📄 বোহেমন্ডের পতন
বালিখের যুদ্ধে বোহেমন্ড তার বাহিনীর উল্লেখযোগ্য একটি অংশ হারান। এরপর তিনি হারান এন্টিয়কের উত্তরে অবস্থিত কয়েকটি দুর্গ, নগরী ও জনপদের নিয়ন্ত্রণ। তার প্রতিকূল অবস্থার সুযোগ নিয়ে এ সময় অতি দুর্বল শাসক রিজওয়ান বিন তুতুশও তার রাজত্বের বিভিন্ন অংশে আক্রমণ চালান। এর পরপরই তিনি বাইজান্টাইনদের ক্রমাগত আঘাতের শিকার হন; হাতছাড়া হয়ে যায় পুরো কিলিকিয়া অঞ্চল, হাতছাড়া হয় লাতাকিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা। এভাবে একের পর এক সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষতির শিকার হওয়ায় এ অঞ্চলে বোহেমন্ডের প্রভাব ও মূল্যায়ন বহুগুণে হ্রাস পায়। এতে প্রভাবিত হয়ে বোহেমন্ড এমন এক চারিত্রিক স্খলনের শিকার হন, যার কারণে ক্রুসেডারদের কাছে তার সুখ্যাতি ধুলোয় মিশে যাওয়ার উপক্রম হয়!
বোহেমন্ডের কাছে মসুলের মুসলিম বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ একজন সেলজুক আমির বন্দি ছিল। এ সময় মসুলের শাসক জাকারমিশ বন্দি মুসলিম আমিরকে মুক্তি দেওয়ার জন্য বোহেমন্ডকে অনুরোধ জানান এবং বিনিময় হিসেবে দুটি প্রস্তাব দেন-১. জাকারমিশ মুসলিম আমিরের মুক্তির পরিবর্তে এডেসার শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গকে মুক্তি দেবেন। ২. অথবা মুক্তিপণ হিসেবে বোহেমন্ডকে পনেরো হাজার দিনার প্রদান করবেন।
বোহেমন্ডের কাছ থেকে এমনটি মোটেও প্রত্যাশিত ছিল না যে, তিনি বল্ডউইনকে মুক্ত করার পরিবর্তে অর্থপ্রাপ্তিকে প্রাধান্য দেবেন। তা ছাড়া এ সময় তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক ও বল্ডউইন ডি বুর্গের চাচাতো ভাই ১ম বল্ডউইনের কাছ থেকে একটি পত্র লাভ করেন। পত্রে ১ম বল্ডউইন তাকে বল্ডউইন ডি বুর্গকে মুক্ত করার চেষ্টা চালাতে উদ্বুদ্ধ করেন। এ তথ্যটিও প্রণিধানযোগ্য যে, স্বয়ং বোহেমন্ড যখন গাজি বিন দানিশমান্দের কাছে বন্দি ছিলেন, তখন এই বল্ডউইন ডি বুর্গই তাকে উদ্ধারের জন্য সম্ভাব্য সকল পন্থায় চেষ্টা চালিয়েছিলেন। এমনকি বোহেমন্ডকে ছাড়িয়ে আনতে এক লক্ষ দিনারের বিরাট অঙ্কের মুক্তিপণ প্রদান করার সময় বল্ডউইন ডি বুর্গ বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে সহায়তা করেছিলেন। এখন বন্দি সেলজুক আমিরকে মুক্তিদানের বিনিময়ে বোহেমন্ডকে যে অঙ্ক প্রদানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তার চেয়ে সে অঙ্ক ছিল কয়েকগুণ বেশি। এই সকল দিকের বিবেচনায় বোহেমন্ডের কাছ থেকে এই সিদ্ধান্তই নিশ্চিত প্রত্যাশিত ছিল যে, তিনি অর্থগ্রহণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বন্দি বিনিময়ের প্রস্তাবেই রাজি হবেন। কিন্তু সবাইকে হতভম্ব করে বোহেমন্ড বল্ডউইনকে মুক্ত করার পরিবর্তে অর্থের বিনিময়ে বন্দি সেলজুক আমিরকে ছেড়ে দেন! বোহেমন্ডের এই চরম চারিত্রিক হীনতা ও দীনতার কারণে বল্ডউইন ডি বুর্গকে এরপরও বেশ কয়েক বছর বন্দিজীবন কাটাতে হয়। (৬৭৮)
বোহেমন্ডের এমন নিকৃষ্টতর আচরণে ক্রুসেড রাজ্যগুলোতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় ওঠে। একের পর এক বিপদের পর এবার ক্রুসেডার সমাজ হতে বিচ্ছিন্নতা, শত্রুর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং খোদ এন্টিয়ক রাজ্যের অভ্যন্তরে দ্রুত সংকুচিত পরিস্থিতির শিকার হওয়ায় বোহেমন্ড এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন পুরো ময়দান ছেড়ে দিয়ে ইউরোপে চলে যাবেন! এই চলে যাওয়া মানে ইসলামি প্রাচ্য অঞ্চলে নিজের রাজত্ব ছেড়ে একেবারে চলে যাওয়া নয়। বোহেমন্ড তো এত সহজে নতি স্বীকার করার লোক নন। তিনি চাচ্ছিলেন ফ্রান্স ও ইতালিতে গিয়ে সেখানে সকলকে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলবেন। বোহেমন্ড উপলব্ধি করেছিলেন যে, রিজওয়ান বিন তুতুশ ভয় পাওয়ার মতো কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নন; প্রয়োজনের সময় সহজেই তার দফারফা করা যাবে। তার রাজ্যের প্রকৃত হুমকি আসলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য। (৬৮৯) আর বাস্তবতার বিচারে তার এই উপলব্ধি মোটেও অমূলক ছিল না। অবশেষে বালিখের যুদ্ধের কিছুদিন পর বোহেমন্ড টেনক্রেডকে এন্টিয়কের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে নিজে ইউরোপে চলে যান। টেনক্রেড এবার পরিণত হন এন্টিয়ক ও এডেসা দুই রাজ্যের একক শাসনকর্তায়। (৬৮০)
এভাবেই চরম হিংস্র ও দুর্বিনীত ক্রুসেডার সেনাপতি বোহেমন্ড চলমান সংঘাতের ক্ষেত্র ছেড়ে দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে যান।
বোহেমন্ডের ইউরোপকাহিনির সংক্ষিপ্ত বিবরণও এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। তাহলে ইতিহাসের এমন উত্তপ্ত একটি অধ্যায় আমাদের অগোচরে থাকবে না। বোহেমন্ড ফ্রান্স ও ইতালিতে গিয়ে বাইজান্টাইনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ ও সৈন্যসমাবেশে সক্ষম হন। তিনি সকলকে এখনই বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের লালসার লাগাম টেনে ধরার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আশ্বস্ত করেন। তিনি সকলকে বোঝান যে, বাইজান্টাইনরা ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে মুসলিম সেলজুকদের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময় করছে (৬৮১) এবং ৪৯৪ হিজরি সনে (১১০১ খ্রিষ্টাব্দে) ইউরোপ থেকে প্রেরিত ক্রুসেডার বাহিনীগুলোর শোচনীয় পতনের পেছনে এই বাইজান্টাইন-সেলজুক সম্পর্কই দায়ী ছিল।
বোহেমন্ডের প্রচেষ্টায় তার নেতৃত্বে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য পশ্চিম ইউরোপের ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, ইংল্যান্ড ও জার্মানি প্রভৃতি রাষ্ট্র থেকে বিশাল এক বাহিনী প্রস্তুত হয়ে যায়। (৬৮২)
বোহেমন্ড এন্টিয়ক ছেড়ে আসার তিন বছর পর ৫০০ হিজরি সনে (১১০৭ খ্রিষ্টাব্দে) দুরাস (Durrës) নৌবন্দরে সংঘটিত হয় এক নিষ্পত্তিমূলক যুদ্ধ। আড্রিয়াটিক (Adriatic) সাগরের প্রবেশমুখে অবস্থিত নৌবন্দরটিতে বাইজান্টাইনদের অতি সুরক্ষিত একটি দুর্গ ছিল। (৬৮৩) যুদ্ধে বাইজান্টাইন সম্রাট ১ম অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস বোহেমন্ডের বাহিনীর বিরুদ্ধে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেন। সম্রাট নিজে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন। পরাজিত বোহেমন্ড ৫০১ হিজরি সনে (১১০৮ খ্রিষ্টাব্দে) ডেভল (Devol) নগরীতে অত্যন্ত লাঞ্ছনাকর এক আত্মসমর্পণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। (৬৮৪) চুক্তিতে তিনি তিন গুরুত্বপূর্ণ নগরী (তারসুস, আদানা ও মপসুয়েসটিয়া)-সহ পুরো কিলিকিয়া অঞ্চল ও লাতাকিয়া নৌবন্দরে বাইজান্টাইনদের কর্তৃত্ব মেনে নেন এবং স্বীকারোক্তি প্রদান করেন যে, এসব অঞ্চল এন্টিয়ক রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত নয়। চুক্তিতে বাইজান্টাইন সম্রাট শর্তারোপ করেন যে, তিনি এন্টিয়কের প্রধান গির্জা হতে ক্যাথলিক বিশপকে বরখাস্ত করে সেখানে একজন অর্থোডক্স বিশপ নিযুক্ত করবেন। বোহেমন্ড চুক্তিতে এই অঙ্গীকারও করেন যে, তার ভাগ্নে টেনক্রেড যদি চুক্তির কোনো ধারা প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে তিনি টেনক্রেডের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাকে চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য করবেন! (৬৮৫)
এমন চরম লাঞ্ছনা মাথায় নিয়ে বোহেমন্ড কোন মুখে এন্টিয়কে ফিরে যাবেন! কীভাবে মিলিত হবেন ক্রুসেড অভিযানের সঙ্গীদের সঙ্গে! আর তাই ডেভলের চুক্তির পর তিনি সিসিলি দ্বীপে ফিরে যান এবং সেখানেই তিন বছর নিঃসঙ্গ ও লাঞ্ছিত অবস্থায় জীবন কাটিয়ে অবশেষে ৫০৪ হিজরি সনে (১১১১ খ্রিষ্টাব্দে) পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। এভাবেই সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব, রিক্ত অবস্থায় শেষ হয় বোহেমন্ড-অধ্যায়! (৬৮৬)
আর তাই আমরা দাবি করতে পারি যে, এই বিস্ময়কর যুদ্ধই (বালিখের যুদ্ধ) মূলত বোহেমন্ডের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শেষ করে দিয়েছিল।
চলমান ঘটনাপ্রবাহের যেকোনো বিশ্লেষক হয়তো অবাক হয়ে ভাববেন যে, এতগুলো বড় বড় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব সৃষ্টি হয়েছিল এমন সাধারণ এক যুদ্ধের মাধ্যমে, যার ব্যাপ্তি ছিল মাত্র এক দিন! যুদ্ধটির জন্য মুসলমানদের দীর্ঘমেয়াদি কোনো প্রস্তুতিও ছিল না। ক্রুসেডার বাহিনীর নিহত সৈন্যসংখ্যাও যে খুব বেশি ছিল, তাও নয়—মাত্র বারো হাজার! অথচ ৪৯৪ হিজরি সনে (১১০১ খ্রিষ্টাব্দে) সংঘটিত তিনটি যুদ্ধে দুই লক্ষের অধিক ক্রুসেড সেনা নিহত হলেও সেই যুদ্ধগুলো এই মানের কোনো প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেনি।
কী পার্থক্য ছিল উভয় যুদ্ধের মধ্যে?! পার্থক্য এই ছিল যে, বালিখের যুদ্ধে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর ঝান্ডা উড্ডীন করা হয়েছিল, যুদ্ধ করা হয়েছিল নিষ্ঠার সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায়, মুসলিম বাহিনী প্রতিনিধিত্ব করছিল ইসলামের। আর তাই মহান আল্লাহ তাআলাও এর ফলাফলে বরকত ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব দান করেন।
অপরদিকে মুরসিফানের যুদ্ধ এবং হিরাক্লিয়ার প্রথম ও দ্বিতীয় যুদ্ধ যদিও আকারে-প্রকারে বালিখের যুদ্ধের চেয়ে বড় ছিল; কিন্তু সেসব যুদ্ধ করা হয়েছিল কেবল রাজ্য, ভূখণ্ড, সম্পদ ও ক্ষমতা রক্ষার লক্ষ্যে। তখন যোদ্ধাদের হৃদয়জগৎ আল্লাহ তাআলার প্রতি নিবেদিত ছিল না; নিবদ্ধ ছিল পার্থিব সম্পদ অর্জনের প্রতি। প্রকৃতপক্ষে লড়াই হয়েছিল যুদ্ধলব্ধ সম্পদের বণ্টনে নিজেদের ভাগ নিশ্চিত করার জন্য। বালিখের যুদ্ধে কিন্তু আমরা এমনটি দেখিনি। বরং সেখানে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি সুকমান বিন উরতুকের তাকওয়া ও খোদাভীতি, নিষ্ঠা ও নির্মোহতা এবং বিভেদ-বিসংবাদ থেকে বেঁচে থাকার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। এমনকি জাকারমিশ যদিও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ প্রাপ্তির প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন; কিন্তু আপন স্থানে তা-ও বড় কোনো বিচ্যুতি নয়। কারণ, তিনি ও তার বাহিনী সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে শরিক ছিল। আমরা দেখেছি তিনি একজন মুসলিম সেলজুক আমিরকে মুক্ত করার বিনিময়ে মূল্যবান বন্দিকেও ছেড়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন; যা প্রমাণ করে যে, তার কাছে একজন মুসলিম বন্দির মূল্য ছিল, ছিল উভয় বাহিনীর হৃদ্যতা ও সম্প্রীতির চেতনা। বোহেমন্ড যেমন সম্পদের লালসায় বল্ডউইন ডি বুর্গের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে উদ্ধারে আগ্রহ দেখাননি, জাকারমিশ তেমনটি করেননি।
টিকাঃ
৬৭৮. Runciman: op. cit., 11, p. 45.
৬৮৯. Stevenson: op. cit., pp. 78.
৬৮০. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/৩২৮।
৬৮১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/ ১০৩. ও Albert d' Aix, p. 651.
৬৮২. Vasiliev: op, cit., 11, pp. 410-411.
৬৮৩. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/৩২৯।
৬৮৪. Chalandon: Alexis Comnene, p. 233.
৬৮৫. Grousset: Hist. des Croisades, 1, p. 418.
৬৮৬. Vasiliev: op. cit., II, p. 411.
📄 সন্ধি ও বিভাজন!
৪৯৬ হিজরি সনে (১১০৪ খ্রিষ্টাব্দে) বালিখের যুদ্ধে বিজয়ই মুসলমানদের একমাত্র আনন্দদায়ক সংবাদ ছিল না। একই বছর এ অঞ্চলের মুসলমানরা লাভ করে আরেকটি সুখকর সংবাদ। অবশ্য দ্বিতীয় সংবাদটির প্রভাব ছিল কিছুটা ব্যতিক্রম! এ বছরই পরস্পর বিবাদমান দুই ভাই সুলতান বারকিয়ারুক ও সুলতান মুহাম্মাদের মধ্যে সন্ধি স্থাপিত হয়। উভয়ে যদিও সমুন্নত চরিত্রগুণের অধিকারী ছিলেন; কিন্তু তাদের পারস্পরিক বিবাদ দিনে দিনে প্রকট রূপ ধারণ করে হানাহানি-সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে আল্লাহ তাআলার অপার অনুগ্রহে এ বছরই তারা একমত হতে সক্ষম হন এবং উভয়ের সন্তুষ্টিতে পারস্পরিক সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো সন্ধির ফলাফল ছিল উভয়ের মাঝে রাজ্যবিভক্তি! (৬৮৭) নিঃসন্দেহে এ সিদ্ধান্ত ছিল বক্র চিন্তা ও ভ্রান্ত নীতি-প্রসূত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِيْنَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَتُ وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ
আর তোমরা সে সকল লোকের মতো হয়ো না, যারা তাদের নিকট সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলি আসার পরও পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং পরস্পরে মতভেদ সৃষ্টি করেছিল। এরূপ লোকদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। [সুরা আলে-ইমরান: ১০৫]
বারকিয়ারুক ও মুহাম্মাদ তাদের পিতা সুলতান মালিকশাহর রেখে যাওয়া রাজত্ব তিন ভাগে ভাগ করতে সম্মত হন। প্রথম ভাগ শাসন করবেন সুলতান বারকিয়ারুক। তার ভাগে থাকবে ইস্পাহান, পারস্য ও ইরাকের অধিকাংশ অঞ্চল। উত্তর ইরাক অবশ্য তার ভাগে থাকবে না। খিলাফতের রাজধানী বাগদাদ তার অংশেই থাকবে। সুতরাং বাগদাদে জুমআর খুতবায় আব্বাসি খলিফা মুসতাযহির বিল্লাহর পাশাপাশি সুলতান বারকিয়ারুকের নামও উচ্চারিত হবে।
দ্বিতীয় ভাগ শাসন করবেন সুলতান মুহাম্মাদ। তার ভাগে থাকবে আজারবাইজান, আর্মেনিয়া, দিয়ারে বকর ও মসুল অঞ্চল। অথচ সন্ধির পূর্বে মসুল ছিল বারকিয়ারুকের অধীনে। একে কেন্দ্র করে সামনে বেশ কিছু জটিলতা সৃষ্টি হবে, যার বিবরণ আমরা যথাস্থানে উল্লেখ করব।
তৃতীয় ও শেষ অংশ থাকবে তাদের আরেক ভাই সানজারের হাতে। তিনি শাসন করবেন খোরাসান (পূর্ব ইরান) ও মাওয়ারাউন নাহার অঞ্চল। (৬৮৮) দুই ভাই এই সমাধানের ওপর সন্ধি করেন। নিঃসন্দেহে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। আমাদের জানা নেই, কী পরিস্থিতির কারণে তারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য হয়েছিলেন। অথচ তাদের উভয়কে সদাচার, সমুন্নত চরিত্র ও সুশাসনসহ বিভিন্ন মহান গুণ-বৈশিষ্ট্যে ভূষিত করা হয়ে থাকে!
অবশ্য ইতিহাসের ধারাক্রম বলে, এই সন্ধিচুক্তির কারণে সকলের অন্তরে প্রশান্তি সৃষ্টি হয়, রাজ্যজুড়ে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরে আসে এবং ইসলামি বিশ্বের এই অঞ্চলে আসন্ন সংঘাত-লড়াইয়ের শঙ্কা দূরীভূত হয়।
এই ছিল আলোচ্য সময়ে ইসলামি বিশ্বের প্রাচ্য অংশের পরিস্থিতি। নিঃসন্দেহে এ পরিস্থিতি ছিল অনেকটাই সুখকর; একদিকে অর্জিত হয়েছিল বালিখ-যুদ্ধের বিজয়, আরেকদিকে সম্পাদিত হয়েছিল দুই ভাইয়ের সমঝোতা-সন্ধি।
টিকাঃ
৬৮৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৭০-৭১।
৬৮৮. প্রাগুক্ত, ৯/৭১-৭২।
📄 শাম অঞ্চলে মুসলমান ও ক্রুসেডারদের পরিস্থিতি
তবে এ বছর শাম অঞ্চলের পরিস্থিতি মোটেও সুখকর ছিল না; ছিল না এর পরবর্তী বছরগুলোতেও! অবশ্য পূর্বে আমরা শামের যে পরিস্থিতি উল্লেখ করে এসেছি, তাতে এমনটিই ছিল স্বাভাবিক। জ্ঞানচর্চার অনুপস্থিতি, জিহাদি মূল্যবোধের শূন্যতা, জনগণের নেতিবাচক মানসিকতা, শাসকগোষ্ঠীর স্বেচ্ছাচারী আচরণসহ আরও যেসব ব্যাধি তৎকালীন শাম অঞ্চলে বিদ্যমান ছিল, তাতে এর ব্যতিক্রম কীভাবেই- বা আশা করা যায়?!
এই দুই রছরে শাম অঞ্চলে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা হলো-
১. ক্রুসেডাররা জেনোভার একটি নৌবহরের সহায়তায় লেবাননে ত্রিপোলির উত্তরে অবস্থিত ব্যাবলস নৌবন্দরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। তারা সেখানকার জনসাধারণকে নিরাপত্তা অঙ্গীকার প্রদান করলেও নগরীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরই বিশ্বাসঘাতকতা করে। (৬৮৯) ব্যাবলস পতনে সহায়তা করায় ক্রুসেডার সেনাপতি ৪র্থ রেমন্ড জেনোভার নৌবহরকে ব্যাবলস অঞ্চলের এক-তৃতীয়াংশের মালিকানা প্রদান করেন। ফলে পরবর্তী সময়ে জেনোভাবাসী ব্যাবলসে ব্যাপক পরিসরে বসতি স্থাপন করে। (৬৯০) ব্যাবলস নগরী দখলের মধ্য দিয়ে রেমন্ড তার স্বপ্নের ত্রিপোলি রাজ্যের কাঙ্ক্ষিত সীমানার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হন। তার পরিকল্পিত ত্রিপোলি রাজ্যের উত্তর সীমানা ছিল তারতুস নগরী, আর দক্ষিণ সীমানা ছিল ব্যাবলস নগরী। ইতিমধ্যে তারতুস ও ব্যাবলস তার দখলে চলে এসেছে; বাকি আছে কেবল প্রধান ও কেন্দ্রীয় নগরী ত্রিপোলির পতন ঘটানো। (৬৯১)
২. এরপর ৪র্থ রেমন্ড ত্রিপোলির সরাসরি সামনে একটি বিরাট দুর্গ নির্মাণ করেন। তিনি দুর্গটির নামকরণ করেন সেন্ট গিল্স (Saint Gilles)। আরবি ইতিহাসগ্রন্থগুলোতে অবশ্য দুর্গটির নাম উল্লেখ করা হয়েছে 'সানজিল দুর্গ'। রেমন্ড ত্রিপোলির পতন ঘটানোর কাজে ব্যবহারের জন্য দুর্গটি নির্মাণ করেন। দুর্গ নির্মাণে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল রেমন্ডের মিত্র বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের একটি নৌবহরের সহায়তায় সাইপ্রাস থেকে আনা হয়। (৬৯২) এ সময় এ অঞ্চলের কোনো মুসলিম নেতাই দুর্গটি ধ্বংস করতে বা নির্মাণকাজে বাধা দিতে অগ্রসর হননি। অথচ ত্রিপোলি ছিল উত্তর-পূর্ব, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে দাক্কাক বিন তুতুশের শাসনাধীন দামেশক ও হিমস রাজ্য দ্বারা বেষ্টিত। ত্রিপোলি থেকে হিমস নব্বই কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে অবস্থিত ছিল, দামেশক ছিল একশ বিশ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে।
৩. ৪৯৭ হিজরি সনে (১১০৪ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) ঘটে বিশ্বকে কাঁপিয়ে দেওয়া এক ঘটনা, পতন ঘটে সুরক্ষিত আক্কা নগরীর। পুরো শাম অঞ্চলের সবচেয়ে দুর্ভেদ্য ও সুরক্ষিত এ নগরীর পতন যেন ছিল অবশিষ্ট নগরীগুলোরও পতনের পূর্বাভাস। তা ছাড়া আক্কার পতনের ফলে এ অঞ্চলের মুসলমানদের জন্য সমুদ্রপথে সাহায্যপ্রাপ্তির পথ বন্ধ হয়ে যায়। আক্কা নগরীতেও ক্রুসেডাররা প্রথমে জনসাধারণকে নিরাপত্তা প্রদান করলেও পরে নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। ইতিপূর্বে ব্যাবলস দখলে সহায়তাকারী জেনোভার নৌবহরটি আক্কা পতনেও ক্রুসেডারদের সহযোগিতা করে। (৬৯৩) বিনিময়ে বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের শাসক ১ম বল্ডউইন নৌবহরটিকে প্রদান করেন আক্কার এক- তৃতীয়াংশ। আক্কা নগরী এবার বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। (৬৯৪)
৪. বোহেমন্ড ইতালি চলে যাওয়ার পর টেনক্রেড এবার তার নথিপত্র গোছাতে শুরু করেন! তিনি তার বাহিনীকে বিন্যস্ত করে ৪৯৮ হিজরি সনে (১১০৫ খ্রিষ্টাব্দের বসন্ত কালে) আলেপ্পো-অধিপতি রিজওয়ান বিন তুতুশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধে টেনক্রেড জয়লাভ করেন এবং আরতাহ দুর্গ পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন। যুদ্ধে রিজওয়ান-বাহিনীর তিন হাজার সৈন্য নিহত হয়। (৬৯৫)
৫. ৪৯৮ হিজরি সনেই (১১০৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ আগস্ট) মুসলমানরা রামলা অঞ্চলে আরেকটি পরাজয়ের শিকার হয়। ইতিহাসে যুদ্ধটি 'রামলার তৃতীয় যুদ্ধ' নামে খ্যাত। বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে আগত উবায়দি বাহিনী এ যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। (৬৯৬) সম্ভবত এটিই ছিল উবায়দি প্রশাসন কর্তৃক বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধারের সর্বশেষ ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। (৬৯৭)
৬. ৪৯৬ হিজরি সনের রমজান মাসে (১১০৩ খ্রিষ্টাব্দে) দাক্কাক বিন তুতুশ ইন্তেকাল করেন। তার স্থলাভিষিক্ত হন তার আতাবিক (৬৯৮) তুগতেকিন (Toghtekin)। তুগতেকিন ছিলেন দাক্কাকের পিতা তুতুশের একজন ক্রীতদাস। (৬৯৯) তিনি একজন দক্ষ, চৌকস ও অভিজ্ঞ সেনাপতি ছিলেন। তুতুশ নিজ সন্তান দাক্কাকের পরিচর্যার দায়িত্ব তুগতেকিনকে প্রদান করেছিলেন এবং তাকে আতাবিক (রাজপুত্রের শিক্ষক) উপাধি প্রদান করেছিলেন। অবশ্য পরবর্তীকালে সেলজুক সুলতানদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি দুর্বল হয়ে পড়লে আতাবিক উপাধিধারী সেনাপতিগণ চলমান ঘটনাপ্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করে; এমনকি তাদের অনেকে স্বাধীন শাসক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করে। আমাদের আলোচ্য ক্ষেত্রেও তেমনটিই ঘটে; দাক্কাকের মৃত্যুর পর তুগতেকিন হিমস ও দামেশকের শাসক পদে অধিষ্ঠিত হন। (৭০০) এর মধ্য দিয়ে এই দুই নগরীতে সেলজুক শাসনের পুরোপুরি সমাপ্তি ঘটে। অবশ্য তুগতেকিন সার্বিক বিচারে দাক্কাকের চেয়ে বহুগুণে শ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন। তিনি জনগণের সঙ্গে ন্যায়-আচরণ করেন (৭০১) এবং শাসকজীবনে বেশ কয়েকবার ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। তবে তিনি ও তার বাহিনী চূড়ান্ত কোনো বিজয় এনে দিতে পারেননি। তুগতেকিনের শাসনকে তুর্কমেন (Turkmens) শাসনব্যবস্থার সূচনাকাল গণ্য করা হয়। বায়ান্নো বছর ব্যাপ্ত তুর্কমেন শাসনব্যবস্থার পতন ঘটে ৫৪৯ হিজরি সনে (১ ১৫৪ খ্রিষ্টাব্দে)।
৭. ৪৯৮ হিজরি সনের ২ রবিউস সানি (১১০৪ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে) ইন্তেকাল করেন পারস্য ও ইরাক অঞ্চলের সেলজুক সুলতান বারকিয়ারুক। মৃত্যুর পূর্বেই তিনি তার ভাই সুলতান মুহাম্মাদের সঙ্গে সমঝোতা-চুক্তিতে উপনীত হতে পেরেছিলেন, যার বিবরণ আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। মৃত্যুর সময় সুলতান বারকিয়ারুকের বয়স হয়েছিল মাত্র পঁচিশ বছর! (৭০২) এভাবে নানাবিধ জটিলতা ও সবশেষে ভাইয়ের মৃত্যুর ফলে সুলতান মুহাম্মাদের ক্ষমতা সুসংহত হয়। তিনি এবার একই সঙ্গে নিজের ও ভাই বারকিয়ারুকের রাজ্য শাসন করতে থাকেন। এর মাধ্যমে পরবর্তী একটানা বারো বছর এ অঞ্চলে ঐক্য ও অবিচ্ছিন্নতা বজায় থাকে। (৭০৩)
৮. ৪৯৮ হিজরি সনেই (১১০৫ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে) বিদায় নেন চলমান ঘটনাপ্রবাহের আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ফরাসি সেনাপতি ৪র্থ রেমন্ড! ত্রিপোলি অবরোধের জন্য তিনি যে দুর্গটি নির্মাণ করেছিলেন, সেখানেই তার মৃত্যু হয়। ত্রিপোলিবাসী অবরোধ মোকাবিলা করার জন্য একপর্যায়ে দুর্গটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। তখন একটি জ্বলন্ত কাঠ রেমন্ডের গায়ে এসে পড়ে এবং এর কারণেই তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন। (৭০৪) এভাবেই ক্রুসেডাররা হারায় নিজেদের একজন দুর্বিনীত নেতাকে। রেমন্ড অবশ্য তার অন্যান্য সঙ্গীর ন্যায় জীবদ্দশায় নিজস্ব রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পূরণ করে যেতে পারেননি। (৭০৫) মৃত্যুর পূর্বে তিনি তার বাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান করে যান তার খালাতো ভাই উইলিয়াম জর্ডান (William Jordan)-কে। উইলিয়াম পুরোপুরি রেমন্ডের নীতি ও পরিকল্পনা অনুসরণ করে সামনে অগ্রসর হন এবং ত্রিপোলি দখলের লক্ষ্যে অবরোধ অব্যাহত রাখেন। রেমন্ডের ন্যায় তিনিও বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমিনোসের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময় অব্যাহত রাখেন। (৭০৬)
৯. সুলতান মুহাম্মাদ মসুলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলে বারকিয়ারুকের সঙ্গে মিত্রতার দাবিতে মসুলের আমির জাকারমিশ তাতে বাধ সাধেন। এর ফলে মসুলের নেতৃত্ব নিয়ে চরম সংকট দেখা দেয়। যদিও বারকিয়ারুক ও মুহাম্মাদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুসারে মসুলের কর্তৃত্ব সুলতান মুহাম্মাদেরই প্রাপ্য ছিল; কিন্তু জাকারমিশের যেহেতু স্বাধীন ক্ষমতার প্রতি ঝোঁক ছিল, তাই তিনি নগরীর নিয়ন্ত্রণ সমর্পণে অস্বীকৃতি জানান। তবে কিছুদিনের মধ্যেই বারকিয়ারুকের মৃত্যুসংবাদ এসে পৌঁছলে জাকারমিশ মসুলের কর্তৃত্ব সুলতান মুহাম্মাদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন। অবশ্য এই সমর্পণ ছিল নিতান্তই সাময়িক, যেমনটি আমরা আগামী ঘটনাপ্রবাহে জানতে পারব। (৭০৭)
১০. ৪৯৮ হিজরি সনেই (১১০৫ খ্রিষ্টাব্দে) মুসলমানরা হারায় ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উজ্জ্বল ভূমিকা পালনকারী এক মহান নেতাকে। তিনি হলেন হাসানকেইফের অধিপতি সুকমান বিন উরতুক। আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি, জাকারমিশের সঙ্গে একজোট হয়ে বালিখের যুদ্ধে তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে এক মহান বিজয় বাস্তবায়ন করেছিলেন।
তার মৃত্যুর ঘটনাও যথেষ্ট উদ্দীপক ও শিক্ষণীয়। প্রথমে রেমন্ড এবং পরে উইলিয়াম ত্রিপোলি অবরোধ করলে ত্রিপোলির শাসক ইবনে আম্মার সুকমানের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করেন। তখন সুকমান তার বাহিনী নিয়ে ত্রিপোলির সহায়তায় রওনা হন। যদিও ইবনে আম্মার ও তার বাহিনী শিয়া ছিল; কিন্তু সুকমান বিন উরতুক রহ. সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করেননি। তিনি দেখেছেন শত্রু এখানে ক্রুসেডার বাহিনী, যারা শিয়া-সুন্নি সকলের শত্রু। আর তাই তিনি ত্রিপোলি থেকে প্রায় ছয়শ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হাসানকেইফ থেকে বীর-বিক্রমে রওনা হন। সুকমান ডিপথেরিয়া-রোগী ছিলেন। ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। তার হঠাৎ হঠাৎ ডিপথেরিয়ার উপসর্গ দেখা দিত। ত্রিপোলির পথে রওনা হয়ে তিনি যখন (ত্রিপোলি হতে একশ বিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত) কারইয়াতাইন (Quaryatayn) অঞ্চলে পৌঁছেন, তখন তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। যেহেতু এ অবস্থায় তার পক্ষে কিছুতেই যুদ্ধ করা সম্ভব নয়, তাই সঙ্গীরা তাকে নিয়ে হাসানকেইফে ফিরে যাওয়ার আবেদন করে। প্রত্যুত্তরে তিনি যা বলেন, তা আজও ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছে—
“না, আমি পথচলা অব্যাহত রাখব। যদি সুস্থ হয়ে উঠি, তাহলে যে সংকল্প করেছি, তা পূর্ণ করব। আমি চাই না যে, আল্লাহ আমাকে মৃত্যুর ভয়ে কাফিরদের বিরুদ্ধে লড়াই না করে পিছু হটতে দেখবেন। আর যদি আমার 'আজাল' এসে যায়, তাহলে তো আমি জিহাদের সফরে থাকায় শহিদ বিবেচিত হব।”
এরপর সৈন্যরা তাকে নিয়ে ত্রিপোলি অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু এর দুদিন পরই তিনি ইন্তেকাল করেন। (৭০৮)
টিকাঃ
৬৮৯. প্রাগুক্ত, ৯/৭২ ও Albert d' Aix, p. 606.
৬৯০. Heyd: op.cit., 1, p.139.
৬৯১. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/২৯০।
৬৯২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৯৫।
৬৯৩. প্রাগুক্ত, ৯/৭২ ও Runciman, II, p. 139.
৬৯৪. Guillaman: de tyr, I, p. 445.
৬৯৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৮৪-৮৫।
৬৯৬. প্রাগুক্ত, ৯/৮৫ ও Gesta Francorum, p. 541.
৬৯৭. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/২৪৭।
৬৯৮. 'আতাবিক' একটি তুর্কি শব্দ। তুর্কি 'আতাবিক' শব্দের অর্থ রাজপুত্রের শিক্ষক। সেলজুক সুলতানগণ শুরুতে সুলতান-পুত্রদের শিক্ষাদীক্ষায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের সম্মানসূচক পদবি হিসেবে 'আতাবিক' উপাধি প্রদান করতেন। পরবর্তী সময়ে সালতানাতের অধীনস্থ বিভিন্ন প্রশাসক, সেনাপতি ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরকেও উক্ত উপাধি প্রদান করা হয়। প্রথম আতাবিক উপাধি লাভ করেন সেলজুক সুলতান মালিকশাহর উজির নিজামুল মুলক তুসি। সেলজুক সুলতানগণ আতাবিক উপাধিধারী অনেককেই বিশাল জায়গির ভূমি প্রদান করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেলজুক সুলতানদের প্রভাব-প্রতিপত্তি দুর্বল হয়ে পড়লে আতাবিকদের অনেকেই স্বাধীন রাষ্ট্রক্ষমতা ভোগ করতে শুরু করে। অনেকে আবার সেলজুক সুলতানের প্রতি আনুগত্য অব্যাহত রাখলেও মোটামুটি স্বাধীনতা ভোগ করত। প্রতিষ্ঠাতাদের প্রতি সম্বন্ধ করে এসব রাষ্ট্র আতাবিক-রাজ্য নামে পরিচিতি লাভ করে। সুবিশাল সেলজুক রাষ্ট্রের ভাঙনের পেছনে আতাবিকদের আলাদা রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠাও ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল। [অনুবাদক]
৬৯৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৭৪ ও ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১২/২৪৬। ইবনুল আছির অবশ্য দাক্কাকের মৃত্যুসন উল্লেখ করেছেন ৪৯৭ হিজরি। ইবনুল কালানিসির মতও ইবনুল আছিরের অনুরূপ।
৭০০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৭৪ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৪৮-১৪৯।
৭০১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৭৪।
৭০২. প্রাগুক্ত, ৯/৭৭।
৭০৩. প্রাগুক্ত, ৯/৭৯-৮০।
৭০৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৯৫-৯৬ ও সিবতু ইবনিল জাওযি, মিরআতুয-যামান, পৃষ্ঠা: ৫২৮।
৭০৫. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/২৯১।
৭০৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৯৬ ও Runciman: op. cit., II, p. 62.
৭০৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৭৯-৮১।
৭০৮. প্রাগুক্ত ৯/৮২-৮৩।