📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 মুসলিম রাজন্যবর্গের পতন!

📄 মুসলিম রাজন্যবর্গের পতন!


যে সময় ক্রুসেড রাজ্যগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি স্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক একই সময় মুসলিম রাজ্যগুলোর পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে অবনতির পথে ধাবিত হচ্ছিল। এতদিন তো মুসলিম রাজ্যগুলো পরস্পর বিরোধ ও সংঘাতে জড়িয়ে ছিল; এবার প্রতিটি রাজ্যের অভ্যন্তরেই শুরু হয় গৃহসংঘাত। এর অন্যতম দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যায় মসুলের কথা। ৪৯৫ হিজরি সনে (১১০২ খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকে) মসুলের প্রশাসক কারবুগা মৃত্যুবরণ করলে মসুলের শাসনক্ষমতা নিয়ে সুনকুরজা ও মুসা তুর্কমানি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। সংঘাতে সুনকুরজা নিহত হন এবং মুসা তুর্কমানি শাসক পদে অধিষ্ঠিত হন। অল্প কদিন পরই তিনি জাকারমিশের (Djekermish) হাতে নিহত হন এবং ক্ষমতার লাগাম চলে যায় জাকারমিশের হাতে। এভাবেই চলতে থাকে নেতৃত্বের পতন ও নতুন নেতৃত্বের আগমন!(৬১৮)

জনজীবনে দ্বীনি শিক্ষা ও ধর্মীয় চেতনার অনুপস্থিতি, ক্ষমতার মোহ ও সম্পদের লালসা, ঐক্য ও অবিচ্ছিন্নতার বিলুপ্তি ইত্যাদি কারণে মুসলিম সমাজে যে শোচনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, তা কাজে লাগিয়ে ক্রুসেডাররা যে মুসলিম উম্মাহর কেন্দ্রমূলেই শেকড় গেড়ে বসবে, তা কেবল অনুমেয় নয়; অবশ্যম্ভাবী ছিল! আর তাই এ তথ্যে মোটেও বিস্ময়ের কিছু নেই যে, মসুলে যখন ক্ষমতা নিয়ে মুসলিম নেতৃবৃন্দের মাঝে চলছে চরম সংঘাত, তার মাঝেই ১১০২ খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকে প্রায় দেড় বছরের অবরোধের পর এন্টিয়ক অধিপতি টেনক্রেডের হাতে লাতাকিয়া নগরীর পতন ঘটে। ক্রুসেডারদের হাতে শাম অঞ্চলের অতি গুরুত্বপূর্ণ এই নৌবন্দরটির নিয়ন্ত্রণ চলে গেলেও আলেপ্পো, হামা, হিমস বা পার্শ্ববর্তী অন্য কোনো ইসলামি নগরী এ সময় লাতাকিয়ায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে অগ্রসর হয়নি। লাতাকিয়া বিজয়ের ফলে ক্রুসেড রাজ্য এন্টিয়ক সমুদ্র অভিমুখী বিস্তৃত করিডোরের অধিকারী হয়। এর ফলে পরবর্তী দশকের পর দশক ধরে ইউরোপ থেকে সমুদ্রপথে আগত রসদপত্র এন্টিয়কে সহজে পৌঁছা নিশ্চিত হয়, যা রাজ্যটির অস্তিত্ব ও স্থিতিশীলতা রক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রাখে। (৬১৯)

১১০৩ খ্রিষ্টাব্দের (৪৯৬ হিজরি) ঘটনাপ্রবাহ দ্বারাও তৎকালীন মুসলিম নেতৃবৃন্দের চারিত্রিক অধঃপতনের পরিমাণ আন্দাজ করা যেতে পারে। মসুলের মতো কেবল ক্ষমতার গদি নিয়ে সংঘাত নয়; কোনো কোনো মুসলিম নেতার অবস্থা এ সময় এতটা নিন্দনীয় পর্যায়ে উপনীত হয় যে, তারা এক মুঠো দিনারের বিনিময়ে উম্মাহর স্বার্থকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে কিংবা ক্রুসেডারদের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময়ের চুক্তি করতে সামান্য দ্বিধা করছিলেন না! এরই একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি।

পূর্বের ঘটনাপ্রবাহে আমরা জেনেছি যে, দানিশমান্দ রাজ্যের শাসক গাজি কুমুশতেগিন ক্রুসেডার সেনাপতি ও এন্টিয়কের সাবেক শাসক বোহেমন্ডকে পাকড়াও করার পর এশিয়া মাইনরের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত কৃষ্ণসাগরের উপকূলবর্তী সুরক্ষিত নিকসার দুর্গে বন্দি করে রেখেছিলেন। এ ঘটনার প্রায় তিন বছর পর ১১০৩ খ্রিষ্টাব্দের শুরুতে এডেসার শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গ এন্টিয়কের গির্জাধ্যক্ষ বার্নাডের সঙ্গে সমঝোতা করে দুজনে মিলে বোহেমন্ডকে মুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বল্ডউইন ডি বুর্গ তখন এন্টিয়কের অন্তর্বর্তীকালীন শাসক টেনক্রেডের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে ভীত হয়ে পড়েছিলেন। (৬২০)

বিশেষ করে ১১০১ খ্রিষ্টাব্দের ব্যর্থ ক্রুসেড অভিযানের স্মৃতিচারণ করে বল্ডউইন উপলব্ধি করেন যে, সামরিক অভিযানের মাধ্যমে বোহেমন্ডকে মুক্ত করা মোটেও সম্ভব নয়। তাই তিনি রাজনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধানে অগ্রসর হন। গাজি কুমুশতেগিন বোহেমন্ডকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে কী দাবি করেন, তা জানার জন্য বল্ডউইন ডি বুর্গ গাজিকে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের আহ্বান জানান। উভয়ের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা ও দরকষাকষি হয়। কিন্তু উভয় পক্ষ সুনির্দিষ্ট কোনো সমাধানে একমত হতে ব্যর্থ হয়। (৬২১)

এ সময় বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস দু-পক্ষের বৈঠক সম্পর্কে অবগত হন। সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস বোহেমন্ডকে প্রচণ্ড অপছন্দ করতেন। তিনি মনে করতেন যে, বোহেমন্ড তাকে নিয়ে খেলেছেন, হৃদ্যতা, মিত্রতা, আনুগত্য ইত্যাদির বুলি আওড়িয়ে তাকে প্রবঞ্চিত করেছেন এবং শেষে এ সবকিছু অস্বীকার করে এন্টিয়ক দখল করে নিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, বোহেমন্ডের বাহিনীর অন্যতম সেনাপতি ও তার ভাগ্নে টেনক্রেড বাইজান্টাইন সম্রাটকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে এন্টিয়কের উত্তরে কিলিকিয়া অঞ্চলের তারসুস, আদানা ও মপসুয়েসটিয়া নগরী দখল করে নিয়েছেন। সবশেষে টেনক্রেড সেই লাতাকিয়া নৌবন্দরও দখল করে নিয়েছেন, যার কর্তৃত্ব নিয়ে ক্রুসেডারদের সঙ্গে বাইজান্টাইনদের বিরোধ চলছিল। লাতাকিয়ার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলায় এ অঞ্চলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের গৌরব ও মর্যাদা প্রচণ্ড আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। তা ছাড়া বোহেমন্ডের সঙ্গে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের শত্রুতার ইতিহাস তো আরও পুরোনো। ক্রুসেড অভিযান শুরু হওয়ারও কয়েক বছর পূর্ব থেকেই উভয় পক্ষের বিরোধ চলে আসছিল। আর তাই বাইজান্টাইন সম্রাট যখন বোহেমন্ডের মুক্তিসংক্রান্ত আলোচনার কথা জানতে পারেন, তখন তিনিও এই রাজনৈতিক খেলায় প্রবেশ করে বোহেমন্ডের বিষয়ে গাজির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও দরকষাকষির সিদ্ধান্ত নেন। সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস নরম্যান সেনাপতি বোহেমন্ডকে তুলে দেওয়ার বিনিময়ে গাজিকে দুই লক্ষ ষাট হাজার দিনার প্রদানের বিরাট প্রস্তাব প্রদান করেন! (৬২২)

বোহেমন্ডের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণই নয়; বাইজান্টাইন সম্রাট এর মাধ্যমে এমন একটি পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছিলেন, যা বোহেমন্ডকে বন্দি করার পর বিগত তিন বছরে মুসলমানরা চিন্তাও করেনি। তিনি চাচ্ছিলেন বোহেমন্ডকে কেনার পর তাকে নিয়ে এন্টিয়কের নরম্যানদের সঙ্গে দরকষাকষি করতে। তার আশা ছিল, বোহেমন্ডকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে তিনি তাদের কাছ থেকে এক বা একাধিক নগরীর মালিকানা বাগিয়ে নিতে পারবেন। নরম্যানদের কাছে বোহেমন্ডের মূল্য কতটা বেশি, বাইজান্টাইন সম্রাট তা ভালো করেই জানতেন। সম্রাটের স্মরণ ছিল যে, এই বোহেমন্ডকে মুক্ত করার জন্যই ১১০১ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ণ একটি ক্রুসেডার বাহিনী নিকসার দুর্গ অভিমুখে রওনা হয়েছিল। অবশ্য পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, নরম্যানদের সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল এবং পুরো বাহিনীটি ধ্বংসের শিকার হয়েছিল।

বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রস্তাব ছিল গাজি বিন দানিশমান্দের জন্য অত্যন্ত লোভনীয় ও প্রলুব্ধকর এক প্রস্তাব! তিনি তো লড়াই করছেন সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে, অর্থসম্পদ বৃদ্ধির লালসায়। বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রস্তাব গ্রহণ করলে তেমন কোনো কষ্ট-ক্লেশ ছাড়াই তার পকেটে ঢুকবে বিরাট অঙ্কের অর্থ!

এ প্রস্তাব মোটেও ফেলে দেওয়ার নয়! এ তো ভালোভাবে চিন্তা করে গ্রহণ করার মতো বিষয়!

আচ্ছা, আর কেউ কি বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রস্তাবের কথা জানে?! হ্যাঁ, বিখ্যাত সেলজুক নেতা কিলিজ আরসালানের কানেও বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রস্তাবের সংবাদ পৌঁছে গেছে। কিলিজ আরসালান তো এশিয়া মাইনর অঞ্চলের ক্ষমতাসীন দুই তুর্কি পরিবারের আরেকটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি ও তার ভাইয়েরা উত্তরাধিকারসূত্রেই দানিশমান্দ পরিবারের বিরুদ্ধে শত্রুতা লালন করে আসছেন। কিলিজ আরসালান যখন জানতে পারেন যে, দানিশমান্দ পরিবারের সম্পদভান্ডারে অচিরেই বিপুল পরিমাণ সম্পদ যুক্ত হতে যাচ্ছে, তখন তার লোভাতুর মন উন্মত্ত হয়ে ওঠে। তিনি তৎক্ষণাৎ গাজি কুমুশতেগিনের কাছে বার্তা পাঠিয়ে প্রস্তাবিত অর্থ পাওয়ামাত্র অর্ধেক তার কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। কারণ, ১১০১ খ্রিষ্টাব্দে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সেই যুদ্ধে তিনি তো গাজিকে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছিলেন। (৬২৩)

তাহলে সেই যুদ্ধ ও সহায়তা মোটেও আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে ছিল না! যুদ্ধ ছিল নিজেদের অস্তিত্ব ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য, অর্থ ও সম্পদ অর্জন করার জন্য। একনিষ্ঠতা, আত্মনিবেদন, দ্বীনের সহায়তা, জান্নাতের আগ্রহ, আল্লাহর পথে সংগ্রাম ও লড়াই ইত্যাদি সুউচ্চ ইসলামি নীতি ও তাৎপর্যের কোনো স্থান তৎকালীন মুসলিম নেতাদের অন্তরে ছিল না!

গাজি কুমুশতেগিন এবার কিলিজ আরসালানের দাবি নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। কিলিজ আরসালানের দাবি মেনে নিলে তার পকেটে থাকবে 'মাত্র' এক লক্ষ ত্রিশ হাজার দিনার! যদিও তা পরিমাণে অনেক বড় অঙ্ক; কিন্তু তার চাওয়া তো আরও অনেক অনেক বেশি। তা ছাড়া তিনি তো কিছুতেই কিলিজ আরসালানের কোনো দাবির সামনে নতি স্বীকার করাকে মেনে নিতে পারেন না।

করণীয় নির্ণয়ে গাজি বিন দানিশমান্দ এবার প্রকৃতই দিশেহারা হয়ে পড়েন!

টিকাঃ
৬১৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৫৪-৫৫।
৬১৯. Raoul de Caen, pp. 708-709.
৬২০. Runciman: op. cit., 11, p. 38.
৬২১. Albert d' Aix, p. 610.
৬২২. Albert d' Aix, p. 610.
৬২৩. Runciman: op. cit., 11, 301.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 বোহেমন্ডের মুক্তি

📄 বোহেমন্ডের মুক্তি


এই যখন পরিস্থিতি, তখন আরও একটি পক্ষ দরকষাকষির আলোচনায় প্রবেশ করে। এডেসার শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গ ও বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোসের পর এবার মঞ্চে আবির্ভূত হন স্বয়ং বন্দি বোহেমন্ড!

মুসলিম সমাজে তখন যে অবক্ষয় বিরাজ করছিল, তাতে নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, মুসলমানদের মধ্য হতেই কেউ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে কিছু অর্থ, জায়গির ভূমি বা অন্য কোনো সম্পদের প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে বন্দি বোহেমন্ডের কাছে এ সংবাদ পৌঁছিয়ে দিয়েছিল। আর তাই এডেসা অধিপতি বল্ডউইন ডি বুর্গের প্রচেষ্টা, বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রস্তাব ও সুলতান কিলিজ আরসালানের ভাগ-বাটোয়ারার দাবির পর এবার স্বয়ং বোহেমন্ড গাজিকে নতুন এক প্রস্তাব প্রদান করেন! (৬২৪)

বোহেমন্ড গাজিকে বুঝিয়ে বলেন যে, 'দেখুন, বাইজান্টাইন সম্রাট আমাদের উভয়ের যৌথ শত্রু। তিনি এশিয়া মাইনর অঞ্চলের নগরীগুলোর নিয়ন্ত্রণ লাভের আশায় সকলের সঙ্গে বিরোধ করছেন। আবার কিলিজ আরসালানও আমাদের উভয়ের শত্রু। (কারণ, এশিয়া মাইনর অঞ্চলে কিলিজ আরসালানের স্বার্থ ও লালসা সন্দেহাতীতভাবেই বোহেমন্ড ও গাজি উভয়ের লালসার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল।) আর তাই আমাকে বাইজান্টাইন সম্রাটের হাতে তুলে দেওয়া হলে কিংবা কিলিজ আরসালানকে তার দাবিকৃত অর্ধেক অর্থ প্রদান করা হলে আমার তো ক্ষতি হবেই, তার পূর্বে আপনার বিরাট স্বার্থহানি হবে।'

এসব দিক তুলে ধরে বোহেমন্ড গাজিকে প্রস্তাব দেন যে, তিনি এন্টিয়ক রাজ্য ও তার বন্ধুদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে গাজিকে এক লক্ষ দিনার প্রদান করবেন এবং এ অর্থ তার মুক্তিপণ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ছাড়াও উভয় পক্ষের মাঝে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বিনিময়ের চুক্তি সম্পাদিত হবে এবং এর মাধ্যমে ক্রুসেড রাজ্য এন্টিয়ক বনু দানিশমান্দের মুসলিম রাজ্যের বন্ধুরাষ্ট্রে পরিণত হবে! (৬২৫)

নিঃসন্দেহে এ প্রস্তাব ছিল চরম উচ্চাকাঙ্ক্ষী শাসক গাজি বিন দানিশমান্দের জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রলুব্ধকর! কারণ—

১. এ প্রস্তাব মেনে নিলে তিনি বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের মালিক হবেন। যদিও বোহেমন্ডের প্রস্তাবিত অঙ্ক বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রস্তাবিত অঙ্কের চেয়ে অনেক কম; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাও বিরাট একটি অঙ্ক। বোহেমন্ডের প্রস্তাবটিও যে যথেষ্ট বড় ছিল তা আমরা এভাবেও উপলব্ধি করতে পারি যে, এন্টিয়ক রাজ্য একা এই অর্থের ব্যবস্থা করতে পারেনি; বরং তারা এডেসা রাজ্য ও সিসিলিতে বসবাসকারী বোহেমন্ডের পরিবারের সহায়তাও গ্রহণ করেছিল। এ তথ্যটিও এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য হতে পারে যে, এর কিছুদিন পর যখন এডেসার শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গ বন্দি হন, তখন তার মুক্তিপণ নির্ধারণ করা হয় মাত্র পনেরো হাজার দিনার!

২. বোহেমন্ডের প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে তা এশিয়া মাইনর অঞ্চলে গাজির অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোসের শক্তিবৃদ্ধিতে কোনো প্রকার অবদান রাখবে না।

৩. এটা হবে গাজির পরম শত্রু কিলিজ আরসালানের গন্ডদেশে সরাসরি চপেটাঘাত।

৪. এর মাধ্যমে গাজি বিন দানিশমান্দ বন্দি শাসক বোহেমন্ডের হৃদ্যতা লাভ করবেন এবং ক্রুসেডার রাজ্য এন্টিয়কের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবেন।

গাজি বিন দানিশমান্দের পক্ষে এসব দিক বিবেচনা করে এই প্রলুব্ধকর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব ছিল না। তাই তিনি বোহেমন্ডের প্রস্তাবে সম্মতি জানান এবং মালাতিয়ায় চুক্তি সম্পাদনের সিদ্ধান্ত নেন। মালাতিয়া তখন গাজির কর্তৃত্বাধীন ছিল। (৬২৬)

এ সংবাদ এন্টিয়কে পৌঁছতেই বোহেমন্ডের অনুসারীরা এডেসার শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গের সঙ্গে মিলে দ্রুত অর্থ সংগ্রহ করতে শুরু করে। আরও কিছু বিত্তশালী ক্রুসেডার এতে শরিক হয়। সিসিলিতে বসবাসকারী বোহেমন্ডের পরিবারের পক্ষ থেকেও কিছু অর্থ প্রেরণ করা হয়। ১১০৩ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসের শুরুতে (৪৯৬ হিজরি সনে) উভয় পক্ষের মধ্যে চুক্তি সম্পাদিত হয় এবং বোহেমন্ড মুক্তি লাভ করেন। বোহেমন্ডের সঙ্গে হৃদ্যতা ও মিত্রতা রক্ষা এবং ভবিষ্যতে নিষ্ঠাপূর্ণ যৌথ সহযোগিতার অঙ্গীকার বিনিময়ের পর গাজি চুক্তি অনুযায়ী অর্থ লাভ করেন।(৬২৭)

এ সংবাদ জানতে পেরে কিলিজ আরসালান ক্রোধে উন্মাদ হয়ে যান!

এত বিরাট অঙ্ক হাতছাড়া হয়ে গেল!

বোহেমন্ডকে যদি সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোসের হাতে তুলে দেওয়া হতো, তাহলে কিন্তু কিলিজ আরসালান মোটেও বিক্ষুব্ধ হতেন না। অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস বুঝি মুসলমানদের বন্ধু; তার হাতে শক্তি-বৃদ্ধির উপকরণ তুলে দিতে কোনো আপত্তি নেই! কিন্তু এখন বোহেমন্ড মুক্তি পাওয়ায় কিলিজ আরসালান বড় ক্রুদ্ধ। কারণ, তিনি যে বিনিময়-মূল্যের কোনো অংশই লাভ করেননি!

ক্রুদ্ধ-বিক্ষুব্ধ কিলিজ আরসালান এবার গাজি কুমুশতেগিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। এশিয়া মাইনর অঞ্চলের মুসলমানদের মাঝে আবারও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের আগুন জ্বলে ওঠে। বরং কিলিজ আরসালান তৎকালীন আব্বাসি খলিফা মুসতাযহির বিল্লাহ ও সেলজুক সুলতান বারকিয়ারুকের কাছে বার্তা পাঠিয়ে গাজির বিরুদ্ধে তাদের সহায়তা কামনা করেন। অথচ রাজনৈতিকভাবে কিলিজ আরসালান তাদের দুজনের ক্ষমতার অস্তিত্বই স্বীকার করতেন না। কিন্তু এখন রাজনীতির খেলায় তিনি সম্ভাব্য সবগুলো তাসই ব্যবহার করতে চাচ্ছেন! (৬২৮)

কিলিজ আরসালান ও গাজি কুমুশতেগিনের মধ্যকার সংঘাত পরিস্থিতি যদিও এ অঞ্চলের মুসলমানদের জন্য দুর্যোগের কারণ ছিল, তবে বোহেমন্ডের মুক্তিলাভের ঘটনা ছিল তার চেয়েও অধিক দুর্যোগপূর্ণ বিষয়। বোহেমন্ড এন্টিয়কে ফিরতেই এন্টিয়কবাসী তাকে উষ্ণ সংবর্ধনা জানায়। (৬২৯) ইবনুল আছির বলেন, 'তার আগমনে এন্টিয়কবাসীর মনোবল শক্তিশালী হয়ে ওঠে।' (৬৩০) এর পরপরই তিন বছরের অধিক সময় মুসলমানদের হাতে বন্দি থাকা বোহেমন্ড নবোদ্যমে প্রতিশোধ নিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

প্রথমেই তিনি আলেপ্পোর অধীনস্থ বিভিন্ন জনপদে হামলা চালান। বোহেমন্ড প্রথমে কিননাসরিন নগরীতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সেখানকার অধিবাসীদের ওপর জিজিয়া আরোপ করেন। (৬৩১) এরপর তিনি আলেপ্পোর উত্তরে কুয়েক নদীর (The Queiq) তীরে বসবাসকারী মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করে তাদেরকে ছিন্ন-ভিন্ন করে দেন। যারা প্রাণে বেঁচে যায়, তাদের ওপর তিনি বিশাল অঙ্কের জিজিয়া আরোপ করেন। এমনকি তিনি আলেপ্পো নগরীর ওপরও অর্থ ও অশ্বের জিজিয়া আরোপ করেন এবং সেখানে বিদ্যমান সকল বন্দি ক্রুসেডারকে মুক্তি দিতে বাধ্য করেন। (৬৩২)

নিঃসন্দেহে এটি ছিল মুসলমানদের ওপর আপতিত চরম দুর্যোগ। এটি ছিল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক দুর্যোগ; বরং এ সবকিছুর পূর্বে ধর্মীয় ও চারিত্রিক দুর্যোগ এবং ঘৃণ্য ও গর্হিত বিচ্ছিন্নতার সংকট; পরবর্তী কয়েক বছর যার দুর্ভোগ উম্মাহকে পোহাতে হয়।

আর এ সবকিছুর বিনিময় মূল্য?!

এক লক্ষ দিনার ও ক্রুসেড রাজ্য এন্টিয়কের সঙ্গে মিত্রতা!

এ জাতীয় ঘটনা নিয়ে আমরা যদি গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করি এবং এ জাতীয় পরিস্থিতি ও ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা ও বিশ্লেষণ করি, তাহলে হয়তো আমরা সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারব যে, মুসলমানদের সংখ্যাধিক্য, সম্পদ-প্রাচুর্য ও সুরক্ষিত নিরাপত্তাব্যবস্থা সত্ত্বেও কীভাবে ক্রুসেডাররা বিভিন্ন ইসলামি নগরী দখল করে নিয়েছিল।

“নিঃসন্দেহে আমরা কখনোই শত্রুদের শক্তির কারণে পরাজিত হই না; আমরা পরাজিত হই নিজেদের দুর্বলতার কারণে এবং আল্লাহর দ্বীন থেকে নিজেদের দূরবর্তিতার কারণে।”

সুন্নাতুল্লাহ তো শাশ্বত ও চিরন্তন! আল্লাহর রীতিতে কোনো বৈষম্য ও অসংগতি নেই!

টিকাঃ
৬২৪. Setton: op. cit. vol. 1, p. 388.
৬২৫. Albert d' Aix, p. 610-612.
৬২৬. Runciman: op. cit., 11, p.39.
৬২৭. Runciman: op. cit., 11, p. 39.
৬২৮. Albert d' Aix, p. 613-614.
৬২৯. Runciman: op. cit., 11, p. 39.
৬৩০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৫৬।
৬৩১. প্রাগুক্ত, ৯/৫৬।
৬৩২. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৪৭ ও Runciman: op. cit., 11, p. 39.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00