📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 কেন কেবল উত্তর ইরাক থেকে?!

📄 কেন কেবল উত্তর ইরাক থেকে?!


এখানে এই প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়া মোটেও অস্বাভাবিক নয় যে, ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে একের পর এক সংগ্রামী ব্যক্তির আত্মপ্রকাশ কেন এই একটি অঞ্চল থেকেই হলো? কেন ইসলামি বিশ্বের অন্যান্য ভূখণ্ড জন্ম দিতে পারল না একজন ইমাদুদ্দিন জিনকি কিংবা একজন সালাহুদ্দিন আইয়ুবি?!

এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে এবং এর নিগূঢ় তত্ত্ব উপলব্ধি করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে একটু পেছনে, জানতে হবে এ অঞ্চলের নিকট অতীতের ইতিহাস, অধ্যয়ন করতে হবে এ অঞ্চলের ও অন্যান্য অঞ্চলের ইতিহাসের পার্থক্যের দিকটি। তাহলেই আমরা এসব সংগ্রামী আন্দোলন ও সংস্কার প্রচেষ্টার শেকড় ও উৎসমূল সম্পর্কে অবগতি লাভ করতে পারব এবং পেয়ে যাব আমাদের কাঙ্ক্ষিত প্রশ্নের উত্তর।

আমরা যদি হিজরি ৫ম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় অর্থাৎ ক্রুসেড আগ্রাসনের প্রায় পঞ্চাশ বছর পূর্বের ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব যে, সে সময়ই বরং আরও নির্দিষ্ট করে বললে ৪৪৭ হিজরি সনে (১০৫৫ খ্রিষ্টাব্দে) সুন্নি সেলজুক নেতা তুগরল বেগ বাগদাদে প্রবেশ করে আব্বাসি খিলাফতকে শিয়া বুওয়াইহি পরিবারের স্বেচ্ছাচারী শাসন থেকে উদ্ধার করেন।(৬০৪) ঐতিহাসিক ইবনুল আছিরের বর্ণনামতে সুলতান তুগরল বেগ ছিলেন সহনশীল, বিচক্ষণ ও অত্যুচ্চ ধৈর্যশক্তির অধিকারী। ইবনুল আছির তার সম্পর্কে আরও বলেছেন, 'তিনি নামাজ আদায়ে যত্নশীল ছিলেন এবং নিয়মিত সোম ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখতেন।'(৬০৫)

তুগরল বেগের ইন্তেকালের পর সেলজুক সালতানাতের হাল ধরেন তার ভ্রাতুষ্পুত্র ও ইতিহাসখ্যাত অনন্যসাধারণ ইসলামি সেনাপতি আলপ আরসালান। আলপ আরসালান সেই মহান সুলতানের নাম, যিনি জগৎজুড়ে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, পৃথিবীকে সমৃদ্ধ করেছিলেন দয়া ও প্রজ্ঞায়, জ্ঞান ও অনুকম্পায় এবং জিহাদ ও সংগ্রাম চর্চায়। ইবনুল আছির তাকে ভূষিত করেছেন নিম্নোক্ত অভিধায়—

তিনি ছিলেন গুণী ও উদার, জ্ঞানী ও ন্যায়পরায়ণ। পরনিন্দা-কানকথা মোটেও শুনতে পারতেন না। তার শাসনামলে সেলজুক সাম্রাজ্যের পরিধি অনেক বৃদ্ধি পায় এবং দিগন্ত বিস্তৃত অঞ্চল তার বশীভূত হয়। তাকে প্রদত্ত 'সুলতানুল আলম' বা জগতের সুলতান অভিধা ছিল সত্যই তার শানে যথোপযুক্ত। মহৎ হৃদয় এই সুলতান দরিদ্রদের প্রতি অনুগ্রহপূর্ণ আচরণ করতেন, আল্লাহর দরবারে প্রচুর দোয়া করতেন। সৈন্যরা যেন জনসাধারণের সম্পদে অন্যায় হস্তক্ষেপ করতে না পারে, এ বিষয়ে তিনি কঠোর নজরদারি করতেন। (৬৩৬)

হ্যাঁ, এমন মহান এক সুলতান তখন শাসন করতেন ইসলামি ভূখণ্ড। সুলতান আলপ আরসালানের শাসনব্যবস্থা মূলত কেন্দ্রীভূত ছিল পারস্য ও ইরাক অঞ্চলজুড়ে। পুরো সালতানাতে তার ন্যায় ও অনুগ্রহ পরিব্যাপ্ত ছিল। ৪৬৩ হিজরি সনে (১০৭০ খ্রিষ্টাব্দে) মানজিকার্টের যুদ্ধে তিনি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এমন চমকপ্রদ ও ঐতিহাসিক এক বিজয় অর্জন করেন, যার কীর্তি আলোচনায় আজকের পৃথিবীও সবাক-মুখর। (৬৩৭) নিঃসন্দেহে তার সেই অমর কীর্তি তার রাজ্যের জনগণের হৃদয়জগতে এক অবিস্মরণীয় প্রভাব সৃষ্টি করেছিল এবং তাদেরকে চিনিয়েছিল আল্লাহর পথে জিহাদের মূল্য ও প্রভাব।

সমকালীন ইরাক ও পারস্য অঞ্চলের জনগণ যে কেবল সুলতান আলপ আরসালানের সযত্ন তত্ত্বাবধান লাভ করেছিল, তা-ই নয়; আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদেরকে দান করেছিলেন ইসলামি ইতিহাসের এক মহান উজিরের সাহচর্য-কল্যাণ। তিনি ছিলেন ন্যায় ও সততার প্রতি উদ্বুদ্ধকারী একজন সৎ সহচর। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম ইরশাদ করেছেন—

مَا اسْتُخْلِفَ خَلِيفَةٌ إِلَّا لَه بِطَانَتَانِ : بِطَانَةٌ تَأْمُرُه بِالْخَيْرِ وَتَحُضُّهُ عَلَيْهِ، وَبِطَانَةٌ تَأْمُرُهُ بِالشَّرِّ وَتَحُضُّهُ عَلَيْهِ، وَالْمَعْصُوْمُ مَنْ عَصَمَ اللَّهُ

খলিফা পদে যিনিই অধিষ্ঠিত হন, তার দু ধরনের সহচর থাকে। এক দল তাকে সৎকর্মের পরামর্শ দেয়, সৎকর্মের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। অপর দল তাকে মন্দ কাজের পরামর্শ দেয়, মন্দের প্রতি প্ররোচিত করে। আর নিরাপদ সে-ই থাকে, আল্লাহ যাকে রক্ষা করেন। (৬৩৮)

মহান সেই উজির হলেন নিজামুল মুলক তুসি। তিনি ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ আলিমে দ্বীন। উজির নিজামুল মুলক শরিয়ত ও সুন্নাহ বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকতেন, জনগণকে জিহাদ ও আত্মোৎসর্গের প্রতি উৎসাহ জোগাতেন। তিনি ছিলেন সত্য ও ন্যায়ের পথে অটল-অবিচল, জনসাধারণের প্রতি উদার ও দয়ার্দ্র। প্রতিটি উত্তম চরিত্রগুণের তিনি ছিলেন উৎকৃষ্ট নমুনা। জ্ঞান ও জ্ঞানচর্চার প্রতি তার ছিল নিষ্ঠাপূর্ণ সুগভীর অনুরাগ। সুলতান আলপ আরসালান যতদিন জীবিত ছিলেন, ততদিন নিজামুল মুলক-ই ছিলেন তার প্রধান উজির। ৪৬৫ হিজরি সনে (১০৭২ খ্রিষ্টাব্দে) আলপ আরসালানের ইন্তেকালের পর তার পুত্র মালিকশাহ তার স্থলাভিষিক্ত হন আর নিজামুল মুলক যথারীতি তার উজির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মালিকশাহর শাসনামলে সেলজুক সাম্রাজ্য পূর্বে চীন ও ভারতবর্ষ পর্যন্ত এবং পশ্চিমে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য ও শাম পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। পিতার মতো সুলতান মালিকশাহও ছিলেন জ্ঞান-অনুরাগী। তিনিও আলিমসমাজ ও জ্ঞানী-গুণীদের মর্যাদার চোখে দেখতেন। সুলতান মালিকশাহ মহান উজির নিজামুল মুলকের যথার্থ মূল্যায়ন করতেন। এমনকি দায়িত্ব গ্রহণকালে তিনি নিজামুল মুলককে বলেছিলেন, 'আমি রাজ্যের ছোট-বড় সার্বিক বিষয়ের দায়িত্ব আপনার হাতেই ছেড়ে দিলাম। (পিতার অবর্তমানে) এখন তো আপনিই আমার পিতা।' (৬৩৯)

নিজামুল মুলক তুসি মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে এমন এক অসাধারণ খেদমতের আঞ্জাম দিয়েছিলেন, যাকে তার কর্মজীবনের শ্রেষ্ঠতম কীর্তি বিবেচনা করা হয়। তিনি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অনেকগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তার প্রতি সম্বন্ধিত হয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো ‘নিজামিয়া মাদরাসা’ নামে খ্যাতি লাভ করে। জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অংশ হিসেবে প্রতিটি মাদরাসায় শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা ও আবাসনের সুলভ ব্যবস্থা ছিল। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে মাসিক ভাতাও প্রদান করা হতো।

উজির নিজামুল মুলক মাদরাসাগুলোতে অধ্যাপনার জন্য ইসলামি বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে যুগশ্রেষ্ঠ আলিম ও বিদ্বানদের খুঁজে নিয়ে আসতেন। হাদিস, ফিকহসহ বিভিন্ন শাস্ত্রের খ্যাতনামা আলিমগণ নিজামিয়া মাদরাসাসমূহে শিক্ষাদান করতেন। (৬৪০) তৎকালে ইসলামি ভূখণ্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে ফিতনারূপে ছড়িয়ে পড়া শিয়া মতাদর্শ ও বাতিনি চিন্তাধারার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধে এসব প্রতিষ্ঠানের বিশেষ ভূমিকা ছিল। সে সময় শিয়াশাসিত প্রধান দুটি অঞ্চল ছিল মিশর ও শাম।

ক্রুসেড আগ্রাসন শুরু হওয়ার মাত্র ছয় বছর পূর্বে ৪৮৫ হিজরি সনে (১০৯২ খ্রিষ্টাব্দে) উজির নিজামুল মুলক জনৈক শিয়া ইসমাইলি বাতিনি গুপ্তঘাতকের হাতে নিহত হন। (৬৪১) এর মাসখানেক পরেই ইন্তেকাল করেন সুলতান মালিকশাহ! (৬৪২) আমাদের বিশ্বাস—এই দুই কীর্তিমান পুরুষ যদি ক্রুসেড অভিযানের সময় জীবিত থাকতেন, তাহলে কিছুতেই ইসলামি ভূখণ্ডে ক্রুসেডারদের নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ ও লুটতরাজ চালানোর সুযোগ দিতেন না। কিন্তু তাকদিরের ফয়সালাই তো চূড়ান্ত! আল্লাহ যা চান, তাই-ই হয়। মহান আল্লাহ উম্মাহর শ্রেষ্ঠতম এই দুই মহান ব্যক্তিকে আপন বিস্তৃত রহমতে আচ্ছাদিত রাখুন।

কিন্তু রাব্বে কারিমের শাশ্বত নীতির দাবি হলো, পৃথিবী থেকে এ জাতীয় মহান ব্যক্তিগণ বিদায় নিলেও তাদের কীর্তি ও কর্মের প্রভাব বিলুপ্ত হয় না। এই দুই মহান ব্যক্তি তাদের শাসিত ভূখণ্ডে রেখে গিয়েছিলেন দ্বীনের প্রতি অনুরাগ ও শরিয়তের প্রতি ভালোবাসার এক বহমান ধারা। তাদের শাসনকালে যেসব সমুন্নত চেতনা জনমানসে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল, তন্মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য দুটি বিষয় হলো ইলম ও জ্ঞানের অনুরাগ এবং জিহাদ ও সংগ্রামের চেতনা। আর বাস্তবতা হলো, যেকোনো জাতির মর্যাদা ও উন্নতি জ্ঞানানুরাগ ও সংগ্রামী চেতনা ধারণের মাঝেই নিহিত এবং যেকোনো জাতির লাঞ্ছনা ও অধঃপতন এই দুই গুণ পরিত্যাগের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট। জ্ঞান ও সংগ্রামের চেতনা অতি দ্রুত বিলীন হয়ে যায় না; চেতনার আহ্বায়ক বিদায় নেওয়ার পরও থেকে যায় কালের পরিক্রমায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

এই ছিল ইতিহাসে 'বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্য' নামে খ্যাত পারস্য, ইরাক ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহের পরিস্থিতি। মালিকশাহর মৃত্যুর পর বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের হাল ধরেন তার পুত্র বারকিয়ারুক। (৬৪৩) সুলতান বারকিয়ারুক উদার, সহনশীল, জ্ঞানী ও ধৈর্যশীল ছিলেন। অবশ্য যোগ্যতা ও কর্মগুণে তিনি তার মহান পিতা ও পিতামহের স্তরের ছিলেন না। তার শাসনামলে সেলজুক সাম্রাজ্যে নানাবিধ অস্থিরতা ও বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তার আমলেই ক্রুসেডার বাহিনী ইসলামি ভূখণ্ডে আগ্রাসন শুরু করে। এ সময় নিজ রাজ্যের অভ্যন্তরে অব্যাহত বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও সুলতান বারকিয়ারুক ক্রুসেডারদের আগ্রাসন থেকে এন্টিয়ক ভূমিকে রক্ষার জন্য মসুলের আমির কারবুগাকে প্রেরণ করতে সামান্য দ্বিধা করেননি। এর বিস্তারিত বিবরণ আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি।

সামগ্রিকভাবে এটি ছিল সুবিস্তৃত বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের সাধারণ পরিস্থিতি। সাম্রাজ্যের অন্যান্য অংশের পরিবর্তে বিশেষ করে উত্তর ইরাক থেকে অধিকাংশ জিহাদি তৎপরতা ও সংস্কার আন্দোলনের উৎপত্তির কারণ হলো, বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের এই অংশটিই ছিল শাম ও এশিয়া মাইনর অঞ্চলের সবচেয়ে নিকটবর্তী অংশ। যেমন এডেসার অবস্থান ছিল মসুলের দক্ষিণ-পশ্চিমে। আর তাই ক্রুসেড আগ্রাসনে আক্রান্ত অঞ্চলসমূহে সংগ্রামী যোদ্ধা ও জ্ঞানী আলিমদের প্রেরণের দায়িত্ব ইরাকের উত্তরাঞ্চল নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিল। অপরদিকে পারস্যসহ বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের অন্যান্য অংশের কর্মপ্রচেষ্টা নিবদ্ধ ছিল ইসলামি বিশ্বের পূর্ব অংশে তুর্কিস্তান ও ভারতবর্ষের বিভিন্ন পৌত্তলিক গোষ্ঠীর বিদ্রোহ বিশৃঙ্খলা দমনে।

এ বিষয়টিও লক্ষণীয় যে, উত্তর ইরাকের সাধারণ জনগণও প্রশংসনীয় কিছু গুণ ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিল। তারা আলিমসমাজের মূল্যায়ন করত, শরিয়তের আলোকে শাসকের মান বিচার করত। এ কারণেই কোনো শাসক দ্বীন ও শরিয়তের সহায়তা করলে তারা তার পাশে দাঁড়াত আর যে শাসক অন্যায়-অবিচার করত, লঙ্ঘন করত শরিয়তের সুনির্ধারিত সীমা, তারা তার প্রতিরোধ করত।

টিকাঃ
৬০৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৩২২-৩২৩ ও ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১২/৬৬।
৬০৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৩৬২।
৬০৬. প্রাগুক্ত, ৮/৩৯৪।
৬৩৭. প্রাগুক্ত, ৮/৩৮৮-৩৮৯।
৬৩৮. ইমাম বুখারি, সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬২৩৭, ইমাম নাসায়ি, আস-সুনানুল কুবরা লিন-নাসায়ি, হাদিস নং ৪২০১, ইমাম আহমাদ, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৭২৩৮ ও তাবারানি, আল-মুজামুল আওসাত, হাদিস নং ৪৬১২।
৬৩৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৩৬৯।
৬৪০. প্রাগুক্ত, ৮/৪৮০-৪৮১।
৬৪১. প্রাগুক্ত, ৮/৪৭৮।
৬৪২. প্রাগুক্ত, ৮/৪৮১-৪৮২। নিজামুল মুলক উনত্রিশ বছর উজিরের দায়িত্ব পালন করার পর ৪৮৫ হিজরি সনের ১০ রমজান (১০৯২ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ অক্টোবর) নিহত হন। এর পয়ত্রিশ দিন পর একই বছরের ১৫ শাওয়াল (১০৯২ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ নভেম্বর) ইন্তেকাল করেন সুলতান মালিকশাহ। [অনুবাদক]
৬৪৩. প্রাগুক্ত, ৮/৪৮৬।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 আদি বিন মুসাফির

📄 আদি বিন মুসাফির


উত্তর ইরাকের জনসমাজে আলিমদের মূল্যায়ন ও প্রভাব কেমন ছিল, তার নমুনা হিসেবে আমরা এখানে একজন মহান আলিমের কথা উল্লেখ করছি। আমাদের নির্বাচিত সেই মহান আলিম হলেন আদি বিন মুসাফির রহ.।

বর্তমান সময়ের অনেক মুসলমান হয়তো তার নামই শোনেনি; কিন্তু তিনি ছিলেন তৎকালীন অন্যতম যুগশ্রেষ্ঠ আলিম। আদি বিন মুসাফির ক্রুসেড অভিযানের সূচনাকাল পেয়েছিলেন। তিনি উত্তর ইরাকে হাকার পাহাড়ের নিকটে কুর্দি শাখাগোত্র হাকারিয়া জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় বাস করতেন। (৬৪৪) ইবনে তাইমিয়া রহ. তার সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, 'তিনি ছিলেন একজন পুণ্যবান পুরুষ। তার অনুসারীরাও ছিল সৎ ও পুণ্যবান।' (৬৪৫) আবদুল কাদির জিলানি রহ. তো তার সম্পর্কে বড় আশ্চর্য মূল্যায়ন করেছেন। তিনি বলেছেন, 'সাধনার মাধ্যমে যদি নবুওয়ত লাভ করা যেত, তাহলে আদি বিন মুসাফির-ই তা লাভ করতেন।' (৬৪৬)

শাইখ আদি বিন মুসাফির একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি সেখানে জনসাধারণকে দ্বীনি শিক্ষা প্রদান করতেন। ঐতিহাসিক ইবনে কাছির বলেছেন, 'তার যুহদ ও নির্মোহতা, ন্যায় ও সততা এবং হিদায়াতের পথে ইখলাছ ও নিষ্ঠার গুণ প্রত্যক্ষ করে আশেপাশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ তার কাছে ছুটে আসত।' আরেক প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে খাল্লিকান বলেছেন, 'আদি বিন মুসাফিরের সুখ্যাতি দিগন্তজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। তার অনুসারীর সংখ্যা ছিল প্রচুর।' (৬৪৭) ইমাম যাহাবি রহ. বলেছেন, 'তার দ্বীনি দাওয়াত উক্ত অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় কার্যকরী ভূমিকা রেখেছিল। কুর্দি জাতিগোষ্ঠীর অসৎ ও দুষ্ট শ্রেণির লোকেরা তার দাওয়াতে প্রভাবিত হয়ে তাওবা করে এবং সৎ পথে ফিরে আসে।' (৬৪৮)

এটি তৎকালীন উত্তর ইরাকীয় জনগণের আলিমদের মূল্যায়ন ও শরিয়তের মর্যাদা অনুধাবনের একটি নমুনামাত্র। সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রেও তাদের এই চেতনাবোধ প্রতিফলিত হতো। যে শাসক বা সেনাপতি দ্বীনের প্রতি শ্রদ্ধাপোষণ করতেন এবং কর্মক্ষেত্রে শরিয়তের দাবি বাস্তবায়ন করতেন, তিনি জনসমাজে বরণীয়-মাননীয়রূপে স্বীকৃতি লাভ করতেন। আর যে এর ব্যতিক্রম করত, সমাজে সে ঘৃণিত ও নিন্দিত হতো; সকলেই তাকে প্রথম সুযোগে অপসারণ বা সরিয়ে দেওয়ার অপেক্ষায় থাকত।

জনসাধারণ যদি হয় এমন অত্যুচ্চ স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, তাহলে তাদের কাছ থেকে তো সমূহ কল্যাণ প্রত্যাশা করাই যায়।

এ অঞ্চলে সেলজুকদের অত্যুজ্জ্বল কীর্তি ও অবদান কক্ষনোই উপেক্ষা করা যাবে না। তদ্রূপ এ বিষয়টিও প্রণিধানযোগ্য যে, সেলজুকদের পাশাপাশি আরও কিছু জনগোষ্ঠী ইরাক অঞ্চলে আত্মপ্রকাশ করেছিল এবং জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর চেতনা সংরক্ষণে সেলজুকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে উরতুক পরিবার ও কুর্দি জনগোষ্ঠীর কথা।

টিকাঃ
৬৪৪. প্রাগুক্ত, ৯/৪৫৯।
৬৪৫. ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, ১১/১০৩।
৬৪৬. আবুল মাহাসিন, আন-নুজুমুয যাহিরা, ৫/৩৪৪।
৬৪৭. ইবনে খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'য়ান, ৩/২৫৪।
৬৪৮. ইমাম যাহাবি, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২০/৩৪২।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 উরতুক-পরিবার ও কুর্দি জনগোষ্ঠী

📄 উরতুক-পরিবার ও কুর্দি জনগোষ্ঠী


উরতুক পরিবার দ্বারা উরতুক তুর্কমানির বংশধরগণ উদ্দেশ্য। সেলজুকদের মতো উরতুক তুর্কমানিও তুর্কি বংশোদ্ভূত ছিলেন। তিনি ছিলেন মহান সেলজুক সুলতান মালিকশাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রশাসনিক ও সামরিক কর্মকর্তা। সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করার পর সবশেষে তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসের গভর্নর পদে দায়িত্ব পালন করেন। (৬৪৯) উরতুক তুর্কমানি ৪৮৪ হিজরি সনে (১০৯১ খ্রিষ্টাব্দে) ইন্তেকাল করেন। (৬৫০) এরপর অল্প কিছুদিন তার দুই পুত্র সুকমান ও ইলগাজি বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। ইসলামি ভূখণ্ডে ক্রুসেডারদের আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর ৪৯১ হিজরি সনে (১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দে) উবায়দিরা বাইতুল মুকাদ্দাস দখল করে নিলে সুকমান ও ইলগাজি বাইতুল মুকাদ্দাস ত্যাগ করে উত্তরে চলে আসেন। ইলগাজি বাগদাদে পৌঁছে সেলজুক সুলতান বারকিয়ারুকের সেবায় নিয়োজিত হন আর সুকমান উত্তর ইরাকের দিয়ারে বকর অঞ্চলে পৌঁছে সেখানে সেলজুক সাম্রাজ্যের অধীনস্থ একটি ইসলামি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। (বর্তমান তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত) মারদিন ও হাসানকেইফ ছিল রাজ্যটির গুরুত্বপূর্ণ দুই নগরী।(৬৫১)

উরতুক-পুত্র সুকমান ও ইলগাজির কর্মধারায় ইসলামি চেতনাবোধ সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান ছিল। একই কথা প্রযোজ্য তাদের ভ্রাতুষ্পুত্র বাল্ক (Balk) বিন বাহরামের ক্ষেত্রেও। আগ্রাসী ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাদের প্রত্যেকেরই ছিল বিশেষ ভূমিকা ও অবদান। আগামীর ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহে আমরা এর বিভিন্ন নমুনা প্রত্যক্ষ করব, ইনশাআল্লাহ। অপরদিকে কুর্দিরা হলো ইসলামের অন্যতম মহান জাতি। প্রবল ধারণামতে, কুর্দি জাতি প্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয় (Indo-Europeans) জাতিগোষ্ঠী হতে উদ্ভূত। খ্রিষ্টপূর্ব দুই হাজার সনের পূর্বে তারা উত্তর ইরাক, দক্ষিণ তুরস্ক ও পূর্ব ইরানে এসে বসতি স্থাপন করে। (৬৫২)

কুর্দি জাতির ইসলামগ্রহণের ইতিহাসও সুপ্রাচীন। ২১ হিজরি সন শুরু হওয়ার পূর্বেই অধিকাংশ কুর্দি ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। যুগে যুগে পরিবেশ-পরিস্থিতিতে নানারকম পালাবদল ও বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত সৃষ্টি হলেও কুর্দিরা ইসলামগ্রহণের পর থেকে সর্বদাই ধর্মের দাবি ও দ্বীনের সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার রক্ষা করে চলেছে এবং ইসলামের সহায়তায় অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করেছে। নিজেদের ইতিহাসে সব সময়ই তারা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর মতাদর্শ আঁকড়ে ধরে ছিল। মাজহাবগত দিক থেকে অধিকাংশ কুর্দি ছিল শাফিয়ি মাজহাবের অনুসারী। এমনকি হিজরি চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীতে শিয়া বুওয়াইহি গোষ্ঠী যখন আব্বাসি খিলাফতের ওপর চেপে বসেছিল, তখনও কুর্দিরা নিজেদের মৌলিক সুন্নি মতাদর্শ ও মজবুত ধর্মীয় চেতনায় অটল-অবিচল ছিল। আর তাই তাদের অঞ্চল থেকে যদি আল্লাহর দ্বীনের সহায়তায় কোনো মহান কর্ম সম্পাদিত হয়, যদি তাদের মাঝ থেকেই বেরিয়ে আসে একজন নাজমুদ্দিন আইয়ুব, আসাদুদ্দিন শিরকুহ, সালাহুদ্দিন আইয়ুবি ও আল-মালিকুস সালিহ নাজমুদ্দিন, তাহলে তাতে মোটেও বিস্ময়ের কিছু নেই।

বলতে গেলে, এই ছিল তৎকালীন উত্তর ইরাকের সার্বিক পরিস্থিতি। এ আলোচনার মাধ্যমে আশা করি আমাদের সামনে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, কেন সে যুগের বিভিন্ন জিহাদি তৎপরতা ও সংস্কার আন্দোলনের সূচনা এ অঞ্চল থেকেই হয়েছিল।

এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। খেয়াল করলে দেখা যাবে যে, আমাদের পেছনের আলোচনায় যেসব ব্যক্তি ও গোত্রের নাম এসেছে, তারা সকলেই বংশমূলের বিচারে ছিলেন অনারব। বরং পুরো ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে যারা সংগ্রামী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে পরিবর্তন সূচিত করেছেন, তাদের মধ্যে আরব পরিচয়ধারী ব্যক্তির সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। এ কথা বলার উদ্দেশ্য আরবদের মর্যাদাহানি নয়; বরং এটিই ঐতিহাসিক বাস্তবতা। অধিকন্তু এটি ইসলামের অনন্য মর্যাদারও একটি স্বীকৃতি। ইসলাম এভাবেই ভিন্ন ভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী ও গোত্র-বর্ণের মানুষকে অভিন্ন বন্ধনে আবদ্ধ করতে পেরেছে। আর তাই সেলজুক, উরতুক ও কুর্দিদের ন্যায় অনারবি বংশপরিচয়ধারীরাও দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসে ইসলামের ঝান্ডা বহন করেছে এবং দ্বীনের মর্যাদা সমুন্নত করেছে। তাদের যেন মনেও ছিল না যে, উম্মাহর নবী ছিলেন আরব বংশীয় এবং সে যুগের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান অনারব হওয়া সত্ত্বেও খিলাফতের দায়িত্ব ছিল আরবদের কাছে। বরং আমাদের বর্তমান কালেও মুসলিম উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ অনারব। বর্তমানে মুসলমানদের মোট সংখ্যার মাত্র পঁচিশ শতাংশ আরব। মূলত ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাযি.-এর ইন্তেকালের পর হজরত উমর রাযি.-এর খিলাফতকাল শুরু হলে যখন পৃথিবীর পূর্বে-পশ্চিমে ইসলামের বাণী ছড়িয়ে পড়ে, তখন থেকে নিয়ে সব সময়ই উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ অনারবই ছিল। আর তাই এ তথ্যে মোটেও আশ্চর্যের কিছু নেই যে, ইসলামি ইতিহাসের অধিকাংশ সংগ্রামী নেতা ও মহান সংস্কারক ছিলেন অনারব। তারিক বিন যিয়াদ, আলপ আরসালান, ইউসুফ বিন তাশফিন, ইমাদুদ্দিন জিনকি, নুরুদ্দিন মাহমুদ, সালাহুদ্দিন আইয়ুবি, সাইফুদ্দিন কুতুজ, মুহাম্মদ আল-ফাতিহ—এভাবে দৃষ্টান্তস্বরূপ অনেক নামই উল্লেখ করা যেতে পারে, যাদের কেউই আরব নন।

একই কথা প্রযোজ্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন দিক ও ইসলামি শরিয়তসংশ্লিষ্ট শাস্ত্রীয় অঙ্গনসমূহের ক্ষেত্রেও। প্রতিটি ক্ষেত্র অনারব কীর্তিমানদের উজ্জ্বল কর্মগৌরবে আলোকিত। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হতে পারে প্রসিদ্ধ হাদিস সংকলকগণের বংশ-পরিচয়। হাদিসশাস্ত্রে যে ছয়জন ইমাম ‘উম্মাহাতুল হাদিস’ বা ‘সিহাহ সিত্তাহ’ নামে খ্যাত ছয়টি গ্রন্থের সংকলক হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, তাদের পাঁচজনই যদি অনারব হয়ে থাকেন, তাতে কি বিস্ময়ের কিছু আছে?! বুখারি রহ., মুসলিম রহ., তিরমিজি রহ., নাসায়ি রহ. ও ইবনে মাজা রহ.—এই পাঁচ অনারব ইমামের সঙ্গে একমাত্র আরব প্রতিনিধি হিসেবে আছেন আবু দাউদ রহ.!

নিঃসন্দেহে এটি ইসলামের মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম সুস্পষ্ট দলিল। ইসলাম যে পৃথিবীজুড়ে বসবাসকারী রক্তে-বর্ণে শতধা বিভক্ত মানবশ্রেণির বিচার-বুদ্ধি, আবেগ-বিবেক ও সম্মিলন-প্রকৃতিকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে, এটি তার অনন্য প্রমাণ। হায়! সেই ইসলামের সন্তানরা যদি কোনো দিন কোনো কালে দ্বীনি চেতনার ওপর জাতীয়তাবাদী চেতনাকে প্রাধান্য দেয় এবং আকিদা ও ধর্মের উপাদানের পরিবর্তে বংশ ও রক্তপরিচয়ের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে তা কতই-না পরিতাপের বিষয়!

টিকাঃ
৬৪৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪৪৩।
৬৫০. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১২/১৭০।
৬৫১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৯।
৬৫২. দেখুন: আহমাদ তাজুদ্দিন, আল-আকরাদ: তারীখু শা'বিন ওয়া কাযিয়্যাতু ওয়াতানিন, পৃষ্ঠা: ১৫।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 অত্যাচারীদের পরিণতি

📄 অত্যাচারীদের পরিণতি


মিশরের ন্যায় শাম অঞ্চলও ৩৫৯ হিজরি সন (৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দ) থেকেই উবায়দিদের নোংরা দখলদারিত্বের শিকার ছিল। পূর্ণ এক শতাব্দীরও অধিক সময় পর ৪৭৭ হিজরি সনে (১০৮৪ খ্রিষ্টাব্দে) সেলজুকরা শাম অঞ্চল থেকে উবায়দিদের বিতাড়িত করে। মিশরে অবশ্য শিয়া উবায়দিরা এরপরও ক্ষমতা ধরে রেখেছিল আরও এক শতাব্দী। ৫৬৭ হিজরি সনে (১১৭১ খ্রিষ্টাব্দে) মিশরে উবায়দি শাসনব্যবস্থার پতন ঘটে। এই দীর্ঘ সময়ে উবায়দিরা অধিকৃত অঞ্চলগুলোকে সুন্নি আলিমশূন্য করার ঘৃণ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে এবং বিশুদ্ধ ইসলামি শিক্ষার পথ রুদ্ধ করে সমাজে বিদআত-কুসংস্কার ছড়িয়ে দেয়। উবায়দি প্রশাসনের কর্মপন্থায় জিহাদ ও সংগ্রামের কোনো স্থান তো ছিলই না; তারা মুজাহিদদের ওপর দমন-নিপীড়ন চালিয়ে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করতে সচেষ্ট ছিল। উবায়দিরা মুসলিম উম্মাহর শত্রুদের সঙ্গে মিত্রতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়তেও দ্বিধা করত না। ক্রুসেডারদের সঙ্গে তাদের গৃহীত নীতি ও সমঝোতার প্রচেষ্টা সম্পর্কে পেছনে আমরা কিছুটা ধারণাও পেয়েছি।

এই অবসাদগ্রস্ত এবং দ্বীনি শিক্ষা ও চেতনাশূন্য পরিবেশে বসবাসকারী জনগণের মাঝ থেকে এমন নতজানু ও নমনীয় জনশ্রেণি বের হওয়াই ছিল অবশ্যম্ভাবী, যাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নেই! শাম ও মিশরে এমন কোনো আলিমকে বেঁচে থাকতে দেওয়া হয়নি, যিনি জনসাধারণকে সঠিক পথের দিশা দেবেন; এমন কোনো মুজাহিদের অস্তিত্ব রাখা হয়নি, যিনি সকলের আদর্শ বিবেচিত হবেন। এই শূন্যতা এক বছর বা দু-বছরের নয়; শাম পূর্ণ এক শতাব্দী আর মিশর দীর্ঘ দুই শতাব্দী ধরে এই দুর্যোগ ও শূন্যতার শিকার ছিল। আর তাই এ অঞ্চলের জনগণ মুসলমানদের কোনো ইস্যুতে স্পন্দিত হবে এবং করণীয় দায়-দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেবে, এমনটি মোটেও প্রত্যাশিত ছিল না। এমনকি নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ লঙ্ঘিত হলেও তাদের নীরব-নির্বিকার থাকারই কথা ছিল! ক্রুসেড আগ্রাসনে তো অন্যদের নয়; তাদের নিজেদের সম্পদই লুণ্ঠিত হচ্ছিল, নিজেদের বাড়িঘরই ধ্বংস হচ্ছিল, আপন ভাই, সন্তান ও পরিবারের রক্তেই জমিন রঞ্জিত হচ্ছিল!

আরও পরিতাপের বিষয়—শেষ পর্যন্ত যিনি শাম অঞ্চলকে উবায়দিদের হাত থেকে মুক্ত করেছিলেন, ধর্মপরিচয়ে সুন্নি হলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে তিনি ছিলেন উবায়দিদের মতোই সাক্ষাৎ জালিম!

উবায়দিরা বিতাড়িত হওয়ার পর শামে সেলজুক রাষ্ট্রের শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন তুতুশ বিন আলপ আরসালান। স্বভাব-চরিত্রের দিক থেকে তিনি ছিলেন তার মহান পিতা আলপ আরসালান ও ভাই মালিকশাহর সম্পূর্ণ বিপরীত। পিতা-পুত্রের এই ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক বৈপরীত্য উপলব্ধির জন্য আমাদের সামনে সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত হতে পারে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত নুহ আ. ও নুহ-পুত্রের আলোচনা।

তুতুশ ছিলেন অত্যাচারী-স্বেচ্ছাচারী একজন শাসক। ক্ষমতা নিষ্কণ্টক রাখাই ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য। তিনি ব্যক্তিস্বার্থ ছাড়া অন্য কিছু বুঝতেন না, নিজের মতের বিপরীত কারও পরামর্শ সহ্য করতে পারতেন না। তার কাছে জনসাধারণের জান-মালের কোনো মূল্যই ছিল না, ছিল না আকিদা ও ধর্মবিশ্বাস বা বংশ ও রক্তের সম্পর্কের কোনো আবেদন। এভাবে তিনি সকলের সঙ্গেই সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন এবং একেকবার একেকজনের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন। এমনকি ভাই মালিকশাহর মৃত্যুর পর তিনি ভ্রাতুষ্পুত্র বারকিয়ারুকের সঙ্গে সংঘাত ও যুদ্ধে জড়াতেও সামান্য দ্বিধা করেননি। এ সবকিছুর কারণ আর কিছুই নয়—সাম্রাজ্যবাদী চেতনা ও সম্পদ বৃদ্ধির লালসা।

অনাচার-অবিচারে নিমজ্জিত এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা জনগণ যে হীনম্মন্য, নতজানু ও দলিত মানসিকতা লালন করবে, চাবুকের ইশারায় পরিচালিত হবে, অম্লান বদনে ইজ্জত-সম্মানের ওপর আঘাত মেনে নেবে এবং অধিকার লুণ্ঠিত হলেও তুষ্ট চিত্তে বসে থাকবে, এমনটাই তো স্বাভাবিক। আর তাই তৎকালীন শাম অঞ্চলের জনসাধারণের কাছে ক্রুসেডাররা তুতুশ বা উবায়দিদের চেয়ে খুব বেশি ভিন্ন কিছু ছিল না! বরং তাদের অনেকে তো এক মুঠো খাবার বা যৎসামান্য অর্থ ও ভূমির লোভে ক্রুসেডারদের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময়ও করেছিল।

৪৮৭ হিজরি সনে (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) তুতুশ নিহত হওয়ার পরও শামের পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন সাধিত হয়নি। তুতুশের শাম-রাজ্য এরপর বিভক্ত হয়ে পড়ে তার দুই পুত্র রিজওয়ান ও দাক্কাকের মাঝে। রিজওয়ানের ভাগে আলেপ্পো আর দাক্কাকের ভাগে দামেশক। স্বভাব-চরিত্রের দিক থেকে দুই ভাই ছিলেন পিতার যোগ্য উত্তরসূরি। আর তাই তাদের শাসন ছিল কেবল শাসিত অঞ্চলের জনগণের জন্য নয়; পুরো মুসলিম উম্মাহর জন্যই এক চরম দুর্যোগ।

অত্যাচারী স্বভাবের পাশাপাশি রিজওয়ানের চরিত্রে উবায়দি অনাচারও যুক্ত হয়েছিল। রিজওয়ান শিয়া মতাদর্শ গ্রহণ করে কুখ্যাত ইসমাইলি-বাতিনি গোষ্ঠীকে আপন করে নিয়েছিলেন এবং জনমনে ত্রাস সৃষ্টি ও ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার লক্ষ্যে তাদেরকে যথেচ্ছা অন্যায়-অপরাধ সংঘটনে প্ররোচিত করেছিলেন। এখনো পর্যন্ত যে ইতিহাস আমরা বর্ণনা করে এসেছি, তাতে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি যে, শিয়া বাতিনি ফিরকার প্রত্যক্ষ চেষ্টায় বড় বড় দুটি অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল। প্রথমে তারা ৪৮৫ হিজরি সনে মহান উজির নিজামুল মুলক তুসিকে হত্যা করে; এরপর ৪৯৫ হিজরি সনে সরাসরি রিজওয়ানের প্ররোচনায় হত্যা করে রিজওয়ানের সৎ পিতা হুসাইন বিন মালাইবকে।

পরিচ্ছেদের শুরু থেকে যে বিশ্লেষণ আমরা পেশ করলাম, তাতে আমাদের সামনে এই আশাবাদই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, আগামী দিন ও বছরগুলোতে উত্তর ইরাক থেকেই কোনো সংস্কারমূলক জিহাদি তৎপরতা সূচিত হবে; বিপরীতে নিপীড়ন ও লাঞ্ছনার মাঝে বেড়ে ওঠা দ্বীন ও শরিয়তবিমুখ শামের জনগণের প্রতিক্রিয়া প্রাথমিক পর্যায়ে বেশ দুর্বল হবে। হ্যাঁ, অন্যের হাত ধরে পরিবর্তন সূচিত হওয়ার পর ধীরে ধীরে যখন জনসাধারণের মনোভাবেও পরিবর্তন শুরু হবে, আশা করা যায় যে, তখন শাম অঞ্চলেও এমন এক প্রজন্ম তৈরি হবে, যাদের হাত ধরে যন্ত্রণাদায়ক বাস্তবতার অবসান ঘটবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00