📄 কিছু জটিল ঘটনা ও ইলগাজির মৃত্যু
আবারও ইলগাজির আলোচনায় ফিরে আসছি। তিনি যদিও তার রাজ্যের পুনর্গঠনে সচেষ্ট ছিলেন; কিন্তু কিছুতেই সন্তোষজনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারছিলেন না। অনেক সময় তার সৈন্যরা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করত এবং তার বিরোধিতা করত। ৫১৫ হিজরি সনে (১১২১ খ্রিষ্টাব্দে) তার পুত্র পর্যন্ত তার সঙ্গে সম্পর্কহীনতার ঘোষণা দিয়ে আলেপ্পোতে নিজের জন্য স্বতন্ত্র রাজ্যপ্রতিষ্ঠার দাবি করে। এমনকি সে ক্রুসেডারদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করে এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী যারদানা ও আসারিব দুর্গের নিয়ন্ত্রণ ক্রুসেডারদের হাতে তুলে দেয়। উদ্বিগ্ন ইলগাজি দ্রুত আলেপ্পোতে ছুটে এসে ছেলেকে তীব্র ভর্ৎসনা করেন এবং আলেপ্পোর শাসনভার নিজের হাতে নিয়ে নেন। এরপর তিনি তার বাহিনী নিয়ে রওনা হন যারদানা দুর্গ পুনরুদ্ধার করতে। সংবাদ পেয়ে এন্টিয়ক রাজ্যের অধীনস্থ দুর্গটির প্রতিরক্ষার জন্য ২য় বল্ডউইন বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে বেরিয়ে আসেন। মুসলিম বাহিনী যারদানা দুর্গের সন্নিকটে ক্রুসেডার বাহিনীর মুখোমুখি হয়। অবশ্য যুদ্ধের পরিবর্তে উভয় পক্ষের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পাদনের মধ্য দিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সমাপ্তি ঘটে। দুঃখের বিষয় চুক্তিতে ইলগাজি যারদানার অধিকার ছেড়ে দিতে সম্মত হন!
ইলগাজির যুদ্ধ ইতিহাস ও জীবনচরিত দেখলে আশ্চর্য হতে হয় যে, তিনি সব সময়ই ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে অর্জিত বিজয়ের সুবিধাকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি লড়াই, অবরোধ ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মতৎপরতায় ধৈর্য ধরে বেশিক্ষণ অবিচল থাকতে পারতেন না। আমার বিশ্বাস, এর জন্য দায়ী তিনি নন; বরং তার সৈন্যগণ! তার বাহিনী ছিল মওদুদ রহ.-এর বাহিনীর তুলনায় সম্পূর্ণই ভিন্ন প্রকৃতির। মূলত ইলগাজির বাহিনী ছিল বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ভাড়াটে সৈন্যদের সমন্বয়ে গঠিত। তিনি যুদ্ধলব্ধ সম্পদ প্রদানের লোভ দেখিয়ে তাদেরকে সংগ্রহ করতেন। স্বভাবতই এসব ভাড়াটে যোদ্ধাদের মাঝে আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের সময় ও জীবন উৎসর্গ করার মতো মুজাহিদসুলভ অবিচলতা থাকত না। তা ছাড়া ঐতিহাসিক ইবনুল আছিরের ভাষ্যমতে সৈন্যদের প্রদানের মতো পর্যাপ্ত অর্থসম্পদও ইলগাজির হাতে ছিল না। আর তাই ইলগাজি যদিও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু বিজয় অর্জন করেছিলেন এবং কিছু কিছু বিজয় ছিল সামগ্রিক বিচারে অত্যন্ত মহান ও গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তিনি ও তার বাহিনী প্রকৃত জিহাদের ঝান্ডা উত্তোলন এবং অবিচল থেকে তা বহন করার মতো উপযুক্ত ছিলেন না।
উত্তরাঞ্চলের এই পরিস্থিতির মধ্যেই এমন দুটি ঘটনা ঘটে; যা পরবর্তী সময়ের ঘটনাপ্রবাহের পট পরিবর্তনে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।
প্রথম ঘটনা হলো, সেলজুক সুলতান মাহমুদ আক সুনকুর আল-বুরসুকিকে পুনরায় মসুলের প্রশাসক পদে নিযুক্ত করেন। আক সুনকুর ইতিপূর্বে ৫০৭ থেকে ৫০৯ হিজরি সন পর্যন্ত মসুলের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অপসারণের ছয় বছর পর তিনি পুনরায় পূর্বের দায়িত্ব লাভ করেন। আক সুনকুরের নতুন করে দায়িত্ব লাভের পেছনে যে বিষয়টি বিশেষভাবে ভূমিকা রেখেছিল, তা হলো— মাঝের এই পুরো সময়টি তিনি সুলতান মাহমুদের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন করেন। সুলতান মাহমুদ ও তার ভাই মাসউদের পারস্পরিক সংঘাতের সময় তিনি সুলতানের পাশে ছিলেন। বরং দুই ভাইয়ের সমঝোতা ও পরিস্থিতি শান্তকরণেও আক সুনকুরের দৃশ্যমান ভূমিকা ছিল। এর মাধ্যমে তিনি সুলতান মাহমুদের অন্তরে বিশেষ অবস্থান লাভ করতে সক্ষম হন। আর আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, তিনি একজন সৎ ও খোদাভীরু ব্যক্তি ছিলেন। সুতরাং মসুলের প্রশাসক পদে তার পুনঃনিয়োগ নিশ্চিত করেই আগামীর ঘটনাপ্রবাহে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা যায়।
দ্বিতীয় ঘটনা হলো, ৫১৫ হিজরি সনে (১১২১ খ্রিষ্টাব্দে) জনৈক ইসমাইলি বাতিনি গুপ্তঘাতকের হাতে মিশরের উবায়দি সাম্রাজ্যের প্রধান উজির আফজাল বিন বদর আল-জামালি নিহত হন। পাঠক হয়তো একজন ইসমাইলি শিয়ার হাতে একজন ইসমাইলি শিয়া নেতার হত্যার ঘটনায় আশ্চর্যান্বিত হবেন। বিষয় হলো, আমরা পূর্বেও উল্লেখ করেছি যে, ইসমাইলিরা পরস্পর প্রচণ্ড শত্রুভাবাপন্ন দুটি দলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। উজির আফজাল ছিলেন প্রথম দল অর্থাৎ মুসতালিয়া ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত আর ঘাতক ছিল হাশশাশিন বা বাতিনিয়া নামে পরিচিত দ্বিতীয় দল নিযারিয়া ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। মিশরের ক্ষমতাসীন উবায়দি প্রশাসনের প্রধান ব্যক্তি উজির আফজালকে হত্যার মাধ্যমে বাতিনিরা মূলত মুসতালিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিয়েছিল। কারণ, উজিরদের একচ্ছত্র আধিপত্যের সেই যুগে উজির আফজালই ছিলেন উবায়দি প্রশাসনের মূল হর্তাকর্তা; খলিফা 'আমির বি আহকামিল্লাহ' ছিলেন নামেই খলিফা।
আফজাল হত্যাকাণ্ডের কারণে মিশরের উবায়দি প্রশাসনের ভিত আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। যদিও এর ফলে বাইতুল মুকাদ্দাসের ক্রুসেড সাম্রাজ্যের পৃষ্ঠদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছিল; কিন্তু ভবিষ্যতে সুলতান নুরুদ্দিন মাহমুদ ও সালাহুদ্দিন আইয়ুবির আমলে শাম অঞ্চল একত্রীকরণ প্রচেষ্টায় নিশ্চিত করেই এ বিষয়টি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
টিকাঃ
১৪১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২০৯ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৯৯।
১৪২. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৯৯।
১৪৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৯৫।
১৪৭. প্রাগুক্ত, ৯/২০৭।
১৪৮, প্রাগুক্ত, ৯/২০৭-২০৮।
আবারও ইলগাজির আলোচনায় ফিরে আসছি। তিনি যদিও তার রাজ্যের পুনর্গঠনে সচেষ্ট ছিলেন; কিন্তু কিছুতেই সন্তোষজনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারছিলেন না। অনেক সময় তার সৈন্যরা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করত এবং তার বিরোধিতা করত। ৫১৫ হিজরি সনে (১১২১ খ্রিষ্টাব্দে) তার পুত্র পর্যন্ত তার সঙ্গে সম্পর্কহীনতার ঘোষণা দিয়ে আলেপ্পোতে নিজের জন্য স্বতন্ত্র রাজ্যপ্রতিষ্ঠার দাবি করে। এমনকি সে ক্রুসেডারদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করে এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী যারদানা ও আসারিব দুর্গের নিয়ন্ত্রণ ক্রুসেডারদের হাতে তুলে দেয়। উদ্বিগ্ন ইলগাজি দ্রুত আলেপ্পোতে ছুটে এসে ছেলেকে তীব্র ভর্ৎসনা করেন এবং আলেপ্পোর শাসনভার নিজের হাতে নিয়ে নেন। এরপর তিনি তার বাহিনী নিয়ে রওনা হন যারদানা দুর্গ পুনরুদ্ধার করতে। সংবাদ পেয়ে এন্টিয়ক রাজ্যের অধীনস্থ দুর্গটির প্রতিরক্ষার জন্য ২য় বল্ডউইন বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে বেরিয়ে আসেন। মুসলিম বাহিনী যারদানা দুর্গের সন্নিকটে ক্রুসেডার বাহিনীর মুখোমুখি হয়। অবশ্য যুদ্ধের পরিবর্তে উভয় পক্ষের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পাদনের মধ্য দিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সমাপ্তি ঘটে। দুঃখের বিষয় চুক্তিতে ইলগাজি যারদানার অধিকার ছেড়ে দিতে সম্মত হন!
ইলগাজির যুদ্ধ ইতিহাস ও জীবনচরিত দেখলে আশ্চর্য হতে হয় যে, তিনি সব সময়ই ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে অর্জিত বিজয়ের সুবিধাকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি লড়াই, অবরোধ ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মতৎপরতায় ধৈর্য ধরে বেশিক্ষণ অবিচল থাকতে পারতেন না। আমার বিশ্বাস, এর জন্য দায়ী তিনি নন; বরং তার সৈন্যগণ! তার বাহিনী ছিল মওদুদ রহ.-এর বাহিনীর তুলনায় সম্পূর্ণই ভিন্ন প্রকৃতির। মূলত ইলগাজির বাহিনী ছিল বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ভাড়াটে সৈন্যদের সমন্বয়ে গঠিত। তিনি যুদ্ধলব্ধ সম্পদ প্রদানের লোভ দেখিয়ে তাদেরকে সংগ্রহ করতেন। স্বভাবতই এসব ভাড়াটে যোদ্ধাদের মাঝে আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের সময় ও জীবন উৎসর্গ করার মতো মুজাহিদসুলভ অবিচলতা থাকত না। তা ছাড়া ঐতিহাসিক ইবনুল আছিরের ভাষ্যমতে সৈন্যদের প্রদানের মতো পর্যাপ্ত অর্থসম্পদও ইলগাজির হাতে ছিল না। আর তাই ইলগাজি যদিও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু বিজয় অর্জন করেছিলেন এবং কিছু কিছু বিজয় ছিল সামগ্রিক বিচারে অত্যন্ত মহান ও গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তিনি ও তার বাহিনী প্রকৃত জিহাদের ঝান্ডা উত্তোলন এবং অবিচল থেকে তা বহন করার মতো উপযুক্ত ছিলেন না।
উত্তরাঞ্চলের এই পরিস্থিতির মধ্যেই এমন দুটি ঘটনা ঘটে; যা পরবর্তী সময়ের ঘটনাপ্রবাহের পট পরিবর্তনে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।
প্রথম ঘটনা হলো, সেলজুক সুলতান মাহমুদ আক সুনকুর আল-বুরসুকিকে পুনরায় মসুলের প্রশাসক পদে নিযুক্ত করেন। আক সুনকুর ইতিপূর্বে ৫০৭ থেকে ৫০৯ হিজরি সন পর্যন্ত মসুলের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অপসারণের ছয় বছর পর তিনি পুনরায় পূর্বের দায়িত্ব লাভ করেন। আক সুনকুরের নতুন করে দায়িত্ব লাভের পেছনে যে বিষয়টি বিশেষভাবে ভূমিকা রেখেছিল, তা হলো— মাঝের এই পুরো সময়টি তিনি সুলতান মাহমুদের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন করেন। সুলতান মাহমুদ ও তার ভাই মাসউদের পারস্পরিক সংঘাতের সময় তিনি সুলতানের পাশে ছিলেন। বরং দুই ভাইয়ের সমঝোতা ও পরিস্থিতি শান্তকরণেও আক সুনকুরের দৃশ্যমান ভূমিকা ছিল। এর মাধ্যমে তিনি সুলতান মাহমুদের অন্তরে বিশেষ অবস্থান লাভ করতে সক্ষম হন। আর আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, তিনি একজন সৎ ও খোদাভীরু ব্যক্তি ছিলেন। সুতরাং মসুলের প্রশাসক পদে তার পুনঃনিয়োগ নিশ্চিত করেই আগামীর ঘটনাপ্রবাহে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা যায়।
দ্বিতীয় ঘটনা হলো, ৫১৫ হিজরি সনে (১১২১ খ্রিষ্টাব্দে) জনৈক ইসমাইলি বাতিনি গুপ্তঘাতকের হাতে মিশরের উবায়দি সাম্রাজ্যের প্রধান উজির আফজাল বিন বদর আল-জামালি নিহত হন। পাঠক হয়তো একজন ইসমাইলি শিয়ার হাতে একজন ইসমাইলি শিয়া নেতার হত্যার ঘটনায় আশ্চর্যান্বিত হবেন। বিষয় হলো, আমরা পূর্বেও উল্লেখ করেছি যে, ইসমাইলিরা পরস্পর প্রচণ্ড শত্রুভাবাপন্ন দুটি দলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। উজির আফজাল ছিলেন প্রথম দল অর্থাৎ মুসতালিয়া ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত আর ঘাতক ছিল হাশশাশিন বা বাতিনিয়া নামে পরিচিত দ্বিতীয় দল নিযারিয়া ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। মিশরের ক্ষমতাসীন উবায়দি প্রশাসনের প্রধান ব্যক্তি উজির আফজালকে হত্যার মাধ্যমে বাতিনিরা মূলত মুসতালিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিয়েছিল। কারণ, উজিরদের একচ্ছত্র আধিপত্যের সেই যুগে উজির আফজালই ছিলেন উবায়দি প্রশাসনের মূল হর্তাকর্তা; খলিফা 'আমির বি আহকামিল্লাহ' ছিলেন নামেই খলিফা।
আফজাল হত্যাকাণ্ডের কারণে মিশরের উবায়দি প্রশাসনের ভিত আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। যদিও এর ফলে বাইতুল মুকাদ্দাসের ক্রুসেড সাম্রাজ্যের পৃষ্ঠদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছিল; কিন্তু ভবিষ্যতে সুলতান নুরুদ্দিন মাহমুদ ও সালাহুদ্দিন আইয়ুবির আমলে শাম অঞ্চল একত্রীকরণ প্রচেষ্টায় নিশ্চিত করেই এ বিষয়টি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
টিকাঃ
১৪১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২০৯ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৯৯।
১৪২. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৯৯।
১৪৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৯৫।
১৪৭. প্রাগুক্ত, ৯/২০৭।
১৪৮, প্রাগুক্ত, ৯/২০৭-২০৮।
📄 মুজাহিদ বাল্ক বিন বাহরাম বিন উরতুক
৫১৫ হিজরি সনের শেষাংশ এবং ৫১৬ হিজরি সনের প্রথমাংশ (১১২২ খ্রিষ্টাব্দ) ছিল অম্লমধুর ঘটনাপ্রবাহের যুগপৎ ধারক!
এ সময় ইলগাজির ভ্রাতুষ্পুত্র বাল্ক বিন বাহরাম বিন উরতুক এডেসা রাজ্য অবরোধ করেন। বাল্ক তখন এডেসা রাজ্যের নিকটবর্তী খারতাবিত নগরীর প্রশাসক ছিলেন। বাল্ক অবরোধের মাধ্যমে এডেসার পতন ঘটাতে ব্যর্থ হয়ে সেখান থেকে সসৈন্য প্রত্যাবর্তন করলে এডেসার শাসক জোসেলিন তার বাহিনীর একটি অংশ নিয়ে তাদের পিছু নেন। এডেসা-দুর্গ থেকে দূরবর্তী এক স্থানে দু-পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বাল্ক তার চারশ সৈন্য নিয়েই প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি নিঃশেষ করে ফেলেন এবং জোসেলিনকে বন্দি করতে সক্ষম হন। ৫১৬ হিজরি সনে (১১২২ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ ডিসেম্বর) এই আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা সংঘটিত হয়।
এ ঘটনা ছিল একেবারেই আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত। বাল্কের বাহিনী ছিল প্রতিপক্ষ ক্রুসেডার বাহিনীর তুলনায় অনেক গুণ দুর্বল।
যদিও এ সংবাদ ছিল মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত আনন্দদায়ক; কিন্তু জোসেলিনকে বন্দি করার দুই মাসেরও কম সময় পরই আসে ইলগাজি বিন উরতুকের মৃত্যুসংবাদ। তার মৃত্যুর পর সে যুগের রীতি মেনে প্রত্যাশামতোই তার সুবিস্তৃত রাজ্য বিভক্ত হয়ে যায়! এই ভাঙনের কারণ কেবল এই ছিল না যে, রাজ্যটির বয়স একেবারেই অল্প; বরং এর মূল কারণ ছিল, রাজ্যটি এমন একদল সৈন্যের ওপর নির্ভর করত, যাদের লক্ষ্য ছিল অর্থসম্পদ; জিহাদ ও জান্নাত নয়! আর তাই শক্তিশালী শাসক ইলগাজির মৃত্যুর পর স্বভাবতই তারা তার রেখে যাওয়া মূল্যবান সম্পদের ভাগাভাগি নিয়ে পরস্পরে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
ইলগাজির মৃত্যুর পর তার এক পুত্র শামসুদ্দৌলা সুলায়মান গ্রহণ করেন দিয়ারে বকর অঞ্চলের উত্তর অংশ সিলভানের দায়িত্ব। আরেক পুত্র হুসামুদ্দিন তামারতাশ দায়িত্ব নেন মারদিন ও দিয়ারে বকরের দক্ষিণ অংশের। আর তার ভ্রাতুষ্পুত্র বাল্ক ধরে রাখেন খারতাবিত নগরীর কর্তৃত্ব। দামি শিকার জোসেলিনও ছিল তার হাতে। আর আলেপ্পোর নিয়ন্ত্রণ লাভ করেন ইলগাজির আরেক ভ্রাতুষ্পুত্র বদরুদ্দৌলা সুলায়মান বিন আবদুল জাব্বার বিন উরতুক।
এই দুঃখজনক বিভাজনের সংবাদ পেয়ে সুযোগ কাজে লাগাতে বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা ২য় বল্ডউইন ছুটে আসেন। তিনি তখন এন্টিয়কের পাশাপাশি এডেসা রাজ্যেরও তত্ত্বাবধান করছিলেন। বল্ডউইন প্রথমে আলেপ্পো রাজ্যে হামলা চালান এবং আলেপ্পো নগরীর পূর্বে অবস্থিত আলবেরা নগরী দখল করে নেওয়ার পাশাপাশি উত্তর ও দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু এলাকায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এর ফলে আলেপ্পো নগরীর নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে যায়। বল্ডউইন জানতেন যে, তার বর্তমান শক্তি ব্যবহার করে আলেপ্পোর মতো সুরক্ষিত নগরীর পতন ঘটানো কার্যত সম্ভব নয়। তিনি মূলত আলেপ্পোর দুর্বল আমির সুলায়মান বিন আবদুল জাব্বারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তার সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করতে এবং তার দিক থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে ইতিমধ্যে ক্রুসেডারদের সামনে মূর্তিমান আতঙ্ক হিসেবে আবির্ভূত হওয়া বাল্ক বিন বাহরামের মুখোমুখি হতে চাচ্ছিলেন। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, এডেসার ক্রুসেডারদের পরাজিত করে এবং খোদ জোসেলিনকে বন্দি করে বাল্ক ততদিনে নিজের দক্ষতার কথা জানান দিয়েছিলেন। দুষ্ট বল্ডউইনের পরিকল্পনা সফল হয়; সুলায়মান তার কাছে সন্ধি প্রার্থনা করেন এবং আসারিব দুর্গের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে তুলে দেন !
আলেপ্পোর দিক থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে ২য় বল্ডউইন এবার বাল্ক বিন বাহরামের মোকাবিলার লক্ষ্যে রওনা হন। বাল্ক তখন এডেসা রাজ্যের অধীনস্থ একটি দুর্গের অবরোধে ব্যস্ত।
৫১৭ হিজরি সনের ১৯ সফর (১১২৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ এপ্রিল) ২য় বল্ডউইন তার বাহিনী নিয়ে উর্শ (Gargar) নামক একটি স্থানে বাল্কের বাহিনীর মুখোমুখি হন। সবাইকে হতবাক করে দিয়ে এ যুদ্ধেও বাল্ক বিন বাহরাম ক্রুসেডারদের পরাজিত করেন এবং বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা ২য় বল্ডউইনকে বন্দি করতে সক্ষম হন !
এভাবে মাত্র সাত মাসের মধ্যে বাল্ক বিন বাহরাম একই সঙ্গে বাইতুল মুকাদ্দাস সাম্রাজ্যের রাজা ও এডেসা রাজ্যের শাসককে বন্দি করতে সক্ষম হন।
এ ঘটনায় ক্রুসেডাররা বিরাট ধাক্কা খায়। বলা চলে, ইসলামি ভূখণ্ডে পা রাখার পর তারা কখনোই এরূপ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়নি। আমাদের নিশ্চয়ই স্মরণ আছে যে, ২য় বল্ডউইন রজার ডি সালের্নোর মৃত্যুর পর থেকে এন্টিয়কের এবং জোসেলিন বন্দি হওয়ার পর থেকে এডেসারও তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। সুতরাং তিনি বন্দি হওয়ায় একই সঙ্গে তিনটি রাজ্য নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে।
হঠাৎ করেই চারদিকে বাল্ক বিন বাহরামের বীরত্বের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। সর্বত্র তার নামে ধন্য ধন্য রব ওঠে। এ সুযোগে তার জন্য নিজ রাজ্য সম্প্রসারণ ও উরতুক রাজপরিবারকে ঐক্যবদ্ধকরণ সহজ ছিল। তিনি এ লক্ষ্যে অগ্রসর হন এবং পর্যায়ক্রমে হাররান ও আলেপ্পোকে নিজ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হন। এরপর তিনি আলেপ্পোতে নিজের নতুন অবস্থানস্থল থেকে এন্টিয়ক রাজ্যে অভিযান পরিচালনা শুরু করেন।
২য় বল্ডউইনের অনুপস্থিতিতে বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসনভার গ্রহণ করেন সিডন ও কায়সারিয়ার প্রশাসক ইস্টাচ গার্নিয়ার (Eustache Garnier)। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের মাসখানেক পরই তিনি মারা যান। এরপর সাম্রাজ্যের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন উইলিয়াম ডি বোর (William de Boer) নামক জনৈক সেনাপতি। ওদিকে এন্টিয়কের শাসনভার গ্রহণ করেন রাজ্যটির গির্জাধ্যক্ষ বার্নার্ড ডি ফালিন্স।
বাল্ক বিন বাহরাম মূল্যবান দুই শিকারকে তার মূল ঘাঁটি খারতাবিত্তের একটি সুরক্ষিত দুর্গে বন্দি করে রাখেন। তিনি এবার ক্রুসেডারদের দুর্বলতা ও হঠাৎ সৃষ্ট ভারসাম্যহীনতাকে কাজে লাগিয়ে আলেপ্পোর আশপাশের ক্রুসেডার অধিকৃত অঞ্চলে অভিযান শুরু করেন। তিনি এ সময় মাআ'ররাতুন-নোমানের পশ্চিমে অবস্থিত বারা অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন, এরপর কাফারতাব অঞ্চল অবরোধের লক্ষ্যে অগ্রসর হন।
কাফারতাব অবরোধ চলাকালে বাল্ক বিন বাহরামের কাছে এক আকস্মিক দুঃখজনক সংবাদ পৌঁছায়। তিনি জানতে পারেন যে, তার অনুপস্থিতি ও মুসলিম বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্যের আলেপ্পো অঞ্চলে লাগাতার যুদ্ধব্যস্ততার সুযোগ কাজে লাগিয়ে খারতাবিরক্তের খ্রিষ্টান অধিবাসীরা গোপন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে একই সঙ্গে বন্দি দুই ক্রুসেডার নেতাকে মুক্ত করে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। বাল্ক বিন বাহরাম তৎক্ষণাৎ খারতাবিতে ফিরে আসেন এবং সদ্য মুক্ত শাসকদ্বয়কে নিয়ে রওনা হওয়া কাফেলার ওপর আকস্মিক হামলা চালান। তিনি ২য় বল্ডউইনকে পুনরায় বন্দি করতে সক্ষম হন। জোসেলিন অবশ্য পূর্ণ এক বছর বন্দিজীবন শেষে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
একই ধরনের ষড়যন্ত্রের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কায় বাল্ক বিন বাহরাম এবার বল্ডউইনকে ক্রুসেডার বাহিনীর নিকটবর্তী ও খ্রিষ্টান নাগরিক অধ্যুষিত খারতাবিত থেকে সরিয়ে হাররানের একটি সুরক্ষিত দুর্গে আটকে রাখেন। কিছুদিন পর তিনি তাকে সেখান থেকেও সরিয়ে নেন এবং আলেপ্পোতে অবস্থিত আরও অধিক সুরক্ষিত একটি দুর্গে বন্দি করে রাখেন।
এরপর বাল্ক বিন বাহরাম আবারও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। তিনি আলেপ্পোর উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত মানবিজ নামক স্থানে ক্রুসেডার বাহিনীর মোকাবিলা করে তাদেরকে পরাজিত করেন। কিন্তু হঠাৎ অজ্ঞাত উৎস হতে নিক্ষিপ্ত লক্ষ্যহীন একটি তির তার শরীরে বিদ্ধ হলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।
দুঃখজনক এ ঘটনাটি ঘটে ৫১৮ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে (১১২৪ খ্রিষ্টাব্দের ৬ মে)। ক্রুসেড যুদ্ধের এ স্তরে এসে মুসলমানরা হারায় জিহাদের ঝান্ডাবাহী এক বরেণ্য মুজাহিদকে। ইলগাজির মৃত্যুর পর যে সমস্যার উদ্ভব হয়েছিল, এবারও তার পুনরাবৃত্তি ঘটে; বাল্ক বিন বাহরামের বিস্তৃত রাজ্য তার উত্তরাধিকারীদের মাঝে বিভক্ত হয়ে যায়!
টিকাঃ
১৪৯. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২০৬ ও Matthieu d' Edesse, p. 131.
১৫০. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২০৯।
১৫১. Setton: op. cit., 1,p. 418.
১৫২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২১ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২০৯।
১৫০. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২১১।
১৫৪. Matthieu d' Edesse, p. 133; Foucher de Chartres, p. 540.
১৫৫. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২১৩।
১৫৬. Runciman: op. cit. II, pp. 163-164.
১৫৭. Foucher de Chartres, p. 540.
১৫৮. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২১৩।
১৫৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২৭।
৫১৫ হিজরি সনের শেষাংশ এবং ৫১৬ হিজরি সনের প্রথমাংশ (১১২২ খ্রিষ্টাব্দ) ছিল অম্লমধুর ঘটনাপ্রবাহের যুগপৎ ধারক!
এ সময় ইলগাজির ভ্রাতুষ্পুত্র বাল্ক বিন বাহরাম বিন উরতুক এডেসা রাজ্য অবরোধ করেন। বাল্ক তখন এডেসা রাজ্যের নিকটবর্তী খারতাবিত নগরীর প্রশাসক ছিলেন। বাল্ক অবরোধের মাধ্যমে এডেসার পতন ঘটাতে ব্যর্থ হয়ে সেখান থেকে সসৈন্য প্রত্যাবর্তন করলে এডেসার শাসক জোসেলিন তার বাহিনীর একটি অংশ নিয়ে তাদের পিছু নেন। এডেসা-দুর্গ থেকে দূরবর্তী এক স্থানে দু-পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বাল্ক তার চারশ সৈন্য নিয়েই প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি নিঃশেষ করে ফেলেন এবং জোসেলিনকে বন্দি করতে সক্ষম হন। ৫১৬ হিজরি সনে (১১২২ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ ডিসেম্বর) এই আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা সংঘটিত হয়।
এ ঘটনা ছিল একেবারেই আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত। বাল্কের বাহিনী ছিল প্রতিপক্ষ ক্রুসেডার বাহিনীর তুলনায় অনেক গুণ দুর্বল।
যদিও এ সংবাদ ছিল মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত আনন্দদায়ক; কিন্তু জোসেলিনকে বন্দি করার দুই মাসেরও কম সময় পরই আসে ইলগাজি বিন উরতুকের মৃত্যুসংবাদ। তার মৃত্যুর পর সে যুগের রীতি মেনে প্রত্যাশামতোই তার সুবিস্তৃত রাজ্য বিভক্ত হয়ে যায়! এই ভাঙনের কারণ কেবল এই ছিল না যে, রাজ্যটির বয়স একেবারেই অল্প; বরং এর মূল কারণ ছিল, রাজ্যটি এমন একদল সৈন্যের ওপর নির্ভর করত, যাদের লক্ষ্য ছিল অর্থসম্পদ; জিহাদ ও জান্নাত নয়! আর তাই শক্তিশালী শাসক ইলগাজির মৃত্যুর পর স্বভাবতই তারা তার রেখে যাওয়া মূল্যবান সম্পদের ভাগাভাগি নিয়ে পরস্পরে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
ইলগাজির মৃত্যুর পর তার এক পুত্র শামসুদ্দৌলা সুলায়মান গ্রহণ করেন দিয়ারে বকর অঞ্চলের উত্তর অংশ সিলভানের দায়িত্ব। আরেক পুত্র হুসামুদ্দিন তামারতাশ দায়িত্ব নেন মারদিন ও দিয়ারে বকরের দক্ষিণ অংশের। আর তার ভ্রাতুষ্পুত্র বাল্ক ধরে রাখেন খারতাবিত নগরীর কর্তৃত্ব। দামি শিকার জোসেলিনও ছিল তার হাতে। আর আলেপ্পোর নিয়ন্ত্রণ লাভ করেন ইলগাজির আরেক ভ্রাতুষ্পুত্র বদরুদ্দৌলা সুলায়মান বিন আবদুল জাব্বার বিন উরতুক।
এই দুঃখজনক বিভাজনের সংবাদ পেয়ে সুযোগ কাজে লাগাতে বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা ২য় বল্ডউইন ছুটে আসেন। তিনি তখন এন্টিয়কের পাশাপাশি এডেসা রাজ্যেরও তত্ত্বাবধান করছিলেন। বল্ডউইন প্রথমে আলেপ্পো রাজ্যে হামলা চালান এবং আলেপ্পো নগরীর পূর্বে অবস্থিত আলবেরা নগরী দখল করে নেওয়ার পাশাপাশি উত্তর ও দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু এলাকায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এর ফলে আলেপ্পো নগরীর নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে যায়। বল্ডউইন জানতেন যে, তার বর্তমান শক্তি ব্যবহার করে আলেপ্পোর মতো সুরক্ষিত নগরীর পতন ঘটানো কার্যত সম্ভব নয়। তিনি মূলত আলেপ্পোর দুর্বল আমির সুলায়মান বিন আবদুল জাব্বারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তার সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করতে এবং তার দিক থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে ইতিমধ্যে ক্রুসেডারদের সামনে মূর্তিমান আতঙ্ক হিসেবে আবির্ভূত হওয়া বাল্ক বিন বাহরামের মুখোমুখি হতে চাচ্ছিলেন। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, এডেসার ক্রুসেডারদের পরাজিত করে এবং খোদ জোসেলিনকে বন্দি করে বাল্ক ততদিনে নিজের দক্ষতার কথা জানান দিয়েছিলেন। দুষ্ট বল্ডউইনের পরিকল্পনা সফল হয়; সুলায়মান তার কাছে সন্ধি প্রার্থনা করেন এবং আসারিব দুর্গের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে তুলে দেন !
আলেপ্পোর দিক থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে ২য় বল্ডউইন এবার বাল্ক বিন বাহরামের মোকাবিলার লক্ষ্যে রওনা হন। বাল্ক তখন এডেসা রাজ্যের অধীনস্থ একটি দুর্গের অবরোধে ব্যস্ত।
৫১৭ হিজরি সনের ১৯ সফর (১১২৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ এপ্রিল) ২য় বল্ডউইন তার বাহিনী নিয়ে উর্শ (Gargar) নামক একটি স্থানে বাল্কের বাহিনীর মুখোমুখি হন। সবাইকে হতবাক করে দিয়ে এ যুদ্ধেও বাল্ক বিন বাহরাম ক্রুসেডারদের পরাজিত করেন এবং বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা ২য় বল্ডউইনকে বন্দি করতে সক্ষম হন !
এভাবে মাত্র সাত মাসের মধ্যে বাল্ক বিন বাহরাম একই সঙ্গে বাইতুল মুকাদ্দাস সাম্রাজ্যের রাজা ও এডেসা রাজ্যের শাসককে বন্দি করতে সক্ষম হন।
এ ঘটনায় ক্রুসেডাররা বিরাট ধাক্কা খায়। বলা চলে, ইসলামি ভূখণ্ডে পা রাখার পর তারা কখনোই এরূপ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়নি। আমাদের নিশ্চয়ই স্মরণ আছে যে, ২য় বল্ডউইন রজার ডি সালের্নোর মৃত্যুর পর থেকে এন্টিয়কের এবং জোসেলিন বন্দি হওয়ার পর থেকে এডেসারও তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। সুতরাং তিনি বন্দি হওয়ায় একই সঙ্গে তিনটি রাজ্য নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে।
হঠাৎ করেই চারদিকে বাল্ক বিন বাহরামের বীরত্বের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। সর্বত্র তার নামে ধন্য ধন্য রব ওঠে। এ সুযোগে তার জন্য নিজ রাজ্য সম্প্রসারণ ও উরতুক রাজপরিবারকে ঐক্যবদ্ধকরণ সহজ ছিল। তিনি এ লক্ষ্যে অগ্রসর হন এবং পর্যায়ক্রমে হাররান ও আলেপ্পোকে নিজ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হন। এরপর তিনি আলেপ্পোতে নিজের নতুন অবস্থানস্থল থেকে এন্টিয়ক রাজ্যে অভিযান পরিচালনা শুরু করেন।
২য় বল্ডউইনের অনুপস্থিতিতে বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসনভার গ্রহণ করেন সিডন ও কায়সারিয়ার প্রশাসক ইস্টাচ গার্নিয়ার (Eustache Garnier)। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের মাসখানেক পরই তিনি মারা যান। এরপর সাম্রাজ্যের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন উইলিয়াম ডি বোর (William de Boer) নামক জনৈক সেনাপতি। ওদিকে এন্টিয়কের শাসনভার গ্রহণ করেন রাজ্যটির গির্জাধ্যক্ষ বার্নার্ড ডি ফালিন্স।
বাল্ক বিন বাহরাম মূল্যবান দুই শিকারকে তার মূল ঘাঁটি খারতাবিত্তের একটি সুরক্ষিত দুর্গে বন্দি করে রাখেন। তিনি এবার ক্রুসেডারদের দুর্বলতা ও হঠাৎ সৃষ্ট ভারসাম্যহীনতাকে কাজে লাগিয়ে আলেপ্পোর আশপাশের ক্রুসেডার অধিকৃত অঞ্চলে অভিযান শুরু করেন। তিনি এ সময় মাআ'ররাতুন-নোমানের পশ্চিমে অবস্থিত বারা অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন, এরপর কাফারতাব অঞ্চল অবরোধের লক্ষ্যে অগ্রসর হন।
কাফারতাব অবরোধ চলাকালে বাল্ক বিন বাহরামের কাছে এক আকস্মিক দুঃখজনক সংবাদ পৌঁছায়। তিনি জানতে পারেন যে, তার অনুপস্থিতি ও মুসলিম বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্যের আলেপ্পো অঞ্চলে লাগাতার যুদ্ধব্যস্ততার সুযোগ কাজে লাগিয়ে খারতাবিরক্তের খ্রিষ্টান অধিবাসীরা গোপন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে একই সঙ্গে বন্দি দুই ক্রুসেডার নেতাকে মুক্ত করে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। বাল্ক বিন বাহরাম তৎক্ষণাৎ খারতাবিতে ফিরে আসেন এবং সদ্য মুক্ত শাসকদ্বয়কে নিয়ে রওনা হওয়া কাফেলার ওপর আকস্মিক হামলা চালান। তিনি ২য় বল্ডউইনকে পুনরায় বন্দি করতে সক্ষম হন। জোসেলিন অবশ্য পূর্ণ এক বছর বন্দিজীবন শেষে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
একই ধরনের ষড়যন্ত্রের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কায় বাল্ক বিন বাহরাম এবার বল্ডউইনকে ক্রুসেডার বাহিনীর নিকটবর্তী ও খ্রিষ্টান নাগরিক অধ্যুষিত খারতাবিত থেকে সরিয়ে হাররানের একটি সুরক্ষিত দুর্গে আটকে রাখেন। কিছুদিন পর তিনি তাকে সেখান থেকেও সরিয়ে নেন এবং আলেপ্পোতে অবস্থিত আরও অধিক সুরক্ষিত একটি দুর্গে বন্দি করে রাখেন।
এরপর বাল্ক বিন বাহরাম আবারও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। তিনি আলেপ্পোর উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত মানবিজ নামক স্থানে ক্রুসেডার বাহিনীর মোকাবিলা করে তাদেরকে পরাজিত করেন। কিন্তু হঠাৎ অজ্ঞাত উৎস হতে নিক্ষিপ্ত লক্ষ্যহীন একটি তির তার শরীরে বিদ্ধ হলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।
দুঃখজনক এ ঘটনাটি ঘটে ৫১৮ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে (১১২৪ খ্রিষ্টাব্দের ৬ মে)। ক্রুসেড যুদ্ধের এ স্তরে এসে মুসলমানরা হারায় জিহাদের ঝান্ডাবাহী এক বরেণ্য মুজাহিদকে। ইলগাজির মৃত্যুর পর যে সমস্যার উদ্ভব হয়েছিল, এবারও তার পুনরাবৃত্তি ঘটে; বাল্ক বিন বাহরামের বিস্তৃত রাজ্য তার উত্তরাধিকারীদের মাঝে বিভক্ত হয়ে যায়!
টিকাঃ
১৪৯. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২০৬ ও Matthieu d' Edesse, p. 131.
১৫০. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২০৯।
১৫১. Setton: op. cit., 1,p. 418.
১৫২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২১ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২০৯।
১৫০. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২১১।
১৫৪. Matthieu d' Edesse, p. 133; Foucher de Chartres, p. 540.
১৫৫. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২১৩।
১৫৬. Runciman: op. cit. II, pp. 163-164.
১৫৭. Foucher de Chartres, p. 540.
১৫৮. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২১৩।
১৫৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২৭।
📄 ২য় বল্ডউইনের মুক্তি
বাল্ক বিন বাহরামের শাহাদাতের পর আলেপ্পোর কর্তৃত্ব চলে যায় ইলগাজির পুত্র হুসামুদ্দিন তামারতাশের হাতে। তিনি আলেপ্পোকে তার রাজ্য মারদিনের সঙ্গে মিলিয়ে নেন। অবশ্য ক্রুসেডারদের সঙ্গে অব্যাহত সংঘাতের কেন্দ্র উত্তপ্ত শাম অঞ্চল থেকে দূরে থাকার উদ্দেশ্যে তিনি বসবাসের জন্য মারদিনকেই বেছে নেন। ঐতিহাসিক ইবনুল আছির রহ.-এর ভাষ্য অনুসারে হুসামুদ্দিন ছিলেন বিলাসী ও আরামপ্রিয় একজন শাসক।
তবে বসবাসের জন্য আলেপ্পোকে এড়াতে পারলেও আরও বড় একটি সমস্যাকে পাশ কাটানোর সুযোগ তামারতাশের ছিল না। ২য় বল্ডউইন যেহেতু আলেপ্পোতে বন্দি ছিলেন, তাই তার ব্যাপারে কর্তৃত্ব তখন তামারতাশেরই হাতে। সুতরাং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্বও ছিল তার কাঁধে।
অবশেষে উভয় পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক মধ্যস্থতার উদ্যোগ গৃহীত হয়। শাইজারের আমির সুলতান বিন মুনকিয মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব পালন করেন। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর উভয় পক্ষ কয়েকটি শর্ত সাপেক্ষে ২য় বল্ডউইনের মুক্তির বিষয়ে সম্মত হয়। শর্তগুলো হলো-
১. মুক্তিপণ হিসেবে ২য় বল্ডউইন আশি হাজার দিনার পরিশোধ করবেন। এর মধ্যে বিশ হাজার দিনার অগ্রীম প্রদান করতে হবে, বাকিটা পরিশোধ করতে হবে বন্দিমুক্তির পর।
২. এন্টিয়ক রাজ্যের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে ২য় বল্ডউইন আযাষ, আসারিব, যারদানা, জাযার ও কাফারতাব দুর্গের নিয়ন্ত্রণ আলেপ্পো রাজ্যের হাতে ফিরিয়ে দেবেন।
৩. রাজা ২য় বল্ডউইন আরব বংশোদ্ভূত শিয়া নেতা দুবাইস বিন সাদাকাকে দমনের বিষয়ে তামারতাশকে সহযোগিতা করবেন।
দুবাইস ইরাকের আব্বাসি খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার পর পালিয়ে জাযিরা অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিল।
৪. শর্ত পূরণের নিশ্চয়তা হিসেবে বল্ডউইন কিছু লোককে মুসলমানদের কাছে জিম্মি রাখবেন। তিনি যতদিন না প্রতিশ্রুত অর্থ ও দুর্গসমূহের নিয়ন্ত্রণ মুসলমানদের বুঝিয়ে দেবেন, ততদিন তারা মুসলমানদের কাছে জিম্মি থাকবে।
জিম্মি হিসেবে ক্রুসেডারদের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নাম নির্ধারণ করা হয়। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল রাজা ২য় বল্ডউইনের পাঁচ বছর বয়সী এক কন্যা এবং এডেসার শাসক জোসেলিনের পুত্র ২য় জোসেলিন। শর্ত ছিল, দাবি পূরণের আগ পর্যন্ত এরা মধ্যস্থতাকারী শাইজারের আমির সুলতান বিন মুনকিযের হেফাজতে থাকবে।
এক বছরেরও অধিক সময় বন্দি থাকার পর অবশেষে ২য় বল্ডউইন মুক্তি লাভ করেন। ছাড়া পেয়ে প্রথমে তিনি এন্টিয়কে গমন করেন এবং সেখানে পৌঁছে এন্টিয়কের গির্জাধ্যক্ষ বার্নার্ড ডি ফালিন্সের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পারস্পরিক আলোচনার পর তারা সিদ্ধান্ত নেন যে, আলেপ্পোর হাতে বিভিন্ন দুর্গ সমর্পণের শর্তটি তারা পালন করবেন না। এরপর বিষয়টি তারা পত্রের মাধ্যমে তামারতাশকে জানিয়ে দেন!
টিকাঃ
১৬০. প্রাগুক্ত, ৯/২২৭।
১৬১. উসামা বিন মুনকিয, আল-ই'তিবার, পৃষ্ঠা: ১২০।
১৬২. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২২১।
১৬৩. উসামা বিন মুনকিয, আল-ই'তিবার, পৃষ্ঠা: ১০৩।
বাল্ক বিন বাহরামের শাহাদাতের পর আলেপ্পোর কর্তৃত্ব চলে যায় ইলগাজির পুত্র হুসামুদ্দিন তামারতাশের হাতে। তিনি আলেপ্পোকে তার রাজ্য মারদিনের সঙ্গে মিলিয়ে নেন। অবশ্য ক্রুসেডারদের সঙ্গে অব্যাহত সংঘাতের কেন্দ্র উত্তপ্ত শাম অঞ্চল থেকে দূরে থাকার উদ্দেশ্যে তিনি বসবাসের জন্য মারদিনকেই বেছে নেন। ঐতিহাসিক ইবনুল আছির রহ.-এর ভাষ্য অনুসারে হুসামুদ্দিন ছিলেন বিলাসী ও আরামপ্রিয় একজন শাসক।
তবে বসবাসের জন্য আলেপ্পোকে এড়াতে পারলেও আরও বড় একটি সমস্যাকে পাশ কাটানোর সুযোগ তামারতাশের ছিল না। ২য় বল্ডউইন যেহেতু আলেপ্পোতে বন্দি ছিলেন, তাই তার ব্যাপারে কর্তৃত্ব তখন তামারতাশেরই হাতে। সুতরাং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্বও ছিল তার কাঁধে।
অবশেষে উভয় পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক মধ্যস্থতার উদ্যোগ গৃহীত হয়। শাইজারের আমির সুলতান বিন মুনকিয মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব পালন করেন। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর উভয় পক্ষ কয়েকটি শর্ত সাপেক্ষে ২য় বল্ডউইনের মুক্তির বিষয়ে সম্মত হয়। শর্তগুলো হলো-
১. মুক্তিপণ হিসেবে ২য় বল্ডউইন আশি হাজার দিনার পরিশোধ করবেন। এর মধ্যে বিশ হাজার দিনার অগ্রীম প্রদান করতে হবে, বাকিটা পরিশোধ করতে হবে বন্দিমুক্তির পর।
২. এন্টিয়ক রাজ্যের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে ২য় বল্ডউইন আযাষ, আসারিব, যারদানা, জাযার ও কাফারতাব দুর্গের নিয়ন্ত্রণ আলেপ্পো রাজ্যের হাতে ফিরিয়ে দেবেন।
৩. রাজা ২য় বল্ডউইন আরব বংশোদ্ভূত শিয়া নেতা দুবাইস বিন সাদাকাকে দমনের বিষয়ে তামারতাশকে সহযোগিতা করবেন।
দুবাইস ইরাকের আব্বাসি খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার পর পালিয়ে জাযিরা অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিল।
৪. শর্ত পূরণের নিশ্চয়তা হিসেবে বল্ডউইন কিছু লোককে মুসলমানদের কাছে জিম্মি রাখবেন। তিনি যতদিন না প্রতিশ্রুত অর্থ ও দুর্গসমূহের নিয়ন্ত্রণ মুসলমানদের বুঝিয়ে দেবেন, ততদিন তারা মুসলমানদের কাছে জিম্মি থাকবে।
জিম্মি হিসেবে ক্রুসেডারদের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নাম নির্ধারণ করা হয়। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল রাজা ২য় বল্ডউইনের পাঁচ বছর বয়সী এক কন্যা এবং এডেসার শাসক জোসেলিনের পুত্র ২য় জোসেলিন। শর্ত ছিল, দাবি পূরণের আগ পর্যন্ত এরা মধ্যস্থতাকারী শাইজারের আমির সুলতান বিন মুনকিযের হেফাজতে থাকবে।
এক বছরেরও অধিক সময় বন্দি থাকার পর অবশেষে ২য় বল্ডউইন মুক্তি লাভ করেন। ছাড়া পেয়ে প্রথমে তিনি এন্টিয়কে গমন করেন এবং সেখানে পৌঁছে এন্টিয়কের গির্জাধ্যক্ষ বার্নার্ড ডি ফালিন্সের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পারস্পরিক আলোচনার পর তারা সিদ্ধান্ত নেন যে, আলেপ্পোর হাতে বিভিন্ন দুর্গ সমর্পণের শর্তটি তারা পালন করবেন না। এরপর বিষয়টি তারা পত্রের মাধ্যমে তামারতাশকে জানিয়ে দেন!
টিকাঃ
১৬০. প্রাগুক্ত, ৯/২২৭।
১৬১. উসামা বিন মুনকিয, আল-ই'তিবার, পৃষ্ঠা: ১২০।
১৬২. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২২১।
১৬৩. উসামা বিন মুনকিয, আল-ই'তিবার, পৃষ্ঠা: ১০৩।
📄 সুর নগরীর পতন
বাল্ক বিন বাহরামের মোকাবিলায় ২য় বল্ডউইনের উত্তরে আগমন, বাহরামের হাতে পাকড়াও, কারাগারে বন্দি জীবনযাপন—এই পুরোটা সময় ক্রুসেডারদের একটি বাহিনী ভেনিস থেকে আগত একটি বিশাল নৌবহরের সহায়তায় লেবাননের সুর নগরী অবরোধ করে রেখেছিল।
পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সুর ছিল ভূমধ্যসাগরের শাম উপকূলের সেই দুই ইসলামি নগরীর একটি, যা তখনও মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অপর নগরীটি হলো আসকালান। এভাবেও বলা চলে যে, সাগরপথে অবশিষ্ট ইসলামি বিশ্ব হতে প্রেরিত যাবতীয় সহায়তা এ অঞ্চলে পৌঁছার মাত্র দুটি করিডোর তখনও খোলা ছিল, সুর ছিল তার একটি। আর তাই কেবল দুর্ভেদ্য নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণেই নয়; এ বিবেচনায়ও মুসলমানদের কাছে সুর নগরীর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
সুর নগরীর পতন
৫০৬ হিজরি সন (১11২ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে সুর নগরী দামেশকের আমির তুগতেকিনের তত্ত্বাবধানে ছিল। কিন্তু মিশরের নিকৃষ্ট উবায়দি প্রশাসন এ সময় শাম অঞ্চলে মুসলমানদের দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বারবার সুর দখলের চেষ্টা চালায়। তারা ষড়যন্ত্র করে তুগতেকিন নিযুক্ত সুরের আমির মাসউদকে সরিয়ে দেয়। অথচ উন্নত সামরিক দক্ষতা ও জিহাদি চেতনার অধিকারী মাসউদ দীর্ঘ এগারো বছর বীরত্বের সঙ্গে ক্রুসেডারদের প্রতিটি আক্রমণ প্রতিহত করে নগরীটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিলেন। উবায়দি শিয়ারা নগরীটি অধিকার করার পর এর নিরাপত্তা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়। ক্রুসেডাররা সুর নগরী ঘিরে কঠিন অবরোধ আরোপ করে। পানাহারদ্রব্য ফুরিয়ে যেতে থাকায় নগরীটি পতনোন্মুখ হয়ে পড়ে। সংবাদ পেয়ে তুগতেকিন দ্রুত অগ্রসর হলে ত্রিপোলির শাসক পন্স তার বাহিনী নিয়ে তুগতেকিনের পথরোধ করেন। অবশ্য তুগতেকিন শেষ পর্যন্ত ক্রুসেডারদের সঙ্গে সমঝোতা করতে সক্ষম হন। সিদ্ধান্ত হয় নগরীটির নিয়ন্ত্রণ ক্রুসেডারদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে; বিনিময়ে নগরীটির সকল নাগরিককে নিরাপত্তা প্রদান করা হবে। চুক্তি সম্পন্ন হলে ক্রুসেডাররা সুর নগরীতে প্রবেশ করে নগরবাসীকে বের করে দেয়। ক্রুসেডাররা শাম অঞ্চলে আগমনের দীর্ঘ পঁচিশ বছরেরও অধিক সময় পর ৫১৮ হিজরির ২৩ জুমাদাল উলা মাসে (১১২৪ খ্রিষ্টাব্দের জুলাইয়ের শুরুতে) মুসলমানদের বেদখল হয়ে যায় সুরক্ষিত সুর নগরী !
মুসলমানদের জন্য এটি ছিল অনেক বড় এক আঘাত। এদিকে বল্ডউইনের মুক্তি-চুক্তির শর্তপূরণে গড়িমসি আর ওদিকে সুরক্ষিত সুর নগরীর পতন একই সময়ে সংঘটিত দুটি ঘটনায় আঘাত আরও গভীর হয়। মুসলমানরা হেলায় হারিয়ে ফেলে হাতে থাকা অতি মূল্যবান এক সুযোগ!
সুর নগরীর পতনে বল্ডউইনের মনোবল অনেক বেড়ে যায়। তিনি এবার মুসলমানদেরকে প্রদত্ত দুর্গ হস্তান্তরের অঙ্গীকার ভঙ্গ করার পাশাপাশি পুরো চুক্তিই প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত নেন। বল্ডউইন এ সময় তামারতাশের প্রতিপক্ষ দুবাইস বিন সাদাকার সঙ্গে মিত্রতা করেন। অথচ চুক্তিতে তিনি দুবাইসকে দমনে তামারতাশকে সহযোগিতা করার অঙ্গীকার করেছিলেন। এরপর বল্ডউইন বাইতুল মুকাদ্দাস ও এন্টিয়কের বাহিনীকে একসঙ্গে জড়ো করেন। জোসেলিনের নেতৃত্বে এডেসার বাহিনী তাদের সঙ্গে যোগ দেয়, যুক্ত হয় দুবাইস বিন সাদাকার শিয়া বাহিনীও। এই সম্মিলিত বাহিনী আলেপ্পো অবরোধের লক্ষ্যে অগ্রসর হয়। আলেপ্পোর শাসক হুসামুদ্দিন তামারতাশ তখন সম্ভাব্য সংঘাতকেন্দ্র থেকে বহু দূরে মারদিনে অবস্থান করছেন!
নিশ্চিত করেই বলা যায়, বল্ডউইন এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন যে, তার প্রতিপক্ষ মুসলিম নেতা ভুলেও জিম্মিদের হত্যা করবেন না। এর কারণ শুধু এই নয় যে, তামারতাশ শক্তির দিক থেকে দুর্বল ছিলেন কিংবা তিনি জানেন যে, ইসলামি শরিয়তে শিশুহত্যা বৈধ নয়; বরং বল্ডউইন জানতেন যে, তামারতাশ প্রতিপক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগের এমন মূল্যবান ঘুঁটি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাতে রাখতে চেষ্টা করবেন। আর তাই বল্ডউইন পরিকল্পনা করেন, তিনি উল্টো তামারতাশের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবেন এবং চাপ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য শেষ পর্যন্ত তাকে জিম্মিদের ছেড়ে দিতে বাধ্য করবেন।
আলেপ্পোবাসীর অবস্থা তখন চরম শোচনীয়। ২য় বল্ডউইন, জোসেলিন ও দুবাইস বিন সাদাকার সম্মিলিত বাহিনী যখন আলেপ্পোকে ঘিরে ফেলেছে, আলেপ্পোতে তখন এমন কোনো নেতা নেই, যিনি এই বিরাট বাহিনীর মোকাবিলা করে নগরীটির প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করবেন।
সত্যিই আলেপ্পো তখন এক কঠিন সংকটের মুখোমুখি!
টিকাঃ
১৬৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২৭।
১৬৫. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২১১।
১৬৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২৮-২২৯।
১৬৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৩০, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২২১ ও Setton: op. cit., 1,p. 423-424.
বাল্ক বিন বাহরামের মোকাবিলায় ২য় বল্ডউইনের উত্তরে আগমন, বাহরামের হাতে পাকড়াও, কারাগারে বন্দি জীবনযাপন—এই পুরোটা সময় ক্রুসেডারদের একটি বাহিনী ভেনিস থেকে আগত একটি বিশাল নৌবহরের সহায়তায় লেবাননের সুর নগরী অবরোধ করে রেখেছিল।
পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সুর ছিল ভূমধ্যসাগরের শাম উপকূলের সেই দুই ইসলামি নগরীর একটি, যা তখনও মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অপর নগরীটি হলো আসকালান। এভাবেও বলা চলে যে, সাগরপথে অবশিষ্ট ইসলামি বিশ্ব হতে প্রেরিত যাবতীয় সহায়তা এ অঞ্চলে পৌঁছার মাত্র দুটি করিডোর তখনও খোলা ছিল, সুর ছিল তার একটি। আর তাই কেবল দুর্ভেদ্য নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণেই নয়; এ বিবেচনায়ও মুসলমানদের কাছে সুর নগরীর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
সুর নগরীর পতন
৫০৬ হিজরি সন (১11২ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে সুর নগরী দামেশকের আমির তুগতেকিনের তত্ত্বাবধানে ছিল। কিন্তু মিশরের নিকৃষ্ট উবায়দি প্রশাসন এ সময় শাম অঞ্চলে মুসলমানদের দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বারবার সুর দখলের চেষ্টা চালায়। তারা ষড়যন্ত্র করে তুগতেকিন নিযুক্ত সুরের আমির মাসউদকে সরিয়ে দেয়। অথচ উন্নত সামরিক দক্ষতা ও জিহাদি চেতনার অধিকারী মাসউদ দীর্ঘ এগারো বছর বীরত্বের সঙ্গে ক্রুসেডারদের প্রতিটি আক্রমণ প্রতিহত করে নগরীটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিলেন। উবায়দি শিয়ারা নগরীটি অধিকার করার পর এর নিরাপত্তা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়। ক্রুসেডাররা সুর নগরী ঘিরে কঠিন অবরোধ আরোপ করে। পানাহারদ্রব্য ফুরিয়ে যেতে থাকায় নগরীটি পতনোন্মুখ হয়ে পড়ে। সংবাদ পেয়ে তুগতেকিন দ্রুত অগ্রসর হলে ত্রিপোলির শাসক পন্স তার বাহিনী নিয়ে তুগতেকিনের পথরোধ করেন। অবশ্য তুগতেকিন শেষ পর্যন্ত ক্রুসেডারদের সঙ্গে সমঝোতা করতে সক্ষম হন। সিদ্ধান্ত হয় নগরীটির নিয়ন্ত্রণ ক্রুসেডারদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে; বিনিময়ে নগরীটির সকল নাগরিককে নিরাপত্তা প্রদান করা হবে। চুক্তি সম্পন্ন হলে ক্রুসেডাররা সুর নগরীতে প্রবেশ করে নগরবাসীকে বের করে দেয়। ক্রুসেডাররা শাম অঞ্চলে আগমনের দীর্ঘ পঁচিশ বছরেরও অধিক সময় পর ৫১৮ হিজরির ২৩ জুমাদাল উলা মাসে (১১২৪ খ্রিষ্টাব্দের জুলাইয়ের শুরুতে) মুসলমানদের বেদখল হয়ে যায় সুরক্ষিত সুর নগরী !
মুসলমানদের জন্য এটি ছিল অনেক বড় এক আঘাত। এদিকে বল্ডউইনের মুক্তি-চুক্তির শর্তপূরণে গড়িমসি আর ওদিকে সুরক্ষিত সুর নগরীর পতন একই সময়ে সংঘটিত দুটি ঘটনায় আঘাত আরও গভীর হয়। মুসলমানরা হেলায় হারিয়ে ফেলে হাতে থাকা অতি মূল্যবান এক সুযোগ!
সুর নগরীর পতনে বল্ডউইনের মনোবল অনেক বেড়ে যায়। তিনি এবার মুসলমানদেরকে প্রদত্ত দুর্গ হস্তান্তরের অঙ্গীকার ভঙ্গ করার পাশাপাশি পুরো চুক্তিই প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত নেন। বল্ডউইন এ সময় তামারতাশের প্রতিপক্ষ দুবাইস বিন সাদাকার সঙ্গে মিত্রতা করেন। অথচ চুক্তিতে তিনি দুবাইসকে দমনে তামারতাশকে সহযোগিতা করার অঙ্গীকার করেছিলেন। এরপর বল্ডউইন বাইতুল মুকাদ্দাস ও এন্টিয়কের বাহিনীকে একসঙ্গে জড়ো করেন। জোসেলিনের নেতৃত্বে এডেসার বাহিনী তাদের সঙ্গে যোগ দেয়, যুক্ত হয় দুবাইস বিন সাদাকার শিয়া বাহিনীও। এই সম্মিলিত বাহিনী আলেপ্পো অবরোধের লক্ষ্যে অগ্রসর হয়। আলেপ্পোর শাসক হুসামুদ্দিন তামারতাশ তখন সম্ভাব্য সংঘাতকেন্দ্র থেকে বহু দূরে মারদিনে অবস্থান করছেন!
নিশ্চিত করেই বলা যায়, বল্ডউইন এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন যে, তার প্রতিপক্ষ মুসলিম নেতা ভুলেও জিম্মিদের হত্যা করবেন না। এর কারণ শুধু এই নয় যে, তামারতাশ শক্তির দিক থেকে দুর্বল ছিলেন কিংবা তিনি জানেন যে, ইসলামি শরিয়তে শিশুহত্যা বৈধ নয়; বরং বল্ডউইন জানতেন যে, তামারতাশ প্রতিপক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগের এমন মূল্যবান ঘুঁটি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাতে রাখতে চেষ্টা করবেন। আর তাই বল্ডউইন পরিকল্পনা করেন, তিনি উল্টো তামারতাশের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবেন এবং চাপ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য শেষ পর্যন্ত তাকে জিম্মিদের ছেড়ে দিতে বাধ্য করবেন।
আলেপ্পোবাসীর অবস্থা তখন চরম শোচনীয়। ২য় বল্ডউইন, জোসেলিন ও দুবাইস বিন সাদাকার সম্মিলিত বাহিনী যখন আলেপ্পোকে ঘিরে ফেলেছে, আলেপ্পোতে তখন এমন কোনো নেতা নেই, যিনি এই বিরাট বাহিনীর মোকাবিলা করে নগরীটির প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করবেন।
সত্যিই আলেপ্পো তখন এক কঠিন সংকটের মুখোমুখি!
টিকাঃ
১৬৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২৭।
১৬৫. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২১১।
১৬৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২৮-২২৯।
১৬৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৩০, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২২১ ও Setton: op. cit., 1,p. 423-424.