📄 রেমন্ডের নতুন লালসা
তুলুজের কাউন্ট ৪র্থ রেমন্ড তখনও পর্যন্ত নিজের স্বতন্ত্র রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তিনি এবার ভেবে দেখেন যে, লেবানন অঞ্চলে নিজের জন্য একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষিপ্র ও ত্বরিত প্রচেষ্টা চালানো উচিত। ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি যে, তিনি সুরক্ষিত ত্রিপোলিতে নিজের জন্য রাজ্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেও ক্রুসেড অভিযানের অন্যান্য সেনাপতির সঙ্গে বিরোধের কারণে ব্যর্থ হয়েছিলেন। একইভাবে তিনি নতুন আগত ক্রুসেডার বাহিনীকে নিয়ে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন এবং পুরো বাহিনী বলতে গেলে মুসলমানদের পদতলে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। রেমন্ড ভেবে দেখেন যে, বাইজান্টাইন সম্রাটের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে তার কোনো লাভ তো হচ্ছেই না; উল্টো অন্যান্য ক্রুসেডার সেনাপতির মাঝে এই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে যে, রেমন্ড তাদের সঙ্গে এবং ক্রুসেড পরিকল্পনার সঙ্গে গাদ্দারি করছেন। ১১০২ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে রেমন্ড যখন নিজের জন্য একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় নবোদ্যমে উজ্জীবিত হয়ে এন্টিয়কের দক্ষিণে সেন্ট সাইমন নৌবন্দর অভিমুখে রওনা হতে কনস্টান্টিনোপল ত্যাগ করেন, তখন এন্টিয়কের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনকর্তা টেনক্রেডের জনৈক সেনাপতি ক্রুসেডারদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ এনে রেমন্ডকে বন্দি করে।
এরপর টেনক্রেড তাকে এন্টিয়কের কারাগারে বন্দি করে রাখেন(৫৯৬) এবং তার বিরুদ্ধে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে আঁতাঁত ও যোগসাজশ করার বরং বাইজান্টাইনদের স্বার্থরক্ষায় ক্রুসেডার বাহিনীকে ইচ্ছাকৃত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ আনেন। একে কেন্দ্র করে ক্রুসেডারদের মাঝে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টির উপক্রম হয়। কারণ, রেমন্ডের পক্ষে প্রভিন্স অঞ্চলের পূর্ণ একটি বাহিনী ছিল। এ কারণেই অন্যান্য ক্রুসেডার নেতা রেমন্ডকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য টেনক্রেডের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
অবশেষে টেনক্রেড এই শর্তে রেমন্ডকে মুক্তি দেন যে, রেমন্ড ভবিষ্যতে এন্টিয়ক ও লাতাকিয়ার বিষয়ে কোনো ধরনের অধিকার দাবি করা থেকে বিরত থাকবেন। শর্ত মেনে নিয়ে রেমন্ড বন্দিদশা থেকে মুক্তি লাভ করেন। এরপর তিনি দ্রুত এন্টিয়ক থেকে বের হয়ে লেবানন অভিমুখে অগ্রসর হন। পথিমধ্যে তিনি (বর্তমান সিরিয়ার অন্তর্গত) তারতুস (Tartus) নগরী অবরোধ করেন। (৫৯৭) জেনোভার একটি নৌবহর তাকে এই অবরোধে সহায়তা করে। (৫৯৮) ১১০২ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে নগরীটির পতন ঘটে। রেমন্ড নগরীটিকে তার অভিযানের মূল ঘাঁটি এবং ত্রিপোলি অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার কেন্দ্র নির্ধারণ করেন। (৫৯৯)
যদিও রেমন্ডের বাহিনী ছিল একেবারেই ক্ষুদ্র, সর্বোচ্চ কয়েকশ সৈন্যবিশিষ্ট; কিন্তু তিনি সামান্য দ্বিধার শিকার না হয়ে এরপর এই অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়েই ত্রিপোলি অবরোধ করেন। (৬০০) এখন তো তার অস্তিত্বের ও টিকে থাকার লড়াই! ইতিমধ্যে তার অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। আর তাই সবকিছু হারানোর পূর্বেই প্রয়োজন ঐকান্তিক ও কঠোর প্রচেষ্টা।
পূর্বেও বলা হয়েছে যে, ত্রিপোলির প্রশাসক ইবনে আম্মার শিয়া মতাদর্শী হলেও উবায়দি সাম্রাজ্য হতে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। আর তাই ত্রিপোলির অভ্যন্তরে একাকী অবরুদ্ধ হয়ে পড়লেও তার পক্ষে উবায়দি সাম্রাজ্যের কাছে সাহায্যপ্রার্থনার চিন্তা করার সুযোগ ছিল না। কারণ, তিনি জানতেন যে, তার রাষ্ট্রের প্রতি উবায়দিদের লোলুপ দৃষ্টি রয়েছে। আর এ কারণেই তিনি নিরুপায় হয়ে অনেকটা নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দুই পরম শত্রুর কাছে সাহায্যবার্তা পাঠান। একজন হলেন দামেশকের শাসক দাক্কাক, অপরজন হিমসের শাসক জানাহুদ্দৌলা। (৬০*) দামেশক ও হিমস ত্রিপোলির তুলনামূলক নিকটবর্তী হলেও সুন্নি নগরীদুটির সঙ্গে ইবনে আম্মারের পুরোনো ও ঘোরতর বিরোধ ছিল। কদিন পূর্বেই দাক্কাক যখন ক্রুসেডার বাহিনীর প্রতিরোধ করতে চেয়েছিলেন, তখন এই ইবনে আম্মারই ক্রুসেডার বাহিনীকে এমন পথ দেখিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি, যার মাধ্যমে তারা দাক্কাকের বাহিনীর হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে যায়। এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণই ভিন্ন। সেদিনের পথপ্রদর্শক আজ নিজেই শিকার! নিঃসন্দেহে কারও মাঝেই ইসলামি চেতনাবোধ ছিল না। না ইবনে আম্মারের মাঝে, না দাক্কাক বা জানাহুদ্দৌলার মাঝে। বিষয় কেবলই ব্যক্তিস্বার্থ!
মুসলিম নেতাদ্বয় এমন আবেদন গ্রহণ করতে দ্বিধা করবেন কেন! এটি তো ত্রিপোলি রাজ্যের পক্ষ থেকে তাদেরকে প্রদত্ত এক মহা সুযোগ। রেমন্ডের বাহিনী তো একেবারেই ক্ষুদ্র! কদিন আগেই রেমন্ডের বাহিনী এশিয়া মাইনর অঞ্চলে কিলিজ আরসালান ও কুমুশতেগিন বিন দানিশমান্দের হাতে পরাজিত হয়েছে। অবশেষে দুই নেতা ইবনে আম্মারকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে রওনা হন! (৬০২)
যদিও দাক্কাক, জানাহুদ্দৌলা ও ইবনে আম্মারের সম্মিলিত মুসলিম বাহিনী রেমন্ডের বাহিনীর চেয়ে অনেক গুণ বড় ছিল; কিন্তু রেমন্ড তাদেরকে পরাজিত করে বিচ্ছিন্ন করে দিতে সক্ষম হন। বরং ঐতিহাসিক ইবনুল আছিরের ভাষ্যমতে এই কয়েকশ সৈন্য নিয়েই রেমন্ড মুসলিম বাহিনীর সাত হাজার সৈন্যকে হত্যা করেন! ইবনে আম্মারের বাহিনী পালিয়ে ত্রিপোলির অভ্যন্তরে আশ্রয় নেয় আর দাক্কাক ও জানাহুদ্দৌলার বাহিনী পালিয়ে নিজ নিজ অঞ্চলে ফিরে যায়। রেমন্ড যুদ্ধ শেষে আবারও ত্রিপোলি অবরোধ করেন। এই পরিস্থিতির মধ্যেই ইবনে আম্মার রেমন্ডকে জিজিয়া প্রদানের প্রস্তাব দিলে রেমন্ড তা মেনে নেন। কারণ, তিনি জানতেন—এত অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে ত্রিপোলির পতন ঘটানো কার্যত অসম্ভব। এরপর ১১০২ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ বা এপ্রিল মাসে রেমন্ড নিজ ঘাঁটি তারতুসে ফিরে আসেন। (৬০৩)
রেমন্ড কিন্তু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য তারতুসে ফিরে আসেননি। তিনি ফিরে এসেছেন তার সৈন্যদের নতুন অভিযানের জন্য প্রস্তুত করতে। আর তাই ফিরে আসার কদিন পরই ১১০২ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসেই তিনি হিমস নগরীর অধিভুক্ত তুবান ও আকরাদ দুর্গসহ বেশ কিছু দুর্গ দখলের লক্ষ্যে বেরিয়ে পড়েন। (৬০৪) ইতিপূর্বে জানাহুদ্দৌলার বাহিনীর পালিয়ে যাওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি দুর্গগুলো অবরোধ করে হামলা শুরু করেন। রেমন্ড যখন দুর্গগুলো অবরোধে ব্যস্ত, তখনই হিমস নগরীতে এমন এক দুর্যোগ সংঘটিত হয়, যা দ্বারা তৎকালীন মুসলিম উম্মাহর অধঃপতনের পরিমাণ কিছুটা হলেও আন্দাজ করা যায়।
আলেপ্পোর শাসক রিজওয়ান ও হিমসের শাসক জানাহুদ্দৌলা হুসাইন বিন মালাইবের মধ্যে পূর্ব থেকেই বিরোধ জিইয়ে ছিল। হুসাইন বিন মালাইব যদিও রিজওয়ান বিন তুতুশের মাকে বিয়ে করেছিলেন; কিন্তু রিজওয়ান এমন কঠিন ও দুর্যোগপূর্ণ সময়ে অমার্জনীয় এক অপরাধ করে বসেন। তিনি তার মায়ের পতি ও হিমসের অধিপতি জানাহুদ্দৌলাকে হত্যা করেন। এ জাতীয় গুপ্তহত্যায় সিদ্ধহস্ত শিয়া ইসমাইলি বাতিনি সম্প্রদায়ের তিনজন গুপ্তঘাতকের মাধ্যমে রিজওয়ান এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। ৪৯৫ হিজরি সনে (১১০২ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) জানাহুদ্দৌলা হিমসের জামে মসজিদে নামাজ আদায়কালে নিহত হন! (৬০৫)
নিঃসন্দেহে এটি অত্যন্ত গর্হিত এক অপরাধ!
অপরাধের ভয়াবহতা কেবল অন্যায়ভাবে একজন মুসলমানের প্রাণহরণ কিংবা নামাজ চলাকালে মসজিদের অভ্যন্তরে গুপ্তহত্যার কারণে নয়, অপরাধ কেবল এতটুকু নয় যে, রিজওয়ান তার মায়ের পতিকে হত্যা করেছেন; বরং অপরাধের ভয়াবহতা এই বিবেচনায়ও যে, তা উম্মাহর এই চরম কঠিন ও দুর্যোগপূর্ণ সময়ে সংঘটিত হয়েছে!
হিমস যে তখন রেমন্ডের বাহিনীর মোকাবিলা করছিল, রিজওয়ান সেদিকে মোটেও ভ্রুক্ষেপ করেননি; ভ্রুক্ষেপ করেননি দেশটি তখন যে সংকটে নিপতিত হয়েছিল সেদিকেও। তিনি এ বিষয়টি ভেবে দেখেননি যে, শাসককে হারিয়ে হিমস আরও কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে। দাম্ভিক রিজওয়ান শুধু নিজের প্রতিশোধস্পৃহা চরিতার্থ করতে চেয়েছেন! তার প্রতিহিংসার শিকার হয়ে হিমস এক কঠিন ও সঙ্গিন মুহূর্তে হয়ে পড়ে নেতৃত্বহারা।
রেমন্ড এই ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে পূর্ণ অবগত ছিলেন। তিনি দ্রুত তার বাকি সৈন্যদের নিয়ে সরাসরি হিমসে চলে আসেন এবং পতন ঘটানোর লক্ষ্যে নগরীটি অবরোধ করেন। (৬০৬) নিরুপায় হিমসবাসী দামেশকের অধিপতি দাক্কাকের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করে। দাক্কাক একে রাজ্য বিস্তৃতির সুবর্ণ সুযোগ বিবেচনা করে তার বাহিনী নিয়ে হিমস অভিমুখে রওনা হন। রেমন্ড যখন দেখতে পান যে, অচিরেই তিনি হিমস ও দামেশকের বাহিনীর মাঝে অবরুদ্ধ হয়ে পড়তে যাচ্ছেন, তখন তিনি অবরোধ প্রত্যাহার করে তারতুসে ফিরে যান। এদিকে দাক্কাক হিমসে পৌঁছে নগরীটিকে নিজ রাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করে নেন। এটি ১১০২ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসের ঘটনা। এরপর দাক্কাক তার জনৈক সেনাপতি তুগতেকিনকে হিমসে প্রশাসক নিযুক্ত করে নিজে দামেশকে ফিরে আসেন। (৬০৭)
এর মাধ্যমে আবারও এ অঞ্চলে তুলনামূলক স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরে আসে। রেমন্ড ত্রিপোলি অবরোধের প্রস্তুতি নিতে সৈন্য বৃদ্ধির কাজে ব্যস্ত থাকায় আপাতত কিছু দিন শান্ত থাকেন। দাক্কাকও রেমন্ডের শান্তভাবে নিশ্চিন্ত হয়ে নিশ্চুপ থাকেন এবং রেমন্ডের বিরুদ্ধে আক্রমণ করা বা তাকে উত্তেজিত করার চেষ্টা হতে সম্পূর্ণ বিরত থাকেন। যেন রেমন্ড যে ভূখণ্ডের ওপর হাত রেখেছেন, তা তার অধিকারে পরিণত হয়েছে এবং এমন বিষয়ে পরিণত হয়েছে, যা মেনে নেওয়া অত্যাবশ্যক!
টিকাঃ
৫৯৬. Matthieu d' Edesse (Doc. Ar. 1), p. 27.
৫৯৭. Albert d' Aix, pp. 582-683.
৫৯৮. Heyd: op. cit., 1, p. 139.
৫৯৯. Archer: Op. cit., p. 156.
৬০০. Raoul de Caen, p. 708.
৬০*. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৫৫।
৬০২. প্রাগুক্ত, ৯/৫৫।
৬০৩. প্রাগুক্ত, ৯/৫৫ ও Raoul de Caen, p. 707.
৬০৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৫৫-৫৬ ও Stevenson: op. cit., p. 54.
৬০৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৫৬ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৪৬।
৬০৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৫৬।
৬০৭. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৪৭।
📄 নতুন করে উবায়দিদের আত্মপ্রকাশ
আমরা আবারও বাইতুল মুকাদ্দাসের আলোচনায় ফিরে আসছি। ১১০১ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বরে প্রথম রামলার যুদ্ধে উবায়দিদের পরাজয়ের পর ইতিমধ্যে কয়েক মাস কেটে গেছে। রামলার পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে উবায়দিরা আবারও বিশাল এক বাহিনী নিয়ে ফিলিস্তিনে আগমন করে এবং ১১০২ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে আসকালানে অবতরণ করে। অর্থাৎ প্রথম যুদ্ধের বিপর্যয়ের পর ইতিমধ্যে আট মাসের অধিক সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। এবার উবায়দি বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন উজির আফজাল বিন বদর আল-জামালির পুত্র শারফ আল-মাআলি। বোঝাই যাচ্ছে, উবায়দি প্রশাসন এবারের অভিযানকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। (৬০৮)
সংবাদ পেয়ে বাইতুল মুকাদ্দাস সাম্রাজ্যের রাজা ১ম বল্ডউইন জাফা অঞ্চলে তার কয়েক হাজার সৈন্যকে সমবেত করেন। এরপর তিনি জাফা ও রামলার মধ্যবর্তী অঞ্চলে অনুসন্ধানমূলক তৎপরতার উদ্দেশ্যে বের হন। তার সঙ্গে তখন মাত্র দুইশ সৈন্য ছিল। আকস্মিকভাবে উবায়দিরা সেখানে তাদের ওপর হামলা চালায়। অপ্রত্যাশিত হামলায় ক্রুসেডার সৈন্যরা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে এবং অনিচ্ছাসত্ত্বেও আকস্মিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ক্রুসেডার বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্য নিহত হয়; বাকিরা পালিয়ে কিছু জাফায় এবং কিছু রামলায় চলে যায়। সেনাপতি বল্ডউইন নিজে পালিয়ে রামলায় চলে যান। এটি ১১০২ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসের ১৭ তারিখের ঘটনা। (৬০৯)
এরপর উবায়দি বাহিনী বল্ডউইনকে হত্যা করার জন্য রামলা অবরোধ করে। কিন্তু বল্ডউইন রাতের অন্ধকারে রামলা থেকে পালিয়ে জাফা অভিমুখে রওনা হন। উবায়দি বাহিনীর হাতে রামলার পতন ঘটে। (৬১০) এরপর উবায়দিরা জাফা অবরোধের উদ্দেশ্যে একটি দ্রুতগামী বাহিনী প্রেরণ করে। (৬১১) বল্ডউইনও তৎক্ষণাৎ পথ পরিবর্তন করে জাফার উত্তরে আরসুফে চলে যান। (৬১২) এরপর তিনি আরসুফে অবস্থানকারী ক্রুসেডারদের সমবেত করেন এবং তাদেরকে নিয়ে জাফায় অবস্থানরত ক্রুসেডার বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য সমুদ্রপথে জাফায় চলে আসেন। পাশাপাশি তিনি প্রচুর সৈন্য ও তীর্থযাত্রী নিয়ে ইংল্যান্ড থেকে আগত দুইশ জাহাজবিশিষ্ট একটি নৌবহরের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করেন। উপকূলীয় অঞ্চলে উবায়দি জাহাজসমূহের উপস্থিতি সত্ত্বেও বল্ডউইন সমুদ্রপথে জাফায় প্রবেশ করতে সক্ষম হন। এরপর তিনি নগরীর অভ্যন্তরে তার বাহিনীকে বিন্যস্ত করতে শুরু করেন। (৬১৩) মে মাসের ২৭ তারিখে বল্ডউইন উবায়দি বাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য ক্রুসেডার বাহিনী নিয়ে জাফার নগরপ্রাচীরের বাইরে বেরিয়ে আসেন। পরিতাপের বিষয়, অল্প সময়ের যুদ্ধের পর উবায়দি বাহিনী চূড়ান্তরূপে পরাজিত হয়। উবায়দি বাহিনীকে পরাভূত করতে ক্রুসেডার বাহিনীকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রাণক্ষয়ও করতে হয়নি। পরাজিত উবায়দি বাহিনীর সৈন্যরা পালিয়ে আসকালানে ফিরে যায়।(৬১৪) আট মাসের মধ্যে টানা দ্বিতীয় পরাজয়ে উবায়দি সাম্রাজ্যের সামরিক সংকট আরও ঘনীভূত হয় আর ফিলিস্তিন অঞ্চলে ক্রুসেডারদের কর্তৃত্ব আরও সুদৃঢ় অবস্থান লাভ করে।
টিকাঃ
৬০৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৬৮।
৬০৯. প্রাগুক্ত, ৯/৬৮ ও Albert d' Aix, p. 593.
৬১০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৬৮ ও Foucher de chartres, p. 402.
৬১১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৬৮।
৬১২. Albert d' Aix, p. 595.
৬১৩. Michaud: op. cit. 11, p. 30 & Runciman: op. cit., 11, 79-80.
৬১৪. Foucher de chartres, pp. 404-405 & Guillaume: de Tyr, p. 435.
📄 বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যে স্থিতিশীলতা
উবায়দি বাহিনীকে পরাজিত করে বল্ডউইন বাইতুল মুকাদ্দাসে ফিরে আসেন এবং প্রশাসনিক বিন্যাসে মনোযোগী হন। এ সময় পোপ ২য় পাসকাল বাইতুল মুকাদ্দাসের বিশপ ডেমবার্টের বিষয়ে তদন্ত করতে একজন প্রতিনিধি প্রেরণ করেন। বল্ডউইনই ইতিপূর্বে পোপের কাছে বার্তা পাঠিয়ে ডেমবার্টের অসদাচরণ সম্পর্কে অভিযোগ জানিয়েছিলেন এবং তার বিভিন্ন আচরণ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। পোপের প্রতিনিধি বিশপ অ্যাবরামার (Abramar) বাইতুল মুকাদ্দাসে আগমন করলে বল্ডউইন তাকে স্বাগত জানান। বিশপ অ্যাবরামার স্বাভাবিকভাবেই বল্ডউইনের সহায়তায় তদন্ত শুরু করেন। সামান্য তদন্তের পরই প্রমাণিত হয় যে, ডেমবার্ট বিভিন্ন অন্যায়ে জড়িত। এরপর ডেমবার্টকে গুরুত্বপূর্ণ বিশপ পদ থেকে বরখাস্ত করা হয় এবং অ্যাবরামার তার স্থলাভিষিক্ত হন!
এর মাধ্যমে বল্ডউইন তার ক্ষমতার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমবার্টের থেকে নিষ্কৃতি লাভ করেন। (৬১৫) এ বিষয়ে পরবর্তী সময়ে এন্টিয়কের শাসক টেনক্রেড অভিযোগ-আপত্তি করলেও বল্ডউইনের তাতে কী আসে যায়! তিনি তো এখন ক্রুসেডার সেনাপতিদের মাঝে সবচেয়ে শক্তিমান নেতা, অপ্রতিদ্বন্দ্বী শাসক!
বল্ডউইনের এই পদক্ষেপ থেকে আমাদের এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া মোটেও ঠিক হবে না যে, বাইতুল মুকাদ্দাসে ধর্মনিরপেক্ষ রাজকীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গির্জার প্রভাব-প্রতিপত্তি পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। বরং বাস্তবতা হলো, এরপরও গির্জার ব্যাপক প্রভাব-প্রতিপত্তি বজায় ছিল। রাজনৈতিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যদিও গির্জার উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা ছিল না; কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গির্জার ছিল ব্যাপক প্রভাব। ক্রুসেড রাজ্যগুলোর আশ্রম ও গির্জাগুলো প্রচুর সম্পদ ও ভূ-মালিকানার অধিকারী ছিল। উদাহরণস্বরূপ আমরা বাইতুল মুকাদ্দাসের জিওন পাহাড়ে (Mount Zion) অবস্থিত আশ্রমটির কথা বলতে পারি। এই আশ্রমটি ৫৮৩ হিজরি সনে (১১৭৮ খ্রিষ্টাব্দে) একেবারে বাইতুল মুকাদ্দাস নগরীর অভ্যন্তরে একটি পূর্ণ মহল্লার মালিকানা লাভ করে। এ ছাড়াও আশ্রমটির আসকালান, জাফা, নাবলুস, কায়সারিয়া, আক্কা, সুর, এন্টিয়ক ও কিলিকিয়ায় প্রচুর বাগান, জমিজমা ও বাজারের মালিকানা ছিল। বরং একই আশ্রমের ইউরোপের সিসিলি, ইতালি ও ফ্রান্সেও প্রচুর ভূ-সম্পদ ও অন্যান্য সম্পদ ছিল!
নিঃসন্দেহে আশ্রম ও গির্জাগুলোর সম্পদপ্রাচুর্য ইউরোপের রাজন্যবর্গ ও সেনাপতিদের মাঝে অসন্তোষ সৃষ্টি করত। বিশেষত এ বিষয়টিও তাদেরকে বিক্ষুব্ধ করত যে, গির্জার মালিকানাধীন সম্পদ ছিল করমুক্ত (৬১৬) আর গির্জাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সামরিক কোনো দায়িত্ব পালন করতে হতো না। সেনাপতিগণ যেহেতু মনে করত যে, তাদের জীবনে ধর্মের এমন কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ও প্রভাব নেই, যার বিনিময়ে গির্জা এত বিশাল সম্পদ ভোগ করতে পারে, তাই তাদের মনমস্তিস্কে হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খেত। তবে মনে যত প্রশ্নই তোলপাড় করুক, তারা এই বাস্তবতা মেনে নিতে বাধ্য ছিল। তখন থেকে আরও কয়েক শতাব্দী অতিবাহিত হওয়ার পরই কেবল সাধারণ ইউরোপবাসী রাজন্যবর্গের এই অসন্তোষ সম্পর্কে জানতে পেরেছিল! (৬১৭)
টিকাঃ
৬১৫. Runciman: op. cit., 11, 81-82.
৬১৬. Thomson: op. cit., p. 406.
৬১৭. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/৩৮৯।
📄 মুসলিম রাজন্যবর্গের পতন!
যে সময় ক্রুসেড রাজ্যগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি স্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক একই সময় মুসলিম রাজ্যগুলোর পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে অবনতির পথে ধাবিত হচ্ছিল। এতদিন তো মুসলিম রাজ্যগুলো পরস্পর বিরোধ ও সংঘাতে জড়িয়ে ছিল; এবার প্রতিটি রাজ্যের অভ্যন্তরেই শুরু হয় গৃহসংঘাত। এর অন্যতম দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যায় মসুলের কথা। ৪৯৫ হিজরি সনে (১১০২ খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকে) মসুলের প্রশাসক কারবুগা মৃত্যুবরণ করলে মসুলের শাসনক্ষমতা নিয়ে সুনকুরজা ও মুসা তুর্কমানি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। সংঘাতে সুনকুরজা নিহত হন এবং মুসা তুর্কমানি শাসক পদে অধিষ্ঠিত হন। অল্প কদিন পরই তিনি জাকারমিশের (Djekermish) হাতে নিহত হন এবং ক্ষমতার লাগাম চলে যায় জাকারমিশের হাতে। এভাবেই চলতে থাকে নেতৃত্বের পতন ও নতুন নেতৃত্বের আগমন!(৬১৮)
জনজীবনে দ্বীনি শিক্ষা ও ধর্মীয় চেতনার অনুপস্থিতি, ক্ষমতার মোহ ও সম্পদের লালসা, ঐক্য ও অবিচ্ছিন্নতার বিলুপ্তি ইত্যাদি কারণে মুসলিম সমাজে যে শোচনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, তা কাজে লাগিয়ে ক্রুসেডাররা যে মুসলিম উম্মাহর কেন্দ্রমূলেই শেকড় গেড়ে বসবে, তা কেবল অনুমেয় নয়; অবশ্যম্ভাবী ছিল! আর তাই এ তথ্যে মোটেও বিস্ময়ের কিছু নেই যে, মসুলে যখন ক্ষমতা নিয়ে মুসলিম নেতৃবৃন্দের মাঝে চলছে চরম সংঘাত, তার মাঝেই ১১০২ খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকে প্রায় দেড় বছরের অবরোধের পর এন্টিয়ক অধিপতি টেনক্রেডের হাতে লাতাকিয়া নগরীর পতন ঘটে। ক্রুসেডারদের হাতে শাম অঞ্চলের অতি গুরুত্বপূর্ণ এই নৌবন্দরটির নিয়ন্ত্রণ চলে গেলেও আলেপ্পো, হামা, হিমস বা পার্শ্ববর্তী অন্য কোনো ইসলামি নগরী এ সময় লাতাকিয়ায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে অগ্রসর হয়নি। লাতাকিয়া বিজয়ের ফলে ক্রুসেড রাজ্য এন্টিয়ক সমুদ্র অভিমুখী বিস্তৃত করিডোরের অধিকারী হয়। এর ফলে পরবর্তী দশকের পর দশক ধরে ইউরোপ থেকে সমুদ্রপথে আগত রসদপত্র এন্টিয়কে সহজে পৌঁছা নিশ্চিত হয়, যা রাজ্যটির অস্তিত্ব ও স্থিতিশীলতা রক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রাখে। (৬১৯)
১১০৩ খ্রিষ্টাব্দের (৪৯৬ হিজরি) ঘটনাপ্রবাহ দ্বারাও তৎকালীন মুসলিম নেতৃবৃন্দের চারিত্রিক অধঃপতনের পরিমাণ আন্দাজ করা যেতে পারে। মসুলের মতো কেবল ক্ষমতার গদি নিয়ে সংঘাত নয়; কোনো কোনো মুসলিম নেতার অবস্থা এ সময় এতটা নিন্দনীয় পর্যায়ে উপনীত হয় যে, তারা এক মুঠো দিনারের বিনিময়ে উম্মাহর স্বার্থকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে কিংবা ক্রুসেডারদের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময়ের চুক্তি করতে সামান্য দ্বিধা করছিলেন না! এরই একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি।
পূর্বের ঘটনাপ্রবাহে আমরা জেনেছি যে, দানিশমান্দ রাজ্যের শাসক গাজি কুমুশতেগিন ক্রুসেডার সেনাপতি ও এন্টিয়কের সাবেক শাসক বোহেমন্ডকে পাকড়াও করার পর এশিয়া মাইনরের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত কৃষ্ণসাগরের উপকূলবর্তী সুরক্ষিত নিকসার দুর্গে বন্দি করে রেখেছিলেন। এ ঘটনার প্রায় তিন বছর পর ১১০৩ খ্রিষ্টাব্দের শুরুতে এডেসার শাসক বল্ডউইন ডি বুর্গ এন্টিয়কের গির্জাধ্যক্ষ বার্নাডের সঙ্গে সমঝোতা করে দুজনে মিলে বোহেমন্ডকে মুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বল্ডউইন ডি বুর্গ তখন এন্টিয়কের অন্তর্বর্তীকালীন শাসক টেনক্রেডের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে ভীত হয়ে পড়েছিলেন। (৬২০)
বিশেষ করে ১১০১ খ্রিষ্টাব্দের ব্যর্থ ক্রুসেড অভিযানের স্মৃতিচারণ করে বল্ডউইন উপলব্ধি করেন যে, সামরিক অভিযানের মাধ্যমে বোহেমন্ডকে মুক্ত করা মোটেও সম্ভব নয়। তাই তিনি রাজনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধানে অগ্রসর হন। গাজি কুমুশতেগিন বোহেমন্ডকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে কী দাবি করেন, তা জানার জন্য বল্ডউইন ডি বুর্গ গাজিকে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের আহ্বান জানান। উভয়ের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা ও দরকষাকষি হয়। কিন্তু উভয় পক্ষ সুনির্দিষ্ট কোনো সমাধানে একমত হতে ব্যর্থ হয়। (৬২১)
এ সময় বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস দু-পক্ষের বৈঠক সম্পর্কে অবগত হন। সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস বোহেমন্ডকে প্রচণ্ড অপছন্দ করতেন। তিনি মনে করতেন যে, বোহেমন্ড তাকে নিয়ে খেলেছেন, হৃদ্যতা, মিত্রতা, আনুগত্য ইত্যাদির বুলি আওড়িয়ে তাকে প্রবঞ্চিত করেছেন এবং শেষে এ সবকিছু অস্বীকার করে এন্টিয়ক দখল করে নিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, বোহেমন্ডের বাহিনীর অন্যতম সেনাপতি ও তার ভাগ্নে টেনক্রেড বাইজান্টাইন সম্রাটকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে এন্টিয়কের উত্তরে কিলিকিয়া অঞ্চলের তারসুস, আদানা ও মপসুয়েসটিয়া নগরী দখল করে নিয়েছেন। সবশেষে টেনক্রেড সেই লাতাকিয়া নৌবন্দরও দখল করে নিয়েছেন, যার কর্তৃত্ব নিয়ে ক্রুসেডারদের সঙ্গে বাইজান্টাইনদের বিরোধ চলছিল। লাতাকিয়ার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলায় এ অঞ্চলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের গৌরব ও মর্যাদা প্রচণ্ড আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। তা ছাড়া বোহেমন্ডের সঙ্গে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের শত্রুতার ইতিহাস তো আরও পুরোনো। ক্রুসেড অভিযান শুরু হওয়ারও কয়েক বছর পূর্ব থেকেই উভয় পক্ষের বিরোধ চলে আসছিল। আর তাই বাইজান্টাইন সম্রাট যখন বোহেমন্ডের মুক্তিসংক্রান্ত আলোচনার কথা জানতে পারেন, তখন তিনিও এই রাজনৈতিক খেলায় প্রবেশ করে বোহেমন্ডের বিষয়ে গাজির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও দরকষাকষির সিদ্ধান্ত নেন। সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস নরম্যান সেনাপতি বোহেমন্ডকে তুলে দেওয়ার বিনিময়ে গাজিকে দুই লক্ষ ষাট হাজার দিনার প্রদানের বিরাট প্রস্তাব প্রদান করেন! (৬২২)
বোহেমন্ডের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণই নয়; বাইজান্টাইন সম্রাট এর মাধ্যমে এমন একটি পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছিলেন, যা বোহেমন্ডকে বন্দি করার পর বিগত তিন বছরে মুসলমানরা চিন্তাও করেনি। তিনি চাচ্ছিলেন বোহেমন্ডকে কেনার পর তাকে নিয়ে এন্টিয়কের নরম্যানদের সঙ্গে দরকষাকষি করতে। তার আশা ছিল, বোহেমন্ডকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে তিনি তাদের কাছ থেকে এক বা একাধিক নগরীর মালিকানা বাগিয়ে নিতে পারবেন। নরম্যানদের কাছে বোহেমন্ডের মূল্য কতটা বেশি, বাইজান্টাইন সম্রাট তা ভালো করেই জানতেন। সম্রাটের স্মরণ ছিল যে, এই বোহেমন্ডকে মুক্ত করার জন্যই ১১০১ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ণ একটি ক্রুসেডার বাহিনী নিকসার দুর্গ অভিমুখে রওনা হয়েছিল। অবশ্য পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, নরম্যানদের সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল এবং পুরো বাহিনীটি ধ্বংসের শিকার হয়েছিল।
বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রস্তাব ছিল গাজি বিন দানিশমান্দের জন্য অত্যন্ত লোভনীয় ও প্রলুব্ধকর এক প্রস্তাব! তিনি তো লড়াই করছেন সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে, অর্থসম্পদ বৃদ্ধির লালসায়। বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রস্তাব গ্রহণ করলে তেমন কোনো কষ্ট-ক্লেশ ছাড়াই তার পকেটে ঢুকবে বিরাট অঙ্কের অর্থ!
এ প্রস্তাব মোটেও ফেলে দেওয়ার নয়! এ তো ভালোভাবে চিন্তা করে গ্রহণ করার মতো বিষয়!
আচ্ছা, আর কেউ কি বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রস্তাবের কথা জানে?! হ্যাঁ, বিখ্যাত সেলজুক নেতা কিলিজ আরসালানের কানেও বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রস্তাবের সংবাদ পৌঁছে গেছে। কিলিজ আরসালান তো এশিয়া মাইনর অঞ্চলের ক্ষমতাসীন দুই তুর্কি পরিবারের আরেকটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি ও তার ভাইয়েরা উত্তরাধিকারসূত্রেই দানিশমান্দ পরিবারের বিরুদ্ধে শত্রুতা লালন করে আসছেন। কিলিজ আরসালান যখন জানতে পারেন যে, দানিশমান্দ পরিবারের সম্পদভান্ডারে অচিরেই বিপুল পরিমাণ সম্পদ যুক্ত হতে যাচ্ছে, তখন তার লোভাতুর মন উন্মত্ত হয়ে ওঠে। তিনি তৎক্ষণাৎ গাজি কুমুশতেগিনের কাছে বার্তা পাঠিয়ে প্রস্তাবিত অর্থ পাওয়ামাত্র অর্ধেক তার কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। কারণ, ১১০১ খ্রিষ্টাব্দে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সেই যুদ্ধে তিনি তো গাজিকে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছিলেন। (৬২৩)
তাহলে সেই যুদ্ধ ও সহায়তা মোটেও আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে ছিল না! যুদ্ধ ছিল নিজেদের অস্তিত্ব ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য, অর্থ ও সম্পদ অর্জন করার জন্য। একনিষ্ঠতা, আত্মনিবেদন, দ্বীনের সহায়তা, জান্নাতের আগ্রহ, আল্লাহর পথে সংগ্রাম ও লড়াই ইত্যাদি সুউচ্চ ইসলামি নীতি ও তাৎপর্যের কোনো স্থান তৎকালীন মুসলিম নেতাদের অন্তরে ছিল না!
গাজি কুমুশতেগিন এবার কিলিজ আরসালানের দাবি নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। কিলিজ আরসালানের দাবি মেনে নিলে তার পকেটে থাকবে 'মাত্র' এক লক্ষ ত্রিশ হাজার দিনার! যদিও তা পরিমাণে অনেক বড় অঙ্ক; কিন্তু তার চাওয়া তো আরও অনেক অনেক বেশি। তা ছাড়া তিনি তো কিছুতেই কিলিজ আরসালানের কোনো দাবির সামনে নতি স্বীকার করাকে মেনে নিতে পারেন না।
করণীয় নির্ণয়ে গাজি বিন দানিশমান্দ এবার প্রকৃতই দিশেহারা হয়ে পড়েন!
টিকাঃ
৬১৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৫৪-৫৫।
৬১৯. Raoul de Caen, pp. 708-709.
৬২০. Runciman: op. cit., 11, p. 38.
৬২১. Albert d' Aix, p. 610.
৬২২. Albert d' Aix, p. 610.
৬২৩. Runciman: op. cit., 11, 301.