📄 হিরাক্লিয়ার প্রথম ও দ্বিতীয় যুদ্ধ
অবশ্য মুরসিফানের পরাজয়ই চলমান পরিস্থিতিতে ক্রুসেডারদের সর্বশেষ দুর্যোগ ছিল না। এরই মধ্যে কনস্টান্টিনোপলে ক্রুসেডারদের আরেকটি বাহিনী এসে পৌঁছায়। ফ্রান্স থেকে আগত বাহিনীটি ছিল পনেরো হাজার অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্যের সমন্বয়ে গঠিত। বাহিনীটির নেতৃত্বে ছিলেন নেভার্স (Nevers)-এর কাউন্ট ২য় উইলিয়াম (William II) ।(৫৮১) মুরসিফানের যুদ্ধ চলাকালে এই বাহিনী এসে পৌঁছায়। ২য় উইলিয়াম তার বাহিনী নিয়ে এশিয়া মাইনর অঞ্চলে চলে আসেন এবং অতি সহজে আঙ্কারায় পৌঁছে যান। প্রথম ক্রুসেডার বাহিনীটি কোন পথে অগ্রসর হয়েছে, তা ২য় উইলিয়ামের জানা ছিল না। যেহেতু প্রথম বাহিনীটির অধিকাংশ সদস্য ইতিমধ্যে নিহত হয়েছিল, আর যারা বেঁচে পালাতে পেরেছিল, তারাও সোজা উত্তরে রওনা হয়েছিল, তাই কাউন্ট উইলিয়ামের পক্ষে তা জানার সুযোগও ছিল না। (৫৮২) অবশেষে তিনি তার বাহিনী নিয়ে দক্ষিণে হিরাক্লিয়া অভিমুখে অগ্রসর হন। যথাসময়ে নতুন এই ক্রুসেডার বাহিনীর আগমন-সংবাদ জোটবদ্ধ মুসলিম বাহিনীর কাছে পৌঁছে যায়। তারা এবার দ্রুত হিরাক্লিয়া অভিমুখে রওনা হয়। মুরসিফানের যুদ্ধে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করায় মুসলিম বাহিনীর আত্মবিশ্বাস ও মনোবলের পারদ তখন অনেক উঁচুতে।
১১০১ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টের শেষ দিকে হিরাক্লিয়ায় উভয় বাহিনী মুখোমুখি হয়। পূর্বের যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করলে এবারের লড়াই ছিল মুসলিম বাহিনীর জন্য অনেকটা সামরিক অনুশীলন-ভ্রমণের ন্যায়! আর তাই যুদ্ধ শুরু হয়ে অল্প সময় অতিবাহিত না হতেই পুরো ক্রুসেডার বাহিনী নিঃশেষ হয়ে যায়। বাহিনীর সেনাপতি নেভার্সের কাউন্ট ২য় উইলিয়াম ও তার বিশেষ ছয়জন অনুচর বাদে সকলেই এ যুদ্ধে নিহত হয় ! (৫৮৩) যেহেতু এর দুই সপ্তাহেরও কম সময় পর একই স্থানে আরেকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়, তাই পার্থক্যকরণের জন্য ইতিহাসে এ যুদ্ধ 'প্রথম হিরাক্লিয়ার যুদ্ধ' নামে খ্যাত।
হিরাক্লিয়ার দ্বিতীয় যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ শুরু হয় এই দুর্ভাগা ক্রুসেডার বাহিনীর দ্বিতীয় অংশ পৌঁছার মধ্য দিয়ে। কনস্টান্টিনোপলে এবার ফ্রান্স ও জার্মানি থেকে ষাট হাজার যোদ্ধার একটি বাহিনী এসে পৌঁছায়। বাহিনীটির নেতৃত্বে ছিলেন আকুইতিন অঞ্চলের ডিউক ৯ম উইলিয়াম (William IX Duke of Aquitaine) ও ব্যাভারিয়া (Bavaria) অঞ্চলের ডিউক ৪র্থ ওয়াল্ফ। (৫৮৪) বাহিনীটি কোনিয়া অতিক্রম করে সরাসরি হিরাক্লিয়া অভিমুখে অগ্রসর হয়। মুসলিম বাহিনী তাদের সঙ্গে হুবহু প্রথম বাহিনীর সঙ্গে প্রয়োগকৃত কৌশল অবলম্বন করে এবং পথে ফল-ফসল, পানি ও অন্যান্য রসদ সংগ্রহের উৎসগুলো ধ্বংস করে দেওয়ার পর ধীরে ধীরে ক্রুসেডারদের হিরাক্লিয়ার দিকে টেনে আনে। ক্রুসেডার বাহিনী ক্ষুৎপিপাসা ও ক্লান্তির চরম সীমায় পৌঁছে অবশেষে সেপ্টেম্বরের শুরুতে হিরাক্লিয়ায় পৌঁছায়। (৫৮৫) যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কিছুক্ষণ অতিবাহিত না হতেই এ বাহিনীটিও পূর্বের দুই বাহিনীর পরিণতি বরণ করে। পুরো বাহিনীটি ধ্বংস হয়ে যায় আর সেনাপতি ও রাজন্যবর্গ কোনোমতে জান বাঁচিয়ে এন্টিয়কে পালিয়ে যায়! (৫৮৬)
তিনটি যুদ্ধেরই এক অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হলো-বাহিনীগুলোর সেনাপতিগণ অসহায় সৈন্যদের অশুভ ও মন্দ পরিণতি বরণের জন্য ফেলে রেখে নিজেরা পলায়নের পথ খুঁজে নিয়েছিল!
যে বাহিনী অভিযানে বের হয় স্বার্থের খোঁজে, যে বাহিনীর নেতা ও সেনাপতি অগ্রসর হয় প্রবৃত্তির চাহিদা ও সাম্রাজ্যবাদের লালসা পূরণে, যুগে যুগে সর্বযুগে তাদের প্রকৃতি ও পরিণতি এমনই হয়! দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে সংঘটিত এই তিনটি যুদ্ধে ক্রুসেডাররা প্রায় আড়াই লক্ষ যোদ্ধাপুরুষ হারায়। বন্দি হয় প্রচুর, প্রভূত সম্পদহানিও হয়। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা চলমান প্রেক্ষাপটে অসংখ্য প্রভাব সৃষ্টি করে থাকে। আর তাই আমরা এখানে ইতিহাসের ধারাবিবরণী কিছুক্ষণের জন্য স্থগিত রেখে এই গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলোর লাভ-ক্ষতি পর্যালোচনা এবং চলমান ঘটনাপ্রবাহে যুদ্ধগুলোর প্রভাব নিয়ে কিছুটা আলোচনা করা সমীচীন মনে করছি।
১. যুদ্ধতিনটিতে জয়লাভ করায় কেবল এশিয়া মাইনর অঞ্চল নয়; বরং পুরো ইসলামি বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের মুসলমানদের মনোবল বৃদ্ধি পায়। মুসলমানরা এমন একটি বিজয়ের প্রতীক্ষায় ছিল, যার ফলে হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে আসবে এবং ক্রুসেডারদের শক্তিমত্তা তাদের সামনে তুচ্ছ বিবেচিত হবে। এই সমুন্নত মনোবলের যদিও তাৎক্ষণিক কোনো বিশেষ প্রতিক্রিয়া ছিল না; কিন্তু সকলের মনমস্তিষ্কে এই দাবির অসারতা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে, ক্রুসেডাররা অপরাজেয় শক্তি। আর তাই এটি ছিল পরিবর্তনের সূচনার অতি গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ।
২. স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া যায় যে, এই তিনটি যুদ্ধের পর সমকালীন মুসলিম উম্মাহ বিজয়ের কিছু কার্যকারণ উপলব্ধি করতে পেরেছিল। সম্ভবত এসব কার্যকারণের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জিহাদ ও ঐক্য।
কারণ, এটি একটি অনস্বীকার্য বাস্তবতা যে, অত্যাচারী-জবরদখলকারীদের প্রতি আক্রমণাত্মক না হয়ে তাদেরকে তুষ্ট করার চেষ্টার মাধ্যমে কখনোই হৃত অধিকার ফিরে পাওয়া যায় না। অধিকার ফিরে পাওয়া যায় না সমঝোতার গোলটেবিল বৈঠকে কিংবা প্রাচ্য-পশ্চিমের নেতৃবৃন্দের মধ্যস্থতায়; হৃত অধিকার ফিরে পাওয়া যায় একমাত্র দুঃসাহসী প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি দৃঢ়তা ও সহনশীলতা, শ্রেয়তর ধৈর্য ও উপযুক্ত প্রস্তুতি এবং শক্তি ও সামর্থ্যের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে। এই তিনটি যুদ্ধের পদক্ষেপগুলোতে আমাদের সামনে এ সবকিছুই সুষ্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয়।
কিলিজ আরসালান ও গাজি কুমুশতেগিনের মধ্যকার ঐক্যই মুসলিম বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করেছিল, তাদেরকে সঠিক লক্ষ্যপানে পরিচালিত করেছিল, শত্রুদের ভীত-সন্ত্রস্ত করেছিল এবং তাদের অন্তর্জগতে প্রকম্পন সৃষ্টি করেছিল। আর এ সবকিছুর সমন্বয়ে রচিত হয়েছিল এক দৃশ্যমান বিজয়।
৩. পরিতাপের বিষয় হলো, ক্রুসেড আগ্রাসনের একেবারে গোড়ার দিকের মতো এবারও আমরা সেলজুক ও দানিশমান্দ বাহিনীর সদস্যদের মাঝে ইসলামি আদর্শের সুস্পষ্ট কোনো ছাপ অবলোকন করিনি। ইতিহাস গ্রন্থগুলোতেও তাদের শাহাদাত ও জান্নাতলাভের বাসনার কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না। তারা মূলত জাতিগত ও ভূখণ্ডগত দৃষ্টিকোণ থেকেই সবকিছু বিবেচনা করেছিল। তাদের কাছে এসব যুদ্ধ ছিল নিজেদের ভূখণ্ড, ঘরবাড়ি ও সহায়-সম্পত্তি রক্ষার লড়াই। আর এ ধরনের মনোভাব নিয়ে যুদ্ধ করলে যদিও ক্ষেত্রবিশেষে বিজয় অর্জিত হয়; কিন্তু সে বিজয় হয় সাময়িক ও ক্ষণস্থায়ী। কারণ, আল্লাহ তাআলা কেবল তাদেরকেই চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ বিজয় দান করেন, যারা তার পথে লড়াই করে এবং নিজেদের পূর্ণ মনোযোগ একমাত্র আল্লাহর প্রতি নিবদ্ধ রাখে। আলোচ্য যুদ্ধগুলোতে তুর্কিরা যে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করছিল, তার অন্যতম প্রমাণ হচ্ছে, তারা অর্জিত বিজয়কে কাজে লাগিয়ে অধিকৃত ইসলামি নগরীগুলো পুনরুদ্ধারের কোনো চেষ্টাই করেনি। অথচ বিশেষ করে এন্টিয়ক ও এডেসা ক্রুসেড রাজ্য ছিল তাদের ভূখণ্ডের অতি নিকটে।
৪. প্রতিটি বিজয় যদিও অত্যন্ত মহান ছিল, ছিল উজ্জ্বল ও তৃপ্তিদায়ক; কিন্তু শাম অঞ্চলের তৎকালীন মুসলিম নেতৃবৃন্দের চোখে যেন পট্টি বাঁধা ছিল। আর তাই না তারা এই বিজয়ের মাহাত্ম্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে, না বিজয়ের কার্যকারণসমূহ উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছে। ক্রুসেডাররা এত বিপুল সংখ্যক জনবল হারিয়ে কঠিন সংকটে নিপতিত হলেও তারা একে কাজে লাগানোর চিন্তা করেনি এবং নিজেদের মাতৃভূমি ও ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের চেষ্টাও করেনি।
৫. এই যুদ্ধগুলোর পর এশিয়া মাইনর অঞ্চলের তুর্কিরা সেখানকার নগরীগুলোতে কর্তৃত্ব বিস্তারে মনোযোগী হয়। কিলিজ আরসালান এশিয়া মাইনরের মধ্যাঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন এবং কোনিয়াকে নিজের রাজধানী নির্ধারণ করেন। (৫৮৭) অপরদিকে গাজি কুমুশতেগিন বিন দানিশমান্দ পূর্বাঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় জোর দেন এবং মালাতিয়ার পতন ঘটিয়ে নিজের অধিকারে নিয়ে নেন। (৫৮৮)
৬. এই যুদ্ধগুলোর ফলে ক্রুসেডার শক্তির সামনে কনস্টান্টিনোপল থেকে শাম অভিমুখী স্থলপথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এ সময় থেকে নিয়ে খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতকের শেষ দিকে জার্মান সম্রাট ফ্রেডেরিক বারবারোসা (Frederick Barbarossa)-এর আমল পর্যন্ত প্রায় পূর্ণ এক শতাব্দী পথটি তাদের জন্য রুদ্ধ ছিল। (৫৮৯) এর দ্বারাই অনুমান করা যায় যে, জিহাদ ও প্রতিরোধের পতাকা যখন উত্তোলিত হয়, মুসলিম উম্মাহর শত্রুদের অন্তর্জগতে তখন কী পরিমাণ ভয়-ডর-শঙ্কা সৃষ্টি হয়।
৭. শাম অভিমুখী স্থলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কনস্টান্টিনোপলে ও শামের বিভিন্ন নৌবন্দরে রসদপত্র, সামরিক সরঞ্জাম ও সৈন্য সহায়তা পৌঁছানোর জন্য ভূমধ্যসাগরে জাহাজের আনাগোনা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। আর যেহেতু এসব জাহাজের অধিকাংশই ছিল ইতালিয়ান প্রজাতন্ত্রগুলোর মালিকানাধীন, তাই স্বাভাবিকভাবেই আগামী দিনগুলোতে ক্রুসেড যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহে ইতালির প্রজাতন্ত্রগুলোর ভূমিকা যে অত্যন্ত প্রভাবক বিবেচিত হবে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। (৫৯০)
৮. মুসলমানদের এসব বিজয়ের ফলে শামে আগে থেকেই অবস্থানরত ক্রুসেডারদের মাঝে গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়। এ কারণেই তাদের সাম্রাজ্যবাদী অভিযানের ধারা স্থগিত হয়ে পড়ে এবং তারা নিজেদের দখলে থাকা ভূখণ্ড রক্ষা করতে পেরেই তুষ্ট থাকে। বিশেষত ক্রুসেডারদের উপর্যুপরি পরাজয় পশ্চিম ইউরোপে অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং সেখান থেকে যোদ্ধা সংগ্রহ করার গির্জা-প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
৯. পরপর তিন-তিনটি যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের কারণে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য উপলব্ধি করে যে, এশিয়া মাইনরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তুর্কিদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর মতো শক্তি বাইজান্টাইন বাহিনীর নেই। এ কারণেই তখন থেকে নিয়ে ছয় বছর পর কিলিজ আরসালানের মৃত্যু পর্যন্ত তারা এশিয়া মাইনর অঞ্চলে কোনো বাহিনী পাঠানোর চেষ্টা করেনি।
১০. এই বিজয়ের অত্যন্ত দুঃখজনক একটি নেতিবাচক ফল হলো, দুই তুর্কি শাসকপরিবার সেলজুক ও বনু দানিশমান্দ এই বিজয়ের পর পরস্পর প্রচণ্ড সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং উভয় পক্ষই অপর পক্ষের ক্ষতিসাধনে তৎপর হয়ে ওঠে। আল্লাহ তাআলা কিছু সময়ের জন্য তাদেরকে ঐক্যের যে নিয়ামত দান করেছিলেন, তারা তার মূল্য অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়। প্রত্যেক পক্ষ নিজেদের সম্প্রসারণমূলক চাহিদা বাস্তবায়নের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। যেহেতু এশিয়া মাইনর অঞ্চলের পরিধি ছিল সীমিত, তাই এক পক্ষের সম্প্রসারণ নীতি অপর পক্ষের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়াই ছিল অবশ্যম্ভাবী। যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে অর্জিত প্রচুর পরিমাণ সম্পদও উভয় পক্ষকে ইসলামি নীতি-আদর্শের কথা ভুলিয়ে দিয়ে পার্থিব সম্পদ অর্জনের প্রতি প্ররোচিত করতে অন্যতম কার্যকারণের ভূমিকা পালন করেছিল। (৫৯১)
তবে ব্যাপকভাবে এই যুদ্ধগুলোর কারণে এশিয়া মাইনর অঞ্চল ক্রুসেড যুদ্ধের চলমান ঘটনাপ্রবাহ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ক্রুসেডাররা যেমন দীর্ঘ দিনের জন্য তাদের পরিকল্পনা থেকে এ অঞ্চলকে বাদ দিয়ে দেয়, এ অঞ্চলের মুসলিম অধিবাসীগণও অধিকৃত শাম ও ফিলিস্তিন অঞ্চলসহ অন্যান্য ইসলামি ইস্যুকে নিজেদের বিবেচনার বাইরে রেখে দেয়। আল-কুদস ও অধিকৃত অন্যান্য ইসলামি নগরী যেন ফিলিস্তিন ও শাম অঞ্চলের মুসলমানদের একান্ত অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে পরিণত হয়। অন্যান্য অঞ্চলের মুসলমানদের যেন এ বিষয়ে কোনো দায়-দায়িত্বই নেই। নিঃসন্দেহে এটি বোধ ও উপলব্ধির অনেক বড় ঘাটতি ও শিথিলতা এবং দ্বীন ও শরিয়তের স্বভাব-প্রকৃতি হতে বড় ধরনের দূরত্ব!
টিকাঃ
৫৭৯. Albert d' Aix, pp. 569-607 &Foucher de chartres, p. 377.
৫৮০. Albert d' Aix, pp. 571-572. ইবনুল আছির উল্লেখ করেছেন যে, তিন লক্ষ ক্রুসেডারের মধ্য হতে মাত্র তিন হাজার সৈন্য জীবিত ফিরতে পেরেছিল। তারা আহত অবস্থায় পালিয়ে গিয়েছিল। দেখুন: আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৯।
৫৮১. Setton :vol 1, p. 358, Oman: vol 1, p.242.
৫৮২. Albert d' Aix, pp. 576-578.
৫৮৩. Albert d' Aix, pp. 575-578.
৫৮৪. Matthieu d' Edesse(Hist. Arm. 1), p. 59.
৫৮৫. Setton: op. cit. 1, pp. 361-362.
৫৮৬. Foucher de chartres, p. 399 & Guibert de Nogent, p. 243.
৫৮৭. রানচিমান, তারীখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৪৭।
৫৮৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৯, ইবনুল ইবরি, তারীখু মুখতাসারিদ দুওয়াল, পৃষ্ঠা: ১২৬ ও Cahen: La Syrie du Nord: p. 232.
৫৮৯. Grousset: Hist. des Croisades, 1, pp. 332-333.
৫৯০. Runciman; op. cit., 11, p. 30.
৫৯১. Gamb. Hist. of Byzantine Empire vol IV prt, 1, p. 741.
📄 উবায়দিদের ব্যর্থ তৎপরতা
আবারও শাম ও ফিলিস্তিনে প্রতিষ্ঠিত ক্রুসেড রাজ্যগুলোতে ফিরে আসছি। নতুন আগত ক্রুসেডার বাহিনীগুলোর শোচনীয় পরাজয়ের সংবাদ বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছার পূর্বে সেখানকার রাজা ১ম বল্ডউইন তার নতুন রাজ্যের প্রশাসনিক বিন্যাসে ব্যস্ত ছিলেন। এরই মধ্যে দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয় উবায়দি বাহিনী!
পূর্বেই আমরা উল্লেখ করে এসেছি যে, উবায়দি সাম্রাজ্য ক্রুসেডারদের সঙ্গে রাষ্ট্রবণ্টনের সমঝোতায় আগ্রহী ছিল। তাদের চাওয়া ছিল শাম থাকবে ক্রুসেডারদের ভাগে আর ফিলিস্তিন উবায়দি সাম্রাজ্যের ভাগে। কিন্তু ক্রুসেডাররা এ প্রস্তাবে তুষ্ট না হয়ে একের পর এক নগরী দখল করতে করতে পুরো ফিলিস্তিনই নিজেদের অধিকারে নিয়ে নেয়। ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে তারা বাইতুল মুকাদ্দাসের পতন ঘটায়। নিঃসন্দেহে এসব ঘটনা ছিল উবায়দি সাম্রাজ্যের পরিকল্পনা ও লালসার সঙ্গে সম্পূর্ণই সাংঘর্ষিক। অবশ্য স্বাভাবিকভাবেই তাদের ক্রোধ ও অসন্তোষ আল-কুদস নগরী ও মসজিদুল আকসার পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ হওয়ায় বা অন্য কোনো ইসলামি আত্মমর্যাদাবোধের কারণে ছিল না; তাদের অসন্তোষ ছিল নিজেদের সাম্রাজ্যবাদ ও কর্তৃত্ববাদের চাহিদায় বাধা সৃষ্টি হওয়ায় এবং উবায়দি সাম্রাজ্যের সরাসরি পূর্ব সীমান্তসংলগ্ন ফিলিস্তিন অঞ্চলে ক্রুসেডারদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উবায়দি সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হওয়ায়।
এর প্রায় দুই বছর পর ১১০১ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে উবায়দিরা ১ম বল্ডউইনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা করে এবং সাদুদ্দৌলা আল-কাওয়াসির নেতৃত্বে একটি বিরাট বাহিনী ফিলিস্তিনে প্রেরণ করে। সাদুদ্দৌলা ইতিপূর্বে বৈরুতের প্রশাসক ছিলেন। (৫৯২) উবায়দি বাহিনী আসকালানে শিবির স্থাপন করে। পূর্বেও আমরা জেনেছি যে, আসকালান তখন উবায়দিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আসকালানে পৌঁছে উবায়দি বাহিনী ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ লড়াই শুরু করার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। কিন্তু এটি সুস্পষ্ট যে, উবায়দি বাহিনীর পদক্ষেপ অত্যন্ত ধীরগতির ছিল। প্রস্তুতি নিতেই তারা ছয় মাসের বেশি সময় কাটিয়ে দেয়। অবশেষে ১১০১ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বরের শুরুতে তারা ক্রুসেডারদের মোকাবিলা করতে অগ্রসর হয়। এই বিলম্বের ফলে একদিকে যেমন ক্রুসেডাররা আসন্ন যুদ্ধের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়, অপরদিকে উবায়দিরা ইউরোপীয় ক্রুসেডারদের প্রচণ্ড গরমের মৌসুমে যুদ্ধ করতে বাধ্য করার সুযোগ হারিয়ে ফেলে। (৫৯৩)
১১০১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ সেপ্টেম্বর রামলায় উভয় পক্ষ মুখোমুখি হয়। ইতিহাসে এ যুদ্ধ 'রামলার প্রথম যুদ্ধ' নামে খ্যাত। এক পক্ষে বিশাল উবায়দি বাহিনী, আরেক পক্ষে ১ম বল্ডউইনের নেতৃত্বাধীন ক্ষুদ্র কিন্তু সুবিন্যস্ত ক্রুসেডার বাহিনী। উবায়দিরা যদিও জনবল বিবেচনায় ক্রুসেডারদের চেয়ে অনেক বেশি ছিল; কিন্তু দ্রুতই তারা পরাজিত হয় এবং তাদের সেনাপতি সাদুদ্দৌলা আল-কাওয়াসি যুদ্ধক্ষেত্রেই নিহত হন। (৫৯৪) উবায়দি বাহিনীর প্রচুর সৈন্য নিহত হয়; বাকিরা পালিয়ে সুরক্ষিত আসকালানে আশ্রয় নেয়। তাদের অস্ত্রশস্ত্র, রসদসামগ্রী ও অন্যান্য সামগ্রী সবকিছু ক্রুসেডাররা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে লাভ করে। (৫৯৫)
নিঃসন্দেহে রামলার প্রথম যুদ্ধে পরাজয়ের ঘটনা ছিল মিশরের উবায়দি সাম্রাজ্যের জন্য চরম বেদনাদায়ক আঘাত!
টিকাঃ
৫৯২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৬৭।
৫৯৩. Stevenson: op. cit., pp. 44-45.
৫৯৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৬৭-৬৮।
৫৯৫. Albert d' Aix, p. 553 & Guillaume de Tyr, 1, p. 26.
📄 রেমন্ডের নতুন লালসা
তুলুজের কাউন্ট ৪র্থ রেমন্ড তখনও পর্যন্ত নিজের স্বতন্ত্র রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তিনি এবার ভেবে দেখেন যে, লেবানন অঞ্চলে নিজের জন্য একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষিপ্র ও ত্বরিত প্রচেষ্টা চালানো উচিত। ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি যে, তিনি সুরক্ষিত ত্রিপোলিতে নিজের জন্য রাজ্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেও ক্রুসেড অভিযানের অন্যান্য সেনাপতির সঙ্গে বিরোধের কারণে ব্যর্থ হয়েছিলেন। একইভাবে তিনি নতুন আগত ক্রুসেডার বাহিনীকে নিয়ে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন এবং পুরো বাহিনী বলতে গেলে মুসলমানদের পদতলে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। রেমন্ড ভেবে দেখেন যে, বাইজান্টাইন সম্রাটের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে তার কোনো লাভ তো হচ্ছেই না; উল্টো অন্যান্য ক্রুসেডার সেনাপতির মাঝে এই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে যে, রেমন্ড তাদের সঙ্গে এবং ক্রুসেড পরিকল্পনার সঙ্গে গাদ্দারি করছেন। ১১০২ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে রেমন্ড যখন নিজের জন্য একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় নবোদ্যমে উজ্জীবিত হয়ে এন্টিয়কের দক্ষিণে সেন্ট সাইমন নৌবন্দর অভিমুখে রওনা হতে কনস্টান্টিনোপল ত্যাগ করেন, তখন এন্টিয়কের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনকর্তা টেনক্রেডের জনৈক সেনাপতি ক্রুসেডারদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ এনে রেমন্ডকে বন্দি করে।
এরপর টেনক্রেড তাকে এন্টিয়কের কারাগারে বন্দি করে রাখেন(৫৯৬) এবং তার বিরুদ্ধে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে আঁতাঁত ও যোগসাজশ করার বরং বাইজান্টাইনদের স্বার্থরক্ষায় ক্রুসেডার বাহিনীকে ইচ্ছাকৃত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ আনেন। একে কেন্দ্র করে ক্রুসেডারদের মাঝে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টির উপক্রম হয়। কারণ, রেমন্ডের পক্ষে প্রভিন্স অঞ্চলের পূর্ণ একটি বাহিনী ছিল। এ কারণেই অন্যান্য ক্রুসেডার নেতা রেমন্ডকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য টেনক্রেডের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
অবশেষে টেনক্রেড এই শর্তে রেমন্ডকে মুক্তি দেন যে, রেমন্ড ভবিষ্যতে এন্টিয়ক ও লাতাকিয়ার বিষয়ে কোনো ধরনের অধিকার দাবি করা থেকে বিরত থাকবেন। শর্ত মেনে নিয়ে রেমন্ড বন্দিদশা থেকে মুক্তি লাভ করেন। এরপর তিনি দ্রুত এন্টিয়ক থেকে বের হয়ে লেবানন অভিমুখে অগ্রসর হন। পথিমধ্যে তিনি (বর্তমান সিরিয়ার অন্তর্গত) তারতুস (Tartus) নগরী অবরোধ করেন। (৫৯৭) জেনোভার একটি নৌবহর তাকে এই অবরোধে সহায়তা করে। (৫৯৮) ১১০২ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে নগরীটির পতন ঘটে। রেমন্ড নগরীটিকে তার অভিযানের মূল ঘাঁটি এবং ত্রিপোলি অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার কেন্দ্র নির্ধারণ করেন। (৫৯৯)
যদিও রেমন্ডের বাহিনী ছিল একেবারেই ক্ষুদ্র, সর্বোচ্চ কয়েকশ সৈন্যবিশিষ্ট; কিন্তু তিনি সামান্য দ্বিধার শিকার না হয়ে এরপর এই অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়েই ত্রিপোলি অবরোধ করেন। (৬০০) এখন তো তার অস্তিত্বের ও টিকে থাকার লড়াই! ইতিমধ্যে তার অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। আর তাই সবকিছু হারানোর পূর্বেই প্রয়োজন ঐকান্তিক ও কঠোর প্রচেষ্টা।
পূর্বেও বলা হয়েছে যে, ত্রিপোলির প্রশাসক ইবনে আম্মার শিয়া মতাদর্শী হলেও উবায়দি সাম্রাজ্য হতে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। আর তাই ত্রিপোলির অভ্যন্তরে একাকী অবরুদ্ধ হয়ে পড়লেও তার পক্ষে উবায়দি সাম্রাজ্যের কাছে সাহায্যপ্রার্থনার চিন্তা করার সুযোগ ছিল না। কারণ, তিনি জানতেন যে, তার রাষ্ট্রের প্রতি উবায়দিদের লোলুপ দৃষ্টি রয়েছে। আর এ কারণেই তিনি নিরুপায় হয়ে অনেকটা নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দুই পরম শত্রুর কাছে সাহায্যবার্তা পাঠান। একজন হলেন দামেশকের শাসক দাক্কাক, অপরজন হিমসের শাসক জানাহুদ্দৌলা। (৬০*) দামেশক ও হিমস ত্রিপোলির তুলনামূলক নিকটবর্তী হলেও সুন্নি নগরীদুটির সঙ্গে ইবনে আম্মারের পুরোনো ও ঘোরতর বিরোধ ছিল। কদিন পূর্বেই দাক্কাক যখন ক্রুসেডার বাহিনীর প্রতিরোধ করতে চেয়েছিলেন, তখন এই ইবনে আম্মারই ক্রুসেডার বাহিনীকে এমন পথ দেখিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি, যার মাধ্যমে তারা দাক্কাকের বাহিনীর হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে যায়। এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণই ভিন্ন। সেদিনের পথপ্রদর্শক আজ নিজেই শিকার! নিঃসন্দেহে কারও মাঝেই ইসলামি চেতনাবোধ ছিল না। না ইবনে আম্মারের মাঝে, না দাক্কাক বা জানাহুদ্দৌলার মাঝে। বিষয় কেবলই ব্যক্তিস্বার্থ!
মুসলিম নেতাদ্বয় এমন আবেদন গ্রহণ করতে দ্বিধা করবেন কেন! এটি তো ত্রিপোলি রাজ্যের পক্ষ থেকে তাদেরকে প্রদত্ত এক মহা সুযোগ। রেমন্ডের বাহিনী তো একেবারেই ক্ষুদ্র! কদিন আগেই রেমন্ডের বাহিনী এশিয়া মাইনর অঞ্চলে কিলিজ আরসালান ও কুমুশতেগিন বিন দানিশমান্দের হাতে পরাজিত হয়েছে। অবশেষে দুই নেতা ইবনে আম্মারকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে রওনা হন! (৬০২)
যদিও দাক্কাক, জানাহুদ্দৌলা ও ইবনে আম্মারের সম্মিলিত মুসলিম বাহিনী রেমন্ডের বাহিনীর চেয়ে অনেক গুণ বড় ছিল; কিন্তু রেমন্ড তাদেরকে পরাজিত করে বিচ্ছিন্ন করে দিতে সক্ষম হন। বরং ঐতিহাসিক ইবনুল আছিরের ভাষ্যমতে এই কয়েকশ সৈন্য নিয়েই রেমন্ড মুসলিম বাহিনীর সাত হাজার সৈন্যকে হত্যা করেন! ইবনে আম্মারের বাহিনী পালিয়ে ত্রিপোলির অভ্যন্তরে আশ্রয় নেয় আর দাক্কাক ও জানাহুদ্দৌলার বাহিনী পালিয়ে নিজ নিজ অঞ্চলে ফিরে যায়। রেমন্ড যুদ্ধ শেষে আবারও ত্রিপোলি অবরোধ করেন। এই পরিস্থিতির মধ্যেই ইবনে আম্মার রেমন্ডকে জিজিয়া প্রদানের প্রস্তাব দিলে রেমন্ড তা মেনে নেন। কারণ, তিনি জানতেন—এত অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে ত্রিপোলির পতন ঘটানো কার্যত অসম্ভব। এরপর ১১০২ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ বা এপ্রিল মাসে রেমন্ড নিজ ঘাঁটি তারতুসে ফিরে আসেন। (৬০৩)
রেমন্ড কিন্তু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য তারতুসে ফিরে আসেননি। তিনি ফিরে এসেছেন তার সৈন্যদের নতুন অভিযানের জন্য প্রস্তুত করতে। আর তাই ফিরে আসার কদিন পরই ১১০২ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসেই তিনি হিমস নগরীর অধিভুক্ত তুবান ও আকরাদ দুর্গসহ বেশ কিছু দুর্গ দখলের লক্ষ্যে বেরিয়ে পড়েন। (৬০৪) ইতিপূর্বে জানাহুদ্দৌলার বাহিনীর পালিয়ে যাওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি দুর্গগুলো অবরোধ করে হামলা শুরু করেন। রেমন্ড যখন দুর্গগুলো অবরোধে ব্যস্ত, তখনই হিমস নগরীতে এমন এক দুর্যোগ সংঘটিত হয়, যা দ্বারা তৎকালীন মুসলিম উম্মাহর অধঃপতনের পরিমাণ কিছুটা হলেও আন্দাজ করা যায়।
আলেপ্পোর শাসক রিজওয়ান ও হিমসের শাসক জানাহুদ্দৌলা হুসাইন বিন মালাইবের মধ্যে পূর্ব থেকেই বিরোধ জিইয়ে ছিল। হুসাইন বিন মালাইব যদিও রিজওয়ান বিন তুতুশের মাকে বিয়ে করেছিলেন; কিন্তু রিজওয়ান এমন কঠিন ও দুর্যোগপূর্ণ সময়ে অমার্জনীয় এক অপরাধ করে বসেন। তিনি তার মায়ের পতি ও হিমসের অধিপতি জানাহুদ্দৌলাকে হত্যা করেন। এ জাতীয় গুপ্তহত্যায় সিদ্ধহস্ত শিয়া ইসমাইলি বাতিনি সম্প্রদায়ের তিনজন গুপ্তঘাতকের মাধ্যমে রিজওয়ান এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। ৪৯৫ হিজরি সনে (১১০২ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) জানাহুদ্দৌলা হিমসের জামে মসজিদে নামাজ আদায়কালে নিহত হন! (৬০৫)
নিঃসন্দেহে এটি অত্যন্ত গর্হিত এক অপরাধ!
অপরাধের ভয়াবহতা কেবল অন্যায়ভাবে একজন মুসলমানের প্রাণহরণ কিংবা নামাজ চলাকালে মসজিদের অভ্যন্তরে গুপ্তহত্যার কারণে নয়, অপরাধ কেবল এতটুকু নয় যে, রিজওয়ান তার মায়ের পতিকে হত্যা করেছেন; বরং অপরাধের ভয়াবহতা এই বিবেচনায়ও যে, তা উম্মাহর এই চরম কঠিন ও দুর্যোগপূর্ণ সময়ে সংঘটিত হয়েছে!
হিমস যে তখন রেমন্ডের বাহিনীর মোকাবিলা করছিল, রিজওয়ান সেদিকে মোটেও ভ্রুক্ষেপ করেননি; ভ্রুক্ষেপ করেননি দেশটি তখন যে সংকটে নিপতিত হয়েছিল সেদিকেও। তিনি এ বিষয়টি ভেবে দেখেননি যে, শাসককে হারিয়ে হিমস আরও কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে। দাম্ভিক রিজওয়ান শুধু নিজের প্রতিশোধস্পৃহা চরিতার্থ করতে চেয়েছেন! তার প্রতিহিংসার শিকার হয়ে হিমস এক কঠিন ও সঙ্গিন মুহূর্তে হয়ে পড়ে নেতৃত্বহারা।
রেমন্ড এই ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে পূর্ণ অবগত ছিলেন। তিনি দ্রুত তার বাকি সৈন্যদের নিয়ে সরাসরি হিমসে চলে আসেন এবং পতন ঘটানোর লক্ষ্যে নগরীটি অবরোধ করেন। (৬০৬) নিরুপায় হিমসবাসী দামেশকের অধিপতি দাক্কাকের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করে। দাক্কাক একে রাজ্য বিস্তৃতির সুবর্ণ সুযোগ বিবেচনা করে তার বাহিনী নিয়ে হিমস অভিমুখে রওনা হন। রেমন্ড যখন দেখতে পান যে, অচিরেই তিনি হিমস ও দামেশকের বাহিনীর মাঝে অবরুদ্ধ হয়ে পড়তে যাচ্ছেন, তখন তিনি অবরোধ প্রত্যাহার করে তারতুসে ফিরে যান। এদিকে দাক্কাক হিমসে পৌঁছে নগরীটিকে নিজ রাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করে নেন। এটি ১১০২ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসের ঘটনা। এরপর দাক্কাক তার জনৈক সেনাপতি তুগতেকিনকে হিমসে প্রশাসক নিযুক্ত করে নিজে দামেশকে ফিরে আসেন। (৬০৭)
এর মাধ্যমে আবারও এ অঞ্চলে তুলনামূলক স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরে আসে। রেমন্ড ত্রিপোলি অবরোধের প্রস্তুতি নিতে সৈন্য বৃদ্ধির কাজে ব্যস্ত থাকায় আপাতত কিছু দিন শান্ত থাকেন। দাক্কাকও রেমন্ডের শান্তভাবে নিশ্চিন্ত হয়ে নিশ্চুপ থাকেন এবং রেমন্ডের বিরুদ্ধে আক্রমণ করা বা তাকে উত্তেজিত করার চেষ্টা হতে সম্পূর্ণ বিরত থাকেন। যেন রেমন্ড যে ভূখণ্ডের ওপর হাত রেখেছেন, তা তার অধিকারে পরিণত হয়েছে এবং এমন বিষয়ে পরিণত হয়েছে, যা মেনে নেওয়া অত্যাবশ্যক!
টিকাঃ
৫৯৬. Matthieu d' Edesse (Doc. Ar. 1), p. 27.
৫৯৭. Albert d' Aix, pp. 582-683.
৫৯৮. Heyd: op. cit., 1, p. 139.
৫৯৯. Archer: Op. cit., p. 156.
৬০০. Raoul de Caen, p. 708.
৬০*. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৫৫।
৬০২. প্রাগুক্ত, ৯/৫৫।
৬০৩. প্রাগুক্ত, ৯/৫৫ ও Raoul de Caen, p. 707.
৬০৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৫৫-৫৬ ও Stevenson: op. cit., p. 54.
৬০৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৫৬ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৪৬।
৬০৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৫৬।
৬০৭. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৪৭।
📄 নতুন করে উবায়দিদের আত্মপ্রকাশ
আমরা আবারও বাইতুল মুকাদ্দাসের আলোচনায় ফিরে আসছি। ১১০১ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বরে প্রথম রামলার যুদ্ধে উবায়দিদের পরাজয়ের পর ইতিমধ্যে কয়েক মাস কেটে গেছে। রামলার পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে উবায়দিরা আবারও বিশাল এক বাহিনী নিয়ে ফিলিস্তিনে আগমন করে এবং ১১০২ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে আসকালানে অবতরণ করে। অর্থাৎ প্রথম যুদ্ধের বিপর্যয়ের পর ইতিমধ্যে আট মাসের অধিক সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। এবার উবায়দি বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন উজির আফজাল বিন বদর আল-জামালির পুত্র শারফ আল-মাআলি। বোঝাই যাচ্ছে, উবায়দি প্রশাসন এবারের অভিযানকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। (৬০৮)
সংবাদ পেয়ে বাইতুল মুকাদ্দাস সাম্রাজ্যের রাজা ১ম বল্ডউইন জাফা অঞ্চলে তার কয়েক হাজার সৈন্যকে সমবেত করেন। এরপর তিনি জাফা ও রামলার মধ্যবর্তী অঞ্চলে অনুসন্ধানমূলক তৎপরতার উদ্দেশ্যে বের হন। তার সঙ্গে তখন মাত্র দুইশ সৈন্য ছিল। আকস্মিকভাবে উবায়দিরা সেখানে তাদের ওপর হামলা চালায়। অপ্রত্যাশিত হামলায় ক্রুসেডার সৈন্যরা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে এবং অনিচ্ছাসত্ত্বেও আকস্মিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ক্রুসেডার বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্য নিহত হয়; বাকিরা পালিয়ে কিছু জাফায় এবং কিছু রামলায় চলে যায়। সেনাপতি বল্ডউইন নিজে পালিয়ে রামলায় চলে যান। এটি ১১০২ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসের ১৭ তারিখের ঘটনা। (৬০৯)
এরপর উবায়দি বাহিনী বল্ডউইনকে হত্যা করার জন্য রামলা অবরোধ করে। কিন্তু বল্ডউইন রাতের অন্ধকারে রামলা থেকে পালিয়ে জাফা অভিমুখে রওনা হন। উবায়দি বাহিনীর হাতে রামলার পতন ঘটে। (৬১০) এরপর উবায়দিরা জাফা অবরোধের উদ্দেশ্যে একটি দ্রুতগামী বাহিনী প্রেরণ করে। (৬১১) বল্ডউইনও তৎক্ষণাৎ পথ পরিবর্তন করে জাফার উত্তরে আরসুফে চলে যান। (৬১২) এরপর তিনি আরসুফে অবস্থানকারী ক্রুসেডারদের সমবেত করেন এবং তাদেরকে নিয়ে জাফায় অবস্থানরত ক্রুসেডার বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য সমুদ্রপথে জাফায় চলে আসেন। পাশাপাশি তিনি প্রচুর সৈন্য ও তীর্থযাত্রী নিয়ে ইংল্যান্ড থেকে আগত দুইশ জাহাজবিশিষ্ট একটি নৌবহরের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করেন। উপকূলীয় অঞ্চলে উবায়দি জাহাজসমূহের উপস্থিতি সত্ত্বেও বল্ডউইন সমুদ্রপথে জাফায় প্রবেশ করতে সক্ষম হন। এরপর তিনি নগরীর অভ্যন্তরে তার বাহিনীকে বিন্যস্ত করতে শুরু করেন। (৬১৩) মে মাসের ২৭ তারিখে বল্ডউইন উবায়দি বাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য ক্রুসেডার বাহিনী নিয়ে জাফার নগরপ্রাচীরের বাইরে বেরিয়ে আসেন। পরিতাপের বিষয়, অল্প সময়ের যুদ্ধের পর উবায়দি বাহিনী চূড়ান্তরূপে পরাজিত হয়। উবায়দি বাহিনীকে পরাভূত করতে ক্রুসেডার বাহিনীকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রাণক্ষয়ও করতে হয়নি। পরাজিত উবায়দি বাহিনীর সৈন্যরা পালিয়ে আসকালানে ফিরে যায়।(৬১৪) আট মাসের মধ্যে টানা দ্বিতীয় পরাজয়ে উবায়দি সাম্রাজ্যের সামরিক সংকট আরও ঘনীভূত হয় আর ফিলিস্তিন অঞ্চলে ক্রুসেডারদের কর্তৃত্ব আরও সুদৃঢ় অবস্থান লাভ করে।
টিকাঃ
৬০৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৬৮।
৬০৯. প্রাগুক্ত, ৯/৬৮ ও Albert d' Aix, p. 593.
৬১০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৬৮ ও Foucher de chartres, p. 402.
৬১১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৬৮।
৬১২. Albert d' Aix, p. 595.
৬১৩. Michaud: op. cit. 11, p. 30 & Runciman: op. cit., 11, 79-80.
৬১৪. Foucher de chartres, pp. 404-405 & Guillaume: de Tyr, p. 435.