📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [দশ] উত্তরাঞ্চলের আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী

📄 [দশ] উত্তরাঞ্চলের আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী


মওদুদের মৃত্যুর পর এডেসার শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গ নিজেকে অনেকটা নিরাপদ ভাবতে থাকেন। এ সময় তিনি অনুভব করেন যে, এডেসা নগরীর মূল চালিকাশক্তি আর্মেনীয়দের হত্যা ও বিতাড়নের কারণে নগরীটির সামগ্রিক পরিস্থিতি অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। যেহেতু ইতিমধ্যে 'মওদুদ সমস্যা'র সমাধান হয়ে গেছে, তাই তার দৃষ্টিতে আর্মেনীয়দের পুনরায় এডেসায় ফিরিয়ে আনাতে কোনো সমস্যা ছিল না। আর্মেনীয়রাও বল্ডউইনের আহ্বানে দ্বিধাহীন চিত্তে সাড়া দিয়ে নিজেদের বাড়িঘর ও কৃষিক্ষেত্র ফিরে পাওয়ার সুযোগ কাজে লাগায়। অবশ্য এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, মনে ক্রুসেডারদের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা ও বিদ্বেষ সুপ্ত রেখেই তারা এডেসায় ফিরে আসে। এ আশঙ্কাও তাদের মনে ছিল যে, ক্রুসেডাররা ভবিষ্যতেও তাদের ওপর দমননীতি চালাতে পারে; আবারও ফিরে আসতে পারে গণহত্যা ও গণবিতাড়নের মতো বিয়োগান্ত ঘটনা।
এডেসার অধিবাসী আর্মেনীয়রা বাহ্যত ক্রুসেডারদের সঙ্গে সহাবস্থান মেনে নিলেও এডেসার বাইরের আর্মেনীয়দের অবস্থান ছিল ভিন্ন। তারা ক্রুসেডারদের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময়ের আহ্বান পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে। বরং ৫০৬ হিজরি সনে (১112 খ্রিষ্টাব্দে) মৃত্যুবরণকারী আর্মেনীয় নেতা কোগ বাসিলের বিধবা স্ত্রী ৫০৮ হিজরি সনে (১১১৪ খ্রিষ্টাব্দে) কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়া মসুলের প্রশাসক আক সুনকুরের কাছে তাকে ও তার জনগণকে মসুলের অধীনস্থ করে নেওয়ার জন্য সুস্পষ্ট ভাষায় আবেদন জানান এবং আনুগত্যের নিদর্শন হিসেবে জিজিয়া কর প্রদানের অঙ্গীকার করেন।
এভাবেই একের পর এক ঘটনা এ বিষয়টি প্রমাণ করে যে, আর্মেনীয় খ্রিষ্টানরা তাদের স্বধর্মীয় ক্রুসেডারদের চেয়ে মুসলমানদের উদারতা ও ন্যায়বিচারের প্রতি হাজার গুণ বেশি আস্থা রাখত।
সারকথা এই দাঁড়াল যে, মহান মুজাহিদ মওদুদের মৃত্যুপরবর্তী পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে এ অঞ্চলে বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হয়, যার সিংহভাগই ছিল ক্রুসেডারদের অবস্থান দৃঢ়করণে সহায়ক। পাশাপাশি মুসলিম রাজ্যগুলোতেও বেশ কিছু রাজনৈতিক রদবদল ঘটে, যার বেশিরভাগই ইতিবাচক ছিল না। একমাত্র ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত করা যায় আলেপ্পোর শাসক রিজওয়ান বিন তুতুশের মৃত্যুকে, যার মাধ্যমে মুসলমানরা এক দাম্ভিক অত্যাচারীর অপশাসন থেকে নিষ্কৃতি লাভ করে।

টিকাঃ
১১৭. Grousset: Hist. des. Croisades 1, pp. 491.
১১৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ২/১৫৩-১৫৪।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিয়োগ-ঘটনা

📄 গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিয়োগ-ঘটনা


এরপর ৫১১ হিজরি সনের শেষভাগে, ৫১২ হিজরি সনে এবং ৫১৩ হিজরি সনের শুরুতে (১১১৭ ও ১১১৮ খ্রিষ্টাব্দে) হিলাল-ছালিব উভয় শিবিরে বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বিয়োগ ঘটনা ঘটে, যা উভয় শিবিরের চলমান সংঘাতে মৌলিক পরিবর্তনের কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 বালাতের যুদ্ধ

📄 বালাতের যুদ্ধ


পূর্বেই আমরা উল্লেখ করেছি যে, আলেপ্পো-প্রশাসনের মূল নিয়ন্ত্রক বদরউদ্দিন লুলুর মৃত্যুর পর রাজ্যটি নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ায় রাজ্যটির উলামায়ে কেরাম ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের একটি প্রতিনিধিদল মারদিনের আমির ইলগাজি বিন উরতুকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রাজ্যের দায়িত্বভার তার হাতে তুলে দেয়। এ সময় এন্টিয়কের শাসক রজার আলেপ্পোতে সৃষ্ট প্রচণ্ড দুর্বল পরিস্থিতির সদ্ব্যবহার করে নগরীটিকে নিজ রাজ্যভুক্ত করার প্রচেষ্টা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। ক্রুসেডারদের যুদ্ধপ্রস্তুতির সংবাদ জানতে পেরে ইলগাজিও তৎপর হয়ে ওঠেন। তিনি আলেপ্পো নগরীর প্রতিরক্ষার লক্ষ্যে বিভিন্ন স্থান থেকে সেনাসংগ্রহ শুরু করেন। দামেশকের আমির তুগতেকিন এ সময় ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সম্মতি প্রকাশ করায় তিনি তার সঙ্গে মিলে একটি শক্তিশালী জোট গড়তে সক্ষম হন। তুগতেকিনের এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে, মওদুদ রহ.-এর মৃত্যুর পর তিনি হৃদ্যতাবশত ক্রুসেডারদের সঙ্গে মিত্রতা করেননি; বরং পরিস্থিতির নাজুকতায় অসহায় হয়েই এমন ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মুসলিম জোটে আরও যোগ দেন শাইজারের আমির সুলতান বিন মুনকিয, যিনি মওদুদের আমলেও বেশ কয়েকটি ক্রুসেডবিরোধী অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
সকলের সহযোগিতায় একটি শক্তিশালী বাহিনী গঠন করার পর ইলগাজি এন্টিয়ক অভিমুখে যাত্রা করেন। আরতাহ-এর নিকটবর্তী বিস্তৃত সমতল ভূমিতে মুসলিম বাহিনী অতর্কিতে এন্টিয়কের ক্রুসেডার বাহিনীর ওপর আপতিত হয় এবং তাদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে।
মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল বিশ হাজার। অপরদিকে এন্টিয়কের বাহিনীতে পদাতিক ও অশ্বারোহী যোদ্ধা মিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার সৈন্য ছিল। রজার ইতিমধ্যে বাইতুল মুকাদ্দাসের নতুন শাসক ২য় বল্ডউইনের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করে বার্তা প্রেরণ করেছিলেন। বল্ডউইনও ত্রিপোলির শাসক পন্সকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত আগমনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহর তাআলার অনুগ্রহে সহায়ক ক্রুসেডার বাহিনী আগমনের পূর্বেই মুসলিম বাহিনী অতর্কিতে তাদের ওপর আক্রমণ চালাতে সক্ষম হয়।
সমতল প্রান্তরটিতে সংঘটিত হয় ক্রুসেড ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক যুদ্ধ। ইতিহাসে যুদ্ধটি 'বালাতের যুদ্ধ' নামে খ্যাত। ৫১৩ হিজরি সনের ১৬ রবিউল আউয়াল (১১১৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ জুন) সংঘটিত এ যুদ্ধে ক্রুসেডার বাহিনী সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যায়। এন্টিয়ক অধিপতি রজারও নিহত হন। প্রচুর সৈন্য নিহত হওয়ায় পরবর্তী সময়ে ক্রুসেডাররা ল্যাটিন ভাষায় জায়গাটির নামকরণ করে ager sanguinis (রক্তের প্রান্তর)!
মালাতিয়া • মারদিন
সুমাইসাত মারআশ এডেসা আদরেরা সিনজার আদানা মপসুয়েসাটিয়া তিল-বাশির মসুল হাররান হিরাক্লিয়া ইসকানদারুন আরতাহ এন্টিয়ক সারুজ লাতাকিয়া মাআরিরাতুন • মানবিজ জাবালা নোমান •আলেপ্পো বানিয়াস তারতুস শাইজার ইরকা • হিমস ত্রিপোলি ব্যাবলস • বালাবাকু বৈরুত সিডন সুর আক্কা হাইফা • দামেশক
• তাবারিয়া
মানচিত্র নং-২৫ বালাতের যুদ্ধ
সর্ববিচারেই এটি ছিল এক ঐতিহাসিক ও মহিমান্বিত বিজয়। বালাতের বিজয় চলমান পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। যেমন :
১. এ যুদ্ধ মুসলমানদের প্রভাব পুনরুদ্ধারে এবং হতাশায় আচ্ছন্নদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখে। মুসলমানরা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে, জাতির ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
২. ক্রুসেডাররা বিরাট মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়ের শিকার হয়, যা পরবর্তী বছরগুলোতে তাদের তৎপরতায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
৩. এ যুদ্ধের পর আলেপ্পো নিয়মতান্ত্রিকভাবে উরতুকিদের শাসনে চলে যায়, যা বহাল ছিল পরবর্তী পূর্ণ ছয় বছর।
৪. এন্টিয়ক এমন একসময় শাসকহারা হয়ে পড়ে, যখন দায়িত্ব গ্রহণের উপযুক্ত বিকল্প কোনো নেতা বা প্রয়াত শাসক রজারের কোনো উত্তরাধিকারী ছিল না। অপ্রাপ্তবয়স্ক ২য় বোহেমন্ড তখনও ইতালিতেই ছিল। এ কারণে বাইতুল মুকাদ্দাস সাম্রাজ্যের রাজা ২য় বল্ডউইন এন্টিয়কের তত্ত্বাবধান করতে থাকেন এবং এন্টিয়কের গির্জাধ্যক্ষ বার্নার্ড ডি ফালিন্স-এর সহায়তায় নতুন করে রাজ্যটির প্রশাসনিক বিন্যাস শুরু করেন।
৫. ক্রুসেডবিরোধী সমরাঙ্গনে নতুন তারকা হিসেবে আবির্ভূত হন ইলগাজি বিন উরতুক। নতুন আব্বাসি খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর পক্ষ থেকে ইলগাজিকে সম্মানসূচক উপহার প্রেরণ করা হয়। কবি-সাহিত্যিকগণ তার প্রশংসায় কবিতা রচনা করে। অনেক মুসলিম জনসাধারণ তাকে নিয়ে স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করে। এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইলগাজি নতুন করে আরও কয়েকটি যুদ্ধে ক্রুসেডারদের মুখোমুখি হন। কিছু যুদ্ধে তিনি বিজয়ী হন, পরাজয়ও ভাগ্যে জোটে কিছু যুদ্ধে। অবশ্য এসব যুদ্ধ গুরুত্ব ও প্রভাব বিচারে ঐতিহাসিক বালাতের যুদ্ধের সমস্তরের ছিল না।
মওদুদ রহ.-এর শাহাদাতের ছয় বছর পর ৫১৩ হিজরি সনে (১১১৯ খ্রিষ্টাব্দে) এসে সার্বিক পরিস্থিতি যে রূপ ধারণ করে, তা আমরা সংক্ষেপে নিম্নোক্ত কয়েকটি পয়েন্টে তুলে ধরতে পারি।
১. বাইতুল মুকাদ্দাস সাম্রাজ্য এখন '২য় বল্ডউইন' উপাধিধারী বল্ডউইন ডি বুর্গের শাসনাধীন।
২. এডেসা রাজ্যের শাসক পদে আছেন জোসেলিন।
৩. এন্টিয়ক রাজ্য আপাতত ২য় বল্ডউইনই দেখাশোনা করছেন। ২য় বোহেমন্ড পরিণত বয়সে উপনীত হয়ে ইতালি থেকে আগমন করলে তিনি তার হাতে এন্টিয়কের শাসনভার তুলে দেবেন।
৪. ত্রিপোলি রাজ্যের শাসক পদে বারট্রামের পুত্র পন্স অধিষ্ঠিত আছেন।
৫. মুসলিম রাজ্য আলেপ্পো এখন ইলগাজি বিন উরতুকের কর্তৃত্বাধীন। এ সময় তিনিই ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জিহাদে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।
৬. দামেশকের শাসনক্ষমতা তুগতেকিনের হাতেই আছে। তিনি নতুন করে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছেন। কেবল এন্টিয়ক রাজ্যের বিরুদ্ধেই নয়; ইতিমধ্যে তিনি দক্ষিণে বাইতুল মুকাদ্দাস সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধেও লড়াই শুরু করেছেন।
৭. মসুলের প্রশাসক পদে অধিষ্ঠিত আছেন বাহ্যত সুলতান মাহমুদের অনুগত জুয়ুশ বেগ। অবশ্য সুলতান মাহমুদের ভাই মাসউদ এ সময় মসুলেই অবস্থান করছিলেন। মাসউদ মসুল নগরীকে সুলতান মাহমুদের কর্তৃত্বাধীন সেলজুক সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিজের অধীনে আনার লক্ষ্যে জুয়ুশ বেগের সহায়তায় ভাই মাহমুদের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন।
৮. আইনগত ও আনুষ্ঠানিকভাবে সুলতান মাহমুদই ছিলেন সেলজুকদের প্রধান নেতা। কিন্তু অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে এ সময় সেলজুক সাম্রাজ্য কার্যত বিভক্ত ছিল।
৯. আব্বাসি খিলাফতের লাগাম এখন খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর হাতে। তিনি সেলজুক সুলতানের নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে এসে খিলাফতের হারানো প্রভাব ও ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তৎপর আছেন।
১০. বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য এখন নতুন সম্রাট ২য় জন কমনিনোসের শাসনাধীন। তিনি তার পিতা প্রয়াত সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোসের রাজনৈতিক আদর্শই অনুসরণ করছিলেন। এ কারণেই এ সময় হিলাল-ছালিব সংঘাতে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যকে উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা রাখতে দেখা যায়নি।
এই সংক্ষিপ্ত চিত্র সামনে রেখে আমরা এ কথা বলতে পারি যে, এ সময় সামগ্রিক চিত্র তুলনামূলক ইতিবাচক ছিল। অবশ্য ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই করে ইসলামি ভূখণ্ড মুক্ত করার চেতনা ও সংকল্প তখনও সুস্পষ্টরূপে দৃশ্যমান হয়নি। এর জন্য আমাদের প্রতীক্ষা করতে হবে আরও আটটি বছর! তখন দৃশ্যপটে আবির্ভূত হবেন এক মহান ব্যক্তি, যিনি এই চেতনা ও সংকল্প লালন করে ইসলামি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জনকে আপন জীবনের মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করে নেবেন।

টিকাঃ
১০০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৮৫।
১০১. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা : ২০০-২০১।
১০২. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৮৮ ও Guillaume de Tyr, 1,pp. 525-526.
১০০ সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/৪০৫।
১৩৪. Stevenson: op. cit., p.104.
১৩৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৯৪, ১৮৬। ইলগাজিকে নিয়ে যেসব কবিতা রচিত হয়েছিল, তার একটি হলো-
قل ما تشاء فقولك المقبول وعليك بعد الخالق التعويل واستبشر القرآن حين نصرته وبكي لفقد رجاله الإنجيل আপনি যা ইচ্ছা বলুন; গৃহীত হবে আপনারই কথা। স্রষ্টার পর আপনিই আমাদের ভরসা।
আপনি যখন কুরআনের সহায়তা করছিলেন, কুরআন তখন পুলকিত হচ্ছিল। ওদিকে ইঞ্জিল তো তার অনুসারীদের বিয়োগ-বেদনায় কাঁদছে!

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ইলগাজির অক্ষমতা

📄 ইলগাজির অক্ষমতা


এবার জানা যাক, কী ঘটেছিল পরবর্তী আট বছরে অর্থাৎ ৫১৩ হিজরি সন হতে ৫২১ হিজরি সন পর্যন্ত সময়ে?
এ সময় ইলগাজি বিন উরতুক উরতুক পরিবারের জন্য একটি বৃহৎ রাজ্য গড়ে তুলতে সচেষ্ট হন। তিনি সুবিস্তৃত দিয়ারে বকর অঞ্চলের প্রায় পুরোটাই নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। ফলে উত্তরে সিলভান (Silvan) এবং দক্ষিণে মারদিন ও হাসানকেইফসহ দিয়ারে বকর অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন নগরী উরতুক রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। দিয়ারে বকর অঞ্চলের বাইরে দক্ষিণের হাররান নগরীতেও তিনি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। আর পুরো আলেপ্পো রাজ্য তো পূর্বেই তার কর্তৃত্বে চলে এসেছিল।
স্বাভাবিকভাবেই এ সুবিশাল রাজ্য ক্রুসেডারদের বিরাট শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা দ্রুত ইলগাজি ও তুগতেকিনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয় এবং বালাতের যুদ্ধে পরাজয়ের দুই মাসেরও কম সময় পর ১১১৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ আগস্ট সংঘটিত এক যুদ্ধে ইলগাজি ও তুগতেকিনের সম্মিলিত মুসলিম বাহিনীকে পরাজিত করে। অবশ্য ফলাফলের বিচারে একে চূড়ান্ত ও নিষ্পত্তিমূলক বিজয় বলা যায় না। ইলগাজি এ পরাজয়ে হতোদ্যম না হয়ে নতুন করে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন এবং বিশেষ করে উরতুক রাজ্যের নিকটবর্তী এডেসা অঞ্চলে হামলা চালান। ১১২০ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে তিনি আযায (Azaz) নগরীতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। অবশ্য এ বছরই ইলগাজি নিশ্চিন্তে তার সুবিস্তৃত রাজ্যের পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করতে অনেকটা বাধ্য হয়ে ২য় বল্ডউইনের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করেন।
ইলগাজি যখন সুবিস্তৃত উরতুক রাজ্যের পুনর্গঠনে ব্যস্ত, ইরাক ও মসুলের পরিস্থিতি তখন প্রচণ্ড রকম অশান্ত হয়ে ওঠে। এর ফলে তিনি আব্বাসি খিলাফত বা সেলজুক সালতানাতের যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপের আশঙ্কা থেকে মুক্ত হয়ে নিশ্চিন্তে নিজের রাজ্য গোছাতে থাকেন। সে বছরই অর্থাৎ ৫১৪ হিজরি সনে (১১২০ খ্রিষ্টাব্দে) সেলজুক সুলতান মাহমুদ ও (মসুলের আমির জুয়ুশ বেগের সমর্থনপুষ্ট) তার ভাই মাসউদের মধ্যে কঠিন সংঘাত ও লড়াইয়ের ঘটনা ঘটে। সুলতান মাহমুদের বিজয় ও পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণে আসার মধ্য দিয়ে এই বেদনাদায়ক বিরোধের সমাপ্তি ঘটে।
অবশ্য ইরাকবাসীর দুর্যোগ দুই সেলজুক সুলতানের সংঘাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আরব বনু মাজিদ গোত্রের দুবাইস বিন সাদাকা নামক জনৈক শিয়া এ সময় ইরাকে বিদ্রোহের ডাক দেয়। সে তার অনুসারীদের নিয়ে বাগদাদে পৌঁছে খলিফার প্রাসাদ ঘেরাও করে। নিরুপায় খলিফা সুলতান মাহমুদের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করলে তিনি তার বাহিনী নিয়ে রওনা হন। পরিস্থিতি নাজুক বুঝে দুবাইস পালিয়ে ক্রুসেড রাজ্য এডেসা-সংলগ্ন জাযিরা অঞ্চলের উত্তরে আশ্রয় নেয়। অবশ্য এর পূর্বেই সে বাগদাদে ব্যাপক নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। এরপর দুবাইস তার সামরিক শক্তি ক্রুসেডারদের সেবায় ব্যয় করতে শুরু করে। তার আশা ছিল, এর বিনিময়ে ক্রুসেডাররা তাকে তার নিজস্ব রাজ্য প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে!
এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ইতিপূর্বে ক্রুসেডার-বিরোধী লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী মসুল চলমান ইসলাম-খ্রিষ্টবাদ সংঘাতের ক্ষেত্র হতে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সন্দেহ নেই, এ কারণে ক্রুসেডাররা অনেকটা স্বস্তিবোধ করছিল। কারণ, মসুল যদি তার পূর্ণ শক্তি নিয়ে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ইলগাজির সঙ্গে শরিক হতো, তাহলে নিশ্চিত করেই ক্রুসেডারদের দুর্যোগ বহুগুণে বেড়ে যেত।
এ সময় বাইতুল মুকাদ্দাস সাম্রাজ্যের ক্রুসেড শক্তি বিরাট বিপাকে পড়ে যায়। কারণ, নিজেদের সাম্রাজ্যের পাশাপাশি তখন তাদের এন্টিয়ক রাজ্যের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হচ্ছিল এবং এর ফলে তাদের সামরিক শক্তি বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। তা ছাড়া তাদের শত্রুও তখন অনেক। এদিকে উরতুক পরিবার, ওদিকে তুগতেকিন, আরও আছে তুগতেকিনের শাসনাধীন সুর নগরী। এ ছাড়াও আছে উবায়দি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন আসকালান। অধিকন্তু মিশরের উবায়দি প্রশাসন যদিও তখন অনেকটা নিশ্চুপ ছিল; কিন্তু ফিলিস্তিন অঞ্চলে নিজেদের কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধারের জন্য তারাও উপযুক্ত সুযোগের প্রতীক্ষায় ওত পেতে ছিল।

টিকাঃ
১৩৬. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৯১-১৯২।
১৩৭. Foucher de Chartres, pp. 445-446.
১৩৮. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৯১-১৯২ ও Foucher de Chartres, p. 446.
১০৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৯১-১৯২।
১৪০. প্রাগুক্ত, ৯/২১৯-২২১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00