📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [এক] সেলজুক সুলতান মুহাম্মদ

📄 [এক] সেলজুক সুলতান মুহাম্মদ


সুলতান মুহাম্মাদ মাত্র সাইত্রিশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তিনি পুরো সেলজুকশক্তিকে একীভূত করে এক বিরাট সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা আব্বাসি খিলাফত ও সমকালীন মুসলিম জনসাধারণের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযান প্রেরণ করেন। তন্মধ্যে মওদুদের আমলে কিছু অভিযান সফলতার মুখ দেখে, আবার আক সুনকুর ও বুরসুক বিন বুরসুকের আমলে প্রেরিত অভিযানসমূহ ব্যর্থ হয়। ইবনুল আছির রহ. তার সম্পর্কে বলেছেন, 'তিনি ন্যায়পরায়ণ, সচ্চরিত্র ও সাহসী ছিলেন।' তবে তার অন্যতম বড় বিচ্যুতি ছিল নিজ পুত্র মাহমুদকে পরবর্তী সুলতান নির্বাচন। অথচ তখন মাহমুদের বয়স ছিল মাত্র চৌদ্দ বছর!
পরিতাপের বিষয় হলো, বয়সে যত ছোটই হোক, নিজের বংশীয় উত্তরাধিকারীকে পরবর্তী শাসক নিযুক্ত করে যাওয়া যেন সে সময়ের রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই অপ্রাপ্তবয়স্ক শাসক হতেন কাগজে-কলমেই ক্ষমতাবান, প্রকৃত ক্ষমতা চলে যেত তার অভিভাবক ও তত্ত্বাবধায়কের হাতে এবং রাজ্য পরিচালিত হতো তত্ত্বাবধায়কের মর্জিমতো।
সুলতান মুহাম্মাদের মৃত্যু ও সুলতান মাহমুদের দায়িত্বগ্রহণের ফলে সেলজুক সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে বিবাদ-বিসংবাদ ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়, সেলজুকরা হারিয়ে ফেলে নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি। বিবাদ একপর্যায়ে সশস্ত্র লড়াইয়ে রূপ নেয়; সুলতান মাহমুদ তার দুই ভাই মাসউদ ও তুগরল এবং চাচা সানজারের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। এসব অন্তঃকলহ হিলাল-ছালিব সংঘাতে অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ক্রুসেডারদের কথা ভুলে মুসলিম শিবির ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজেদের নিয়ে!

টিকাঃ
১১৯. প্রাগুক্ত, ৩/১৬৭-১৬৮।
১২০, প্রাগুক্ত, ৯/১৮১-১৮৫, ১৯১-১৯২।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [দুই] আলেপ্পোর শাসক বদরউদ্দিন লুলু

📄 [দুই] আলেপ্পোর শাসক বদরউদ্দিন লুলু


পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, আলেপ্পোর শাসক পদে সুলতান শাহ অধিষ্ঠিত থাকলেও কার্যনির্বাহী ক্ষমতা মূলত তার আতাবিক বদরউদ্দিন লুলুর হাতেই ছিল। বদরউদ্দিন লুলুকে তার জনৈক সহযোগী হত্যা করে। রিজওয়ানের মৃত্যু ও তার পুত্র আলপ আরসালানের হত্যাকাণ্ডের পর বিগত কয়েক বছর আলেপ্পো-পরিস্থিতি এমনিতেই বেশ অশান্ত ছিল, আর এর পরপরই ঘটে বদরউদ্দিন লুলুর নিহত হওয়ার ঘটনা। তাই রাজ্যের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এ সময় পরিস্থিতির পরিবর্তনে সচেষ্ট হয়। তারা আশেপাশের অঞ্চলসমূহের বিবেচনায় তুলনামূলক শ্রেষ্ঠতম শাসক ইলগাজি বিন উরতুকের কাছে গিয়ে তার হাতে আলেপ্পোর শাসনভার অর্পণ করে। ফলে হঠাৎ করেই ইলগাজি মারদিন ও আলেপ্পো উভয় অঞ্চলের শাসকে পরিণত হন। ইলগাজির জন্য এটি অবশ্য নির্ভেজাল উপহার ছিল না! আলেপ্পোর দায়িত্ব গ্রহণ করার পরই তিনি বিভিন্ন রকম সমস্যার মুখোমুখি হন। রিজওয়ানের জমানো অবৈধ সম্পদের পুরোটাই বদরউদ্দিন খরচ করে ফেলায় রাজ্যের কোষাগার ছিল কার্যত শূন্য। এভাবে এ অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য হওয়া সত্ত্বেও আলেপ্পো এ সময় পরিণত হয় করুণা ও অনুকম্পার পাত্রে।

টিকাঃ
১২১. প্রাগুক্ত।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [তিন] আব্বাসি খলিফা মুসতায়হির বিল্লাহ

📄 [তিন] আব্বাসি খলিফা মুসতায়হির বিল্লাহ


আটাশতম আব্বাসি খলিফা মুসতাযহির বিল্লাহ ৪৮৭ হিজরি থেকে ৫১২ হিজরি সন (১০৯৪-১১১৮ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর খলিফা পদে অধিষ্ঠিত হন তার পুত্র মুসতারশিদ বিল্লাহ। নতুন খলিফা পূর্ববর্তী খলিফাদের মতো ছিলেন না। তিনি ছিলেন উচ্চাভিলাষী, উন্নত মনোবল ও কঠোর ব্যক্তিত্বের অধিকারী, নির্ভীক ও সাহসী। তিনি ফকিহ আলিম ছিলেন। হাদিসশাস্ত্রের বিখ্যাত ইমাম ইবনুস সালাহ রহ. শাফিয়ি মাজহাবের শ্রেষ্ঠতম আলিমদের তালিকায় তার নাম উল্লেখ করেছেন। ইবনুস সালাহ-এর ন্যায় একজন বিদগ্ধ শাস্ত্রজ্ঞের এই স্বীকৃতিকে নিঃসন্দেহে খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য করা যায়। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে আমরা লক্ষ করব যে, খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর খিলাফতকাল ইসলামি অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখে যেতে সক্ষম হবে। কারণ বিগত দুই শতাব্দীর অন্যান্য খলিফার ন্যায় তিনি কাগুজে খলিফা হওয়াকে মেনে নেবেন না; বরং খলিফা পদ ও খলিফার মতামত যেন সকলের কাছে ওজনদার বিবেচিত হয়, এমন পরিবেশ-পরিস্থিতি তৈরিতে সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকবেন। তার এই প্রচেষ্টা নিশ্চিত করেই এ অঞ্চলে বিভিন্ন সংঘাতের জন্ম দেবে, যা চলমান ঘটনাপ্রবাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।

টিকাঃ
১২২. প্রাগুক্ত, ৯/১৭৩।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [চার] বাইতুল মুকাদ্দাস সাম্রাজ্যের রাজা ১ম বল্ডউইন

📄 [চার] বাইতুল মুকাদ্দাস সাম্রাজ্যের রাজা ১ম বল্ডউইন


১ম বল্ডউইনকেই বাইতুল মুকাদ্দাস সাম্রাজ্যের মূল প্রতিষ্ঠাতা গণ্য করা হয়। তিনি তার শাসনামলে বাইতুল মুকাদ্দাস সাম্রাজ্যকে যে বিস্তৃত সীমানায় পৌঁছিয়ে দিয়েছিলেন, পরবর্তী দশকের পর দশক তা অক্ষত ছিল। তিনি আসকালান ব্যতীত ফিলিস্তিন অঞ্চলের সকল নগরীর পতন ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন, অধিকার করেছিলেন সুর নগরী বাদে লেবানন অঞ্চলের পুরো দক্ষিণার্ধ। তিনি মিশরের ফারামা অঞ্চল দখল করার পর সেখান থেকে ফেরার পথে ৫১১ হিজরি সনে (১১১৮ খ্রিষ্টাব্দে) আরিশ অঞ্চলে ইহধাম ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর পর ক্রুসেডারদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে তার চাচাতো ভাই ও এডেসার শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গ বাইতুল মুকাদ্দাস সাম্রাজ্যের নতুন রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হন। নিঃসন্দেহে এই মনোনয়ন ছিল বল্ডউইন ডি বুর্গের জন্য অভাবনীয় উন্নতির নিদর্শন। কারণ, আল-কুদস নগরীর অত্যুচ্চ মর্যাদা ও বাইতুল মুকাদ্দাস সাম্রাজ্যের বিস্তৃত আয়তনের কারণে বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসকই অন্য ক্রুসেড রাজ্যগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। তা ছাড়া ক্রুসেডারদের প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য রাষ্ট্র ইমারত বা রাজ্য পর্যায়ের হলেও বাইতুল মুকাদ্দাস ছিল একটি পরিপূর্ণ রাষ্ট্র。
এরপর থেকে বল্ডউইন ডি বুর্গ '২য় বল্ডউইন' নামে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসে চলে আসার সময় তার ফুফাতো ভাই জোসেলিন ডি কার্টেনিকে এডেসা রাজ্যের শাসক নির্বাচিত করেন। যদিও ইতিপূর্বে তিনি জোসেলিনকে তিল-বাশিরের প্রশাসক পদ থেকে বরখাস্ত করেছিলেন; কিন্তু ততদিনে উভয়ের মধ্যকার বিরোধের অবসান ঘটেছিল। ২য় বল্ডউইন এক্ষেত্রে এ বিষয়টিও বিবেচনা করেন যে, এডেসাসহ শামের উত্তরাঞ্চল সম্পর্কে জোসেলিনের বেশ ভালো জানা- শোনা আছে।

টিকাঃ
১২০. প্রাগুক্ত, ৯/১৭৮।
১২৪. Guillaume de Tyr, 1, p.. 519 & Runciman: op. cit., II, pp. 143-144.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00