📄 এক মহিমান্বিত বিজয়
এ তো গেল অতীতের আলোকে আগামীর আশাবাদের গল্প! বাস্তব ইতিহাস আমাদের জন্য কী তথ্য সংরক্ষণ করেছে?! বাস্তবতা তো অতীতের ওপর ভর করেই গড়ে ওঠে। আর তাই ইতিহাসের পাতায় আমরা দেখতে পাই যে, অতীতের মহান পুরুষগণ উত্তর ইরাকে কল্যাণের যে বীজ রোপণ করে গিয়েছিলেন, ৪৯৬ হিজরি সনেই (১১০৪ খ্রিষ্টাব্দে) তা ডালপালা মেলে বেড়ে উঠতে শুরু করে। শুরু হয় ক্রুসেডারদের প্রতিরোধের লক্ষ্যে এক জিহাদি আন্দোলন।
আসুন, আবারও ফিরে যাই ইতিহাসের ধারাবর্ণনায়!
এ সময় মসুলের শাসক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন জাকারমিশ। পূর্বেই বলা হয়েছে যে, মসুলের সাবেক প্রশাসক কারবুগার মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট বিরোধ-বিশৃঙ্খলার মাঝে একসময় তিনি শাসনক্ষমতা লাভ করেন। (৬৫৩) জাকারমিশ ছিলেন সুস্পষ্ট ধর্মীয় চেতনার অধিকারী ন্যায় ও উদার একজন নেতা। প্রজা-আচরণনীতি সম্পর্কেও তার বাস্তবানুগ জ্ঞান ছিল। এ কারণেই মসুলের জনগণ তাকে পছন্দ করে শাসক হিসেবে বরণ করে নেয়। অবশ্য জাকারমিশের স্বাধীন ক্ষমতার প্রতি ঝোঁক ছিল। বিশেষত সেলজুক সুলতান বারকিয়ারুক ও তার ভাই সুলতান মুহাম্মাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও অব্যাহত সংঘাতের কারণে জাকারমিশের মনে মসুলকেন্দ্রিক স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ঘুরপাক খাচ্ছিল। অবশ্য বাহ্যিকভাবে তিনি সুলতান বারকিয়ারুকের প্রতি আনুগত্য ও মিত্রতা বজায় রেখে চলছিলেন। (৬৫৪)
কারবুগার মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে মসুলে যেমন প্রশাসনিক অস্থিরতা চলছিল, ঠিক একই সময় হাররান নগরীতেও তৈরি হয়েছিল প্রশাসনিক সংকট। ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে হাররান নগরীর অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাররান ছিল ক্রুসেড রাজ্য এডেসা থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। তা ছাড়া নগরীটির অবস্থান ছিল আলেপ্পো থেকে আনুমানিক দুইশ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এবং মসুল থেকে সমদূরত্বে বা সামান্য অধিক দূরত্বে উত্তর-পশ্চিমে। অধিকন্তু শামের সঙ্গে ইরাকের সংযোগপথ বরং আরও নির্দিষ্ট করে বললে আলেপ্পোর সঙ্গে মসুলের সংযোগপথের ওপর নগরীটির নিয়ন্ত্রণ ছিল। এই গুরুত্বপূর্ণ নগরীটিতেই মসুলের মতো একই ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। অল্প সময়ের মধ্যে বেশ কয়েকজন শাসককে হত্যা করা হয় এবং ক্ষমতার পালাবদলে শেষ পর্যন্ত প্রশাসক পদে অধিষ্ঠিত হন 'জাওলি' নামক জনৈক তুর্কি আমির। (৬৫৫)
মসুল ও হাররানের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রতি ক্রুসেডারদের নজর ছিল। তারা একে কাজে লাগিয়ে নগরীদুটি দখলের এবং এর মাধ্যমে উত্তরের দুই ক্রুসেড রাজ্য এডেসা ও এন্টিয়কের বিভিন্ন স্বার্থ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। (৬৫৬)
ক্রুসেড রাজ্য এডেসার শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গ তার সহকারী তিল-বাশির (Turbessel) (নগরীটি এডেসা রাজ্যের অংশ ছিল) নগরীর প্রশাসক জোসেলিন ডি কার্টেনি (Joscelin de Courtenay)-কে সঙ্গে নিয়ে এন্টিয়কের শাসক বোহেমন্ড এবং তার ভাগ্নে ও প্রধান সহযোগী টেনক্রেডের সঙ্গে এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেন যে, সকলে মিলে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি যৌথ সামরিক অভিযান পরিচালনা করবেন। আর তা হলো (বর্তমান তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত) হাররান নগরীতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা। এটি হবে অভিযানের প্রথম অংশ। পরবর্তী পর্যায়ে তারা একেবারে মসুল নগরী দখলের চেষ্টা চালাবেন! (৬৫৭)
অভিযান সফল হলে ক্রুসেডারদের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জিত হবে।
১. এর মাধ্যমে তারা প্রাকৃতিক সম্পদ ও উর্বর ভূমির জন্য প্রসিদ্ধ হাররান নগরীর পতন ঘটাতে পারবে।
২. তারা ইরাক ও শামের পারস্পরিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারবে। তখন ইরাক থেকে সেলজুকদের প্রেরিত কোনো ধরনের সামরিক সহায়তা শামের ক্রুসেডার অধিকৃত অঞ্চলে পৌঁছতে পারবে না। (৬৫৮)
৩. হাররান বিজয়ের মধ্য দিয়ে মসুল দখলের পথ উন্মুক্ত হয়ে পড়বে। আগেই বলা হয়েছে যে, মসুল ছিল জিহাদি আন্দোলনের উর্বর ভূমি, মসুলে ছিল অনুকূল ইসলামি পরিবেশ। আর তাই পরিকল্পনামতো মসুলের পতন ঘটাতে পারলে এ অঞ্চলের মুসলমানদের নিক্ষেপ করা যাবে পতনের গভীর খাদে।
৪. মসুল দখল করতে পারলে খিলাফতের রাজধানী ও ইসলামি বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র বাগদাদও ক্রুসেডারদের সামনে উন্মুক্ত হয়ে যাবে। আর বাগদাদের পতন ঘটাতে পারলে তো নিঃসন্দেহে পুরো ইসলামি বিশ্বকেই প্রকম্পিত করে তোলা যাবে। তখন তো পুরো ইসলামি বিশ্বই চলে আসবে ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রণে!
৫. এন্টিয়ক শাসক বোহেমন্ডের একান্ত একটি স্বার্থও এর সঙ্গে জড়িত ছিল। আর তা হলো হাররান দখল করতে পারলে আলেপ্পো পূর্ব দিক থেকে এন্টিয়ক ও পশ্চিম দিক থেকে হাররানের মাঝে আটকা পড়ে যাবে এবং এর মাধ্যমে আলেপ্পোর পতন ঘটানোও সহজ হবে। আর তখন বর্তমান ক্ষুদ্র এন্টিয়ক রাজ্যের পরিবর্তে বোহেমন্ডের নেতৃত্বে শামের উত্তরাঞ্চলে গড়ে উঠবে সুবিশাল ক্রুসেড সাম্রাজ্য। (৬৫৯)
এসব সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যের বিবেচনায় হাররানের পতন ক্রুসেডারদের অতি আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নে পরিণত হয়। আর তাই এ অঞ্চলের সকল ক্রুসেডার সেনাপতির সমন্বয়ে প্রস্তুত হয় এক বিরাট বাহিনী। বল্ডউইন, জোসেলিন, বোহেমন্ড ও টেনক্রেডের সঙ্গে আরও যোগ দেয় এডেসা ও এন্টিয়কের গির্জার নেতৃবৃন্দ। সবমিলিয়ে ক্রুসেডার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় বিশ হাজার।
ক্রুসেডারদের এই পরিকল্পনা ছিল সামগ্রিক বিচারে অত্যন্ত ভয়াবহ। বিশেষত এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ দুই ইসলামি নগরী মসুল ও হাররান সদ্যই অস্থির সময় পাড়ি দিয়ে এসেছিল। এদিকে মসুলের শাসক জাকারমিশ ও (হাররানের পূর্বে অবস্থিত) হাসানকেইফের শাসক সুকমান বিন উরতুকের মধ্যকার সম্পর্ক ছিল বেশ বিরোধপূর্ণ। কদিন পূর্বে মসুলের ক্ষমতা নিয়ে জাকারমিশ যখন মুসা তুর্কমানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন, তখন সুকমান সরাসরি মুসার পক্ষ অবলম্বন করেছিলেন।
ক্রুসেডাররা এই অভিযানের জন্য মুসলমানদের অত্যন্ত দুর্যোগপূর্ণ সময়কেই বেছে নিয়েছিল। চলমান পরিস্থিতিতে বাহ্যত মনে হচ্ছিল যে, তাদের বিজয় অতি সন্নিকটে! কিন্তু এ সময়ই এমন এক ঘটনা সংঘটিত হয়, যা এই অস্থিরতাপূর্ণ সময়ে ক্রুসেডারদের কল্পনাতেও ছিল না। এর ফলে এ অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য অনেকটা বদলে যায়। দুই মুসলিম নেতা জাকারমিশ ও সুকমান বিন উরতুক প্রায় কাছাকাছি সময়ে পত্রবিনিময় করেন এবং উভয় নেতা তার মুসলিম ভাইকে পারস্পরিক অতীত বিভেদ ভুলে গিয়ে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যৌথ সহযোগিতা বিনিময়ের আহ্বান জানান। নিঃসন্দেহে এমন সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে মুসলমানদের এই ঐক্য ছিল অত্যন্ত চমকপ্রদ ঘটনা। তবে এর চেয়েও চমকপ্রদ বিষয় হলো—এই ঐক্য যুদ্ধজয়, রাজ্যবিস্তৃতি বা সম্পদবৃদ্ধির ন্যায় পার্থিব কোনো স্বার্থে ছিল না; উভয় নেতার সুস্পষ্ট ঘোষণা অনুযায়ী এ ঐক্য ছিল কেবলই আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে!
ঐতিহাসিক ইবনুল আছির বর্ণনা করেছেন, উভয় নেতাই অপরজনের কাছে প্রেরিত বার্তায় বলেন, 'নিশ্চয়ই আমি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সাওয়াব লাভের আশায় নিজেকে এ বিষয়ে নিবেদিত করেছি।'(৬৬০)
ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাসে এই প্রথমবার আমরা দেখছি, জিহাদের পতাকা আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে সুস্পষ্ট নিষ্ঠার সঙ্গে উত্তোলিত হয়েছে। হ্যাঁ, সময় ছিল দুর্যোগপূর্ণ, মুসলমানদের হৃদয়জগৎ ছিল বিশৃঙ্খল, মেধা ও মননে ছিল অস্থিরতা, ক্ষমতা ও রাজত্বের লালসা ছিল ব্যাপক-বিস্তৃত, ব্যক্তিস্বার্থের উপস্থিতিও ছিল লক্ষণীয়। কিন্তু আল্লাহর শোকর, তখনও কিছু হৃদয়ে কল্যাণ অবশিষ্ট ছিল; তখনও এমন কিছু মানুষের অস্তিত্ব ছিল, যারা কেবল আল্লাহর লক্ষ্যে কাজ করে যায়। আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, উভয় নেতা একই সময়ে একে অপরের কাছে পত্র প্রেরণ করেছেন। স্পষ্টতই অনুমিত হচ্ছিল যে, আল্লাহ তাআলা তাদের দুজনের এবং উম্মাহর কল্যাণ কামনা করছেন।
বিশাল ক্রুসেডার বাহিনী হাররানের কাছে পৌঁছে কঠিন অবরোধ আরোপ করে। মসুল ও হাসানকেইফের ইসলামি শক্তির সম্মিলন সম্পর্কে তাদের জানা ছিল না। আর তাই ঐক্যবদ্ধ মুসলিম বাহিনী যখন ক্রুসেডার বাহিনীর দৃষ্টিপথে আবির্ভূত হয়, তখন তারা বিস্ময়ে হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। যৌথ মুসলিম বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ছিল দশ হাজার। জাকারমিশের নেতৃত্বে তিন হাজার আরব, সেলজুক ও কুর্দি সৈন্য আর সুকমান বিন উরতুকের নেতৃত্বে সাত হাজার তুর্কমেন সৈন্য। (৬৬১)
১১০৪ খ্রিষ্টাব্দের ৭ মে বালিখ নদীর তীরে মুসলিম ও ক্রুসেডার বাহিনীর মাঝে সংঘটিত হয় এক রক্তক্ষয়ী লড়াই।(৬৬২) ইতিহাসে এ যুদ্ধ 'হাররানের যুদ্ধ' বা 'বালিখের যুদ্ধ' নামে খ্যাত।
সুমাইসাত কায়সুম • মারদিন এডেসা হিরাক্লিয়া আদানা মপসুয়েসটিয়া • মারআশ আলবেরা ইসকানদারুন তিল-বাশির এন্টিয়ক আলেপ্পো হরিরান হাসানকেইফ মসুল লাতাকিয়া জাবালা • মাআ'ররাতুন-নোমান বানিয়াস হামা তারতুস ইরকা • হিমস ত্রিপোলি ভূমধ্যসাগর ব্যাবলস • বালাবার বৈরুত সিডন দামেশক সুর আক্কা হাইফা কায়সারিয়া • আম্মান আরসুফ আসকালান জাফা গাজা রামলা আল-কুদস শামের মরুঅঞ্চল কারাক
মানচিত্র নং-২১ হাররানের (বালিখের) যুদ্ধ
বল্ডউইন ও জোসেলিন নিজেদের সর্বশক্তি ব্যয় করে লড়াই করেন। কারণ, যুদ্ধ সংঘটিত হচ্ছিল অনেকটা তাদের রাজ্যসীমাতেই। অপরদিকে বোহেমন্ড ইতিপূর্বে একবার বন্দি হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভাগ্নে টেনক্রেডকে সঙ্গে নিয়ে বাহিনীর পেছনের দিকে অবস্থান গ্রহণ করেন। তার দায়িত্ব ছিল বাহিনীর পৃষ্ঠদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে সম্ভাব্য প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পালানোর পথ খোলা রেখে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা! (৬৬৩)
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অল্প সময় অতিবাহিত হতেই নিরঙ্কুশ বিজয় মুসলিম বাহিনীর পদচুম্বন করে। ক্রুসেডার বাহিনীর বারো হাজারের অধিক সৈন্য নিহত হয়, (৬৬৪) বন্দি হয় দুই ক্রুসেডার সেনাপতি বল্ডউইন ও জোসেলিন! বন্দি হয় আরও অনেক ক্রুসেডার সৈন্য। মুসলিম বাহিনী লাভ করে প্রচুর পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ। অপর দুই সেনাপতি বোহেমন্ড ও টেনক্রেড কোনোমতে পালিয়ে পৌঁছেন এন্টিয়কে! (৬৬৫)
টিকাঃ
৬৫৩. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৫৫।
৬৫৪. প্রাগুক্ত, ৯/৭৮-৭৯।
৬৫৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/ ১০২। হাররানের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন: ইবনুল ইবরি, তারীখু মুখতাসারিদ দুওয়াল, পৃষ্ঠা: ১৯৮ ও আবুল মাহাসিন, আন-নুজুমুয যাহিরা, ৫/১৯১।
৬৫৬. Setton: op. cit., 1389.
৬৫৭. Guillaume de Tyr, 1, P. 389.
৬৫৮. Elisseeff: op. cit., p. 296.
৬৫৯. Runciman: op. cit., 11, p. 44.
৬৬০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৭৩।
৬৬১. প্রাগুক্ত, ৯/৭৩।
৬৬২. বালিখ রাক্কা অঞ্চলের একটি নদী। রাক্কা থেকে প্রায় পাঁচ মাইল বয়ে চলার পর নদীটি সেই দুর্গের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছে, যা মাসলামা বিন আবদুল মালিক নির্মাণ করেছিলেন। মুজামুল বুলদান, ১/৪৯৩।
৬৬৩. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৭৩।
৬৬৪. প্রাগুক্ত, ৯/৭৪।
৬৬৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৭৩, ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা : ২৩২ ও Setton: op. cit., 1,p. 389.
📄 বিরল অভিযান! অভাবনীয় ত্যাগ!
নিঃসন্দেহে এ বিজয় ছিল অতি মহিমান্বিত এক বিজয়!
যুদ্ধ চলাকালে বাস্তব অর্থে মুসলিম শিবির কোনো ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়নি। শুরু থেকেই রণাঙ্গনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল মুসলামানদের হাতে। তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দেখা দেয় এক অযাচিত সংকট। তবে দয়াময় আল্লাহ আপন অনুগ্রহে সে সংকট থেকেও মুসলিম বাহিনীকে নিষ্কৃতি দান করেন।
যুদ্ধ শেষে দেখা গেল অধিকাংশ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সুকমান বিন উরতুক ও তার সৈন্যদের কাছে আছে। দুই দামি 'শিকার'ও ছিল তাদের কাছে। জাকারমিশ প্রায় শূন্য হাতে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এসেছিলেন। এতে জাকারমিশের বাহিনীর সদস্যগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং তাদের সেনাপতি জাকারমিশকে তার অংশ নিয়ে আসতে প্ররোচিত করে। সাধারণ সৈন্যদের পীড়াপীড়িতে জাকারমিশ একসময় প্রভাবিত হন; তার সৈন্যরা এবার ছুটে যায় তুর্কমেন শিবিরে। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারে যে, সুকমান তার কিছু সৈন্যকে নিয়ে ক্রুসেডারদের তাড়া করতে বেরিয়েছেন। জাকারমিশের সৈন্যরা বন্দিদের তাঁবুতে প্রবেশ করে দামি শিকার এডেসার শাসক বল্ডউইনকে পেয়ে যায় এবং তাকে নিয়ে নিজেদের শিবিরে ফিরে আসে!
এরই নাম পার্থিব মোহ! যে যুগে মানুষের বোধ ও চিন্তার জগৎ হাজারো দুবোধ্যতায় আচ্ছন্ন ছিল, সে যুগে সেনাপতি ও যোদ্ধাদের অন্তর্জগতে পার্থিব মোহ ও আকর্ষণ সৃষ্টি হওয়া মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়।
সুকমান বিন উরতুক ফিরে এসে সবকিছু জানতে পারেন। তার সৈন্যরা তাকে জাকারমিশের বিরুদ্ধে লড়াই করে বল্ডউইনকে ফিরিয়ে আনার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকে। কিন্তু সুকমান রহ. আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে এমন এক অবস্থান গ্রহণ করেন, যাকে তার জীবনের সবচেয়ে মহান অবস্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে। প্রকৃতপক্ষে তার এ অবস্থান ছিল তার চিত্তের বিশুদ্ধতা ও নিষ্ঠাপূর্ণ অভিপ্রায়ের সুস্পষ্ট প্রমাণ। সুকমান তার সৈন্যদের বলেন, 'মুসলমানদের যুদ্ধজয়ের আনন্দ আমাদের বিরোধের কারণে বিষাদে পরিণত হতে পারে না। নিজের ক্ষোভ চরিতার্থ করতে গিয়ে আমি মুসলমানদের বিপদে ফেলে শত্রুদের আনন্দ দিতে পারি না।' (৬৬৬)
আল্লাহু আকবার! তিনি যুদ্ধলব্ধ সম্পদ নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে মুসলমানদের বিজয়-সৌভাগ্য বিলীন করতে চাচ্ছিলেন না, আবেগের বশবর্তী হয়ে জাকারমিশের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে গিয়ে শত্রুদের আনন্দের উপলক্ষ্য সৃষ্টি করতে চাচ্ছিলেন না।
এরই নাম নিষ্ঠা ও নির্মোহতা, যার পেছনে অপেক্ষা করে আল্লাহর নুসরত ও বিজয়-গৌরব!
এই নিষ্ঠাপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করেই সুকমান থেমে থাকেননি; বরং তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ বিজয়কে কাজে লাগিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ক্রুসেড সেনাদের ফেলে যাওয়া যুদ্ধাস্ত্র ও যুদ্ধ-পোশাকগুলো সংগ্রহ করেন এবং শত্রুপক্ষকে বিভ্রান্ত করার জন্য সেগুলো নিজের সৈন্যদের পরিধান করতে বলেন। এরপর তিনি তার সৈন্যদের নিয়ে ক্রুসেডারদের অধিকৃত বিভিন্ন দুর্গে অভিযান চালান। দুর্গগুলোর অভ্যন্তরে অবস্থানরত ক্রুসেডাররা সুকমানের বাহিনীকে নিজেদের লোক ভেবে দুর্গদ্বার খুলে দেয়। ফলে মুসলিম সৈন্যরা অতি সহজে দুর্গগুলোতে প্রবেশ করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এভাবে এ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ মুসলমানদের অধিকারে আসে। (৬৬৭)
অপরদিকে জাকারমিশ তার বাহিনী নিয়ে হাররানে পৌঁছার পর নগরীটির কর্তৃত্ব বুঝে নেন এবং হাররানকে মসুল রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করেন। এরপর তিনিও থেমে না থেকে তার স্বল্পসংখ্যক সৈন্য নিয়েই ক্রুসেড রাজ্য এডেসা অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি জানতেন যে, এই সীমিত জনবল নিয়ে সুরক্ষিত এডেসা রাজ্য জয় করা সম্ভব নয়। (৬৬৮) মূলত তার এই পদক্ষেপ ছিল এক ধরনের মনস্তাত্বিক লড়াই, যা বালিখের যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয় বরণকারী ক্রুসেডারদের মনোবল আরও বেশি দুর্বল করে দিতে বড় ভূমিকা রাখে। (৬৬৯)
টিকাঃ
৬৬৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারিখ, ৯/৭৩-৭৪।
৬৬৭. প্রাগুক্ত, ৯/৭৪।
৬৬৮. প্রাগুক্ত, ৯/৭৪।
৬৬৯. Runciman: op. cit., 11, p. 44.
📄 বালিখের যুদ্ধের প্রভাবসমূহ
সামরিক দৃষ্টিকোণ ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বালিখের যুদ্ধ যদিও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কোনো যুদ্ধ ছিল না; কিন্তু ইসলাম-খ্রিষ্টবাদ চলমান সংঘাতে এই যুদ্ধ অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। বরং বাহ্যত সাধারণ এই যুদ্ধকে বিবেচনা করা যেতে পারে চলমান ঘটনাপ্রবাহের এক উজ্জ্বল টার্নিং পয়েন্ট ও বাঁক পরিবর্তন হিসেবে। ইতিহাসের ধারাবিবরণীতে সামান্য বিরতি নিয়ে এখানে আমরা সংক্ষেপে বালিখের যুদ্ধের দশটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ও ফলাফল উল্লেখ করছি।
১. মুসলমানদের মনোবল ও আত্মবিশ্বাস লক্ষণীয় মাত্রায় বৃদ্ধি লাভ করে। এ বিজয়ের প্রভাব দীর্ঘকাল ধরে মুসলমানদের মানসজুড়ে বিদ্যমান থাকে। প্রতিপক্ষের বিপুল সংখ্যক যোদ্ধা নিহত হয়েছে, বন্দিও হয়েছে প্রচুর ক্রুসেড সেনা-কেবল এ কারণেই যে মুসলমানদের মনোবল বৃদ্ধি পেয়েছিল এমন নয়। এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গি ও লক্ষ্য ছিল সুস্পষ্ট; তারা উপলব্ধি করতে পেরেছিল বিজয়ের মূলমন্ত্র কী এবং জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর প্রভাব কত সমুন্নত; তারা চাক্ষুস প্রত্যক্ষ করেছিল আল্লাহর নির্দেশিত পথে অবিচল বান্দাদের প্রতি রাব্বে কারিমের নুসরত ও অনুগ্রহ।
২. এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এ যুদ্ধ একদিকে যেমন মুসলমানদের মাঝে লক্ষণীয় মাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করেছে, বিপরীত দিকে অবশ্যই ক্রুসেডারদের মাঝে আরও বেশি পরিমাণে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করেছে। বালিখের যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে ক্রুসেডাররা মানসিকভাবেও পরাজিত হয়ে পড়ে এবং চরম ব্যর্থতার গ্লানিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এই পরাভবতা ও ব্যর্থতার গ্লানি তাদেরকে যেমন ছেয়ে গিয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সংক্রমিত হয়েছিল তাদের পরবর্তী প্রজন্মের মাঝেও। বরং এ দাবি করলেও অত্যুক্তি হবে না যে, এ যুদ্ধে পরাজয়ের কারণেই ইরাক ও পারস্য নিয়ে ক্রুসেডারদের পরিকল্পনা ও চিন্তাধারা সম্পূর্ণ বদলে যায়। এটিই ছিল এ অঞ্চলে ক্রুসেডারদের প্রথম ও শেষ অভিযান পরিকল্পনা। আর তাই আপাতদৃষ্টিতে অতি সাধারণ এই যুদ্ধই ক্রুসেডারদের স্বপ্ন ও লালসার সীমানা বেঁধে দিয়েছিল। (৬৭০)
৩. ক্রুসেডাররা এ যুদ্ধে বারো হাজারের অধিক সৈন্য হারায়। নিঃসন্দেহে এটি তাদের সামরিক শক্তিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষত এর মাত্র তিন বছর পূর্বে ৪৯৪ হিজরি সনে (১১০১ খ্রিষ্টাব্দে) নবাগত ক্রুসেডার বাহিনীগুলো মর্মন্তুদ পরিণতি বরণের কারণে ইউরোপীয় খ্রিষ্টানরা ইসলামি ভূখণ্ডে নতুন করে বাহিনী প্রেরণের সাহস একদমই হারিয়ে ফেলেছিল। আর তাই বালিখের যুদ্ধে আশঙ্কাজনক হারে সৈন্যসংখ্যা হ্রাস এন্টিয়ক ও এডেসা রাজ্যের সামরিক পরিকল্পনায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
৪. বালিখের যুদ্ধে ক্রুসেড রাজ্য এডেসার ক্ষতি ছিল আরও বেশি। তারা তো কেবল বিপুল সংখ্যক যোদ্ধাই হারায়নি, হারিয়েছে শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গ ও তার অন্যতম প্রধান সহযোগী জোসেলিন ডি কার্টেনিকেও! বল্ডউইন ও জোসেলিন এখন শত্রুদের হাতে বন্দি। কেউ জানে না—কবে তারা মুক্তি পাবেন। অধিকন্তু দুজন বন্দি দুই জায়গায়; বল্ডউইন মসুলের শাসক জাকারমিশের কবজায়, আর জোসেলিন হাসানকেইফ ও মারদিনের অধিপতি সুকমানের হাতে। (৬৭১) নেতা ও তার প্রধান সহকারীর অনুপস্থিতিতে এডেসার ক্রুসেড যোদ্ধারা এমন কাউকে খুঁজে পাচ্ছিল না, যে আপাতত এডেসা রাজ্যের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে পারে। অগত্যা তারা নরম্যান সেনাপতি টেনক্রেডকে তাদের নেতাদ্বয় ফিরে আসা পর্যন্ত এডেসা রাজ্যের শাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের অনুরোধ জানায়। (৬৭২) স্বভাবতই সুযোগসন্ধানী টেনক্রেডের জন্য এ প্রস্তাব ছিল নিজের লালসা বাস্তবায়নের অপূর্ব সুযোগ। এভাবেই টেনক্রেড শাম অঞ্চলে সেই ভাঁড়ের ন্যায় কাজ করতে থাকেন, যাকে কেবল সংকটকালে অভিনয়ের জন্য ডাকা হয়। কখনো তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের অভ্যন্তরে জালিল অঞ্চলের প্রশাসক, কখনো বোহেমন্ডের অনুপস্থিতিতে এন্টিয়কের অন্তর্বর্তীকালীন শাসক, আর এখন বল্ডউইন ডি বুর্গের অনুপস্থিতিতে এডেসার ভারপ্রাপ্ত শাসক!
৫. এই পরাজয়ের পরপরই ক্রুসেডাররা বেশ কয়েকটি দুর্গের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে; হারিয়ে ফেলে উল্লেখযোগ্য কিছু নগর-জনপদ ও ভূখণ্ডের কর্তৃত্বও। এর ফলে এ অঞ্চলের মানচিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সৃষ্টি হয়। যুদ্ধের পরপরই সুকমান বিন উরতুক অতর্কিত হামলা চালিয়ে যেসব দুর্গ অধিকার করে নিয়েছিলেন, তার সবগুলোই ছিল এডেসা রাজ্যভুক্ত। তবে বিষয়টি কেবল এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এ অঞ্চলের আরেক ক্রুসেড রাজ্য এন্টিয়কও এ সময় হারিয়েছিল বেশ কয়েকটি বড় বড় জনপদ ও দুর্গের নিয়ন্ত্রণ।
এর বিবরণ হলো, আলেপ্পোর শাসক রিজওয়ান বিন তুতুশ বালিখের যুদ্ধে জোটবদ্ধ মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার চিন্তা না করে নিজের বাহিনী নিয়ে ফুরাত নদীর তীরে অবস্থান করে ঘটনাপ্রবাহের ওপর নজর রাখছিলেন। তিনি যখন জানতে পারেন—যুদ্ধে ক্রুসেডার বাহিনী পরাজিত হয়েছে, তাদের প্রচুর সৈন্য নিহত হয়েছে, বোহেমন্ড ও টেনক্রেড পালাতে পারলেও বল্ডউইন ও জোসেলিন বন্দি হয়েছেন এবং এরপর বল্ডউইনের অনুপস্থিতিতে এডেসার শাসনভার গ্রহণ করতে টেনক্রেড এডেসায় চলে গেছেন, তখন তিনি এন্টিয়কের অধিভুক্ত বিভিন্ন দুর্গ ও জনপদে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। এসব অঞ্চল ইতিপূর্বে আলেপ্পো রাজ্যের অধীনস্থ ছিল। অল্প কদিনেই তিনি মাআ'ররাতু-মিসরিন (Ma'arrat Misrin) ও সারমিন (Sarmin)-সহ আলেপ্পোর নিকটবর্তী কয়েকটি নগরী ও দুর্গ পুনরুদ্ধার করেন। একই সময় এ অঞ্চলের আরেকটি ইসলামি রাজ্য রাফিনার আমির শামসুল-খাওয়াছ শাইজার নগরীর পূর্বে অবস্থিত সুরান (Suran) নগরী পুনরুদ্ধার করেন। এ ছাড়া মাআ'ররাতুন-নোমান, বারা, কাফারতাব (Kafartab) ও লাতমিন (Latmin) অঞ্চলে অবস্থানরত ক্রুসেডার বাহিনীর বিভিন্ন অংশ এ সময় এন্টিয়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এন্টিয়কে চলে আসে। ফলে ক্রুসেডাররা এসব নগরীর নিয়ন্ত্রণও হারিয়ে ফেলে। এভাবে এন্টিয়ক রাজ্যের পূর্ব সীমানা অনেকটা সংকুচিত হয়ে যায়। এতদিন রাজ্যটির পূর্ব সীমানা ছিল আলেপ্পোর উচ্চভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত, এখন তা আমিক হ্রদ পর্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ে। (৬৭৩)
৬. এ যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলমানরা পরবর্তী দীর্ঘ সময়ের জন্য ইরাক ও শামের মধ্যবর্তী যোগাযোগব্যবস্থা উন্মুক্ত ও নিরাপদ রাখতে সক্ষম হয়। ফলে পরবর্তী কালে মসুল ও তৎপার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এডেসা ও এন্টিয়কসহ অধিকৃত বিভিন্ন এলাকায় ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বাহিনী প্রেরণ সহজ হয়।
৭. বালিখের যুদ্ধের কারণে এ অঞ্চলের কৌশলগত পরিস্থিতিতেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হয়। এ যুদ্ধের পরই এ অঞ্চলে বসবাসকারী আর্মেনীয়রা প্রথমবারের মতো কার্যকর পন্থায় ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধাচরণের সাহস দেখায়। ক্রুসেডারদের আগমনের পর থেকেই তাদের হাতে বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার হলেও আর্মেনীয়দের এতদিন প্রতিবাদের শক্তি ছিল না। এবার ক্রুসেডাররা পরাজিত হওয়ার পর আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত বিভিন্ন দুর্গ ও নগরীর অধিবাসীরা মুসলিম তুর্কিদের সঙ্গে পত্রবিনিময় করে তাদেরকে দুর্গ ও নগরীগুলোর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে অনুরোধ জানায়। এর মাধ্যমে তারা অত্যাচারী খ্রিষ্টান ক্রুসেডারদের শাসনের নাগপাশ থেকে বেরিয়ে এসে মুসলমানদের শাসনাধীনে বসবাস করতে চাচ্ছিল। এর অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হতে পারে আরতাহ দুর্গের ঘটনা। এন্টিয়কের একেবারে সন্নিকটে অবস্থিত হওয়ায় দুর্গটির কৌশলগত অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আরতাহ দুর্গের আর্মেনীয় নাগরিকরা নরম্যান ক্রুসেডার প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং কোনো ধরনের প্রচেষ্টা ছাড়াই দুর্গটির নিয়ন্ত্রণ আলেপ্পো-অধিপতি রিজওয়ানের হাতে তুলে দেয়। এটিই এ ধরনের ঘটনার একমাত্র দৃষ্টান্ত নয়। একই ধরনের ঘটনা অন্যান্য দুর্গের ক্ষেত্রেও ঘটে। (৬৭৪)
৮. বালিখের যুদ্ধের ফলে এডেসায় ক্রুসেডারদের শাসন-ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যান্য এলাকার আর্মেনীয়দের মতো এডেসার আর্মেনীয় নাগরিকরাও ক্রুসেডার প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে। এমনকি একপর্যায়ে তারাও সেলজুকদের সঙ্গে পত্রবিনিময় করতে থাকে। একে কেন্দ্র করে তাদের সঙ্গে ক্রুসেডার শাসকশ্রেণির বিরোধ চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। এ পরিস্থিতি ছিল নিকট ভবিষ্যতে উভয় পক্ষের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষের পূর্বাভাস। আশা করা যায় যে, তৎকালীন সমৃদ্ধতম ইসলামি অঞ্চল উত্তর ইরাকের নিকটবর্তী এডেসা রাজ্যের এই পট পরিবর্তন রাজ্যটির ভবিষ্যৎ নির্ণয়ে বিশেষ ভূমিকা রাখবে এবং উত্তর ইরাকের উদ্যমী মুসলিম সন্তানদের নিজেদের দায়িত্ব ও করণীয় নিয়ে ভাবতে উদ্দীপ্ত করবে।
৯. বালিখ-যুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কেবল মুসলমানরা নবোদ্যমে অধিকৃত বিভিন্ন ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছিল, এমন নয়। ক্রুসেডারদের শোচনীয় পরাজয়ের সংবাদ যখন বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে পৌঁছে যায়, তখন ঝানু সম্রাট ১ম অ্যালেক্সিয়াস কমিনোসও পরিবর্তিত পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে তৎপর হয়ে ওঠেন। বাইজান্টাইন সম্রাট তৎক্ষণাৎ দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি স্থলপথে কিলিকিয়া অঞ্চলে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। বাহিনীটি অতি সহজে তারসুস, আদানা ও মপসুয়েসটিয়াসহ কিলিকিয়া অঞ্চলের প্রসিদ্ধ নগরীগুলোকে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। (৬৭৫) দ্বিতীয় পদক্ষেপ হিসেবে বাইজান্টাইন সম্রাট সমুদ্রপথে বাইজান্টাইন নৌবহর প্রেরণ করেন। নৌবহরটি অতি গুরুত্বপূর্ণ লাতাকিয়া নৌবন্দর পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। (৬৭৬) এ ছাড়াও তারা মারকাব (Marqab) দুর্গসহ লাতাকিয়া ও তারতুসের মধ্যবর্তী ভূমধ্যসাগর-তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। (৬৭৭)
১০. বালিখের যুদ্ধে ও যুদ্ধপরবর্তী সময়ে এন্টিয়কের শাসক বোহেমন্ড এমন কয়েকটি কঠিন আঘাতের শিকার হন, যা তার শক্তির ভারসাম্য পুরোপুরি শেষ করে দেয়। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় অবশেষে তিনি অতি গুরুত্বপূর্ণ এক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন!
টিকাঃ
৬৭০. মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখুয-যিনকিয়্যীন ফিল-মাওসিলি ওয়া বিলাদিশ-শাম, পৃষ্ঠা: ৬৪।
৬৭১. Setton: op. cit., 1, p. 389.
৬৭২. Archer: op. cit., p. 616.
৬৭৩. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৪৯।
৬৭৪. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৫০ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৪৮।
৬৭৫. Raoul de Cean, p. 712.
৬৭৬. Stevenson: op. cit, pp.79.
৬৭৭. Grousset: Hist des Croisades, 1, p. 410.
📄 বোহেমন্ডের পতন
বালিখের যুদ্ধে বোহেমন্ড তার বাহিনীর উল্লেখযোগ্য একটি অংশ হারান। এরপর তিনি হারান এন্টিয়কের উত্তরে অবস্থিত কয়েকটি দুর্গ, নগরী ও জনপদের নিয়ন্ত্রণ। তার প্রতিকূল অবস্থার সুযোগ নিয়ে এ সময় অতি দুর্বল শাসক রিজওয়ান বিন তুতুশও তার রাজত্বের বিভিন্ন অংশে আক্রমণ চালান। এর পরপরই তিনি বাইজান্টাইনদের ক্রমাগত আঘাতের শিকার হন; হাতছাড়া হয়ে যায় পুরো কিলিকিয়া অঞ্চল, হাতছাড়া হয় লাতাকিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা। এভাবে একের পর এক সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষতির শিকার হওয়ায় এ অঞ্চলে বোহেমন্ডের প্রভাব ও মূল্যায়ন বহুগুণে হ্রাস পায়। এতে প্রভাবিত হয়ে বোহেমন্ড এমন এক চারিত্রিক স্খলনের শিকার হন, যার কারণে ক্রুসেডারদের কাছে তার সুখ্যাতি ধুলোয় মিশে যাওয়ার উপক্রম হয়!
বোহেমন্ডের কাছে মসুলের মুসলিম বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ একজন সেলজুক আমির বন্দি ছিল। এ সময় মসুলের শাসক জাকারমিশ বন্দি মুসলিম আমিরকে মুক্তি দেওয়ার জন্য বোহেমন্ডকে অনুরোধ জানান এবং বিনিময় হিসেবে দুটি প্রস্তাব দেন-১. জাকারমিশ মুসলিম আমিরের মুক্তির পরিবর্তে এডেসার শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গকে মুক্তি দেবেন। ২. অথবা মুক্তিপণ হিসেবে বোহেমন্ডকে পনেরো হাজার দিনার প্রদান করবেন।
বোহেমন্ডের কাছ থেকে এমনটি মোটেও প্রত্যাশিত ছিল না যে, তিনি বল্ডউইনকে মুক্ত করার পরিবর্তে অর্থপ্রাপ্তিকে প্রাধান্য দেবেন। তা ছাড়া এ সময় তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক ও বল্ডউইন ডি বুর্গের চাচাতো ভাই ১ম বল্ডউইনের কাছ থেকে একটি পত্র লাভ করেন। পত্রে ১ম বল্ডউইন তাকে বল্ডউইন ডি বুর্গকে মুক্ত করার চেষ্টা চালাতে উদ্বুদ্ধ করেন। এ তথ্যটিও প্রণিধানযোগ্য যে, স্বয়ং বোহেমন্ড যখন গাজি বিন দানিশমান্দের কাছে বন্দি ছিলেন, তখন এই বল্ডউইন ডি বুর্গই তাকে উদ্ধারের জন্য সম্ভাব্য সকল পন্থায় চেষ্টা চালিয়েছিলেন। এমনকি বোহেমন্ডকে ছাড়িয়ে আনতে এক লক্ষ দিনারের বিরাট অঙ্কের মুক্তিপণ প্রদান করার সময় বল্ডউইন ডি বুর্গ বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে সহায়তা করেছিলেন। এখন বন্দি সেলজুক আমিরকে মুক্তিদানের বিনিময়ে বোহেমন্ডকে যে অঙ্ক প্রদানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তার চেয়ে সে অঙ্ক ছিল কয়েকগুণ বেশি। এই সকল দিকের বিবেচনায় বোহেমন্ডের কাছ থেকে এই সিদ্ধান্তই নিশ্চিত প্রত্যাশিত ছিল যে, তিনি অর্থগ্রহণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বন্দি বিনিময়ের প্রস্তাবেই রাজি হবেন। কিন্তু সবাইকে হতভম্ব করে বোহেমন্ড বল্ডউইনকে মুক্ত করার পরিবর্তে অর্থের বিনিময়ে বন্দি সেলজুক আমিরকে ছেড়ে দেন! বোহেমন্ডের এই চরম চারিত্রিক হীনতা ও দীনতার কারণে বল্ডউইন ডি বুর্গকে এরপরও বেশ কয়েক বছর বন্দিজীবন কাটাতে হয়। (৬৭৮)
বোহেমন্ডের এমন নিকৃষ্টতর আচরণে ক্রুসেড রাজ্যগুলোতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় ওঠে। একের পর এক বিপদের পর এবার ক্রুসেডার সমাজ হতে বিচ্ছিন্নতা, শত্রুর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং খোদ এন্টিয়ক রাজ্যের অভ্যন্তরে দ্রুত সংকুচিত পরিস্থিতির শিকার হওয়ায় বোহেমন্ড এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন পুরো ময়দান ছেড়ে দিয়ে ইউরোপে চলে যাবেন! এই চলে যাওয়া মানে ইসলামি প্রাচ্য অঞ্চলে নিজের রাজত্ব ছেড়ে একেবারে চলে যাওয়া নয়। বোহেমন্ড তো এত সহজে নতি স্বীকার করার লোক নন। তিনি চাচ্ছিলেন ফ্রান্স ও ইতালিতে গিয়ে সেখানে সকলকে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলবেন। বোহেমন্ড উপলব্ধি করেছিলেন যে, রিজওয়ান বিন তুতুশ ভয় পাওয়ার মতো কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নন; প্রয়োজনের সময় সহজেই তার দফারফা করা যাবে। তার রাজ্যের প্রকৃত হুমকি আসলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য। (৬৮৯) আর বাস্তবতার বিচারে তার এই উপলব্ধি মোটেও অমূলক ছিল না। অবশেষে বালিখের যুদ্ধের কিছুদিন পর বোহেমন্ড টেনক্রেডকে এন্টিয়কের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে নিজে ইউরোপে চলে যান। টেনক্রেড এবার পরিণত হন এন্টিয়ক ও এডেসা দুই রাজ্যের একক শাসনকর্তায়। (৬৮০)
এভাবেই চরম হিংস্র ও দুর্বিনীত ক্রুসেডার সেনাপতি বোহেমন্ড চলমান সংঘাতের ক্ষেত্র ছেড়ে দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে যান।
বোহেমন্ডের ইউরোপকাহিনির সংক্ষিপ্ত বিবরণও এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। তাহলে ইতিহাসের এমন উত্তপ্ত একটি অধ্যায় আমাদের অগোচরে থাকবে না। বোহেমন্ড ফ্রান্স ও ইতালিতে গিয়ে বাইজান্টাইনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ ও সৈন্যসমাবেশে সক্ষম হন। তিনি সকলকে এখনই বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের লালসার লাগাম টেনে ধরার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আশ্বস্ত করেন। তিনি সকলকে বোঝান যে, বাইজান্টাইনরা ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে মুসলিম সেলজুকদের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময় করছে (৬৮১) এবং ৪৯৪ হিজরি সনে (১১০১ খ্রিষ্টাব্দে) ইউরোপ থেকে প্রেরিত ক্রুসেডার বাহিনীগুলোর শোচনীয় পতনের পেছনে এই বাইজান্টাইন-সেলজুক সম্পর্কই দায়ী ছিল।
বোহেমন্ডের প্রচেষ্টায় তার নেতৃত্বে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য পশ্চিম ইউরোপের ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, ইংল্যান্ড ও জার্মানি প্রভৃতি রাষ্ট্র থেকে বিশাল এক বাহিনী প্রস্তুত হয়ে যায়। (৬৮২)
বোহেমন্ড এন্টিয়ক ছেড়ে আসার তিন বছর পর ৫০০ হিজরি সনে (১১০৭ খ্রিষ্টাব্দে) দুরাস (Durrës) নৌবন্দরে সংঘটিত হয় এক নিষ্পত্তিমূলক যুদ্ধ। আড্রিয়াটিক (Adriatic) সাগরের প্রবেশমুখে অবস্থিত নৌবন্দরটিতে বাইজান্টাইনদের অতি সুরক্ষিত একটি দুর্গ ছিল। (৬৮৩) যুদ্ধে বাইজান্টাইন সম্রাট ১ম অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস বোহেমন্ডের বাহিনীর বিরুদ্ধে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেন। সম্রাট নিজে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন। পরাজিত বোহেমন্ড ৫০১ হিজরি সনে (১১০৮ খ্রিষ্টাব্দে) ডেভল (Devol) নগরীতে অত্যন্ত লাঞ্ছনাকর এক আত্মসমর্পণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। (৬৮৪) চুক্তিতে তিনি তিন গুরুত্বপূর্ণ নগরী (তারসুস, আদানা ও মপসুয়েসটিয়া)-সহ পুরো কিলিকিয়া অঞ্চল ও লাতাকিয়া নৌবন্দরে বাইজান্টাইনদের কর্তৃত্ব মেনে নেন এবং স্বীকারোক্তি প্রদান করেন যে, এসব অঞ্চল এন্টিয়ক রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত নয়। চুক্তিতে বাইজান্টাইন সম্রাট শর্তারোপ করেন যে, তিনি এন্টিয়কের প্রধান গির্জা হতে ক্যাথলিক বিশপকে বরখাস্ত করে সেখানে একজন অর্থোডক্স বিশপ নিযুক্ত করবেন। বোহেমন্ড চুক্তিতে এই অঙ্গীকারও করেন যে, তার ভাগ্নে টেনক্রেড যদি চুক্তির কোনো ধারা প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে তিনি টেনক্রেডের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাকে চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য করবেন! (৬৮৫)
এমন চরম লাঞ্ছনা মাথায় নিয়ে বোহেমন্ড কোন মুখে এন্টিয়কে ফিরে যাবেন! কীভাবে মিলিত হবেন ক্রুসেড অভিযানের সঙ্গীদের সঙ্গে! আর তাই ডেভলের চুক্তির পর তিনি সিসিলি দ্বীপে ফিরে যান এবং সেখানেই তিন বছর নিঃসঙ্গ ও লাঞ্ছিত অবস্থায় জীবন কাটিয়ে অবশেষে ৫০৪ হিজরি সনে (১১১১ খ্রিষ্টাব্দে) পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। এভাবেই সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব, রিক্ত অবস্থায় শেষ হয় বোহেমন্ড-অধ্যায়! (৬৮৬)
আর তাই আমরা দাবি করতে পারি যে, এই বিস্ময়কর যুদ্ধই (বালিখের যুদ্ধ) মূলত বোহেমন্ডের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শেষ করে দিয়েছিল।
চলমান ঘটনাপ্রবাহের যেকোনো বিশ্লেষক হয়তো অবাক হয়ে ভাববেন যে, এতগুলো বড় বড় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব সৃষ্টি হয়েছিল এমন সাধারণ এক যুদ্ধের মাধ্যমে, যার ব্যাপ্তি ছিল মাত্র এক দিন! যুদ্ধটির জন্য মুসলমানদের দীর্ঘমেয়াদি কোনো প্রস্তুতিও ছিল না। ক্রুসেডার বাহিনীর নিহত সৈন্যসংখ্যাও যে খুব বেশি ছিল, তাও নয়—মাত্র বারো হাজার! অথচ ৪৯৪ হিজরি সনে (১১০১ খ্রিষ্টাব্দে) সংঘটিত তিনটি যুদ্ধে দুই লক্ষের অধিক ক্রুসেড সেনা নিহত হলেও সেই যুদ্ধগুলো এই মানের কোনো প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেনি।
কী পার্থক্য ছিল উভয় যুদ্ধের মধ্যে?! পার্থক্য এই ছিল যে, বালিখের যুদ্ধে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর ঝান্ডা উড্ডীন করা হয়েছিল, যুদ্ধ করা হয়েছিল নিষ্ঠার সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায়, মুসলিম বাহিনী প্রতিনিধিত্ব করছিল ইসলামের। আর তাই মহান আল্লাহ তাআলাও এর ফলাফলে বরকত ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব দান করেন।
অপরদিকে মুরসিফানের যুদ্ধ এবং হিরাক্লিয়ার প্রথম ও দ্বিতীয় যুদ্ধ যদিও আকারে-প্রকারে বালিখের যুদ্ধের চেয়ে বড় ছিল; কিন্তু সেসব যুদ্ধ করা হয়েছিল কেবল রাজ্য, ভূখণ্ড, সম্পদ ও ক্ষমতা রক্ষার লক্ষ্যে। তখন যোদ্ধাদের হৃদয়জগৎ আল্লাহ তাআলার প্রতি নিবেদিত ছিল না; নিবদ্ধ ছিল পার্থিব সম্পদ অর্জনের প্রতি। প্রকৃতপক্ষে লড়াই হয়েছিল যুদ্ধলব্ধ সম্পদের বণ্টনে নিজেদের ভাগ নিশ্চিত করার জন্য। বালিখের যুদ্ধে কিন্তু আমরা এমনটি দেখিনি। বরং সেখানে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি সুকমান বিন উরতুকের তাকওয়া ও খোদাভীতি, নিষ্ঠা ও নির্মোহতা এবং বিভেদ-বিসংবাদ থেকে বেঁচে থাকার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। এমনকি জাকারমিশ যদিও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ প্রাপ্তির প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন; কিন্তু আপন স্থানে তা-ও বড় কোনো বিচ্যুতি নয়। কারণ, তিনি ও তার বাহিনী সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে শরিক ছিল। আমরা দেখেছি তিনি একজন মুসলিম সেলজুক আমিরকে মুক্ত করার বিনিময়ে মূল্যবান বন্দিকেও ছেড়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন; যা প্রমাণ করে যে, তার কাছে একজন মুসলিম বন্দির মূল্য ছিল, ছিল উভয় বাহিনীর হৃদ্যতা ও সম্প্রীতির চেতনা। বোহেমন্ড যেমন সম্পদের লালসায় বল্ডউইন ডি বুর্গের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে উদ্ধারে আগ্রহ দেখাননি, জাকারমিশ তেমনটি করেননি।
টিকাঃ
৬৭৮. Runciman: op. cit., 11, p. 45.
৬৮৯. Stevenson: op. cit., pp. 78.
৬৮০. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/৩২৮।
৬৮১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/ ১০৩. ও Albert d' Aix, p. 651.
৬৮২. Vasiliev: op, cit., 11, pp. 410-411.
৬৮৩. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/৩২৯।
৬৮৪. Chalandon: Alexis Comnene, p. 233.
৬৮৫. Grousset: Hist. des Croisades, 1, p. 418.
৬৮৬. Vasiliev: op. cit., II, p. 411.