইনের কাছে সাহায্যবার্তা পাঠালে বল্ডউইন দ্রুত এ অঞ্চলে ছুটে আসেন। আক সুনকুরের হাতে নিজের কন্যা জিম্মি থাকার বিষয়টিও তাকে দ্রুত আগমনে উদ্বুদ্ধ করে। বল্ডউইনের সঙ্গে পন্সের নেতৃত্বে ত্রিপোলির বাহিনী এবং জোসেলিনের নেতৃত্বে এডেসার সেনাদলও যুক্ত হয়। লড়াই অবশ্যম্ভাবী দেখে আক সুনকুর যারদানার অবরোধ প্রত্যাহার করে যুদ্ধের লক্ষ্যে আলেপ্পোর উত্তরে আযায অঞ্চলে চলে আসেন। আযাযে দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। মুসলিম বাহিনীর সদস্যগণ প্রচণ্ড বিক্রমে লড়াই করলেও দুঃখজনকভাবে পরাজিত হয়। যদিও কিছু কিছু ইতিহাসগ্রন্থে মুসলমানদের শোচনীয় পরাজয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তবে প্রকৃত বিচারে এ যুদ্ধে নিরঙ্কুশ জয়-পরাজয়ের কোনো ঘটনা ঘটেনি। ঐতিহাসিক ইবনুল আছিরের ভাষ্য অনুসারে এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর নিহতের সংখ্যা ছিল মাত্র এক হাজার। তা ছাড়া যুদ্ধের পর উভয় পক্ষের সমঝোতা বৈঠকে মিলিত হওয়ার ঘটনাও দু-পক্ষের তুলনামূলক শক্তি-ভারসাম্য বজায় থাকার বিষয়টি প্রমাণ করে।
সমঝোতা বৈঠকে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তসমূহ গৃহীত হয়।
১. আক সুনকুর জিম্মি ক্রুসেডারদের ২য় বল্ডউইনের কাছে হস্তান্তর করবেন।
২. কাফারতাব দুর্গের নিয়ন্ত্রণ মুসলমানদের হাতে থাকবে।
৩. নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে।
ঐতিহাসিক বর্ণনাসমূহে যুদ্ধবিরতির সময়সীমার সুস্পষ্ট বিবরণ পাওয়া যায় না। অবশ্য এটি নিশ্চিত যে, চুক্তিতে অতি সামান্য সময়ের জন্যই যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কারণ, এর পরপরই আক সুনকুর তার পুত্র ইযযুদ্দিন মাসউদকে আলেপ্পোর দায়িত্ব দিয়ে নিজে দ্রুত মসুলে ফিরে যান এবং নতুন যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বাহিনীর বিন্যাস ও সেনাসমাবেশ শুরু করেন।
আযাযের যুদ্ধে পরাজয় এবং তৎপরবর্তী সমঝোতা-চুক্তি যদিও আপাতদৃষ্টিতে আক সুনকুরের ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল; কিন্তু এ ঘটনা তার নেতৃত্বে কোনো প্রভাব ফেলেনি, এতে তার অবস্থানও সামান্য দুর্বল হয়নি। এ কারণে তার প্রতি সুলতান মাহমুদের আস্থাও নষ্ট হয়নি, জনসাধারণের মনেও তার নিষ্ঠা ও যোগ্যতা নিয়ে কোনো দ্বিধা তৈরি হয়নি। আর তাই এ ঘটনার পরও ক্রুসেডারদের অপবিত্র নখর থেকে ইসলামি ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের অভিযানে তিনি আপামর মুসলিম জনগণের আশার প্রদীপ হয়ে ছিলেন।
যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলে নতুন যুদ্ধ শুরু করার জন্য আক সুনকুর যখন পূর্বপ্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন শাম অঞ্চল থেকে সংবাদ আসে যে, ত্রিপোলির শাসক পন্স মুসলমানদের কাছ থেকে রাফানিয়া (Raphanea) দুর্গ ছিনিয়ে নিয়েছেন। যেহেতু দুর্গটি ছিল হিমস রাজ্যভুক্ত আর হিমস তখন দামেশকের অধিপতি তুগতেকিনের অধিকারে ছিল, তাই প্রকারান্তরে এ ঘটনা ছিল তুগতেকিনের ওপর আঘাত। মৌলিক দুটি কারণে রাফানিয়া দুর্গের নিয়ন্ত্রণ ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত দুর্গটি থেকে ত্রিপোলি নগরীর ওপর নজর রাখা যেত। তাই মুসলমানদের কর্তৃত্বে থাকা দুর্গটিকে ক্রুসেড রাজ্য ত্রিপোলির নিরাপত্তার জন্য হুমকি বিবেচনা করা হতো। দ্বিতীয়ত দুর্গটির অবস্থান ছিল এন্টিয়ক-বাইতুল বাইতুল মুকাদ্দাস যোগাযোগপথের সন্নিকটে। আর তাই দুর্গটির ওপর ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে এন্টিয়কে প্রেরিত যেকোনো সহায়তার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। এ বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য যে, রাফানিয়া দুর্গের পতনে রাজা ২য় বল্ডউইনও পন্সের সঙ্গে শরিক ছিলেন, যা ছিল তার ও আক সুনকুরের মধ্যে সম্পাদিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ফলে উভয়ের মধ্যকার চুক্তিও কার্যত বাতিল হয়ে যায়। এটি ৫২০ হিজরি সনের মধ্যভাগের (১১২৬ খ্রিষ্টাব্দের) ঘটনা।
তুগতেকিন আক সুনকুরের কাছে সহায়তা কামনা করলে তিনি তৎক্ষণাৎ তার বাহিনী নিয়ে ছুটে আসেন। আক সুনকুর তার পুত্র ইযযুদ্দিন মাসউদকে রাফানিয়ায় ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রেরণ করেন আর নিজে রওনা হন এন্টিয়কের অধিভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ আসারিব দুর্গের অবরোধে।
বল্ডউইনও দ্রুত এডেসার শাসক জোসেলিনকে নিয়ে ছুটে আসেন। সন্দেহ নেই, আক সুনকুরের ক্রমবর্ধমান শক্তি, অব্যাহত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প ও দৃঢ়তা, তার প্রতি মুসলিম জনসাধারণের সহানুভূতি ও শাম অঞ্চলের নেতৃবর্গের সমর্থন বল্ডউইনের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল। এ কারণেই তিনি নতুন করে যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রস্তাব দেন। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে নতুন চুক্তি সম্পন্ন হয়। তবে এবার তো তার মূল্য চুকানোর পালা! চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তিনি গুরুত্বপূর্ণ রাফানিয়া দুর্গের নিয়ন্ত্রণ মুসলমানদের হাতে সমর্পণ করেন!
নিঃসন্দেহে এ ফলাফল ছিল আক সুনকুরের জন্য অত্যন্ত সন্তোষজনক। কারণ, বিনা যুদ্ধে কোনো প্রকার শক্তি ক্ষয় না করেই অতি গুরুত্বপূর্ণ রাফানিয়া দুর্গের নিয়ন্ত্রণ মুসলমানদের হাতে ফিরে আসছে। তা ছাড়া যুদ্ধবিরতিকে কাজে লাগিয়ে মুসলমানরা এ সময় নিজেদের পুনঃসেনাবিন্যাস ও অন্যান্য সংস্কারকর্মের সুযোগ পাবে। আর তাই আক সুনকুর বল্ডউইনের প্রস্তাবে সম্মত হয়ে রাফানিয়া দুর্গ গ্রহণ করে নেন। এরপর তিনি পুত্র ইযযুদ্দিন মাসউদকে আলেপ্পোতে রেখে নিজে মসুলে ফিরে যান।
সমকালীন মুসলিম জনসাধারণের প্রত্যাশার দৃষ্টি তখন আক সুনকুরের দিকেই নিবদ্ধ। তিনিই সেই কাঙ্ক্ষিত নেতা, যিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বুক চিতিয়ে টিকে আছেন। নিঃসন্দেহে তার এ ভূমিকা মুসলমানদের হৃদয়ে অনেক বেশি সুখকর অনুভূতি সৃষ্টি করেছিল। তবে ঘটনাপ্রবাহে চোখ-রাখা সকলের হৃদয়েই কিন্তু সুখকর অনুভূতি ছিল না! বিষে-ভরা কিছু দৃষ্টিও তাকে অনুসরণ করছিল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে জ্বলেপুড়ে ছারখার হচ্ছিল বিদ্বেষে পূর্ণ কিছু অন্তর। মহান মুজাহিদ আক সুনকুরের প্রতি ক্রমবর্ধমান জনসমর্থন এবং তাকে ঘিরে মুসলমানদের বুকবাঁধা আশার জোয়ার সবই তারা লক্ষ করছিল।
নিষ্ঠাবান মুসলমানদের উন্নতি ও অগ্রগতিতে কাদের দৃষ্টি ও অন্তর জ্বলতে পারে?! তারা ছিল দুষ্ট বাতিনি শিয়াগোষ্ঠী!
উম্মাহর ঐক্য প্রতিষ্ঠা, জিহাদের ঝান্ডা উত্তোলন ও ক্রুসেডারদের বিতাড়নের লক্ষ্যে সুন্নি মুসলমানদের নিষ্ঠাপূর্ণ প্রচেষ্টায় বাতিনি নামক ইসমাইলি শিয়াদের এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি কখনোই সুস্থির বা আনন্দিত হতে পারেনি। তাই দুষ্ট হৃদয় ও কুটিল মানসিকতার অধিকারী বাতিনিরা এবার জাতির এই নব-আদর্শকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ইতিপূর্বে যেমন তারা সরিয়ে দিয়েছিল আক সুনকুরেরই পূর্বসূরি মওদুদ রহ.-কে, থামিয়ে দিয়েছিল মহান আলিম উজির নিজামুল মুলকের অগ্রযাত্রা!
৫২০ হিজরি সনের ৮ জিলকদ (১১২৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ নভেম্বর) শুক্রবার আক সুনকুর মসুলে ফিরে আসেন। মসুলে ফিরেই তিনি জুমার নামাজ আদায়ের জন্য জামে মসজিদে উপস্থিত হন। আক সুনকুর রহ. সাধারণ জনগণের সঙ্গে প্রথম কাতারে নামাজ পড়ছিলেন। হঠাৎ করেই দশের অধিক বাতিনি ঘাতক একযোগে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ছুরি ও খঞ্জর দ্বারা তাকে উপর্যুপরি আঘাত করতে থাকে। উম্মাহর এই ক্ষণজন্মা বীরপুরুষ তখনই শাহাদাত বরণ করেন। অথচ প্রত্যাশা ছিল মুসলমানরা সেদিন রাফানিয়া দুর্গ পুনরুদ্ধারের আনন্দ উদযাপন করবে!
এ তো জিহাদের পথ! যেমন দুর্গম, তেমনই সুদীর্ঘ! এ পথে পদে পদে হাজারো বাধা, বাধার হিমাদ্রি যেন! কষ্ট ও ক্লেশে ভরা এ পথের দুর্যোগ কখনো শেষ হওয়ার নয়! কিন্তু তারপরও এ জিহাদই চিরদিন ইসলামের সর্বোচ্চ চূড়া ও শ্রেষ্ঠতম আমল হিসেবে বহাল থাকবে।
যে জাতি অন্বেষণ করে সম্মান ও মর্যাদা এবং পুরো পৃথিবীর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব, তাদের কর্তব্য এ জাতীয় দুর্যোগ ও বিপর্যয়ে অভ্যস্ত হওয়া এবং সংগ্রামী অঙ্গনের কোনো প্রবাদপুরুষের বিয়োগে হতাশ না হয়ে অটল-অবিচল থাকা। কারণ, আল্লাহ তাআলা যখন মুসলমানদের হৃদয়ে সততা-নিষ্ঠা ও নির্ভেজাল জিহাদি স্পৃহা প্রত্যক্ষ করেন, তখন তিনি ঝান্ডা বহনের উপযুক্ত বিকল্প তৈরি করে দেন। অনেক সময় এই নতুন ঝান্ডাবাহী হয়ে থাকেন প্রয়াত মহান ব্যক্তির চেয়ে হাজার গুণ মহান ও প্রভাবশালী। এ তো সেই মহান সত্তার নিখুঁত ব্যবস্থাপনা, যিনি যাবতীয় ত্রুটি হতে পবিত্র; তন্দ্রা-উদাসীনতা কিছুই তাঁকে আচ্ছন্ন করতে পারে না!
অবশ্য এরপরও জিহাদ ও পুণ্যের অঙ্গনের মহান কোনো প্রতীক-পুরুষের অন্তর্ধানের পর সাময়িক সংকট সৃষ্টি হতেই পারে। আক সুনকুর রহ.-এর শাহাদাতের প্রায় কাছাকাছি সময়ে এমন আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়, যা মুসলিম বিশ্বের অস্থিরতা ও সংকট আরও ঘনীভূত করে তোলে।
উদাহরণস্বরূপ আক সুনকুরের মৃত্যুর দু-মাসেরও কম সময় পর খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ ও সুলতান মাহমুদের মধ্যে প্রচণ্ড বিরোধ সৃষ্টি হয়। বিরোধরত দু-পক্ষ একসময় যুদ্ধের জন্য মুখোমুখি অবস্থানে চলে যায়। আল্লাহ তাআলা যদি এ ফিতনার মূলোৎপাটন না করতেন, নিশ্চিত করেই উভয় পক্ষে প্রচুর হতাহতের ঘটনা ঘটত। শেষ পর্যন্ত খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ শক্তিশালী সুলতান মাহমুদের কাছে নতি স্বীকার করলে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত হয়ে আসে।

টিকাঃ
১৭০. Guillaume de Tyr, I, p.557.
১৭৪, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৩০।
১৭৫. Runciman:op.cit.,II,p.173
১৭৬. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৩১ ও Foucher de Chartres, p. 471.
১৭৭. Guillaume de Tyr, I, p. 580.
১৭৮. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৩১।
১৭৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৩৪।
১৮০. Guillaume de Tyr,1,p.580.
১৮১. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৩১-২৩২।
১৮২. Grousset: Hist, des Croisades 1, p. 641.
১৮০. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২১৬, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৩২ ও Foucher de Chartres, p.480.
১৮৪. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৩৩।
১৮৫. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২১৪।
১৮৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৩৬ ও শিহাবুদ্দিন আহমাদ বিন আবদুল ওয়াহহাব নুওয়াইরি, নিহায়াতুল আরাব ফী ফুনুনিল আদাব, ২৭/২৬।
১৮৭. আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'সবকিছুর মূল হলো ইসলাম। ইসলামের খুঁটি হলো নামাজ আর সর্বোচ্চ চূড়া হলো জিহাদ।' সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২৬১৬, আস-সুনানুল কুবরা লিন-নাসায়ি, হাদিস নং ১১৩৯৪ ও মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২২০৬৯। [অনুবাদক]
১৮৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৩৭-২৩৯ ও আত-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ২৯-৩০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00