📄 গণজাগরণ!
এই অভিযানের পর বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিম জনসাধারণ ভাবতে শুরু করে যে, আশা এখনো ফুরিয়ে যায়নি; বেদনাদায়ক এ বর্তমানের পরিবর্তন ঘটানো এখনো সম্ভব। একই সঙ্গে তারা অনুভব করে যে, ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মূলত মওদুদ একাই করছেন; তাকে সহায়তাকারী বাহিনীগুলো মোটেও তার সঙ্গে তুল্য নয়। এ সময় জাতির নিষ্ঠাবান ব্যক্তিবর্গ দ্রুত সবাইকে নবোদ্যমে উদ্দীপ্ত করতে এবং সবার হৃদয়ে আত্মমর্যাদাবোধ জাগিয়ে তুলতে সচেষ্ট হন। তাদের প্রচেষ্টায় আলেপ্পোতে জ্ঞানী-গুণী, আলিম-ফকিহ, বণিক ও সাধারণ জনতার একটি প্রতিনিধিদল প্রস্তুত হয়ে বাগদাদে যাওয়ার মনস্থ করে।
আলেপ্পোবাসী তাদের অলস-অথর্ব শাসক রিজওয়ানের কর্মকাণ্ডে নিরাশ হয়ে পড়েছিল। প্রতিনিধিদলটি বাগদাদে খলিফা মুসতাযহির বিল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। কিন্তু পূর্বেও আমরা জেনেছি, তিনি তো প্রকৃত অর্থে ‘খলিফাতুল মুসলিমিন’ ছিলেন না; ছিলেন নামেই খলিফা! তাই আলেপ্পোর প্রতিনিধিদলের আগমন তার মন-মানসকে সামান্যও প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হয়। তিনি তার স্বভাব-রীতি অনুযায়ী তাদের পরিবেশ-পরিস্থিতির খোঁজ-খবর নেন, তাদের দুর্দশায় সৌজন্যমূলক দুঃখ ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেন এবং কার্যকর সহায়তার পরিবর্তে তাদেরকে পূর্ণ ‘আন্তরিক সহায়তা’র আশ্বাস প্রদান করেন! তিনি তাদের দুঃখ-দুর্দশা ও সংকটময় পরিস্থিতি দূর হওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলার দরবারে দোয়া করারও প্রতিশ্রুতি দেন!
এমনটিই ছিল স্বাভাবিক। তার মতো অসহায়-নিরুপায় ব্যক্তির কাছ থেকে এমন প্রতিক্রিয়াই ছিল প্রত্যাশিত। কিন্তু আলেপ্পোর প্রতিনিধিদল খলিফার দুর্বল সান্ত্বনায় তুষ্ট না হয়ে এবার বাগদাদের সাধারণ জনগণের শরণাপন্ন হয় এবং তাদের কাছে পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও আক্রান্ত অঞ্চলের মুসলমানদের শোচনীয় অবস্থা তুলে ধরে। প্রতিনিধিদল তাদেরকে এই বলে সতর্ক করে যে, আজ শাম অঞ্চল যে দুর্যোগের শিকার হয়েছে, উদাসীনতার চাদরে মুড়ি দিয়ে থাকলে নিঃসন্দেহে আগামীকাল পুরো মুসলিম বিশ্ব একই পরিণতির শিকার হবে!
আল্লাহর শোকর, বাগদাদে তখনও এসব কথা মন দিয়ে শোনার মতো কিছু কান ছিল; ছিল অনুভূতিসম্পন্ন কিছু বিবেক, সচেতন ও জাগ্রত কিছু হৃদয়। এটি সুস্পষ্ট যে, বাগদাদে তখনও মহান উজির নিজামুল মুলক রহ.-এর প্রতিষ্ঠিত নিজামিয়া মাদরাসাসমূহের প্রভাব অবশিষ্ট ছিল এবং ইলমের নুর ও জ্ঞানের আলোয় বাগদাদকে সমৃদ্ধকারী আলিমসমাজের নিষ্ঠাপূর্ণ কর্মপ্রচেষ্টার প্রভাব তখনও বিদ্যমান ছিল। আর তাই প্রতিনিধিদলের প্রচেষ্টা জনসাধারণের মাঝে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যা সমকালীন পরিস্থিতিতে একেবারেই অভাবনীয় ছিল! ৫০৪ হিজরি সনের দ্বিতীয়ার্ধের এক শুক্রবারে (১১১১ খ্রিষ্টাব্দে) বাগদাদের জনতা বিরাট বিক্ষোভের ডাক দেয়। বিক্ষোভ থেকে সুস্পষ্ট ভাষায় ইসলামি ভূখণ্ড থেকে ক্রুসেডারদের বিতাড়িত করতে জিহাদ শুরু করার দাবি জানানো হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা জুমার সামান্য পূর্বে সুলতানের মসজিদ অভিমুখে অগ্রসর হয় এবং সকলে মসজিদে ঢুকে পড়ে। প্রচণ্ড বিক্ষুব্ধ জনতা মসজিদটির মিম্বর ভেঙে ফেলে। বিপুল সংখ্যক জনসাধারণের উপস্থিতিতে পুরো এলাকায় তুমুল আন্দোলন চলতে থাকে। এমনকি সেদিন মসজিদটিতে জুমার নামাজ আদায় করাও সম্ভব হয়নি। সুলতান মুহাম্মাদের কাছে এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে জনতাকে শান্ত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু এক সপ্তাহ অতিবাহিত হওয়ার পরও সুলতানের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ গৃহীত না হওয়ায় বিক্ষুব্ধ জনতা পরের শুক্রবার আবারও পথে নামে। এবার তারা সরাসরি খলিফা-প্রাসাদের মসজিদ অভিমুখে অগ্রসর হয়। রাজপ্রহরীরা বাধা দিলে বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং তাদেরকে হটিয়ে মসজিদে ঢুকে যায়। উত্তেজিত জনতা মসজিদে খলিফার বসার জন্য নির্দিষ্ট বিশেষ কক্ষের জানালা ও মসজিদের মিম্বর ভেঙে ফেলে। গত সপ্তাহে যেমন সুলতানের মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করা সম্ভব হয়নি, এ সপ্তাহে একই পরিস্থিতির অবতারণা হয় খলিফার মসজিদে।
পরিস্থিতি বেশ জটিল আকার ধারণ করে। এ অবস্থায় নিশ্চুপ বসে থাকলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা ছিল। পরিস্থিতির দাবি ছিল, খলিফা ও সুলতান সমস্যার সমাধানে কোনো দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। তাদের সামনে দুটি পথ খোলা ছিল—জনতার দাবি মেনে নিয়ে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত জিহাদের লক্ষ্যে সৈন্যসমাবেশ ঘটানো কিংবা উত্তেজিত জনতার বিরুদ্ধে দমন-অস্ত্র ব্যবহার অর্থাৎ তাদেরকে গ্রেফতার, বেত্রাঘাত ও হত্যাসহ প্রচলিত বিভিন্ন শান্তির হুমকি প্রদান!
যেহেতু আন্দোলনরত জনগণ ছিল সংখ্যায় অনেক এবং তাদের আন্দোলন ছিল সুবিন্যস্ত ও পরিকল্পিত, তা ছাড়া তারা ছিল এক-অভিন্ন লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ, তাই খলিফা ও সুলতান পুরো বিষয়টি নিয়ে নতুন করে চিন্তা করেন এবং শেষ পর্যন্ত জনতার দাবির সামনে নতি স্বীকার করে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সৈন্যসমাবেশ শুরু করেন। এমনকি সুলতান মুহাম্মাদ আসন্ন অভিযানের সেনাপতি হিসেবে তার পুত্র মাসউদের নাম ঘোষণা করেন। অবশ্য এ ঘোষণা ছিল নিছক আনুষ্ঠানিকতা মাত্র; বাস্তব নেতৃত্ব মওদুদ বিন তুনতেকিনকেই প্রদান করা হয়।
বাগদাদের এই গণজোয়ার ছিল ইতিহাসের এক যুগান্তকারী গণজাগরণ। প্রশ্ন হতে পারে—বাগদাদের মতো আলেপ্পো, দামেশক, হামা বা হিমসে কেন বিক্ষোভ বা গণ-উত্থানের ঘটনা ঘটেনি? আমরা বলব, উত্তর একেবারেই সুস্পষ্ট। বাগদাদের জনগণ দীর্ঘকাল ধরে লাভ করেছে ইলম, জিহাদ ও আত্মমর্যাদাবোধসহ সমুন্নত মানসিকতা তৈরিতে কার্যকর বিভিন্ন গুণের দীক্ষা। বিগত সময়ে হাজারো আলিম বাগদাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গন ও জনগণের মানসিক উন্নয়নের সংস্কারপ্রচেষ্টায় অবদান রেখেছেন। তাদের অনেকেই হয়তো ইতিমধ্যে পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন এবং নিজেদের কর্মপ্রচেষ্টার এই ফলাফল দেখে যেতে পারেননি। বাগদাদের এই গণজাগরণের পেছনে এটি যে অন্যতম কার্যকারণ ছিল, তা ঐতিহাসিক ইবনুল আছিরের পর্যবেক্ষণেও ফুটে উঠেছে। তিনি তার মনোজ্ঞ ইতিহাসগ্রন্থ আল-কামিল ফিত-তারীখ-এ উল্লেখ করেছেন, বাগদাদের এ গণবিদ্রোহ আলিম-ফকিহদের এক বড় জামাতের তত্ত্বাবধানে সংঘটিত হয়েছিল।
নিঃসন্দেহে প্রশ্নের উত্তর একেবারেই সুস্পষ্ট! আলিমগণই ছিলেন এই গণজাগরণের মূল চাবিকাঠি!
ইলম ও আলিমগণের সাহচর্যের প্রভাবেই জেগে উঠেছিল বাগদাদবাসী! জাতির আলিমসমাজ যদি সঠিক পথে চলেন, তাহলে জাতির সবকিছুই সঠিক পথে পরিচালিত হয়। পক্ষান্তরে আলিমসমাজই যদি বিপথে হাঁটেন, ভ্রষ্টতার শিকার হন, কীভাবে আশা করা যায় সততা ও কল্যাণ?! আর তাই মোটেও অসারতা নেই নবীজির এ বাণীতে-
«إِنَّ الْعُلَمَاءَ وَرَثَةُ الْأَنْبِيَاءِ» নিশ্চয়ই আলিমগণ নবীগণের উত্তরাধিকারী।
নেই কোনো অসারতা এই নববি ঘোষণাতেও إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ وَأَهْلَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِيْنَ حَتَّى النَّمْلَةَ فِي جُحْرِهَا وَحَتَّى الْحُوْتَ لَيُصَلُّوْنَ عَلَى مُعَلَّمَ النَّاسِ الْخَيْرَ নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা, তার ফিরেশতাগণ এবং আসমান ও জমিনের অধিবাসীগণ এমনকি গর্তের পিপীলিকা ও (পানির) মাছ পর্যন্ত মানুষকে কল্যাণ শিক্ষাদানকারী (আলিম)-এর জন্য দোয়া করে।
টিকাঃ
১৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪১।
১৯. প্রাগুক্ত, ৯/১৪১।
২০. প্রাগুক্ত, ৯/১৪১।
২১. ইমাম আবু দাউদ, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৬৪১, ইমাম তিরমিজি, সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২৬৮২ ও ইমাম ইবনে মাজা, সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস নং ২২৩।
২২. ইমাম তিরমিজি, সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২৬৮৫ ও তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির, হাদিস নং ৭৯১২।
এই অভিযানের পর বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিম জনসাধারণ ভাবতে শুরু করে যে, আশা এখনো ফুরিয়ে যায়নি; বেদনাদায়ক এ বর্তমানের পরিবর্তন ঘটানো এখনো সম্ভব। একই সঙ্গে তারা অনুভব করে যে, ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মূলত মওদুদ একাই করছেন; তাকে সহায়তাকারী বাহিনীগুলো মোটেও তার সঙ্গে তুল্য নয়। এ সময় জাতির নিষ্ঠাবান ব্যক্তিবর্গ দ্রুত সবাইকে নবোদ্যমে উদ্দীপ্ত করতে এবং সবার হৃদয়ে আত্মমর্যাদাবোধ জাগিয়ে তুলতে সচেষ্ট হন। তাদের প্রচেষ্টায় আলেপ্পোতে জ্ঞানী-গুণী, আলিম-ফকিহ, বণিক ও সাধারণ জনতার একটি প্রতিনিধিদল প্রস্তুত হয়ে বাগদাদে যাওয়ার মনস্থ করে।
আলেপ্পোবাসী তাদের অলস-অথর্ব শাসক রিজওয়ানের কর্মকাণ্ডে নিরাশ হয়ে পড়েছিল। প্রতিনিধিদলটি বাগদাদে খলিফা মুসতাযহির বিল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। কিন্তু পূর্বেও আমরা জেনেছি, তিনি তো প্রকৃত অর্থে ‘খলিফাতুল মুসলিমিন’ ছিলেন না; ছিলেন নামেই খলিফা! তাই আলেপ্পোর প্রতিনিধিদলের আগমন তার মন-মানসকে সামান্যও প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হয়। তিনি তার স্বভাব-রীতি অনুযায়ী তাদের পরিবেশ-পরিস্থিতির খোঁজ-খবর নেন, তাদের দুর্দশায় সৌজন্যমূলক দুঃখ ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেন এবং কার্যকর সহায়তার পরিবর্তে তাদেরকে পূর্ণ ‘আন্তরিক সহায়তা’র আশ্বাস প্রদান করেন! তিনি তাদের দুঃখ-দুর্দশা ও সংকটময় পরিস্থিতি দূর হওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলার দরবারে দোয়া করারও প্রতিশ্রুতি দেন!
এমনটিই ছিল স্বাভাবিক। তার মতো অসহায়-নিরুপায় ব্যক্তির কাছ থেকে এমন প্রতিক্রিয়াই ছিল প্রত্যাশিত। কিন্তু আলেপ্পোর প্রতিনিধিদল খলিফার দুর্বল সান্ত্বনায় তুষ্ট না হয়ে এবার বাগদাদের সাধারণ জনগণের শরণাপন্ন হয় এবং তাদের কাছে পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও আক্রান্ত অঞ্চলের মুসলমানদের শোচনীয় অবস্থা তুলে ধরে। প্রতিনিধিদল তাদেরকে এই বলে সতর্ক করে যে, আজ শাম অঞ্চল যে দুর্যোগের শিকার হয়েছে, উদাসীনতার চাদরে মুড়ি দিয়ে থাকলে নিঃসন্দেহে আগামীকাল পুরো মুসলিম বিশ্ব একই পরিণতির শিকার হবে!
আল্লাহর শোকর, বাগদাদে তখনও এসব কথা মন দিয়ে শোনার মতো কিছু কান ছিল; ছিল অনুভূতিসম্পন্ন কিছু বিবেক, সচেতন ও জাগ্রত কিছু হৃদয়। এটি সুস্পষ্ট যে, বাগদাদে তখনও মহান উজির নিজামুল মুলক রহ.-এর প্রতিষ্ঠিত নিজামিয়া মাদরাসাসমূহের প্রভাব অবশিষ্ট ছিল এবং ইলমের নুর ও জ্ঞানের আলোয় বাগদাদকে সমৃদ্ধকারী আলিমসমাজের নিষ্ঠাপূর্ণ কর্মপ্রচেষ্টার প্রভাব তখনও বিদ্যমান ছিল। আর তাই প্রতিনিধিদলের প্রচেষ্টা জনসাধারণের মাঝে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যা সমকালীন পরিস্থিতিতে একেবারেই অভাবনীয় ছিল! ৫০৪ হিজরি সনের দ্বিতীয়ার্ধের এক শুক্রবারে (১১১১ খ্রিষ্টাব্দে) বাগদাদের জনতা বিরাট বিক্ষোভের ডাক দেয়। বিক্ষোভ থেকে সুস্পষ্ট ভাষায় ইসলামি ভূখণ্ড থেকে ক্রুসেডারদের বিতাড়িত করতে জিহাদ শুরু করার দাবি জানানো হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা জুমার সামান্য পূর্বে সুলতানের মসজিদ অভিমুখে অগ্রসর হয় এবং সকলে মসজিদে ঢুকে পড়ে। প্রচণ্ড বিক্ষুব্ধ জনতা মসজিদটির মিম্বর ভেঙে ফেলে। বিপুল সংখ্যক জনসাধারণের উপস্থিতিতে পুরো এলাকায় তুমুল আন্দোলন চলতে থাকে। এমনকি সেদিন মসজিদটিতে জুমার নামাজ আদায় করাও সম্ভব হয়নি। সুলতান মুহাম্মাদের কাছে এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে জনতাকে শান্ত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু এক সপ্তাহ অতিবাহিত হওয়ার পরও সুলতানের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ গৃহীত না হওয়ায় বিক্ষুব্ধ জনতা পরের শুক্রবার আবারও পথে নামে। এবার তারা সরাসরি খলিফা-প্রাসাদের মসজিদ অভিমুখে অগ্রসর হয়। রাজপ্রহরীরা বাধা দিলে বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং তাদেরকে হটিয়ে মসজিদে ঢুকে যায়। উত্তেজিত জনতা মসজিদে খলিফার বসার জন্য নির্দিষ্ট বিশেষ কক্ষের জানালা ও মসজিদের মিম্বর ভেঙে ফেলে। গত সপ্তাহে যেমন সুলতানের মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করা সম্ভব হয়নি, এ সপ্তাহে একই পরিস্থিতির অবতারণা হয় খলিফার মসজিদে।
পরিস্থিতি বেশ জটিল আকার ধারণ করে। এ অবস্থায় নিশ্চুপ বসে থাকলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা ছিল। পরিস্থিতির দাবি ছিল, খলিফা ও সুলতান সমস্যার সমাধানে কোনো দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। তাদের সামনে দুটি পথ খোলা ছিল—জনতার দাবি মেনে নিয়ে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত জিহাদের লক্ষ্যে সৈন্যসমাবেশ ঘটানো কিংবা উত্তেজিত জনতার বিরুদ্ধে দমন-অস্ত্র ব্যবহার অর্থাৎ তাদেরকে গ্রেফতার, বেত্রাঘাত ও হত্যাসহ প্রচলিত বিভিন্ন শান্তির হুমকি প্রদান!
যেহেতু আন্দোলনরত জনগণ ছিল সংখ্যায় অনেক এবং তাদের আন্দোলন ছিল সুবিন্যস্ত ও পরিকল্পিত, তা ছাড়া তারা ছিল এক-অভিন্ন লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ, তাই খলিফা ও সুলতান পুরো বিষয়টি নিয়ে নতুন করে চিন্তা করেন এবং শেষ পর্যন্ত জনতার দাবির সামনে নতি স্বীকার করে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সৈন্যসমাবেশ শুরু করেন। এমনকি সুলতান মুহাম্মাদ আসন্ন অভিযানের সেনাপতি হিসেবে তার পুত্র মাসউদের নাম ঘোষণা করেন। অবশ্য এ ঘোষণা ছিল নিছক আনুষ্ঠানিকতা মাত্র; বাস্তব নেতৃত্ব মওদুদ বিন তুনতেকিনকেই প্রদান করা হয়।
বাগদাদের এই গণজোয়ার ছিল ইতিহাসের এক যুগান্তকারী গণজাগরণ। প্রশ্ন হতে পারে—বাগদাদের মতো আলেপ্পো, দামেশক, হামা বা হিমসে কেন বিক্ষোভ বা গণ-উত্থানের ঘটনা ঘটেনি? আমরা বলব, উত্তর একেবারেই সুস্পষ্ট। বাগদাদের জনগণ দীর্ঘকাল ধরে লাভ করেছে ইলম, জিহাদ ও আত্মমর্যাদাবোধসহ সমুন্নত মানসিকতা তৈরিতে কার্যকর বিভিন্ন গুণের দীক্ষা। বিগত সময়ে হাজারো আলিম বাগদাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গন ও জনগণের মানসিক উন্নয়নের সংস্কারপ্রচেষ্টায় অবদান রেখেছেন। তাদের অনেকেই হয়তো ইতিমধ্যে পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন এবং নিজেদের কর্মপ্রচেষ্টার এই ফলাফল দেখে যেতে পারেননি। বাগদাদের এই গণজাগরণের পেছনে এটি যে অন্যতম কার্যকারণ ছিল, তা ঐতিহাসিক ইবনুল আছিরের পর্যবেক্ষণেও ফুটে উঠেছে। তিনি তার মনোজ্ঞ ইতিহাসগ্রন্থ আল-কামিল ফিত-তারীখ-এ উল্লেখ করেছেন, বাগদাদের এ গণবিদ্রোহ আলিম-ফকিহদের এক বড় জামাতের তত্ত্বাবধানে সংঘটিত হয়েছিল।
নিঃসন্দেহে প্রশ্নের উত্তর একেবারেই সুস্পষ্ট! আলিমগণই ছিলেন এই গণজাগরণের মূল চাবিকাঠি!
ইলম ও আলিমগণের সাহচর্যের প্রভাবেই জেগে উঠেছিল বাগদাদবাসী! জাতির আলিমসমাজ যদি সঠিক পথে চলেন, তাহলে জাতির সবকিছুই সঠিক পথে পরিচালিত হয়। পক্ষান্তরে আলিমসমাজই যদি বিপথে হাঁটেন, ভ্রষ্টতার শিকার হন, কীভাবে আশা করা যায় সততা ও কল্যাণ?! আর তাই মোটেও অসারতা নেই নবীজির এ বাণীতে-
«إِنَّ الْعُلَمَاءَ وَرَثَةُ الْأَنْبِيَاءِ» নিশ্চয়ই আলিমগণ নবীগণের উত্তরাধিকারী।
নেই কোনো অসারতা এই নববি ঘোষণাতেও إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ وَأَهْلَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِيْنَ حَتَّى النَّمْلَةَ فِي جُحْرِهَا وَحَتَّى الْحُوْتَ لَيُصَلُّوْنَ عَلَى مُعَلَّمَ النَّاسِ الْخَيْرَ নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা, তার ফিরেশতাগণ এবং আসমান ও জমিনের অধিবাসীগণ এমনকি গর্তের পিপীলিকা ও (পানির) মাছ পর্যন্ত মানুষকে কল্যাণ শিক্ষাদানকারী (আলিম)-এর জন্য দোয়া করে।
টিকাঃ
১৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪১।
১৯. প্রাগুক্ত, ৯/১৪১।
২০. প্রাগুক্ত, ৯/১৪১।
২১. ইমাম আবু দাউদ, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৬৪১, ইমাম তিরমিজি, সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২৬৮২ ও ইমাম ইবনে মাজা, সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস নং ২২৩।
২২. ইমাম তিরমিজি, সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২৬৮৫ ও তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির, হাদিস নং ৭৯১২।
📄 ঐক্যের নাটক!
৫০৫ হিজরি সনের শুরুতে (১১১১ খ্রিষ্টাব্দে) ব্যাপক পরিসরে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসমাবেশ শুরু হয়। যেহেতু বাহিনীর প্রধান ও মহান মুজাহিদ আমির মওদুদ বিন তুনতেকিনের অবস্থান ছিল মসুলে এবং মসুলেই ছিল বাহিনীর কেন্দ্রীয় শক্তি ও মূল অংশের প্রতিনিধিত্বকারী সচেতন জনসাধারণের নিবাস, তাই সকলে মসুলেই সমবেত হতে থাকে। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সৈন্যদল আসতে থাকে। বাগদাদ থেকে সুলতান-পুত্র মাসউদ একটি বাহিনী নিয়ে আগমন করেন। (বর্তমান তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চল ও ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত) আহলাত ও তিবরিজ থেকে সুকমান আল-কুতবি, মারদিন থেকে ইয়াজ বিন ইলগাজি বিন উরতুক, (আজারবাইজানের) মারাগা (Maragheh) অঞ্চল থেকে কুর্দি আমির আহমাদিল, হামাদান থেকে আমির বুরসুক, তার দুই পুত্র ইলবাকি ও জিনকি এবং ইরবিল (Erbil) থেকে আবুল হাইজা আপন আপন বাহিনী নিয়ে বৃহত্তর ইসলামি বাহিনীতে যোগদান করেন।
মানচিত্র নং-২৩ ৫০৫ হিজরি সনে/১১১১ খ্রিষ্টাব্দে মওদুদের নেতৃত্বে অভিযান
নিঃসন্দেহে বিশাল সৈন্যসমাবেশ ঘটেছিল। কিন্তু আমরা জানি, সংখ্যাধিক্যে কিছু আসে-যায় না; বাহিনীর ধরন ও প্রকৃতিই হলো আসল বিবেচ্য। মওদুদ ও তার সঙ্গী মসুলের বাহিনী বাদে বৃহত্তর মুসলিম বাহিনীর কারও মধ্যেই আমরা পরিস্থিতির গভীর উপলব্ধি-বোধ এবং নিষ্ঠার সঙ্গে নিজেকে উৎসর্গ করার চেতনা খুঁজে পাইনি। অন্যান্য আমির ও রাজন্য বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল শুধুই সুলতান মুহাম্মাদের আনুগত্যের দাবিতে; আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে নয়। হায়! এ দুই উদ্দেশ্যে সমবেত লোকদের মাঝে কত ফারাক, কত পার্থক্য!
৫০৫ হিজরি সনের মুহাররম মাসে (১১১১ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে) সুবিশাল মুসলিম বাহিনী মসুল থেকে রওনা হয়। মুসলিম বাহিনী এডেসা নগরী অবরোধের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ফুরাতের পূর্ব তীরে অবস্থিত ক্রুসেডার-নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন দুর্গের পতন ঘটানোর লক্ষ্যে তৎক্ষণাৎ কাজ শুরু করে। প্রচেষ্টা সফল হয় এবং ক্রুসেডারদের বেশ কয়েকটি দুর্গ জয় করার পর মুসলিম বাহিনী খুব সহজে এডেসায় পৌঁছে যায় এবং নগরীটি ঘিরে অবরোধ আরোপ করে।
এডেসা নগরীর দুর্ভেদ্য নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল সুপ্রসিদ্ধ। তা ছাড়া মুসলিম বাহিনীর আগমন-সংবাদ জানতে পেরে ক্রুসেডাররা দীর্ঘ অবরোধে টিকে থাকার জন্য নগরীর অভ্যন্তরে যথেষ্ট পরিমাণ আহারদ্রব্য ও প্রয়োজনীয় রসদসামগ্রী মজুত করে নিয়েছিল। নগরপ্রাচীরের বাইরে এসে মুসলিম বাহিনীর মোকাবিলা করার কোনো ইচ্ছাই তাদের ছিল না। ফলে একসময় মওদুদ অনুভব করেন যে, বৃথাই সময় নষ্ট হচ্ছে; অবরোধের মাধ্যমে নগরীটির পতন ঘটানো সম্ভব নয়।
তাহলে মওদুদ এখন কী করবেন?!
মওদুদ সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি বাস্তববাদী হবেন। তিনি সুরক্ষিত এডেসার অবরোধ তুলে নিয়ে ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রিত অন্য কোনো দুর্গ অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনামতো মুসলিম বাহিনী এডেসা নগরী ছেড়ে ফুরাতের পশ্চিম তীরে অবস্থিত এডেসা রাজ্যের দ্বিতীয় প্রধান নগরী তিল-বাশির অভিমুখে অগ্রসর হয়। নগরীটির প্রশাসনিক দায়িত্ব ছিল প্রসিদ্ধ ক্রুসেডার সেনাপতি জোসেলিন ডি কার্টেনির হাতে।
মুসলিম বাহিনী তিল-বাশির ঘিরে কঠিন অবরোধ আরোপ করে এবং পূর্ণ শক্তি ব্যয় করে নগরদ্বার উন্মুক্ত করার বা নগরপ্রাচীর ধসিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু তিল-বাশিরও ছিল এডেসার মতো সুরক্ষিত এবং দুর্ভেদ্য নগরী।
দিনের পর দিন অতিবাহিত হতে থাকে, মুসলিম বাহিনীর পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হতে থাকে। পরিস্থিতি পরিবর্তনের কোনো লক্ষণও পরিলক্ষিত হচ্ছিল না। এরই মধ্যে সেনাপতি মওদুদের কাছে শাম থেকে দুটি সাহায্যবার্তা এসে পৌঁছায়।
প্রথম বার্তাটি আসে শাইজারের প্রশাসক সুলতান বিন মুনকিযের পক্ষ থেকে। বার্তায় তিনি জানান যে, এন্টিয়ক অধিপতি টেনক্রেডের বাহিনী তার রাজ্যে আক্রমণ চালাতে যাচ্ছে। ২য় বার্তাটি ছিল আলেপ্পোর দুষ্কর্ম শাসক রিজওয়ানের প্রেরিত। বার্তায় তিনি এন্টিয়কের শাসক টেনক্রেডের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময়ের আগ্রহ প্রকাশ করেন। টেনক্রেড সে সময় শাইজারের পাশাপাশি আলেপ্পোতে অভিযান পরিচালনা করছিলেন। সন্দেহ নেই, বার্তাদুটিতে মুসলিম বাহিনীর জন্য দুশ্চিন্তার যথেষ্ট উপাদান ছিল। কেননা, নতুন করে যদি কোনো ইসলামি নগরীর পতন ঘটে, বিশেষত তা যদি হয় আলেপ্পোর মতো গুরুত্বপূর্ণ নগরী, নিঃসন্দেহে তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যাবে এবং ক্রুসেডারদের শক্তি অনেক বেশি বেড়ে যাবে।
এ সময় মওদুদ তিল-বাশিরের অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ে দ্বিধায় পড়ে যান। বিশেষত রিজওয়ান মোটেও আস্থা রাখার মতো মানুষ নন। তবে অন্যায়-অপকর্ম করার মতো লোক কেবল রিজওয়ানই ছিলেন না! তিল-বাশিরের প্রশাসক জোসেলিন এ সময় মারাগার আমির আহমাদিলের কাছে পৌঁছে যান এবং তার সঙ্গে গোপনে সমঝোতা করেন। জোসেলিন তাকে তিল-বাশির থেকে অবরোধ তুলে নিতে মুসলিম বাহিনীর নেতৃবৃন্দকে রাজি করানোর বিনিময়ে লোভনীয় বিনিময়ের প্রস্তাব দেন। নিঃসন্দেহে এটি ছিল জিহাদের ময়দানে নিশ্চিত বিশ্বাসঘাতকতা এবং মুসলিম জনসাধারণের আশার প্রতীক মুসলিম বাহিনীর পিঠে ছুরিকাঘাতের নামান্তর!
আহমাদিল মুসলিম বাহিনীর নেতৃবৃন্দকে রিজওয়ানের সহায়তায় অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আশ্বস্ত করতে সক্ষম হন। সকলে এ বিষয়ে একমত হলে মওদুদ একপ্রকার নিরুপায় হয়ে তাদের মত মেনে নেন।
অবশেষে পয়তাল্লিশ দিনের অবরোধের পর তিল-বাশির থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।
এরপর মওদুদ রিজওয়ানের বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়ে টেনক্রেডের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আলেপ্পো অভিমুখে রওনা হন। কারণ, এখন এডেসার পতন গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো যেকোনো ইসলামি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা রক্ষা করা; হোক তা মসুল থেকে অনেক দূরের কোনো এলাকা।
টিকাঃ
২০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৩।
২৪. প্রাগুক্ত, ৯/১৪৩।
২৫. Stevenson: op. cit., p. 91.
২৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪।
২৭. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৭৫।
৫০৫ হিজরি সনের শুরুতে (১১১১ খ্রিষ্টাব্দে) ব্যাপক পরিসরে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসমাবেশ শুরু হয়। যেহেতু বাহিনীর প্রধান ও মহান মুজাহিদ আমির মওদুদ বিন তুনতেকিনের অবস্থান ছিল মসুলে এবং মসুলেই ছিল বাহিনীর কেন্দ্রীয় শক্তি ও মূল অংশের প্রতিনিধিত্বকারী সচেতন জনসাধারণের নিবাস, তাই সকলে মসুলেই সমবেত হতে থাকে। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সৈন্যদল আসতে থাকে। বাগদাদ থেকে সুলতান-পুত্র মাসউদ একটি বাহিনী নিয়ে আগমন করেন। (বর্তমান তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চল ও ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত) আহলাত ও তিবরিজ থেকে সুকমান আল-কুতবি, মারদিন থেকে ইয়াজ বিন ইলগাজি বিন উরতুক, (আজারবাইজানের) মারাগা (Maragheh) অঞ্চল থেকে কুর্দি আমির আহমাদিল, হামাদান থেকে আমির বুরসুক, তার দুই পুত্র ইলবাকি ও জিনকি এবং ইরবিল (Erbil) থেকে আবুল হাইজা আপন আপন বাহিনী নিয়ে বৃহত্তর ইসলামি বাহিনীতে যোগদান করেন।
মানচিত্র নং-২৩ ৫০৫ হিজরি সনে/১১১১ খ্রিষ্টাব্দে মওদুদের নেতৃত্বে অভিযান
নিঃসন্দেহে বিশাল সৈন্যসমাবেশ ঘটেছিল। কিন্তু আমরা জানি, সংখ্যাধিক্যে কিছু আসে-যায় না; বাহিনীর ধরন ও প্রকৃতিই হলো আসল বিবেচ্য। মওদুদ ও তার সঙ্গী মসুলের বাহিনী বাদে বৃহত্তর মুসলিম বাহিনীর কারও মধ্যেই আমরা পরিস্থিতির গভীর উপলব্ধি-বোধ এবং নিষ্ঠার সঙ্গে নিজেকে উৎসর্গ করার চেতনা খুঁজে পাইনি। অন্যান্য আমির ও রাজন্য বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল শুধুই সুলতান মুহাম্মাদের আনুগত্যের দাবিতে; আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে নয়। হায়! এ দুই উদ্দেশ্যে সমবেত লোকদের মাঝে কত ফারাক, কত পার্থক্য!
৫০৫ হিজরি সনের মুহাররম মাসে (১১১১ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে) সুবিশাল মুসলিম বাহিনী মসুল থেকে রওনা হয়। মুসলিম বাহিনী এডেসা নগরী অবরোধের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ফুরাতের পূর্ব তীরে অবস্থিত ক্রুসেডার-নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন দুর্গের পতন ঘটানোর লক্ষ্যে তৎক্ষণাৎ কাজ শুরু করে। প্রচেষ্টা সফল হয় এবং ক্রুসেডারদের বেশ কয়েকটি দুর্গ জয় করার পর মুসলিম বাহিনী খুব সহজে এডেসায় পৌঁছে যায় এবং নগরীটি ঘিরে অবরোধ আরোপ করে।
এডেসা নগরীর দুর্ভেদ্য নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল সুপ্রসিদ্ধ। তা ছাড়া মুসলিম বাহিনীর আগমন-সংবাদ জানতে পেরে ক্রুসেডাররা দীর্ঘ অবরোধে টিকে থাকার জন্য নগরীর অভ্যন্তরে যথেষ্ট পরিমাণ আহারদ্রব্য ও প্রয়োজনীয় রসদসামগ্রী মজুত করে নিয়েছিল। নগরপ্রাচীরের বাইরে এসে মুসলিম বাহিনীর মোকাবিলা করার কোনো ইচ্ছাই তাদের ছিল না। ফলে একসময় মওদুদ অনুভব করেন যে, বৃথাই সময় নষ্ট হচ্ছে; অবরোধের মাধ্যমে নগরীটির পতন ঘটানো সম্ভব নয়।
তাহলে মওদুদ এখন কী করবেন?!
মওদুদ সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি বাস্তববাদী হবেন। তিনি সুরক্ষিত এডেসার অবরোধ তুলে নিয়ে ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রিত অন্য কোনো দুর্গ অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনামতো মুসলিম বাহিনী এডেসা নগরী ছেড়ে ফুরাতের পশ্চিম তীরে অবস্থিত এডেসা রাজ্যের দ্বিতীয় প্রধান নগরী তিল-বাশির অভিমুখে অগ্রসর হয়। নগরীটির প্রশাসনিক দায়িত্ব ছিল প্রসিদ্ধ ক্রুসেডার সেনাপতি জোসেলিন ডি কার্টেনির হাতে।
মুসলিম বাহিনী তিল-বাশির ঘিরে কঠিন অবরোধ আরোপ করে এবং পূর্ণ শক্তি ব্যয় করে নগরদ্বার উন্মুক্ত করার বা নগরপ্রাচীর ধসিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু তিল-বাশিরও ছিল এডেসার মতো সুরক্ষিত এবং দুর্ভেদ্য নগরী।
দিনের পর দিন অতিবাহিত হতে থাকে, মুসলিম বাহিনীর পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হতে থাকে। পরিস্থিতি পরিবর্তনের কোনো লক্ষণও পরিলক্ষিত হচ্ছিল না। এরই মধ্যে সেনাপতি মওদুদের কাছে শাম থেকে দুটি সাহায্যবার্তা এসে পৌঁছায়।
প্রথম বার্তাটি আসে শাইজারের প্রশাসক সুলতান বিন মুনকিযের পক্ষ থেকে। বার্তায় তিনি জানান যে, এন্টিয়ক অধিপতি টেনক্রেডের বাহিনী তার রাজ্যে আক্রমণ চালাতে যাচ্ছে। ২য় বার্তাটি ছিল আলেপ্পোর দুষ্কর্ম শাসক রিজওয়ানের প্রেরিত। বার্তায় তিনি এন্টিয়কের শাসক টেনক্রেডের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময়ের আগ্রহ প্রকাশ করেন। টেনক্রেড সে সময় শাইজারের পাশাপাশি আলেপ্পোতে অভিযান পরিচালনা করছিলেন। সন্দেহ নেই, বার্তাদুটিতে মুসলিম বাহিনীর জন্য দুশ্চিন্তার যথেষ্ট উপাদান ছিল। কেননা, নতুন করে যদি কোনো ইসলামি নগরীর পতন ঘটে, বিশেষত তা যদি হয় আলেপ্পোর মতো গুরুত্বপূর্ণ নগরী, নিঃসন্দেহে তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যাবে এবং ক্রুসেডারদের শক্তি অনেক বেশি বেড়ে যাবে।
এ সময় মওদুদ তিল-বাশিরের অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ে দ্বিধায় পড়ে যান। বিশেষত রিজওয়ান মোটেও আস্থা রাখার মতো মানুষ নন। তবে অন্যায়-অপকর্ম করার মতো লোক কেবল রিজওয়ানই ছিলেন না! তিল-বাশিরের প্রশাসক জোসেলিন এ সময় মারাগার আমির আহমাদিলের কাছে পৌঁছে যান এবং তার সঙ্গে গোপনে সমঝোতা করেন। জোসেলিন তাকে তিল-বাশির থেকে অবরোধ তুলে নিতে মুসলিম বাহিনীর নেতৃবৃন্দকে রাজি করানোর বিনিময়ে লোভনীয় বিনিময়ের প্রস্তাব দেন। নিঃসন্দেহে এটি ছিল জিহাদের ময়দানে নিশ্চিত বিশ্বাসঘাতকতা এবং মুসলিম জনসাধারণের আশার প্রতীক মুসলিম বাহিনীর পিঠে ছুরিকাঘাতের নামান্তর!
আহমাদিল মুসলিম বাহিনীর নেতৃবৃন্দকে রিজওয়ানের সহায়তায় অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আশ্বস্ত করতে সক্ষম হন। সকলে এ বিষয়ে একমত হলে মওদুদ একপ্রকার নিরুপায় হয়ে তাদের মত মেনে নেন।
অবশেষে পয়তাল্লিশ দিনের অবরোধের পর তিল-বাশির থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।
এরপর মওদুদ রিজওয়ানের বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়ে টেনক্রেডের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আলেপ্পো অভিমুখে রওনা হন। কারণ, এখন এডেসার পতন গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো যেকোনো ইসলামি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা রক্ষা করা; হোক তা মসুল থেকে অনেক দূরের কোনো এলাকা।
টিকাঃ
২০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৩।
২৪. প্রাগুক্ত, ৯/১৪৩।
২৫. Stevenson: op. cit., p. 91.
২৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪।
২৭. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৭৫।
📄 মুসলিম বাহিনীর ব্যর্থ অভিযান
কিন্তু আলেপ্পোতে রিজওয়ানের কাছে যা প্রত্যাশিত ছিল, তা-ই ঘটে! রিজওয়ান মসুল, ইরাক ও পারস্যের সম্মিলিত বাহিনীর সামনে আলেপ্পোর নগরদ্বার রুদ্ধ করে দেন এবং ঘোষণা করেন যে, তিনি ক্রুসেডার বাহিনীর তুলনায় মুসলিম বাহিনীকে বেশি ভয় পাচ্ছেন!
রিজওয়ানের এই চরম প্রতারণামূলক পদক্ষেপে মুসলিম বাহিনী কঠিন সংকটে পড়ে যায়। রিজওয়ানকে সাহায্য করতে মুসলিম বাহিনী নিজেদের মূল সাহায্যক্ষেত্র উত্তর ইরাক থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে এবং শত্রু-ভূখণ্ডের অনেকটা ভেতরে চলে এসেছে। এদিকে রিজওয়ান তাদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। এখন যদি ক্রুসেডার বাহিনী চলে আসে, তাহলে নিঃসন্দেহে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করবে। তা ছাড়া আলেপ্পোর কাছেই ছিল ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন দুর্গের অবস্থান। ওদিক থেকে বল্ডউইন ডি বুর্গ যদি মুসলিম বাহিনীর ফেরার পথ বন্ধ করে দিতে এবং তাদের কাছে সামরিক সহায়তা পৌঁছার পথ রুদ্ধ করে দিতে এডেসা থেকে বের হয়ে আসেন, তাহলে তো বিপদ বহুগুণে বেড়ে যাবে। চরম প্রতারক রিজওয়ান মুসলিম বাহিনীকে বাস্তবেই জটিল সংকটে ফেলে দিয়েছিলেন।
এমন পতনোন্মুখ পরিস্থিতিতে আলেপ্পোর জনগণের যেন হঠাৎ হুঁশ ফিরে আসে। এহেন ঘৃণ্য পদক্ষেপ থেকে রিজওয়ানকে নিবৃত্ত করতে তারা তীব্র বিক্ষোভ শুরু করে। কিন্তু রিজওয়ান আলেপ্পোর গণ্যমান্য ও নেতৃস্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তিকে বন্দি করে ফেলেন এবং আন্দোলন অব্যাহত রাখলে তাদের অনিষ্ট সাধনের হুমকি দিয়ে জনসাধারণকে দমন করেন।
নিঃসন্দেহে রিজওয়ানের এই আচরণ ছিল ইতিহাসের এক চরম নিন্দনীয় চিত্র এবং উম্মাহর দুশমনদের সামনে নতজানু হয়ে নিজ জাতি, মাতৃভূমি ও স্বধর্মীয়দের ওপর দমন-নীতি ব্যবহারকারী এক নেতার বাস্তব রূপ।
মওদুদ অনুভব করেন যে, তিনি কঠিন বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আটকে গেছেন। এরই মধ্যে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে যে, রিজওয়ান মুসলিম বাহিনীকে মার দেওয়ার জন্য খোদ টেনক্রেডের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন! সবদিক বিবেচনা করে মওদুদ আলেপ্পো থেকে দূরে সরে দামেশকের কাছাকাছি পৌঁছতে আরও দক্ষিণে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দামেশকের আমির তুগতেকিন প্রথমসারির মুজাহিদ না হলেও রিজওয়ানের তুলনায় শ্রেয়তর ছিলেন! মুসলিম বাহিনী আছি নদীর অববাহিকায় মাআ'ররাতুন-নোমানের কাছে পৌঁছার পর দামেশকের আমির তুগতেকিন সেখানে উপস্থিত হন এবং মুসলিম রাজন্যবর্গের আঘাতে আঘাতে জর্জরিত মহান সেনাপতি মওদুদ বিন তুনতেকিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অথচ স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল আঘাত আসবে ওদিক থেকে; এদিক থেকে নয়!
ইরাকি-পারসিক সম্মিলিত মুসলিম বাহিনীর নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আমির তুগতেকিন আলোচনায় মিলিত হন। আলোচনায় স্পষ্টত অনুমিত হচ্ছিল যে, তুগতেকিন যদিও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আগ্রহী; কিন্তু তিনি এই বিরাট মুসলিম বাহিনীকে (নিজ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিবেচনায়) ভয় করছেন। অবশ্য এমন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যেও তিনি সহজেই মওদুদ ও অন্যান্য রাজন্যের মধ্যে যে মোটাদাগের পার্থক্য আছে, তা অনুধাবন করতে সক্ষম হন। তিনি সুস্পষ্ট অনুভব করেন যে, প্রথমজন একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে নিঃস্বার্থ লড়াইয়ের চেতনা লালন করেন; সম্পদ বা রাজত্বের কোনো লালসা তার মাঝে নেই। আর বাহিনীর অন্যান্য নেতা সে যুগের সাধারণ আমিরদের মতোই কেবল পার্থিব স্বার্থের মোহে অভিযানে বের হয়েছে; জিহাদের কোনো চেতনাই তাদের মাঝে নেই। এখান থেকেই মওদুদ ও তুগতেকিনের মধ্যে এক হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের সূচনা হয়। তবে তুগতেকিন আশঙ্কা করছিলেন যে, অন্যান্য রাজন্য তার রাজ্যের অনিষ্ট সাধন করতে পারে। তাই মুসলিম বাহিনীকে দামেশক হতে দূরে রাখা নিশ্চিত করতে তিনি আলোচনায় সকলকে ত্রিপোলিতে আক্রমণে রাজি হতে পীড়াপীড়ি করেন। এতে তুগতেকিনের আরেকটি স্বার্থ নিহিত ছিল। যেহেতু ক্রুসেড রাজ্য ত্রিপোলির অবস্থান ছিল দামেশক রাজ্যের অধীনস্থ অঞ্চলের তুলনায় নিকটে, তাই তিনি এর মাধ্যমে তার জন্য তুলনামূলক অধিক অনিষ্টকর ক্রুসেডার নেতা ত্রিপোলি-শাসক বারট্রামকে ঘায়েল করতে চাচ্ছিলেন।
তুগতেকিনের মনোজগতে পার্থিব স্বার্থ-চিন্তা ও প্রবৃত্তির লালসা যেমন বিদ্যমান ছিল, দ্বীনি কল্যাণ-চিন্তা ও শরিয়তের চাহিদাও বিরাজমান ছিল। এই দ্বিমুখী চেতনার সংঘাতের কারণে তার পদক্ষেপ ও কার্যক্রমগুলো হতো সাংঘর্ষিক ও পরস্পর বিরোধী। তার পদচারণায় না মওদুদের মতো স্বচ্ছ জিহাদি চেতনা প্রতিভাত হতো, না রিজওয়ানের মতো সুস্পষ্ট দালালির চেতনা! এ ধরনের লোকের সংখ্যা অনেক। এমন অনিশ্চিত চেতনাধারী লোকদের দ্বারা কিছু কল্যাণ সাধিত হলেও সংস্কার ও পরিবর্তনের আশা করা যায় না!
এদিকে যখন মুসলিম বাহিনীতে চারিত্রিক অবক্ষয়জনিত বিভাজন, ওদিকে তখন ক্রুসেডার কাঠামোতে দৃশ্যমান ঐক্যের আয়োজন! এন্টিয়কের শাসক টেনক্রেড এ সময় বাইতুল মুকাদ্দাসের অধিপতি ১ম বল্ডউইনের কাছে সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন এবং ত্রিপোলি, এডেসা ও তিল-বাশিরের শাসকদের প্রতি মুসলমানদের মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের শাশ্বত ও অপরিবর্তনীয় একটি নীতি হলো-কোনো সেনাদল যদি এভাবে ঐক্যের লক্ষ্যে অগ্রসর হয়, তখন অবশ্যই তাদের প্রভাব-ভীতি ছড়িয়ে পড়ে; আর যে সেনাদল ঘোরতর কঠিন মুহূর্তেও ঐক্যবদ্ধ হতে পারে না, তাদের ভাগ্যে বিজয়ের আশা করা যায় না!
মুসলিম শিবিরের পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। অধিকাংশ রাজন্যের শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ে ভয়-ডর-শঙ্কা। হঠাৎ করেই মারা যান সুকমান আল-কুতবি (ধারণা করা যায়, অতি ভীতিই ছিল তার মৃত্যু-কারণ)। যুদ্ধ না করার উপযুক্ত অজুহাত পেয়ে যাওয়ায় আহলাত ও তিবরিজের বাহিনী প্রস্থানের সিদ্ধান্ত নেয়! হামাদানের আমির বুরসুক অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং নিজ রাজ্যে সুচিকিৎসা গ্রহণের জন্য ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন! ফলে তার বাহিনীও শিবির ত্যাগ করে। জোসেলিনের সঙ্গে গোপনে আঁতাঁত করা আহমাদিল নিজ রাজ্য মারাগায় 'হঠাৎ সৃষ্ট' অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যার বাহানা দেখিয়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি এর মাধ্যমে এক ঢিলে দুই পাখি শিকার করেন; একদিকে ক্রুসেডার-বিরোধী যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যান, অপরদিকে সদ্য-মৃত আমির সুকমান আল-কুতবির রাজ্যে ভাগ বসানোর চেষ্টা করার সুযোগ পান। ইয়াজ বিন ইলগাজি এক আজব উদ্দেশ্যে মুসলিম শিবির ত্যাগ করেন; তার লক্ষ্য মৃত আমির সুকমান আল-কুতবির বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে যা পারা যায় লুটে নেওয়া! অবশ্য তার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং উল্টো সুকমনের বাহিনী তার বাহিনীকে পরাজিত করে তাদের সঙ্গে থাকা সবকিছু লুট করে নিয়ে নিজেদের রাজ্যে ফিরে যায়!
এসব বিবরণও কেউ বিশ্বাস করবে?!
ভীরুতা ও কাপুরুষতা, পলায়ন ও বিশ্বাসঘাতকতার লক্ষ্যে এভাবে একদল রাজন্য ও সেনাপতি সকলে একজোট হতে পারে?!
হ্যাঁ, বাস্তবে এমনটিই ঘটেছিল! এখান থেকেই আমরা অনুমান করতে পারি, কেন ক্রুসেড আগ্রাসন চলাকালে মুসলমানদের ওপর বিরাট বিপর্যয় নেমে এসেছিল। যুগে যুগে দুর্বলতা ও অবসন্নতার সময় মুসলিম উম্মাহ যেসব সংকটের শিকার হয়েছে, তার কার্যকরণও আমরা এখান থেকেই উপলব্ধি করতে পারি। উনিশশ আটচল্লিশ বা উনিশশ সাতষট্টির ট্র্যাজেডি তো আমাদের থেকে খুব দূরবর্তী অতীত নয়!
মসুলের আমির মওদুদ এখন কার্যত নিঃসঙ্গ! তার সঙ্গে কেবল তার নিজস্ব বাহিনী এবং দামেশকের আমির তুগতেকিন। ওদিকে ক্রুসেডাররা সবদিক থেকে ছুটে আসছে। ক্রুসেডারদের যোদ্ধাসংখ্যা ষোলো হাজারের মতো; অবশিষ্ট মুসলিম সৈন্যদের তুলনায় যা অনেক বেশি।
এমন জটিলতর পরিস্থিতিতে মুসলিম বাহিনীর কাছে শাইজারের প্রশাসক সুলতান বিন মুনকিযের পক্ষ থেকে একটি বার্তা এসে পৌঁছায়। বার্তায় তিনি মুসলিম বাহিনীকে শাইজারে আশ্রয় গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন। তার এই প্রস্তাবে উভয় পক্ষেরই স্বার্থ নিহিত ছিল। এতে একদিকে যেমন শাইজারের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত হবে, অপরদিকে মুসলিম বাহিনীর নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে। ইবনে মুনকিযের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুসলিম বাহিনী শাইজার অভিমুখে রওনা হয় এবং সেখানে পৌঁছে নগরপ্রাচীরের অভ্যন্তরে সুরক্ষিত অবস্থান গ্রহণ করে। ক্রুসেডার বাহিনীও ততক্ষণে চলে এসেছে সিংহভাগ পালিয়ে যাওয়ার পর অবশিষ্ট মুসলিম বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার লক্ষ্যে।
নিজেদের এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় মওদুদের বাহিনীর অবস্থান তখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মওদুদ তাই এ অঞ্চলে দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ অবস্থায় আটকে থাকতে চাচ্ছিলেন না। তার সামনে তখন একটাই পথ খোলা- ক্রুসেডার বাহিনীকে ভয় দেখিয়ে নিজেদের প্রত্যাবর্তনের পথ করে নেওয়া। এ কারণেই মওদুদ দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসে ক্রুসেডারদের ওপর হামলা চালিয়ে পুনরায় দুর্গে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি আশা করছিলেন, এভাবে ঝটিকা হামলার শিকার হলে ক্রুসেডাররা প্রভাবিত হয়ে যুদ্ধে না জড়িয়ে তাকে ফিরে যাওয়ার সুযোগ করে দেবে।
মওদুদের হৃদয়ের নিষ্ঠাপূর্ণ ইচ্ছার কথা আল্লাহ তাআলা জানতেন। আল্লাহ তাই শত্রুপক্ষের সুবিশাল বাহিনীর অন্তর্জগতে ভীতি সঞ্চার করে দেন। মুসলিম বাহিনীর দুঃসাহসী আক্রমণে তারা ভীত হয়ে পড়ে। বরং মওদুদ ক্রুসেডার বাহিনীর পেছনের অংশে হামলা চালিয়ে কিছু যুদ্ধলব্ধ সম্পদও হাসিল করে নেন!
ক্রুসেডাররা বিবেচনা করে দেখে যে, এই অদম্য বীর মুজাহিদের পথ ছেড়ে দিয়ে শাম অঞ্চলের বিভিন্ন দুর্বল প্রকৃতির রাজন্যবর্গের রাজ্যে হানা দেওয়াই তাদের জন্য নিরাপদ। মওদুদও বাস্তববাদী ছিলেন। তিনি দেখছিলেন যে, বর্তমান অবস্থায় যুদ্ধচিন্তায় অটল থাকা নিজের বাহিনীকে ধ্বংসাত্মক পরিণতির দিকে ঠেলে দেওয়ার নামান্তর। তাই তিনি মসুলের পথ ধরেন। তুগতেকিনও ফিরে যান দামেশকে।
সম্মিলিত মুসলিম বাহিনীর এই অভিযান যদিও মূল লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়; কিন্তু এর মধ্য দিয়ে অন্য একটি উপকারও হয়! এ অভিযানের মাধ্যমেই এসব প্রতারক নেতার মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যায়। কেবল মওদুদের সামনে নয়; সাধারণ জনগণও সুনিশ্চিতভাবে উপলব্ধি করতে পারে যে, কারা আল্লাহর পথে লড়াইকারী নিষ্ঠাবান নেতা আর কারা অজুহাত দেখিয়ে পাশ কাটিয়ে যাওয়া কপট নেতা। যেকোনো আন্দোলন ও সংগ্রাম পূর্ণতায় পৌঁছার জন্য এই দৃষ্টিগত স্বচ্ছতা অনেক বেশি জরুরি। এমন স্বচ্ছতা থাকলে জনসাধারণ কল্পনার বালু-প্রাসাদ গড়ার মতো ভুল করে না; এমন ভণ্ড লোকদের ওপর নির্ভর করে সুমহান কোনো স্বপ্নের জাল বোনে না, যারা মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতে জানলেও কাজের কাজ কিছুই করতে পারে না!
টিকাঃ
২৮. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৫৯।
২৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪ ও Setton: op. cit., 1,p. 400.
৩০. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৫৯।
৩১. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৭৫।
৩২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪ ও আত-তারীখুল বাহির, ১৭-১৮।
৩৩. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৬০।
৩৪. Grousset: Hist. des. Croisades 1, p. 469.
৩৫. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৭৬-১৭৭।
৩৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪।
৩৭. ১৯৪৮ সালের আরব-ইহুদি সশস্ত্র বাহিনী যুদ্ধ ও ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। [সম্পাদক]
৩৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪।
*. Setton: op. cit., 1,p. 400.
কিন্তু আলেপ্পোতে রিজওয়ানের কাছে যা প্রত্যাশিত ছিল, তা-ই ঘটে! রিজওয়ান মসুল, ইরাক ও পারস্যের সম্মিলিত বাহিনীর সামনে আলেপ্পোর নগরদ্বার রুদ্ধ করে দেন এবং ঘোষণা করেন যে, তিনি ক্রুসেডার বাহিনীর তুলনায় মুসলিম বাহিনীকে বেশি ভয় পাচ্ছেন!
রিজওয়ানের এই চরম প্রতারণামূলক পদক্ষেপে মুসলিম বাহিনী কঠিন সংকটে পড়ে যায়। রিজওয়ানকে সাহায্য করতে মুসলিম বাহিনী নিজেদের মূল সাহায্যক্ষেত্র উত্তর ইরাক থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে এবং শত্রু-ভূখণ্ডের অনেকটা ভেতরে চলে এসেছে। এদিকে রিজওয়ান তাদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। এখন যদি ক্রুসেডার বাহিনী চলে আসে, তাহলে নিঃসন্দেহে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করবে। তা ছাড়া আলেপ্পোর কাছেই ছিল ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন দুর্গের অবস্থান। ওদিক থেকে বল্ডউইন ডি বুর্গ যদি মুসলিম বাহিনীর ফেরার পথ বন্ধ করে দিতে এবং তাদের কাছে সামরিক সহায়তা পৌঁছার পথ রুদ্ধ করে দিতে এডেসা থেকে বের হয়ে আসেন, তাহলে তো বিপদ বহুগুণে বেড়ে যাবে। চরম প্রতারক রিজওয়ান মুসলিম বাহিনীকে বাস্তবেই জটিল সংকটে ফেলে দিয়েছিলেন।
এমন পতনোন্মুখ পরিস্থিতিতে আলেপ্পোর জনগণের যেন হঠাৎ হুঁশ ফিরে আসে। এহেন ঘৃণ্য পদক্ষেপ থেকে রিজওয়ানকে নিবৃত্ত করতে তারা তীব্র বিক্ষোভ শুরু করে। কিন্তু রিজওয়ান আলেপ্পোর গণ্যমান্য ও নেতৃস্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তিকে বন্দি করে ফেলেন এবং আন্দোলন অব্যাহত রাখলে তাদের অনিষ্ট সাধনের হুমকি দিয়ে জনসাধারণকে দমন করেন।
নিঃসন্দেহে রিজওয়ানের এই আচরণ ছিল ইতিহাসের এক চরম নিন্দনীয় চিত্র এবং উম্মাহর দুশমনদের সামনে নতজানু হয়ে নিজ জাতি, মাতৃভূমি ও স্বধর্মীয়দের ওপর দমন-নীতি ব্যবহারকারী এক নেতার বাস্তব রূপ।
মওদুদ অনুভব করেন যে, তিনি কঠিন বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আটকে গেছেন। এরই মধ্যে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে যে, রিজওয়ান মুসলিম বাহিনীকে মার দেওয়ার জন্য খোদ টেনক্রেডের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন! সবদিক বিবেচনা করে মওদুদ আলেপ্পো থেকে দূরে সরে দামেশকের কাছাকাছি পৌঁছতে আরও দক্ষিণে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দামেশকের আমির তুগতেকিন প্রথমসারির মুজাহিদ না হলেও রিজওয়ানের তুলনায় শ্রেয়তর ছিলেন! মুসলিম বাহিনী আছি নদীর অববাহিকায় মাআ'ররাতুন-নোমানের কাছে পৌঁছার পর দামেশকের আমির তুগতেকিন সেখানে উপস্থিত হন এবং মুসলিম রাজন্যবর্গের আঘাতে আঘাতে জর্জরিত মহান সেনাপতি মওদুদ বিন তুনতেকিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অথচ স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল আঘাত আসবে ওদিক থেকে; এদিক থেকে নয়!
ইরাকি-পারসিক সম্মিলিত মুসলিম বাহিনীর নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আমির তুগতেকিন আলোচনায় মিলিত হন। আলোচনায় স্পষ্টত অনুমিত হচ্ছিল যে, তুগতেকিন যদিও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আগ্রহী; কিন্তু তিনি এই বিরাট মুসলিম বাহিনীকে (নিজ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিবেচনায়) ভয় করছেন। অবশ্য এমন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যেও তিনি সহজেই মওদুদ ও অন্যান্য রাজন্যের মধ্যে যে মোটাদাগের পার্থক্য আছে, তা অনুধাবন করতে সক্ষম হন। তিনি সুস্পষ্ট অনুভব করেন যে, প্রথমজন একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে নিঃস্বার্থ লড়াইয়ের চেতনা লালন করেন; সম্পদ বা রাজত্বের কোনো লালসা তার মাঝে নেই। আর বাহিনীর অন্যান্য নেতা সে যুগের সাধারণ আমিরদের মতোই কেবল পার্থিব স্বার্থের মোহে অভিযানে বের হয়েছে; জিহাদের কোনো চেতনাই তাদের মাঝে নেই। এখান থেকেই মওদুদ ও তুগতেকিনের মধ্যে এক হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের সূচনা হয়। তবে তুগতেকিন আশঙ্কা করছিলেন যে, অন্যান্য রাজন্য তার রাজ্যের অনিষ্ট সাধন করতে পারে। তাই মুসলিম বাহিনীকে দামেশক হতে দূরে রাখা নিশ্চিত করতে তিনি আলোচনায় সকলকে ত্রিপোলিতে আক্রমণে রাজি হতে পীড়াপীড়ি করেন। এতে তুগতেকিনের আরেকটি স্বার্থ নিহিত ছিল। যেহেতু ক্রুসেড রাজ্য ত্রিপোলির অবস্থান ছিল দামেশক রাজ্যের অধীনস্থ অঞ্চলের তুলনায় নিকটে, তাই তিনি এর মাধ্যমে তার জন্য তুলনামূলক অধিক অনিষ্টকর ক্রুসেডার নেতা ত্রিপোলি-শাসক বারট্রামকে ঘায়েল করতে চাচ্ছিলেন।
তুগতেকিনের মনোজগতে পার্থিব স্বার্থ-চিন্তা ও প্রবৃত্তির লালসা যেমন বিদ্যমান ছিল, দ্বীনি কল্যাণ-চিন্তা ও শরিয়তের চাহিদাও বিরাজমান ছিল। এই দ্বিমুখী চেতনার সংঘাতের কারণে তার পদক্ষেপ ও কার্যক্রমগুলো হতো সাংঘর্ষিক ও পরস্পর বিরোধী। তার পদচারণায় না মওদুদের মতো স্বচ্ছ জিহাদি চেতনা প্রতিভাত হতো, না রিজওয়ানের মতো সুস্পষ্ট দালালির চেতনা! এ ধরনের লোকের সংখ্যা অনেক। এমন অনিশ্চিত চেতনাধারী লোকদের দ্বারা কিছু কল্যাণ সাধিত হলেও সংস্কার ও পরিবর্তনের আশা করা যায় না!
এদিকে যখন মুসলিম বাহিনীতে চারিত্রিক অবক্ষয়জনিত বিভাজন, ওদিকে তখন ক্রুসেডার কাঠামোতে দৃশ্যমান ঐক্যের আয়োজন! এন্টিয়কের শাসক টেনক্রেড এ সময় বাইতুল মুকাদ্দাসের অধিপতি ১ম বল্ডউইনের কাছে সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন এবং ত্রিপোলি, এডেসা ও তিল-বাশিরের শাসকদের প্রতি মুসলমানদের মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের শাশ্বত ও অপরিবর্তনীয় একটি নীতি হলো-কোনো সেনাদল যদি এভাবে ঐক্যের লক্ষ্যে অগ্রসর হয়, তখন অবশ্যই তাদের প্রভাব-ভীতি ছড়িয়ে পড়ে; আর যে সেনাদল ঘোরতর কঠিন মুহূর্তেও ঐক্যবদ্ধ হতে পারে না, তাদের ভাগ্যে বিজয়ের আশা করা যায় না!
মুসলিম শিবিরের পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। অধিকাংশ রাজন্যের শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ে ভয়-ডর-শঙ্কা। হঠাৎ করেই মারা যান সুকমান আল-কুতবি (ধারণা করা যায়, অতি ভীতিই ছিল তার মৃত্যু-কারণ)। যুদ্ধ না করার উপযুক্ত অজুহাত পেয়ে যাওয়ায় আহলাত ও তিবরিজের বাহিনী প্রস্থানের সিদ্ধান্ত নেয়! হামাদানের আমির বুরসুক অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং নিজ রাজ্যে সুচিকিৎসা গ্রহণের জন্য ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন! ফলে তার বাহিনীও শিবির ত্যাগ করে। জোসেলিনের সঙ্গে গোপনে আঁতাঁত করা আহমাদিল নিজ রাজ্য মারাগায় 'হঠাৎ সৃষ্ট' অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যার বাহানা দেখিয়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি এর মাধ্যমে এক ঢিলে দুই পাখি শিকার করেন; একদিকে ক্রুসেডার-বিরোধী যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যান, অপরদিকে সদ্য-মৃত আমির সুকমান আল-কুতবির রাজ্যে ভাগ বসানোর চেষ্টা করার সুযোগ পান। ইয়াজ বিন ইলগাজি এক আজব উদ্দেশ্যে মুসলিম শিবির ত্যাগ করেন; তার লক্ষ্য মৃত আমির সুকমান আল-কুতবির বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে যা পারা যায় লুটে নেওয়া! অবশ্য তার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং উল্টো সুকমনের বাহিনী তার বাহিনীকে পরাজিত করে তাদের সঙ্গে থাকা সবকিছু লুট করে নিয়ে নিজেদের রাজ্যে ফিরে যায়!
এসব বিবরণও কেউ বিশ্বাস করবে?!
ভীরুতা ও কাপুরুষতা, পলায়ন ও বিশ্বাসঘাতকতার লক্ষ্যে এভাবে একদল রাজন্য ও সেনাপতি সকলে একজোট হতে পারে?!
হ্যাঁ, বাস্তবে এমনটিই ঘটেছিল! এখান থেকেই আমরা অনুমান করতে পারি, কেন ক্রুসেড আগ্রাসন চলাকালে মুসলমানদের ওপর বিরাট বিপর্যয় নেমে এসেছিল। যুগে যুগে দুর্বলতা ও অবসন্নতার সময় মুসলিম উম্মাহ যেসব সংকটের শিকার হয়েছে, তার কার্যকরণও আমরা এখান থেকেই উপলব্ধি করতে পারি। উনিশশ আটচল্লিশ বা উনিশশ সাতষট্টির ট্র্যাজেডি তো আমাদের থেকে খুব দূরবর্তী অতীত নয়!
মসুলের আমির মওদুদ এখন কার্যত নিঃসঙ্গ! তার সঙ্গে কেবল তার নিজস্ব বাহিনী এবং দামেশকের আমির তুগতেকিন। ওদিকে ক্রুসেডাররা সবদিক থেকে ছুটে আসছে। ক্রুসেডারদের যোদ্ধাসংখ্যা ষোলো হাজারের মতো; অবশিষ্ট মুসলিম সৈন্যদের তুলনায় যা অনেক বেশি।
এমন জটিলতর পরিস্থিতিতে মুসলিম বাহিনীর কাছে শাইজারের প্রশাসক সুলতান বিন মুনকিযের পক্ষ থেকে একটি বার্তা এসে পৌঁছায়। বার্তায় তিনি মুসলিম বাহিনীকে শাইজারে আশ্রয় গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন। তার এই প্রস্তাবে উভয় পক্ষেরই স্বার্থ নিহিত ছিল। এতে একদিকে যেমন শাইজারের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত হবে, অপরদিকে মুসলিম বাহিনীর নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে। ইবনে মুনকিযের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুসলিম বাহিনী শাইজার অভিমুখে রওনা হয় এবং সেখানে পৌঁছে নগরপ্রাচীরের অভ্যন্তরে সুরক্ষিত অবস্থান গ্রহণ করে। ক্রুসেডার বাহিনীও ততক্ষণে চলে এসেছে সিংহভাগ পালিয়ে যাওয়ার পর অবশিষ্ট মুসলিম বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার লক্ষ্যে।
নিজেদের এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় মওদুদের বাহিনীর অবস্থান তখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মওদুদ তাই এ অঞ্চলে দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ অবস্থায় আটকে থাকতে চাচ্ছিলেন না। তার সামনে তখন একটাই পথ খোলা- ক্রুসেডার বাহিনীকে ভয় দেখিয়ে নিজেদের প্রত্যাবর্তনের পথ করে নেওয়া। এ কারণেই মওদুদ দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসে ক্রুসেডারদের ওপর হামলা চালিয়ে পুনরায় দুর্গে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি আশা করছিলেন, এভাবে ঝটিকা হামলার শিকার হলে ক্রুসেডাররা প্রভাবিত হয়ে যুদ্ধে না জড়িয়ে তাকে ফিরে যাওয়ার সুযোগ করে দেবে।
মওদুদের হৃদয়ের নিষ্ঠাপূর্ণ ইচ্ছার কথা আল্লাহ তাআলা জানতেন। আল্লাহ তাই শত্রুপক্ষের সুবিশাল বাহিনীর অন্তর্জগতে ভীতি সঞ্চার করে দেন। মুসলিম বাহিনীর দুঃসাহসী আক্রমণে তারা ভীত হয়ে পড়ে। বরং মওদুদ ক্রুসেডার বাহিনীর পেছনের অংশে হামলা চালিয়ে কিছু যুদ্ধলব্ধ সম্পদও হাসিল করে নেন!
ক্রুসেডাররা বিবেচনা করে দেখে যে, এই অদম্য বীর মুজাহিদের পথ ছেড়ে দিয়ে শাম অঞ্চলের বিভিন্ন দুর্বল প্রকৃতির রাজন্যবর্গের রাজ্যে হানা দেওয়াই তাদের জন্য নিরাপদ। মওদুদও বাস্তববাদী ছিলেন। তিনি দেখছিলেন যে, বর্তমান অবস্থায় যুদ্ধচিন্তায় অটল থাকা নিজের বাহিনীকে ধ্বংসাত্মক পরিণতির দিকে ঠেলে দেওয়ার নামান্তর। তাই তিনি মসুলের পথ ধরেন। তুগতেকিনও ফিরে যান দামেশকে।
সম্মিলিত মুসলিম বাহিনীর এই অভিযান যদিও মূল লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়; কিন্তু এর মধ্য দিয়ে অন্য একটি উপকারও হয়! এ অভিযানের মাধ্যমেই এসব প্রতারক নেতার মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যায়। কেবল মওদুদের সামনে নয়; সাধারণ জনগণও সুনিশ্চিতভাবে উপলব্ধি করতে পারে যে, কারা আল্লাহর পথে লড়াইকারী নিষ্ঠাবান নেতা আর কারা অজুহাত দেখিয়ে পাশ কাটিয়ে যাওয়া কপট নেতা। যেকোনো আন্দোলন ও সংগ্রাম পূর্ণতায় পৌঁছার জন্য এই দৃষ্টিগত স্বচ্ছতা অনেক বেশি জরুরি। এমন স্বচ্ছতা থাকলে জনসাধারণ কল্পনার বালু-প্রাসাদ গড়ার মতো ভুল করে না; এমন ভণ্ড লোকদের ওপর নির্ভর করে সুমহান কোনো স্বপ্নের জাল বোনে না, যারা মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতে জানলেও কাজের কাজ কিছুই করতে পারে না!
টিকাঃ
২৮. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৫৯।
২৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪ ও Setton: op. cit., 1,p. 400.
৩০. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৫৯।
৩১. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৭৫।
৩২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪ ও আত-তারীখুল বাহির, ১৭-১৮।
৩৩. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৬০।
৩৪. Grousset: Hist. des. Croisades 1, p. 469.
৩৫. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৭৬-১৭৭।
৩৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪।
৩৭. ১৯৪৮ সালের আরব-ইহুদি সশস্ত্র বাহিনী যুদ্ধ ও ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। [সম্পাদক]
৩৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৪।
*. Setton: op. cit., 1,p. 400.
📄 মওদুদ দমার পাত্র নন!
এভাবে উপর্যুপরি আঘাতে জর্জরিত হয়েও মওদুদ তার দায়িত্ব ভুলে যাননি। যদিও তার রাজ্য ছিল শান্তিপূর্ণ এবং সংঘাতস্থল থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থিত, রাজ্যের পরিস্থিতি ছিল স্থিতিশীল এবং তিনি লাভ করেছিলেন জনগণের অকুণ্ঠ ভালোবাসা; কিন্তু তিনি তো ছিলেন আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ এবং দ্বীন ও উম্মাহর প্রতি আপন দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন একজন নেতা। আর তাই একের পর এক বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েও তিনি তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন।
একই বছর অর্থাৎ ৫০৫ হিজরি সনের জিলকদ মাসে (১১১২ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) তিনি পুনরায় তার বাহিনীকে প্রস্তুত করে আচমকা এডেসা নগরীতে আক্রমণ করেন! এডেসা দুর্গের দুর্ভেদ্যতা এবং নিজ বাহিনীর সৈন্য-স্বল্পতা সত্ত্বেও তিনি আবারও অভিযান পরিচালনায় পিছপা হননি। কিন্তু বাস্তবেই এত সামান্য সংখ্যক সৈন্য নিয়ে এডেসা জয় করা সম্ভব ছিল না। তাই তিনি এডেসার কাছেই ফুরাতের পূর্ব তীরে অবস্থিত সারুজ নগরী অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নেন। সারুজ ছিল ফুরাতের পূর্ব তীরে ক্রুসেডারদের দ্বিতীয় প্রধান ঘাঁটি। তবে মওদুদ আশঙ্কা করছিলেন যে, তিনি সারুজ অভিমুখে অগ্রসর হলে এডেসার শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গ দুর্গ ছেড়ে বেরিয়ে এসে তার বাহিনীর পেছনের অংশে হামলা চালাতে পারেন। তাই তিনি তার বাহিনীর একটি অংশকে এডেসা অবরোধে রেখে অন্য অংশ নিয়ে সারুজ অভিমুখে অগ্রসর হন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তিল-বাশিরের প্রশাসক জোসেলিনের কাছে এ সংবাদ পৌঁছে যায়। তিনি যখন জানতে পারেন যে, মওদুদ তার বাহিনীর ক্ষুদ্র একটি অংশ নিয়ে সারুজ অভিমুখে রওনা হয়েছেন, তখন তিনি সুযোগ কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং তার বাহিনী নিয়ে সারুজের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন। সারুজে পৌঁছে জোসেলিন মওদুদের বাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম হন। মুসলিম বাহিনীর অনেক সৈন্য হতাহত হয়। সম্ভবত মওদুদ তার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা অনুমান করতে ভুল করেছিলেন এবং অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়েই বিরাট সংখ্যক ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়তে অগ্রসর হয়েছিলেন।
হৃদয়ে পরাজয়ের ক্ষত নিয়েই মওদুদ দ্রুত এডেসায় ফিরে আসেন এবং এডেসা অবরোধ করে রাখা সৈন্যদের সঙ্গে মিলিত হন।
সারুজে যখন যুদ্ধ চলছিল, এদিকে এডেসা অবরোধকারী মুসলিম বাহিনী তখন এডেসার অভ্যন্তরে বসবাসকারী আর্মেনীয়দের সঙ্গে গোপনে সমঝোতা চুক্তি করতে সক্ষম হয়েছিল! চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তারা এডেসা নগরীর পূর্ব অংশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গের নিয়ন্ত্রণ মুসলমানদের হাতে তুলে দেয়। মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা সেদিক দিয়ে এডেসার অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে শুরু করে। এ সময়ই মওদুদ সারুজ থেকে ফিরে আসেন এবং তার সৈন্যদের নিয়ে দ্রুত এডেসার পতন প্রচেষ্টায় শরিক হন। তবে জোসেলিন ঘটনাপ্রবাহ অনুমান করতে পেরে তার বাহিনী নিয়ে দ্রুত সারুজ থেকে এডেসায় চলে আসেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মওদুদ অনুভব করেন যে, অবশিষ্ট সৈন্যদের নিয়ে সমবেত ক্রুসেডারদের পরাভূত করা সম্ভব নয়। তাই তিনি মসুলে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এভাবেই মওদুদ রহ. হতাশ না হয়ে একের পর এক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত এডেসা-পতনক্ষণের তখনও বেশ দেরি ছিল!
জিহাদের এই সুকঠিন পথের চূড়ান্ত মনজিল হলো জান্নাত। প্রত্যাশিত ফলাফল নয়; আপন সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ত্যাগই এখানে মুখ্য। উহুদ যুদ্ধের শহিদান নিহত হয়েছেন মুসলমানদের কঠিন এক দুর্যোগকালে! অথচ জান্নাতে তাদের মর্যাদা কত উঁচু! তারা অবস্থান করবেন সুরম্য প্রাসাদের সর্বোচ্চ স্তরে! হামজা বিন আবদুল মুত্তালিব হবেন জান্নাতে শহিদানের সর্দার! কারণ, তারা নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে আদায় করেছেন; অবহেলা বা শিথিলতা প্রদর্শন করেননি।
তবে মওদুদের গল্পের সমাপ্তি টানার আগে আমাদের জানতে হবে যে, এডেসায় কী এমন ঘটেছিল, যার কারণে খ্রিষ্টান হয়েও আর্মেনীয়রা মুসলমানদের সঙ্গে গোপনে পত্রবিনিময় করেছিল এবং তাদেরকে নগরীটিতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছিল। এ ঘটনা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের শাসনের তুলনায় ইসলামি শাসনকে হাজার গুণ সদয়, সহনীয় ও ন্যায়ানুগ বিবেচনা করেছিল। এ কারণেই তারা নিজেদের ধর্মীয় ভাইদের বলি দিয়ে মুসলমানদের সহায়তা করেছিল। ব্যক্তিবিশেষকে অর্থ বা অন্য কিছুর লোভ দেখিয়ে সুবিধা অর্জন করা হয়নি; বরং একটি জনগোষ্ঠীর সিংহভাগের উদ্যোগে এমনটি সংঘটিত হয়েছিল। নিঃসন্দেহে এটি ইসলামি শাসনব্যবস্থা মূল্যায়নের এক প্রকৃষ্ট দলিল।
স্বভাবতই এ তথ্যে মোটেও বিস্ময়ের কিছু নেই যে, মওদুদ চলে যাওয়ার পরই এডেসায় ক্রুসেডারদের পক্ষ থেকে আর্মেনীয়দের বিচারের জন্য নিপীড়নমূলক সামরিক আদালত স্থাপন করা হয়। এরপর যেমনটি প্রত্যাশিত ছিল, তেমনই ঘটে; আর্মেনীয়দের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারমূলক রায় প্রদান করা হয়, বহু মানুষকে হত্যা করা হয়, অন্যদেরকে নগর-ত্যাগে বাধ্য করা হয়। ফলে ক্রুসেডার-আর্মেনীয় সহাবস্থান চূড়ান্ত পর্যায়ের কঠিন হয়ে ওঠে। অবশ্য বছর চারেক পূর্বে ৫০১ হিজরি সনে (১১০৮ খ্রিষ্টাব্দে) বল্ডউইন ডি বুর্গ বন্দিদশা থেকে ফিরে আসার পর থেকেই আর্মেনীয়দের সঙ্গে তার সম্পর্ক অস্থিরতাপূর্ণ ছিল।
সুস্পষ্ট অনুমিত হচ্ছিল যে, এডেসা রাজ্যের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি দিনে দিনে জটিল হয়ে উঠছে। বল্ডউইন এ সময় তার চারপাশের সকলকেই সন্দেহের চোখে দেখতে থাকেন এবং আশঙ্কা করেন যে, তারা তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে মুসলমানদের সঙ্গে গোপনে মিত্রতা করছে। সন্দেহ-রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মানসিক ভারসাম্যই হারিয়ে ফেলেন এবং শেষ পর্যন্ত রাজ্যের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা জোসেলিনকেও সন্দেহ করতে শুরু করেন! জোসেলিনের অপরাধ, আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী তাকে পছন্দ করে! একপর্যায়ে তিনি জোসেলিনকে তিল-বাশিরের প্রশাসক পদ হতে বরখাস্ত করেন এবং তাকে রাজ্য থেকে বহিষ্কার করেন। অথচ বল্ডউইনের বন্দিত্বের সময় এবং পরবর্তীকালে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুদ্ধে এই জোসেলিন বল্ডউইনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, বল্ডউইনের অনুপস্থিতিতে এডেসা রাজ্যের শান্তি-নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করেছেন এবং সবশেষে মওদুদের বাহিনীকে পরাজিত করেছেন। কিন্তু এসবের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে বল্ডউইন তাকে পদচ্যুত করেন। বিতাড়িত জোসেলিন বাইতুল মুকাদ্দাসের অধিপতি ১ম বল্ডউইনের কাছে চলে গেলে তিনি তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানান এবং তার ব্যাপক সামরিক দক্ষতা কাজে লাগাতে তাকে তাবারিয়া ও জালিল অঞ্চলের জায়গির প্রদান করেন।
৫০৫ হিজরি সনে (১ ১১২ খ্রিষ্টাব্দে) মওদুদের অভিযান আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থ হলেও মূলত একে কেন্দ্র করেই এডেসার অভ্যন্তরে ব্যাপক পরিসরে গোলযোগ সৃষ্টি হয় এবং পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। উপরি পাওনা হিসেবে ছিল এডেসাকেন্দ্রিক সংঘাতের ক্ষেত্র থেকে কঠিন প্রতিপক্ষ জোসেলিনের বিদায়!
টিকাঃ
80. Stevenson: op. cit., p. 95.
৪১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৭, Matthieu d' Edesse, p. 100.
42. Matthieu d' Edesse, p. 101.
40. Michel Le Syrien, III, p. 196.
৪৪. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'সকল শহিদদের সর্দার হবেন হামজা বিন আবদুল মুত্তালিব।' তাবারানি, আল-মুজামুল আওসাত, ৪/২৩৮ ও হাকিম, আল-মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন, হাদিস নং ২৫৫৭। [অনুবাদক]
45. Matthieu d' Edesse, pp. 104-106.
46. Runciman: op. cit., 11,p. 124.
47. Runciman: op. cit., 11,p. 124.
এভাবে উপর্যুপরি আঘাতে জর্জরিত হয়েও মওদুদ তার দায়িত্ব ভুলে যাননি। যদিও তার রাজ্য ছিল শান্তিপূর্ণ এবং সংঘাতস্থল থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থিত, রাজ্যের পরিস্থিতি ছিল স্থিতিশীল এবং তিনি লাভ করেছিলেন জনগণের অকুণ্ঠ ভালোবাসা; কিন্তু তিনি তো ছিলেন আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ এবং দ্বীন ও উম্মাহর প্রতি আপন দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন একজন নেতা। আর তাই একের পর এক বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েও তিনি তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন।
একই বছর অর্থাৎ ৫০৫ হিজরি সনের জিলকদ মাসে (১১১২ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) তিনি পুনরায় তার বাহিনীকে প্রস্তুত করে আচমকা এডেসা নগরীতে আক্রমণ করেন! এডেসা দুর্গের দুর্ভেদ্যতা এবং নিজ বাহিনীর সৈন্য-স্বল্পতা সত্ত্বেও তিনি আবারও অভিযান পরিচালনায় পিছপা হননি। কিন্তু বাস্তবেই এত সামান্য সংখ্যক সৈন্য নিয়ে এডেসা জয় করা সম্ভব ছিল না। তাই তিনি এডেসার কাছেই ফুরাতের পূর্ব তীরে অবস্থিত সারুজ নগরী অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নেন। সারুজ ছিল ফুরাতের পূর্ব তীরে ক্রুসেডারদের দ্বিতীয় প্রধান ঘাঁটি। তবে মওদুদ আশঙ্কা করছিলেন যে, তিনি সারুজ অভিমুখে অগ্রসর হলে এডেসার শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গ দুর্গ ছেড়ে বেরিয়ে এসে তার বাহিনীর পেছনের অংশে হামলা চালাতে পারেন। তাই তিনি তার বাহিনীর একটি অংশকে এডেসা অবরোধে রেখে অন্য অংশ নিয়ে সারুজ অভিমুখে অগ্রসর হন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তিল-বাশিরের প্রশাসক জোসেলিনের কাছে এ সংবাদ পৌঁছে যায়। তিনি যখন জানতে পারেন যে, মওদুদ তার বাহিনীর ক্ষুদ্র একটি অংশ নিয়ে সারুজ অভিমুখে রওনা হয়েছেন, তখন তিনি সুযোগ কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং তার বাহিনী নিয়ে সারুজের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন। সারুজে পৌঁছে জোসেলিন মওদুদের বাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম হন। মুসলিম বাহিনীর অনেক সৈন্য হতাহত হয়। সম্ভবত মওদুদ তার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা অনুমান করতে ভুল করেছিলেন এবং অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়েই বিরাট সংখ্যক ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়তে অগ্রসর হয়েছিলেন।
হৃদয়ে পরাজয়ের ক্ষত নিয়েই মওদুদ দ্রুত এডেসায় ফিরে আসেন এবং এডেসা অবরোধ করে রাখা সৈন্যদের সঙ্গে মিলিত হন।
সারুজে যখন যুদ্ধ চলছিল, এদিকে এডেসা অবরোধকারী মুসলিম বাহিনী তখন এডেসার অভ্যন্তরে বসবাসকারী আর্মেনীয়দের সঙ্গে গোপনে সমঝোতা চুক্তি করতে সক্ষম হয়েছিল! চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তারা এডেসা নগরীর পূর্ব অংশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গের নিয়ন্ত্রণ মুসলমানদের হাতে তুলে দেয়। মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা সেদিক দিয়ে এডেসার অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে শুরু করে। এ সময়ই মওদুদ সারুজ থেকে ফিরে আসেন এবং তার সৈন্যদের নিয়ে দ্রুত এডেসার পতন প্রচেষ্টায় শরিক হন। তবে জোসেলিন ঘটনাপ্রবাহ অনুমান করতে পেরে তার বাহিনী নিয়ে দ্রুত সারুজ থেকে এডেসায় চলে আসেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মওদুদ অনুভব করেন যে, অবশিষ্ট সৈন্যদের নিয়ে সমবেত ক্রুসেডারদের পরাভূত করা সম্ভব নয়। তাই তিনি মসুলে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এভাবেই মওদুদ রহ. হতাশ না হয়ে একের পর এক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত এডেসা-পতনক্ষণের তখনও বেশ দেরি ছিল!
জিহাদের এই সুকঠিন পথের চূড়ান্ত মনজিল হলো জান্নাত। প্রত্যাশিত ফলাফল নয়; আপন সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ত্যাগই এখানে মুখ্য। উহুদ যুদ্ধের শহিদান নিহত হয়েছেন মুসলমানদের কঠিন এক দুর্যোগকালে! অথচ জান্নাতে তাদের মর্যাদা কত উঁচু! তারা অবস্থান করবেন সুরম্য প্রাসাদের সর্বোচ্চ স্তরে! হামজা বিন আবদুল মুত্তালিব হবেন জান্নাতে শহিদানের সর্দার! কারণ, তারা নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে আদায় করেছেন; অবহেলা বা শিথিলতা প্রদর্শন করেননি।
তবে মওদুদের গল্পের সমাপ্তি টানার আগে আমাদের জানতে হবে যে, এডেসায় কী এমন ঘটেছিল, যার কারণে খ্রিষ্টান হয়েও আর্মেনীয়রা মুসলমানদের সঙ্গে গোপনে পত্রবিনিময় করেছিল এবং তাদেরকে নগরীটিতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছিল। এ ঘটনা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের শাসনের তুলনায় ইসলামি শাসনকে হাজার গুণ সদয়, সহনীয় ও ন্যায়ানুগ বিবেচনা করেছিল। এ কারণেই তারা নিজেদের ধর্মীয় ভাইদের বলি দিয়ে মুসলমানদের সহায়তা করেছিল। ব্যক্তিবিশেষকে অর্থ বা অন্য কিছুর লোভ দেখিয়ে সুবিধা অর্জন করা হয়নি; বরং একটি জনগোষ্ঠীর সিংহভাগের উদ্যোগে এমনটি সংঘটিত হয়েছিল। নিঃসন্দেহে এটি ইসলামি শাসনব্যবস্থা মূল্যায়নের এক প্রকৃষ্ট দলিল।
স্বভাবতই এ তথ্যে মোটেও বিস্ময়ের কিছু নেই যে, মওদুদ চলে যাওয়ার পরই এডেসায় ক্রুসেডারদের পক্ষ থেকে আর্মেনীয়দের বিচারের জন্য নিপীড়নমূলক সামরিক আদালত স্থাপন করা হয়। এরপর যেমনটি প্রত্যাশিত ছিল, তেমনই ঘটে; আর্মেনীয়দের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারমূলক রায় প্রদান করা হয়, বহু মানুষকে হত্যা করা হয়, অন্যদেরকে নগর-ত্যাগে বাধ্য করা হয়। ফলে ক্রুসেডার-আর্মেনীয় সহাবস্থান চূড়ান্ত পর্যায়ের কঠিন হয়ে ওঠে। অবশ্য বছর চারেক পূর্বে ৫০১ হিজরি সনে (১১০৮ খ্রিষ্টাব্দে) বল্ডউইন ডি বুর্গ বন্দিদশা থেকে ফিরে আসার পর থেকেই আর্মেনীয়দের সঙ্গে তার সম্পর্ক অস্থিরতাপূর্ণ ছিল।
সুস্পষ্ট অনুমিত হচ্ছিল যে, এডেসা রাজ্যের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি দিনে দিনে জটিল হয়ে উঠছে। বল্ডউইন এ সময় তার চারপাশের সকলকেই সন্দেহের চোখে দেখতে থাকেন এবং আশঙ্কা করেন যে, তারা তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে মুসলমানদের সঙ্গে গোপনে মিত্রতা করছে। সন্দেহ-রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মানসিক ভারসাম্যই হারিয়ে ফেলেন এবং শেষ পর্যন্ত রাজ্যের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা জোসেলিনকেও সন্দেহ করতে শুরু করেন! জোসেলিনের অপরাধ, আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী তাকে পছন্দ করে! একপর্যায়ে তিনি জোসেলিনকে তিল-বাশিরের প্রশাসক পদ হতে বরখাস্ত করেন এবং তাকে রাজ্য থেকে বহিষ্কার করেন। অথচ বল্ডউইনের বন্দিত্বের সময় এবং পরবর্তীকালে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুদ্ধে এই জোসেলিন বল্ডউইনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, বল্ডউইনের অনুপস্থিতিতে এডেসা রাজ্যের শান্তি-নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করেছেন এবং সবশেষে মওদুদের বাহিনীকে পরাজিত করেছেন। কিন্তু এসবের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে বল্ডউইন তাকে পদচ্যুত করেন। বিতাড়িত জোসেলিন বাইতুল মুকাদ্দাসের অধিপতি ১ম বল্ডউইনের কাছে চলে গেলে তিনি তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানান এবং তার ব্যাপক সামরিক দক্ষতা কাজে লাগাতে তাকে তাবারিয়া ও জালিল অঞ্চলের জায়গির প্রদান করেন।
৫০৫ হিজরি সনে (১ ১১২ খ্রিষ্টাব্দে) মওদুদের অভিযান আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থ হলেও মূলত একে কেন্দ্র করেই এডেসার অভ্যন্তরে ব্যাপক পরিসরে গোলযোগ সৃষ্টি হয় এবং পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। উপরি পাওনা হিসেবে ছিল এডেসাকেন্দ্রিক সংঘাতের ক্ষেত্র থেকে কঠিন প্রতিপক্ষ জোসেলিনের বিদায়!
টিকাঃ
80. Stevenson: op. cit., p. 95.
৪১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪৭, Matthieu d' Edesse, p. 100.
42. Matthieu d' Edesse, p. 101.
40. Michel Le Syrien, III, p. 196.
৪৪. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'সকল শহিদদের সর্দার হবেন হামজা বিন আবদুল মুত্তালিব।' তাবারানি, আল-মুজামুল আওসাত, ৪/২৩৮ ও হাকিম, আল-মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন, হাদিস নং ২৫৫৭। [অনুবাদক]
45. Matthieu d' Edesse, pp. 104-106.
46. Runciman: op. cit., 11,p. 124.
47. Runciman: op. cit., 11,p. 124.