📄 মুসলিম বাহিনীর ব্যর্থ অভিযান
কিন্তু আলেপ্পোতে রিজওয়ানের কাছে যা প্রত্যাশিত ছিল, তা-ই ঘটে! রিজওয়ান মসুল, ইরাক ও পারস্যের সম্মিলিত বাহিনীর সামনে আলেপ্পোর নগরদ্বার রুদ্ধ করে দেন এবং ঘোষণা করেন যে, তিনি ক্রুসেডার বাহিনীর তুলনায় মুসলিম বাহিনীকে বেশি ভয় পাচ্ছেন!
রিজওয়ানের এই চরম প্রতারণামূলক পদক্ষেপে মুসলিম বাহিনী কঠিন সংকটে পড়ে যায়। রিজওয়ানকে সাহায্য করতে মুসলিম বাহিনী নিজেদের মূল সাহায্যক্ষেত্র উত্তর ইরাক থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে এবং শত্রু-ভূখণ্ডের অনেকটা ভেতরে চলে এসেছে। এদিকে রিজওয়ান তাদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। এখন যদি ক্রুসেডার বাহিনী চলে আসে, তাহলে নিঃসন্দেহে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করবে। তা ছাড়া আলেপ্পোর কাছেই ছিল ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন দুর্গের অবস্থান। ওদিক থেকে বল্ডউইন ডি বুর্গ যদি মুসলিম বাহিনীর ফেরার পথ বন্ধ করে দিতে এবং তাদের কাছে সামরিক সহায়তা পৌঁছার পথ রুদ্ধ করে দিতে এডেসা থেকে বের হয়ে আসেন, তাহলে তো বিপদ বহুগুণে বেড়ে যাবে। চরম প্রতারক রিজওয়ান মুসলিম বাহিনীকে বাস্তবেই জটিল সংকটে ফেলে দিয়েছিলেন।
এমন পতনোন্মুখ পরিস্থিতিতে আলেপ্পোর জনগণের যেন হঠাৎ হুঁশ ফিরে আসে। এহেন ঘৃণ্য পদক্ষেপ থেকে রিজওয়ানকে নিবৃত্ত করতে তারা তীব্র বিক্ষোভ শুরু করে। কিন্তু রিজওয়ান আলেপ্পোর গণ্যমান্য ও নেতৃস্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তিকে বন্দি করে ফেলেন এবং আন্দোলন অব্যাহত রাখলে তাদের অনিষ্ট সাধনের হুমকি দিয়ে জনসাধারণকে দমন করেন।
নিঃসন্দেহে রিজওয়ানের এই আচরণ ছিল ইতিহাসের এক চরম নিন্দনীয় চিত্র এবং উম্মাহর দুশমনদের সামনে নতজানু হয়ে নিজ জাতি, মাতৃভূমি ও স্বধর্মীয়দের ওপর দমন-নীতি ব্যবহারকারী এক নেতার বাস্তব রূপ।
মওদুদ অনুভব করেন যে, তিনি কঠিন বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আটকে গেছেন। এরই মধ্যে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে যে, রিজওয়ান মুসলিম বাহিনীকে মার দেওয়ার জন্য খোদ টেনক্রেডের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন! সবদিক বিবেচনা করে মওদুদ আলেপ্পো থেকে দূরে সরে দামেশকের কাছাকাছি পৌঁছতে আরও দক্ষিণে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দামেশকের আমির তুগতেকিন প্রথমসারির মুজাহিদ না হলেও রিজওয়ানের তুলনায় শ্রেয়তর ছিলেন! মুসলিম বাহিনী আছি নদীর অববাহিকায় মাআ'ররাতুন-নোমানের কাছে পৌঁছার পর দামেশকের আমির তুগতেকিন সেখানে উপস্থিত হন এবং মুসলিম রাজন্যবর্গের আঘাতে আঘাতে জর্জরিত মহান সেনাপতি মওদুদ বিন তুনতেকিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অথচ স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল আঘাত আসবে ওদিক থেকে; এদিক থেকে নয়!
ইরাকি-পারসিক সম্মিলিত মুসলিম বাহিনীর নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আমির তুগতেকিন আলোচনায় মিলিত হন। আলোচনায় স্পষ্টত অনুমিত হচ্ছিল যে, তুগতেকিন যদিও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আগ্রহী; কিন্তু তিনি এই বিরাট মুসলিম বাহিনীকে (নিজ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিবেচনায়) ভয় করছেন। অবশ্য এমন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যেও তিনি সহজেই মওদুদ ও অন্যান্য রাজন্যের মধ্যে যে মোটাদাগের পার্থক্য আছে, তা অনুধাবন করতে সক্ষম হন। তিনি সুস্পষ্ট অনুভব করেন যে, প্রথমজন একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে নিঃস্বার্থ লড়াইয়ের চেতনা লালন করেন; সম্পদ বা রাজত্বের কোনো লালসা তার মাঝে নেই। আর বাহিনীর অন্যান্য নেতা সে যুগের সাধারণ আমিরদের মতোই কেবল পার্থিব স্বার্থের মোহে অভিযানে বের হয়েছে; জিহাদের কোনো চেতনাই তাদের মাঝে নেই। এখান থেকেই মওদুদ ও তুগতেকিনের মধ্যে এক হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের সূচনা হয়। তবে তুগতেকিন আশঙ্কা করছিলেন যে, অন্যান্য রাজন্য তার রাজ্যের অনিষ্ট সাধন করতে পারে। তাই মুসলিম বাহিনীকে দামেশক হতে দূরে রাখা নিশ্চিত করতে তিনি আলোচনায় সকলকে ত্রিপোলিতে আক্রমণে রাজি হতে পীড়াপীড়ি করেন। এতে তুগতেকিনের আরেকটি স্বার্থ নিহিত ছিল। যেহেতু ক্রুসেড রাজ্য ত্রিপোলির অবস্থান ছিল দামেশক রাজ্যের অধীনস্থ অঞ্চলের তুলনায় নিকটে, তাই তিনি এর মাধ্যমে তার জন্য তুলনামূলক অধিক অনিষ্টকর ক্রুসেডার নেতা ত্রিপোলি-শাসক বারট্রামকে ঘায়েল করতে চাচ্ছিলেন।
তুগতেকিনের মনোজগতে পার্থিব স্বার্থ-চিন্তা ও প্রবৃত্তির লালসা যেমন বিদ্যমান ছিল, দ্বীনি কল্যাণ-চিন্তা ও শরিয়তের চাহিদাও বিরাজমান ছিল। এই দ্বিমুখী চেতনার সংঘাতের কারণে তার পদক্ষেপ ও কার্যক্রমগুলো হতো সাংঘর্ষিক ও পরস্পর বিরোধী। তার পদচারণায় না মওদুদের মতো স্বচ্ছ জিহাদি চেতনা প্রতিভাত হতো, না রিজওয়ানের মতো সুস্পষ্ট দালালির চেতনা! এ ধরনের লোকের সংখ্যা অনেক। এমন অনিশ্চিত চেতনাধারী লোকদের দ্বারা কিছু কল্যাণ সাধিত হলেও সংস্কার ও পরিবর্তনের আশা করা যায় না!
এদিকে যখন মুসলিম বাহিনীতে চারিত্রিক অবক্ষয়জনিত বিভাজন, ওদিকে তখন ক্রুসেডার কাঠামোতে দৃশ্যমান ঐক্যের আয়োজন! এন্টিয়কের শাসক টেনক্রেড এ সময় বাইতুল মুকাদ্দাসের অধিপতি ১ম বল্ডউইনের কাছে সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন এবং ত্রিপোলি, এডেসা ও তিল-বাশিরের শাসকদের প্রতি মুসলমানদের মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের শাশ্বত ও অপরিবর্তনীয় একটি নীতি হলো-কোনো সেনাদল যদি এভাবে ঐক্যের লক্ষ্যে অগ্রসর হয়, তখন অবশ্যই তাদের প্রভাব-ভীতি ছড়িয়ে পড়ে; আর যে সেনাদল ঘোরতর কঠিন মুহূর্তেও ঐক্যবদ্ধ হতে পারে না, তাদের ভাগ্যে বিজয়ের আশা করা যায় না!
মুসলিম শিবিরের পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। অধিকাংশ রাজন্যের শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ে ভয়-ডর-শঙ্কা। হঠাৎ করেই মারা যান সুকমান আল-কুতবি (ধারণা করা যায়, অতি ভীতিই ছিল তার মৃত্যু-কারণ)। যুদ্ধ না করার উপযুক্ত অজুহাত পেয়ে যাওয়ায় আহলাত ও তিবরিজের বাহিনী প্রস্থানের সিদ্ধান্ত নেয়! হামাদানের আমির বুরসুক অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং নিজ রাজ্যে সুচিকিৎসা গ্রহণের জন্য ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন! ফলে তার বাহিনীও শিবির ত্যাগ করে। জোসেলিনের সঙ্গে গোপনে আঁতাঁত করা আহমাদিল নিজ রাজ্য মারাগায় 'হঠাৎ সৃষ্ট' অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যার বাহানা দেখিয়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি এর মাধ্যমে এক ঢিলে দুই পাখি শিকার করেন; একদিকে ক্রুসেডার-বিরোধী যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যান, অপরদিকে সদ্য-মৃত আমির সুকমান আল-কুতবির রাজ্যে ভাগ বসানোর চেষ্টা করার সুযোগ পান। ইয়াজ বিন ইলগাজি এক আজব উদ্দেশ্যে মুসলিম শিবির ত্যাগ করেন; তার লক্ষ্য মৃত আমির সুকমান আল-কুতবির বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে যা পারা যায় লুটে নেওয়া! অবশ্য তার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং উল্টো সুকমনের বাহিনী তার বাহিনীকে পরাজিত করে তাদের সঙ্গে থাকা সবকিছু লুট করে নিয়ে নিজেদের রাজ্যে ফিরে যায়!
এসব বিবরণও কেউ বিশ্বাস করবে?!
ভীরুতা ও কাপুরুষতা, পলায়ন ও বিশ্বাসঘাতকতার লক্ষ্যে এভাবে একদল রাজন্য ও সেনাপতি সকলে একজোট হতে পারে?!
হ্যাঁ, বাস্তবে এমনটিই ঘটেছিল! এখান থেকেই আমরা অনুমান করতে পারি, কেন ক্রুসেড আগ্রাসন চলাকালে মুসলমানদের ওপর বিরাট বিপর্যয় নেমে এসেছিল। যুগে যুগে দুর্বলতা ও অবসন্নতার সময় মুসলিম উম্মাহ যেসব সংকটের শিকার হয়েছে, তার কার্যকরণও আমরা এখান থেকেই উপলব্ধি করতে পারি। উনিশশ আটচল্লিশ বা উনিশশ সাতষট্টির ট্র্যাজেডি তো আমাদের থেকে খুব দূরবর্তী অতীত নয়!
মসুলের আমির মওদুদ এখন কার্যত নিঃসঙ্গ! তার সঙ্গে কেবল তার নিজস্ব বাহিনী এবং দামেশকের আমির তুগতেকিন। ওদিকে ক্রুসেডাররা সবদিক থেকে ছুটে আসছে। ক্রুসেডারদের যোদ্ধাসংখ্যা ষোলো হাজারের মতো; অবশিষ্ট মুসলিম সৈন্যদের তুলনায় যা অনেক বেশি।
এমন জটিলতর পরিস্থিতিতে মুসলিম বাহিনীর কাছে শাইজারের প্রশাসক সুলতান বিন মুনকিযের পক্ষ থেকে একটি বার্তা এসে পৌঁছায়। বার্তায় তিনি মুসলিম বাহিনীকে শাইজারে আশ্রয় গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন। তার এই প্রস্তাবে উভয় পক্ষেরই স্বার্থ নিহিত ছিল। এতে একদিকে যেমন শাইজারের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত হবে, অপরদিকে মুসলিম বাহিনীর নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে। ইবনে মুনকিযের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুসলিম বাহিনী শাইজার অভিমুখে রওনা হয় এবং সেখানে পৌঁছে নগরপ্রাচীরের অভ্যন্তরে সুরক্ষিত অবস্থান গ্রহণ করে। ক্রুসেডার বাহিনীও ততক্ষণে চলে এসেছে সিংহভাগ পালিয়ে যাওয়ার পর অবশিষ্ট মুসলিম বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার লক্ষ্যে।
নিজেদের এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় মওদুদের বাহিনীর অবস্থান তখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মওদুদ তাই এ অঞ্চলে দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ অবস্থায় আটকে থাকতে চাচ্ছিলেন না। তার সামনে তখন একটাই পথ খোলা- ক্রুসেডার বাহিনীকে ভয় দেখিয়ে নিজেদের প্রত্যাবর্তনের পথ করে নেওয়া। এ কারণেই মওদুদ দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসে ক্রুসেডারদের ওপর হামলা চালিয়ে পুনরায় দুর্গে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি আশা করছিলেন, এভাবে ঝটিকা হামলার শিকার হলে ক্রুসেডাররা প্রভাবিত হয়ে যুদ্ধে না জড়িয়ে তাকে ফিরে যাওয়ার সুযোগ করে দেবে।
মওদুদের হৃদয়ের নিষ্ঠাপূর্ণ ইচ্ছার কথা আল্লাহ তাআলা জানতেন। আল্লাহ তাই শত্রুপক্ষের সুবিশাল বাহিনীর অন্তর্জগতে ভীতি সঞ্চার করে দেন। মুসলিম বাহিনীর দুঃসাহসী আক্রমণে তারা ভীত হয়ে পড়ে। বরং মওদুদ ক্রুসেডার বাহিনীর পেছনের অংশে হামলা চালিয়ে কিছু যুদ্ধলব্ধ সম্পদও হাসিল করে নেন!
ক্রুসেডাররা বিবেচনা করে দেখে যে, এই অদম্য বীর মুজাহিদের পথ ছেড়ে দিয়ে শাম অঞ্চলের বিভিন্ন দুর্বল প্রকৃতির রাজন্যবর্গের রাজ্যে হানা দেওয়াই তাদের জন্য নিরাপদ। মওদুদও বাস্তববাদী ছিলেন। তিনি দেখছিলেন যে, বর্তমান অবস্থায় যুদ্ধচিন্তায় অটল থাকা নিজের বাহিনীকে ধ্বংসাত্মক পরিণতির দিকে ঠেলে দেওয়ার নামান্তর। তাই তিনি মসুলের পথ ধরেন। তুগতেকিনও ফিরে যান দামেশকে।
সম্মিলিত মুসলিম বাহিনীর এই অভিযান যদিও মূল লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়; কিন্তু এর মধ্য দিয়ে অন্য একটি উপকারও হয়! এ অভিযানের মাধ্যমেই এসব প্রতারক নেতার মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যায়। কেবল মওদুদের সামনে নয়; সাধারণ জনগণও সুনিশ্চিতভাবে উপলব্ধি করতে পারে যে, কারা আল্লাহর পথে লড়াইকারী নিষ্ঠাবান নেতা আর কারা অজুহাত দেখিয়ে পাশ কাটিয়ে যাওয়া কপট নেতা। যেকোনো আন্দোলন ও সংগ্রাম পূর্ণতায় পৌঁছার জন্য এই দৃষ্টিগত স্বচ্ছতা অনেক বেশি জরুরি। এমন স্বচ্ছতা থাকলে জনসাধারণ কল্পনার বালু-প্রাসাদ গড়ার মতো ভুল করে না; এমন ভণ্ড লোকদের ওপর নির্ভর করে সুমহান কোনো স্বপ্নের জাল বোনে না, যারা মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতে জানলেও কাজের কাজ কিছুই করতে পারে না!
টিকাঃ
২৮. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৫৯।
২৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪ ও Setton: op. cit., 1,p. 400.
৩০. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৫৯।
৩১. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৭৫।
৩২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪ ও আত-তারীখুল বাহির, ১৭-১৮।
৩৩. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৬০।
৩৪. Grousset: Hist. des. Croisades 1, p. 469.
৩৫. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৭৬-১৭৭।
৩৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪।
৩৭. ১৯৪৮ সালের আরব-ইহুদি সশস্ত্র বাহিনী যুদ্ধ ও ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। [সম্পাদক]
৩৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪।
*. Setton: op. cit., 1,p. 400.
কিন্তু আলেপ্পোতে রিজওয়ানের কাছে যা প্রত্যাশিত ছিল, তা-ই ঘটে! রিজওয়ান মসুল, ইরাক ও পারস্যের সম্মিলিত বাহিনীর সামনে আলেপ্পোর নগরদ্বার রুদ্ধ করে দেন এবং ঘোষণা করেন যে, তিনি ক্রুসেডার বাহিনীর তুলনায় মুসলিম বাহিনীকে বেশি ভয় পাচ্ছেন!
রিজওয়ানের এই চরম প্রতারণামূলক পদক্ষেপে মুসলিম বাহিনী কঠিন সংকটে পড়ে যায়। রিজওয়ানকে সাহায্য করতে মুসলিম বাহিনী নিজেদের মূল সাহায্যক্ষেত্র উত্তর ইরাক থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে এবং শত্রু-ভূখণ্ডের অনেকটা ভেতরে চলে এসেছে। এদিকে রিজওয়ান তাদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। এখন যদি ক্রুসেডার বাহিনী চলে আসে, তাহলে নিঃসন্দেহে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করবে। তা ছাড়া আলেপ্পোর কাছেই ছিল ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন দুর্গের অবস্থান। ওদিক থেকে বল্ডউইন ডি বুর্গ যদি মুসলিম বাহিনীর ফেরার পথ বন্ধ করে দিতে এবং তাদের কাছে সামরিক সহায়তা পৌঁছার পথ রুদ্ধ করে দিতে এডেসা থেকে বের হয়ে আসেন, তাহলে তো বিপদ বহুগুণে বেড়ে যাবে। চরম প্রতারক রিজওয়ান মুসলিম বাহিনীকে বাস্তবেই জটিল সংকটে ফেলে দিয়েছিলেন।
এমন পতনোন্মুখ পরিস্থিতিতে আলেপ্পোর জনগণের যেন হঠাৎ হুঁশ ফিরে আসে। এহেন ঘৃণ্য পদক্ষেপ থেকে রিজওয়ানকে নিবৃত্ত করতে তারা তীব্র বিক্ষোভ শুরু করে। কিন্তু রিজওয়ান আলেপ্পোর গণ্যমান্য ও নেতৃস্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তিকে বন্দি করে ফেলেন এবং আন্দোলন অব্যাহত রাখলে তাদের অনিষ্ট সাধনের হুমকি দিয়ে জনসাধারণকে দমন করেন।
নিঃসন্দেহে রিজওয়ানের এই আচরণ ছিল ইতিহাসের এক চরম নিন্দনীয় চিত্র এবং উম্মাহর দুশমনদের সামনে নতজানু হয়ে নিজ জাতি, মাতৃভূমি ও স্বধর্মীয়দের ওপর দমন-নীতি ব্যবহারকারী এক নেতার বাস্তব রূপ।
মওদুদ অনুভব করেন যে, তিনি কঠিন বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আটকে গেছেন। এরই মধ্যে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে যে, রিজওয়ান মুসলিম বাহিনীকে মার দেওয়ার জন্য খোদ টেনক্রেডের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন! সবদিক বিবেচনা করে মওদুদ আলেপ্পো থেকে দূরে সরে দামেশকের কাছাকাছি পৌঁছতে আরও দক্ষিণে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দামেশকের আমির তুগতেকিন প্রথমসারির মুজাহিদ না হলেও রিজওয়ানের তুলনায় শ্রেয়তর ছিলেন! মুসলিম বাহিনী আছি নদীর অববাহিকায় মাআ'ররাতুন-নোমানের কাছে পৌঁছার পর দামেশকের আমির তুগতেকিন সেখানে উপস্থিত হন এবং মুসলিম রাজন্যবর্গের আঘাতে আঘাতে জর্জরিত মহান সেনাপতি মওদুদ বিন তুনতেকিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অথচ স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল আঘাত আসবে ওদিক থেকে; এদিক থেকে নয়!
ইরাকি-পারসিক সম্মিলিত মুসলিম বাহিনীর নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আমির তুগতেকিন আলোচনায় মিলিত হন। আলোচনায় স্পষ্টত অনুমিত হচ্ছিল যে, তুগতেকিন যদিও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আগ্রহী; কিন্তু তিনি এই বিরাট মুসলিম বাহিনীকে (নিজ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিবেচনায়) ভয় করছেন। অবশ্য এমন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যেও তিনি সহজেই মওদুদ ও অন্যান্য রাজন্যের মধ্যে যে মোটাদাগের পার্থক্য আছে, তা অনুধাবন করতে সক্ষম হন। তিনি সুস্পষ্ট অনুভব করেন যে, প্রথমজন একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে নিঃস্বার্থ লড়াইয়ের চেতনা লালন করেন; সম্পদ বা রাজত্বের কোনো লালসা তার মাঝে নেই। আর বাহিনীর অন্যান্য নেতা সে যুগের সাধারণ আমিরদের মতোই কেবল পার্থিব স্বার্থের মোহে অভিযানে বের হয়েছে; জিহাদের কোনো চেতনাই তাদের মাঝে নেই। এখান থেকেই মওদুদ ও তুগতেকিনের মধ্যে এক হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের সূচনা হয়। তবে তুগতেকিন আশঙ্কা করছিলেন যে, অন্যান্য রাজন্য তার রাজ্যের অনিষ্ট সাধন করতে পারে। তাই মুসলিম বাহিনীকে দামেশক হতে দূরে রাখা নিশ্চিত করতে তিনি আলোচনায় সকলকে ত্রিপোলিতে আক্রমণে রাজি হতে পীড়াপীড়ি করেন। এতে তুগতেকিনের আরেকটি স্বার্থ নিহিত ছিল। যেহেতু ক্রুসেড রাজ্য ত্রিপোলির অবস্থান ছিল দামেশক রাজ্যের অধীনস্থ অঞ্চলের তুলনায় নিকটে, তাই তিনি এর মাধ্যমে তার জন্য তুলনামূলক অধিক অনিষ্টকর ক্রুসেডার নেতা ত্রিপোলি-শাসক বারট্রামকে ঘায়েল করতে চাচ্ছিলেন।
তুগতেকিনের মনোজগতে পার্থিব স্বার্থ-চিন্তা ও প্রবৃত্তির লালসা যেমন বিদ্যমান ছিল, দ্বীনি কল্যাণ-চিন্তা ও শরিয়তের চাহিদাও বিরাজমান ছিল। এই দ্বিমুখী চেতনার সংঘাতের কারণে তার পদক্ষেপ ও কার্যক্রমগুলো হতো সাংঘর্ষিক ও পরস্পর বিরোধী। তার পদচারণায় না মওদুদের মতো স্বচ্ছ জিহাদি চেতনা প্রতিভাত হতো, না রিজওয়ানের মতো সুস্পষ্ট দালালির চেতনা! এ ধরনের লোকের সংখ্যা অনেক। এমন অনিশ্চিত চেতনাধারী লোকদের দ্বারা কিছু কল্যাণ সাধিত হলেও সংস্কার ও পরিবর্তনের আশা করা যায় না!
এদিকে যখন মুসলিম বাহিনীতে চারিত্রিক অবক্ষয়জনিত বিভাজন, ওদিকে তখন ক্রুসেডার কাঠামোতে দৃশ্যমান ঐক্যের আয়োজন! এন্টিয়কের শাসক টেনক্রেড এ সময় বাইতুল মুকাদ্দাসের অধিপতি ১ম বল্ডউইনের কাছে সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন এবং ত্রিপোলি, এডেসা ও তিল-বাশিরের শাসকদের প্রতি মুসলমানদের মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের শাশ্বত ও অপরিবর্তনীয় একটি নীতি হলো-কোনো সেনাদল যদি এভাবে ঐক্যের লক্ষ্যে অগ্রসর হয়, তখন অবশ্যই তাদের প্রভাব-ভীতি ছড়িয়ে পড়ে; আর যে সেনাদল ঘোরতর কঠিন মুহূর্তেও ঐক্যবদ্ধ হতে পারে না, তাদের ভাগ্যে বিজয়ের আশা করা যায় না!
মুসলিম শিবিরের পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। অধিকাংশ রাজন্যের শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ে ভয়-ডর-শঙ্কা। হঠাৎ করেই মারা যান সুকমান আল-কুতবি (ধারণা করা যায়, অতি ভীতিই ছিল তার মৃত্যু-কারণ)। যুদ্ধ না করার উপযুক্ত অজুহাত পেয়ে যাওয়ায় আহলাত ও তিবরিজের বাহিনী প্রস্থানের সিদ্ধান্ত নেয়! হামাদানের আমির বুরসুক অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং নিজ রাজ্যে সুচিকিৎসা গ্রহণের জন্য ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন! ফলে তার বাহিনীও শিবির ত্যাগ করে। জোসেলিনের সঙ্গে গোপনে আঁতাঁত করা আহমাদিল নিজ রাজ্য মারাগায় 'হঠাৎ সৃষ্ট' অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যার বাহানা দেখিয়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি এর মাধ্যমে এক ঢিলে দুই পাখি শিকার করেন; একদিকে ক্রুসেডার-বিরোধী যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যান, অপরদিকে সদ্য-মৃত আমির সুকমান আল-কুতবির রাজ্যে ভাগ বসানোর চেষ্টা করার সুযোগ পান। ইয়াজ বিন ইলগাজি এক আজব উদ্দেশ্যে মুসলিম শিবির ত্যাগ করেন; তার লক্ষ্য মৃত আমির সুকমান আল-কুতবির বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে যা পারা যায় লুটে নেওয়া! অবশ্য তার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং উল্টো সুকমনের বাহিনী তার বাহিনীকে পরাজিত করে তাদের সঙ্গে থাকা সবকিছু লুট করে নিয়ে নিজেদের রাজ্যে ফিরে যায়!
এসব বিবরণও কেউ বিশ্বাস করবে?!
ভীরুতা ও কাপুরুষতা, পলায়ন ও বিশ্বাসঘাতকতার লক্ষ্যে এভাবে একদল রাজন্য ও সেনাপতি সকলে একজোট হতে পারে?!
হ্যাঁ, বাস্তবে এমনটিই ঘটেছিল! এখান থেকেই আমরা অনুমান করতে পারি, কেন ক্রুসেড আগ্রাসন চলাকালে মুসলমানদের ওপর বিরাট বিপর্যয় নেমে এসেছিল। যুগে যুগে দুর্বলতা ও অবসন্নতার সময় মুসলিম উম্মাহ যেসব সংকটের শিকার হয়েছে, তার কার্যকরণও আমরা এখান থেকেই উপলব্ধি করতে পারি। উনিশশ আটচল্লিশ বা উনিশশ সাতষট্টির ট্র্যাজেডি তো আমাদের থেকে খুব দূরবর্তী অতীত নয়!
মসুলের আমির মওদুদ এখন কার্যত নিঃসঙ্গ! তার সঙ্গে কেবল তার নিজস্ব বাহিনী এবং দামেশকের আমির তুগতেকিন। ওদিকে ক্রুসেডাররা সবদিক থেকে ছুটে আসছে। ক্রুসেডারদের যোদ্ধাসংখ্যা ষোলো হাজারের মতো; অবশিষ্ট মুসলিম সৈন্যদের তুলনায় যা অনেক বেশি।
এমন জটিলতর পরিস্থিতিতে মুসলিম বাহিনীর কাছে শাইজারের প্রশাসক সুলতান বিন মুনকিযের পক্ষ থেকে একটি বার্তা এসে পৌঁছায়। বার্তায় তিনি মুসলিম বাহিনীকে শাইজারে আশ্রয় গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন। তার এই প্রস্তাবে উভয় পক্ষেরই স্বার্থ নিহিত ছিল। এতে একদিকে যেমন শাইজারের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত হবে, অপরদিকে মুসলিম বাহিনীর নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে। ইবনে মুনকিযের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুসলিম বাহিনী শাইজার অভিমুখে রওনা হয় এবং সেখানে পৌঁছে নগরপ্রাচীরের অভ্যন্তরে সুরক্ষিত অবস্থান গ্রহণ করে। ক্রুসেডার বাহিনীও ততক্ষণে চলে এসেছে সিংহভাগ পালিয়ে যাওয়ার পর অবশিষ্ট মুসলিম বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার লক্ষ্যে।
নিজেদের এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় মওদুদের বাহিনীর অবস্থান তখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মওদুদ তাই এ অঞ্চলে দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ অবস্থায় আটকে থাকতে চাচ্ছিলেন না। তার সামনে তখন একটাই পথ খোলা- ক্রুসেডার বাহিনীকে ভয় দেখিয়ে নিজেদের প্রত্যাবর্তনের পথ করে নেওয়া। এ কারণেই মওদুদ দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসে ক্রুসেডারদের ওপর হামলা চালিয়ে পুনরায় দুর্গে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি আশা করছিলেন, এভাবে ঝটিকা হামলার শিকার হলে ক্রুসেডাররা প্রভাবিত হয়ে যুদ্ধে না জড়িয়ে তাকে ফিরে যাওয়ার সুযোগ করে দেবে।
মওদুদের হৃদয়ের নিষ্ঠাপূর্ণ ইচ্ছার কথা আল্লাহ তাআলা জানতেন। আল্লাহ তাই শত্রুপক্ষের সুবিশাল বাহিনীর অন্তর্জগতে ভীতি সঞ্চার করে দেন। মুসলিম বাহিনীর দুঃসাহসী আক্রমণে তারা ভীত হয়ে পড়ে। বরং মওদুদ ক্রুসেডার বাহিনীর পেছনের অংশে হামলা চালিয়ে কিছু যুদ্ধলব্ধ সম্পদও হাসিল করে নেন!
ক্রুসেডাররা বিবেচনা করে দেখে যে, এই অদম্য বীর মুজাহিদের পথ ছেড়ে দিয়ে শাম অঞ্চলের বিভিন্ন দুর্বল প্রকৃতির রাজন্যবর্গের রাজ্যে হানা দেওয়াই তাদের জন্য নিরাপদ। মওদুদও বাস্তববাদী ছিলেন। তিনি দেখছিলেন যে, বর্তমান অবস্থায় যুদ্ধচিন্তায় অটল থাকা নিজের বাহিনীকে ধ্বংসাত্মক পরিণতির দিকে ঠেলে দেওয়ার নামান্তর। তাই তিনি মসুলের পথ ধরেন। তুগতেকিনও ফিরে যান দামেশকে।
সম্মিলিত মুসলিম বাহিনীর এই অভিযান যদিও মূল লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়; কিন্তু এর মধ্য দিয়ে অন্য একটি উপকারও হয়! এ অভিযানের মাধ্যমেই এসব প্রতারক নেতার মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যায়। কেবল মওদুদের সামনে নয়; সাধারণ জনগণও সুনিশ্চিতভাবে উপলব্ধি করতে পারে যে, কারা আল্লাহর পথে লড়াইকারী নিষ্ঠাবান নেতা আর কারা অজুহাত দেখিয়ে পাশ কাটিয়ে যাওয়া কপট নেতা। যেকোনো আন্দোলন ও সংগ্রাম পূর্ণতায় পৌঁছার জন্য এই দৃষ্টিগত স্বচ্ছতা অনেক বেশি জরুরি। এমন স্বচ্ছতা থাকলে জনসাধারণ কল্পনার বালু-প্রাসাদ গড়ার মতো ভুল করে না; এমন ভণ্ড লোকদের ওপর নির্ভর করে সুমহান কোনো স্বপ্নের জাল বোনে না, যারা মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতে জানলেও কাজের কাজ কিছুই করতে পারে না!
টিকাঃ
২৮. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৫৯।
২৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪ ও Setton: op. cit., 1,p. 400.
৩০. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৫৯।
৩১. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৭৫।
৩২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪ ও আত-তারীখুল বাহির, ১৭-১৮।
৩৩. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৬০।
৩৪. Grousset: Hist. des. Croisades 1, p. 469.
৩৫. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৭৬-১৭৭।
৩৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪।
৩৭. ১৯৪৮ সালের আরব-ইহুদি সশস্ত্র বাহিনী যুদ্ধ ও ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। [সম্পাদক]
৩৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪।
*. Setton: op. cit., 1,p. 400.
📄 মওদুদ দমার পাত্র নন!
এভাবে উপর্যুপরি আঘাতে জর্জরিত হয়েও মওদুদ তার দায়িত্ব ভুলে যাননি। যদিও তার রাজ্য ছিল শান্তিপূর্ণ এবং সংঘাতস্থল থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থিত, রাজ্যের পরিস্থিতি ছিল স্থিতিশীল এবং তিনি লাভ করেছিলেন জনগণের অকুণ্ঠ ভালোবাসা; কিন্তু তিনি তো ছিলেন আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ এবং দ্বীন ও উম্মাহর প্রতি আপন দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন একজন নেতা। আর তাই একের পর এক বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েও তিনি তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন।
একই বছর অর্থাৎ ৫০৫ হিজরি সনের জিলকদ মাসে (১১১২ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) তিনি পুনরায় তার বাহিনীকে প্রস্তুত করে আচমকা এডেসা নগরীতে আক্রমণ করেন! এডেসা দুর্গের দুর্ভেদ্যতা এবং নিজ বাহিনীর সৈন্য-স্বল্পতা সত্ত্বেও তিনি আবারও অভিযান পরিচালনায় পিছপা হননি। কিন্তু বাস্তবেই এত সামান্য সংখ্যক সৈন্য নিয়ে এডেসা জয় করা সম্ভব ছিল না। তাই তিনি এডেসার কাছেই ফুরাতের পূর্ব তীরে অবস্থিত সারুজ নগরী অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নেন। সারুজ ছিল ফুরাতের পূর্ব তীরে ক্রুসেডারদের দ্বিতীয় প্রধান ঘাঁটি। তবে মওদুদ আশঙ্কা করছিলেন যে, তিনি সারুজ অভিমুখে অগ্রসর হলে এডেসার শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গ দুর্গ ছেড়ে বেরিয়ে এসে তার বাহিনীর পেছনের অংশে হামলা চালাতে পারেন। তাই তিনি তার বাহিনীর একটি অংশকে এডেসা অবরোধে রেখে অন্য অংশ নিয়ে সারুজ অভিমুখে অগ্রসর হন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তিল-বাশিরের প্রশাসক জোসেলিনের কাছে এ সংবাদ পৌঁছে যায়। তিনি যখন জানতে পারেন যে, মওদুদ তার বাহিনীর ক্ষুদ্র একটি অংশ নিয়ে সারুজ অভিমুখে রওনা হয়েছেন, তখন তিনি সুযোগ কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং তার বাহিনী নিয়ে সারুজের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন। সারুজে পৌঁছে জোসেলিন মওদুদের বাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম হন। মুসলিম বাহিনীর অনেক সৈন্য হতাহত হয়। সম্ভবত মওদুদ তার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা অনুমান করতে ভুল করেছিলেন এবং অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়েই বিরাট সংখ্যক ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়তে অগ্রসর হয়েছিলেন।
হৃদয়ে পরাজয়ের ক্ষত নিয়েই মওদুদ দ্রুত এডেসায় ফিরে আসেন এবং এডেসা অবরোধ করে রাখা সৈন্যদের সঙ্গে মিলিত হন।
সারুজে যখন যুদ্ধ চলছিল, এদিকে এডেসা অবরোধকারী মুসলিম বাহিনী তখন এডেসার অভ্যন্তরে বসবাসকারী আর্মেনীয়দের সঙ্গে গোপনে সমঝোতা চুক্তি করতে সক্ষম হয়েছিল! চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তারা এডেসা নগরীর পূর্ব অংশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গের নিয়ন্ত্রণ মুসলমানদের হাতে তুলে দেয়। মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা সেদিক দিয়ে এডেসার অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে শুরু করে। এ সময়ই মওদুদ সারুজ থেকে ফিরে আসেন এবং তার সৈন্যদের নিয়ে দ্রুত এডেসার পতন প্রচেষ্টায় শরিক হন। তবে জোসেলিন ঘটনাপ্রবাহ অনুমান করতে পেরে তার বাহিনী নিয়ে দ্রুত সারুজ থেকে এডেসায় চলে আসেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মওদুদ অনুভব করেন যে, অবশিষ্ট সৈন্যদের নিয়ে সমবেত ক্রুসেডারদের পরাভূত করা সম্ভব নয়। তাই তিনি মসুলে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এভাবেই মওদুদ রহ. হতাশ না হয়ে একের পর এক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত এডেসা-পতনক্ষণের তখনও বেশ দেরি ছিল!
জিহাদের এই সুকঠিন পথের চূড়ান্ত মনজিল হলো জান্নাত। প্রত্যাশিত ফলাফল নয়; আপন সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ত্যাগই এখানে মুখ্য। উহুদ যুদ্ধের শহিদান নিহত হয়েছেন মুসলমানদের কঠিন এক দুর্যোগকালে! অথচ জান্নাতে তাদের মর্যাদা কত উঁচু! তারা অবস্থান করবেন সুরম্য প্রাসাদের সর্বোচ্চ স্তরে! হামজা বিন আবদুল মুত্তালিব হবেন জান্নাতে শহিদানের সর্দার! কারণ, তারা নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে আদায় করেছেন; অবহেলা বা শিথিলতা প্রদর্শন করেননি।
তবে মওদুদের গল্পের সমাপ্তি টানার আগে আমাদের জানতে হবে যে, এডেসায় কী এমন ঘটেছিল, যার কারণে খ্রিষ্টান হয়েও আর্মেনীয়রা মুসলমানদের সঙ্গে গোপনে পত্রবিনিময় করেছিল এবং তাদেরকে নগরীটিতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছিল। এ ঘটনা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের শাসনের তুলনায় ইসলামি শাসনকে হাজার গুণ সদয়, সহনীয় ও ন্যায়ানুগ বিবেচনা করেছিল। এ কারণেই তারা নিজেদের ধর্মীয় ভাইদের বলি দিয়ে মুসলমানদের সহায়তা করেছিল। ব্যক্তিবিশেষকে অর্থ বা অন্য কিছুর লোভ দেখিয়ে সুবিধা অর্জন করা হয়নি; বরং একটি জনগোষ্ঠীর সিংহভাগের উদ্যোগে এমনটি সংঘটিত হয়েছিল। নিঃসন্দেহে এটি ইসলামি শাসনব্যবস্থা মূল্যায়নের এক প্রকৃষ্ট দলিল।
স্বভাবতই এ তথ্যে মোটেও বিস্ময়ের কিছু নেই যে, মওদুদ চলে যাওয়ার পরই এডেসায় ক্রুসেডারদের পক্ষ থেকে আর্মেনীয়দের বিচারের জন্য নিপীড়নমূলক সামরিক আদালত স্থাপন করা হয়। এরপর যেমনটি প্রত্যাশিত ছিল, তেমনই ঘটে; আর্মেনীয়দের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারমূলক রায় প্রদান করা হয়, বহু মানুষকে হত্যা করা হয়, অন্যদেরকে নগর-ত্যাগে বাধ্য করা হয়। ফলে ক্রুসেডার-আর্মেনীয় সহাবস্থান চূড়ান্ত পর্যায়ের কঠিন হয়ে ওঠে। অবশ্য বছর চারেক পূর্বে ৫০১ হিজরি সনে (১১০৮ খ্রিষ্টাব্দে) বল্ডউইন ডি বুর্গ বন্দিদশা থেকে ফিরে আসার পর থেকেই আর্মেনীয়দের সঙ্গে তার সম্পর্ক অস্থিরতাপূর্ণ ছিল।
সুস্পষ্ট অনুমিত হচ্ছিল যে, এডেসা রাজ্যের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি দিনে দিনে জটিল হয়ে উঠছে। বল্ডউইন এ সময় তার চারপাশের সকলকেই সন্দেহের চোখে দেখতে থাকেন এবং আশঙ্কা করেন যে, তারা তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে মুসলমানদের সঙ্গে গোপনে মিত্রতা করছে। সন্দেহ-রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মানসিক ভারসাম্যই হারিয়ে ফেলেন এবং শেষ পর্যন্ত রাজ্যের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা জোসেলিনকেও সন্দেহ করতে শুরু করেন! জোসেলিনের অপরাধ, আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী তাকে পছন্দ করে! একপর্যায়ে তিনি জোসেলিনকে তিল-বাশিরের প্রশাসক পদ হতে বরখাস্ত করেন এবং তাকে রাজ্য থেকে বহিষ্কার করেন। অথচ বল্ডউইনের বন্দিত্বের সময় এবং পরবর্তীকালে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুদ্ধে এই জোসেলিন বল্ডউইনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, বল্ডউইনের অনুপস্থিতিতে এডেসা রাজ্যের শান্তি-নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করেছেন এবং সবশেষে মওদুদের বাহিনীকে পরাজিত করেছেন। কিন্তু এসবের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে বল্ডউইন তাকে পদচ্যুত করেন। বিতাড়িত জোসেলিন বাইতুল মুকাদ্দাসের অধিপতি ১ম বল্ডউইনের কাছে চলে গেলে তিনি তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানান এবং তার ব্যাপক সামরিক দক্ষতা কাজে লাগাতে তাকে তাবারিয়া ও জালিল অঞ্চলের জায়গির প্রদান করেন।
৫০৫ হিজরি সনে (১ ১১২ খ্রিষ্টাব্দে) মওদুদের অভিযান আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থ হলেও মূলত একে কেন্দ্র করেই এডেসার অভ্যন্তরে ব্যাপক পরিসরে গোলযোগ সৃষ্টি হয় এবং পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। উপরি পাওনা হিসেবে ছিল এডেসাকেন্দ্রিক সংঘাতের ক্ষেত্র থেকে কঠিন প্রতিপক্ষ জোসেলিনের বিদায়!
টিকাঃ
80. Stevenson: op. cit., p. 95.
৪১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৭, Matthieu d' Edesse, p. 100.
42. Matthieu d' Edesse, p. 101.
40. Michel Le Syrien, III, p. 196.
৪৪. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'সকল শহিদদের সর্দার হবেন হামজা বিন আবদুল মুত্তালিব।' তাবারানি, আল-মুজামুল আওসাত, ৪/২৩৮ ও হাকিম, আল-মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন, হাদিস নং ২৫৫৭। [অনুবাদক]
45. Matthieu d' Edesse, pp. 104-106.
46. Runciman: op. cit., 11,p. 124.
47. Runciman: op. cit., 11,p. 124.
এভাবে উপর্যুপরি আঘাতে জর্জরিত হয়েও মওদুদ তার দায়িত্ব ভুলে যাননি। যদিও তার রাজ্য ছিল শান্তিপূর্ণ এবং সংঘাতস্থল থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থিত, রাজ্যের পরিস্থিতি ছিল স্থিতিশীল এবং তিনি লাভ করেছিলেন জনগণের অকুণ্ঠ ভালোবাসা; কিন্তু তিনি তো ছিলেন আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ এবং দ্বীন ও উম্মাহর প্রতি আপন দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন একজন নেতা। আর তাই একের পর এক বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েও তিনি তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন।
একই বছর অর্থাৎ ৫০৫ হিজরি সনের জিলকদ মাসে (১১১২ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) তিনি পুনরায় তার বাহিনীকে প্রস্তুত করে আচমকা এডেসা নগরীতে আক্রমণ করেন! এডেসা দুর্গের দুর্ভেদ্যতা এবং নিজ বাহিনীর সৈন্য-স্বল্পতা সত্ত্বেও তিনি আবারও অভিযান পরিচালনায় পিছপা হননি। কিন্তু বাস্তবেই এত সামান্য সংখ্যক সৈন্য নিয়ে এডেসা জয় করা সম্ভব ছিল না। তাই তিনি এডেসার কাছেই ফুরাতের পূর্ব তীরে অবস্থিত সারুজ নগরী অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নেন। সারুজ ছিল ফুরাতের পূর্ব তীরে ক্রুসেডারদের দ্বিতীয় প্রধান ঘাঁটি। তবে মওদুদ আশঙ্কা করছিলেন যে, তিনি সারুজ অভিমুখে অগ্রসর হলে এডেসার শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গ দুর্গ ছেড়ে বেরিয়ে এসে তার বাহিনীর পেছনের অংশে হামলা চালাতে পারেন। তাই তিনি তার বাহিনীর একটি অংশকে এডেসা অবরোধে রেখে অন্য অংশ নিয়ে সারুজ অভিমুখে অগ্রসর হন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তিল-বাশিরের প্রশাসক জোসেলিনের কাছে এ সংবাদ পৌঁছে যায়। তিনি যখন জানতে পারেন যে, মওদুদ তার বাহিনীর ক্ষুদ্র একটি অংশ নিয়ে সারুজ অভিমুখে রওনা হয়েছেন, তখন তিনি সুযোগ কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং তার বাহিনী নিয়ে সারুজের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন। সারুজে পৌঁছে জোসেলিন মওদুদের বাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম হন। মুসলিম বাহিনীর অনেক সৈন্য হতাহত হয়। সম্ভবত মওদুদ তার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা অনুমান করতে ভুল করেছিলেন এবং অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়েই বিরাট সংখ্যক ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়তে অগ্রসর হয়েছিলেন।
হৃদয়ে পরাজয়ের ক্ষত নিয়েই মওদুদ দ্রুত এডেসায় ফিরে আসেন এবং এডেসা অবরোধ করে রাখা সৈন্যদের সঙ্গে মিলিত হন।
সারুজে যখন যুদ্ধ চলছিল, এদিকে এডেসা অবরোধকারী মুসলিম বাহিনী তখন এডেসার অভ্যন্তরে বসবাসকারী আর্মেনীয়দের সঙ্গে গোপনে সমঝোতা চুক্তি করতে সক্ষম হয়েছিল! চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তারা এডেসা নগরীর পূর্ব অংশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গের নিয়ন্ত্রণ মুসলমানদের হাতে তুলে দেয়। মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা সেদিক দিয়ে এডেসার অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে শুরু করে। এ সময়ই মওদুদ সারুজ থেকে ফিরে আসেন এবং তার সৈন্যদের নিয়ে দ্রুত এডেসার পতন প্রচেষ্টায় শরিক হন। তবে জোসেলিন ঘটনাপ্রবাহ অনুমান করতে পেরে তার বাহিনী নিয়ে দ্রুত সারুজ থেকে এডেসায় চলে আসেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মওদুদ অনুভব করেন যে, অবশিষ্ট সৈন্যদের নিয়ে সমবেত ক্রুসেডারদের পরাভূত করা সম্ভব নয়। তাই তিনি মসুলে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এভাবেই মওদুদ রহ. হতাশ না হয়ে একের পর এক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত এডেসা-পতনক্ষণের তখনও বেশ দেরি ছিল!
জিহাদের এই সুকঠিন পথের চূড়ান্ত মনজিল হলো জান্নাত। প্রত্যাশিত ফলাফল নয়; আপন সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ত্যাগই এখানে মুখ্য। উহুদ যুদ্ধের শহিদান নিহত হয়েছেন মুসলমানদের কঠিন এক দুর্যোগকালে! অথচ জান্নাতে তাদের মর্যাদা কত উঁচু! তারা অবস্থান করবেন সুরম্য প্রাসাদের সর্বোচ্চ স্তরে! হামজা বিন আবদুল মুত্তালিব হবেন জান্নাতে শহিদানের সর্দার! কারণ, তারা নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে আদায় করেছেন; অবহেলা বা শিথিলতা প্রদর্শন করেননি।
তবে মওদুদের গল্পের সমাপ্তি টানার আগে আমাদের জানতে হবে যে, এডেসায় কী এমন ঘটেছিল, যার কারণে খ্রিষ্টান হয়েও আর্মেনীয়রা মুসলমানদের সঙ্গে গোপনে পত্রবিনিময় করেছিল এবং তাদেরকে নগরীটিতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছিল। এ ঘটনা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের শাসনের তুলনায় ইসলামি শাসনকে হাজার গুণ সদয়, সহনীয় ও ন্যায়ানুগ বিবেচনা করেছিল। এ কারণেই তারা নিজেদের ধর্মীয় ভাইদের বলি দিয়ে মুসলমানদের সহায়তা করেছিল। ব্যক্তিবিশেষকে অর্থ বা অন্য কিছুর লোভ দেখিয়ে সুবিধা অর্জন করা হয়নি; বরং একটি জনগোষ্ঠীর সিংহভাগের উদ্যোগে এমনটি সংঘটিত হয়েছিল। নিঃসন্দেহে এটি ইসলামি শাসনব্যবস্থা মূল্যায়নের এক প্রকৃষ্ট দলিল।
স্বভাবতই এ তথ্যে মোটেও বিস্ময়ের কিছু নেই যে, মওদুদ চলে যাওয়ার পরই এডেসায় ক্রুসেডারদের পক্ষ থেকে আর্মেনীয়দের বিচারের জন্য নিপীড়নমূলক সামরিক আদালত স্থাপন করা হয়। এরপর যেমনটি প্রত্যাশিত ছিল, তেমনই ঘটে; আর্মেনীয়দের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারমূলক রায় প্রদান করা হয়, বহু মানুষকে হত্যা করা হয়, অন্যদেরকে নগর-ত্যাগে বাধ্য করা হয়। ফলে ক্রুসেডার-আর্মেনীয় সহাবস্থান চূড়ান্ত পর্যায়ের কঠিন হয়ে ওঠে। অবশ্য বছর চারেক পূর্বে ৫০১ হিজরি সনে (১১০৮ খ্রিষ্টাব্দে) বল্ডউইন ডি বুর্গ বন্দিদশা থেকে ফিরে আসার পর থেকেই আর্মেনীয়দের সঙ্গে তার সম্পর্ক অস্থিরতাপূর্ণ ছিল।
সুস্পষ্ট অনুমিত হচ্ছিল যে, এডেসা রাজ্যের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি দিনে দিনে জটিল হয়ে উঠছে। বল্ডউইন এ সময় তার চারপাশের সকলকেই সন্দেহের চোখে দেখতে থাকেন এবং আশঙ্কা করেন যে, তারা তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে মুসলমানদের সঙ্গে গোপনে মিত্রতা করছে। সন্দেহ-রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মানসিক ভারসাম্যই হারিয়ে ফেলেন এবং শেষ পর্যন্ত রাজ্যের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা জোসেলিনকেও সন্দেহ করতে শুরু করেন! জোসেলিনের অপরাধ, আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী তাকে পছন্দ করে! একপর্যায়ে তিনি জোসেলিনকে তিল-বাশিরের প্রশাসক পদ হতে বরখাস্ত করেন এবং তাকে রাজ্য থেকে বহিষ্কার করেন। অথচ বল্ডউইনের বন্দিত্বের সময় এবং পরবর্তীকালে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুদ্ধে এই জোসেলিন বল্ডউইনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, বল্ডউইনের অনুপস্থিতিতে এডেসা রাজ্যের শান্তি-নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করেছেন এবং সবশেষে মওদুদের বাহিনীকে পরাজিত করেছেন। কিন্তু এসবের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে বল্ডউইন তাকে পদচ্যুত করেন। বিতাড়িত জোসেলিন বাইতুল মুকাদ্দাসের অধিপতি ১ম বল্ডউইনের কাছে চলে গেলে তিনি তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানান এবং তার ব্যাপক সামরিক দক্ষতা কাজে লাগাতে তাকে তাবারিয়া ও জালিল অঞ্চলের জায়গির প্রদান করেন।
৫০৫ হিজরি সনে (১ ১১২ খ্রিষ্টাব্দে) মওদুদের অভিযান আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থ হলেও মূলত একে কেন্দ্র করেই এডেসার অভ্যন্তরে ব্যাপক পরিসরে গোলযোগ সৃষ্টি হয় এবং পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। উপরি পাওনা হিসেবে ছিল এডেসাকেন্দ্রিক সংঘাতের ক্ষেত্র থেকে কঠিন প্রতিপক্ষ জোসেলিনের বিদায়!
টিকাঃ
80. Stevenson: op. cit., p. 95.
৪১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৭, Matthieu d' Edesse, p. 100.
42. Matthieu d' Edesse, p. 101.
40. Michel Le Syrien, III, p. 196.
৪৪. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'সকল শহিদদের সর্দার হবেন হামজা বিন আবদুল মুত্তালিব।' তাবারানি, আল-মুজামুল আওসাত, ৪/২৩৮ ও হাকিম, আল-মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন, হাদিস নং ২৫৫৭। [অনুবাদক]
45. Matthieu d' Edesse, pp. 104-106.
46. Runciman: op. cit., 11,p. 124.
47. Runciman: op. cit., 11,p. 124.
📄 ক্রুসেডারদের দ্বিতীয় প্রজন্ম
মওদুদের গল্পে ফেরার আগে আমরা একই বছর সংঘটিত কেন্দ্রীয় ঘটনাপ্রবাহ হতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আলোচনা করব। ৫০৬ হিজরি সনেই (১১১২ খ্রিষ্টাব্দের ১২ ডিসেম্বর) এন্টিয়কের শাসক টেনক্রেড মৃত্যুবরণ করেন। মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রচণ্ড ধূর্ত ও হিংস্র টেনক্রেডের প্রয়াণ ছিল ক্রুসেড শিবিরের জন্য বিরাট ক্ষতি। টেনক্রেডকেই এন্টিয়ক রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা গণ্য করা হয়। তার মামা ও এন্টিয়কের প্রথম শাসক বোহেমন্ড বন্দি থাকা অবস্থায় তিনি তিন বছর রাজ্যটির ভারপ্রাপ্ত শাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আর বোহেমন্ড ইতালিতে চলে যাওয়ার পর এন্টিয়কের শাসনকার্য পরিচালনা করেন দীর্ঘ আট বছর। কেবল মুসলমানদের বিরুদ্ধেই নয়; বাইজান্টাইনদের বিরুদ্ধেও তিনি ছিলেন প্রচণ্ড উদ্যমী। তার প্রচেষ্টাতেই মূলত এন্টিয়ক একটি মজবুত স্থায়ী অবস্থানে পৌঁছতে সক্ষম হয়।
যেহেতু টেনক্রেডের বৈধ কোনো উত্তরাধিকারী ছিল না, তাই মৃত্যুশয্যায় তিনি আরেক চরম শয়তান রজার সালের্নো (Roger of Salerno)-কে তার স্থলাভিষিক্ত করে যান। ধূর্ততা ও হিংস্রতা উভয় ক্ষেত্রেই রজার ছিলেন টেনক্রেডের স্বার্থক উত্তরসূরি। তিনি ছিলেন এডেসা রাজ্যের শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গের ভগ্নিপতি। রজারের দায়িত্বগ্রহণের মধ্য দিয়ে তাই এন্টিয়ক-এডেসা সম্পর্ক মজবুত হওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়।
রজারকে দায়িত্ব প্রদানের সময় টেনক্রেড এই শর্ত আরোপ করেন যে, ক্রুসেড রাজ্য এন্টিয়কের প্রথম শাসক বোহেমন্ডের পুত্র যখন পরিণত বয়সে উপনীত হবেন, তখন রজার তার হাতে রাজ্যের শাসনক্ষমতা তুলে দিতে বাধ্য থাকবেন। বোহেমন্ড-পুত্রের বয়স তখন মাত্র দুই বছর। পরবর্তীকালে ২য় বোহেমন্ড নামে পরিচিতি লাভকারী শিশুটি এ সময় ইতালিতে প্রতিপালিত হচ্ছিল। দায়িত্ব পালনকালে রজার সালের্নো এন্টিয়কের প্রতি সম্বন্ধিত হয়ে 'রজার অফ এন্টিয়ক' এবং নিজ জন্মভূমি সিসিলির প্রতি সম্বন্ধিত হয়ে 'রজার অফ সিসিলি' নামেও পরিচিতি লাভ করেন।
এ বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য যে, টেনক্রেডের মৃত্যুর কিছুদিন পরই ৫০৬ হিজরি সনে (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের শুরুতে) ত্রিপোলির শাসক বারট্রামও মৃত্যুবরণ করেন। ত্রিপোলির শাসক পদে বারট্রামের স্থলাভিষিক্ত হন তার পুত্র পন্স (Pons)। এভাবেই শাম অঞ্চলের দুই ক্রুসেড রাজ্যে ক্রুসেডারদের দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতৃত্বের সূচনা হয়।
টিকাঃ
৪৮. Foucher de Chartres, p. 425.
৪৯. Stevenson: op. cit., p. 106.
৪৯. Matthieu d' Edesse, pp.281, 282 & Setton: op, cit., p. 401.
৫০. উসামা বিন মুনকিয, আল ই'তিবার, পৃষ্ঠা : ১১৮।
>. Runciman: op. cit., 11,p. 126 & Grousset: Hist. des. Croisades 1,p.pp. 482-483.
52. Guillaume de Tyr, р. 483.
**. King: The Kingths Hospitallers In the Holy land, p. 36.
মওদুদের গল্পে ফেরার আগে আমরা একই বছর সংঘটিত কেন্দ্রীয় ঘটনাপ্রবাহ হতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আলোচনা করব। ৫০৬ হিজরি সনেই (১১১২ খ্রিষ্টাব্দের ১২ ডিসেম্বর) এন্টিয়কের শাসক টেনক্রেড মৃত্যুবরণ করেন। মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রচণ্ড ধূর্ত ও হিংস্র টেনক্রেডের প্রয়াণ ছিল ক্রুসেড শিবিরের জন্য বিরাট ক্ষতি। টেনক্রেডকেই এন্টিয়ক রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা গণ্য করা হয়। তার মামা ও এন্টিয়কের প্রথম শাসক বোহেমন্ড বন্দি থাকা অবস্থায় তিনি তিন বছর রাজ্যটির ভারপ্রাপ্ত শাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আর বোহেমন্ড ইতালিতে চলে যাওয়ার পর এন্টিয়কের শাসনকার্য পরিচালনা করেন দীর্ঘ আট বছর। কেবল মুসলমানদের বিরুদ্ধেই নয়; বাইজান্টাইনদের বিরুদ্ধেও তিনি ছিলেন প্রচণ্ড উদ্যমী। তার প্রচেষ্টাতেই মূলত এন্টিয়ক একটি মজবুত স্থায়ী অবস্থানে পৌঁছতে সক্ষম হয়।
যেহেতু টেনক্রেডের বৈধ কোনো উত্তরাধিকারী ছিল না, তাই মৃত্যুশয্যায় তিনি আরেক চরম শয়তান রজার সালের্নো (Roger of Salerno)-কে তার স্থলাভিষিক্ত করে যান। ধূর্ততা ও হিংস্রতা উভয় ক্ষেত্রেই রজার ছিলেন টেনক্রেডের স্বার্থক উত্তরসূরি। তিনি ছিলেন এডেসা রাজ্যের শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গের ভগ্নিপতি। রজারের দায়িত্বগ্রহণের মধ্য দিয়ে তাই এন্টিয়ক-এডেসা সম্পর্ক মজবুত হওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়।
রজারকে দায়িত্ব প্রদানের সময় টেনক্রেড এই শর্ত আরোপ করেন যে, ক্রুসেড রাজ্য এন্টিয়কের প্রথম শাসক বোহেমন্ডের পুত্র যখন পরিণত বয়সে উপনীত হবেন, তখন রজার তার হাতে রাজ্যের শাসনক্ষমতা তুলে দিতে বাধ্য থাকবেন। বোহেমন্ড-পুত্রের বয়স তখন মাত্র দুই বছর। পরবর্তীকালে ২য় বোহেমন্ড নামে পরিচিতি লাভকারী শিশুটি এ সময় ইতালিতে প্রতিপালিত হচ্ছিল। দায়িত্ব পালনকালে রজার সালের্নো এন্টিয়কের প্রতি সম্বন্ধিত হয়ে 'রজার অফ এন্টিয়ক' এবং নিজ জন্মভূমি সিসিলির প্রতি সম্বন্ধিত হয়ে 'রজার অফ সিসিলি' নামেও পরিচিতি লাভ করেন।
এ বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য যে, টেনক্রেডের মৃত্যুর কিছুদিন পরই ৫০৬ হিজরি সনে (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের শুরুতে) ত্রিপোলির শাসক বারট্রামও মৃত্যুবরণ করেন। ত্রিপোলির শাসক পদে বারট্রামের স্থলাভিষিক্ত হন তার পুত্র পন্স (Pons)। এভাবেই শাম অঞ্চলের দুই ক্রুসেড রাজ্যে ক্রুসেডারদের দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতৃত্বের সূচনা হয়।
টিকাঃ
৪৮. Foucher de Chartres, p. 425.
৪৯. Stevenson: op. cit., p. 106.
৪৯. Matthieu d' Edesse, pp.281, 282 & Setton: op, cit., p. 401.
৫০. উসামা বিন মুনকিয, আল ই'তিবার, পৃষ্ঠা : ১১৮।
>. Runciman: op. cit., 11,p. 126 & Grousset: Hist. des. Croisades 1,p.pp. 482-483.
52. Guillaume de Tyr, р. 483.
**. King: The Kingths Hospitallers In the Holy land, p. 36.
📄 সিন্নাবরার যুদ্ধ
নতুন করে আবারও মওদুদ রহ.-এর ইতিহাসে ফিরে আসছি। মওদুদ আবারও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে নতুন অভিযান শুরু করার প্রস্তুতি শুরু করেন। তিনি কেবল বের হওয়ার উপযুক্ত সুযোগের প্রতীক্ষা করছিলেন। মওদুদের দৃষ্টি নির্দিষ্ট কোনো ক্রুসেড রাজ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তার লক্ষ্য ছিল, নির্দিষ্ট কোনো এলাকা নয়; বরং পুরো অধিকৃত অঞ্চলকে ক্রুসেডারদের হাত থেকে উদ্ধার করা। এরই মধ্যে ৫০৬ হিজরি সনের শেষ দিকে (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) দামেশকের আমির তুগতেকিন মওদুদের কাছে সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন। তিনি এ সময় বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক ১ম বল্ডউইনের পক্ষ থেকে হামলার আশঙ্কা করছিলেন।
তুগতেকিন মূলত বিভিন্ন ক্ষেত্রেই ১ম বল্ডউইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। বিশেষ করে লেবানন অঞ্চলের সুর নগরীকে কেন্দ্র করে উভয়ের দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছেছিল। লেবানন অঞ্চলে সুর ছিল একমাত্র নগরী, যা তখনও ক্রুসেডারদের দখলদারিত্বের শিকার হয়নি। বিষয়টি বল্ডউইনের নজরে ছিল। তিনি এ সময় নগরীটির পতন ঘটাতে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। আক্রান্ত নগরবাসী তুগতেকিনের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করলে তিনি তার বাহিনীর একটি অংশ নিয়ে অগ্রসর হন এবং বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে নগরীটির প্রতিরক্ষা করতে সক্ষম হন। তিনি এ সময় সুরবাসীকে বলেন, 'আমি সম্পদ বা কোনো দুর্গের কর্তৃত্ব লাভের আশায় নয়; একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় এখানে এসেছি। ভবিষ্যতেও যখনই শত্রুপক্ষ তোমাদের ওপর আক্রমণ করবে, আমি নিজে আমার সৈন্যদের নিয়ে তোমাদের সাহায্যার্থে চলে আসব। ইতিহাসের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তার এই বক্তব্যের সত্যায়ন করে। পরবর্তী সময়ে তিনি সুরবাসীর কাছে এই সাহায্যের কোনো বিনিময় দাবি করেননি।
তুগতেকিনের এই স্বপ্রণোদিত সহায়তা বল্ডউইনকে বেশ বিক্ষুব্ধ করে তোলে। তিনি এর প্রতিশোধ নিতে দামেশকের দক্ষিণে অবস্থিত বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালাতে শুরু করেন। এই অভিযানে তিনি তাবারিয়া ও জালিল অঞ্চলের নতুন উদ্যমী প্রশাসক জোসেলিনের নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে কাজে লাগান। এতটুকুতেই ক্ষান্ত না হয়ে বল্ডউইন এরপর কায়রোগামী দামেশকের বিভিন্ন কাফেলার ওপর হামলা চালাতে শুরু করেন। কাফেলাগুলো যদিও বাইতুল মুকাদ্দাসের ক্রুসেডারদের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য উপকূলীয় পথ ছেড়ে অনেকটা ভেতর দিয়ে পথ চলত; কিন্তু বল্ডউইন তাদের নাগাল পেতে মৃত সাগরের দক্ষিণে ওয়াদিয়ে মুসা অঞ্চলে ওত পেতে থাকতেন। তিনি বণিক কাফেলার ওপর হামলা চালিয়ে বাণিজ্যপণ্য ও অন্যান্য সম্পদ ছিনিয়ে নিতেন এবং বণিকদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালাতেন। বল্ডউইনের প্রতিশোধস্পৃহা এরপরও চরিতার্থ হয়নি। বরং ক্রুসেডারদের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও প্রস্তুতি দেখে তুগতেকিন অনুভব করেন যে, তারা সম্ভবত দামেশকের দক্ষিণাঞ্চলে বা খোদ দামেশক নগরীতেই বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করছে। এ কারনেই বাধ্য হয়ে তিনি এ অঞ্চলের প্রকৃত নেতা মসুলের আমির মওদুদ বিন তুনতেকিনের কাছে সহায়তা কামনা করেন।
মওদুদ ভেবে দেখেন, ঝুঁকিপূর্ণ হলেও এটি ক্রুসেডারদের পরাভূত করার একটি অনুকূল সুযোগ। ঝুঁকির কারণ হলো, এক্ষেত্রে তাকে মসুল থেকে অনেক দূরে দামেশক রাজ্যের গভীরতম অঞ্চলে গিয়ে লড়াই করতে হবে। সম্ভবত প্রতিপক্ষের সঙ্গে মোকাবিলা হবে দামেশকের দক্ষিণ অঞ্চলে, যা মসুল থেকে এক হাজার কিলোমিটারেরও অধিক দূরত্বে অবস্থিত। তা ছাড়া তাকে লড়তে হবে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ক্রুসেড রাজ্য বাইতুল মুকাদ্দাসের বাহিনীর সঙ্গে। তদুপরি এ আশঙ্কাও আছে যে, এন্টিয়ক ও এডেসার ক্রুসেডাররা তার ফেরার পথ আটকে দেবে। তখন তো তিনি আরও জটিলতর পরিস্থিতির সম্মুখীন হবেন। এত সব ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও মওদুদ তুগতেকিনের আহ্বানে দ্বিধাহীন চিত্তে সাড়া দেন এবং যে মাসে তুগতেকিনের বার্তা মসুলে পৌঁছায় সে মাসেই অর্থাৎ ৫০৬ হিজরি সনের শেষ দিকে (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) তার বাহিনী নিয়ে দামেশক অভিমুখে রওনা হন।
দামেশকের পথে রওনা হওয়ার পর যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি মওদুদের চিন্তাজগৎকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, তা হলো—কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পরই তাকে ক্রুসেড রাজ্য এডেসার দক্ষিণ অংশ পাড়ি দিতে হবে বা নিদেনপক্ষে রাজ্যটির কোনো না কোনো অংশ অতিক্রম করতে হবে। সেক্ষেত্রে নিশ্চিত করেই রাজ্যটির ক্রুসেড শক্তি তার ওপর হামলে পড়বে। যেহেতু তিনি বেশ কয়েকবার এডেসায় অভিযান চালিয়েছেন এবং এডেসা নগরী অবরোধ করেছেন, তাই রাজ্যটির সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের উত্তেজনাপূর্ণ। কিন্তু আল্লাহ তাআলা এই মহান মুজাহিদের দুশ্চিন্তা দূর করে দেন এবং তার যাত্রাপথ সুগম করে দেন।
এডেসা রাজ্যের অভ্যন্তরে সংঘটিত কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ক্রুসেডাররা এ সময় নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যে মাসে মওদুদ মসুল থেকে দামেশকের উদ্দেশে রওনা হন, সে মাসেই অর্থাৎ ১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে রাজ্যটিতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, আর্মেনীয়রা ক্রুসেডারদের শাসন থেকে মুক্তি পেতে নতুন করে মুসলমানদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। বিষয়টি সত্য হোক বা মিথ্যা; এর প্রতিক্রিয়ায় বল্ডউইন ডি বুর্গ চূড়ান্ত পর্যায়ের আগ্রাসী হয়ে ওঠেন। তার নির্দেশে এডেসার ক্রুসেডার বাহিনী কোনো প্রকার বাছবিচার ব্যতিরেকে ঘৃণ্য জাতিগত নির্মূল অভিযান শুরু করে। প্রথমে তারা নিরস্ত্র আর্মেনীয়দের নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে। এরপর এডেসার নগরদ্বারসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং বেঁচে থাকা অবশিষ্ট আর্মেনীয়দের নগরী ছেড়ে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। যারা তখনও বেঁচে ছিল, তাদের অনেকে নিজেদের ঘরবাড়ি, সহায়সম্পত্তি সব ছেড়ে অনিশ্চিত গন্তব্যের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ে; আবার অনেকে নিজেদের বাড়িতেই থেকে যায়। এরপর ক্রুসেডাররা তাদের ঘরে ঘরে প্রবেশ করে লুটপাট করে, তারপর আর্মেনীয়দের ভেতরে রেখেই ঘরগুলো জ্বালিয়ে দেয়। আর্মেনীয় ঐতিহাসিক 'ম্যাথিউ ডি এডেসা'র বর্ণনামতে এই জাতিগত নির্মূল অভিযানের সবচেয়ে বীভৎসতম দিন ছিল ১৩ মে। সেদিন আক্ষরিক অর্থেই নগরীটিতে গণহত্যা চালানো হয়। আর্মেনীয়দের সামগ্রিক ইতিহাসে দিনটি 'কালো দিবস' হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ম্যাথিউর বর্ণনামতে সেদিন পরিস্থিতি এত ভয়াবহ ছিল যে, পিতা তার সন্তানকে চিনতে পারছিল না, সন্তান চিনতে পারছিল না পিতাকে। প্রত্যেকেই কোনোমতে জান-হাতে-নিয়ে পালানোর চেষ্টায় ছিল। নির্বিচারে সকল আর্মেনীয় নাগরিককে হত্যা বা বিতাড়িত করার পরই কেবল এই ধ্বংসযজ্ঞ থামে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এডেসা রাজ্যের সামরিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা-পরিস্থিতি পুরোপুরি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এ কারণে বল্ডউইন ডি বুর্গ মওদুদের বাহিনীর গতিরোধ বা ফিরতি পথে বাধা প্রদানের চিন্তাও করতে পারেননি। নিঃসন্দেহে এটি ছিল সত্যিকারের মুমিন ও মহান মুজাহিদ মওদুদ বিন তুনতেকিনের জন্য রাব্বে কারিমের পক্ষ থেকে এক আসমানি তদবির ও অদৃষ্ট ব্যবস্থাপনা!
যদিও ইতিপূর্বে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযানে শরিক মুসলিম রাজন্যবর্গ মওদুদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, তবুও ঐক্য-নীতির ধারক মওদুদ সবাইকে এক পতাকাতলে সমবেত করে একতার শক্তি অর্জনের লক্ষ্যে নতুন করে রাজন্যবর্গকে একজোট হওয়ার আহ্বান জানান। তার এবারের আহ্বানে সাড়া দেন উত্তর ইরাকের দিয়ারে বকর অঞ্চলের সিনজার রাজ্যের আমির কুমাইরুক এবং মারদিনের আমির ইয়াজ বিন ইলগাজি। আর স্বভাবতই মওদুদকে যিনি আহ্বান জানিয়েছিলেন, সেই দামেশকের আমির তুগতেকিন তো ছিলেনই।
সেলজুক বাহিনীগুলো হামা নগরীর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত সালামিয়া (Salamiyah) নগরীর কাছে একত্র হয়। এরপর সম্মিলিত মুসলিম বাহিনী সরাসরি তাবারিয়া নগরী অভিমুখে অগ্রসর হয়। ফিলিস্তিন অঞ্চলের বিখ্যাত তাবারিয়া হ্রদ (The Sea of Galilee)-এর পাশে অবস্থিত নগরীটির নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত মজবুত। তাবারিয়ায় মওদুদের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত বাহিনীর সঙ্গে তুগতেকিনের বাহিনীও মিলিত হয়। মুসলিম বাহিনী দ্রুত তাবারিয়া অবরোধ করলেও সুরক্ষিত নিরাপত্তার কারণে নগরীটির পতন ঘটানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাই মুসলিম বাহিনী সেখান থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করে আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করতে থাকে এবং বিপুল পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি ক্রুসেডারদের দখল থেকে বিভিন্ন এলাকা পুনরুদ্ধার করে। এভাবে অভিযান অব্যাহত রেখে মুসলিম বাহিনী একসময় তুর পাহাড়ের কাছে পৌঁছায়।
মুসলিম বাহিনীর তৎপরতার সংবাদ দ্রুত বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক ১ম বল্ডউইনের কাছে পৌঁছে যায়। পরিস্থিতির নাজুকতা উপলব্ধি করে তিনি দ্রুত সবগুলো ক্রুসেড রাজ্যে সাহায্য চেয়ে বার্তা প্রেরণ করেন।
এন্টিয়কের নতুন শাসক রজার ও ত্রিপোলির নতুন শাসক পন্স তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে তাবারিয়া অভিমুখে রওনা হয়ে যান। তবে এডেসার শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গ নিজ রাজ্যের অভ্যন্তরীণ গোলযোগের কারণে অভিযানে যোগ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
সাহায্য চেয়ে বার্তা প্রেরণ করলেও উত্তর থেকে আগত মুসলিম বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করার সুযোগ বল্ডউইনের ছিল না। তিনি আশঙ্কা করছিলেন যে, দেরি করলে মুসলিম বাহিনী তার রাজ্যে ঢুকে পড়বে। সেক্ষেত্রে আল-কুদসে ক্রুসেডারদের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে যাবে। কারণ আসকালান তখনও উবায়দিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আর তাই মুসলিম বাহিনী তার রাজ্যে প্রবেশ করতে পারলে আল-কুদস দু-দিক থেকে সেলজুক ও উবায়দি বাহিনী দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে। এসব দিক বিবেচনা করে অন্যান্য বাহিনীর অপেক্ষা না করেই বল্ডউইন দ্রুত নিজ বাহিনী নিয়ে উত্তরে তাবারিয়া অভিমুখে অগ্রসর হন।
দক্ষিণ দিক থেকে ক্রুসেডার বাহিনীর অগ্রসর হওয়ার সংবাদ পেয়ে মওদুদ দ্রুত লড়াইয়ের জন্য একটি উপযুক্ত স্থান সন্ধান করেন। তিনি তাবারিয়া হ্রদের দক্ষিণে জর্ডান নদী ও ইয়ারমুক নদীর মাঝে অবস্থিত 'উকহুয়ানা' নামে পরিচিত উপদ্বীপ এলাকাকে আসন্ন যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত বিবেচনা করেন। এখানেই থেমে না থেকে এরপর তিনি তাবারিয়া হ্রদের দক্ষিণ-পশ্চিমে জর্ডান নদীর ওপর অবস্থিত সিন্নাবরা সেতুর কাছে বল্ডউইনের জন্য এক কঠিন ফাঁদ পাতেন।
আল্লাহর পাকের অনুগ্রহে ৫০৭ হিজরি সনের ১৩ মুহাররম (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের ২০ জুন) বল্ডউইন সিন্নাবরা সেতুর কাছে মওদুদের পাতা ফাঁদে পা দেন। এমনকি তিনি পৃষ্ঠদেশের নিরাপত্তার জন্য তার বাহিনীর কোনো অংশকে পেছনে মোতায়েন না করে চরম অসাবধানতার পরিচয় দেন। বল্ডউইন যেন তার দীর্ঘ জীবনে অর্জিত সকল রণকৌশল ও সামরিক নিয়মনীতিই ভুলে গিয়েছিলেন! তার এই আচরণের একটাই ব্যাখ্যা করা যেতে পারে—আল্লাহ তার দৃষ্টি অন্ধ করে দিয়েছিলেন!
সিন্নাবরা সেতুর কাছে প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইতিহাসে এ যুদ্ধ 'সিন্নাবরার যুদ্ধ' নামে খ্যাত। শুরুতেই প্রতিপক্ষকে হতচকিত করে দিয়ে হঠাৎ আক্রমণ যুদ্ধের গতিপথ মুসলমানদের পক্ষে নিয়ে আসতে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখে।
মালাতিয়া মারদিন আহলাত সুমাইসাত এডেসা মসুল হিরাক্লিয়া আদানা মপসুয়েসটিয়া মারআশ সিনজার আলবেরা ইসকানদারুন এন্টিয়ক মাআ'ররাতুন-নোমান তিল-বাশির লাতাকিয়া হাররান আলেপ্পো ইরবিল জাবালা বানিয়াস হামা ইরকা সালামিয়া ভূমধ্যসাগর ত্রিপোলি হিমস ব্যাবলস বালাবাকু তারতুস দামেশক সিডন বৈরুত সুর আড়া হাইফা কায়সারিয়া তাবারিয়া আম্মান আল-কুদস আরসুফ জাফা আসকালান গাজা রামলা কারাক শামের মরুঅঞ্চল ইরাক
মানচিত্র নং-২৪ সিন্নাবরার যুদ্ধ
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কিছু সময় অতিবাহিত না হতেই ক্রুসেডার বাহিনী পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে যায়। দুই হাজারের অধিক ক্রুসেড যোদ্ধা নিহত হয়। সেনাপতি বল্ডউইন তার বাহিনীর অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশকে হারানোর পর অনেক কষ্টে প্রাণ নিয়ে পালাতে সক্ষম হন। এ যুদ্ধে মুসলমানরা বিপুল পরিমাণ অশ্ব, যুদ্ধাস্ত্র ও অন্যান্য যুদ্ধলব্ধ সম্পদ লাভ করে। পূর্বের বছর এডেসা অভিযানে পরাজিত হয়ে সেনাপতি মওদুদ যে শিক্ষা পেয়েছিলেন, এদিন তিনি তার বদলা তুলে নেন। এ তথ্যটিও উল্লেখযোগ্য যে, সিন্নাবরার যুদ্ধেই ইতিহাস প্রথমবারের মতো প্রত্যক্ষ করে মওদুদের বাহিনীর এক নতুন ইসলামি তারকার সামরিক নিপুণতা ও রণদক্ষতা। নতুন উদিত এই তারকার নাম ইমাদুদ্দিন জিনকি। ইসলামি ইতিহাসের এই অনন্যসাধারণ সেনাপতি সিন্নাবরার যুদ্ধে বীরত্বের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন। ঐতিহাসিক ইবনুল আছির এ সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন,
“তিনি এ যুদ্ধে রণদক্ষতার চূড়ান্ত স্তরে উপনীত হয়েছিলেন!”
টিকাঃ
৫৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৯।
৫৫. সিবতু ইবনিল জাওযি, মিরআতুয-যামান, (৫০৬-৫০৮ হিজরি সনের ঘটনাবলি)।
৫৬. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২১৮ ও Albert d' Aix, p.693.
৫৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/ ১৪৯।
৫৮. প্রাগুক্ত, ৯/১৪৯।
৫৯. Grousset: Hist. des. Croisades 1, p. 490.
৬০. Matthieu d' Edesse, pp. 104-106.
৬১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৯।
৬২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৯ ও Albert d' Aix, p. 694.
৬৩. সিবতু ইবনিল জাওযি, মিরআতুয-যামান, পৃষ্ঠা: ৫৪৬-৫৪9।
৬৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৯।
৬৫. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৮৫।
**. Guillaume de Tyr, p. 486 Foucher de Chartres, p. 426.
৬৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৫৩।
নতুন করে আবারও মওদুদ রহ.-এর ইতিহাসে ফিরে আসছি। মওদুদ আবারও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে নতুন অভিযান শুরু করার প্রস্তুতি শুরু করেন। তিনি কেবল বের হওয়ার উপযুক্ত সুযোগের প্রতীক্ষা করছিলেন। মওদুদের দৃষ্টি নির্দিষ্ট কোনো ক্রুসেড রাজ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তার লক্ষ্য ছিল, নির্দিষ্ট কোনো এলাকা নয়; বরং পুরো অধিকৃত অঞ্চলকে ক্রুসেডারদের হাত থেকে উদ্ধার করা। এরই মধ্যে ৫০৬ হিজরি সনের শেষ দিকে (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) দামেশকের আমির তুগতেকিন মওদুদের কাছে সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন। তিনি এ সময় বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক ১ম বল্ডউইনের পক্ষ থেকে হামলার আশঙ্কা করছিলেন।
তুগতেকিন মূলত বিভিন্ন ক্ষেত্রেই ১ম বল্ডউইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। বিশেষ করে লেবানন অঞ্চলের সুর নগরীকে কেন্দ্র করে উভয়ের দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছেছিল। লেবানন অঞ্চলে সুর ছিল একমাত্র নগরী, যা তখনও ক্রুসেডারদের দখলদারিত্বের শিকার হয়নি। বিষয়টি বল্ডউইনের নজরে ছিল। তিনি এ সময় নগরীটির পতন ঘটাতে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। আক্রান্ত নগরবাসী তুগতেকিনের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করলে তিনি তার বাহিনীর একটি অংশ নিয়ে অগ্রসর হন এবং বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে নগরীটির প্রতিরক্ষা করতে সক্ষম হন। তিনি এ সময় সুরবাসীকে বলেন, 'আমি সম্পদ বা কোনো দুর্গের কর্তৃত্ব লাভের আশায় নয়; একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় এখানে এসেছি। ভবিষ্যতেও যখনই শত্রুপক্ষ তোমাদের ওপর আক্রমণ করবে, আমি নিজে আমার সৈন্যদের নিয়ে তোমাদের সাহায্যার্থে চলে আসব। ইতিহাসের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তার এই বক্তব্যের সত্যায়ন করে। পরবর্তী সময়ে তিনি সুরবাসীর কাছে এই সাহায্যের কোনো বিনিময় দাবি করেননি।
তুগতেকিনের এই স্বপ্রণোদিত সহায়তা বল্ডউইনকে বেশ বিক্ষুব্ধ করে তোলে। তিনি এর প্রতিশোধ নিতে দামেশকের দক্ষিণে অবস্থিত বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালাতে শুরু করেন। এই অভিযানে তিনি তাবারিয়া ও জালিল অঞ্চলের নতুন উদ্যমী প্রশাসক জোসেলিনের নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে কাজে লাগান। এতটুকুতেই ক্ষান্ত না হয়ে বল্ডউইন এরপর কায়রোগামী দামেশকের বিভিন্ন কাফেলার ওপর হামলা চালাতে শুরু করেন। কাফেলাগুলো যদিও বাইতুল মুকাদ্দাসের ক্রুসেডারদের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য উপকূলীয় পথ ছেড়ে অনেকটা ভেতর দিয়ে পথ চলত; কিন্তু বল্ডউইন তাদের নাগাল পেতে মৃত সাগরের দক্ষিণে ওয়াদিয়ে মুসা অঞ্চলে ওত পেতে থাকতেন। তিনি বণিক কাফেলার ওপর হামলা চালিয়ে বাণিজ্যপণ্য ও অন্যান্য সম্পদ ছিনিয়ে নিতেন এবং বণিকদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালাতেন। বল্ডউইনের প্রতিশোধস্পৃহা এরপরও চরিতার্থ হয়নি। বরং ক্রুসেডারদের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও প্রস্তুতি দেখে তুগতেকিন অনুভব করেন যে, তারা সম্ভবত দামেশকের দক্ষিণাঞ্চলে বা খোদ দামেশক নগরীতেই বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করছে। এ কারনেই বাধ্য হয়ে তিনি এ অঞ্চলের প্রকৃত নেতা মসুলের আমির মওদুদ বিন তুনতেকিনের কাছে সহায়তা কামনা করেন।
মওদুদ ভেবে দেখেন, ঝুঁকিপূর্ণ হলেও এটি ক্রুসেডারদের পরাভূত করার একটি অনুকূল সুযোগ। ঝুঁকির কারণ হলো, এক্ষেত্রে তাকে মসুল থেকে অনেক দূরে দামেশক রাজ্যের গভীরতম অঞ্চলে গিয়ে লড়াই করতে হবে। সম্ভবত প্রতিপক্ষের সঙ্গে মোকাবিলা হবে দামেশকের দক্ষিণ অঞ্চলে, যা মসুল থেকে এক হাজার কিলোমিটারেরও অধিক দূরত্বে অবস্থিত। তা ছাড়া তাকে লড়তে হবে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ক্রুসেড রাজ্য বাইতুল মুকাদ্দাসের বাহিনীর সঙ্গে। তদুপরি এ আশঙ্কাও আছে যে, এন্টিয়ক ও এডেসার ক্রুসেডাররা তার ফেরার পথ আটকে দেবে। তখন তো তিনি আরও জটিলতর পরিস্থিতির সম্মুখীন হবেন। এত সব ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও মওদুদ তুগতেকিনের আহ্বানে দ্বিধাহীন চিত্তে সাড়া দেন এবং যে মাসে তুগতেকিনের বার্তা মসুলে পৌঁছায় সে মাসেই অর্থাৎ ৫০৬ হিজরি সনের শেষ দিকে (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) তার বাহিনী নিয়ে দামেশক অভিমুখে রওনা হন।
দামেশকের পথে রওনা হওয়ার পর যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি মওদুদের চিন্তাজগৎকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, তা হলো—কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পরই তাকে ক্রুসেড রাজ্য এডেসার দক্ষিণ অংশ পাড়ি দিতে হবে বা নিদেনপক্ষে রাজ্যটির কোনো না কোনো অংশ অতিক্রম করতে হবে। সেক্ষেত্রে নিশ্চিত করেই রাজ্যটির ক্রুসেড শক্তি তার ওপর হামলে পড়বে। যেহেতু তিনি বেশ কয়েকবার এডেসায় অভিযান চালিয়েছেন এবং এডেসা নগরী অবরোধ করেছেন, তাই রাজ্যটির সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের উত্তেজনাপূর্ণ। কিন্তু আল্লাহ তাআলা এই মহান মুজাহিদের দুশ্চিন্তা দূর করে দেন এবং তার যাত্রাপথ সুগম করে দেন।
এডেসা রাজ্যের অভ্যন্তরে সংঘটিত কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ক্রুসেডাররা এ সময় নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যে মাসে মওদুদ মসুল থেকে দামেশকের উদ্দেশে রওনা হন, সে মাসেই অর্থাৎ ১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে রাজ্যটিতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, আর্মেনীয়রা ক্রুসেডারদের শাসন থেকে মুক্তি পেতে নতুন করে মুসলমানদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। বিষয়টি সত্য হোক বা মিথ্যা; এর প্রতিক্রিয়ায় বল্ডউইন ডি বুর্গ চূড়ান্ত পর্যায়ের আগ্রাসী হয়ে ওঠেন। তার নির্দেশে এডেসার ক্রুসেডার বাহিনী কোনো প্রকার বাছবিচার ব্যতিরেকে ঘৃণ্য জাতিগত নির্মূল অভিযান শুরু করে। প্রথমে তারা নিরস্ত্র আর্মেনীয়দের নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে। এরপর এডেসার নগরদ্বারসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং বেঁচে থাকা অবশিষ্ট আর্মেনীয়দের নগরী ছেড়ে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। যারা তখনও বেঁচে ছিল, তাদের অনেকে নিজেদের ঘরবাড়ি, সহায়সম্পত্তি সব ছেড়ে অনিশ্চিত গন্তব্যের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ে; আবার অনেকে নিজেদের বাড়িতেই থেকে যায়। এরপর ক্রুসেডাররা তাদের ঘরে ঘরে প্রবেশ করে লুটপাট করে, তারপর আর্মেনীয়দের ভেতরে রেখেই ঘরগুলো জ্বালিয়ে দেয়। আর্মেনীয় ঐতিহাসিক 'ম্যাথিউ ডি এডেসা'র বর্ণনামতে এই জাতিগত নির্মূল অভিযানের সবচেয়ে বীভৎসতম দিন ছিল ১৩ মে। সেদিন আক্ষরিক অর্থেই নগরীটিতে গণহত্যা চালানো হয়। আর্মেনীয়দের সামগ্রিক ইতিহাসে দিনটি 'কালো দিবস' হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ম্যাথিউর বর্ণনামতে সেদিন পরিস্থিতি এত ভয়াবহ ছিল যে, পিতা তার সন্তানকে চিনতে পারছিল না, সন্তান চিনতে পারছিল না পিতাকে। প্রত্যেকেই কোনোমতে জান-হাতে-নিয়ে পালানোর চেষ্টায় ছিল। নির্বিচারে সকল আর্মেনীয় নাগরিককে হত্যা বা বিতাড়িত করার পরই কেবল এই ধ্বংসযজ্ঞ থামে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এডেসা রাজ্যের সামরিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা-পরিস্থিতি পুরোপুরি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এ কারণে বল্ডউইন ডি বুর্গ মওদুদের বাহিনীর গতিরোধ বা ফিরতি পথে বাধা প্রদানের চিন্তাও করতে পারেননি। নিঃসন্দেহে এটি ছিল সত্যিকারের মুমিন ও মহান মুজাহিদ মওদুদ বিন তুনতেকিনের জন্য রাব্বে কারিমের পক্ষ থেকে এক আসমানি তদবির ও অদৃষ্ট ব্যবস্থাপনা!
যদিও ইতিপূর্বে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযানে শরিক মুসলিম রাজন্যবর্গ মওদুদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, তবুও ঐক্য-নীতির ধারক মওদুদ সবাইকে এক পতাকাতলে সমবেত করে একতার শক্তি অর্জনের লক্ষ্যে নতুন করে রাজন্যবর্গকে একজোট হওয়ার আহ্বান জানান। তার এবারের আহ্বানে সাড়া দেন উত্তর ইরাকের দিয়ারে বকর অঞ্চলের সিনজার রাজ্যের আমির কুমাইরুক এবং মারদিনের আমির ইয়াজ বিন ইলগাজি। আর স্বভাবতই মওদুদকে যিনি আহ্বান জানিয়েছিলেন, সেই দামেশকের আমির তুগতেকিন তো ছিলেনই।
সেলজুক বাহিনীগুলো হামা নগরীর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত সালামিয়া (Salamiyah) নগরীর কাছে একত্র হয়। এরপর সম্মিলিত মুসলিম বাহিনী সরাসরি তাবারিয়া নগরী অভিমুখে অগ্রসর হয়। ফিলিস্তিন অঞ্চলের বিখ্যাত তাবারিয়া হ্রদ (The Sea of Galilee)-এর পাশে অবস্থিত নগরীটির নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত মজবুত। তাবারিয়ায় মওদুদের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত বাহিনীর সঙ্গে তুগতেকিনের বাহিনীও মিলিত হয়। মুসলিম বাহিনী দ্রুত তাবারিয়া অবরোধ করলেও সুরক্ষিত নিরাপত্তার কারণে নগরীটির পতন ঘটানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাই মুসলিম বাহিনী সেখান থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করে আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করতে থাকে এবং বিপুল পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি ক্রুসেডারদের দখল থেকে বিভিন্ন এলাকা পুনরুদ্ধার করে। এভাবে অভিযান অব্যাহত রেখে মুসলিম বাহিনী একসময় তুর পাহাড়ের কাছে পৌঁছায়।
মুসলিম বাহিনীর তৎপরতার সংবাদ দ্রুত বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক ১ম বল্ডউইনের কাছে পৌঁছে যায়। পরিস্থিতির নাজুকতা উপলব্ধি করে তিনি দ্রুত সবগুলো ক্রুসেড রাজ্যে সাহায্য চেয়ে বার্তা প্রেরণ করেন।
এন্টিয়কের নতুন শাসক রজার ও ত্রিপোলির নতুন শাসক পন্স তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে তাবারিয়া অভিমুখে রওনা হয়ে যান। তবে এডেসার শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গ নিজ রাজ্যের অভ্যন্তরীণ গোলযোগের কারণে অভিযানে যোগ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
সাহায্য চেয়ে বার্তা প্রেরণ করলেও উত্তর থেকে আগত মুসলিম বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করার সুযোগ বল্ডউইনের ছিল না। তিনি আশঙ্কা করছিলেন যে, দেরি করলে মুসলিম বাহিনী তার রাজ্যে ঢুকে পড়বে। সেক্ষেত্রে আল-কুদসে ক্রুসেডারদের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে যাবে। কারণ আসকালান তখনও উবায়দিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আর তাই মুসলিম বাহিনী তার রাজ্যে প্রবেশ করতে পারলে আল-কুদস দু-দিক থেকে সেলজুক ও উবায়দি বাহিনী দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে। এসব দিক বিবেচনা করে অন্যান্য বাহিনীর অপেক্ষা না করেই বল্ডউইন দ্রুত নিজ বাহিনী নিয়ে উত্তরে তাবারিয়া অভিমুখে অগ্রসর হন।
দক্ষিণ দিক থেকে ক্রুসেডার বাহিনীর অগ্রসর হওয়ার সংবাদ পেয়ে মওদুদ দ্রুত লড়াইয়ের জন্য একটি উপযুক্ত স্থান সন্ধান করেন। তিনি তাবারিয়া হ্রদের দক্ষিণে জর্ডান নদী ও ইয়ারমুক নদীর মাঝে অবস্থিত 'উকহুয়ানা' নামে পরিচিত উপদ্বীপ এলাকাকে আসন্ন যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত বিবেচনা করেন। এখানেই থেমে না থেকে এরপর তিনি তাবারিয়া হ্রদের দক্ষিণ-পশ্চিমে জর্ডান নদীর ওপর অবস্থিত সিন্নাবরা সেতুর কাছে বল্ডউইনের জন্য এক কঠিন ফাঁদ পাতেন।
আল্লাহর পাকের অনুগ্রহে ৫০৭ হিজরি সনের ১৩ মুহাররম (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দের ২০ জুন) বল্ডউইন সিন্নাবরা সেতুর কাছে মওদুদের পাতা ফাঁদে পা দেন। এমনকি তিনি পৃষ্ঠদেশের নিরাপত্তার জন্য তার বাহিনীর কোনো অংশকে পেছনে মোতায়েন না করে চরম অসাবধানতার পরিচয় দেন। বল্ডউইন যেন তার দীর্ঘ জীবনে অর্জিত সকল রণকৌশল ও সামরিক নিয়মনীতিই ভুলে গিয়েছিলেন! তার এই আচরণের একটাই ব্যাখ্যা করা যেতে পারে—আল্লাহ তার দৃষ্টি অন্ধ করে দিয়েছিলেন!
সিন্নাবরা সেতুর কাছে প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইতিহাসে এ যুদ্ধ 'সিন্নাবরার যুদ্ধ' নামে খ্যাত। শুরুতেই প্রতিপক্ষকে হতচকিত করে দিয়ে হঠাৎ আক্রমণ যুদ্ধের গতিপথ মুসলমানদের পক্ষে নিয়ে আসতে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখে।
মালাতিয়া মারদিন আহলাত সুমাইসাত এডেসা মসুল হিরাক্লিয়া আদানা মপসুয়েসটিয়া মারআশ সিনজার আলবেরা ইসকানদারুন এন্টিয়ক মাআ'ররাতুন-নোমান তিল-বাশির লাতাকিয়া হাররান আলেপ্পো ইরবিল জাবালা বানিয়াস হামা ইরকা সালামিয়া ভূমধ্যসাগর ত্রিপোলি হিমস ব্যাবলস বালাবাকু তারতুস দামেশক সিডন বৈরুত সুর আড়া হাইফা কায়সারিয়া তাবারিয়া আম্মান আল-কুদস আরসুফ জাফা আসকালান গাজা রামলা কারাক শামের মরুঅঞ্চল ইরাক
মানচিত্র নং-২৪ সিন্নাবরার যুদ্ধ
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কিছু সময় অতিবাহিত না হতেই ক্রুসেডার বাহিনী পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে যায়। দুই হাজারের অধিক ক্রুসেড যোদ্ধা নিহত হয়। সেনাপতি বল্ডউইন তার বাহিনীর অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশকে হারানোর পর অনেক কষ্টে প্রাণ নিয়ে পালাতে সক্ষম হন। এ যুদ্ধে মুসলমানরা বিপুল পরিমাণ অশ্ব, যুদ্ধাস্ত্র ও অন্যান্য যুদ্ধলব্ধ সম্পদ লাভ করে। পূর্বের বছর এডেসা অভিযানে পরাজিত হয়ে সেনাপতি মওদুদ যে শিক্ষা পেয়েছিলেন, এদিন তিনি তার বদলা তুলে নেন। এ তথ্যটিও উল্লেখযোগ্য যে, সিন্নাবরার যুদ্ধেই ইতিহাস প্রথমবারের মতো প্রত্যক্ষ করে মওদুদের বাহিনীর এক নতুন ইসলামি তারকার সামরিক নিপুণতা ও রণদক্ষতা। নতুন উদিত এই তারকার নাম ইমাদুদ্দিন জিনকি। ইসলামি ইতিহাসের এই অনন্যসাধারণ সেনাপতি সিন্নাবরার যুদ্ধে বীরত্বের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন। ঐতিহাসিক ইবনুল আছির এ সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন,
“তিনি এ যুদ্ধে রণদক্ষতার চূড়ান্ত স্তরে উপনীত হয়েছিলেন!”
টিকাঃ
৫৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৯।
৫৫. সিবতু ইবনিল জাওযি, মিরআতুয-যামান, (৫০৬-৫০৮ হিজরি সনের ঘটনাবলি)।
৫৬. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২১৮ ও Albert d' Aix, p.693.
৫৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/ ১৪৯।
৫৮. প্রাগুক্ত, ৯/১৪৯।
৫৯. Grousset: Hist. des. Croisades 1, p. 490.
৬০. Matthieu d' Edesse, pp. 104-106.
৬১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৯।
৬২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৯ ও Albert d' Aix, p. 694.
৬৩. সিবতু ইবনিল জাওযি, মিরআতুয-যামান, পৃষ্ঠা: ৫৪৬-৫৪9।
৬৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৯।
৬৫. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৮৫।
**. Guillaume de Tyr, p. 486 Foucher de Chartres, p. 426.
৬৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৫৩।