📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 বোহেমন্ডের মুক্তি

📄 বোহেমন্ডের মুক্তি


এই যখন পরিস্থিতি, তখন আরও একটি পক্ষ দরকষাকষির আলোচনায় প্রবেশ করে। এডেসার শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গ ও বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোসের পর এবার মঞ্চে আবির্ভূত হন স্বয়ং বন্দি বোহেমন্ড!

মুসলিম সমাজে তখন যে অবক্ষয় বিরাজ করছিল, তাতে নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, মুসলমানদের মধ্য হতেই কেউ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে কিছু অর্থ, জায়গির ভূমি বা অন্য কোনো সম্পদের প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে বন্দি বোহেমন্ডের কাছে এ সংবাদ পৌঁছিয়ে দিয়েছিল। আর তাই এডেসা অধিপতি বল্ডউইন ডি বুর্গের প্রচেষ্টা, বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রস্তাব ও সুলতান কিলিজ আরসালানের ভাগ-বাটোয়ারার দাবির পর এবার স্বয়ং বোহেমন্ড গাজিকে নতুন এক প্রস্তাব প্রদান করেন! (৬২৪)

বোহেমন্ড গাজিকে বুঝিয়ে বলেন যে, 'দেখুন, বাইজান্টাইন সম্রাট আমাদের উভয়ের যৌথ শত্রু। তিনি এশিয়া মাইনর অঞ্চলের নগরীগুলোর নিয়ন্ত্রণ লাভের আশায় সকলের সঙ্গে বিরোধ করছেন। আবার কিলিজ আরসালানও আমাদের উভয়ের শত্রু। (কারণ, এশিয়া মাইনর অঞ্চলে কিলিজ আরসালানের স্বার্থ ও লালসা সন্দেহাতীতভাবেই বোহেমন্ড ও গাজি উভয়ের লালসার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল।) আর তাই আমাকে বাইজান্টাইন সম্রাটের হাতে তুলে দেওয়া হলে কিংবা কিলিজ আরসালানকে তার দাবিকৃত অর্ধেক অর্থ প্রদান করা হলে আমার তো ক্ষতি হবেই, তার পূর্বে আপনার বিরাট স্বার্থহানি হবে।'

এসব দিক তুলে ধরে বোহেমন্ড গাজিকে প্রস্তাব দেন যে, তিনি এন্টিয়ক রাজ্য ও তার বন্ধুদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে গাজিকে এক লক্ষ দিনার প্রদান করবেন এবং এ অর্থ তার মুক্তিপণ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ছাড়াও উভয় পক্ষের মাঝে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বিনিময়ের চুক্তি সম্পাদিত হবে এবং এর মাধ্যমে ক্রুসেড রাজ্য এন্টিয়ক বনু দানিশমান্দের মুসলিম রাজ্যের বন্ধুরাষ্ট্রে পরিণত হবে! (৬২৫)

নিঃসন্দেহে এ প্রস্তাব ছিল চরম উচ্চাকাঙ্ক্ষী শাসক গাজি বিন দানিশমান্দের জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রলুব্ধকর! কারণ—

১. এ প্রস্তাব মেনে নিলে তিনি বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের মালিক হবেন। যদিও বোহেমন্ডের প্রস্তাবিত অঙ্ক বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রস্তাবিত অঙ্কের চেয়ে অনেক কম; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাও বিরাট একটি অঙ্ক। বোহেমন্ডের প্রস্তাবটিও যে যথেষ্ট বড় ছিল তা আমরা এভাবেও উপলব্ধি করতে পারি যে, এন্টিয়ক রাজ্য একা এই অর্থের ব্যবস্থা করতে পারেনি; বরং তারা এডেসা রাজ্য ও সিসিলিতে বসবাসকারী বোহেমন্ডের পরিবারের সহায়তাও গ্রহণ করেছিল। এ তথ্যটিও এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য হতে পারে যে, এর কিছুদিন পর যখন এডেসার শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গ বন্দি হন, তখন তার মুক্তিপণ নির্ধারণ করা হয় মাত্র পনেরো হাজার দিনার!

২. বোহেমন্ডের প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে তা এশিয়া মাইনর অঞ্চলে গাজির অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোসের শক্তিবৃদ্ধিতে কোনো প্রকার অবদান রাখবে না।

৩. এটা হবে গাজির পরম শত্রু কিলিজ আরসালানের গন্ডদেশে সরাসরি চপেটাঘাত।

৪. এর মাধ্যমে গাজি বিন দানিশমান্দ বন্দি শাসক বোহেমন্ডের হৃদ্যতা লাভ করবেন এবং ক্রুসেডার রাজ্য এন্টিয়কের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবেন।

গাজি বিন দানিশমান্দের পক্ষে এসব দিক বিবেচনা করে এই প্রলুব্ধকর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব ছিল না। তাই তিনি বোহেমন্ডের প্রস্তাবে সম্মতি জানান এবং মালাতিয়ায় চুক্তি সম্পাদনের সিদ্ধান্ত নেন। মালাতিয়া তখন গাজির কর্তৃত্বাধীন ছিল। (৬২৬)

এ সংবাদ এন্টিয়কে পৌঁছতেই বোহেমন্ডের অনুসারীরা এডেসার শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গের সঙ্গে মিলে দ্রুত অর্থ সংগ্রহ করতে শুরু করে। আরও কিছু বিত্তশালী ক্রুসেডার এতে শরিক হয়। সিসিলিতে বসবাসকারী বোহেমন্ডের পরিবারের পক্ষ থেকেও কিছু অর্থ প্রেরণ করা হয়। ১১০৩ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসের শুরুতে (৪৯৬ হিজরি সনে) উভয় পক্ষের মধ্যে চুক্তি সম্পাদিত হয় এবং বোহেমন্ড মুক্তি লাভ করেন। বোহেমন্ডের সঙ্গে হৃদ্যতা ও মিত্রতা রক্ষা এবং ভবিষ্যতে নিষ্ঠাপূর্ণ যৌথ সহযোগিতার অঙ্গীকার বিনিময়ের পর গাজি চুক্তি অনুযায়ী অর্থ লাভ করেন।(৬২৭)

এ সংবাদ জানতে পেরে কিলিজ আরসালান ক্রোধে উন্মাদ হয়ে যান!

এত বিরাট অঙ্ক হাতছাড়া হয়ে গেল!

বোহেমন্ডকে যদি সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোসের হাতে তুলে দেওয়া হতো, তাহলে কিন্তু কিলিজ আরসালান মোটেও বিক্ষুব্ধ হতেন না। অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস বুঝি মুসলমানদের বন্ধু; তার হাতে শক্তি-বৃদ্ধির উপকরণ তুলে দিতে কোনো আপত্তি নেই! কিন্তু এখন বোহেমন্ড মুক্তি পাওয়ায় কিলিজ আরসালান বড় ক্রুদ্ধ। কারণ, তিনি যে বিনিময়-মূল্যের কোনো অংশই লাভ করেননি!

ক্রুদ্ধ-বিক্ষুব্ধ কিলিজ আরসালান এবার গাজি কুমুশতেগিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। এশিয়া মাইনর অঞ্চলের মুসলমানদের মাঝে আবারও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের আগুন জ্বলে ওঠে। বরং কিলিজ আরসালান তৎকালীন আব্বাসি খলিফা মুসতাযহির বিল্লাহ ও সেলজুক সুলতান বারকিয়ারুকের কাছে বার্তা পাঠিয়ে গাজির বিরুদ্ধে তাদের সহায়তা কামনা করেন। অথচ রাজনৈতিকভাবে কিলিজ আরসালান তাদের দুজনের ক্ষমতার অস্তিত্বই স্বীকার করতেন না। কিন্তু এখন রাজনীতির খেলায় তিনি সম্ভাব্য সবগুলো তাসই ব্যবহার করতে চাচ্ছেন! (৬২৮)

কিলিজ আরসালান ও গাজি কুমুশতেগিনের মধ্যকার সংঘাত পরিস্থিতি যদিও এ অঞ্চলের মুসলমানদের জন্য দুর্যোগের কারণ ছিল, তবে বোহেমন্ডের মুক্তিলাভের ঘটনা ছিল তার চেয়েও অধিক দুর্যোগপূর্ণ বিষয়। বোহেমন্ড এন্টিয়কে ফিরতেই এন্টিয়কবাসী তাকে উষ্ণ সংবর্ধনা জানায়। (৬২৯) ইবনুল আছির বলেন, 'তার আগমনে এন্টিয়কবাসীর মনোবল শক্তিশালী হয়ে ওঠে।' (৬৩০) এর পরপরই তিন বছরের অধিক সময় মুসলমানদের হাতে বন্দি থাকা বোহেমন্ড নবোদ্যমে প্রতিশোধ নিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

প্রথমেই তিনি আলেপ্পোর অধীনস্থ বিভিন্ন জনপদে হামলা চালান। বোহেমন্ড প্রথমে কিননাসরিন নগরীতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সেখানকার অধিবাসীদের ওপর জিজিয়া আরোপ করেন। (৬৩১) এরপর তিনি আলেপ্পোর উত্তরে কুয়েক নদীর (The Queiq) তীরে বসবাসকারী মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করে তাদেরকে ছিন্ন-ভিন্ন করে দেন। যারা প্রাণে বেঁচে যায়, তাদের ওপর তিনি বিশাল অঙ্কের জিজিয়া আরোপ করেন। এমনকি তিনি আলেপ্পো নগরীর ওপরও অর্থ ও অশ্বের জিজিয়া আরোপ করেন এবং সেখানে বিদ্যমান সকল বন্দি ক্রুসেডারকে মুক্তি দিতে বাধ্য করেন। (৬৩২)

নিঃসন্দেহে এটি ছিল মুসলমানদের ওপর আপতিত চরম দুর্যোগ। এটি ছিল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক দুর্যোগ; বরং এ সবকিছুর পূর্বে ধর্মীয় ও চারিত্রিক দুর্যোগ এবং ঘৃণ্য ও গর্হিত বিচ্ছিন্নতার সংকট; পরবর্তী কয়েক বছর যার দুর্ভোগ উম্মাহকে পোহাতে হয়।

আর এ সবকিছুর বিনিময় মূল্য?!

এক লক্ষ দিনার ও ক্রুসেড রাজ্য এন্টিয়কের সঙ্গে মিত্রতা!

এ জাতীয় ঘটনা নিয়ে আমরা যদি গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করি এবং এ জাতীয় পরিস্থিতি ও ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা ও বিশ্লেষণ করি, তাহলে হয়তো আমরা সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারব যে, মুসলমানদের সংখ্যাধিক্য, সম্পদ-প্রাচুর্য ও সুরক্ষিত নিরাপত্তাব্যবস্থা সত্ত্বেও কীভাবে ক্রুসেডাররা বিভিন্ন ইসলামি নগরী দখল করে নিয়েছিল।

“নিঃসন্দেহে আমরা কখনোই শত্রুদের শক্তির কারণে পরাজিত হই না; আমরা পরাজিত হই নিজেদের দুর্বলতার কারণে এবং আল্লাহর দ্বীন থেকে নিজেদের দূরবর্তিতার কারণে।”

সুন্নাতুল্লাহ তো শাশ্বত ও চিরন্তন! আল্লাহর রীতিতে কোনো বৈষম্য ও অসংগতি নেই!

টিকাঃ
৬২৪. Setton: op. cit. vol. 1, p. 388.
৬২৫. Albert d' Aix, p. 610-612.
৬২৬. Runciman: op. cit., 11, p.39.
৬২৭. Runciman: op. cit., 11, p. 39.
৬২৮. Albert d' Aix, p. 613-614.
৬২৯. Runciman: op. cit., 11, p. 39.
৬৩০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৫৬।
৬৩১. প্রাগুক্ত, ৯/৫৬।
৬৩২. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৪৭ ও Runciman: op. cit., 11, p. 39.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00