📄 [তিন] ইমাদুদ্দিন জিনকি
এই সম্ভাবনাময় তরুণ যোদ্ধা বিভিন্ন যুদ্ধে নিজের দ্যুতি ছড়াতে থাকেন। সবাই তার ব্যতিক্রমী সামরিক দক্ষতার কথা জানতে পারে। অধিকন্তু সকলে উপলব্ধি করে যে, তিনি সেলজুক সুলতানদের পূর্ণ অনুগত এবং দ্বিধাহীন চিত্তে তাদের প্রতিটি আদেশ পালন করেন। এ কারণে বিভিন্ন যুদ্ধে তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করা হয়। এ সময়ে সংঘটিত যুদ্ধগুলোতে তিনি বিজয়ের কেতন ওড়াতে না পারলেও সকলের মুখেমুখে ছিল ইমাদুদ্দিন জিনকি নামক এক সদ্য উদিত তারকার কীর্তি-আলোচনা।
📄 [চার] দামেশকের আমির তুগতেকিন
আমরা পূর্বেও উল্লেখ করেছি যে, মওদুদ-হত্যাকাণ্ডের পর রিজওয়ান প্রচার করেছিলেন, তুগতেকিনই তাকে হত্যা করেছেন। এই প্রচারণার মাধ্যমে রিজওয়ান প্রথমত নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে, দ্বিতীয়ত তুগতেকিনের দিক থেকে আশঙ্কামুক্ত হতে চেয়েছিলেন। রিজওয়ানের অপপ্রচারে আরও অনেকের মতো স্বয়ং সেলজুক সুলতান মুহাম্মাদও প্রভাবিত হয়ে পড়েন। তিনি মওদুদ-হত্যার দায়ভার তুগতেকিনের ওপর চাপান। তা ছাড়া দামেশকের অভ্যন্তরে অবস্থান করা অবস্থায় মওদুদের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব তুগতেকিনের কাঁধেই বর্তায়। এসব কারণে তুগতেকিন অনুভব করেন যে, তার চারপাশ ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে আসছে এবং সহযোগী মিত্রের সংখ্যা কমে আসছে। এ চিন্তা থেকেই তিনি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এক নিকৃষ্ট অন্যায় করে বসেন। সকলের অনিষ্ট আচরণ থেকে আত্মরক্ষা করতে তিনি এবার হাত মেলান ক্রুসেডারদের সঙ্গে!
দুর্বলতার সময়টুকু পার করার জন্য তিনি যদি বড়োজোর ক্রুসেডারদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির চুক্তি করতেন, তাও মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু ক্রুসেডারদের সঙ্গে মৈত্রীচুক্তি করে তাদের সঙ্গে একই পরিখায় অবস্থান করে আপন মুসলিম ভাই সেলজুকদের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হওয়া না ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য, না বিবেকের কাঠগড়ায় ক্ষমাযোগ্য।
অবশ্য অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, মওদুদ হত্যাকাণ্ডে তুগতেকিন জড়িত ছিলেন না। কারণ, মওদুদের ছত্রছায়া হারিয়ে ফেলার পরপরই তিনি নতুন আশ্রয়ের আশায় ক্রুসেডারদের সঙ্গে মিত্রতা করেছিলেন। এতে এ ধারণাই দৃঢ়তা লাভ করে যে, তিনি নিজেই নিজের মূল অবলম্বনকে হত্যা করতে পারেন না। এ বিষয়টিও লক্ষণীয় যে, দামেশকে মওদুদের আগমনের অব্যবহিত পূর্বেই তিনি ক্রুসেডারদের অধিকৃত বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে এবং ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সুর নগরবাসীকে সহায়তা করে ক্রুসেডারদের উত্তেজিত করেছিলেন।
যাই হোক, তুগতেকিনের এই অন্যায় অবস্থানের কারণে দামেশকের মতো একটি বৃহৎ নগরী চলমান সংঘাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক পাশে সরে পড়ে। অবশ্য এ তথ্যটিও প্রণিধানযোগ্য যে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাতিনি শিয়াদের প্রভাব-নিয়ন্ত্রণ থাকায় এমনিতেও দামেশকের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি কখনোই স্থিতিশীল ছিল না।
টিকাঃ
৯৯. Grousset: Hist. des. Croisades 1, pp. 276-277.
📄 [পাঁচ] আলেপ্পো রাজ্য
৫০৭ হিজরি সনে (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দে) দুরাচারী রিজওয়ানের মৃত্যুর পর আলেপ্পো রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন তার তরুণ পুত্র আলপ আরসালান। মহান পিতামহ আলপ আরসালানের নামে নাম হলেও তিনি কোনো দিক থেকেই পিতামহের যোগ্য উত্তরসূরি ছিলেন না; বরং পিতার মতো তিনিও ছিলেন চরম হঠকারী, অবিবেচক ও ধর্মীয় চেতনাশূন্য। নিজের একচ্ছত্র ক্ষমতা নিশ্চিত করতে শুরুতেই তিনি তার দুই সহোদর মালিকশাহ ও মুবারকশাহকে হত্যা করেন! কিন্তু তিনি ছিলেন ভীরু ও দুর্বল চিত্তের একজন শাসক। দায়িত্ব গ্রহণ করার পরই নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ক্রুসেডারদের রোষানল থেকে আত্মরক্ষা করতে তিনি এন্টিয়ক শাসক রজারকে জিজিয়া কর প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
অবশ্য তার শাসনামলের শুরুতেই এমন এক ঘটনা ঘটে, যা প্রমাণ করে যে, আলেপ্পোবাসীর মাঝে তখনও সামান্য হলেও কল্যাণ-গুণ অবশিষ্ট আছে। রিজওয়ানের শাসনামলে আলেপ্পোতে বাতিনি গোষ্ঠী অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল। আলপ আরসালানের শাসনামলের শুরুতে জনগণ তাদের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং পালের গোদা আবু তাহির আস-সায়িগকে হত্যা করে। এরপর উত্তেজিত জনতা বাতিনিদের ওপর চড়াও হয়ে তাদের হত্যা ও আটক করতে থাকে। কূলকিনারা না পেয়ে অবশিষ্ট বাতিনিরা দ্রুত আলেপ্পো ছেড়ে পালিয়ে যায়। আগ্রাসী বাতিনি গোষ্ঠী যদিও সন্ত্রাসকর্মে কুখ্যাত ছিল; কিন্তু এই ব্যতিক্রমী জনতার সহসা উত্থান তাদেরকে ভীত করে তোলে। তারা অবাক বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করে যে, দীর্ঘ বিশ বছর বাতিনি-শিয়া আদর্শ-প্রভাবিত শাসনব্যবস্থার অধীনে বসবাস করার পরও আলেপ্পোর জনগণের চেতনা ও মর্যাদাবোধ বিলুপ্ত হয়নি, নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি সুন্নাহ ও আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর প্রতি তাদের হৃদ্যতা ও আকর্ষণ। সম্ভবত এ ঘটনা পরবর্তী বছরগুলোতে আলেপ্পোর জনগণের মেজাজ ও প্রকৃতির ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। নিশ্চিত করেই এ বিষয়টি ভবিষ্যৎ জিহাদি আন্দোলনের অঙ্গনে ব্যাপক প্রভাব রাখতে সক্ষম হবে।
এ তথ্যটিও প্রণিধানযোগ্য যে, এই আলপ আরসালান বেশিদিন আলেপ্পোর ক্ষমতা ভোগ করতে পারেননি। বরং তার আতাবিক বদরউদ্দিন লুলু তাকে হত্যা করে তার ছোট ভাই ছয় বছরের শিশু সুলতান শাহকে ক্ষমতায় বসান। এর মাধ্যমে কার্যত আলেপ্পোর শাসনক্ষমতা চলে যায় বদরউদ্দিন লুলুর হাতে। কোনো সন্দেহ নেই যে, এর ফলে আলেপ্পোর অবস্থান অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। আগামীর ঘটনাপ্রবাহে এ বিষয়টিও বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
টিকাঃ
১০০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৫১ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৬৭।
১০১. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৬৮।
১০২. প্রাগুক্ত: ২/১৬৮-১৬৯।
📄 [ছয়] ইলগাজি বিন উরতুক
ইলগাজি বিন উরতুক এক আজব চরিত্রের ধারক!
ক্রুসেড ইতিহাসে আমি তার মতো বিস্ময়কর চরিত্রের মানুষের দেখা পাইনি!
তিনি মারদিনের আমির। তিনি সেই সুকমান বিন উরতুকের সহোদর, যিনি জিহাদের সফরে ইন্তেকাল করেছিলেন।
তাকে নিয়ে বিস্ময়বোধের কারণ চিন্তা ও কর্মে তার দ্বিমাত্রিক অবস্থান; যা তার ব্যক্তিত্ব বিশ্লেষণকে বেশ কঠিন করে দিয়েছে। আমি বহুবার তার ব্যক্তিত্বের সামনে দাঁড়িয়ে দিশেহারা হয়ে থেমে গেছি; উপলব্ধি করতে পারিনি যে, তিনি প্রশংসা-যোগ্য সৎ ব্যক্তি, নাকি নিন্দার পাত্র অসৎ চরিত্র!
ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি, মওদুদ রহ. যখন ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করেছেন, তখন তিনি তাতে সহায়তা করেছেন। আবার আমরা তাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ লুট করার লালসায় প্রয়াত মুসলিম আমির সুকমান আল-কুতবির বাহিনীর ওপর হামলা চালাতেও দেখেছি! পূর্বে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, হামাদানের আমির বুরসুক বিন বুরসুকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি ক্রুসেডারদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। আবার আগামী ঘটনাপ্রবাহে আমরা তাকে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে দেখব; দেখব বিজয় ছিনিয়ে এনে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে।
আমরা এখানে তার আলোচনা আলাদাভাবে এজন্য করেছি যে, মওদুদের শাহাদাতের পর মুষ্টিমেয় যে কজন ব্যক্তি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জিহাদের পতাকা সমুন্নত রেখেছিলেন, ইলগাজি ছিলেন তাদের একজন। এরপর তাদের হাত থেকেই এ পতাকা বহনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন ইসলামি ইতিহাসের এক অনন্যসাধারণ বীরযোদ্ধা। সে ইতিহাস আমরা শীঘ্রই জানতে পারব।
টিকাঃ
১০০. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৭২-১৭৩ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৯০।
১০৪, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৫৯।