📄 [সাত] বাইতুল মুকাদ্দাস সাম্রাজ্য
মওদুদ হত্যাকাণ্ড ছিল ইসলামি ভূখণ্ডে বাইতুল মুকাদ্দাসের ক্রুসেড সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণ প্রচেষ্টার সূচনা-ইঙ্গিত। কারণ, পূর্বের আলোচনায় আমরা জেনেছি, মওদুদ হত্যাকাণ্ড ১ম বল্ডউইনের সামনে থেকে কেবল একজন মহান বীর সেনাপতিকেই সরিয়ে দেয়নি; দামেশকের আমির তুগতেকিনকেও করে দিয়েছিল বল্ডউইনের আজ্ঞাবহ। এর ফলে বল্ডউইন অনেকটাই আশঙ্কামুক্ত হয়ে যান এবং আপন সাম্রাজ্যের অবস্থান শক্তিশালী করার পাশাপাশি রাজ্যপরিধি বিস্তারের পরিকল্পনাও শুরু করেন।
বল্ডউইনের ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র সম্পর্কে ধারণা পেতে আমরা এবার তাকে একটু কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করব। পূর্বেও আমরা উল্লেখ করেছি যে, তিনি যখন এডেসায় ক্রুসেড রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তখন তিনি সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর সমর্থন লাভ এবং তাদেরকে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে আরডা নামক এক আর্মেনীয় নারীকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু এখন তো তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক। বাইতুল মুকাদ্দাসে আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর লোকজন ছিল না। আর তাই আর্মেনীয় আরডা এখন তার কাছে নিতান্তই অপ্রয়োজনীয়! এ কারণেই বল্ডউইন এ সময় আরডাকে পরিত্যাগ করে অন্য কোনো নারীকে বিয়ে করার মাধ্যমে নতুন কোনো স্বার্থ উদ্ধারের পরিকল্পনা করেন! কিন্তু খ্রিষ্টান ক্যাথলিক মতাদর্শে বিবাহবিচ্ছেদ ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ!
বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা ১ম বল্ডউইন এ সমস্যারও সমাধান খুঁজে বের করেন। তিনি আরডার বিরুদ্ধে প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ আনেন। এ সময় বাইতুল মুকাদ্দাসের গির্জাধ্যক্ষ ছিলেন বল্ডউইনের কাছের মানুষ আরনাল্ফ মালকোরন! বন্ধুর যোগসাজশে অভিযোগ প্রমাণিত হয়, বিবাহবিচ্ছেদও কার্যকর হয়। পরিত্যক্তা আরডাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কনস্টান্টিনোপলে।
অনুকূল পরিবেশ পেয়ে এরপর ১ম বল্ডউইন আরেকটি ‘রাজনৈতিক বিয়ে’ সম্পন্ন করেন। মওদুদের মৃত্যুর বছর তিনি বিয়ে করেন সিসিলির প্রশাসক ১ম রজারের বিধবা স্ত্রীকে। তিনি আশা করছিলেন এর মাধ্যমে তিনি বড় দুটি স্বার্থ হাসিল করবেন। একদিকে বিরাট সামরিক শক্তির অধিকারী ইতালিয়ান নরম্যানদের সঙ্গে বাইতুল মুকাদ্দাস সাম্রাজ্যের সম্পর্ক মজবুত হবে, অপরদিকে প্রচুর বিত্ত-বৈভবের অধিকারী বিধবা নারী অ্যাডেলেইড (Adelaide)-এর অঢেল সম্পদ কাজে লাগিয়ে অব্যাহত যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শূন্য হয়ে পড়া বাইতুল মুকাদ্দাসের কোষাগার পূর্ণ করা যাবে।
এভাবে দৃশ্যপট থেকে মওদুদ ও তুগতেকিনের প্রস্থান এবং বল্ডউইনের সামরিক ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি একই সময়ে সংঘটিত হওয়ায় বল্ডউইনের সামনে সাম্রাজ্যবাদী লালসা বাস্তবায়নের অবারিত সুযোগ সৃষ্টি হয়। ৫০৯ হিজরি সনে (১১১৫ খ্রিষ্টাব্দে) মৃতসাগরের দক্ষিণে অবস্থিত ওয়াদি আরাবা (Wadi Araba) অঞ্চল দখল করার মধ্য দিয়ে তার এই লালসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। শাম অঞ্চল থেকে মিশর বা হিজাযগামী কাফেলাসমূহের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে তিনি সেখানে 'শোবাক' (Shoubak/ Montréal castle) নামে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন।
পরের বছর অর্থাৎ ৫১০ হিজরি সনে (১১১৬ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি পুরো নেগেভ মরুঅঞ্চল পাড়ি দিয়ে আকাবা উপসাগরের তীরবর্তী আয়লা (Ayla) অঞ্চল দখল করেন এবং শাম বা মিশর থেকে হিজাযগামী কাফেলাসহ এ অঞ্চলে চলাচলকারী অন্যান্য কাফেলাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সেখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ প্রতিষ্ঠা করেন। আকাবা উপসাগরের অভ্যন্তরে ফেরাউন দ্বীপে (Pharaoh's Island) তিনি নির্মাণ করেন আরেকটি দুর্গ। এ অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি ফিলিস্তিন-মিশর সীমান্তে সরাসরি নজরদারি করার সক্ষমতা অর্জন করেন, পাশাপাশি লাভ করেন লোহিত সাগরমুখী গুরুত্বপূর্ণ এক করিডোর।
এভাবে মুসলমানদের জিহাদি তৎপরতা বন্ধ থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে বল্ডউইন আসকালান ব্যতীত পুরো ফিলিস্তিন অঞ্চল এবং সুর নগরী ব্যতীত লেবাবনের অর্ধেক (দক্ষিণাঞ্চল) নিজের অধিকারে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। পরবর্তী সময়ে এটিই বাইতুল মুকাদ্দাস সাম্রাজ্যের সীমানা বিবেচিত হয়।
বরং মুসলমানদের লাঞ্ছনাকর নীরবতায় বল্ডউইন আরও দুঃসাহসী হয়ে ওঠেন। তিনি তার বাহিনীর ক্ষুদ্র একটি অংশ নিয়েই মিশরে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেন! সিনাই অঞ্চল অতিক্রম করে প্রথমেই তিনি অতি সহজে আরিশ নগরী দখল করে নেন। এরপর অভিযান অব্যাহত রেখে তিনি (বর্তমান পোর্ট সাইদের নিকটবর্তী) ফারামা (Pelusium) অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। বল্ডউইন সেখানকার মসজিদ ও জনবসতি জ্বালিয়ে দেন। এ সময় কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে না পড়লে তিনি হয়তো তার এ অভিযান পূর্ণ করেই ছাড়তেন। প্রচণ্ড অসুস্থতার কারণে তিনি এরপর অভিযান মুলতবি করে প্রত্যাবর্তনের মনস্থ করেন। এসব ঘটনা ঘটে ৫১২ হিজরি সনে (১১১৮ খ্রিষ্টাব্দে)।
টিকাঃ
১০৫. Guillaume de Tyr, pp. 473 -474 & Setton: op.cot., 1 p.102.
১০৬. Cam. Med. Hist. Vol. 5,p. 184.
১০৭. Grousset: L'Empire du Levant, p. 213 & Runciman: op. cit., II, pp. 97-98.
১০৮. Setton: op.cit., 1 p.406.
১০৯. Albert d' Aix, p. 703.
১১০. Grousset: Hist. des. Croisades 1,pp. 283.
১১১. Albert d' Aix, p. 706.
১১২. আবুল মাহাসিন, আন-নুজুমুয যাহিরা, ৫/১৭১।
১১৩. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৭৮।
📄 [আট] এডেসা রাজ্য
মওদুদের মৃত্যুর পর এবং বিশেষ করে সামরিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে তুলনামূলক অদক্ষ ও অযোগ্য নেতারা বিভিন্ন মুসলিম রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণের পর এডেসা রাজ্য নতুন করে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে সক্ষম হয়। এ সুযোগে এডেসা রাজ্য আশেপাশের অঞ্চলে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন শুরু করে। এডেসা নৃপতি বল্ডউইন ডি বুর্গ ৫১০ হিজরি সনে (১১১৬ খ্রিষ্টাব্দে) কায়সুম ও রাবান নগরী দখল করে নেন। এরপর ৫১১ হিজরি সনে (১১১৭ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি দখল করেন আলবেরা (Birecik) নগরী। সবশেষে একই বছর তিনি পতন ঘটান আলেপ্পোর উত্তরে অবস্থিত অতি গুরুত্বপূর্ণ কোরিস (Coris) দুর্গের। এর মাধ্যমে তিনি সরাসরি আলেপ্পোর ওপর নজর রাখার এবং প্রথম সুযোগেই নগরীটির পতন ঘটানোর সক্ষমতা অর্জন করেন। আলেপ্পো এবার একই সঙ্গে এডেসা ও এন্টিয়ক দুই ক্রুসেড রাজ্যের সম্ভাব্য শিকারে পরিণত হয়।
টিকাঃ
১১৪. Matthieu d' Edesse, pp. 116, 117.
১১৫. Setton: op. cit., 1 p. 405.
১১৬. Cam. Med. Hist. Vol. 5, p. 301.
📄 [নয়] এন্টিয়ক ও ত্রিপোলি রাজ্য
আলোচ্য সময়ে রাজ্যদুটিতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। তবে পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে রাজ্যদুটি এ সময় নিজেদের সমরশক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে এবং নতুন নতুন দুর্গ ও নগরপ্রাচীর নির্মাণ করে। পাশাপাশি রাজ্যদুটি প্রত্যাশিত সম্প্রসারণের প্রস্তুতি হিসেবে নিজেদের সামরিক জনবল বৃদ্ধিতেও সচেষ্ট হয়। এ সময়ে রজার যেমন এন্টিয়কের শাসক পদে বহাল ছিলেন, পন্সও তেমনই বহাল ছিলেন ত্রিপোলির শাসক পদে।
📄 [দশ] উত্তরাঞ্চলের আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী
মওদুদের মৃত্যুর পর এডেসার শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গ নিজেকে অনেকটা নিরাপদ ভাবতে থাকেন। এ সময় তিনি অনুভব করেন যে, এডেসা নগরীর মূল চালিকাশক্তি আর্মেনীয়দের হত্যা ও বিতাড়নের কারণে নগরীটির সামগ্রিক পরিস্থিতি অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। যেহেতু ইতিমধ্যে 'মওদুদ সমস্যা'র সমাধান হয়ে গেছে, তাই তার দৃষ্টিতে আর্মেনীয়দের পুনরায় এডেসায় ফিরিয়ে আনাতে কোনো সমস্যা ছিল না। আর্মেনীয়রাও বল্ডউইনের আহ্বানে দ্বিধাহীন চিত্তে সাড়া দিয়ে নিজেদের বাড়িঘর ও কৃষিক্ষেত্র ফিরে পাওয়ার সুযোগ কাজে লাগায়। অবশ্য এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, মনে ক্রুসেডারদের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা ও বিদ্বেষ সুপ্ত রেখেই তারা এডেসায় ফিরে আসে। এ আশঙ্কাও তাদের মনে ছিল যে, ক্রুসেডাররা ভবিষ্যতেও তাদের ওপর দমননীতি চালাতে পারে; আবারও ফিরে আসতে পারে গণহত্যা ও গণবিতাড়নের মতো বিয়োগান্ত ঘটনা।
এডেসার অধিবাসী আর্মেনীয়রা বাহ্যত ক্রুসেডারদের সঙ্গে সহাবস্থান মেনে নিলেও এডেসার বাইরের আর্মেনীয়দের অবস্থান ছিল ভিন্ন। তারা ক্রুসেডারদের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময়ের আহ্বান পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে। বরং ৫০৬ হিজরি সনে (১112 খ্রিষ্টাব্দে) মৃত্যুবরণকারী আর্মেনীয় নেতা কোগ বাসিলের বিধবা স্ত্রী ৫০৮ হিজরি সনে (১১১৪ খ্রিষ্টাব্দে) কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়া মসুলের প্রশাসক আক সুনকুরের কাছে তাকে ও তার জনগণকে মসুলের অধীনস্থ করে নেওয়ার জন্য সুস্পষ্ট ভাষায় আবেদন জানান এবং আনুগত্যের নিদর্শন হিসেবে জিজিয়া কর প্রদানের অঙ্গীকার করেন।
এভাবেই একের পর এক ঘটনা এ বিষয়টি প্রমাণ করে যে, আর্মেনীয় খ্রিষ্টানরা তাদের স্বধর্মীয় ক্রুসেডারদের চেয়ে মুসলমানদের উদারতা ও ন্যায়বিচারের প্রতি হাজার গুণ বেশি আস্থা রাখত।
সারকথা এই দাঁড়াল যে, মহান মুজাহিদ মওদুদের মৃত্যুপরবর্তী পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে এ অঞ্চলে বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হয়, যার সিংহভাগই ছিল ক্রুসেডারদের অবস্থান দৃঢ়করণে সহায়ক। পাশাপাশি মুসলিম রাজ্যগুলোতেও বেশ কিছু রাজনৈতিক রদবদল ঘটে, যার বেশিরভাগই ইতিবাচক ছিল না। একমাত্র ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত করা যায় আলেপ্পোর শাসক রিজওয়ান বিন তুতুশের মৃত্যুকে, যার মাধ্যমে মুসলমানরা এক দাম্ভিক অত্যাচারীর অপশাসন থেকে নিষ্কৃতি লাভ করে।
টিকাঃ
১১৭. Grousset: Hist. des. Croisades 1, pp. 491.
১১৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ২/১৫৩-১৫৪।