📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ২য় বল্ডউইনের মুক্তি

📄 ২য় বল্ডউইনের মুক্তি


বাল্ক বিন বাহরামের শাহাদাতের পর আলেপ্পোর কর্তৃত্ব চলে যায় ইলগাজির পুত্র হুসামুদ্দিন তামারতাশের হাতে। তিনি আলেপ্পোকে তার রাজ্য মারদিনের সঙ্গে মিলিয়ে নেন। অবশ্য ক্রুসেডারদের সঙ্গে অব্যাহত সংঘাতের কেন্দ্র উত্তপ্ত শাম অঞ্চল থেকে দূরে থাকার উদ্দেশ্যে তিনি বসবাসের জন্য মারদিনকেই বেছে নেন। ঐতিহাসিক ইবনুল আছির রহ.-এর ভাষ্য অনুসারে হুসামুদ্দিন ছিলেন বিলাসী ও আরামপ্রিয় একজন শাসক।
তবে বসবাসের জন্য আলেপ্পোকে এড়াতে পারলেও আরও বড় একটি সমস্যাকে পাশ কাটানোর সুযোগ তামারতাশের ছিল না। ২য় বল্ডউইন যেহেতু আলেপ্পোতে বন্দি ছিলেন, তাই তার ব্যাপারে কর্তৃত্ব তখন তামারতাশেরই হাতে। সুতরাং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্বও ছিল তার কাঁধে।
অবশেষে উভয় পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক মধ্যস্থতার উদ্যোগ গৃহীত হয়। শাইজারের আমির সুলতান বিন মুনকিয মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব পালন করেন। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর উভয় পক্ষ কয়েকটি শর্ত সাপেক্ষে ২য় বল্ডউইনের মুক্তির বিষয়ে সম্মত হয়। শর্তগুলো হলো-
১. মুক্তিপণ হিসেবে ২য় বল্ডউইন আশি হাজার দিনার পরিশোধ করবেন। এর মধ্যে বিশ হাজার দিনার অগ্রীম প্রদান করতে হবে, বাকিটা পরিশোধ করতে হবে বন্দিমুক্তির পর।
২. এন্টিয়ক রাজ্যের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে ২য় বল্ডউইন আযাষ, আসারিব, যারদানা, জাযার ও কাফারতাব দুর্গের নিয়ন্ত্রণ আলেপ্পো রাজ্যের হাতে ফিরিয়ে দেবেন।
৩. রাজা ২য় বল্ডউইন আরব বংশোদ্ভূত শিয়া নেতা দুবাইস বিন সাদাকাকে দমনের বিষয়ে তামারতাশকে সহযোগিতা করবেন।
দুবাইস ইরাকের আব্বাসি খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার পর পালিয়ে জাযিরা অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিল।
৪. শর্ত পূরণের নিশ্চয়তা হিসেবে বল্ডউইন কিছু লোককে মুসলমানদের কাছে জিম্মি রাখবেন। তিনি যতদিন না প্রতিশ্রুত অর্থ ও দুর্গসমূহের নিয়ন্ত্রণ মুসলমানদের বুঝিয়ে দেবেন, ততদিন তারা মুসলমানদের কাছে জিম্মি থাকবে।
জিম্মি হিসেবে ক্রুসেডারদের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নাম নির্ধারণ করা হয়। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল রাজা ২য় বল্ডউইনের পাঁচ বছর বয়সী এক কন্যা এবং এডেসার শাসক জোসেলিনের পুত্র ২য় জোসেলিন। শর্ত ছিল, দাবি পূরণের আগ পর্যন্ত এরা মধ্যস্থতাকারী শাইজারের আমির সুলতান বিন মুনকিযের হেফাজতে থাকবে।
এক বছরেরও অধিক সময় বন্দি থাকার পর অবশেষে ২য় বল্ডউইন মুক্তি লাভ করেন। ছাড়া পেয়ে প্রথমে তিনি এন্টিয়কে গমন করেন এবং সেখানে পৌঁছে এন্টিয়কের গির্জাধ্যক্ষ বার্নার্ড ডি ফালিন্সের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পারস্পরিক আলোচনার পর তারা সিদ্ধান্ত নেন যে, আলেপ্পোর হাতে বিভিন্ন দুর্গ সমর্পণের শর্তটি তারা পালন করবেন না। এরপর বিষয়টি তারা পত্রের মাধ্যমে তামারতাশকে জানিয়ে দেন!

টিকাঃ
১৬০. প্রাগুক্ত, ৯/২২৭।
১৬১. উসামা বিন মুনকিয, আল-ই'তিবার, পৃষ্ঠা: ১২০।
১৬২. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২২১।
১৬৩. উসামা বিন মুনকিয, আল-ই'তিবার, পৃষ্ঠা: ১০৩।

বাল্ক বিন বাহরামের শাহাদাতের পর আলেপ্পোর কর্তৃত্ব চলে যায় ইলগাজির পুত্র হুসামুদ্দিন তামারতাশের হাতে। তিনি আলেপ্পোকে তার রাজ্য মারদিনের সঙ্গে মিলিয়ে নেন। অবশ্য ক্রুসেডারদের সঙ্গে অব্যাহত সংঘাতের কেন্দ্র উত্তপ্ত শাম অঞ্চল থেকে দূরে থাকার উদ্দেশ্যে তিনি বসবাসের জন্য মারদিনকেই বেছে নেন। ঐতিহাসিক ইবনুল আছির রহ.-এর ভাষ্য অনুসারে হুসামুদ্দিন ছিলেন বিলাসী ও আরামপ্রিয় একজন শাসক।
তবে বসবাসের জন্য আলেপ্পোকে এড়াতে পারলেও আরও বড় একটি সমস্যাকে পাশ কাটানোর সুযোগ তামারতাশের ছিল না। ২য় বল্ডউইন যেহেতু আলেপ্পোতে বন্দি ছিলেন, তাই তার ব্যাপারে কর্তৃত্ব তখন তামারতাশেরই হাতে। সুতরাং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্বও ছিল তার কাঁধে।
অবশেষে উভয় পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক মধ্যস্থতার উদ্যোগ গৃহীত হয়। শাইজারের আমির সুলতান বিন মুনকিয মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব পালন করেন। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর উভয় পক্ষ কয়েকটি শর্ত সাপেক্ষে ২য় বল্ডউইনের মুক্তির বিষয়ে সম্মত হয়। শর্তগুলো হলো-
১. মুক্তিপণ হিসেবে ২য় বল্ডউইন আশি হাজার দিনার পরিশোধ করবেন। এর মধ্যে বিশ হাজার দিনার অগ্রীম প্রদান করতে হবে, বাকিটা পরিশোধ করতে হবে বন্দিমুক্তির পর।
২. এন্টিয়ক রাজ্যের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে ২য় বল্ডউইন আযাষ, আসারিব, যারদানা, জাযার ও কাফারতাব দুর্গের নিয়ন্ত্রণ আলেপ্পো রাজ্যের হাতে ফিরিয়ে দেবেন।
৩. রাজা ২য় বল্ডউইন আরব বংশোদ্ভূত শিয়া নেতা দুবাইস বিন সাদাকাকে দমনের বিষয়ে তামারতাশকে সহযোগিতা করবেন।
দুবাইস ইরাকের আব্বাসি খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার পর পালিয়ে জাযিরা অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিল।
৪. শর্ত পূরণের নিশ্চয়তা হিসেবে বল্ডউইন কিছু লোককে মুসলমানদের কাছে জিম্মি রাখবেন। তিনি যতদিন না প্রতিশ্রুত অর্থ ও দুর্গসমূহের নিয়ন্ত্রণ মুসলমানদের বুঝিয়ে দেবেন, ততদিন তারা মুসলমানদের কাছে জিম্মি থাকবে।
জিম্মি হিসেবে ক্রুসেডারদের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নাম নির্ধারণ করা হয়। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল রাজা ২য় বল্ডউইনের পাঁচ বছর বয়সী এক কন্যা এবং এডেসার শাসক জোসেলিনের পুত্র ২য় জোসেলিন। শর্ত ছিল, দাবি পূরণের আগ পর্যন্ত এরা মধ্যস্থতাকারী শাইজারের আমির সুলতান বিন মুনকিযের হেফাজতে থাকবে।
এক বছরেরও অধিক সময় বন্দি থাকার পর অবশেষে ২য় বল্ডউইন মুক্তি লাভ করেন। ছাড়া পেয়ে প্রথমে তিনি এন্টিয়কে গমন করেন এবং সেখানে পৌঁছে এন্টিয়কের গির্জাধ্যক্ষ বার্নার্ড ডি ফালিন্সের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পারস্পরিক আলোচনার পর তারা সিদ্ধান্ত নেন যে, আলেপ্পোর হাতে বিভিন্ন দুর্গ সমর্পণের শর্তটি তারা পালন করবেন না। এরপর বিষয়টি তারা পত্রের মাধ্যমে তামারতাশকে জানিয়ে দেন!

টিকাঃ
১৬০. প্রাগুক্ত, ৯/২২৭।
১৬১. উসামা বিন মুনকিয, আল-ই'তিবার, পৃষ্ঠা: ১২০।
১৬২. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২২১।
১৬৩. উসামা বিন মুনকিয, আল-ই'তিবার, পৃষ্ঠা: ১০৩।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 সুর নগরীর পতন

📄 সুর নগরীর পতন


বাল্ক বিন বাহরামের মোকাবিলায় ২য় বল্ডউইনের উত্তরে আগমন, বাহরামের হাতে পাকড়াও, কারাগারে বন্দি জীবনযাপন—এই পুরোটা সময় ক্রুসেডারদের একটি বাহিনী ভেনিস থেকে আগত একটি বিশাল নৌবহরের সহায়তায় লেবাননের সুর নগরী অবরোধ করে রেখেছিল।
পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সুর ছিল ভূমধ্যসাগরের শাম উপকূলের সেই দুই ইসলামি নগরীর একটি, যা তখনও মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অপর নগরীটি হলো আসকালান। এভাবেও বলা চলে যে, সাগরপথে অবশিষ্ট ইসলামি বিশ্ব হতে প্রেরিত যাবতীয় সহায়তা এ অঞ্চলে পৌঁছার মাত্র দুটি করিডোর তখনও খোলা ছিল, সুর ছিল তার একটি। আর তাই কেবল দুর্ভেদ্য নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণেই নয়; এ বিবেচনায়ও মুসলমানদের কাছে সুর নগরীর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
সুর নগরীর পতন
৫০৬ হিজরি সন (১11২ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে সুর নগরী দামেশকের আমির তুগতেকিনের তত্ত্বাবধানে ছিল। কিন্তু মিশরের নিকৃষ্ট উবায়দি প্রশাসন এ সময় শাম অঞ্চলে মুসলমানদের দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বারবার সুর দখলের চেষ্টা চালায়। তারা ষড়যন্ত্র করে তুগতেকিন নিযুক্ত সুরের আমির মাসউদকে সরিয়ে দেয়। অথচ উন্নত সামরিক দক্ষতা ও জিহাদি চেতনার অধিকারী মাসউদ দীর্ঘ এগারো বছর বীরত্বের সঙ্গে ক্রুসেডারদের প্রতিটি আক্রমণ প্রতিহত করে নগরীটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিলেন। উবায়দি শিয়ারা নগরীটি অধিকার করার পর এর নিরাপত্তা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়। ক্রুসেডাররা সুর নগরী ঘিরে কঠিন অবরোধ আরোপ করে। পানাহারদ্রব্য ফুরিয়ে যেতে থাকায় নগরীটি পতনোন্মুখ হয়ে পড়ে। সংবাদ পেয়ে তুগতেকিন দ্রুত অগ্রসর হলে ত্রিপোলির শাসক পন্স তার বাহিনী নিয়ে তুগতেকিনের পথরোধ করেন। অবশ্য তুগতেকিন শেষ পর্যন্ত ক্রুসেডারদের সঙ্গে সমঝোতা করতে সক্ষম হন। সিদ্ধান্ত হয় নগরীটির নিয়ন্ত্রণ ক্রুসেডারদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে; বিনিময়ে নগরীটির সকল নাগরিককে নিরাপত্তা প্রদান করা হবে। চুক্তি সম্পন্ন হলে ক্রুসেডাররা সুর নগরীতে প্রবেশ করে নগরবাসীকে বের করে দেয়। ক্রুসেডাররা শাম অঞ্চলে আগমনের দীর্ঘ পঁচিশ বছরেরও অধিক সময় পর ৫১৮ হিজরির ২৩ জুমাদাল উলা মাসে (১১২৪ খ্রিষ্টাব্দের জুলাইয়ের শুরুতে) মুসলমানদের বেদখল হয়ে যায় সুরক্ষিত সুর নগরী !
মুসলমানদের জন্য এটি ছিল অনেক বড় এক আঘাত। এদিকে বল্ডউইনের মুক্তি-চুক্তির শর্তপূরণে গড়িমসি আর ওদিকে সুরক্ষিত সুর নগরীর পতন একই সময়ে সংঘটিত দুটি ঘটনায় আঘাত আরও গভীর হয়। মুসলমানরা হেলায় হারিয়ে ফেলে হাতে থাকা অতি মূল্যবান এক সুযোগ!
সুর নগরীর পতনে বল্ডউইনের মনোবল অনেক বেড়ে যায়। তিনি এবার মুসলমানদেরকে প্রদত্ত দুর্গ হস্তান্তরের অঙ্গীকার ভঙ্গ করার পাশাপাশি পুরো চুক্তিই প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত নেন। বল্ডউইন এ সময় তামারতাশের প্রতিপক্ষ দুবাইস বিন সাদাকার সঙ্গে মিত্রতা করেন। অথচ চুক্তিতে তিনি দুবাইসকে দমনে তামারতাশকে সহযোগিতা করার অঙ্গীকার করেছিলেন। এরপর বল্ডউইন বাইতুল মুকাদ্দাস ও এন্টিয়কের বাহিনীকে একসঙ্গে জড়ো করেন। জোসেলিনের নেতৃত্বে এডেসার বাহিনী তাদের সঙ্গে যোগ দেয়, যুক্ত হয় দুবাইস বিন সাদাকার শিয়া বাহিনীও। এই সম্মিলিত বাহিনী আলেপ্পো অবরোধের লক্ষ্যে অগ্রসর হয়। আলেপ্পোর শাসক হুসামুদ্দিন তামারতাশ তখন সম্ভাব্য সংঘাতকেন্দ্র থেকে বহু দূরে মারদিনে অবস্থান করছেন!
নিশ্চিত করেই বলা যায়, বল্ডউইন এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন যে, তার প্রতিপক্ষ মুসলিম নেতা ভুলেও জিম্মিদের হত্যা করবেন না। এর কারণ শুধু এই নয় যে, তামারতাশ শক্তির দিক থেকে দুর্বল ছিলেন কিংবা তিনি জানেন যে, ইসলামি শরিয়তে শিশুহত্যা বৈধ নয়; বরং বল্ডউইন জানতেন যে, তামারতাশ প্রতিপক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগের এমন মূল্যবান ঘুঁটি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাতে রাখতে চেষ্টা করবেন। আর তাই বল্ডউইন পরিকল্পনা করেন, তিনি উল্টো তামারতাশের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবেন এবং চাপ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য শেষ পর্যন্ত তাকে জিম্মিদের ছেড়ে দিতে বাধ্য করবেন।
আলেপ্পোবাসীর অবস্থা তখন চরম শোচনীয়। ২য় বল্ডউইন, জোসেলিন ও দুবাইস বিন সাদাকার সম্মিলিত বাহিনী যখন আলেপ্পোকে ঘিরে ফেলেছে, আলেপ্পোতে তখন এমন কোনো নেতা নেই, যিনি এই বিরাট বাহিনীর মোকাবিলা করে নগরীটির প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করবেন।
সত্যিই আলেপ্পো তখন এক কঠিন সংকটের মুখোমুখি!

টিকাঃ
১৬৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২৭।
১৬৫. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২১১।
১৬৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২৮-২২৯।
১৬৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৩০, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২২১ ও Setton: op. cit., 1,p. 423-424.

বাল্ক বিন বাহরামের মোকাবিলায় ২য় বল্ডউইনের উত্তরে আগমন, বাহরামের হাতে পাকড়াও, কারাগারে বন্দি জীবনযাপন—এই পুরোটা সময় ক্রুসেডারদের একটি বাহিনী ভেনিস থেকে আগত একটি বিশাল নৌবহরের সহায়তায় লেবাননের সুর নগরী অবরোধ করে রেখেছিল।
পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সুর ছিল ভূমধ্যসাগরের শাম উপকূলের সেই দুই ইসলামি নগরীর একটি, যা তখনও মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অপর নগরীটি হলো আসকালান। এভাবেও বলা চলে যে, সাগরপথে অবশিষ্ট ইসলামি বিশ্ব হতে প্রেরিত যাবতীয় সহায়তা এ অঞ্চলে পৌঁছার মাত্র দুটি করিডোর তখনও খোলা ছিল, সুর ছিল তার একটি। আর তাই কেবল দুর্ভেদ্য নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণেই নয়; এ বিবেচনায়ও মুসলমানদের কাছে সুর নগরীর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
সুর নগরীর পতন
৫০৬ হিজরি সন (১11২ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে সুর নগরী দামেশকের আমির তুগতেকিনের তত্ত্বাবধানে ছিল। কিন্তু মিশরের নিকৃষ্ট উবায়দি প্রশাসন এ সময় শাম অঞ্চলে মুসলমানদের দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বারবার সুর দখলের চেষ্টা চালায়। তারা ষড়যন্ত্র করে তুগতেকিন নিযুক্ত সুরের আমির মাসউদকে সরিয়ে দেয়। অথচ উন্নত সামরিক দক্ষতা ও জিহাদি চেতনার অধিকারী মাসউদ দীর্ঘ এগারো বছর বীরত্বের সঙ্গে ক্রুসেডারদের প্রতিটি আক্রমণ প্রতিহত করে নগরীটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিলেন। উবায়দি শিয়ারা নগরীটি অধিকার করার পর এর নিরাপত্তা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়। ক্রুসেডাররা সুর নগরী ঘিরে কঠিন অবরোধ আরোপ করে। পানাহারদ্রব্য ফুরিয়ে যেতে থাকায় নগরীটি পতনোন্মুখ হয়ে পড়ে। সংবাদ পেয়ে তুগতেকিন দ্রুত অগ্রসর হলে ত্রিপোলির শাসক পন্স তার বাহিনী নিয়ে তুগতেকিনের পথরোধ করেন। অবশ্য তুগতেকিন শেষ পর্যন্ত ক্রুসেডারদের সঙ্গে সমঝোতা করতে সক্ষম হন। সিদ্ধান্ত হয় নগরীটির নিয়ন্ত্রণ ক্রুসেডারদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে; বিনিময়ে নগরীটির সকল নাগরিককে নিরাপত্তা প্রদান করা হবে। চুক্তি সম্পন্ন হলে ক্রুসেডাররা সুর নগরীতে প্রবেশ করে নগরবাসীকে বের করে দেয়। ক্রুসেডাররা শাম অঞ্চলে আগমনের দীর্ঘ পঁচিশ বছরেরও অধিক সময় পর ৫১৮ হিজরির ২৩ জুমাদাল উলা মাসে (১১২৪ খ্রিষ্টাব্দের জুলাইয়ের শুরুতে) মুসলমানদের বেদখল হয়ে যায় সুরক্ষিত সুর নগরী !
মুসলমানদের জন্য এটি ছিল অনেক বড় এক আঘাত। এদিকে বল্ডউইনের মুক্তি-চুক্তির শর্তপূরণে গড়িমসি আর ওদিকে সুরক্ষিত সুর নগরীর পতন একই সময়ে সংঘটিত দুটি ঘটনায় আঘাত আরও গভীর হয়। মুসলমানরা হেলায় হারিয়ে ফেলে হাতে থাকা অতি মূল্যবান এক সুযোগ!
সুর নগরীর পতনে বল্ডউইনের মনোবল অনেক বেড়ে যায়। তিনি এবার মুসলমানদেরকে প্রদত্ত দুর্গ হস্তান্তরের অঙ্গীকার ভঙ্গ করার পাশাপাশি পুরো চুক্তিই প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত নেন। বল্ডউইন এ সময় তামারতাশের প্রতিপক্ষ দুবাইস বিন সাদাকার সঙ্গে মিত্রতা করেন। অথচ চুক্তিতে তিনি দুবাইসকে দমনে তামারতাশকে সহযোগিতা করার অঙ্গীকার করেছিলেন। এরপর বল্ডউইন বাইতুল মুকাদ্দাস ও এন্টিয়কের বাহিনীকে একসঙ্গে জড়ো করেন। জোসেলিনের নেতৃত্বে এডেসার বাহিনী তাদের সঙ্গে যোগ দেয়, যুক্ত হয় দুবাইস বিন সাদাকার শিয়া বাহিনীও। এই সম্মিলিত বাহিনী আলেপ্পো অবরোধের লক্ষ্যে অগ্রসর হয়। আলেপ্পোর শাসক হুসামুদ্দিন তামারতাশ তখন সম্ভাব্য সংঘাতকেন্দ্র থেকে বহু দূরে মারদিনে অবস্থান করছেন!
নিশ্চিত করেই বলা যায়, বল্ডউইন এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন যে, তার প্রতিপক্ষ মুসলিম নেতা ভুলেও জিম্মিদের হত্যা করবেন না। এর কারণ শুধু এই নয় যে, তামারতাশ শক্তির দিক থেকে দুর্বল ছিলেন কিংবা তিনি জানেন যে, ইসলামি শরিয়তে শিশুহত্যা বৈধ নয়; বরং বল্ডউইন জানতেন যে, তামারতাশ প্রতিপক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগের এমন মূল্যবান ঘুঁটি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাতে রাখতে চেষ্টা করবেন। আর তাই বল্ডউইন পরিকল্পনা করেন, তিনি উল্টো তামারতাশের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবেন এবং চাপ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য শেষ পর্যন্ত তাকে জিম্মিদের ছেড়ে দিতে বাধ্য করবেন।
আলেপ্পোবাসীর অবস্থা তখন চরম শোচনীয়। ২য় বল্ডউইন, জোসেলিন ও দুবাইস বিন সাদাকার সম্মিলিত বাহিনী যখন আলেপ্পোকে ঘিরে ফেলেছে, আলেপ্পোতে তখন এমন কোনো নেতা নেই, যিনি এই বিরাট বাহিনীর মোকাবিলা করে নগরীটির প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করবেন।
সত্যিই আলেপ্পো তখন এক কঠিন সংকটের মুখোমুখি!

টিকাঃ
১৬৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২৭।
১৬৫. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২১১।
১৬৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২৮-২২৯।
১৬৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৩০, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২২১ ও Setton: op. cit., 1,p. 423-424.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 জনসাধারণের পরিচর্যা

📄 জনসাধারণের পরিচর্যা


শেষের কয়েক দশক ধরে আলেপ্পোর সংকট কেবলই ঘনীভূত হয়েছে। প্রথমে রিজওয়ান বিন তুতুশের শাসনামলে, তারপর রিজওয়ান-পুত্র আলপ আরসালান ও ভৃত্য বদরুদ্দিন লুলুর শাসনামলে এবং শেষে ইলগাজি, বাল্ক বিন বাহরাম ও হুসামুদ্দিন তামারতাশের ন্যায় উরতুক শাসকদের আমলে এই পুরোটা সময়ের মধ্যে আলেপ্পোবাসী কখনোই শান্ত-স্থিতিশীল পরিস্থিতির দেখা পায়নি।
অত্যাচারী শাসক রিজওয়ান, তার পুত্র আলপ আরসালান ও বদরউদ্দিন লুলুর আমলের বেদনাদায়ক পরিস্থিতি তো যৌক্তিক ও বোধগম্যই ছিল; প্রশ্ন থেকে যায়-উরতুক পরিবারের শাসকদের রাজত্বকালে আলেপ্পো কেন স্থিতিশীলতার দেখা পায়নি? অথচ আমরা দেখেছি, উরতুক পরিবারের শাসকগণ ছিলেন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জিহাদ-প্রীতি ও ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অধিকারী।
জনসাধারণের পরিচর্যা
বাস্তবতা হলো, ক্রুসেড ইতিহাসে সুকমান বিন উরতুক থেকে শুরু করে ইলগাজি বিন উরতুক হয়ে বাল্ক বিন বাহরাম পর্যন্ত আমরা উরতুক পরিবারের যেসব 'দুর্ভাগা' মুজাহিদ নেতার পদচারণা প্রত্যক্ষ করেছি, তারা সকলেই ছিলেন অযোগ্য-ব্যর্থ জাতির যোগ্য-সফল নেতা!
একজন মহান ও সফল নেতারও ভরাডুবি হতে পারে, যদি তার অধীনস্থ সেনাদল বা জনগণ হয় পরাজিত মানসের অধিকারী। উরতুকি শাসকদের যোদ্ধাবাহিনী বরং জনসাধারণও এসব যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল যুদ্ধলব্ধ সম্পদসহ বিভিন্ন প্রাপ্তির লালসায়, জীবনযাত্রার মান আরও উন্নত ও বিলাসী করার তাড়নায় এবং ছোট ছোট নগর-জনপদ ছেড়ে হাররান ও আলেপ্পোর মতো বৃহৎ নগরীতে বসবাসের লক্ষ্যে। এ জাতীয় মানসিকতা লালনকারী সেনাদল কালেভদ্রে দু-একবার হয়তো সাময়িক বিজয়ের দেখা পায়; কিন্তু চূড়ান্ত ও স্থায়ী বিজয় তাদের ভাগ্যে জোটে না। কোনো ভূখণ্ড বা নগরীতে হয়তো সাময়িক দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়; স্থায়ী কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব কখনোই অর্জিত হয় না। কারণ, বিজয় ও দখলদারিত্বের অব্যবহিত পরেই যখন জান-মালের ওপর কোনো ধরনের হুমকি সৃষ্টি হয়, এ জাতীয় যোদ্ধাবাহিনী তখন কালবিলম্ব না করে বিক্ষিপ্ত ছুটে পালায়।
আর তাই মুসলমানরা যদি স্থায়ী সফলতা, টেকসই কর্তৃত্ব, স্থিতিশীল রাজত্ব ও দুর্যোগকালে দৃঢ় প্রভাবশক্তির অধিকারী হতে চায়, তাহলে প্রথম কর্তব্য হলো, জনসাধারণকে ধর্মীয় অনুরাগ ও জিহাদি চেতনার দীক্ষায় গড়ে তোলা। তখন সুশিক্ষিত-উজ্জীবিত জনগণই এমন বুদ্ধিদীপ্ত সেনাবাহিনী ও দূরদর্শী নেতা গড়ে তুলবে, যারা পারবে জিহাদের কণ্টকাকীর্ণ পথে পদচারণা অব্যাহত রেখে দুর্গম গিরি কান্তার মরু পাড়ি দিতে।
আমরা যদি খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি., সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস রাযি., তারিক বিন যিয়াদ, সালাহুদ্দিন আইয়ুবি, সাইফুদ্দিন কুতুজ ও মুহাম্মাদ আল-ফাতিহের ন্যায় মহান বিজেতাগণের বিজয় ও বিজয়াভিযানের ইতিহাস অধ্যয়ন করি, পর্যালোচনা করি তাদের দিগ্বিজয়ের দাস্তান, তাহলে অবশ্যই প্রত্যক্ষ করব যে, তাদের সমর্থনে ছিল একদল মহৎপ্রাণ জনসাধারণ; যারা লাভ করেছিল উন্নত দীক্ষা ও সমুন্নত পরিচর্যা, যাদের ছিল অনন্যসাধারণ ঈমানি চেতনা ও চারিত্রিক কুশলতা এবং উন্নত সামরিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দক্ষতা।
মূলত সমাজ ও সমাজব্যবস্থার এরূপ পূর্ণাঙ্গ ও বিন্যস্ত কাঠামোই চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত করতে পারে। এক-দুজন চেতনাদীপ্ত বীর সেনাপতি বা আত্মোৎসর্গে উজ্জীবিত ব্যক্তির উত্থানে কখনোই স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ বিজয় অর্জন করা সম্ভব নয়।
এটিই নির্মম বাস্তবতা যে, ক্রুসেড যুদ্ধ ইতিহাসে এখনো পর্যন্ত আমরা এমন কোনো নেতার দেখা পাইনি, যিনি বিষয়টিকে এভাবে বিবেচনা করেছেন। এ পর্যন্ত আমরা যেসব সত্যনিষ্ঠ মহান নেতাকে প্রত্যক্ষ করেছি, তারা সকলেই আপতিত সংকটের সাময়িক সমাধান নিয়ে চিন্তা করেছেন, জরুরি অবস্থার জরুরি সমাধান বাস্তবায়নে সচেষ্ট থেকেছেন। সন্দেহ নেই, এ ধরনের কর্মপন্থায় আপতিত সংকট থেকে উত্তরণের একনিষ্ঠ ও সর্বোচ্চ প্রচেষ্টাই থাকে; কিন্তু তাতে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে গঠনমূলক কোনো পরিকল্পনা থাকে না, থাকে না সুদীর্ঘকাল রাষ্ট্রকে এ জাতীয় সমস্যা হতে নিরাপদ রাখার নিশ্চয়তাদানকারী কোনো সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ।
আমাদের যাপিত কালেও আমরা মুসলিম উম্মাহ এই একই সমস্যায় আক্রান্ত। বর্তমানে আমরা যাদেরকে ফিলিস্তিন, ইরাক বা অধিকৃত অন্যান্য ইসলামি ভূখণ্ডের বিষয়ে উদ্যোগী হতে দেখি, তারাও তাদের চিন্তা-পরিকল্পনা ও কর্মতৎপরতা মজলুম ভাইদের কাছে অর্থ, খাদ্য ও চিকিৎসা-সহায়তা পৌঁছানো কিংবা সর্বোচ্চ আক্রান্ত অঞ্চলে গিয়ে লড়াই ও শাহাদাতের প্রতি উদ্বুদ্ধকরণে সীমাবদ্ধ রাখেন। নিঃসন্দেহে এসব কর্মতৎপরতাও কাম্য ও প্রশংসনীয়; কিন্তু কেবল এতটুকুকেই যথেষ্ট মনে করা উচিত নয়। বরং এর পাশাপাশি প্রয়োজন এমন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা প্রণয়ন, যার মাধ্যমে আমরা জাতির জাগরণ ও প্রজন্মের পুনর্গঠনের নিশ্চয়তা লাভ করব। দীক্ষিত সেই প্রজন্মই পারবে স্বপ্ন ও বাস্তবতার মিলন ঘটাতে। মনে রাখতে হবে, কেবল অধিকৃত ভূখণ্ডের স্বাধিকার পুনরুদ্ধার করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রতিটি অর্জনকে ধরে রাখার অব্যাহত প্রচেষ্টা এবং স্থায়ী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার টেকসই পরিকল্পনা; প্রয়োজন পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দ্বীন প্রচারের দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা।
দেখুন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কি জীবনে কত গভীর ও মর্মসমৃদ্ধ শব্দে মুষ্টিমেয় সাহাবায়ে কেরামের জামাতকে উজ্জীবিত করেছেন, শাণিত করেছেন তাদের সাহসের ধার, সমুন্নত করেছেন তাদের আকাঙ্ক্ষা ও সংকল্প! নবীজি তাদেরকে কেবল মক্কাবাসীর নিপীড়ন থেকে নিষ্কৃতি লাভের সম্ভাবনার আশা শুনিয়েই ক্ষান্ত হননি; বরং এ বিষয়ে তাদেরকে নিশ্চিন্ত করেছেন এবং আরও অগ্রসর হয়ে তাদেরকে চমৎকার স্বপ্নের কথা শুনিয়েছেন। নবীজি তাদেরকে বলেছেন-
«وَاللَّهِ لَيُتِمَّنَّ هَذَا الأَمْرَ، حَتَّى يَسِيرَ الرَّاكِبُ مِنْ صَنْعَاءَ إِلَى حَضْرَمَوْتَ، لَا يَخَافُ إِلَّا اللَّهَ، أَوِ الذِّئْبَ عَلَى غَنَمِهِ، وَلَكِنَّكُمْ تَسْتَعْجِلُوْنَ»
আল্লাহর শপথ, তিনি অবশ্যই এ দ্বীনকে পূর্ণতা দান করবেন। তখন একজন মুসাফির সানআ থেকে হাজরামাউত পর্যন্ত (নিরাপদে) সফর করবে। পথিমধ্যে সে তার মেষপালে নেকড়ের আক্রমণের আশঙ্কা ছাড়া (কোনো মানুষের) অন্য কোনো অনিষ্টতার আশঙ্কা করবে না এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করবে না। কিন্তু তোমরা (ওই সময়ের জন্য প্রতীক্ষা না করে) তাড়াহুড়া করছ।
এমনকি নবীজি তাদেরকে সুস্পষ্ট ভাষায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—
يَا أَيُّهَا النَّاسُ قُوْلُوا: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، تُفْلِحُوا»
লোকসকল, বলো—আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই; নিশ্চিত সফলতা লাভ করবে।
প্রিয়নবী তার চাচা আবু তালিবকে বলেছিলেন, 'আমি তাদের কাছে কেবল একটি কালিমার স্বীকৃতি দাবি করছি। তারা আমার আহ্বানে সাড়া দিলে পুরো আরবজাতি তাদের বশীভূত হয়ে যাবে আর অনারবরা তাদেরকে জিজিয়া প্রদান করবে।'
আবু তালিব অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করেছিলেন, 'মাত্র একটি বাক্য?!'
-হ্যাঁ, একটি বাক্য। চাচা! আপনারা কেবল বলুন, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।' নবীজি নিষ্কম্প কন্ঠে উত্তর দিয়েছিলেন।
আল্লাহর নবী কখন এই নিশ্চিত ঘোষণা করেছিলেন?! যখন তিনি ও তার গুটিকয়েক সঙ্গী ছিলেন মক্কায় অবরুদ্ধ; বিজয় ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার যাবতীয় বাহ্যিক উপায় ও বস্তু-উপকরণশূন্য!
সুতরাং জাতিগঠনে ও প্রজন্মের বিনির্মাণে এমন কিছু নেতা, সংস্কারক, পথপ্রদর্শক ও আলিমের প্রয়োজন, যারা বিশ্বাসীদের স্বপ্নের পরিধি বিস্তৃত করবেন এবং সুদৃঢ় ভিত্তির আলোকে জনসাধারণের দীক্ষা ও পরিচর্যায় উদ্যোগী হবেন। তারা নিজেদের কর্মপদ্ধতি আহরণ করবেন প্রিয় নবীজির সিরাত এবং উম্মাহর ইতিহাসের মহান সংস্কারক ও সংগ্রামী যোদ্ধাদের জীবনাদর্শ হতে। তারাই পারবেন পৃথিবীতে ইসলামকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে।
তবে স্বীকার করতেই হবে যে, চলমান সংকটকালে উরতুকিরা যতটুকু অবদান রেখেছে, তারও প্রয়োজন ছিল। তাদের কর্মপ্রচেষ্টা সাময়িক ও অপূর্ণ হলেও নিঃসন্দেহে প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা লাভের উপযুক্ত। অন্য অনেকে যখন দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য প্রদর্শন করেছিল, উরতুক পরিবারের মহান নেতৃবৃন্দ তখন প্রতিরোধের ঝান্ডা উড্ডীন করেছেন এবং শত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও জিহাদের বন্ধুর পথে পদচারণা অব্যাহত রেখেছেন। তারা বিভিন্ন যুদ্ধে ক্রুসেডারদের পরাজিত করে ইসলামি ভূখণ্ডে ক্রুসেডারদের আগ্রাসী সম্প্রসারণ প্রচেষ্টায় কিছুটা হলেও বাধা সৃষ্টি করতে পেরেছেন। মহান উরতুকি নেতৃবৃন্দ নিজেরা যদিও মনজিলে পৌঁছতে পারেননি; কিন্তু পরবর্তীদের জন্য মনজিলে পৌঁছার পথ সুগম করেছেন। তাদের এ অবদানও অনস্বীকার্য যে, ক্রুসেড আগ্রাসনের শিকার হতে পারত এমন হাজারো প্রাণ তাদের ওসিলায় বেঁচে গেছে এবং বিভিন্ন জনপদ সম্ভাব্য ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। জাতির শিক্ষা-দীক্ষা ও পরিচর্যায় কোনো সচেতন নেতার নিষ্ঠাপূর্ণ কর্মপ্রচেষ্টার পরবর্তীকালে যদি উরতুকিদের আবির্ভাব ঘটত, তাহলে হয়তো তাদের কর্ম-অবদান আরও ব্যাপক-বিস্তৃত হতো এবং তাদের ইতিহাসও ভিন্নভাবে লেখা হতো। কিন্তু পৃথিবীর সবকিছু তো সুনির্ধারিত নিয়তির অদৃশ্য মায়াজালে আবদ্ধ!

টিকাঃ
১৬৮. ইমাম বুখারি, সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৪১৬, ইমাম আহমাদ, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২১১১০, ইমাম আবু দাউদ, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২৬৪৯, ইমাম ইবনে হিব্বان আল-বুসতি, সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ২৮৯৭।
১৬৮. ইমাম আহমাদ, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১৬০৬৬, হাকিম, মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস নং ৪২১৯, ইবনে খুযায়মা, সহিহ ইবনে খুযায়মা, হাদিস নং ১৫৯ ও ইমাম ইবনে হিব্বান আল-বুসতি, সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৬৫৬২।
১৭০. ইমাম তিরমিজি, সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৩২৩২। তিরমিজি রহ. হাদিসটিকে 'হাসান' বলেছেন।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 মসুল-আলেপ্পো একক রাজ্য!

📄 মসুল-আলেপ্পো একক রাজ্য!


ফিরে যাই আলেপ্পোবাসীর কাছে!
শত্রুবাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ আলেপ্পোবাসী নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ে। তারা স্পষ্টতই অনুভব করে যে, তাদের না আছে শক্তিশালী কোনো নেতা, না আছে নির্ভরযোগ্য বহিঃসংযোগ। শাসক হিসেবে যিনি তাদের ওপর চেপে বসেছেন, সেই হুসামুদ্দিন তামারতাশ শাসনকাজে যথেষ্ট দুর্বল। তিনি অবস্থান করছেন আক্রান্ত এলাকা থেকে নিরাপদ দূরত্বে। আর যদি তিনি তার বাহিনী নিয়ে বেরিয়েও আসেন, তবুও তার দুর্বল শক্তি নিয়ে কিছুতেই প্রতিপক্ষকে প্রতিরোধ করতে পারবেন না। আর বাস্তব কথা হলো, তার ক্রুসেডারদের মোকাবিলা করার কোনো আগ্রহই নেই। অথচ জিহাদ এক কঠিন সংগ্রামের নাম; এ পথে কেবল সে-ই অবিচল থাকতে পারে, যার শুধু আগ্রহ নয়; আছে জিহাদ-অনুরাগ ও শাহাদাতের দুর্নিবার আকর্ষণ।
সবকিছু বিবেচনা করে আলেপ্পোবাসী বাইরের এমন কোনো নেতার কাছে সাহায্যপ্রার্থনার সিদ্ধান্ত নেয়, যিনি আলেপ্পো রাজ্যের লাগাম হাতে তুলে নিলে শত্রুপক্ষ সুরক্ষিত আলেপ্পো হতে অবরোধ প্রত্যাহার করে প্রস্থান করতে বাধ্য হবে।
প্রশ্ন হলো—তারা সাহায্যপ্রার্থনা করবে কার কাছে?! চারপাশের অধিকাংশ নেতাই যে ভীরু-উদাসীন, নিতান্তই দুর্বল! আলেপ্পোবাসীর সামনে তুলনামূলক উপযুক্ত দুটি বিকল্প ছিল। এক. দামেশকের অধিপতি তুগতেকিন। দুই. মসুলের প্রশাসক আক সুনকুর আল-বুরসুকি।
তুগতেকিন যদিও উল্লেখযোগ্য সামরিক শক্তির অধিকারী ছিলেন এবং দীর্ঘকাল ধরে দামেশকের শাসনভার আগলে রেখেছিলেন; কিন্তু তাকে কাঙ্ক্ষিত নেতা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ আলেপ্পোবাসীর ছিল না। কারণ, সব সময়ই তিনি বহিঃসাহায্যের মুখাপেক্ষী থাকতেন। এমনকি ইতিপূর্বে তিনি দুর্বল পরিস্থিতিতে ক্রুসেডারদের সঙ্গেও মিত্রতা করেছিলেন। এখন যে ক্রুসেডার বাহিনী আলেপ্পো অবরোধ করেছে, তারা তো আলেপ্পোর কাছেই অবস্থানকারী তুগতেকিনের সামরিক শক্তিকে গোনায় না ধরেই এখানে এসেছে। এসব দিক বিবেচনা করে আলেপ্পোবাসী উপলব্ধি করে যে, তুগতেকিনের প্রভাব কিছুতেই ক্রুসেডারদের সন্ত্রস্ত করতে পারবে না এবং তাদেরকে বিফল মনোরথে ফিরে যেতে বাধ্য করতেও পারবে না।
সম্ভাব্য দ্বিতীয় বিকল্প আক সুনকুরের অবস্থা ছিল এর বিপরীত। যদিও এ অঞ্চলে তার সমৃদ্ধ অতীত ইতিহাস ছিল না, উল্টো প্রথমবারের প্রশাসক আমলে ক্রুসেডারদের কাছে পরাজিত হওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল; কিন্তু তিনি এমন কিছু ব্যতিক্রমী গুণ-বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন, যা তুগতেকিনের তুলনায় তার পাল্লা ভারী করেছিল। যেমন :
১. সুউচ্চ সততা ও তাকওয়া গুণের অধিকারী হওয়ায় আক সুনকুর জনসাধারণের সঙ্গে ন্যায়, উদার ও অনুগ্রহপূর্ণ আচরণ করতেন। আলেপ্পোর জনসাধারণ তো বিগত কয়েক দশক ধরে তাদের নেতাদের মাঝে এসব গুণের অভাবই অনুভব করে আসছিল।
২. তার অধীনে ছিল মসুলের শক্তিশালী সেনাদল। মসুলবাহিনীর শক্তিমত্তার এটিও অন্যতম প্রমাণ যে, এ বাহিনীর সদস্য ছিলেন সমকালীন প্রসিদ্ধ সেনাপতি ইমাদুদ্দিন জিনকি, যার বীরত্বের খ্যাতি তৎকালীন মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল।
৩. তার অধীনে ছিল মসুলের জিহাদ-অনুরাগী সচেতন জনসাধারণ। এ কারণেই তার বাহিনী ছিল সমকালীন অন্যান্য বাহিনীর চেয়ে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। মসুলের যোদ্ধারা জানত কীভাবে ক্ষমতা ও অর্থের মোহ উপেক্ষা করে আল্লাহর জন্য লড়াই করতে হয়।
৪. সেলজুক সুলতান মাহমুদের সঙ্গে আক সুনকুরের চমৎকার সম্পর্ক ছিল, ছিল ব্যক্তিগত সম্পর্কও। এদিক থেকে বিবেচনা করলে সমকালীন মুসলিম বিশ্বের সর্ববৃহৎ ও সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের সমর্থন আক সুনকুরের পক্ষে ছিল।
৫. আক সুনকুরের হাতে আলেপ্পোর শাসনভার তুলে দেওয়া হলে তুগতেকিনের সমরশক্তির সঙ্গে নতুন শক্তির সম্মিলনে এ অঞ্চলে মুসলমানদের শক্তি মজবুত হবে। ইতিপূর্বে মওদুদের আমলেও দামেশক-মসুল ঐক্যবদ্ধ সম্পর্কের কারণে এ অঞ্চলে মুসলমানদের মজবুত অবস্থান সৃষ্টি হয়েছিল। আবারও যদি সেই ঐক্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে আর তার সঙ্গে যুক্ত হয় আলেপ্পোর সামরিক শক্তি, তাহলে ক্রুসেডাররা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে প্রস্থান করবে এবং এতে মুসলমানদের বিজয় নিশ্চিত হবে বলেই প্রতীয়মান হয়।
সার্বিক বিচারে আক সুনকুরের পাল্লা ভারী হওয়ায় আলেপ্পোবাসী তৎক্ষণাৎ তার কাছে সাহায্যবার্তা পাঠিয়ে তাকে ঐতিহ্যবাহী আলেপ্পো নগরীর শাসনভার গ্রহণে আগমনের আহ্বান জানায়।
আক সুনকুর চিন্তা করে দেখেন যে, এটি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখার এক 'বিনামূল্য' সুযোগ। এদিকে সুলতান মাহমুদও ইতিপূর্বে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাই তিনি আলেপ্পোবাসীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে দ্রুত মসুল থেকে রওনা হন এবং ৫১৮ হিজরির জিলহজ মাসে (১১২৫ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে) আলেপ্পোতে পৌঁছে রাজ্যটিকে মসুলের সঙ্গে যুক্ত করে নেন। বড় দুটি রাজ্য মিলে এবার গঠিত হয় একক বৃহৎ রাজ্য।
মালাতিয়া মারদিন আহলাত সুমাইসাত মারআশ আলবেরা মপসুয়েসটিয়া এডেসা আদানা তিল-বাশির সারুজ সিনজার মসুল হাররান ইসকানদারুন হারিম এন্টিয়ক মাআ’রাতুন- আসারিব দুর্গ কারমানবিজ ইরবিল লাতাকিয়া জাবালা নোমান আলেপ্পো ভূমধ্যসাগর কিননাসরিন বানিয়াস শাইজার হামা তারতুস ইরকা হিমস আলেপ্পো রাজ্য মসুল রাজ্য
মানচিত্র নং-২৬ মসুল-আলেপ্পো একক রাজ্য
মহান মুজাহিদ বাল্ক বিন বাহরামের শাহাদাত, উল্লেখযোগ্য কোনো বিনিময় ছাড়াই ২য় বল্ডউইনের মুক্তি, এরপর বল্ডউইন ও তার সহযোগীদের আলেপ্পো অবরোধ ইত্যাদি দুঃখজনক ঘটনাপ্রবাহ ও অনিষ্টের আড়ালেই নিহিত ছিল এক কল্যাণের বার্তা-গুরুত্বপূর্ণ দুই অঞ্চল আলেপ্পো ও মসুলের ঐক্য। প্রাথমিক পর্যায়ে এ ঐক্য যদিও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল বয়ে আনতে পারেনি; কিন্তু এর মাধ্যমে রাজ্যদুটির ঐক্যের মূল্য ও গুরুত্ব সকলের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে যায়। আর তাই এই ঘটনাকে পরবর্তীকালে সংঘটিত উভয় রাজ্যের অতি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ঐক্যের বীজরূপে বিবেচনা করা যেতে পারে।
যদি প্রশ্ন করা হয়, উভয় রাজ্যের একীভূতকরণকে এতটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবার কারণ কী, তাহলে তার উত্তর হচ্ছে-বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকেই এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেমন:
১. যেহেতু মসুল ও আলেপ্পো রাজ্য ভৌগোলিক দিক থেকে পরস্পর সংযুক্ত ছিল এবং মাঝে অন্য কোনো রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল না, তাই এই একীকরণকে অভিহিত করা যায় 'ইরাকের সঙ্গে সামরিক সংযোগ-সেতু' হিসেবে। শুধু ইরাক নয়; এর মাধ্যমে সেলজুকদের মূলকেন্দ্র পারস্যসহ ইসলামি বিশ্বের পুরো প্রাচ্য অংশের সঙ্গে ক্রুসেডারদের বিচরণভূমি শাম অঞ্চলের সংযোগ স্থাপিত হয়।
২. মসুলে জাগ্রত ছিল প্রকৃত জিহাদের আহ্বান। মসুলের সঙ্গে আলেপ্পো যুক্ত হওয়ায় আলেপ্পোতেও জিহাদি চেতনা বিস্তারের আশা তৈরি হয়। শুধু আলেপ্পো নয়; হতে পারে একে কেন্দ্র করে অনেক বছর ধরে এ জাতীয় চেতনাশূন্য পুরো শাম অঞ্চলে এক নতুন জোয়ার সৃষ্টি হবে।
৩. রাজ্যদুটির ছিল প্রচুর জনবল ও সামরিক শক্তি। তাই এ ঐক্যের মাধ্যমে ক্রুসেডারদের মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী বাহিনী গঠিত হওয়া নিশ্চিত হয়।
৪. যেহেতু মসুল ছিল সেলজুক সালতানাত ও আব্বাসি খিলাফতের অধীনস্থ, তাই মসুলের সঙ্গে আলেপ্পোর সংযুক্তির ফলে আলেপ্পোর দায়িত্ব কাগজে-কলমে সেলজুক সালতানাত ও আব্বাসি খিলাফতের ওপরও অর্পিত হয়। কারণ, এটি কেবল সহায়তা চুক্তি বা জিহাদের অঙ্গনে স্বেচ্ছা-সহযোগিতা ছিল না; ছিল পুরোপুরি রাজ্যভুক্তি।
৫. ইরাকের সামরিক শক্তি সব সময়ই শাম অঞ্চলে কোনো অগ্রবর্তী ঘাঁটি না থাকার অভাব বোধ করে আসছিল। আমাদের নিশ্চয়ই স্মরণ আছে যে, মওদুদ রহ. যখন এ অঞ্চলে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসেছিলেন আর আলেপ্পোর শাসক রিজওয়ান তার সামনে নগরদ্বার বন্ধ করে দিয়েছিলেন, তখন মওদুদ এ অঞ্চলে একটি ঘাঁটির অভাব রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুভব করেছিলেন। এই একীকরণের মাধ্যমে এ সমস্যারও সমাধান হয়।
৬. এর মাধ্যমে আলেপ্পো ও শাম অঞ্চলের জনসাধারণের আকিদা ও চিন্তাগত পরিশুদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষ করে মসুল ও বাগদাদসহ পুরো ইরাক অঞ্চল থেকে উলামায়ে কেরামের আগমনের বিরাট সুযোগ সৃষ্টি হয়। পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে—শামের দুই বৃহৎ নগরী আলেপ্পো ও দামেশকের বিভিন্ন অঙ্গনে শিয়া বাতিনিদের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে অঞ্চলদুটির জনসাধারণের চিন্তা-চেতনায় ব্যাপক বিকৃতি সাধিত হয়েছিল।
এই হলো মসুল-আলেপ্পো একীকরণের ইতিবাচক কিছু দিক। আর এ কারণেই সমকালীন নিষ্ঠাবান মুসলমানগণ এই পদক্ষেপকে সাদরে স্বাগত জানায়। অতীত ঐতিহাসিকগণের কলমে যেমন বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে, উঠে এসেছে সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত সব যুগের লেখক-ঐতিহাসিকদের বিশ্লেষণেই। ঐক্য যখন যেখানেই হোক, নিঃসন্দেহে তা গুরুত্ব ও উদ্যাপনের দাবিদার!

টিকাঃ
১৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৩০।
১৭১. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২১১-২১২ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২২৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00