📄 সিন্নাবরার যুদ্ধ
নতুন করে আবারও মওদুদ রহ.-এর ইতিহাসে ফিরে আসছি। মওদুদ আবারও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে নতুন অভিযান শুরু করার প্রস্তুতি শুরু করেন। তিনি কেবল বের হওয়ার উপযুক্ত সুযোগের প্রতীক্ষা করছিলেন। মওদুদের দৃষ্টি নির্দিষ্ট কোনো ক্রুসেড রাজ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তার লক্ষ্য ছিল, নির্দিষ্ট কোনো এলাকা নয়; বরং পুরো অধিকৃত অঞ্চলকে ক্রুসেডারদের হাত থেকে উদ্ধার করা। এরই মধ্যে ৫০৬ হিজরি সনের শেষ দিকে (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) দামেশকের আমির তুগতেকিন মওদুদের কাছে সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন। তিনি এ সময় বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক ১ম বল্ডউইনের পক্ষ থেকে হামলার আশঙ্কা করছিলেন।
তুগতেকিন মূলত বিভিন্ন ক্ষেত্রেই ১ম বল্ডউইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। বিশেষ করে লেবানন অঞ্চলের সুর নগরীকে কেন্দ্র করে উভয়ের দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছেছিল। লেবানন অঞ্চলে সুর ছিল একমাত্র নগরী, যা তখনও ক্রুসেডারদের দখলদারিত্বের শিকার হয়নি। বিষয়টি বল্ডউইনের নজরে ছিল। তিনি এ সময় নগরীটির পতন ঘটাতে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। আক্রান্ত নগরবাসী তুগতেকিনের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করলে তিনি তার বাহিনীর একটি অংশ নিয়ে অগ্রসর হন এবং বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে নগরীটির প্রতিরক্ষা করতে সক্ষম হন। তিনি এ সময় সুরবাসীকে বলেন, 'আমি সম্পদ বা কোনো দুর্গের কর্তৃত্ব লাভের আশায় নয়; একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় এখানে এসেছি। ভবিষ্যতেও যখনই শত্রুপক্ষ তোমাদের ওপর আক্রমণ করবে, আমি নিজে আমার সৈন্যদের নিয়ে তোমাদের সাহায্যার্থে চলে আসব। ইতিহাসের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তার এই বক্তব্যের সত্যায়ন করে। পরবর্তী সময়ে তিনি সুরবাসীর কাছে এই সাহায্যের কোনো বিনিময় দাবি করেননি।
তুগতেকিনের এই স্বপ্রণোদিত সহায়তা বল্ডউইনকে বেশ বিক্ষুব্ধ করে তোলে। তিনি এর প্রতিশোধ নিতে দামেশকের দক্ষিণে অবস্থিত বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালাতে শুরু করেন। এই অভিযানে তিনি তাবারিয়া ও জালিল অঞ্চলের নতুন উদ্যমী প্রশাসক জোসেলিনের নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে কাজে লাগান। এতটুকুতেই ক্ষান্ত না হয়ে বল্ডউইন এরপর কায়রোগামী দামেশকের বিভিন্ন কাফেলার ওপর হামলা চালাতে শুরু করেন। কাফেলাগুলো যদিও বাইতুল মুকাদ্দাসের ক্রুসেডারদের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য উপকূলীয় পথ ছেড়ে অনেকটা ভেতর দিয়ে পথ চলত; কিন্তু বল্ডউইন তাদের নাগাল পেতে মৃত সাগরের দক্ষিণে ওয়াদিয়ে মুসা অঞ্চলে ওত পেতে থাকতেন। তিনি বণিক কাফেলার ওপর হামলা চালিয়ে বাণিজ্যপণ্য ও অন্যান্য সম্পদ ছিনিয়ে নিতেন এবং বণিকদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালাতেন। বল্ডউইনের প্রতিশোধস্পৃহা এরপরও চরিতার্থ হয়নি। বরং ক্রুসেডারদের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও প্রস্তুতি দেখে তুগতেকিন অনুভব করেন যে, তারা সম্ভবত দামেশকের দক্ষিণাঞ্চলে বা খোদ দামেশক নগরীতেই বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করছে। এ কারনেই বাধ্য হয়ে তিনি এ অঞ্চলের প্রকৃত নেতা মসুলের আমির মওদুদ বিন তুনতেকিনের কাছে সহায়তা কামনা করেন।
মওদুদ ভেবে দেখেন, ঝুঁকিপূর্ণ হলেও এটি ক্রুসেডারদের পরাভূত করার একটি অনুকূল সুযোগ। ঝুঁকির কারণ হলো, এক্ষেত্রে তাকে মসুল থেকে অনেক দূরে দামেশক রাজ্যের গভীরতম অঞ্চলে গিয়ে লড়াই করতে হবে। সম্ভবত প্রতিপক্ষের সঙ্গে মোকাবিলা হবে দামেশকের দক্ষিণ অঞ্চলে, যা মসুল থেকে এক হাজার কিলোমিটারেরও অধিক দূরত্বে অবস্থিত। তা ছাড়া তাকে লড়তে হবে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ক্রুসেড রাজ্য বাইতুল মুকাদ্দাসের বাহিনীর সঙ্গে। তদুপরি এ আশঙ্কাও আছে যে, এন্টিয়ক ও এডেসার ক্রুসেডাররা তার ফেরার পথ আটকে দেবে। তখন তো তিনি আরও জটিলতর পরিস্থিতির সম্মুখীন হবেন। এত সব ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও মওদুদ তুগতেকিনের আহ্বানে দ্বিধাহীন চিত্তে সাড়া দেন এবং যে মাসে তুগতেকিনের বার্তা মসুলে পৌঁছায় সে মাসেই অর্থাৎ ৫০৬ হিজরি সনের শেষ দিকে (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) তার বাহিনী নিয়ে দামেশক অভিমুখে রওনা হন।
দামেশকের পথে রওনা হওয়ার পর যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি মওদুদের চিন্তাজগৎকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, তা হলো—কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পরই তাকে ক্রুসেড রাজ্য এডেসার দক্ষিণ অংশ পাড়ি দিতে হবে বা নিদেনপক্ষে রাজ্যটির কোনো না কোনো অংশ অতিক্রম করতে হবে। সেক্ষেত্রে নিশ্চিত করেই রাজ্যটির ক্রুসেড শক্তি তার ওপর হামলে পড়বে। যেহেতু তিনি বেশ কয়েকবার এডেসায় অভিযান চালিয়েছেন এবং এডেসা নগরী অবরোধ করেছেন, তাই রাজ্যটির সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের উত্তেজনাপূর্ণ। কিন্তু আল্লাহ তাআলা এই মহান মুজাহিদের দুশ্চিন্তা দূর করে দেন এবং তার যাত্রাপথ সুগম করে দেন।
এডেসা রাজ্যের অভ্যন্তরে সংঘটিত কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ক্রুসেডাররা এ সময় নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যে মাসে মওদুদ মসুল থেকে দামেশকের উদ্দেশে রওনা হন, সে মাসেই অর্থাৎ ১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে রাজ্যটিতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, আর্মেনীয়রা ক্রুসেডারদের শাসন থেকে মুক্তি পেতে নতুন করে মুসলমানদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। বিষয়টি সত্য হোক বা মিথ্যা; এর প্রতিক্রিয়ায় বল্ডউইন ডি বুর্গ চূড়ান্ত পর্যায়ের আগ্রাসী হয়ে ওঠেন। তার নির্দেশে এডেসার ক্রুসেডার বাহিনী কোনো প্রকার বাছবিচার ব্যতিরেকে ঘৃণ্য জাতিগত নির্মূল অভিযান শুরু করে। প্রথমে তারা নিরস্ত্র আর্মেনীয়দের নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে। এরপর এডেসার নগরদ্বারসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং বেঁচে থাকা অবশিষ্ট আর্মেনীয়দের নগরী ছেড়ে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। যারা তখনও বেঁচে ছিল, তাদের অনেকে নিজেদের ঘরবাড়ি, সহায়সম্পত্তি সব ছেড়ে অনিশ্চিত গন্তব্যের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ে; আবার অনেকে নিজেদের বাড়িতেই থেকে যায়। এরপর ক্রুসেডাররা তাদের ঘরে ঘরে প্রবেশ করে লুটপাট করে, তারপর আর্মেনীয়দের ভেতরে রেখেই ঘরগুলো জ্বালিয়ে দেয়। আর্মেনীয় ঐতিহাসিক 'ম্যাথিউ ডি এডেসা'র বর্ণনামতে এই জাতিগত নির্মূল অভিযানের সবচেয়ে বীভৎসতম দিন ছিল ১৩ মে। সেদিন আক্ষরিক অর্থেই নগরীটিতে গণহত্যা চালানো হয়। আর্মেনীয়দের সামগ্রিক ইতিহাসে দিনটি 'কালো দিবস' হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ম্যাথিউর বর্ণনামতে সেদিন পরিস্থিতি এত ভয়াবহ ছিল যে, পিতা তার সন্তানকে চিনতে পারছিল না, সন্তান চিনতে পারছিল না পিতাকে। প্রত্যেকেই কোনোমতে জান-হাতে-নিয়ে পালানোর চেষ্টায় ছিল। নির্বিচারে সকল আর্মেনীয় নাগরিককে হত্যা বা বিতাড়িত করার পরই কেবল এই ধ্বংসযজ্ঞ থামে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এডেসা রাজ্যের সামরিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা-পরিস্থিতি পুরোপুরি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এ কারণে বল্ডউইন ডি বুর্গ মওদুদের বাহিনীর গতিরোধ বা ফিরতি পথে বাধা প্রদানের চিন্তাও করতে পারেননি। নিঃসন্দেহে এটি ছিল সত্যিকারের মুমিন ও মহান মুজাহিদ মওদুদ বিন তুনতেকিনের জন্য রাব্বে কারিমের পক্ষ থেকে এক আসমানি তদবির ও অদৃষ্ট ব্যবস্থাপনা!
যদিও ইতিপূর্বে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযানে শরিক মুসলিম রাজন্যবর্গ মওদুদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, তবুও ঐক্য-নীতির ধারক মওদুদ সবাইকে এক পতাকাতলে সমবেত করে একতার শক্তি অর্জনের লক্ষ্যে নতুন করে রাজন্যবর্গকে একজোট হওয়ার আহ্বান জানান। তার এবারের আহ্বানে সাড়া দেন উত্তর ইরাকের দিয়ারে বকর অঞ্চলের সিনজার রাজ্যের আমির কুমাইরুক এবং মারদিনের আমির ইয়াজ বিন ইলগাজি। আর স্বভাবতই মওদুদকে যিনি আহ্বান জানিয়েছিলেন, সেই দামেশকের আমির তুগতেকিন তো ছিলেনই।
সেলজুক বাহিনীগুলো হামা নগরীর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত সালামিয়া (Salamiyah) নগরীর কাছে একত্র হয়। এরপর সম্মিলিত মুসলিম বাহিনী সরাসরি তাবারিয়া নগরী অভিমুখে অগ্রসর হয়। ফিলিস্তিন অঞ্চলের বিখ্যাত তাবারিয়া হ্রদ (The Sea of Galilee)-এর পাশে অবস্থিত নগরীটির নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত মজবুত। তাবারিয়ায় মওদুদের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত বাহিনীর সঙ্গে তুগতেকিনের বাহিনীও মিলিত হয়। মুসলিম বাহিনী দ্রুত তাবারিয়া অবরোধ করলেও সুরক্ষিত নিরাপত্তার কারণে নগরীটির পতন ঘটানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাই মুসলিম বাহিনী সেখান থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করে আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করতে থাকে এবং বিপুল পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি ক্রুসেডারদের দখল থেকে বিভিন্ন এলাকা পুনরুদ্ধার করে। এভাবে অভিযান অব্যাহত রেখে মুসলিম বাহিনী একসময় তুর পাহাড়ের কাছে পৌঁছায়।
মুসলিম বাহিনীর তৎপরতার সংবাদ দ্রুত বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক ১ম বল্ডউইনের কাছে পৌঁছে যায়। পরিস্থিতির নাজুকতা উপলব্ধি করে তিনি দ্রুত সবগুলো ক্রুসেড রাজ্যে সাহায্য চেয়ে বার্তা প্রেরণ করেন।
এন্টিয়কের নতুন শাসক রজার ও ত্রিপোলির নতুন শাসক পন্স তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে তাবারিয়া অভিমুখে রওনা হয়ে যান। তবে এডেসার শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গ নিজ রাজ্যের অভ্যন্তরীণ গোলযোগের কারণে অভিযানে যোগ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
সাহায্য চেয়ে বার্তা প্রেরণ করলেও উত্তর থেকে আগত মুসলিম বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করার সুযোগ বল্ডউইনের ছিল না। তিনি আশঙ্কা করছিলেন যে, দেরি করলে মুসলিম বাহিনী তার রাজ্যে ঢুকে পড়বে। সেক্ষেত্রে আল-কুদসে ক্রুসেডারদের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে যাবে। কারণ আসকালান তখনও উবায়দিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আর তাই মুসলিম বাহিনী তার রাজ্যে প্রবেশ করতে পারলে আল-কুদস দু-দিক থেকে সেলজুক ও উবায়দি বাহিনী দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে। এসব দিক বিবেচনা করে অন্যান্য বাহিনীর অপেক্ষা না করেই বল্ডউইন দ্রুত নিজ বাহিনী নিয়ে উত্তরে তাবারিয়া অভিমুখে অগ্রসর হন।
দক্ষিণ দিক থেকে ক্রুসেডার বাহিনীর অগ্রসর হওয়ার সংবাদ পেয়ে মওদুদ দ্রুত লড়াইয়ের জন্য একটি উপযুক্ত স্থান সন্ধান করেন। তিনি তাবারিয়া হ্রদের দক্ষিণে জর্ডান নদী ও ইয়ারমুক নদীর মাঝে অবস্থিত 'উকহুয়ানা' নামে পরিচিত উপদ্বীপ এলাকাকে আসন্ন যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত বিবেচনা করেন। এখানেই থেমে না থেকে এরপর তিনি তাবারিয়া হ্রদের দক্ষিণ-পশ্চিমে জর্ডান নদীর ওপর অবস্থিত সিন্নাবরা সেতুর কাছে বল্ডউইনের জন্য এক কঠিন ফাঁদ পাতেন।
আল্লাহর পাকের অনুগ্রহে ৫০৭ হিজরি সনের ১৩ মুহাররম (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের ২০ জুন) বল্ডউইন সিন্নাবরা সেতুর কাছে মওদুদের পাতা ফাঁদে পা দেন। এমনকি তিনি পৃষ্ঠদেশের নিরাপত্তার জন্য তার বাহিনীর কোনো অংশকে পেছনে মোতায়েন না করে চরম অসাবধানতার পরিচয় দেন। বল্ডউইন যেন তার দীর্ঘ জীবনে অর্জিত সকল রণকৌশল ও সামরিক নিয়মনীতিই ভুলে গিয়েছিলেন! তার এই আচরণের একটাই ব্যাখ্যা করা যেতে পারে—আল্লাহ তার দৃষ্টি অন্ধ করে দিয়েছিলেন!
সিন্নাবরা সেতুর কাছে প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইতিহাসে এ যুদ্ধ 'সিন্নাবরার যুদ্ধ' নামে খ্যাত। শুরুতেই প্রতিপক্ষকে হতচকিত করে দিয়ে হঠাৎ আক্রমণ যুদ্ধের গতিপথ মুসলমানদের পক্ষে নিয়ে আসতে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখে।
মালাতিয়া মারদিন আহলাত সুমাইসাত এডেসা মসুল হিরাক্লিয়া আদানা মপসুয়েসটিয়া মারআশ সিনজার আলবেরা ইসকানদারুন এন্টিয়ক মাআ'ররাতুন-নোমান তিল-বাশির লাতাকিয়া হাররান আলেপ্পো ইরবিল জাবালা বানিয়াস হামা ইরকা সালামিয়া ভূমধ্যসাগর ত্রিপোলি হিমস ব্যাবলস বালাবাকু তারতুস দামেশক সিডন বৈরুত সুর আড়া হাইফা কায়সারিয়া তাবারিয়া আম্মান আল-কুদস আরসুফ জাফা আসকালান গাজা রামলা কারাক শামের মরুঅঞ্চল ইরাক
মানচিত্র নং-২৪ সিন্নাবরার যুদ্ধ
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কিছু সময় অতিবাহিত না হতেই ক্রুসেডার বাহিনী পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে যায়। দুই হাজারের অধিক ক্রুসেড যোদ্ধা নিহত হয়। সেনাপতি বল্ডউইন তার বাহিনীর অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশকে হারানোর পর অনেক কষ্টে প্রাণ নিয়ে পালাতে সক্ষম হন। এ যুদ্ধে মুসলমানরা বিপুল পরিমাণ অশ্ব, যুদ্ধাস্ত্র ও অন্যান্য যুদ্ধলব্ধ সম্পদ লাভ করে। পূর্বের বছর এডেসা অভিযানে পরাজিত হয়ে সেনাপতি মওদুদ যে শিক্ষা পেয়েছিলেন, এদিন তিনি তার বদলা তুলে নেন। এ তথ্যটিও উল্লেখযোগ্য যে, সিন্নাবরার যুদ্ধেই ইতিহাস প্রথমবারের মতো প্রত্যক্ষ করে মওদুদের বাহিনীর এক নতুন ইসলামি তারকার সামরিক নিপুণতা ও রণদক্ষতা। নতুন উদিত এই তারকার নাম ইমাদুদ্দিন জিনকি। ইসলামি ইতিহাসের এই অনন্যসাধারণ সেনাপতি সিন্নাবরার যুদ্ধে বীরত্বের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন। ঐতিহাসিক ইবনুল আছির এ সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন,
“তিনি এ যুদ্ধে রণদক্ষতার চূড়ান্ত স্তরে উপনীত হয়েছিলেন!”
টিকাঃ
৫৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৯।
৫৫. সিবতু ইবনিল জাওযি, মিরআতুয-যামান, (৫০৬-৫০৮ হিজরি সনের ঘটনাবলি)।
৫৬. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২১৮ ও Albert d' Aix, p.693.
৫৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/ ১৪৯।
৫৮. প্রাগুক্ত, ৯/১৪৯।
৫৯. Grousset: Hist. des. Croisades 1, p. 490.
৬০. Matthieu d' Edesse, pp. 104-106.
৬১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৯।
৬২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৯ ও Albert d' Aix, p. 694.
৬৩. সিবতু ইবনিল জাওযি, মিরআতুয-যামান, পৃষ্ঠা: ৫৪৬-৫৪9।
৬৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৯।
৬৫. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৮৫।
**. Guillaume de Tyr, p. 486 Foucher de Chartres, p. 426.
৬৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৫৩।
নতুন করে আবারও মওদুদ রহ.-এর ইতিহাসে ফিরে আসছি। মওদুদ আবারও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে নতুন অভিযান শুরু করার প্রস্তুতি শুরু করেন। তিনি কেবল বের হওয়ার উপযুক্ত সুযোগের প্রতীক্ষা করছিলেন। মওদুদের দৃষ্টি নির্দিষ্ট কোনো ক্রুসেড রাজ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তার লক্ষ্য ছিল, নির্দিষ্ট কোনো এলাকা নয়; বরং পুরো অধিকৃত অঞ্চলকে ক্রুসেডারদের হাত থেকে উদ্ধার করা। এরই মধ্যে ৫০৬ হিজরি সনের শেষ দিকে (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) দামেশকের আমির তুগতেকিন মওদুদের কাছে সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন। তিনি এ সময় বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক ১ম বল্ডউইনের পক্ষ থেকে হামলার আশঙ্কা করছিলেন।
তুগতেকিন মূলত বিভিন্ন ক্ষেত্রেই ১ম বল্ডউইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। বিশেষ করে লেবানন অঞ্চলের সুর নগরীকে কেন্দ্র করে উভয়ের দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছেছিল। লেবানন অঞ্চলে সুর ছিল একমাত্র নগরী, যা তখনও ক্রুসেডারদের দখলদারিত্বের শিকার হয়নি। বিষয়টি বল্ডউইনের নজরে ছিল। তিনি এ সময় নগরীটির পতন ঘটাতে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। আক্রান্ত নগরবাসী তুগতেকিনের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করলে তিনি তার বাহিনীর একটি অংশ নিয়ে অগ্রসর হন এবং বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে নগরীটির প্রতিরক্ষা করতে সক্ষম হন। তিনি এ সময় সুরবাসীকে বলেন, 'আমি সম্পদ বা কোনো দুর্গের কর্তৃত্ব লাভের আশায় নয়; একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় এখানে এসেছি। ভবিষ্যতেও যখনই শত্রুপক্ষ তোমাদের ওপর আক্রমণ করবে, আমি নিজে আমার সৈন্যদের নিয়ে তোমাদের সাহায্যার্থে চলে আসব। ইতিহাসের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তার এই বক্তব্যের সত্যায়ন করে। পরবর্তী সময়ে তিনি সুরবাসীর কাছে এই সাহায্যের কোনো বিনিময় দাবি করেননি।
তুগতেকিনের এই স্বপ্রণোদিত সহায়তা বল্ডউইনকে বেশ বিক্ষুব্ধ করে তোলে। তিনি এর প্রতিশোধ নিতে দামেশকের দক্ষিণে অবস্থিত বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালাতে শুরু করেন। এই অভিযানে তিনি তাবারিয়া ও জালিল অঞ্চলের নতুন উদ্যমী প্রশাসক জোসেলিনের নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে কাজে লাগান। এতটুকুতেই ক্ষান্ত না হয়ে বল্ডউইন এরপর কায়রোগামী দামেশকের বিভিন্ন কাফেলার ওপর হামলা চালাতে শুরু করেন। কাফেলাগুলো যদিও বাইতুল মুকাদ্দাসের ক্রুসেডারদের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য উপকূলীয় পথ ছেড়ে অনেকটা ভেতর দিয়ে পথ চলত; কিন্তু বল্ডউইন তাদের নাগাল পেতে মৃত সাগরের দক্ষিণে ওয়াদিয়ে মুসা অঞ্চলে ওত পেতে থাকতেন। তিনি বণিক কাফেলার ওপর হামলা চালিয়ে বাণিজ্যপণ্য ও অন্যান্য সম্পদ ছিনিয়ে নিতেন এবং বণিকদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালাতেন। বল্ডউইনের প্রতিশোধস্পৃহা এরপরও চরিতার্থ হয়নি। বরং ক্রুসেডারদের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও প্রস্তুতি দেখে তুগতেকিন অনুভব করেন যে, তারা সম্ভবত দামেশকের দক্ষিণাঞ্চলে বা খোদ দামেশক নগরীতেই বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করছে। এ কারনেই বাধ্য হয়ে তিনি এ অঞ্চলের প্রকৃত নেতা মসুলের আমির মওদুদ বিন তুনতেকিনের কাছে সহায়তা কামনা করেন।
মওদুদ ভেবে দেখেন, ঝুঁকিপূর্ণ হলেও এটি ক্রুসেডারদের পরাভূত করার একটি অনুকূল সুযোগ। ঝুঁকির কারণ হলো, এক্ষেত্রে তাকে মসুল থেকে অনেক দূরে দামেশক রাজ্যের গভীরতম অঞ্চলে গিয়ে লড়াই করতে হবে। সম্ভবত প্রতিপক্ষের সঙ্গে মোকাবিলা হবে দামেশকের দক্ষিণ অঞ্চলে, যা মসুল থেকে এক হাজার কিলোমিটারেরও অধিক দূরত্বে অবস্থিত। তা ছাড়া তাকে লড়তে হবে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ক্রুসেড রাজ্য বাইতুল মুকাদ্দাসের বাহিনীর সঙ্গে। তদুপরি এ আশঙ্কাও আছে যে, এন্টিয়ক ও এডেসার ক্রুসেডাররা তার ফেরার পথ আটকে দেবে। তখন তো তিনি আরও জটিলতর পরিস্থিতির সম্মুখীন হবেন। এত সব ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও মওদুদ তুগতেকিনের আহ্বানে দ্বিধাহীন চিত্তে সাড়া দেন এবং যে মাসে তুগতেকিনের বার্তা মসুলে পৌঁছায় সে মাসেই অর্থাৎ ৫০৬ হিজরি সনের শেষ দিকে (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) তার বাহিনী নিয়ে দামেশক অভিমুখে রওনা হন।
দামেশকের পথে রওনা হওয়ার পর যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি মওদুদের চিন্তাজগৎকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, তা হলো—কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পরই তাকে ক্রুসেড রাজ্য এডেসার দক্ষিণ অংশ পাড়ি দিতে হবে বা নিদেনপক্ষে রাজ্যটির কোনো না কোনো অংশ অতিক্রম করতে হবে। সেক্ষেত্রে নিশ্চিত করেই রাজ্যটির ক্রুসেড শক্তি তার ওপর হামলে পড়বে। যেহেতু তিনি বেশ কয়েকবার এডেসায় অভিযান চালিয়েছেন এবং এডেসা নগরী অবরোধ করেছেন, তাই রাজ্যটির সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের উত্তেজনাপূর্ণ। কিন্তু আল্লাহ তাআলা এই মহান মুজাহিদের দুশ্চিন্তা দূর করে দেন এবং তার যাত্রাপথ সুগম করে দেন।
এডেসা রাজ্যের অভ্যন্তরে সংঘটিত কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ক্রুসেডাররা এ সময় নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যে মাসে মওদুদ মসুল থেকে দামেশকের উদ্দেশে রওনা হন, সে মাসেই অর্থাৎ ১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে রাজ্যটিতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, আর্মেনীয়রা ক্রুসেডারদের শাসন থেকে মুক্তি পেতে নতুন করে মুসলমানদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। বিষয়টি সত্য হোক বা মিথ্যা; এর প্রতিক্রিয়ায় বল্ডউইন ডি বুর্গ চূড়ান্ত পর্যায়ের আগ্রাসী হয়ে ওঠেন। তার নির্দেশে এডেসার ক্রুসেডার বাহিনী কোনো প্রকার বাছবিচার ব্যতিরেকে ঘৃণ্য জাতিগত নির্মূল অভিযান শুরু করে। প্রথমে তারা নিরস্ত্র আর্মেনীয়দের নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে। এরপর এডেসার নগরদ্বারসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং বেঁচে থাকা অবশিষ্ট আর্মেনীয়দের নগরী ছেড়ে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। যারা তখনও বেঁচে ছিল, তাদের অনেকে নিজেদের ঘরবাড়ি, সহায়সম্পত্তি সব ছেড়ে অনিশ্চিত গন্তব্যের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ে; আবার অনেকে নিজেদের বাড়িতেই থেকে যায়। এরপর ক্রুসেডাররা তাদের ঘরে ঘরে প্রবেশ করে লুটপাট করে, তারপর আর্মেনীয়দের ভেতরে রেখেই ঘরগুলো জ্বালিয়ে দেয়। আর্মেনীয় ঐতিহাসিক 'ম্যাথিউ ডি এডেসা'র বর্ণনামতে এই জাতিগত নির্মূল অভিযানের সবচেয়ে বীভৎসতম দিন ছিল ১৩ মে। সেদিন আক্ষরিক অর্থেই নগরীটিতে গণহত্যা চালানো হয়। আর্মেনীয়দের সামগ্রিক ইতিহাসে দিনটি 'কালো দিবস' হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ম্যাথিউর বর্ণনামতে সেদিন পরিস্থিতি এত ভয়াবহ ছিল যে, পিতা তার সন্তানকে চিনতে পারছিল না, সন্তান চিনতে পারছিল না পিতাকে। প্রত্যেকেই কোনোমতে জান-হাতে-নিয়ে পালানোর চেষ্টায় ছিল। নির্বিচারে সকল আর্মেনীয় নাগরিককে হত্যা বা বিতাড়িত করার পরই কেবল এই ধ্বংসযজ্ঞ থামে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এডেসা রাজ্যের সামরিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা-পরিস্থিতি পুরোপুরি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এ কারণে বল্ডউইন ডি বুর্গ মওদুদের বাহিনীর গতিরোধ বা ফিরতি পথে বাধা প্রদানের চিন্তাও করতে পারেননি। নিঃসন্দেহে এটি ছিল সত্যিকারের মুমিন ও মহান মুজাহিদ মওদুদ বিন তুনতেকিনের জন্য রাব্বে কারিমের পক্ষ থেকে এক আসমানি তদবির ও অদৃষ্ট ব্যবস্থাপনা!
যদিও ইতিপূর্বে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযানে শরিক মুসলিম রাজন্যবর্গ মওদুদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, তবুও ঐক্য-নীতির ধারক মওদুদ সবাইকে এক পতাকাতলে সমবেত করে একতার শক্তি অর্জনের লক্ষ্যে নতুন করে রাজন্যবর্গকে একজোট হওয়ার আহ্বান জানান। তার এবারের আহ্বানে সাড়া দেন উত্তর ইরাকের দিয়ারে বকর অঞ্চলের সিনজার রাজ্যের আমির কুমাইরুক এবং মারদিনের আমির ইয়াজ বিন ইলগাজি। আর স্বভাবতই মওদুদকে যিনি আহ্বান জানিয়েছিলেন, সেই দামেশকের আমির তুগতেকিন তো ছিলেনই।
সেলজুক বাহিনীগুলো হামা নগরীর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত সালামিয়া (Salamiyah) নগরীর কাছে একত্র হয়। এরপর সম্মিলিত মুসলিম বাহিনী সরাসরি তাবারিয়া নগরী অভিমুখে অগ্রসর হয়। ফিলিস্তিন অঞ্চলের বিখ্যাত তাবারিয়া হ্রদ (The Sea of Galilee)-এর পাশে অবস্থিত নগরীটির নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত মজবুত। তাবারিয়ায় মওদুদের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত বাহিনীর সঙ্গে তুগতেকিনের বাহিনীও মিলিত হয়। মুসলিম বাহিনী দ্রুত তাবারিয়া অবরোধ করলেও সুরক্ষিত নিরাপত্তার কারণে নগরীটির পতন ঘটানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাই মুসলিম বাহিনী সেখান থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করে আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করতে থাকে এবং বিপুল পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি ক্রুসেডারদের দখল থেকে বিভিন্ন এলাকা পুনরুদ্ধার করে। এভাবে অভিযান অব্যাহত রেখে মুসলিম বাহিনী একসময় তুর পাহাড়ের কাছে পৌঁছায়।
মুসলিম বাহিনীর তৎপরতার সংবাদ দ্রুত বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক ১ম বল্ডউইনের কাছে পৌঁছে যায়। পরিস্থিতির নাজুকতা উপলব্ধি করে তিনি দ্রুত সবগুলো ক্রুসেড রাজ্যে সাহায্য চেয়ে বার্তা প্রেরণ করেন।
এন্টিয়কের নতুন শাসক রজার ও ত্রিপোলির নতুন শাসক পন্স তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে তাবারিয়া অভিমুখে রওনা হয়ে যান। তবে এডেসার শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গ নিজ রাজ্যের অভ্যন্তরীণ গোলযোগের কারণে অভিযানে যোগ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
সাহায্য চেয়ে বার্তা প্রেরণ করলেও উত্তর থেকে আগত মুসলিম বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করার সুযোগ বল্ডউইনের ছিল না। তিনি আশঙ্কা করছিলেন যে, দেরি করলে মুসলিম বাহিনী তার রাজ্যে ঢুকে পড়বে। সেক্ষেত্রে আল-কুদসে ক্রুসেডারদের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে যাবে। কারণ আসকালান তখনও উবায়দিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আর তাই মুসলিম বাহিনী তার রাজ্যে প্রবেশ করতে পারলে আল-কুদস দু-দিক থেকে সেলজুক ও উবায়দি বাহিনী দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে। এসব দিক বিবেচনা করে অন্যান্য বাহিনীর অপেক্ষা না করেই বল্ডউইন দ্রুত নিজ বাহিনী নিয়ে উত্তরে তাবারিয়া অভিমুখে অগ্রসর হন।
দক্ষিণ দিক থেকে ক্রুসেডার বাহিনীর অগ্রসর হওয়ার সংবাদ পেয়ে মওদুদ দ্রুত লড়াইয়ের জন্য একটি উপযুক্ত স্থান সন্ধান করেন। তিনি তাবারিয়া হ্রদের দক্ষিণে জর্ডান নদী ও ইয়ারমুক নদীর মাঝে অবস্থিত 'উকহুয়ানা' নামে পরিচিত উপদ্বীপ এলাকাকে আসন্ন যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত বিবেচনা করেন। এখানেই থেমে না থেকে এরপর তিনি তাবারিয়া হ্রদের দক্ষিণ-পশ্চিমে জর্ডান নদীর ওপর অবস্থিত সিন্নাবরা সেতুর কাছে বল্ডউইনের জন্য এক কঠিন ফাঁদ পাতেন।
আল্লাহর পাকের অনুগ্রহে ৫০৭ হিজরি সনের ১৩ মুহাররম (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের ২০ জুন) বল্ডউইন সিন্নাবরা সেতুর কাছে মওদুদের পাতা ফাঁদে পা দেন। এমনকি তিনি পৃষ্ঠদেশের নিরাপত্তার জন্য তার বাহিনীর কোনো অংশকে পেছনে মোতায়েন না করে চরম অসাবধানতার পরিচয় দেন। বল্ডউইন যেন তার দীর্ঘ জীবনে অর্জিত সকল রণকৌশল ও সামরিক নিয়মনীতিই ভুলে গিয়েছিলেন! তার এই আচরণের একটাই ব্যাখ্যা করা যেতে পারে—আল্লাহ তার দৃষ্টি অন্ধ করে দিয়েছিলেন!
সিন্নাবরা সেতুর কাছে প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইতিহাসে এ যুদ্ধ 'সিন্নাবরার যুদ্ধ' নামে খ্যাত। শুরুতেই প্রতিপক্ষকে হতচকিত করে দিয়ে হঠাৎ আক্রমণ যুদ্ধের গতিপথ মুসলমানদের পক্ষে নিয়ে আসতে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখে।
মালাতিয়া মারদিন আহলাত সুমাইসাত এডেসা মসুল হিরাক্লিয়া আদানা মপসুয়েসটিয়া মারআশ সিনজার আলবেরা ইসকানদারুন এন্টিয়ক মাআ'ররাতুন-নোমান তিল-বাশির লাতাকিয়া হাররান আলেপ্পো ইরবিল জাবালা বানিয়াস হামা ইরকা সালামিয়া ভূমধ্যসাগর ত্রিপোলি হিমস ব্যাবলস বালাবাকু তারতুস দামেশক সিডন বৈরুত সুর আড়া হাইফা কায়সারিয়া তাবারিয়া আম্মান আল-কুদস আরসুফ জাফা আসকালান গাজা রামলা কারাক শামের মরুঅঞ্চল ইরাক
মানচিত্র নং-২৪ সিন্নাবরার যুদ্ধ
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কিছু সময় অতিবাহিত না হতেই ক্রুসেডার বাহিনী পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে যায়। দুই হাজারের অধিক ক্রুসেড যোদ্ধা নিহত হয়। সেনাপতি বল্ডউইন তার বাহিনীর অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশকে হারানোর পর অনেক কষ্টে প্রাণ নিয়ে পালাতে সক্ষম হন। এ যুদ্ধে মুসলমানরা বিপুল পরিমাণ অশ্ব, যুদ্ধাস্ত্র ও অন্যান্য যুদ্ধলব্ধ সম্পদ লাভ করে। পূর্বের বছর এডেসা অভিযানে পরাজিত হয়ে সেনাপতি মওদুদ যে শিক্ষা পেয়েছিলেন, এদিন তিনি তার বদলা তুলে নেন। এ তথ্যটিও উল্লেখযোগ্য যে, সিন্নাবরার যুদ্ধেই ইতিহাস প্রথমবারের মতো প্রত্যক্ষ করে মওদুদের বাহিনীর এক নতুন ইসলামি তারকার সামরিক নিপুণতা ও রণদক্ষতা। নতুন উদিত এই তারকার নাম ইমাদুদ্দিন জিনকি। ইসলামি ইতিহাসের এই অনন্যসাধারণ সেনাপতি সিন্নাবরার যুদ্ধে বীরত্বের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন। ঐতিহাসিক ইবনুল আছির এ সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন,
“তিনি এ যুদ্ধে রণদক্ষতার চূড়ান্ত স্তরে উপনীত হয়েছিলেন!”
টিকাঃ
৫৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৯।
৫৫. সিবতু ইবনিল জাওযি, মিরআতুয-যামান, (৫০৬-৫০৮ হিজরি সনের ঘটনাবলি)।
৫৬. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২১৮ ও Albert d' Aix, p.693.
৫৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/ ১৪৯।
৫৮. প্রাগুক্ত, ৯/১৪৯।
৫৯. Grousset: Hist. des. Croisades 1, p. 490.
৬০. Matthieu d' Edesse, pp. 104-106.
৬১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৯।
৬২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৯ ও Albert d' Aix, p. 694.
৬৩. সিবতু ইবনিল জাওযি, মিরআতুয-যামান, পৃষ্ঠা: ৫৪৬-৫৪9।
৬৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৯।
৬৫. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৮৫।
**. Guillaume de Tyr, p. 486 Foucher de Chartres, p. 426.
৬৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৫৩।
📄 সিন্নাবরার যুদ্ধের প্রভাবসমূহ
সিন্নাবরার যুদ্ধের পরপরই মুসলিম বাহিনী জানতে পারে যে, রজার ও পন্সের বাহিনী বেশ কাছে চলে এসেছে। ওদিকে আল-কুদস ও উপকূলীয় বিভিন্ন নগরী থেকেও সহায়ক ক্রুসেডার বাহিনী চলে আসার আশঙ্কা ছিল। তাই তাবারিয়ায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার পূর্বেই মওদুদ তার বাহিনী নিয়ে দ্রুত সটকে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সিন্নাবরার যুদ্ধের প্রভাবসমূহ ক্রুসেডারদের ফাঁদে আটকে পড়া থেকে আত্মরক্ষা করতে মওদুদ তৎক্ষণাৎ সংঘাতময় অঞ্চল থেকে বেরিয়ে পড়েন। এর পরপরই ক্রুসেডাররা আবারও সৈন্যসমাবেশ ঘটাতে থাকে। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর শক্তি ও উন্নত আত্মবিশ্বাস প্রত্যক্ষ করে আপাতত তারা চূড়ান্ত কোনো লড়াইয়ে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে তাবারিয়া হ্রদের পশ্চিমে একটি মালভূমিতে অবস্থান গ্রহণ করে। তখন মুসলিম বাহিনী অগ্রসর হয়ে তাদের অবরুদ্ধ করে রাখে। কিন্তু ক্রুসেডাররা নিজেদের অবস্থান থেকে নামতে অস্বীকৃতি জানিয়ে দূর থেকে তির, বর্শা নিক্ষেপ করতে থাকে। এ সময় মুসলিম বাহিনী ক্রুসেডারদের অবরোধ করে রাখা ছাড়াও ক্রুসেডারদের অধিকৃত আক্কা ও কুদসের মধ্যবর্তী অঞ্চলের বিভিন্ন দুর্গ ধ্বংস করার জন্য অভিযান চালাতে থাকে। পাশাপাশি তারা ক্রুসেডারদের অনেক সম্পদও অর্জন করতে সক্ষম হয়।
একই সময় আসকালান থেকে একটি উবায়দি বাহিনী বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে অগ্রসর হয়। ক্ষুদ্র বাহিনীটির বাইতুল মুকাদ্দাসের বিশাল ক্রুসেডার বাহিনীর মোকাবিলা করার সামর্থ্য ছিল না। তাদের পরিকল্পনা ছিল এ অঞ্চলে কিছু ঝটিকা হামলা চালানো। কিন্তু উবায়দি বাহিনীটি সেলজুক বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলতে পারে এই আশঙ্কায় ১ম বল্ডউইন সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, সুন্নি মুসলমানদের সঙ্গে ঐক্য ও সহযোগিতা বিনিময়ের কোনো ইচ্ছাই উবায়দিদের ছিল না। তাই তারা মওদুদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করার পরিবর্তে ঝটিকা অভিযানে প্রাপ্ত কিছু যুদ্ধলব্ধ সম্পদ নিয়েই আসকালানে ফিরে যায়।
মুসলিম বাহিনী একটানা ছাব্বিশ দিন ক্রুসেডারদের ঘিরে রাখে। এ সময়ের মধ্যে একবারের জন্য হলেও তারা সরাসরি মোকাবিলা করার সাহস দেখাতে ব্যর্থ হয়। এরই মধ্যে ১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে ষোলো হাজার সশস্ত্র ক্রুসেডার তীর্থযাত্রী বহনকারী একটি ইউরোপীয় নৌবহর এ অঞ্চলের নিকটবর্তী আক্কা নৌবন্দরে এসে পৌঁছায়। নিঃসন্দেহে এই বিরাট সংখ্যক জনবলের আগমনে পরিস্থিতি এবার ক্রুসেডারদের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
ক্রুসেডারদের বিরাট সৈন্যসমাবেশে বিপদ আঁচ করতে পেরে মওদুদ রহ. এবার প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা করেন। অতি সামান্য সংখ্যক সৈন্যকে হারিয়ে তিনি ইতিমধ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিজয় অর্জন করেছেন। মুসলিম বাহিনীর নিরাপত্তা রক্ষার লক্ষ্যে আপাতত তিনি অর্জিত বিজয়েই তুষ্ট থাকেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী দেরি না করে মুসলিম বাহিনী উত্তর দিকে দামেশক অভিমুখে রওনা করে। সিন্নাবরার যুদ্ধে বিরাট ক্ষতির শিকার হওয়ায় মানসিক পরাভবতা ও প্রচণ্ড ভীতিতে আচ্ছন্ন ক্রুসেডাররা এ সময় মুসলিম বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবনের চিন্তাই করেনি। তা ছাড়া এ সময় তারা আল-কুদসে উবায়দিদের বড় ধরনের অভিযানের আশঙ্কা করছিল। ফলে তারাও বর্তমান অবস্থান মেনে নিয়ে মুসলিম বাহিনীকে নিশ্চিন্তে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ দেয়।
প্রত্যাবর্তনকারী মুসলিম বাহিনী ৫০৭ হিজরি সনের রবিউস সানি মাসে (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে) দামেশকে প্রবেশ করে।
এ পর্যায়ে আমরা ইতিহাসের ধারাবর্ণনায় সামান্য বিরতি দিয়ে সিন্নারার যুদ্ধ ক্রুসেড ইতিহাসে যেসব গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব সৃষ্টি করেছিল, অল্পকথায় তা আলোচনার প্রয়াস পাব।
১. বিশেষত পূর্বের অভিযানগুলোর নেতিবাচক ফলাফলের পর এ যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলিম সেনাদল বরং ব্যাপকভাবে সকল মুসলমানের আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। এ দিক থেকে যুদ্ধটিকে মুসলমানদের আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারকারী যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এ যুদ্ধে মুসলমানদের মনোবল ও মানসিক শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়, বিপরীতে ক্রুসেডারদের ভেতর ভর করে পরাজয়ের শঙ্কা। আর তাই আমরা দেখেছি, বিপুল সেনাসমাবেশের পরও তারা মুসলিম বাহিনীর মোকাবিলা করতে সাহস করেনি।
২. এ যুদ্ধে ক্রুসেডাররা দুই হাজারের অধিক সৈন্য হারায়। তাদের প্রচুর সম্পদ, অস্ত্র হাতছাড়া হয়ে যায়। তাবারিয়া অঞ্চলসহ দক্ষিণ দিকে প্রায় আল-কুদস নগরী পর্যন্ত তাদের অধিকৃত বিভিন্ন দুর্গ ধ্বংস করা হয়।
৩. এ যুদ্ধের মাধ্যমেই মুসলমানদের ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই- নীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। আত্মরক্ষামূলক নীতির পরিবর্তে প্রতিপক্ষের ওপর স্বপ্রণোদিত আক্রমণ-নীতির সূচনা হয়। নিঃসন্দেহে এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ রণকৌশল নীতি। এর জন্য প্রয়োজন সুউচ্চ যুদ্ধ-চেতনা ও অগাধ আত্মবিশ্বাস, যা সিন্নারার যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল।
৪. মুসলিম বাহিনীতে ঐক্যের গুরুত্ব সুস্পষ্ট হয়। মূলত দামেশক ও মসুলের ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণে সিন্নারার যুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয়েছিল। তা ছাড়া অনেকটা প্রতীকী হলেও সিনজারের আমির কুমাইরুক ও মারদিনের শাসক ইয়াজ বিন ইলগাজিও এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীতে শরিক ছিলেন।
৫. সম্ভবত এটিও সিন্নারার যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন যে, এ যুদ্ধের মাধ্যমেই হাজিব আক সুনকুরের পুত্র মহান মুসলিম বীর ইমাদুদ্দিন জিনকি পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন। এ যুদ্ধে তিনি অভিনব রণদক্ষতা ও বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের মাধ্যমে সকলের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হন। চতুর্দিকে তার কীর্তিগাথা ছড়িয়ে পড়ে। এ বিষয়টি পরবর্তী সময় ক্রুসেডবিরোধী লড়াইয়ে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলেছিল। নিশ্চিতভাবেই আমাদের আগামী আলোচনায় এই অনন্য সাহসী যোদ্ধা ব্যাপকভাবেই জায়গা করে নেবেন। সামনে যথাস্থানে আমরা সবিস্তারে তার জীবনকথা আলোচনার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
৬৮. প্রাগুক্ত, ৯/১৪৯।
৬৯. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৮৫।
*. Foucher de Chartres, p. 426-427.
**. Grousset: Hist. des. Croisades 1, p. 274.
*২. Albert d' Aix, p. 696 & Guillaume de Tyr, p. 437.
৭০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৫০।
সিন্নাবরার যুদ্ধের পরপরই মুসলিম বাহিনী জানতে পারে যে, রজার ও পন্সের বাহিনী বেশ কাছে চলে এসেছে। ওদিকে আল-কুদস ও উপকূলীয় বিভিন্ন নগরী থেকেও সহায়ক ক্রুসেডার বাহিনী চলে আসার আশঙ্কা ছিল। তাই তাবারিয়ায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার পূর্বেই মওদুদ তার বাহিনী নিয়ে দ্রুত সটকে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সিন্নাবরার যুদ্ধের প্রভাবসমূহ ক্রুসেডারদের ফাঁদে আটকে পড়া থেকে আত্মরক্ষা করতে মওদুদ তৎক্ষণাৎ সংঘাতময় অঞ্চল থেকে বেরিয়ে পড়েন। এর পরপরই ক্রুসেডাররা আবারও সৈন্যসমাবেশ ঘটাতে থাকে। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর শক্তি ও উন্নত আত্মবিশ্বাস প্রত্যক্ষ করে আপাতত তারা চূড়ান্ত কোনো লড়াইয়ে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে তাবারিয়া হ্রদের পশ্চিমে একটি মালভূমিতে অবস্থান গ্রহণ করে। তখন মুসলিম বাহিনী অগ্রসর হয়ে তাদের অবরুদ্ধ করে রাখে। কিন্তু ক্রুসেডাররা নিজেদের অবস্থান থেকে নামতে অস্বীকৃতি জানিয়ে দূর থেকে তির, বর্শা নিক্ষেপ করতে থাকে। এ সময় মুসলিম বাহিনী ক্রুসেডারদের অবরোধ করে রাখা ছাড়াও ক্রুসেডারদের অধিকৃত আক্কা ও কুদসের মধ্যবর্তী অঞ্চলের বিভিন্ন দুর্গ ধ্বংস করার জন্য অভিযান চালাতে থাকে। পাশাপাশি তারা ক্রুসেডারদের অনেক সম্পদও অর্জন করতে সক্ষম হয়।
একই সময় আসকালান থেকে একটি উবায়দি বাহিনী বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে অগ্রসর হয়। ক্ষুদ্র বাহিনীটির বাইতুল মুকাদ্দাসের বিশাল ক্রুসেডার বাহিনীর মোকাবিলা করার সামর্থ্য ছিল না। তাদের পরিকল্পনা ছিল এ অঞ্চলে কিছু ঝটিকা হামলা চালানো। কিন্তু উবায়দি বাহিনীটি সেলজুক বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলতে পারে এই আশঙ্কায় ১ম বল্ডউইন সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, সুন্নি মুসলমানদের সঙ্গে ঐক্য ও সহযোগিতা বিনিময়ের কোনো ইচ্ছাই উবায়দিদের ছিল না। তাই তারা মওদুদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করার পরিবর্তে ঝটিকা অভিযানে প্রাপ্ত কিছু যুদ্ধলব্ধ সম্পদ নিয়েই আসকালানে ফিরে যায়।
মুসলিম বাহিনী একটানা ছাব্বিশ দিন ক্রুসেডারদের ঘিরে রাখে। এ সময়ের মধ্যে একবারের জন্য হলেও তারা সরাসরি মোকাবিলা করার সাহস দেখাতে ব্যর্থ হয়। এরই মধ্যে ১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে ষোলো হাজার সশস্ত্র ক্রুসেডার তীর্থযাত্রী বহনকারী একটি ইউরোপীয় নৌবহর এ অঞ্চলের নিকটবর্তী আক্কা নৌবন্দরে এসে পৌঁছায়। নিঃসন্দেহে এই বিরাট সংখ্যক জনবলের আগমনে পরিস্থিতি এবার ক্রুসেডারদের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
ক্রুসেডারদের বিরাট সৈন্যসমাবেশে বিপদ আঁচ করতে পেরে মওদুদ রহ. এবার প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা করেন। অতি সামান্য সংখ্যক সৈন্যকে হারিয়ে তিনি ইতিমধ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিজয় অর্জন করেছেন। মুসলিম বাহিনীর নিরাপত্তা রক্ষার লক্ষ্যে আপাতত তিনি অর্জিত বিজয়েই তুষ্ট থাকেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী দেরি না করে মুসলিম বাহিনী উত্তর দিকে দামেশক অভিমুখে রওনা করে। সিন্নাবরার যুদ্ধে বিরাট ক্ষতির শিকার হওয়ায় মানসিক পরাভবতা ও প্রচণ্ড ভীতিতে আচ্ছন্ন ক্রুসেডাররা এ সময় মুসলিম বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবনের চিন্তাই করেনি। তা ছাড়া এ সময় তারা আল-কুদসে উবায়দিদের বড় ধরনের অভিযানের আশঙ্কা করছিল। ফলে তারাও বর্তমান অবস্থান মেনে নিয়ে মুসলিম বাহিনীকে নিশ্চিন্তে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ দেয়।
প্রত্যাবর্তনকারী মুসলিম বাহিনী ৫০৭ হিজরি সনের রবিউস সানি মাসে (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে) দামেশকে প্রবেশ করে।
এ পর্যায়ে আমরা ইতিহাসের ধারাবর্ণনায় সামান্য বিরতি দিয়ে সিন্নারার যুদ্ধ ক্রুসেড ইতিহাসে যেসব গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব সৃষ্টি করেছিল, অল্পকথায় তা আলোচনার প্রয়াস পাব।
১. বিশেষত পূর্বের অভিযানগুলোর নেতিবাচক ফলাফলের পর এ যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলিম সেনাদল বরং ব্যাপকভাবে সকল মুসলমানের আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। এ দিক থেকে যুদ্ধটিকে মুসলমানদের আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারকারী যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এ যুদ্ধে মুসলমানদের মনোবল ও মানসিক শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়, বিপরীতে ক্রুসেডারদের ভেতর ভর করে পরাজয়ের শঙ্কা। আর তাই আমরা দেখেছি, বিপুল সেনাসমাবেশের পরও তারা মুসলিম বাহিনীর মোকাবিলা করতে সাহস করেনি।
২. এ যুদ্ধে ক্রুসেডাররা দুই হাজারের অধিক সৈন্য হারায়। তাদের প্রচুর সম্পদ, অস্ত্র হাতছাড়া হয়ে যায়। তাবারিয়া অঞ্চলসহ দক্ষিণ দিকে প্রায় আল-কুদস নগরী পর্যন্ত তাদের অধিকৃত বিভিন্ন দুর্গ ধ্বংস করা হয়।
৩. এ যুদ্ধের মাধ্যমেই মুসলমানদের ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই- নীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। আত্মরক্ষামূলক নীতির পরিবর্তে প্রতিপক্ষের ওপর স্বপ্রণোদিত আক্রমণ-নীতির সূচনা হয়। নিঃসন্দেহে এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ রণকৌশল নীতি। এর জন্য প্রয়োজন সুউচ্চ যুদ্ধ-চেতনা ও অগাধ আত্মবিশ্বাস, যা সিন্নারার যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল।
৪. মুসলিম বাহিনীতে ঐক্যের গুরুত্ব সুস্পষ্ট হয়। মূলত দামেশক ও মসুলের ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণে সিন্নারার যুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয়েছিল। তা ছাড়া অনেকটা প্রতীকী হলেও সিনজারের আমির কুমাইরুক ও মারদিনের শাসক ইয়াজ বিন ইলগাজিও এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীতে শরিক ছিলেন।
৫. সম্ভবত এটিও সিন্নারার যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন যে, এ যুদ্ধের মাধ্যমেই হাজিব আক সুনকুরের পুত্র মহান মুসলিম বীর ইমাদুদ্দিন জিনকি পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন। এ যুদ্ধে তিনি অভিনব রণদক্ষতা ও বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের মাধ্যমে সকলের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হন। চতুর্দিকে তার কীর্তিগাথা ছড়িয়ে পড়ে। এ বিষয়টি পরবর্তী সময় ক্রুসেডবিরোধী লড়াইয়ে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলেছিল। নিশ্চিতভাবেই আমাদের আগামী আলোচনায় এই অনন্য সাহসী যোদ্ধা ব্যাপকভাবেই জায়গা করে নেবেন। সামনে যথাস্থানে আমরা সবিস্তারে তার জীবনকথা আলোচনার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
৬৮. প্রাগুক্ত, ৯/১৪৯।
৬৯. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৮৫।
*. Foucher de Chartres, p. 426-427.
**. Grousset: Hist. des. Croisades 1, p. 274.
*২. Albert d' Aix, p. 696 & Guillaume de Tyr, p. 437.
৭০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৫০।
📄 মওদুদ-হত্যা
মওদুদ বিন তুনতেকিন ৫০৭ হিজরি সনে (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে) দামেশকে প্রবেশ করেন। তিনি পুরো শীতকাল দামেশকে কাটিয়ে নতুন করে সৈন্যসমাবেশ এবং ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের মনস্থ করেন।
এই ছিল তার মনোবাসনা। কিন্তু উম্মাহর শত্রুরা ভাবছিল ভিন্ন কিছু। তারা গোপনে গাদ্দারি ও বিশ্বাসঘাতকতার এমন জঘন্য চিত্র অঙ্কন করছিল, ইতিহাসের পাতায় যার দৃষ্টান্ত বিরল!
হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় এই ভেবে যে, উম্মাহর এই শত্রুরা খ্রিষ্টান ক্রুসেডার ছিল না; ছিল মুসলিম সন্তান কিংবা অন্তত ইসলামি পরিচয়ের দাবিদার!
মওদুদ রহ. ৫০৭ হিজরি সনের রবিউস সানি মাসের শেষ শুক্রবার (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে) জুমার নামাজ আদায়ের জন্য দামেশকের কেন্দ্রীয় মসজিদে প্রবেশ করেন। নামাজ শেষে তিনি যখন তুগতেকিনের হাত ধরে মসজিদের চত্বরে পায়চারি করছিলেন, তখন হঠাৎ করে শিয়া বাতিনি গোষ্ঠীর জনৈক আততায়ী তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাকে খঞ্জর দ্বারা আঘাত করে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সমাপ্ত হয় জিহাদ, আত্মত্যাগ ও কর্ম-অবদানে সমৃদ্ধ এক মহীরুহের জীবন সফর। আমাদের ধারণা, তিনি শহিদানের কাতারে গণ্য হবেন। আল্লাহর সিদ্ধান্তের বাইরে আমরা তার পবিত্রতার ঘোষণা দিই না! আল্লাহই তার উত্তম বিধায়ক হোন!
তুগতেকিন দ্রুত ঘাতকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন। এমনকি তিনি বিক্ষুব্ধ হয়ে তার লাশ আগুনে জ্বালিয়ে দেন। এভাবেই তিনি মহান সেলজুক উজির নিজামুল মুলকের হত্যাকাণ্ডের পর শিয়া বাতিনি চক্রের কৃত সবচেয়ে ঘৃণ্য অপকর্মটির ওপর পর্দা টেনে দেন।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই জঘন্য অপরাধের পেছনে কে বা কারা কলকাঠি নেড়েছিল? মুসলিম বিশ্ব যে মহান মুসলিম নেতাকে কেন্দ্র করে ক্রুসেডারদের ঘৃণ্য দখলদারিত্ব থেকে অধিকৃত ইসলামি ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখছিল, তাকে হত্যা করে কারা নিজেদের আখের গোছাতে চেয়েছিল?
আলেপ্পোর শাসক রিজওয়ান প্রচার করেন যে, দামেশকের আমির তুগতেকিনই ছিলেন এ হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী। ইবনুল আছির ও ইবনুল কালানিসির মতো নেতৃস্থানীয় ঐতিহাসিকগণও এ প্রচারণার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের ইতিহাসগ্রন্থে তা উল্লেখ করেছেন। অবশ্য তারা এ মতটি সংশয়পূর্ণ ভাষায় উল্লেখ করেছেন। তাদের ভাষ্য হলো— ‘কথিত আছে, শাম অঞ্চলের বাতিনি শিয়ারা তাকে নিজেদের জন্য হুমকি বিবেচনা করে হত্যা করে। আরেকটি মত হলো স্বয়ং তুগতেকিনই তার প্রতি সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ায় তাকে হত্যা করতে ঘাতক নিযুক্ত করেন। '
পরবর্তী সময়ে সমকালীন মুসলিম-খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকগণ নির্বিশেষে এই অপবাদটি লুফে নিয়ে একে প্রমাণ করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। তুগতেকিনই যে মওদুদ-হত্যার মূল কুশীলব, তাদের এই বিশ্বাসের অন্যতম উৎস হলো তুগতেকিন কর্তৃক দ্রুত ঘাতকের বিচার কার্যকর এবং তাকে হত্যা করে তার লাশ জ্বালিয়ে ফেলা। তারা বলেন, এটি এক ধরনের অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলা এবং গোপন অপরাধ থেকে দায়মুক্তির চেষ্টা।
কিন্তু আমার বিশ্বাস, এ ঘটনার পেছনে তুগতেকিনের হাত ছিল না। যারা তুগতেকিনকে অভিযুক্ত করে থাকে, তাদের দাবি হলো—তুগতেকিন মওদুদ ও তার বাহিনীর শক্তিমত্তা উপলব্ধি করতে পেরে শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি আশঙ্কা করছিলেন যে, ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পেছনে মওদুদের মূল লক্ষ্য হলো শাম ও দামেশক দখল করা। তাই তিনি নিজের রাজ্য হাতছাড়া হওয়ার আগেই পথ পরিষ্কার করার পরিকল্পনা করেছিলেন। আমার দৃষ্টিতে তাদের এ দাবি বিভিন্ন কারণে গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন:
১. মওদুদের আচরণে কখনোই তুগতেকিন বা অন্য কোনো মুসলিম রাজন্যের প্রতি প্রতারণা বা বিশ্বাসঘাতকতার মনোভাব প্রকাশ পায়নি। বরং তাদের প্রত্যেকের প্রতি এমনকি যুদ্ধের ময়দানে যারা তার সঙ্গে সুস্পষ্ট প্রতারণা করেছে, তাদের প্রতিও তিনি ছিলেন চূড়ান্ত সদয় ও সহনশীল। তিনি কখনোই কোনো মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধে জড়ানোর চিন্তাও করেননি। ঝানু ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ তুগতেকিনও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ তিন বছরের যুদ্ধের পুরোটা সময় মওদুদের এসব গুণের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন।
২. সিন্নাবরার যুদ্ধ শেষে মওদুদ তার বাহিনী মসুলে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি নিজে দামেশকে প্রবেশ করেছিলেন তার অল্প কয়েকজন বিশেষ অনুচরকে সঙ্গে নিয়ে। প্রতারণা করার ইচ্ছা থাকলে তিনি তো পুরো বাহিনী সঙ্গে নিয়েই দামেশকে প্রবেশ করতেন। নিঃসন্দেহে এ বিষয়টিও তুগতেকিনকে আশ্বস্ত করেছিল।
৩. স্বয়ং ইবনুল আছির সিন্নাবরার যুদ্ধ-পূর্ববর্তী আলোচনায় প্রমাণ করেছেন যে, এ সময় মওদুদ ও তুগতেকিনের মাঝে হৃদ্যতা ও নিষ্ঠাপূর্ণ সৌহার্দ্য-সম্পর্ক ছিল।
৪. এটা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয় যে, তুগতেকিন মওদুদকে হত্যা করে নিজের পথ পরিষ্কার করবেন। তিনি জানতেন, ক্রুসেডাররা তার ওপর হামলে পড়লে একমাত্র মওদুদের কাছেই তিনি আশ্রয় নিয়ে আত্মরক্ষা করতে পারবেন। নিঃসন্দেহে তুগতেকিন সিন্নাবরার যুদ্ধের পর দামেশকে ক্রুসেডারদের প্রতিশোধ অভিযানের আশঙ্কা করছিলেন। তাই সুনির্দিষ্ট এই সময়েই তিনি এমন কিছু করবেন, যা ক্রুসেডারদের দ্রুত প্রতিশোধ নিতে প্ররোচিত করবে, এমনটি ভাবা মোটেও যৌক্তিক নয়।
৫. তুগতেকিনকে আমরা একাধিকবার ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জিহাদের ময়দানে অবতীর্ণ হতে দেখেছি, বিভিন্ন বিষয়ে তাকে ঈমানি দাবির পক্ষে অবস্থান নিতেও দেখেছি। তার এসব আচরণে অনুমিত হয় যে, আর যাই হোক, মুসলমানদের আশার প্রদীপ নিভিয়ে দিয়ে মওদুদের ন্যায় একজন সৎ-নিষ্ঠাবান নেতাকে হত্যা করার মতো বিশ্বাসঘাতক তিনি নন। এর অর্থ এই নয় যে, তার কোনো অন্যায় হতে পারে না। অতীতে তার বিভিন্ন ভুল হয়েছে, ভবিষ্যৎ ঘটনাপ্রবাহেও হয়তো হবে; বড় কোনো অন্যায় করাও তার মতো ব্যক্তির পক্ষে অসম্ভব নয়। কিন্তু মওদুদ-হত্যার ন্যায় জঘন্য অপরাধে অভিযুক্ত করার জন্য চাই শক্ত প্রমাণ; অন্তত অভিযোগ যদি আনা হয় তুগতেকিনের মতো কারও প্রতি।
৬. ঘাতককে দ্রুত মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করলেই এ কথা প্রমাণিত হয় না যে, তিনিই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা ছিলেন। বরং এমনও হতে পারে যে, তিনি এমনটি করেছিলেন যেন তার প্রতি ঘাতকের ব্যাপারে গড়িমসি ও তার দুষ্কর্ম মৌন সম্মতির অভিযোগ আরোপিত না হয়। এ জাতীয় ঘটনায় আমরা দেখে থাকি, প্রথমে হত্যাকারীকে আটক করা হয়, এরপর গোপনে অর্থের বিনিময়ে সমঝোতা করে তাকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। এ কথাও মানার মতো নয় যে, তুগতেকিন ঘাতকের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন এবং তাকে দিয়ে কাজ সারার পর প্রমাণ মুছতে তাকে সরিয়ে দিয়েছেন। কারণ, ঘাতক ছিল শিয়া বাতিনি গোষ্ঠীর সদস্য। আর পূর্বেও আমরা জেনেছি যে, তুগতেকিন বাতিনিদের ভয় করতেন। তাই নিজেকে বাতিনিদের চক্ষুশূলে পরিণত করে তিনি তাদের সঙ্গে প্রতারণা করবেন, এটি যৌক্তিক নয়।
৭. তুগতেকিনই মূল হত্যাকারী, এ দাবির স্বপক্ষে যখন শক্ত কোনো প্রমাণ নেই, তাহলে এটাই কি সমীচীন নয় যে, মওদুদ হত্যাকাণ্ডে কারা বেশি উপকৃত হচ্ছে, আমরা তা খুঁজে বের করব, তারপর পুরো দায় তুগতেকিনের ঘাড়ে না চাপিয়ে আনুপাতিক হারে সন্দেহভাজন সকলের মধ্যে দায়ভার বণ্টন করে দেবো?!
টিকাঃ
৭৪. Setton: op.cit., 1 p. 402.
৭৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৫০।
৭৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৫০ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৮৭।
৭৭. প্রাগুক্ত।
৭৮. Albert d' Aix, pp. 700 & Guillaume de Tyr, p. 487.
*. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪।
মওদুদ বিন তুনতেকিন ৫০৭ হিজরি সনে (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে) দামেশকে প্রবেশ করেন। তিনি পুরো শীতকাল দামেশকে কাটিয়ে নতুন করে সৈন্যসমাবেশ এবং ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের মনস্থ করেন।
এই ছিল তার মনোবাসনা। কিন্তু উম্মাহর শত্রুরা ভাবছিল ভিন্ন কিছু। তারা গোপনে গাদ্দারি ও বিশ্বাসঘাতকতার এমন জঘন্য চিত্র অঙ্কন করছিল, ইতিহাসের পাতায় যার দৃষ্টান্ত বিরল!
হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় এই ভেবে যে, উম্মাহর এই শত্রুরা খ্রিষ্টান ক্রুসেডার ছিল না; ছিল মুসলিম সন্তান কিংবা অন্তত ইসলামি পরিচয়ের দাবিদার!
মওদুদ রহ. ৫০৭ হিজরি সনের রবিউস সানি মাসের শেষ শুক্রবার (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে) জুমার নামাজ আদায়ের জন্য দামেশকের কেন্দ্রীয় মসজিদে প্রবেশ করেন। নামাজ শেষে তিনি যখন তুগতেকিনের হাত ধরে মসজিদের চত্বরে পায়চারি করছিলেন, তখন হঠাৎ করে শিয়া বাতিনি গোষ্ঠীর জনৈক আততায়ী তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাকে খঞ্জর দ্বারা আঘাত করে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সমাপ্ত হয় জিহাদ, আত্মত্যাগ ও কর্ম-অবদানে সমৃদ্ধ এক মহীরুহের জীবন সফর। আমাদের ধারণা, তিনি শহিদানের কাতারে গণ্য হবেন। আল্লাহর সিদ্ধান্তের বাইরে আমরা তার পবিত্রতার ঘোষণা দিই না! আল্লাহই তার উত্তম বিধায়ক হোন!
তুগতেকিন দ্রুত ঘাতকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন। এমনকি তিনি বিক্ষুব্ধ হয়ে তার লাশ আগুনে জ্বালিয়ে দেন। এভাবেই তিনি মহান সেলজুক উজির নিজামুল মুলকের হত্যাকাণ্ডের পর শিয়া বাতিনি চক্রের কৃত সবচেয়ে ঘৃণ্য অপকর্মটির ওপর পর্দা টেনে দেন।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই জঘন্য অপরাধের পেছনে কে বা কারা কলকাঠি নেড়েছিল? মুসলিম বিশ্ব যে মহান মুসলিম নেতাকে কেন্দ্র করে ক্রুসেডারদের ঘৃণ্য দখলদারিত্ব থেকে অধিকৃত ইসলামি ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখছিল, তাকে হত্যা করে কারা নিজেদের আখের গোছাতে চেয়েছিল?
আলেপ্পোর শাসক রিজওয়ান প্রচার করেন যে, দামেশকের আমির তুগতেকিনই ছিলেন এ হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী। ইবনুল আছির ও ইবনুল কালানিসির মতো নেতৃস্থানীয় ঐতিহাসিকগণও এ প্রচারণার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের ইতিহাসগ্রন্থে তা উল্লেখ করেছেন। অবশ্য তারা এ মতটি সংশয়পূর্ণ ভাষায় উল্লেখ করেছেন। তাদের ভাষ্য হলো— ‘কথিত আছে, শাম অঞ্চলের বাতিনি শিয়ারা তাকে নিজেদের জন্য হুমকি বিবেচনা করে হত্যা করে। আরেকটি মত হলো স্বয়ং তুগতেকিনই তার প্রতি সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ায় তাকে হত্যা করতে ঘাতক নিযুক্ত করেন। '
পরবর্তী সময়ে সমকালীন মুসলিম-খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকগণ নির্বিশেষে এই অপবাদটি লুফে নিয়ে একে প্রমাণ করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। তুগতেকিনই যে মওদুদ-হত্যার মূল কুশীলব, তাদের এই বিশ্বাসের অন্যতম উৎস হলো তুগতেকিন কর্তৃক দ্রুত ঘাতকের বিচার কার্যকর এবং তাকে হত্যা করে তার লাশ জ্বালিয়ে ফেলা। তারা বলেন, এটি এক ধরনের অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলা এবং গোপন অপরাধ থেকে দায়মুক্তির চেষ্টা।
কিন্তু আমার বিশ্বাস, এ ঘটনার পেছনে তুগতেকিনের হাত ছিল না। যারা তুগতেকিনকে অভিযুক্ত করে থাকে, তাদের দাবি হলো—তুগতেকিন মওদুদ ও তার বাহিনীর শক্তিমত্তা উপলব্ধি করতে পেরে শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি আশঙ্কা করছিলেন যে, ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পেছনে মওদুদের মূল লক্ষ্য হলো শাম ও দামেশক দখল করা। তাই তিনি নিজের রাজ্য হাতছাড়া হওয়ার আগেই পথ পরিষ্কার করার পরিকল্পনা করেছিলেন। আমার দৃষ্টিতে তাদের এ দাবি বিভিন্ন কারণে গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন:
১. মওদুদের আচরণে কখনোই তুগতেকিন বা অন্য কোনো মুসলিম রাজন্যের প্রতি প্রতারণা বা বিশ্বাসঘাতকতার মনোভাব প্রকাশ পায়নি। বরং তাদের প্রত্যেকের প্রতি এমনকি যুদ্ধের ময়দানে যারা তার সঙ্গে সুস্পষ্ট প্রতারণা করেছে, তাদের প্রতিও তিনি ছিলেন চূড়ান্ত সদয় ও সহনশীল। তিনি কখনোই কোনো মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধে জড়ানোর চিন্তাও করেননি। ঝানু ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ তুগতেকিনও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ তিন বছরের যুদ্ধের পুরোটা সময় মওদুদের এসব গুণের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন।
২. সিন্নাবরার যুদ্ধ শেষে মওদুদ তার বাহিনী মসুলে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি নিজে দামেশকে প্রবেশ করেছিলেন তার অল্প কয়েকজন বিশেষ অনুচরকে সঙ্গে নিয়ে। প্রতারণা করার ইচ্ছা থাকলে তিনি তো পুরো বাহিনী সঙ্গে নিয়েই দামেশকে প্রবেশ করতেন। নিঃসন্দেহে এ বিষয়টিও তুগতেকিনকে আশ্বস্ত করেছিল।
৩. স্বয়ং ইবনুল আছির সিন্নাবরার যুদ্ধ-পূর্ববর্তী আলোচনায় প্রমাণ করেছেন যে, এ সময় মওদুদ ও তুগতেকিনের মাঝে হৃদ্যতা ও নিষ্ঠাপূর্ণ সৌহার্দ্য-সম্পর্ক ছিল।
৪. এটা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয় যে, তুগতেকিন মওদুদকে হত্যা করে নিজের পথ পরিষ্কার করবেন। তিনি জানতেন, ক্রুসেডাররা তার ওপর হামলে পড়লে একমাত্র মওদুদের কাছেই তিনি আশ্রয় নিয়ে আত্মরক্ষা করতে পারবেন। নিঃসন্দেহে তুগতেকিন সিন্নাবরার যুদ্ধের পর দামেশকে ক্রুসেডারদের প্রতিশোধ অভিযানের আশঙ্কা করছিলেন। তাই সুনির্দিষ্ট এই সময়েই তিনি এমন কিছু করবেন, যা ক্রুসেডারদের দ্রুত প্রতিশোধ নিতে প্ররোচিত করবে, এমনটি ভাবা মোটেও যৌক্তিক নয়।
৫. তুগতেকিনকে আমরা একাধিকবার ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জিহাদের ময়দানে অবতীর্ণ হতে দেখেছি, বিভিন্ন বিষয়ে তাকে ঈমানি দাবির পক্ষে অবস্থান নিতেও দেখেছি। তার এসব আচরণে অনুমিত হয় যে, আর যাই হোক, মুসলমানদের আশার প্রদীপ নিভিয়ে দিয়ে মওদুদের ন্যায় একজন সৎ-নিষ্ঠাবান নেতাকে হত্যা করার মতো বিশ্বাসঘাতক তিনি নন। এর অর্থ এই নয় যে, তার কোনো অন্যায় হতে পারে না। অতীতে তার বিভিন্ন ভুল হয়েছে, ভবিষ্যৎ ঘটনাপ্রবাহেও হয়তো হবে; বড় কোনো অন্যায় করাও তার মতো ব্যক্তির পক্ষে অসম্ভব নয়। কিন্তু মওদুদ-হত্যার ন্যায় জঘন্য অপরাধে অভিযুক্ত করার জন্য চাই শক্ত প্রমাণ; অন্তত অভিযোগ যদি আনা হয় তুগতেকিনের মতো কারও প্রতি।
৬. ঘাতককে দ্রুত মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করলেই এ কথা প্রমাণিত হয় না যে, তিনিই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা ছিলেন। বরং এমনও হতে পারে যে, তিনি এমনটি করেছিলেন যেন তার প্রতি ঘাতকের ব্যাপারে গড়িমসি ও তার দুষ্কর্ম মৌন সম্মতির অভিযোগ আরোপিত না হয়। এ জাতীয় ঘটনায় আমরা দেখে থাকি, প্রথমে হত্যাকারীকে আটক করা হয়, এরপর গোপনে অর্থের বিনিময়ে সমঝোতা করে তাকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। এ কথাও মানার মতো নয় যে, তুগতেকিন ঘাতকের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন এবং তাকে দিয়ে কাজ সারার পর প্রমাণ মুছতে তাকে সরিয়ে দিয়েছেন। কারণ, ঘাতক ছিল শিয়া বাতিনি গোষ্ঠীর সদস্য। আর পূর্বেও আমরা জেনেছি যে, তুগতেকিন বাতিনিদের ভয় করতেন। তাই নিজেকে বাতিনিদের চক্ষুশূলে পরিণত করে তিনি তাদের সঙ্গে প্রতারণা করবেন, এটি যৌক্তিক নয়।
৭. তুগতেকিনই মূল হত্যাকারী, এ দাবির স্বপক্ষে যখন শক্ত কোনো প্রমাণ নেই, তাহলে এটাই কি সমীচীন নয় যে, মওদুদ হত্যাকাণ্ডে কারা বেশি উপকৃত হচ্ছে, আমরা তা খুঁজে বের করব, তারপর পুরো দায় তুগতেকিনের ঘাড়ে না চাপিয়ে আনুপাতিক হারে সন্দেহভাজন সকলের মধ্যে দায়ভার বণ্টন করে দেবো?!
টিকাঃ
৭৪. Setton: op.cit., 1 p. 402.
৭৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৫০।
৭৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৫০ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৮৭।
৭৭. প্রাগুক্ত।
৭৮. Albert d' Aix, pp. 700 & Guillaume de Tyr, p. 487.
*. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪।
📄 হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা কে?!
বাস্তবতা হলো মওদুদ-হত্যায় স্বার্থভোগী পক্ষ ছিল অনেক। এক্ষেত্রে প্রথমেই আসবে আলেপ্পোর শাসক রিজওয়ানের নাম। রিজওয়ান হয়তো নিজেকে দায়মুক্ত প্রমাণ করতেই দ্রুত তুগতেকিনের প্রতি অভিযোগের আঙুল তুলেছিলেন। রিজওয়ান মওদুদকে প্রচণ্ড রকম অপছন্দ করতেন, ভয়ও করতেন প্রচণ্ড। তিনি ভুলে যাননি যে, মাত্র দু-বছর পূর্বেই ৫০৫ হিজরি সনে তিনি মওদুদ ও তার বাহিনীর মুখের ওপর আলেপ্পোর প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং তাদেরকে মারাত্মক বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন। বরং তখন তিনি মওদুদের বিরুদ্ধে এন্টিয়কের শাসক টেনক্রেডের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন! এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তখন আলেপ্পোর জনগণ মওদুদের জন্য নগরদ্বার উন্মুক্ত করে দিতে বিক্ষোভ করেছিল। আর তাই এ সম্ভাবনা মোটেও অমূলক ছিল না যে, জনগণ এখন বিশেষ করে সিন্নাবরায় মওদুদের মহান বিজয় প্রত্যক্ষ করার পর আলেপ্পোকে মওদুদের মসুল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তুলবে।
নিঃসন্দেহে সিন্নাবরার বিজয় আলেপ্পোবাসীসহ সমকালীন মুসলিম উম্মাহর কাছে মওদুদের জনপ্রিয়তা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল। তদুপরি আলেপ্পো ছিল মসুলের প্রতিবেশী-রাজ্য। অতীতেও অনেক সময় যিনি মসুল শাসন করেছেন, আলেপ্পোও তিনিই শাসন করেছেন। আর তাই মওদুদ আলেপ্পোতে তার রাজ্য সম্প্রসারণের চেষ্টা করলে তা একান্তই স্বাভাবিক হতো।
তা ছাড়া বাতিনি শিয়াদের সঙ্গে রিজওয়ানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কেবল সম্পর্কই নয়; তিনি আলেপ্পোর আপামর জনসাধারণের রুচি ও মতাদর্শের বিরুদ্ধে গিয়ে শিয়া মতাদর্শের মুখপাত্র ও সমর্থকে পরিণত হয়েছিলেন। এই সবকিছুই ইঙ্গিত বহন করে যে, মওদুদ হত্যাকাণ্ডে রিজওয়ানই সবচেয়ে বেশি লাভবান ছিলেন।
সঙ্গে এ তথ্যও যোগ করুন যে, রিজওয়ান তুগতেকিনকে প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন এবং তুগতেকিন তার রাজ্যে হানা দিতে পারেন, এমন আশঙ্কা করতেন। আমরা হয়তো এ তথ্যটিও ভুলে যাইনি যে, তিনি তার ভাই ও দামেশকের সাবেক শাসক দাক্কাকের প্রতিও প্রচণ্ড বিদ্বেষী ছিলেন। সাম্রাজ্য বিস্তারের লালসায় তিনি বহুবার দাক্কাকের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছিলেন। তা ছাড়া রিজওয়ানের পূর্বেও এ ধরনের গুপ্তহত্যার অভিজ্ঞতা ছিল। ইতিপূর্বে তিনি রাজ্য হারানোর আশঙ্কায় বাতিনি গুপ্তঘাতকের মাধ্যমে হিমসের আমির জানাহুদ্দৌলা হুসাইন বিন মালাইবকে হত্যা করিয়েছিলেন। অথচ জানাহুদ্দৌলা ব্যক্তিজীবনে ছিলেন রিজওয়ানের মায়ের স্বামী (সৎ বাবা)। কিন্তু এসব সম্পর্কের বিন্দুমাত্র মূল্য রিজওয়ানের কাছে ছিল না। আর তাই নেতৃত্ব ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য রিজওয়ানের কাছ থেকে কোনো অন্যায় আচরণই অপ্রত্যাশিত ছিল না। এসব যুক্তি পাশাপাশি রাখলে এ সম্ভাবনাই আমাদের কাছে প্রবল মনে হয় যে, আলেপ্পোর শাসক রিজওয়ানই ছিলেন এই ঘৃণ্য অপকর্মের মূল হোতা।
তবে রিজওয়ান একাই এ হত্যাকাণ্ডের মুনাফাভোগী ছিলেন না। কারও প্ররোচনা ছাড়াই খোদ বাতিনি শিয়াদেরও এতে বিরাট স্বার্থ ছিল। বাতিনিরা ছিল সমকালীন শাম অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য শক্তি; রিজওয়ান ও তুগতেকিনের মতো শামের প্রধান নেতারাও তাদেরকে সমীহ করত। সন্দেহ নেই, মওদুদের মতো একজন ভারসাম্যপূর্ণ সুন্নি মুজাহিদ নেতার উত্থান বাতিনিদের অন্যায়কর্মের পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছিল এবং তাদের অনাচার-অবিচারের জীবনে বাধা সৃষ্টি করছিল। আর অন্যায় গুপ্তহত্যায় এমনিতেও বাতিনিদের কুখ্যাতি ছিল। সুতরাং এ সম্ভাবনা মোটেও সুদূরপরাহত নয় যে, কারও প্ররোচনা ছাড়া বাতিনি গোষ্ঠী নিজেরাই স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
মওদুদ হত্যায় ক্রুসেডারদেরও স্বার্থ ছিল। মোটেও অসম্ভব নয় যে, তারা বাতিনি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মিত্রতা করেছিল এবং এই বরেণ্য মুজাহিদকে সরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে প্রচুর অর্থসম্পদ, যুদ্ধাস্ত্র বা বিভিন্ন দুর্গের কর্তৃত্ব প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছিল। মওদুদ তো তখন শাম অঞ্চলে সকল ক্রুসেডারের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলেন।
এমনও হতে পারে যে, রিজওয়ান, শিয়া বাতিনি সম্প্রদায় ও ক্রুসেডার শক্তি তিন পক্ষের বা যেকোনো দুই পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। আমার মতে দামেশকের আমির তুগতেকিনের পরিবর্তে অভিযোগের তির এদের দিকে তাক করাই অধিক যুক্তিযুক্ত।
কেউ প্রশ্ন করতে পারেন-মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও কীভাবে একজন বাতিনি ঘাতক এ কাজের দুঃসাহস করল? ভ্রান্ত চিন্তাধারা ও দোদুল্যমান ধর্মবিশ্বাসের অনুসারী হয়েও; এমনকি বিনাবাক্যে ইসলামের গণ্ডি বহির্ভূত হয়েও কোন নীতি-আদর্শে প্ররোচিত হয়ে সে এই আত্মঘাতী তৎপরতায় জড়াল?
আমরা বক্ষ্যমাণ গ্রন্থের শুরুর দিকেও উল্লেখ করেছি যে, শিয়া ইসমাইলি সম্প্রদায় মুসতালিয়া ও নিযারিয়া নামে দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছিল। ৪৮৭ হিজরি সনে (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) অষ্টম উবায়দি খলিফা মুসতানসির বিল্লাহ মারা যাওয়ার পর তার দুই পুত্র মুসতালি ও নিযার ক্ষমতা নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। তখন মিশরের তৎকালীন উজির বদর আল-জামালি বয়সে ছোট মুসতালিকে খলিফা পদে অধিষ্ঠিত করেন। এ সময় মিশরে অবস্থানকারী অন্যতম প্রভাবশালী ইসমাইলি ধর্মপ্রচারক হাসান বিন সাবাহ নিযারের পক্ষাবলম্বন করেন। মুসতালি ক্ষমতা গ্রহণের পর হাসান নিযারকে নিয়ে মিশর থেকে শামে চলে যান এবং সেখানে 'নিযারিয়া ইসমাইলিয়া' নামে শিয়াদের একটি চরম জঘন্য গোষ্ঠী গড়ে তোলেন। এই গোষ্ঠীটিই ইতিহাসে 'বাতিনি সম্প্রদায়' নামে পরিচিতি লাভ করে। কারণ, তাদের দাবি হলো কুরআনের প্রতিটি আয়াতের একটি বাহ্যিক ও একটি অন্তর্নিহিত মর্ম রয়েছে। সাধারণ মানুষ কেবল প্রথমটি জানে, আয়াতসমূহের বাতিনি ও অন্তর্নিহিত মর্ম একমাত্র তারাই জানে। এই দাবিকে উপজীব্য করে তারা কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা করতে থাকে এবং ভ্রান্ত বিভিন্ন আকিদা ও ব্যাখ্যা তৈরি করে ইসলামের গণ্ডি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যায়।
হাসান বিন সাবাহই এই ভ্রান্ত গোষ্ঠীর মূল নেতা ছিলেন। তিনি তার অনুসারীদের হাশিশ (এক ধরনের নেশা উদ্রেককারী উদ্ভিদের নির্যাস) পান করাতেন। ফলে তাদের বিবেক-বুদ্ধি লোপ পেত এবং তারা তাদের 'শায়খ' হাসান বিন সাবাহর অন্ধ আনুগত্য শুরু করত।
এরপর হাসান আরও ভয়ানক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি তার অনুসারীদের জন্য দুর্গম পাহাড়ের পাদদেশে একটি মনোরম উদ্যান গড়ে তোলেন এবং এর নামকরণ করেন 'জান্নাত'! তিনি সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করেন, সব জাতের ফল-ফলাদির ব্যবস্থা করেন এবং ছোট ছোট কৃত্রিম ঝরনা ও প্রস্রবণ তৈরি করেন। তিনি সেখানে তার অনুসারী সুদর্শনা তরুণীদের নিয়োজিত করেন।
হাসান তার যেকোনো অনুসারীকে প্রথমে হাশিশ পান করিয়ে পুরোপুরি অচেতন করে ফেলতেন, এরপর অচেতন অবস্থায় কথিত জান্নাতে নিয়ে আসতেন। অচেতন অনুসারী যখন কিছুটা চেতনা ফিরে পেয়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় থাকত, তখন তার সামনে হরেক পদের খাবার ও পানীয় পরিবেশন করা হতো। এরপর সে সুন্দরী যুবতীদের সঙ্গে অপকর্মে লিপ্ত হতো। তারপর তাকে পুনরায় হাশিশ পান করিয়ে অচেতন করে ফেলা হতো এবং 'জান্নাত' থেকে বের করে নিয়ে আসা হতো। চেতনা ফিরে এলে তাকে বলা হতো, আবারও জান্নাতে ফিরতে চাইলে 'শায়খুল জাবাল' (হাসান বিন সাবাহ)-এর নিঃশর্ত আনুগত্য করতে হবে। এভাবে কয়েকবার হাশিশ পান ও কৃত্রিম উদ্যানে আনা-নেওয়া করে তাকে হাশিশের নেশায় আসক্ত করে তোলা হতো এবং কৃত্রিম জান্নাত ও তার ভোগসামগ্রীর প্রতি পাগলপারা করে তোলা হতো। তারপর একদিন তাকে নির্দেশ দেওয়া হতো—যাও, আত্মঘাতী অভিযানে অংশ নিয়ে প্রাণ উৎসর্গ করে এসো। তাহলে তুমি চিরদিন জান্নাতে থাকতে পারবে!
অনুসারী হিসেবে তারা সাদাসিধা, চিন্তা-ধর্মে সরল, দরিদ্র-নিপীড়িত, গ্রাম্য-গোঁয়ার লোকদের বাছাই করত। এসব লোক নেতাদের হাতের পুতুলে পরিণত হতো এবং নেতারা যা আদেশ করত, নির্দ্বিধায় তা পালন করত।
বাতিনিরা গুপ্তহত্যাকে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করেছিল এবং চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের নিত্যনতুন কৌশল উদ্ভাবন করে ব্যাপকহারে গুপ্তহত্যার পথ বেছে নিয়েছিল। সশস্ত্র গোষ্ঠী হওয়ায় তাদের লাগাম টেনে ধরা ছিল অত্যন্ত কঠিন। এ কারণে তাদের নাম শুনলেই শাসক-প্রজা নির্বিশেষে সকলের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠত!
যেহেতু তারা হাশিশ পানে অভ্যস্ত ছিল, তাই ইতিহাসে তারা 'নিয়ারিয়া', 'বাতিনি' ইত্যাদি নামের পাশাপাশি 'হাশশাশিন' নামেও পরিচিত। ইতিহাসে এদের অন্যায়কর্মের ফিরিস্তি বেশ দীর্ঘ। তাদের অনেক হত্যাপ্রচেষ্টা যেমন সফল হয়, ব্যর্থও হয় অনেক অপচেষ্টা। কিন্তু সব সময় তারা ছিল ভীতি ও ত্রাসের প্রতীক এবং সত্যের পথিকদের চলার পথে বাধা সৃষ্টিকারী।
টিকাঃ
৮০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪।
৮১. আল-মাকরিজি, ইত্তিআ'জুল হুনাফা বি-আখবারিল আইম্মাতিল ফাতিমিয়ীনাল খুলাফা, ৩/১১।
৮২. উজির বদর আল-জামালি হাসান বিন সাবাহকে বন্দি করে মাগরিবে নির্বাসিত করেছিলেন। কিন্তু হাসানকে বহনকারী জাহাজ পথিমধ্যে ঝড়ের কবলে পড়ে বাতাসের টানে শামের উপকূলীয় এলাকায় চলে যায়। তখন হাসান বিন সাবাহ আক্কার উপকূলীয় এলাকায় অবতরণ করেন এবং সেখান থেকে নিজের এলাকা ইস্পাহানে ফিরে যান। এরপর তিনি সেখানে নিযারের পক্ষে প্রচারণা চালাতে থাকেন। ওদিকে নিযার তার ভাই মুসতালির কারাগারে বন্দি অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র হাদি বিন নিযার মিশর থেকে পালিয়ে পারস্যে হাসান বিন সাবাহর কাছে চলে আসেন এবং নিযারিয়া মতাদর্শের প্রসারে কাজ করতে থাকেন। (সম্পাদক)
৮০. আবু হামিদ আল-গাজালি, ফাযাইহুল বাতিনিয়্যা, পৃষ্ঠা: ১১ ও Grousset: Hist. des. Croisades 1,p. 530.
৮৪. Marco Polo: Travels, p. 50.
৮৫. Michaud: op. cit., II,pp. 72 -73.
b. Marco Polo: Travels, pp. 49-53
৮. Ivanow: An Islamic Ode in Praise of Fidawis, pp. 63-64.
৮৮. যেহেতু বাতিনিদের মূল লক্ষ্য ছিল সারা বিশ্বে নিজেদের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করা, তাই তারা মুসলিম বিশ্বকে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দিক থেকে নেতৃত্বশূন্য করার লক্ষ্যে গুপ্তহত্যা ও আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে সমকালীন ইসলামি বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামি শক্তি যথা আব্বাসি খিলাফত, সেলজুক, খোয়ারিজমি, জিনকি ও আইয়ুবি সালতানাতের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। তারা আব্বাসি খলিফা মুসতারশিদ, রাশিদ, বাগদাদের উজির নিজামুল মুলক ও সুলতান মুহাম্মাদ ঘুরিকে হত্যা করে এবং সেলজুক সুলতান মালিকশাহ, জিনকি সুলতান নুরুদ্দিন মাহমুদ ও আইয়ুবি সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবিকে হত্যা করার জন্য একাধিকবার চেষ্টা চালায়। (সম্পাদক)
৮. শিয়া ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়ের মূল শাখা তিনটি— কারামাতিয়া, মুসতালিয়া ও নিযারিয়া। কালের পরিক্রমায় বর্তমানে যেহেতু কারামাতিয়া ও মুসতালিয়াদের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে, তাই বর্তমানে ইসমাইলিয়া বলে নিযারিয়া বা বাতিনি গোষ্ঠীকেই বোঝানো হয়। বর্তমানে তারা 'আগাখানিয়া' নামে অধিক প্রসিদ্ধ। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল,=ইউরোপ ও ভারতে প্রচুর সংখ্যক আগাখানিয়া মতাদর্শী বসবাস করে। বর্তমানে তাদের প্রধান নেতা ফ্রান্সে বসবাসকারী ও ব্রিটিশ নাগরিকত্বের অধিকারী করিম হুসাইন শাহ (৪র্থ আগাখান), যিনি বিখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিনের ভাষ্য অনুসারে বিশ্বের শীর্ষ দশ ধনীর একজন। [সম্পাদক]
বাস্তবতা হলো মওদুদ-হত্যায় স্বার্থভোগী পক্ষ ছিল অনেক। এক্ষেত্রে প্রথমেই আসবে আলেপ্পোর শাসক রিজওয়ানের নাম। রিজওয়ান হয়তো নিজেকে দায়মুক্ত প্রমাণ করতেই দ্রুত তুগতেকিনের প্রতি অভিযোগের আঙুল তুলেছিলেন। রিজওয়ান মওদুদকে প্রচণ্ড রকম অপছন্দ করতেন, ভয়ও করতেন প্রচণ্ড। তিনি ভুলে যাননি যে, মাত্র দু-বছর পূর্বেই ৫০৫ হিজরি সনে তিনি মওদুদ ও তার বাহিনীর মুখের ওপর আলেপ্পোর প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং তাদেরকে মারাত্মক বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন। বরং তখন তিনি মওদুদের বিরুদ্ধে এন্টিয়কের শাসক টেনক্রেডের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন! এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তখন আলেপ্পোর জনগণ মওদুদের জন্য নগরদ্বার উন্মুক্ত করে দিতে বিক্ষোভ করেছিল। আর তাই এ সম্ভাবনা মোটেও অমূলক ছিল না যে, জনগণ এখন বিশেষ করে সিন্নাবরায় মওদুদের মহান বিজয় প্রত্যক্ষ করার পর আলেপ্পোকে মওদুদের মসুল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তুলবে।
নিঃসন্দেহে সিন্নাবরার বিজয় আলেপ্পোবাসীসহ সমকালীন মুসলিম উম্মাহর কাছে মওদুদের জনপ্রিয়তা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল। তদুপরি আলেপ্পো ছিল মসুলের প্রতিবেশী-রাজ্য। অতীতেও অনেক সময় যিনি মসুল শাসন করেছেন, আলেপ্পোও তিনিই শাসন করেছেন। আর তাই মওদুদ আলেপ্পোতে তার রাজ্য সম্প্রসারণের চেষ্টা করলে তা একান্তই স্বাভাবিক হতো।
তা ছাড়া বাতিনি শিয়াদের সঙ্গে রিজওয়ানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কেবল সম্পর্কই নয়; তিনি আলেপ্পোর আপামর জনসাধারণের রুচি ও মতাদর্শের বিরুদ্ধে গিয়ে শিয়া মতাদর্শের মুখপাত্র ও সমর্থকে পরিণত হয়েছিলেন। এই সবকিছুই ইঙ্গিত বহন করে যে, মওদুদ হত্যাকাণ্ডে রিজওয়ানই সবচেয়ে বেশি লাভবান ছিলেন।
সঙ্গে এ তথ্যও যোগ করুন যে, রিজওয়ান তুগতেকিনকে প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন এবং তুগতেকিন তার রাজ্যে হানা দিতে পারেন, এমন আশঙ্কা করতেন। আমরা হয়তো এ তথ্যটিও ভুলে যাইনি যে, তিনি তার ভাই ও দামেশকের সাবেক শাসক দাক্কাকের প্রতিও প্রচণ্ড বিদ্বেষী ছিলেন। সাম্রাজ্য বিস্তারের লালসায় তিনি বহুবার দাক্কাকের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছিলেন। তা ছাড়া রিজওয়ানের পূর্বেও এ ধরনের গুপ্তহত্যার অভিজ্ঞতা ছিল। ইতিপূর্বে তিনি রাজ্য হারানোর আশঙ্কায় বাতিনি গুপ্তঘাতকের মাধ্যমে হিমসের আমির জানাহুদ্দৌলা হুসাইন বিন মালাইবকে হত্যা করিয়েছিলেন। অথচ জানাহুদ্দৌলা ব্যক্তিজীবনে ছিলেন রিজওয়ানের মায়ের স্বামী (সৎ বাবা)। কিন্তু এসব সম্পর্কের বিন্দুমাত্র মূল্য রিজওয়ানের কাছে ছিল না। আর তাই নেতৃত্ব ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য রিজওয়ানের কাছ থেকে কোনো অন্যায় আচরণই অপ্রত্যাশিত ছিল না। এসব যুক্তি পাশাপাশি রাখলে এ সম্ভাবনাই আমাদের কাছে প্রবল মনে হয় যে, আলেপ্পোর শাসক রিজওয়ানই ছিলেন এই ঘৃণ্য অপকর্মের মূল হোতা।
তবে রিজওয়ান একাই এ হত্যাকাণ্ডের মুনাফাভোগী ছিলেন না। কারও প্ররোচনা ছাড়াই খোদ বাতিনি শিয়াদেরও এতে বিরাট স্বার্থ ছিল। বাতিনিরা ছিল সমকালীন শাম অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য শক্তি; রিজওয়ান ও তুগতেকিনের মতো শামের প্রধান নেতারাও তাদেরকে সমীহ করত। সন্দেহ নেই, মওদুদের মতো একজন ভারসাম্যপূর্ণ সুন্নি মুজাহিদ নেতার উত্থান বাতিনিদের অন্যায়কর্মের পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছিল এবং তাদের অনাচার-অবিচারের জীবনে বাধা সৃষ্টি করছিল। আর অন্যায় গুপ্তহত্যায় এমনিতেও বাতিনিদের কুখ্যাতি ছিল। সুতরাং এ সম্ভাবনা মোটেও সুদূরপরাহত নয় যে, কারও প্ররোচনা ছাড়া বাতিনি গোষ্ঠী নিজেরাই স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
মওদুদ হত্যায় ক্রুসেডারদেরও স্বার্থ ছিল। মোটেও অসম্ভব নয় যে, তারা বাতিনি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মিত্রতা করেছিল এবং এই বরেণ্য মুজাহিদকে সরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে প্রচুর অর্থসম্পদ, যুদ্ধাস্ত্র বা বিভিন্ন দুর্গের কর্তৃত্ব প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছিল। মওদুদ তো তখন শাম অঞ্চলে সকল ক্রুসেডারের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলেন।
এমনও হতে পারে যে, রিজওয়ান, শিয়া বাতিনি সম্প্রদায় ও ক্রুসেডার শক্তি তিন পক্ষের বা যেকোনো দুই পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। আমার মতে দামেশকের আমির তুগতেকিনের পরিবর্তে অভিযোগের তির এদের দিকে তাক করাই অধিক যুক্তিযুক্ত।
কেউ প্রশ্ন করতে পারেন-মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও কীভাবে একজন বাতিনি ঘাতক এ কাজের দুঃসাহস করল? ভ্রান্ত চিন্তাধারা ও দোদুল্যমান ধর্মবিশ্বাসের অনুসারী হয়েও; এমনকি বিনাবাক্যে ইসলামের গণ্ডি বহির্ভূত হয়েও কোন নীতি-আদর্শে প্ররোচিত হয়ে সে এই আত্মঘাতী তৎপরতায় জড়াল?
আমরা বক্ষ্যমাণ গ্রন্থের শুরুর দিকেও উল্লেখ করেছি যে, শিয়া ইসমাইলি সম্প্রদায় মুসতালিয়া ও নিযারিয়া নামে দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছিল। ৪৮৭ হিজরি সনে (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) অষ্টম উবায়দি খলিফা মুসতানসির বিল্লাহ মারা যাওয়ার পর তার দুই পুত্র মুসতালি ও নিযার ক্ষমতা নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। তখন মিশরের তৎকালীন উজির বদর আল-জামালি বয়সে ছোট মুসতালিকে খলিফা পদে অধিষ্ঠিত করেন। এ সময় মিশরে অবস্থানকারী অন্যতম প্রভাবশালী ইসমাইলি ধর্মপ্রচারক হাসান বিন সাবাহ নিযারের পক্ষাবলম্বন করেন। মুসতালি ক্ষমতা গ্রহণের পর হাসান নিযারকে নিয়ে মিশর থেকে শামে চলে যান এবং সেখানে 'নিযারিয়া ইসমাইলিয়া' নামে শিয়াদের একটি চরম জঘন্য গোষ্ঠী গড়ে তোলেন। এই গোষ্ঠীটিই ইতিহাসে 'বাতিনি সম্প্রদায়' নামে পরিচিতি লাভ করে। কারণ, তাদের দাবি হলো কুরআনের প্রতিটি আয়াতের একটি বাহ্যিক ও একটি অন্তর্নিহিত মর্ম রয়েছে। সাধারণ মানুষ কেবল প্রথমটি জানে, আয়াতসমূহের বাতিনি ও অন্তর্নিহিত মর্ম একমাত্র তারাই জানে। এই দাবিকে উপজীব্য করে তারা কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা করতে থাকে এবং ভ্রান্ত বিভিন্ন আকিদা ও ব্যাখ্যা তৈরি করে ইসলামের গণ্ডি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যায়।
হাসান বিন সাবাহই এই ভ্রান্ত গোষ্ঠীর মূল নেতা ছিলেন। তিনি তার অনুসারীদের হাশিশ (এক ধরনের নেশা উদ্রেককারী উদ্ভিদের নির্যাস) পান করাতেন। ফলে তাদের বিবেক-বুদ্ধি লোপ পেত এবং তারা তাদের 'শায়খ' হাসান বিন সাবাহর অন্ধ আনুগত্য শুরু করত।
এরপর হাসান আরও ভয়ানক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি তার অনুসারীদের জন্য দুর্গম পাহাড়ের পাদদেশে একটি মনোরম উদ্যান গড়ে তোলেন এবং এর নামকরণ করেন 'জান্নাত'! তিনি সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করেন, সব জাতের ফল-ফলাদির ব্যবস্থা করেন এবং ছোট ছোট কৃত্রিম ঝরনা ও প্রস্রবণ তৈরি করেন। তিনি সেখানে তার অনুসারী সুদর্শনা তরুণীদের নিয়োজিত করেন।
হাসান তার যেকোনো অনুসারীকে প্রথমে হাশিশ পান করিয়ে পুরোপুরি অচেতন করে ফেলতেন, এরপর অচেতন অবস্থায় কথিত জান্নাতে নিয়ে আসতেন। অচেতন অনুসারী যখন কিছুটা চেতনা ফিরে পেয়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় থাকত, তখন তার সামনে হরেক পদের খাবার ও পানীয় পরিবেশন করা হতো। এরপর সে সুন্দরী যুবতীদের সঙ্গে অপকর্মে লিপ্ত হতো। তারপর তাকে পুনরায় হাশিশ পান করিয়ে অচেতন করে ফেলা হতো এবং 'জান্নাত' থেকে বের করে নিয়ে আসা হতো। চেতনা ফিরে এলে তাকে বলা হতো, আবারও জান্নাতে ফিরতে চাইলে 'শায়খুল জাবাল' (হাসান বিন সাবাহ)-এর নিঃশর্ত আনুগত্য করতে হবে। এভাবে কয়েকবার হাশিশ পান ও কৃত্রিম উদ্যানে আনা-নেওয়া করে তাকে হাশিশের নেশায় আসক্ত করে তোলা হতো এবং কৃত্রিম জান্নাত ও তার ভোগসামগ্রীর প্রতি পাগলপারা করে তোলা হতো। তারপর একদিন তাকে নির্দেশ দেওয়া হতো—যাও, আত্মঘাতী অভিযানে অংশ নিয়ে প্রাণ উৎসর্গ করে এসো। তাহলে তুমি চিরদিন জান্নাতে থাকতে পারবে!
অনুসারী হিসেবে তারা সাদাসিধা, চিন্তা-ধর্মে সরল, দরিদ্র-নিপীড়িত, গ্রাম্য-গোঁয়ার লোকদের বাছাই করত। এসব লোক নেতাদের হাতের পুতুলে পরিণত হতো এবং নেতারা যা আদেশ করত, নির্দ্বিধায় তা পালন করত।
বাতিনিরা গুপ্তহত্যাকে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করেছিল এবং চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের নিত্যনতুন কৌশল উদ্ভাবন করে ব্যাপকহারে গুপ্তহত্যার পথ বেছে নিয়েছিল। সশস্ত্র গোষ্ঠী হওয়ায় তাদের লাগাম টেনে ধরা ছিল অত্যন্ত কঠিন। এ কারণে তাদের নাম শুনলেই শাসক-প্রজা নির্বিশেষে সকলের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠত!
যেহেতু তারা হাশিশ পানে অভ্যস্ত ছিল, তাই ইতিহাসে তারা 'নিয়ারিয়া', 'বাতিনি' ইত্যাদি নামের পাশাপাশি 'হাশশাশিন' নামেও পরিচিত। ইতিহাসে এদের অন্যায়কর্মের ফিরিস্তি বেশ দীর্ঘ। তাদের অনেক হত্যাপ্রচেষ্টা যেমন সফল হয়, ব্যর্থও হয় অনেক অপচেষ্টা। কিন্তু সব সময় তারা ছিল ভীতি ও ত্রাসের প্রতীক এবং সত্যের পথিকদের চলার পথে বাধা সৃষ্টিকারী।
টিকাঃ
৮০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪।
৮১. আল-মাকরিজি, ইত্তিআ'জুল হুনাফা বি-আখবারিল আইম্মাতিল ফাতিমিয়ীনাল খুলাফা, ৩/১১।
৮২. উজির বদর আল-জামালি হাসান বিন সাবাহকে বন্দি করে মাগরিবে নির্বাসিত করেছিলেন। কিন্তু হাসানকে বহনকারী জাহাজ পথিমধ্যে ঝড়ের কবলে পড়ে বাতাসের টানে শামের উপকূলীয় এলাকায় চলে যায়। তখন হাসান বিন সাবাহ আক্কার উপকূলীয় এলাকায় অবতরণ করেন এবং সেখান থেকে নিজের এলাকা ইস্পাহানে ফিরে যান। এরপর তিনি সেখানে নিযারের পক্ষে প্রচারণা চালাতে থাকেন। ওদিকে নিযার তার ভাই মুসতালির কারাগারে বন্দি অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র হাদি বিন নিযার মিশর থেকে পালিয়ে পারস্যে হাসান বিন সাবাহর কাছে চলে আসেন এবং নিযারিয়া মতাদর্শের প্রসারে কাজ করতে থাকেন। (সম্পাদক)
৮০. আবু হামিদ আল-গাজালি, ফাযাইহুল বাতিনিয়্যা, পৃষ্ঠা: ১১ ও Grousset: Hist. des. Croisades 1,p. 530.
৮৪. Marco Polo: Travels, p. 50.
৮৫. Michaud: op. cit., II,pp. 72 -73.
b. Marco Polo: Travels, pp. 49-53
৮. Ivanow: An Islamic Ode in Praise of Fidawis, pp. 63-64.
৮৮. যেহেতু বাতিনিদের মূল লক্ষ্য ছিল সারা বিশ্বে নিজেদের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করা, তাই তারা মুসলিম বিশ্বকে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দিক থেকে নেতৃত্বশূন্য করার লক্ষ্যে গুপ্তহত্যা ও আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে সমকালীন ইসলামি বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামি শক্তি যথা আব্বাসি খিলাফত, সেলজুক, খোয়ারিজমি, জিনকি ও আইয়ুবি সালতানাতের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। তারা আব্বাসি খলিফা মুসতারশিদ, রাশিদ, বাগদাদের উজির নিজামুল মুলক ও সুলতান মুহাম্মাদ ঘুরিকে হত্যা করে এবং সেলজুক সুলতান মালিকশাহ, জিনকি সুলতান নুরুদ্দিন মাহমুদ ও আইয়ুবি সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবিকে হত্যা করার জন্য একাধিকবার চেষ্টা চালায়। (সম্পাদক)
৮. শিয়া ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়ের মূল শাখা তিনটি— কারামাতিয়া, মুসতালিয়া ও নিযারিয়া। কালের পরিক্রমায় বর্তমানে যেহেতু কারামাতিয়া ও মুসতালিয়াদের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে, তাই বর্তমানে ইসমাইলিয়া বলে নিযারিয়া বা বাতিনি গোষ্ঠীকেই বোঝানো হয়। বর্তমানে তারা 'আগাখানিয়া' নামে অধিক প্রসিদ্ধ। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল,=ইউরোপ ও ভারতে প্রচুর সংখ্যক আগাখানিয়া মতাদর্শী বসবাস করে। বর্তমানে তাদের প্রধান নেতা ফ্রান্সে বসবাসকারী ও ব্রিটিশ নাগরিকত্বের অধিকারী করিম হুসাইন শাহ (৪র্থ আগাখান), যিনি বিখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিনের ভাষ্য অনুসারে বিশ্বের শীর্ষ দশ ধনীর একজন। [সম্পাদক]