📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা কে?!

📄 হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা কে?!


বাস্তবতা হলো মওদুদ-হত্যায় স্বার্থভোগী পক্ষ ছিল অনেক। এক্ষেত্রে প্রথমেই আসবে আলেপ্পোর শাসক রিজওয়ানের নাম। রিজওয়ান হয়তো নিজেকে দায়মুক্ত প্রমাণ করতেই দ্রুত তুগতেকিনের প্রতি অভিযোগের আঙুল তুলেছিলেন। রিজওয়ান মওদুদকে প্রচণ্ড রকম অপছন্দ করতেন, ভয়ও করতেন প্রচণ্ড। তিনি ভুলে যাননি যে, মাত্র দু-বছর পূর্বেই ৫০৫ হিজরি সনে তিনি মওদুদ ও তার বাহিনীর মুখের ওপর আলেপ্পোর প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং তাদেরকে মারাত্মক বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন। বরং তখন তিনি মওদুদের বিরুদ্ধে এন্টিয়কের শাসক টেনক্রেডের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন! এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তখন আলেপ্পোর জনগণ মওদুদের জন্য নগরদ্বার উন্মুক্ত করে দিতে বিক্ষোভ করেছিল। আর তাই এ সম্ভাবনা মোটেও অমূলক ছিল না যে, জনগণ এখন বিশেষ করে সিন্নাবরায় মওদুদের মহান বিজয় প্রত্যক্ষ করার পর আলেপ্পোকে মওদুদের মসুল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তুলবে।
নিঃসন্দেহে সিন্নাবরার বিজয় আলেপ্পোবাসীসহ সমকালীন মুসলিম উম্মাহর কাছে মওদুদের জনপ্রিয়তা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল। তদুপরি আলেপ্পো ছিল মসুলের প্রতিবেশী-রাজ্য। অতীতেও অনেক সময় যিনি মসুল শাসন করেছেন, আলেপ্পোও তিনিই শাসন করেছেন। আর তাই মওদুদ আলেপ্পোতে তার রাজ্য সম্প্রসারণের চেষ্টা করলে তা একান্তই স্বাভাবিক হতো।
তা ছাড়া বাতিনি শিয়াদের সঙ্গে রিজওয়ানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কেবল সম্পর্কই নয়; তিনি আলেপ্পোর আপামর জনসাধারণের রুচি ও মতাদর্শের বিরুদ্ধে গিয়ে শিয়া মতাদর্শের মুখপাত্র ও সমর্থকে পরিণত হয়েছিলেন। এই সবকিছুই ইঙ্গিত বহন করে যে, মওদুদ হত্যাকাণ্ডে রিজওয়ানই সবচেয়ে বেশি লাভবান ছিলেন।
সঙ্গে এ তথ্যও যোগ করুন যে, রিজওয়ান তুগতেকিনকে প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন এবং তুগতেকিন তার রাজ্যে হানা দিতে পারেন, এমন আশঙ্কা করতেন। আমরা হয়তো এ তথ্যটিও ভুলে যাইনি যে, তিনি তার ভাই ও দামেশকের সাবেক শাসক দাক্কাকের প্রতিও প্রচণ্ড বিদ্বেষী ছিলেন। সাম্রাজ্য বিস্তারের লালসায় তিনি বহুবার দাক্কাকের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছিলেন। তা ছাড়া রিজওয়ানের পূর্বেও এ ধরনের গুপ্তহত্যার অভিজ্ঞতা ছিল। ইতিপূর্বে তিনি রাজ্য হারানোর আশঙ্কায় বাতিনি গুপ্তঘাতকের মাধ্যমে হিমসের আমির জানাহুদ্দৌলা হুসাইন বিন মালাইবকে হত্যা করিয়েছিলেন। অথচ জানাহুদ্দৌলা ব্যক্তিজীবনে ছিলেন রিজওয়ানের মায়ের স্বামী (সৎ বাবা)। কিন্তু এসব সম্পর্কের বিন্দুমাত্র মূল্য রিজওয়ানের কাছে ছিল না। আর তাই নেতৃত্ব ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য রিজওয়ানের কাছ থেকে কোনো অন্যায় আচরণই অপ্রত্যাশিত ছিল না। এসব যুক্তি পাশাপাশি রাখলে এ সম্ভাবনাই আমাদের কাছে প্রবল মনে হয় যে, আলেপ্পোর শাসক রিজওয়ানই ছিলেন এই ঘৃণ্য অপকর্মের মূল হোতা।
তবে রিজওয়ান একাই এ হত্যাকাণ্ডের মুনাফাভোগী ছিলেন না। কারও প্ররোচনা ছাড়াই খোদ বাতিনি শিয়াদেরও এতে বিরাট স্বার্থ ছিল। বাতিনিরা ছিল সমকালীন শাম অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য শক্তি; রিজওয়ান ও তুগতেকিনের মতো শামের প্রধান নেতারাও তাদেরকে সমীহ করত। সন্দেহ নেই, মওদুদের মতো একজন ভারসাম্যপূর্ণ সুন্নি মুজাহিদ নেতার উত্থান বাতিনিদের অন্যায়কর্মের পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছিল এবং তাদের অনাচার-অবিচারের জীবনে বাধা সৃষ্টি করছিল। আর অন্যায় গুপ্তহত্যায় এমনিতেও বাতিনিদের কুখ্যাতি ছিল। সুতরাং এ সম্ভাবনা মোটেও সুদূরপরাহত নয় যে, কারও প্ররোচনা ছাড়া বাতিনি গোষ্ঠী নিজেরাই স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
মওদুদ হত্যায় ক্রুসেডারদেরও স্বার্থ ছিল। মোটেও অসম্ভব নয় যে, তারা বাতিনি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মিত্রতা করেছিল এবং এই বরেণ্য মুজাহিদকে সরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে প্রচুর অর্থসম্পদ, যুদ্ধাস্ত্র বা বিভিন্ন দুর্গের কর্তৃত্ব প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছিল। মওদুদ তো তখন শাম অঞ্চলে সকল ক্রুসেডারের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলেন।
এমনও হতে পারে যে, রিজওয়ান, শিয়া বাতিনি সম্প্রদায় ও ক্রুসেডার শক্তি তিন পক্ষের বা যেকোনো দুই পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। আমার মতে দামেশকের আমির তুগতেকিনের পরিবর্তে অভিযোগের তির এদের দিকে তাক করাই অধিক যুক্তিযুক্ত।
কেউ প্রশ্ন করতে পারেন-মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও কীভাবে একজন বাতিনি ঘাতক এ কাজের দুঃসাহস করল? ভ্রান্ত চিন্তাধারা ও দোদুল্যমান ধর্মবিশ্বাসের অনুসারী হয়েও; এমনকি বিনাবাক্যে ইসলামের গণ্ডি বহির্ভূত হয়েও কোন নীতি-আদর্শে প্ররোচিত হয়ে সে এই আত্মঘাতী তৎপরতায় জড়াল?
আমরা বক্ষ্যমাণ গ্রন্থের শুরুর দিকেও উল্লেখ করেছি যে, শিয়া ইসমাইলি সম্প্রদায় মুসতালিয়া ও নিযারিয়া নামে দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছিল। ৪৮৭ হিজরি সনে (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) অষ্টম উবায়দি খলিফা মুসতানসির বিল্লাহ মারা যাওয়ার পর তার দুই পুত্র মুসতালি ও নিযার ক্ষমতা নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। তখন মিশরের তৎকালীন উজির বদর আল-জামালি বয়সে ছোট মুসতালিকে খলিফা পদে অধিষ্ঠিত করেন। এ সময় মিশরে অবস্থানকারী অন্যতম প্রভাবশালী ইসমাইলি ধর্মপ্রচারক হাসান বিন সাবাহ নিযারের পক্ষাবলম্বন করেন। মুসতালি ক্ষমতা গ্রহণের পর হাসান নিযারকে নিয়ে মিশর থেকে শামে চলে যান এবং সেখানে 'নিযারিয়া ইসমাইলিয়া' নামে শিয়াদের একটি চরম জঘন্য গোষ্ঠী গড়ে তোলেন। এই গোষ্ঠীটিই ইতিহাসে 'বাতিনি সম্প্রদায়' নামে পরিচিতি লাভ করে। কারণ, তাদের দাবি হলো কুরআনের প্রতিটি আয়াতের একটি বাহ্যিক ও একটি অন্তর্নিহিত মর্ম রয়েছে। সাধারণ মানুষ কেবল প্রথমটি জানে, আয়াতসমূহের বাতিনি ও অন্তর্নিহিত মর্ম একমাত্র তারাই জানে। এই দাবিকে উপজীব্য করে তারা কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা করতে থাকে এবং ভ্রান্ত বিভিন্ন আকিদা ও ব্যাখ্যা তৈরি করে ইসলামের গণ্ডি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যায়।
হাসান বিন সাবাহই এই ভ্রান্ত গোষ্ঠীর মূল নেতা ছিলেন। তিনি তার অনুসারীদের হাশিশ (এক ধরনের নেশা উদ্রেককারী উদ্ভিদের নির্যাস) পান করাতেন। ফলে তাদের বিবেক-বুদ্ধি লোপ পেত এবং তারা তাদের 'শায়খ' হাসান বিন সাবাহর অন্ধ আনুগত্য শুরু করত।
এরপর হাসান আরও ভয়ানক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি তার অনুসারীদের জন্য দুর্গম পাহাড়ের পাদদেশে একটি মনোরম উদ্যান গড়ে তোলেন এবং এর নামকরণ করেন 'জান্নাত'! তিনি সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করেন, সব জাতের ফল-ফলাদির ব্যবস্থা করেন এবং ছোট ছোট কৃত্রিম ঝরনা ও প্রস্রবণ তৈরি করেন। তিনি সেখানে তার অনুসারী সুদর্শনা তরুণীদের নিয়োজিত করেন।
হাসান তার যেকোনো অনুসারীকে প্রথমে হাশিশ পান করিয়ে পুরোপুরি অচেতন করে ফেলতেন, এরপর অচেতন অবস্থায় কথিত জান্নাতে নিয়ে আসতেন। অচেতন অনুসারী যখন কিছুটা চেতনা ফিরে পেয়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় থাকত, তখন তার সামনে হরেক পদের খাবার ও পানীয় পরিবেশন করা হতো। এরপর সে সুন্দরী যুবতীদের সঙ্গে অপকর্মে লিপ্ত হতো। তারপর তাকে পুনরায় হাশিশ পান করিয়ে অচেতন করে ফেলা হতো এবং 'জান্নাত' থেকে বের করে নিয়ে আসা হতো। চেতনা ফিরে এলে তাকে বলা হতো, আবারও জান্নাতে ফিরতে চাইলে 'শায়খুল জাবাল' (হাসান বিন সাবাহ)-এর নিঃশর্ত আনুগত্য করতে হবে। এভাবে কয়েকবার হাশিশ পান ও কৃত্রিম উদ্যানে আনা-নেওয়া করে তাকে হাশিশের নেশায় আসক্ত করে তোলা হতো এবং কৃত্রিম জান্নাত ও তার ভোগসামগ্রীর প্রতি পাগলপারা করে তোলা হতো। তারপর একদিন তাকে নির্দেশ দেওয়া হতো—যাও, আত্মঘাতী অভিযানে অংশ নিয়ে প্রাণ উৎসর্গ করে এসো। তাহলে তুমি চিরদিন জান্নাতে থাকতে পারবে!
অনুসারী হিসেবে তারা সাদাসিধা, চিন্তা-ধর্মে সরল, দরিদ্র-নিপীড়িত, গ্রাম্য-গোঁয়ার লোকদের বাছাই করত। এসব লোক নেতাদের হাতের পুতুলে পরিণত হতো এবং নেতারা যা আদেশ করত, নির্দ্বিধায় তা পালন করত।
বাতিনিরা গুপ্তহত্যাকে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করেছিল এবং চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের নিত্যনতুন কৌশল উদ্ভাবন করে ব্যাপকহারে গুপ্তহত্যার পথ বেছে নিয়েছিল। সশস্ত্র গোষ্ঠী হওয়ায় তাদের লাগাম টেনে ধরা ছিল অত্যন্ত কঠিন। এ কারণে তাদের নাম শুনলেই শাসক-প্রজা নির্বিশেষে সকলের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠত!
যেহেতু তারা হাশিশ পানে অভ্যস্ত ছিল, তাই ইতিহাসে তারা 'নিয়ারিয়া', 'বাতিনি' ইত্যাদি নামের পাশাপাশি 'হাশশাশিন' নামেও পরিচিত। ইতিহাসে এদের অন্যায়কর্মের ফিরিস্তি বেশ দীর্ঘ। তাদের অনেক হত্যাপ্রচেষ্টা যেমন সফল হয়, ব্যর্থও হয় অনেক অপচেষ্টা। কিন্তু সব সময় তারা ছিল ভীতি ও ত্রাসের প্রতীক এবং সত্যের পথিকদের চলার পথে বাধা সৃষ্টিকারী।

টিকাঃ
৮০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪।
৮১. আল-মাকরিজি, ইত্তিআ'জুল হুনাফা বি-আখবারিল আইম্মাতিল ফাতিমিয়ীনাল খুলাফা, ৩/১১।
৮২. উজির বদর আল-জামালি হাসান বিন সাবাহকে বন্দি করে মাগরিবে নির্বাসিত করেছিলেন। কিন্তু হাসানকে বহনকারী জাহাজ পথিমধ্যে ঝড়ের কবলে পড়ে বাতাসের টানে শামের উপকূলীয় এলাকায় চলে যায়। তখন হাসান বিন সাবাহ আক্কার উপকূলীয় এলাকায় অবতরণ করেন এবং সেখান থেকে নিজের এলাকা ইস্পাহানে ফিরে যান। এরপর তিনি সেখানে নিযারের পক্ষে প্রচারণা চালাতে থাকেন। ওদিকে নিযার তার ভাই মুসতালির কারাগারে বন্দি অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র হাদি বিন নিযার মিশর থেকে পালিয়ে পারস্যে হাসান বিন সাবাহর কাছে চলে আসেন এবং নিযারিয়া মতাদর্শের প্রসারে কাজ করতে থাকেন। (সম্পাদক)
৮০. আবু হামিদ আল-গাজালি, ফাযাইহুল বাতিনিয়্যা, পৃষ্ঠা: ১১ ও Grousset: Hist. des. Croisades 1,p. 530.
৮৪. Marco Polo: Travels, p. 50.
৮৫. Michaud: op. cit., II,pp. 72 -73.
b. Marco Polo: Travels, pp. 49-53
৮. Ivanow: An Islamic Ode in Praise of Fidawis, pp. 63-64.
৮৮. যেহেতু বাতিনিদের মূল লক্ষ্য ছিল সারা বিশ্বে নিজেদের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করা, তাই তারা মুসলিম বিশ্বকে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দিক থেকে নেতৃত্বশূন্য করার লক্ষ্যে গুপ্তহত্যা ও আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে সমকালীন ইসলামি বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামি শক্তি যথা আব্বাসি খিলাফত, সেলজুক, খোয়ারিজমি, জিনকি ও আইয়ুবি সালতানাতের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। তারা আব্বাসি খলিফা মুসতারশিদ, রাশিদ, বাগদাদের উজির নিজামুল মুলক ও সুলতান মুহাম্মাদ ঘুরিকে হত্যা করে এবং সেলজুক সুলতান মালিকশাহ, জিনকি সুলতান নুরুদ্দিন মাহমুদ ও আইয়ুবি সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবিকে হত্যা করার জন্য একাধিকবার চেষ্টা চালায়। (সম্পাদক)
৮. শিয়া ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়ের মূল শাখা তিনটি— কারামাতিয়া, মুসতালিয়া ও নিযারিয়া। কালের পরিক্রমায় বর্তমানে যেহেতু কারামাতিয়া ও মুসতালিয়াদের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে, তাই বর্তমানে ইসমাইলিয়া বলে নিযারিয়া বা বাতিনি গোষ্ঠীকেই বোঝানো হয়। বর্তমানে তারা 'আগাখানিয়া' নামে অধিক প্রসিদ্ধ। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল,=ইউরোপ ও ভারতে প্রচুর সংখ্যক আগাখানিয়া মতাদর্শী বসবাস করে। বর্তমানে তাদের প্রধান নেতা ফ্রান্সে বসবাসকারী ও ব্রিটিশ নাগরিকত্বের অধিকারী করিম হুসাইন শাহ (৪র্থ আগাখান), যিনি বিখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিনের ভাষ্য অনুসারে বিশ্বের শীর্ষ দশ ধনীর একজন। [সম্পাদক]

বাস্তবতা হলো মওদুদ-হত্যায় স্বার্থভোগী পক্ষ ছিল অনেক। এক্ষেত্রে প্রথমেই আসবে আলেপ্পোর শাসক রিজওয়ানের নাম। রিজওয়ান হয়তো নিজেকে দায়মুক্ত প্রমাণ করতেই দ্রুত তুগতেকিনের প্রতি অভিযোগের আঙুল তুলেছিলেন। রিজওয়ান মওদুদকে প্রচণ্ড রকম অপছন্দ করতেন, ভয়ও করতেন প্রচণ্ড। তিনি ভুলে যাননি যে, মাত্র দু-বছর পূর্বেই ৫০৫ হিজরি সনে তিনি মওদুদ ও তার বাহিনীর মুখের ওপর আলেপ্পোর প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং তাদেরকে মারাত্মক বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন। বরং তখন তিনি মওদুদের বিরুদ্ধে এন্টিয়কের শাসক টেনক্রেডের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন! এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তখন আলেপ্পোর জনগণ মওদুদের জন্য নগরদ্বার উন্মুক্ত করে দিতে বিক্ষোভ করেছিল। আর তাই এ সম্ভাবনা মোটেও অমূলক ছিল না যে, জনগণ এখন বিশেষ করে সিন্নাবরায় মওদুদের মহান বিজয় প্রত্যক্ষ করার পর আলেপ্পোকে মওদুদের মসুল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তুলবে।
নিঃসন্দেহে সিন্নাবরার বিজয় আলেপ্পোবাসীসহ সমকালীন মুসলিম উম্মাহর কাছে মওদুদের জনপ্রিয়তা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল। তদুপরি আলেপ্পো ছিল মসুলের প্রতিবেশী-রাজ্য। অতীতেও অনেক সময় যিনি মসুল শাসন করেছেন, আলেপ্পোও তিনিই শাসন করেছেন। আর তাই মওদুদ আলেপ্পোতে তার রাজ্য সম্প্রসারণের চেষ্টা করলে তা একান্তই স্বাভাবিক হতো।
তা ছাড়া বাতিনি শিয়াদের সঙ্গে রিজওয়ানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কেবল সম্পর্কই নয়; তিনি আলেপ্পোর আপামর জনসাধারণের রুচি ও মতাদর্শের বিরুদ্ধে গিয়ে শিয়া মতাদর্শের মুখপাত্র ও সমর্থকে পরিণত হয়েছিলেন। এই সবকিছুই ইঙ্গিত বহন করে যে, মওদুদ হত্যাকাণ্ডে রিজওয়ানই সবচেয়ে বেশি লাভবান ছিলেন।
সঙ্গে এ তথ্যও যোগ করুন যে, রিজওয়ান তুগতেকিনকে প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন এবং তুগতেকিন তার রাজ্যে হানা দিতে পারেন, এমন আশঙ্কা করতেন। আমরা হয়তো এ তথ্যটিও ভুলে যাইনি যে, তিনি তার ভাই ও দামেশকের সাবেক শাসক দাক্কাকের প্রতিও প্রচণ্ড বিদ্বেষী ছিলেন। সাম্রাজ্য বিস্তারের লালসায় তিনি বহুবার দাক্কাকের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছিলেন। তা ছাড়া রিজওয়ানের পূর্বেও এ ধরনের গুপ্তহত্যার অভিজ্ঞতা ছিল। ইতিপূর্বে তিনি রাজ্য হারানোর আশঙ্কায় বাতিনি গুপ্তঘাতকের মাধ্যমে হিমসের আমির জানাহুদ্দৌলা হুসাইন বিন মালাইবকে হত্যা করিয়েছিলেন। অথচ জানাহুদ্দৌলা ব্যক্তিজীবনে ছিলেন রিজওয়ানের মায়ের স্বামী (সৎ বাবা)। কিন্তু এসব সম্পর্কের বিন্দুমাত্র মূল্য রিজওয়ানের কাছে ছিল না। আর তাই নেতৃত্ব ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য রিজওয়ানের কাছ থেকে কোনো অন্যায় আচরণই অপ্রত্যাশিত ছিল না। এসব যুক্তি পাশাপাশি রাখলে এ সম্ভাবনাই আমাদের কাছে প্রবল মনে হয় যে, আলেপ্পোর শাসক রিজওয়ানই ছিলেন এই ঘৃণ্য অপকর্মের মূল হোতা।
তবে রিজওয়ান একাই এ হত্যাকাণ্ডের মুনাফাভোগী ছিলেন না। কারও প্ররোচনা ছাড়াই খোদ বাতিনি শিয়াদেরও এতে বিরাট স্বার্থ ছিল। বাতিনিরা ছিল সমকালীন শাম অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য শক্তি; রিজওয়ান ও তুগতেকিনের মতো শামের প্রধান নেতারাও তাদেরকে সমীহ করত। সন্দেহ নেই, মওদুদের মতো একজন ভারসাম্যপূর্ণ সুন্নি মুজাহিদ নেতার উত্থান বাতিনিদের অন্যায়কর্মের পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছিল এবং তাদের অনাচার-অবিচারের জীবনে বাধা সৃষ্টি করছিল। আর অন্যায় গুপ্তহত্যায় এমনিতেও বাতিনিদের কুখ্যাতি ছিল। সুতরাং এ সম্ভাবনা মোটেও সুদূরপরাহত নয় যে, কারও প্ররোচনা ছাড়া বাতিনি গোষ্ঠী নিজেরাই স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
মওদুদ হত্যায় ক্রুসেডারদেরও স্বার্থ ছিল। মোটেও অসম্ভব নয় যে, তারা বাতিনি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মিত্রতা করেছিল এবং এই বরেণ্য মুজাহিদকে সরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে প্রচুর অর্থসম্পদ, যুদ্ধাস্ত্র বা বিভিন্ন দুর্গের কর্তৃত্ব প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছিল। মওদুদ তো তখন শাম অঞ্চলে সকল ক্রুসেডারের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলেন।
এমনও হতে পারে যে, রিজওয়ান, শিয়া বাতিনি সম্প্রদায় ও ক্রুসেডার শক্তি তিন পক্ষের বা যেকোনো দুই পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। আমার মতে দামেশকের আমির তুগতেকিনের পরিবর্তে অভিযোগের তির এদের দিকে তাক করাই অধিক যুক্তিযুক্ত।
কেউ প্রশ্ন করতে পারেন-মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও কীভাবে একজন বাতিনি ঘাতক এ কাজের দুঃসাহস করল? ভ্রান্ত চিন্তাধারা ও দোদুল্যমান ধর্মবিশ্বাসের অনুসারী হয়েও; এমনকি বিনাবাক্যে ইসলামের গণ্ডি বহির্ভূত হয়েও কোন নীতি-আদর্শে প্ররোচিত হয়ে সে এই আত্মঘাতী তৎপরতায় জড়াল?
আমরা বক্ষ্যমাণ গ্রন্থের শুরুর দিকেও উল্লেখ করেছি যে, শিয়া ইসমাইলি সম্প্রদায় মুসতালিয়া ও নিযারিয়া নামে দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছিল। ৪৮৭ হিজরি সনে (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) অষ্টম উবায়দি খলিফা মুসতানসির বিল্লাহ মারা যাওয়ার পর তার দুই পুত্র মুসতালি ও নিযার ক্ষমতা নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। তখন মিশরের তৎকালীন উজির বদর আল-জামালি বয়সে ছোট মুসতালিকে খলিফা পদে অধিষ্ঠিত করেন। এ সময় মিশরে অবস্থানকারী অন্যতম প্রভাবশালী ইসমাইলি ধর্মপ্রচারক হাসান বিন সাবাহ নিযারের পক্ষাবলম্বন করেন। মুসতালি ক্ষমতা গ্রহণের পর হাসান নিযারকে নিয়ে মিশর থেকে শামে চলে যান এবং সেখানে 'নিযারিয়া ইসমাইলিয়া' নামে শিয়াদের একটি চরম জঘন্য গোষ্ঠী গড়ে তোলেন। এই গোষ্ঠীটিই ইতিহাসে 'বাতিনি সম্প্রদায়' নামে পরিচিতি লাভ করে। কারণ, তাদের দাবি হলো কুরআনের প্রতিটি আয়াতের একটি বাহ্যিক ও একটি অন্তর্নিহিত মর্ম রয়েছে। সাধারণ মানুষ কেবল প্রথমটি জানে, আয়াতসমূহের বাতিনি ও অন্তর্নিহিত মর্ম একমাত্র তারাই জানে। এই দাবিকে উপজীব্য করে তারা কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা করতে থাকে এবং ভ্রান্ত বিভিন্ন আকিদা ও ব্যাখ্যা তৈরি করে ইসলামের গণ্ডি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যায়।
হাসান বিন সাবাহই এই ভ্রান্ত গোষ্ঠীর মূল নেতা ছিলেন। তিনি তার অনুসারীদের হাশিশ (এক ধরনের নেশা উদ্রেককারী উদ্ভিদের নির্যাস) পান করাতেন। ফলে তাদের বিবেক-বুদ্ধি লোপ পেত এবং তারা তাদের 'শায়খ' হাসান বিন সাবাহর অন্ধ আনুগত্য শুরু করত।
এরপর হাসান আরও ভয়ানক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি তার অনুসারীদের জন্য দুর্গম পাহাড়ের পাদদেশে একটি মনোরম উদ্যান গড়ে তোলেন এবং এর নামকরণ করেন 'জান্নাত'! তিনি সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করেন, সব জাতের ফল-ফলাদির ব্যবস্থা করেন এবং ছোট ছোট কৃত্রিম ঝরনা ও প্রস্রবণ তৈরি করেন। তিনি সেখানে তার অনুসারী সুদর্শনা তরুণীদের নিয়োজিত করেন।
হাসান তার যেকোনো অনুসারীকে প্রথমে হাশিশ পান করিয়ে পুরোপুরি অচেতন করে ফেলতেন, এরপর অচেতন অবস্থায় কথিত জান্নাতে নিয়ে আসতেন। অচেতন অনুসারী যখন কিছুটা চেতনা ফিরে পেয়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় থাকত, তখন তার সামনে হরেক পদের খাবার ও পানীয় পরিবেশন করা হতো। এরপর সে সুন্দরী যুবতীদের সঙ্গে অপকর্মে লিপ্ত হতো। তারপর তাকে পুনরায় হাশিশ পান করিয়ে অচেতন করে ফেলা হতো এবং 'জান্নাত' থেকে বের করে নিয়ে আসা হতো। চেতনা ফিরে এলে তাকে বলা হতো, আবারও জান্নাতে ফিরতে চাইলে 'শায়খুল জাবাল' (হাসান বিন সাবাহ)-এর নিঃশর্ত আনুগত্য করতে হবে। এভাবে কয়েকবার হাশিশ পান ও কৃত্রিম উদ্যানে আনা-নেওয়া করে তাকে হাশিশের নেশায় আসক্ত করে তোলা হতো এবং কৃত্রিম জান্নাত ও তার ভোগসামগ্রীর প্রতি পাগলপারা করে তোলা হতো। তারপর একদিন তাকে নির্দেশ দেওয়া হতো—যাও, আত্মঘাতী অভিযানে অংশ নিয়ে প্রাণ উৎসর্গ করে এসো। তাহলে তুমি চিরদিন জান্নাতে থাকতে পারবে!
অনুসারী হিসেবে তারা সাদাসিধা, চিন্তা-ধর্মে সরল, দরিদ্র-নিপীড়িত, গ্রাম্য-গোঁয়ার লোকদের বাছাই করত। এসব লোক নেতাদের হাতের পুতুলে পরিণত হতো এবং নেতারা যা আদেশ করত, নির্দ্বিধায় তা পালন করত।
বাতিনিরা গুপ্তহত্যাকে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করেছিল এবং চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের নিত্যনতুন কৌশল উদ্ভাবন করে ব্যাপকহারে গুপ্তহত্যার পথ বেছে নিয়েছিল। সশস্ত্র গোষ্ঠী হওয়ায় তাদের লাগাম টেনে ধরা ছিল অত্যন্ত কঠিন। এ কারণে তাদের নাম শুনলেই শাসক-প্রজা নির্বিশেষে সকলের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠত!
যেহেতু তারা হাশিশ পানে অভ্যস্ত ছিল, তাই ইতিহাসে তারা 'নিয়ারিয়া', 'বাতিনি' ইত্যাদি নামের পাশাপাশি 'হাশশাশিন' নামেও পরিচিত। ইতিহাসে এদের অন্যায়কর্মের ফিরিস্তি বেশ দীর্ঘ। তাদের অনেক হত্যাপ্রচেষ্টা যেমন সফল হয়, ব্যর্থও হয় অনেক অপচেষ্টা। কিন্তু সব সময় তারা ছিল ভীতি ও ত্রাসের প্রতীক এবং সত্যের পথিকদের চলার পথে বাধা সৃষ্টিকারী।

টিকাঃ
৮০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪।
৮১. আল-মাকরিজি, ইত্তিআ'জুল হুনাফা বি-আখবারিল আইম্মাতিল ফাতিমিয়ীনাল খুলাফা, ৩/১১।
৮২. উজির বদর আল-জামালি হাসান বিন সাবাহকে বন্দি করে মাগরিবে নির্বাসিত করেছিলেন। কিন্তু হাসানকে বহনকারী জাহাজ পথিমধ্যে ঝড়ের কবলে পড়ে বাতাসের টানে শামের উপকূলীয় এলাকায় চলে যায়। তখন হাসান বিন সাবাহ আক্কার উপকূলীয় এলাকায় অবতরণ করেন এবং সেখান থেকে নিজের এলাকা ইস্পাহানে ফিরে যান। এরপর তিনি সেখানে নিযারের পক্ষে প্রচারণা চালাতে থাকেন। ওদিকে নিযার তার ভাই মুসতালির কারাগারে বন্দি অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র হাদি বিন নিযার মিশর থেকে পালিয়ে পারস্যে হাসান বিন সাবাহর কাছে চলে আসেন এবং নিযারিয়া মতাদর্শের প্রসারে কাজ করতে থাকেন। (সম্পাদক)
৮০. আবু হামিদ আল-গাজালি, ফাযাইহুল বাতিনিয়্যা, পৃষ্ঠা: ১১ ও Grousset: Hist. des. Croisades 1,p. 530.
৮৪. Marco Polo: Travels, p. 50.
৮৫. Michaud: op. cit., II,pp. 72 -73.
b. Marco Polo: Travels, pp. 49-53
৮. Ivanow: An Islamic Ode in Praise of Fidawis, pp. 63-64.
৮৮. যেহেতু বাতিনিদের মূল লক্ষ্য ছিল সারা বিশ্বে নিজেদের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করা, তাই তারা মুসলিম বিশ্বকে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দিক থেকে নেতৃত্বশূন্য করার লক্ষ্যে গুপ্তহত্যা ও আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে সমকালীন ইসলামি বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামি শক্তি যথা আব্বাসি খিলাফত, সেলজুক, খোয়ারিজমি, জিনকি ও আইয়ুবি সালতানাতের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। তারা আব্বাসি খলিফা মুসতারশিদ, রাশিদ, বাগদাদের উজির নিজামুল মুলক ও সুলতান মুহাম্মাদ ঘুরিকে হত্যা করে এবং সেলজুক সুলতান মালিকশাহ, জিনকি সুলতান নুরুদ্দিন মাহমুদ ও আইয়ুবি সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবিকে হত্যা করার জন্য একাধিকবার চেষ্টা চালায়। (সম্পাদক)
৮. শিয়া ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়ের মূল শাখা তিনটি— কারামাতিয়া, মুসতালিয়া ও নিযারিয়া। কালের পরিক্রমায় বর্তমানে যেহেতু কারামাতিয়া ও মুসতালিয়াদের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে, তাই বর্তমানে ইসমাইলিয়া বলে নিযারিয়া বা বাতিনি গোষ্ঠীকেই বোঝানো হয়। বর্তমানে তারা 'আগাখানিয়া' নামে অধিক প্রসিদ্ধ। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল,=ইউরোপ ও ভারতে প্রচুর সংখ্যক আগাখানিয়া মতাদর্শী বসবাস করে। বর্তমানে তাদের প্রধান নেতা ফ্রান্সে বসবাসকারী ও ব্রিটিশ নাগরিকত্বের অধিকারী করিম হুসাইন শাহ (৪র্থ আগাখান), যিনি বিখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিনের ভাষ্য অনুসারে বিশ্বের শীর্ষ দশ ধনীর একজন। [সম্পাদক]

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 আসমানি ইশারা!

📄 আসমানি ইশারা!


এই আলোচনার পর আশা করি কোনো পাঠকের কাছে এ বিষয়টি অসম্ভব মনে হবে না যে, নেতাদের প্ররোচনায় কীভাবে একজন বাতিনি গুপ্তঘাতক মুসলিম উম্মাহর এক মহৎ পুরুষকে হত্যার লক্ষ্যে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিল। হয়তো তাকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল অনন্ত জান্নাতের কিংবা নিদেনপক্ষে চরম আসক্তির বস্তু এক পেয়ালা হাশিশের! আসমানি ইশারা!
এ বিষয়ে শেষ কথা হলো, এই ঘৃণ্য এবং জঘন্য হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য তো আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কেউ জানে না, তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এর মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ মহান এক নেতাকে হারায়; যিনি এমন দুর্যোগপূর্ণ সময়ে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জিহাদের ঝান্ডা বহন করেছিলেন, যখন অন্য সবাই এই মর্যাদার কেতন বহন করতে উদাসীনতা প্রদর্শন করেছিল। নিঃসন্দেহে মওদুদের মৃত্যুপরবর্তী সময় ছিল মুসলিম উম্মাহর জন্য বড় কঠিন সময়। তবে মওদুদ রহ.-এর শাহাদাতপরবর্তী পরিস্থিতির বিশ্লেষণের পূর্বে আমি বিস্ময়কর দুটি ঘটনার অবতারণা করতে চাচ্ছি। ঘটনাদুটির সংঘটনে কোনো বিস্ময় নেই; বিস্ময় সংঘটনের সময়ে!
প্রথম ঘটনা মওদুদ রহ.-এর শাহাদাতের মাত্র তিন মাস পূর্বে সিন্নারার যুদ্ধে ইমাদুদ্দিন জিনকি নামক ইসলামি ইতিহাসের এক মহান বীরযোদ্ধার আত্মপ্রকাশ। বড় বিস্ময়কর সময় নির্বাচন! কেন তিনি আরও অনেক পূর্বে আলোচনায় এলেন না? কেন আত্মপ্রকাশ করলেন না মওদুদের মৃত্যুর অনেক দিন পর? এর একমাত্র উত্তর তো এই যে, এমনটিই ছিল তাকদিরের লিখন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নির্ধারণ। তবে আমরা এর অন্তর্নিহিত রহস্য ও সূক্ষ্ম ইঙ্গিত খুঁজে বের করতে পারি। এই সুনির্দিষ্ট সময়ে তার আত্মপ্রকাশের মাঝে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল যে—
"মুসলিম জাতি মৃত্যুঞ্জয়ী, চির অমর জাতি। মুসলিম জাতির অস্তিত্ব কখনোই কালের গর্ভে বিলীন হওয়ার নয়। আমরা একজন নেতা হারালে তৎক্ষণাৎ আরেকজন আত্মপ্রকাশ করবেন; একজন বীরসেনানী শহিদ হলে তার ঝান্ডা বহনে অগ্রসর হবেন আরেকজন। এ ধারা চলবে ততদিন, যতদিন না আল্লাহ তাআলা পৃথিবী ও পৃথিবীর ওপরের সবকিছুর চূড়ান্ত মালিকানা গ্রহণ করবেন।"
নিঃসন্দেহে রাব্বে কারিমের এই শাশ্বত নীতি মুসলমানদের হৃদয়ে বিজয়ের আশা জিইয়ে রাখে। ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে দেখুন। যেখানেই উম্মাহর আশা-প্রত্যাশার কোনো প্রদীপ নিভে যেতে দেখবেন, সেখানেই দেখবেন নতুন এক প্রদীপ জ্বলে উঠেছে। অনন্যসাধারণ জাতির এ এক অনন্য বৈশিষ্ট্য!
দ্বিতীয় বিস্ময়কর ঘটনা, মওদুদ রহ.-এর শাহাদাতের মাত্র তিন মাস পর ৫০৭ হিজরি সনের জুমাদাল উখরা মাসে (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে) আলেপ্পোর শাসক রিজওয়ানের প্রয়াণ!
রহস্যজনক মওদুদ হত্যাকাণ্ডের পেছনে রিজওয়ানের হাত থাক বা না থাক, একই সময়ে তার প্রস্থান ছিল নিতান্তই আশ্চর্যকর। রিজওয়ানের চারিত্রিক কলুষতা ছিল সর্বজনজ্ঞাত। মওদুদ-হত্যাই তার প্রথম বা একমাত্র অপরাধ ছিল না; এর পূর্বেও তিনি উম্মাহর স্বার্থবিরোধী নানারকম অপকর্ম ঘটিয়েছেন। এই সুনির্দিষ্ট সময়ে তার ইহধাম ত্যাগের মাঝে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল যে—
"প্রতিটি মানুষের জন্য একটি 'আজাল' বা সুনির্ধারিত সময় আছে। কেউ তা এড়িয়ে যেতে পারে না। আজালের পূর্বেও কেউ মারা যায় না, আজালের পরেও না। মরতে হবে সবাইকে, কেউ থাকতে পারবে না চিরদিন। সচ্চরিত্র-অসচ্চরিত্র, নেককার-বদকার, নিষ্ঠাবান মুমিন-বিশ্বাসঘাতক মুনাফিক সবাইকে ছুঁয়ে যাবে মৃত্যু। শাহাদাতের তামান্নায় সম্মুখ লড়াইয়ে অগ্রসর হওয়া মুজাহিদ যেমন মৃত্যুবরণ করবেন, বেঁচে থাকার আশায় গৃহকোণে আত্মগোপন করা কাপুরুষও তেমনই হীমশীতল মৃত্যুথাবার শিকার হবে।”
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত এক শাশ্বত বিধান— প্রতিটি প্রাণীই গ্রহণ করবে মৃত্যু-স্বাদ। তবে নিজের মৃত্যুর পথ মানুষ নিজেই বেছে নেয়! সুতরাং আপনার পথও আপনিই বেছে নিন। পুণ্যবানদের দোয়া সঙ্গে নিয়ে রবের অনুগত বান্দা হিসেবে মাথা উঁচু করে মৃত্যুকে বরণ করে নেবেন, না-কি মুমিনদের অভিশাপ সঙ্গে নিয়ে আল্লাহর অবাধ্য বান্দা হিসেবে লাঞ্ছনা মাথায় নিয়ে মারা যাবেন, তা নির্বাচনের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত আপনারই হাতে! আল্লাহর কাছে প্রার্থনা— তিনি আমাদেরকে তাঁর সুন্নাত ও শাশ্বত নীতি অনুধাবন করার তাওফিক দিন।
***

টিকাঃ
*০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৫১।
১. সূরা আলে-ইমরান: ১৮৫।

এই আলোচনার পর আশা করি কোনো পাঠকের কাছে এ বিষয়টি অসম্ভব মনে হবে না যে, নেতাদের প্ররোচনায় কীভাবে একজন বাতিনি গুপ্তঘাতক মুসলিম উম্মাহর এক মহৎ পুরুষকে হত্যার লক্ষ্যে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিল। হয়তো তাকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল অনন্ত জান্নাতের কিংবা নিদেনপক্ষে চরম আসক্তির বস্তু এক পেয়ালা হাশিশের! আসমানি ইশারা!
এ বিষয়ে শেষ কথা হলো, এই ঘৃণ্য এবং জঘন্য হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য তো আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কেউ জানে না, তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এর মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ মহান এক নেতাকে হারায়; যিনি এমন দুর্যোগপূর্ণ সময়ে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জিহাদের ঝান্ডা বহন করেছিলেন, যখন অন্য সবাই এই মর্যাদার কেতন বহন করতে উদাসীনতা প্রদর্শন করেছিল। নিঃসন্দেহে মওদুদের মৃত্যুপরবর্তী সময় ছিল মুসলিম উম্মাহর জন্য বড় কঠিন সময়। তবে মওদুদ রহ.-এর শাহাদাতপরবর্তী পরিস্থিতির বিশ্লেষণের পূর্বে আমি বিস্ময়কর দুটি ঘটনার অবতারণা করতে চাচ্ছি। ঘটনাদুটির সংঘটনে কোনো বিস্ময় নেই; বিস্ময় সংঘটনের সময়ে!
প্রথম ঘটনা মওদুদ রহ.-এর শাহাদাতের মাত্র তিন মাস পূর্বে সিন্নারার যুদ্ধে ইমাদুদ্দিন জিনকি নামক ইসলামি ইতিহাসের এক মহান বীরযোদ্ধার আত্মপ্রকাশ। বড় বিস্ময়কর সময় নির্বাচন! কেন তিনি আরও অনেক পূর্বে আলোচনায় এলেন না? কেন আত্মপ্রকাশ করলেন না মওদুদের মৃত্যুর অনেক দিন পর? এর একমাত্র উত্তর তো এই যে, এমনটিই ছিল তাকদিরের লিখন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নির্ধারণ। তবে আমরা এর অন্তর্নিহিত রহস্য ও সূক্ষ্ম ইঙ্গিত খুঁজে বের করতে পারি। এই সুনির্দিষ্ট সময়ে তার আত্মপ্রকাশের মাঝে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল যে—
"মুসলিম জাতি মৃত্যুঞ্জয়ী, চির অমর জাতি। মুসলিম জাতির অস্তিত্ব কখনোই কালের গর্ভে বিলীন হওয়ার নয়। আমরা একজন নেতা হারালে তৎক্ষণাৎ আরেকজন আত্মপ্রকাশ করবেন; একজন বীরসেনানী শহিদ হলে তার ঝান্ডা বহনে অগ্রসর হবেন আরেকজন। এ ধারা চলবে ততদিন, যতদিন না আল্লাহ তাআলা পৃথিবী ও পৃথিবীর ওপরের সবকিছুর চূড়ান্ত মালিকানা গ্রহণ করবেন।"
নিঃসন্দেহে রাব্বে কারিমের এই শাশ্বত নীতি মুসলমানদের হৃদয়ে বিজয়ের আশা জিইয়ে রাখে। ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে দেখুন। যেখানেই উম্মাহর আশা-প্রত্যাশার কোনো প্রদীপ নিভে যেতে দেখবেন, সেখানেই দেখবেন নতুন এক প্রদীপ জ্বলে উঠেছে। অনন্যসাধারণ জাতির এ এক অনন্য বৈশিষ্ট্য!
দ্বিতীয় বিস্ময়কর ঘটনা, মওদুদ রহ.-এর শাহাদাতের মাত্র তিন মাস পর ৫০৭ হিজরি সনের জুমাদাল উখরা মাসে (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে) আলেপ্পোর শাসক রিজওয়ানের প্রয়াণ!
রহস্যজনক মওদুদ হত্যাকাণ্ডের পেছনে রিজওয়ানের হাত থাক বা না থাক, একই সময়ে তার প্রস্থান ছিল নিতান্তই আশ্চর্যকর। রিজওয়ানের চারিত্রিক কলুষতা ছিল সর্বজনজ্ঞাত। মওদুদ-হত্যাই তার প্রথম বা একমাত্র অপরাধ ছিল না; এর পূর্বেও তিনি উম্মাহর স্বার্থবিরোধী নানারকম অপকর্ম ঘটিয়েছেন। এই সুনির্দিষ্ট সময়ে তার ইহধাম ত্যাগের মাঝে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল যে—
"প্রতিটি মানুষের জন্য একটি 'আজাল' বা সুনির্ধারিত সময় আছে। কেউ তা এড়িয়ে যেতে পারে না। আজালের পূর্বেও কেউ মারা যায় না, আজালের পরেও না। মরতে হবে সবাইকে, কেউ থাকতে পারবে না চিরদিন। সচ্চরিত্র-অসচ্চরিত্র, নেককার-বদকার, নিষ্ঠাবান মুমিন-বিশ্বাসঘাতক মুনাফিক সবাইকে ছুঁয়ে যাবে মৃত্যু। শাহাদাতের তামান্নায় সম্মুখ লড়াইয়ে অগ্রসর হওয়া মুজাহিদ যেমন মৃত্যুবরণ করবেন, বেঁচে থাকার আশায় গৃহকোণে আত্মগোপন করা কাপুরুষও তেমনই হীমশীতল মৃত্যুথাবার শিকার হবে।”
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত এক শাশ্বত বিধান— প্রতিটি প্রাণীই গ্রহণ করবে মৃত্যু-স্বাদ। তবে নিজের মৃত্যুর পথ মানুষ নিজেই বেছে নেয়! সুতরাং আপনার পথও আপনিই বেছে নিন। পুণ্যবানদের দোয়া সঙ্গে নিয়ে রবের অনুগত বান্দা হিসেবে মাথা উঁচু করে মৃত্যুকে বরণ করে নেবেন, না-কি মুমিনদের অভিশাপ সঙ্গে নিয়ে আল্লাহর অবাধ্য বান্দা হিসেবে লাঞ্ছনা মাথায় নিয়ে মারা যাবেন, তা নির্বাচনের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত আপনারই হাতে! আল্লাহর কাছে প্রার্থনা— তিনি আমাদেরকে তাঁর সুন্নাত ও শাশ্বত নীতি অনুধাবন করার তাওফিক দিন।
***

টিকাঃ
*০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৫১।
১. সূরা আলে-ইমরান: ১৮৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00