📄 উরতুক-পরিবার ও কুর্দি জনগোষ্ঠী
উরতুক পরিবার দ্বারা উরতুক তুর্কমানির বংশধরগণ উদ্দেশ্য। সেলজুকদের মতো উরতুক তুর্কমানিও তুর্কি বংশোদ্ভূত ছিলেন। তিনি ছিলেন মহান সেলজুক সুলতান মালিকশাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রশাসনিক ও সামরিক কর্মকর্তা। সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করার পর সবশেষে তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসের গভর্নর পদে দায়িত্ব পালন করেন। (৬৪৯) উরতুক তুর্কমানি ৪৮৪ হিজরি সনে (১০৯১ খ্রিষ্টাব্দে) ইন্তেকাল করেন। (৬৫০) এরপর অল্প কিছুদিন তার দুই পুত্র সুকমান ও ইলগাজি বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। ইসলামি ভূখণ্ডে ক্রুসেডারদের আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর ৪৯১ হিজরি সনে (১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দে) উবায়দিরা বাইতুল মুকাদ্দাস দখল করে নিলে সুকমান ও ইলগাজি বাইতুল মুকাদ্দাস ত্যাগ করে উত্তরে চলে আসেন। ইলগাজি বাগদাদে পৌঁছে সেলজুক সুলতান বারকিয়ারুকের সেবায় নিয়োজিত হন আর সুকমান উত্তর ইরাকের দিয়ারে বকর অঞ্চলে পৌঁছে সেখানে সেলজুক সাম্রাজ্যের অধীনস্থ একটি ইসলামি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। (বর্তমান তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত) মারদিন ও হাসানকেইফ ছিল রাজ্যটির গুরুত্বপূর্ণ দুই নগরী।(৬৫১)
উরতুক-পুত্র সুকমান ও ইলগাজির কর্মধারায় ইসলামি চেতনাবোধ সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান ছিল। একই কথা প্রযোজ্য তাদের ভ্রাতুষ্পুত্র বাল্ক (Balk) বিন বাহরামের ক্ষেত্রেও। আগ্রাসী ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাদের প্রত্যেকেরই ছিল বিশেষ ভূমিকা ও অবদান। আগামীর ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহে আমরা এর বিভিন্ন নমুনা প্রত্যক্ষ করব, ইনশাআল্লাহ। অপরদিকে কুর্দিরা হলো ইসলামের অন্যতম মহান জাতি। প্রবল ধারণামতে, কুর্দি জাতি প্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয় (Indo-Europeans) জাতিগোষ্ঠী হতে উদ্ভূত। খ্রিষ্টপূর্ব দুই হাজার সনের পূর্বে তারা উত্তর ইরাক, দক্ষিণ তুরস্ক ও পূর্ব ইরানে এসে বসতি স্থাপন করে। (৬৫২)
কুর্দি জাতির ইসলামগ্রহণের ইতিহাসও সুপ্রাচীন। ২১ হিজরি সন শুরু হওয়ার পূর্বেই অধিকাংশ কুর্দি ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। যুগে যুগে পরিবেশ-পরিস্থিতিতে নানারকম পালাবদল ও বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত সৃষ্টি হলেও কুর্দিরা ইসলামগ্রহণের পর থেকে সর্বদাই ধর্মের দাবি ও দ্বীনের সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার রক্ষা করে চলেছে এবং ইসলামের সহায়তায় অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করেছে। নিজেদের ইতিহাসে সব সময়ই তারা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর মতাদর্শ আঁকড়ে ধরে ছিল। মাজহাবগত দিক থেকে অধিকাংশ কুর্দি ছিল শাফিয়ি মাজহাবের অনুসারী। এমনকি হিজরি চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীতে শিয়া বুওয়াইহি গোষ্ঠী যখন আব্বাসি খিলাফতের ওপর চেপে বসেছিল, তখনও কুর্দিরা নিজেদের মৌলিক সুন্নি মতাদর্শ ও মজবুত ধর্মীয় চেতনায় অটল-অবিচল ছিল। আর তাই তাদের অঞ্চল থেকে যদি আল্লাহর দ্বীনের সহায়তায় কোনো মহান কর্ম সম্পাদিত হয়, যদি তাদের মাঝ থেকেই বেরিয়ে আসে একজন নাজমুদ্দিন আইয়ুব, আসাদুদ্দিন শিরকুহ, সালাহুদ্দিন আইয়ুবি ও আল-মালিকুস সালিহ নাজমুদ্দিন, তাহলে তাতে মোটেও বিস্ময়ের কিছু নেই।
বলতে গেলে, এই ছিল তৎকালীন উত্তর ইরাকের সার্বিক পরিস্থিতি। এ আলোচনার মাধ্যমে আশা করি আমাদের সামনে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, কেন সে যুগের বিভিন্ন জিহাদি তৎপরতা ও সংস্কার আন্দোলনের সূচনা এ অঞ্চল থেকেই হয়েছিল।
এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। খেয়াল করলে দেখা যাবে যে, আমাদের পেছনের আলোচনায় যেসব ব্যক্তি ও গোত্রের নাম এসেছে, তারা সকলেই বংশমূলের বিচারে ছিলেন অনারব। বরং পুরো ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে যারা সংগ্রামী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে পরিবর্তন সূচিত করেছেন, তাদের মধ্যে আরব পরিচয়ধারী ব্যক্তির সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। এ কথা বলার উদ্দেশ্য আরবদের মর্যাদাহানি নয়; বরং এটিই ঐতিহাসিক বাস্তবতা। অধিকন্তু এটি ইসলামের অনন্য মর্যাদারও একটি স্বীকৃতি। ইসলাম এভাবেই ভিন্ন ভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী ও গোত্র-বর্ণের মানুষকে অভিন্ন বন্ধনে আবদ্ধ করতে পেরেছে। আর তাই সেলজুক, উরতুক ও কুর্দিদের ন্যায় অনারবি বংশপরিচয়ধারীরাও দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসে ইসলামের ঝান্ডা বহন করেছে এবং দ্বীনের মর্যাদা সমুন্নত করেছে। তাদের যেন মনেও ছিল না যে, উম্মাহর নবী ছিলেন আরব বংশীয় এবং সে যুগের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান অনারব হওয়া সত্ত্বেও খিলাফতের দায়িত্ব ছিল আরবদের কাছে। বরং আমাদের বর্তমান কালেও মুসলিম উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ অনারব। বর্তমানে মুসলমানদের মোট সংখ্যার মাত্র পঁচিশ শতাংশ আরব। মূলত ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাযি.-এর ইন্তেকালের পর হজরত উমর রাযি.-এর খিলাফতকাল শুরু হলে যখন পৃথিবীর পূর্বে-পশ্চিমে ইসলামের বাণী ছড়িয়ে পড়ে, তখন থেকে নিয়ে সব সময়ই উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ অনারবই ছিল। আর তাই এ তথ্যে মোটেও আশ্চর্যের কিছু নেই যে, ইসলামি ইতিহাসের অধিকাংশ সংগ্রামী নেতা ও মহান সংস্কারক ছিলেন অনারব। তারিক বিন যিয়াদ, আলপ আরসালান, ইউসুফ বিন তাশফিন, ইমাদুদ্দিন জিনকি, নুরুদ্দিন মাহমুদ, সালাহুদ্দিন আইয়ুবি, সাইফুদ্দিন কুতুজ, মুহাম্মদ আল-ফাতিহ—এভাবে দৃষ্টান্তস্বরূপ অনেক নামই উল্লেখ করা যেতে পারে, যাদের কেউই আরব নন।
একই কথা প্রযোজ্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন দিক ও ইসলামি শরিয়তসংশ্লিষ্ট শাস্ত্রীয় অঙ্গনসমূহের ক্ষেত্রেও। প্রতিটি ক্ষেত্র অনারব কীর্তিমানদের উজ্জ্বল কর্মগৌরবে আলোকিত। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হতে পারে প্রসিদ্ধ হাদিস সংকলকগণের বংশ-পরিচয়। হাদিসশাস্ত্রে যে ছয়জন ইমাম ‘উম্মাহাতুল হাদিস’ বা ‘সিহাহ সিত্তাহ’ নামে খ্যাত ছয়টি গ্রন্থের সংকলক হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, তাদের পাঁচজনই যদি অনারব হয়ে থাকেন, তাতে কি বিস্ময়ের কিছু আছে?! বুখারি রহ., মুসলিম রহ., তিরমিজি রহ., নাসায়ি রহ. ও ইবনে মাজা রহ.—এই পাঁচ অনারব ইমামের সঙ্গে একমাত্র আরব প্রতিনিধি হিসেবে আছেন আবু দাউদ রহ.!
নিঃসন্দেহে এটি ইসলামের মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম সুস্পষ্ট দলিল। ইসলাম যে পৃথিবীজুড়ে বসবাসকারী রক্তে-বর্ণে শতধা বিভক্ত মানবশ্রেণির বিচার-বুদ্ধি, আবেগ-বিবেক ও সম্মিলন-প্রকৃতিকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে, এটি তার অনন্য প্রমাণ। হায়! সেই ইসলামের সন্তানরা যদি কোনো দিন কোনো কালে দ্বীনি চেতনার ওপর জাতীয়তাবাদী চেতনাকে প্রাধান্য দেয় এবং আকিদা ও ধর্মের উপাদানের পরিবর্তে বংশ ও রক্তপরিচয়ের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে তা কতই-না পরিতাপের বিষয়!
টিকাঃ
৬৪৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪৪৩।
৬৫০. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১২/১৭০।
৬৫১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৯।
৬৫২. দেখুন: আহমাদ তাজুদ্দিন, আল-আকরাদ: তারীখু শা'বিন ওয়া কাযিয়্যাতু ওয়াতানিন, পৃষ্ঠা: ১৫।
📄 অত্যাচারীদের পরিণতি
মিশরের ন্যায় শাম অঞ্চলও ৩৫৯ হিজরি সন (৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দ) থেকেই উবায়দিদের নোংরা দখলদারিত্বের শিকার ছিল। পূর্ণ এক শতাব্দীরও অধিক সময় পর ৪৭৭ হিজরি সনে (১০৮৪ খ্রিষ্টাব্দে) সেলজুকরা শাম অঞ্চল থেকে উবায়দিদের বিতাড়িত করে। মিশরে অবশ্য শিয়া উবায়দিরা এরপরও ক্ষমতা ধরে রেখেছিল আরও এক শতাব্দী। ৫৬৭ হিজরি সনে (১১৭১ খ্রিষ্টাব্দে) মিশরে উবায়দি শাসনব্যবস্থার پতন ঘটে। এই দীর্ঘ সময়ে উবায়দিরা অধিকৃত অঞ্চলগুলোকে সুন্নি আলিমশূন্য করার ঘৃণ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে এবং বিশুদ্ধ ইসলামি শিক্ষার পথ রুদ্ধ করে সমাজে বিদআত-কুসংস্কার ছড়িয়ে দেয়। উবায়দি প্রশাসনের কর্মপন্থায় জিহাদ ও সংগ্রামের কোনো স্থান তো ছিলই না; তারা মুজাহিদদের ওপর দমন-নিপীড়ন চালিয়ে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করতে সচেষ্ট ছিল। উবায়দিরা মুসলিম উম্মাহর শত্রুদের সঙ্গে মিত্রতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়তেও দ্বিধা করত না। ক্রুসেডারদের সঙ্গে তাদের গৃহীত নীতি ও সমঝোতার প্রচেষ্টা সম্পর্কে পেছনে আমরা কিছুটা ধারণাও পেয়েছি।
এই অবসাদগ্রস্ত এবং দ্বীনি শিক্ষা ও চেতনাশূন্য পরিবেশে বসবাসকারী জনগণের মাঝ থেকে এমন নতজানু ও নমনীয় জনশ্রেণি বের হওয়াই ছিল অবশ্যম্ভাবী, যাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নেই! শাম ও মিশরে এমন কোনো আলিমকে বেঁচে থাকতে দেওয়া হয়নি, যিনি জনসাধারণকে সঠিক পথের দিশা দেবেন; এমন কোনো মুজাহিদের অস্তিত্ব রাখা হয়নি, যিনি সকলের আদর্শ বিবেচিত হবেন। এই শূন্যতা এক বছর বা দু-বছরের নয়; শাম পূর্ণ এক শতাব্দী আর মিশর দীর্ঘ দুই শতাব্দী ধরে এই দুর্যোগ ও শূন্যতার শিকার ছিল। আর তাই এ অঞ্চলের জনগণ মুসলমানদের কোনো ইস্যুতে স্পন্দিত হবে এবং করণীয় দায়-দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেবে, এমনটি মোটেও প্রত্যাশিত ছিল না। এমনকি নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ লঙ্ঘিত হলেও তাদের নীরব-নির্বিকার থাকারই কথা ছিল! ক্রুসেড আগ্রাসনে তো অন্যদের নয়; তাদের নিজেদের সম্পদই লুণ্ঠিত হচ্ছিল, নিজেদের বাড়িঘরই ধ্বংস হচ্ছিল, আপন ভাই, সন্তান ও পরিবারের রক্তেই জমিন রঞ্জিত হচ্ছিল!
আরও পরিতাপের বিষয়—শেষ পর্যন্ত যিনি শাম অঞ্চলকে উবায়দিদের হাত থেকে মুক্ত করেছিলেন, ধর্মপরিচয়ে সুন্নি হলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে তিনি ছিলেন উবায়দিদের মতোই সাক্ষাৎ জালিম!
উবায়দিরা বিতাড়িত হওয়ার পর শামে সেলজুক রাষ্ট্রের শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন তুতুশ বিন আলপ আরসালান। স্বভাব-চরিত্রের দিক থেকে তিনি ছিলেন তার মহান পিতা আলপ আরসালান ও ভাই মালিকশাহর সম্পূর্ণ বিপরীত। পিতা-পুত্রের এই ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক বৈপরীত্য উপলব্ধির জন্য আমাদের সামনে সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত হতে পারে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত নুহ আ. ও নুহ-পুত্রের আলোচনা।
তুতুশ ছিলেন অত্যাচারী-স্বেচ্ছাচারী একজন শাসক। ক্ষমতা নিষ্কণ্টক রাখাই ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য। তিনি ব্যক্তিস্বার্থ ছাড়া অন্য কিছু বুঝতেন না, নিজের মতের বিপরীত কারও পরামর্শ সহ্য করতে পারতেন না। তার কাছে জনসাধারণের জান-মালের কোনো মূল্যই ছিল না, ছিল না আকিদা ও ধর্মবিশ্বাস বা বংশ ও রক্তের সম্পর্কের কোনো আবেদন। এভাবে তিনি সকলের সঙ্গেই সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন এবং একেকবার একেকজনের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন। এমনকি ভাই মালিকশাহর মৃত্যুর পর তিনি ভ্রাতুষ্পুত্র বারকিয়ারুকের সঙ্গে সংঘাত ও যুদ্ধে জড়াতেও সামান্য দ্বিধা করেননি। এ সবকিছুর কারণ আর কিছুই নয়—সাম্রাজ্যবাদী চেতনা ও সম্পদ বৃদ্ধির লালসা।
অনাচার-অবিচারে নিমজ্জিত এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা জনগণ যে হীনম্মন্য, নতজানু ও দলিত মানসিকতা লালন করবে, চাবুকের ইশারায় পরিচালিত হবে, অম্লান বদনে ইজ্জত-সম্মানের ওপর আঘাত মেনে নেবে এবং অধিকার লুণ্ঠিত হলেও তুষ্ট চিত্তে বসে থাকবে, এমনটাই তো স্বাভাবিক। আর তাই তৎকালীন শাম অঞ্চলের জনসাধারণের কাছে ক্রুসেডাররা তুতুশ বা উবায়দিদের চেয়ে খুব বেশি ভিন্ন কিছু ছিল না! বরং তাদের অনেকে তো এক মুঠো খাবার বা যৎসামান্য অর্থ ও ভূমির লোভে ক্রুসেডারদের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময়ও করেছিল।
৪৮৭ হিজরি সনে (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) তুতুশ নিহত হওয়ার পরও শামের পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন সাধিত হয়নি। তুতুশের শাম-রাজ্য এরপর বিভক্ত হয়ে পড়ে তার দুই পুত্র রিজওয়ান ও দাক্কাকের মাঝে। রিজওয়ানের ভাগে আলেপ্পো আর দাক্কাকের ভাগে দামেশক। স্বভাব-চরিত্রের দিক থেকে দুই ভাই ছিলেন পিতার যোগ্য উত্তরসূরি। আর তাই তাদের শাসন ছিল কেবল শাসিত অঞ্চলের জনগণের জন্য নয়; পুরো মুসলিম উম্মাহর জন্যই এক চরম দুর্যোগ।
অত্যাচারী স্বভাবের পাশাপাশি রিজওয়ানের চরিত্রে উবায়দি অনাচারও যুক্ত হয়েছিল। রিজওয়ান শিয়া মতাদর্শ গ্রহণ করে কুখ্যাত ইসমাইলি-বাতিনি গোষ্ঠীকে আপন করে নিয়েছিলেন এবং জনমনে ত্রাস সৃষ্টি ও ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার লক্ষ্যে তাদেরকে যথেচ্ছা অন্যায়-অপরাধ সংঘটনে প্ররোচিত করেছিলেন। এখনো পর্যন্ত যে ইতিহাস আমরা বর্ণনা করে এসেছি, তাতে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি যে, শিয়া বাতিনি ফিরকার প্রত্যক্ষ চেষ্টায় বড় বড় দুটি অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল। প্রথমে তারা ৪৮৫ হিজরি সনে মহান উজির নিজামুল মুলক তুসিকে হত্যা করে; এরপর ৪৯৫ হিজরি সনে সরাসরি রিজওয়ানের প্ররোচনায় হত্যা করে রিজওয়ানের সৎ পিতা হুসাইন বিন মালাইবকে।
পরিচ্ছেদের শুরু থেকে যে বিশ্লেষণ আমরা পেশ করলাম, তাতে আমাদের সামনে এই আশাবাদই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, আগামী দিন ও বছরগুলোতে উত্তর ইরাক থেকেই কোনো সংস্কারমূলক জিহাদি তৎপরতা সূচিত হবে; বিপরীতে নিপীড়ন ও লাঞ্ছনার মাঝে বেড়ে ওঠা দ্বীন ও শরিয়তবিমুখ শামের জনগণের প্রতিক্রিয়া প্রাথমিক পর্যায়ে বেশ দুর্বল হবে। হ্যাঁ, অন্যের হাত ধরে পরিবর্তন সূচিত হওয়ার পর ধীরে ধীরে যখন জনসাধারণের মনোভাবেও পরিবর্তন শুরু হবে, আশা করা যায় যে, তখন শাম অঞ্চলেও এমন এক প্রজন্ম তৈরি হবে, যাদের হাত ধরে যন্ত্রণাদায়ক বাস্তবতার অবসান ঘটবে।
📄 এক মহিমান্বিত বিজয়
এ তো গেল অতীতের আলোকে আগামীর আশাবাদের গল্প! বাস্তব ইতিহাস আমাদের জন্য কী তথ্য সংরক্ষণ করেছে?! বাস্তবতা তো অতীতের ওপর ভর করেই গড়ে ওঠে। আর তাই ইতিহাসের পাতায় আমরা দেখতে পাই যে, অতীতের মহান পুরুষগণ উত্তর ইরাকে কল্যাণের যে বীজ রোপণ করে গিয়েছিলেন, ৪৯৬ হিজরি সনেই (১১০৪ খ্রিষ্টাব্দে) তা ডালপালা মেলে বেড়ে উঠতে শুরু করে। শুরু হয় ক্রুসেডারদের প্রতিরোধের লক্ষ্যে এক জিহাদি আন্দোলন।
আসুন, আবারও ফিরে যাই ইতিহাসের ধারাবর্ণনায়!
এ সময় মসুলের শাসক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন জাকারমিশ। পূর্বেই বলা হয়েছে যে, মসুলের সাবেক প্রশাসক কারবুগার মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট বিরোধ-বিশৃঙ্খলার মাঝে একসময় তিনি শাসনক্ষমতা লাভ করেন। (৬৫৩) জাকারমিশ ছিলেন সুস্পষ্ট ধর্মীয় চেতনার অধিকারী ন্যায় ও উদার একজন নেতা। প্রজা-আচরণনীতি সম্পর্কেও তার বাস্তবানুগ জ্ঞান ছিল। এ কারণেই মসুলের জনগণ তাকে পছন্দ করে শাসক হিসেবে বরণ করে নেয়। অবশ্য জাকারমিশের স্বাধীন ক্ষমতার প্রতি ঝোঁক ছিল। বিশেষত সেলজুক সুলতান বারকিয়ারুক ও তার ভাই সুলতান মুহাম্মাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও অব্যাহত সংঘাতের কারণে জাকারমিশের মনে মসুলকেন্দ্রিক স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ঘুরপাক খাচ্ছিল। অবশ্য বাহ্যিকভাবে তিনি সুলতান বারকিয়ারুকের প্রতি আনুগত্য ও মিত্রতা বজায় রেখে চলছিলেন। (৬৫৪)
কারবুগার মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে মসুলে যেমন প্রশাসনিক অস্থিরতা চলছিল, ঠিক একই সময় হাররান নগরীতেও তৈরি হয়েছিল প্রশাসনিক সংকট। ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে হাররান নগরীর অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাররান ছিল ক্রুসেড রাজ্য এডেসা থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। তা ছাড়া নগরীটির অবস্থান ছিল আলেপ্পো থেকে আনুমানিক দুইশ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এবং মসুল থেকে সমদূরত্বে বা সামান্য অধিক দূরত্বে উত্তর-পশ্চিমে। অধিকন্তু শামের সঙ্গে ইরাকের সংযোগপথ বরং আরও নির্দিষ্ট করে বললে আলেপ্পোর সঙ্গে মসুলের সংযোগপথের ওপর নগরীটির নিয়ন্ত্রণ ছিল। এই গুরুত্বপূর্ণ নগরীটিতেই মসুলের মতো একই ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। অল্প সময়ের মধ্যে বেশ কয়েকজন শাসককে হত্যা করা হয় এবং ক্ষমতার পালাবদলে শেষ পর্যন্ত প্রশাসক পদে অধিষ্ঠিত হন 'জাওলি' নামক জনৈক তুর্কি আমির। (৬৫৫)
মসুল ও হাররানের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রতি ক্রুসেডারদের নজর ছিল। তারা একে কাজে লাগিয়ে নগরীদুটি দখলের এবং এর মাধ্যমে উত্তরের দুই ক্রুসেড রাজ্য এডেসা ও এন্টিয়কের বিভিন্ন স্বার্থ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। (৬৫৬)
ক্রুসেড রাজ্য এডেসার শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গ তার সহকারী তিল-বাশির (Turbessel) (নগরীটি এডেসা রাজ্যের অংশ ছিল) নগরীর প্রশাসক জোসেলিন ডি কার্টেনি (Joscelin de Courtenay)-কে সঙ্গে নিয়ে এন্টিয়কের শাসক বোহেমন্ড এবং তার ভাগ্নে ও প্রধান সহযোগী টেনক্রেডের সঙ্গে এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেন যে, সকলে মিলে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি যৌথ সামরিক অভিযান পরিচালনা করবেন। আর তা হলো (বর্তমান তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত) হাররান নগরীতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা। এটি হবে অভিযানের প্রথম অংশ। পরবর্তী পর্যায়ে তারা একেবারে মসুল নগরী দখলের চেষ্টা চালাবেন! (৬৫৭)
অভিযান সফল হলে ক্রুসেডারদের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জিত হবে।
১. এর মাধ্যমে তারা প্রাকৃতিক সম্পদ ও উর্বর ভূমির জন্য প্রসিদ্ধ হাররান নগরীর পতন ঘটাতে পারবে।
২. তারা ইরাক ও শামের পারস্পরিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারবে। তখন ইরাক থেকে সেলজুকদের প্রেরিত কোনো ধরনের সামরিক সহায়তা শামের ক্রুসেডার অধিকৃত অঞ্চলে পৌঁছতে পারবে না। (৬৫৮)
৩. হাররান বিজয়ের মধ্য দিয়ে মসুল দখলের পথ উন্মুক্ত হয়ে পড়বে। আগেই বলা হয়েছে যে, মসুল ছিল জিহাদি আন্দোলনের উর্বর ভূমি, মসুলে ছিল অনুকূল ইসলামি পরিবেশ। আর তাই পরিকল্পনামতো মসুলের পতন ঘটাতে পারলে এ অঞ্চলের মুসলমানদের নিক্ষেপ করা যাবে পতনের গভীর খাদে।
৪. মসুল দখল করতে পারলে খিলাফতের রাজধানী ও ইসলামি বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র বাগদাদও ক্রুসেডারদের সামনে উন্মুক্ত হয়ে যাবে। আর বাগদাদের পতন ঘটাতে পারলে তো নিঃসন্দেহে পুরো ইসলামি বিশ্বকেই প্রকম্পিত করে তোলা যাবে। তখন তো পুরো ইসলামি বিশ্বই চলে আসবে ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রণে!
৫. এন্টিয়ক শাসক বোহেমন্ডের একান্ত একটি স্বার্থও এর সঙ্গে জড়িত ছিল। আর তা হলো হাররান দখল করতে পারলে আলেপ্পো পূর্ব দিক থেকে এন্টিয়ক ও পশ্চিম দিক থেকে হাররানের মাঝে আটকা পড়ে যাবে এবং এর মাধ্যমে আলেপ্পোর পতন ঘটানোও সহজ হবে। আর তখন বর্তমান ক্ষুদ্র এন্টিয়ক রাজ্যের পরিবর্তে বোহেমন্ডের নেতৃত্বে শামের উত্তরাঞ্চলে গড়ে উঠবে সুবিশাল ক্রুসেড সাম্রাজ্য। (৬৫৯)
এসব সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যের বিবেচনায় হাররানের পতন ক্রুসেডারদের অতি আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নে পরিণত হয়। আর তাই এ অঞ্চলের সকল ক্রুসেডার সেনাপতির সমন্বয়ে প্রস্তুত হয় এক বিরাট বাহিনী। বল্ডউইন, জোসেলিন, বোহেমন্ড ও টেনক্রেডের সঙ্গে আরও যোগ দেয় এডেসা ও এন্টিয়কের গির্জার নেতৃবৃন্দ। সবমিলিয়ে ক্রুসেডার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় বিশ হাজার।
ক্রুসেডারদের এই পরিকল্পনা ছিল সামগ্রিক বিচারে অত্যন্ত ভয়াবহ। বিশেষত এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ দুই ইসলামি নগরী মসুল ও হাররান সদ্যই অস্থির সময় পাড়ি দিয়ে এসেছিল। এদিকে মসুলের শাসক জাকারমিশ ও (হাররানের পূর্বে অবস্থিত) হাসানকেইফের শাসক সুকমান বিন উরতুকের মধ্যকার সম্পর্ক ছিল বেশ বিরোধপূর্ণ। কদিন পূর্বে মসুলের ক্ষমতা নিয়ে জাকারমিশ যখন মুসা তুর্কমানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন, তখন সুকমান সরাসরি মুসার পক্ষ অবলম্বন করেছিলেন।
ক্রুসেডাররা এই অভিযানের জন্য মুসলমানদের অত্যন্ত দুর্যোগপূর্ণ সময়কেই বেছে নিয়েছিল। চলমান পরিস্থিতিতে বাহ্যত মনে হচ্ছিল যে, তাদের বিজয় অতি সন্নিকটে! কিন্তু এ সময়ই এমন এক ঘটনা সংঘটিত হয়, যা এই অস্থিরতাপূর্ণ সময়ে ক্রুসেডারদের কল্পনাতেও ছিল না। এর ফলে এ অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য অনেকটা বদলে যায়। দুই মুসলিম নেতা জাকারমিশ ও সুকমান বিন উরতুক প্রায় কাছাকাছি সময়ে পত্রবিনিময় করেন এবং উভয় নেতা তার মুসলিম ভাইকে পারস্পরিক অতীত বিভেদ ভুলে গিয়ে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যৌথ সহযোগিতা বিনিময়ের আহ্বান জানান। নিঃসন্দেহে এমন সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে মুসলমানদের এই ঐক্য ছিল অত্যন্ত চমকপ্রদ ঘটনা। তবে এর চেয়েও চমকপ্রদ বিষয় হলো—এই ঐক্য যুদ্ধজয়, রাজ্যবিস্তৃতি বা সম্পদবৃদ্ধির ন্যায় পার্থিব কোনো স্বার্থে ছিল না; উভয় নেতার সুস্পষ্ট ঘোষণা অনুযায়ী এ ঐক্য ছিল কেবলই আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে!
ঐতিহাসিক ইবনুল আছির বর্ণনা করেছেন, উভয় নেতাই অপরজনের কাছে প্রেরিত বার্তায় বলেন, 'নিশ্চয়ই আমি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সাওয়াব লাভের আশায় নিজেকে এ বিষয়ে নিবেদিত করেছি।'(৬৬০)
ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাসে এই প্রথমবার আমরা দেখছি, জিহাদের পতাকা আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে সুস্পষ্ট নিষ্ঠার সঙ্গে উত্তোলিত হয়েছে। হ্যাঁ, সময় ছিল দুর্যোগপূর্ণ, মুসলমানদের হৃদয়জগৎ ছিল বিশৃঙ্খল, মেধা ও মননে ছিল অস্থিরতা, ক্ষমতা ও রাজত্বের লালসা ছিল ব্যাপক-বিস্তৃত, ব্যক্তিস্বার্থের উপস্থিতিও ছিল লক্ষণীয়। কিন্তু আল্লাহর শোকর, তখনও কিছু হৃদয়ে কল্যাণ অবশিষ্ট ছিল; তখনও এমন কিছু মানুষের অস্তিত্ব ছিল, যারা কেবল আল্লাহর লক্ষ্যে কাজ করে যায়। আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, উভয় নেতা একই সময়ে একে অপরের কাছে পত্র প্রেরণ করেছেন। স্পষ্টতই অনুমিত হচ্ছিল যে, আল্লাহ তাআলা তাদের দুজনের এবং উম্মাহর কল্যাণ কামনা করছেন।
বিশাল ক্রুসেডার বাহিনী হাররানের কাছে পৌঁছে কঠিন অবরোধ আরোপ করে। মসুল ও হাসানকেইফের ইসলামি শক্তির সম্মিলন সম্পর্কে তাদের জানা ছিল না। আর তাই ঐক্যবদ্ধ মুসলিম বাহিনী যখন ক্রুসেডার বাহিনীর দৃষ্টিপথে আবির্ভূত হয়, তখন তারা বিস্ময়ে হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। যৌথ মুসলিম বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ছিল দশ হাজার। জাকারমিশের নেতৃত্বে তিন হাজার আরব, সেলজুক ও কুর্দি সৈন্য আর সুকমান বিন উরতুকের নেতৃত্বে সাত হাজার তুর্কমেন সৈন্য। (৬৬১)
১১০৪ খ্রিষ্টাব্দের ৭ মে বালিখ নদীর তীরে মুসলিম ও ক্রুসেডার বাহিনীর মাঝে সংঘটিত হয় এক রক্তক্ষয়ী লড়াই।(৬৬২) ইতিহাসে এ যুদ্ধ 'হাররানের যুদ্ধ' বা 'বালিখের যুদ্ধ' নামে খ্যাত।
সুমাইসাত কায়সুম • মারদিন এডেসা হিরাক্লিয়া আদানা মপসুয়েসটিয়া • মারআশ আলবেরা ইসকানদারুন তিল-বাশির এন্টিয়ক আলেপ্পো হরিরান হাসানকেইফ মসুল লাতাকিয়া জাবালা • মাআ'ররাতুন-নোমান বানিয়াস হামা তারতুস ইরকা • হিমস ত্রিপোলি ভূমধ্যসাগর ব্যাবলস • বালাবার বৈরুত সিডন দামেশক সুর আক্কা হাইফা কায়সারিয়া • আম্মান আরসুফ আসকালান জাফা গাজা রামলা আল-কুদস শামের মরুঅঞ্চল কারাক
মানচিত্র নং-২১ হাররানের (বালিখের) যুদ্ধ
বল্ডউইন ও জোসেলিন নিজেদের সর্বশক্তি ব্যয় করে লড়াই করেন। কারণ, যুদ্ধ সংঘটিত হচ্ছিল অনেকটা তাদের রাজ্যসীমাতেই। অপরদিকে বোহেমন্ড ইতিপূর্বে একবার বন্দি হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভাগ্নে টেনক্রেডকে সঙ্গে নিয়ে বাহিনীর পেছনের দিকে অবস্থান গ্রহণ করেন। তার দায়িত্ব ছিল বাহিনীর পৃষ্ঠদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে সম্ভাব্য প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পালানোর পথ খোলা রেখে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা! (৬৬৩)
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অল্প সময় অতিবাহিত হতেই নিরঙ্কুশ বিজয় মুসলিম বাহিনীর পদচুম্বন করে। ক্রুসেডার বাহিনীর বারো হাজারের অধিক সৈন্য নিহত হয়, (৬৬৪) বন্দি হয় দুই ক্রুসেডার সেনাপতি বল্ডউইন ও জোসেলিন! বন্দি হয় আরও অনেক ক্রুসেডার সৈন্য। মুসলিম বাহিনী লাভ করে প্রচুর পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ। অপর দুই সেনাপতি বোহেমন্ড ও টেনক্রেড কোনোমতে পালিয়ে পৌঁছেন এন্টিয়কে! (৬৬৫)
টিকাঃ
৬৫৩. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৫৫।
৬৫৪. প্রাগুক্ত, ৯/৭৮-৭৯।
৬৫৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/ ১০২। হাররানের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন: ইবনুল ইবরি, তারীখু মুখতাসারিদ দুওয়াল, পৃষ্ঠা: ১৯৮ ও আবুল মাহাসিন, আন-নুজুমুয যাহিরা, ৫/১৯১।
৬৫৬. Setton: op. cit., 1389.
৬৫৭. Guillaume de Tyr, 1, P. 389.
৬৫৮. Elisseeff: op. cit., p. 296.
৬৫৯. Runciman: op. cit., 11, p. 44.
৬৬০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৭৩।
৬৬১. প্রাগুক্ত, ৯/৭৩।
৬৬২. বালিখ রাক্কা অঞ্চলের একটি নদী। রাক্কা থেকে প্রায় পাঁচ মাইল বয়ে চলার পর নদীটি সেই দুর্গের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছে, যা মাসলামা বিন আবদুল মালিক নির্মাণ করেছিলেন। মুজামুল বুলদান, ১/৪৯৩।
৬৬৩. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৭৩।
৬৬৪. প্রাগুক্ত, ৯/৭৪।
৬৬৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৭৩, ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা : ২৩২ ও Setton: op. cit., 1,p. 389.
📄 বিরল অভিযান! অভাবনীয় ত্যাগ!
নিঃসন্দেহে এ বিজয় ছিল অতি মহিমান্বিত এক বিজয়!
যুদ্ধ চলাকালে বাস্তব অর্থে মুসলিম শিবির কোনো ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়নি। শুরু থেকেই রণাঙ্গনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল মুসলামানদের হাতে। তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দেখা দেয় এক অযাচিত সংকট। তবে দয়াময় আল্লাহ আপন অনুগ্রহে সে সংকট থেকেও মুসলিম বাহিনীকে নিষ্কৃতি দান করেন।
যুদ্ধ শেষে দেখা গেল অধিকাংশ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সুকমান বিন উরতুক ও তার সৈন্যদের কাছে আছে। দুই দামি 'শিকার'ও ছিল তাদের কাছে। জাকারমিশ প্রায় শূন্য হাতে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এসেছিলেন। এতে জাকারমিশের বাহিনীর সদস্যগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং তাদের সেনাপতি জাকারমিশকে তার অংশ নিয়ে আসতে প্ররোচিত করে। সাধারণ সৈন্যদের পীড়াপীড়িতে জাকারমিশ একসময় প্রভাবিত হন; তার সৈন্যরা এবার ছুটে যায় তুর্কমেন শিবিরে। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারে যে, সুকমান তার কিছু সৈন্যকে নিয়ে ক্রুসেডারদের তাড়া করতে বেরিয়েছেন। জাকারমিশের সৈন্যরা বন্দিদের তাঁবুতে প্রবেশ করে দামি শিকার এডেসার শাসক বল্ডউইনকে পেয়ে যায় এবং তাকে নিয়ে নিজেদের শিবিরে ফিরে আসে!
এরই নাম পার্থিব মোহ! যে যুগে মানুষের বোধ ও চিন্তার জগৎ হাজারো দুবোধ্যতায় আচ্ছন্ন ছিল, সে যুগে সেনাপতি ও যোদ্ধাদের অন্তর্জগতে পার্থিব মোহ ও আকর্ষণ সৃষ্টি হওয়া মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়।
সুকমান বিন উরতুক ফিরে এসে সবকিছু জানতে পারেন। তার সৈন্যরা তাকে জাকারমিশের বিরুদ্ধে লড়াই করে বল্ডউইনকে ফিরিয়ে আনার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকে। কিন্তু সুকমান রহ. আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে এমন এক অবস্থান গ্রহণ করেন, যাকে তার জীবনের সবচেয়ে মহান অবস্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে। প্রকৃতপক্ষে তার এ অবস্থান ছিল তার চিত্তের বিশুদ্ধতা ও নিষ্ঠাপূর্ণ অভিপ্রায়ের সুস্পষ্ট প্রমাণ। সুকমান তার সৈন্যদের বলেন, 'মুসলমানদের যুদ্ধজয়ের আনন্দ আমাদের বিরোধের কারণে বিষাদে পরিণত হতে পারে না। নিজের ক্ষোভ চরিতার্থ করতে গিয়ে আমি মুসলমানদের বিপদে ফেলে শত্রুদের আনন্দ দিতে পারি না।' (৬৬৬)
আল্লাহু আকবার! তিনি যুদ্ধলব্ধ সম্পদ নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে মুসলমানদের বিজয়-সৌভাগ্য বিলীন করতে চাচ্ছিলেন না, আবেগের বশবর্তী হয়ে জাকারমিশের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে গিয়ে শত্রুদের আনন্দের উপলক্ষ্য সৃষ্টি করতে চাচ্ছিলেন না।
এরই নাম নিষ্ঠা ও নির্মোহতা, যার পেছনে অপেক্ষা করে আল্লাহর নুসরত ও বিজয়-গৌরব!
এই নিষ্ঠাপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করেই সুকমান থেমে থাকেননি; বরং তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ বিজয়কে কাজে লাগিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ক্রুসেড সেনাদের ফেলে যাওয়া যুদ্ধাস্ত্র ও যুদ্ধ-পোশাকগুলো সংগ্রহ করেন এবং শত্রুপক্ষকে বিভ্রান্ত করার জন্য সেগুলো নিজের সৈন্যদের পরিধান করতে বলেন। এরপর তিনি তার সৈন্যদের নিয়ে ক্রুসেডারদের অধিকৃত বিভিন্ন দুর্গে অভিযান চালান। দুর্গগুলোর অভ্যন্তরে অবস্থানরত ক্রুসেডাররা সুকমানের বাহিনীকে নিজেদের লোক ভেবে দুর্গদ্বার খুলে দেয়। ফলে মুসলিম সৈন্যরা অতি সহজে দুর্গগুলোতে প্রবেশ করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এভাবে এ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ মুসলমানদের অধিকারে আসে। (৬৬৭)
অপরদিকে জাকারমিশ তার বাহিনী নিয়ে হাররানে পৌঁছার পর নগরীটির কর্তৃত্ব বুঝে নেন এবং হাররানকে মসুল রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করেন। এরপর তিনিও থেমে না থেকে তার স্বল্পসংখ্যক সৈন্য নিয়েই ক্রুসেড রাজ্য এডেসা অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি জানতেন যে, এই সীমিত জনবল নিয়ে সুরক্ষিত এডেসা রাজ্য জয় করা সম্ভব নয়। (৬৬৮) মূলত তার এই পদক্ষেপ ছিল এক ধরনের মনস্তাত্বিক লড়াই, যা বালিখের যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয় বরণকারী ক্রুসেডারদের মনোবল আরও বেশি দুর্বল করে দিতে বড় ভূমিকা রাখে। (৬৬৯)
টিকাঃ
৬৬৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারিখ, ৯/৭৩-৭৪।
৬৬৭. প্রাগুক্ত, ৯/৭৪।
৬৬৮. প্রাগুক্ত, ৯/৭৪।
৬৬৯. Runciman: op. cit., 11, p. 44.