📄 ক্রুসেডারদের দুর্যোগ
রেমন্ডের নেতৃত্বে নবগঠিত ক্রুসেডার বাহিনীটি এখন মুসলিম তুর্কিদের রাজ্যের গভীরতম অংশে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। সুতরাং দেখার বিষয় — এ অঞ্চলের মুসলিম শাসক গাজি কুমুশতেগিনের প্রতিক্রিয়া কী হয়? আর যিনি কোনিয়া নগরীকে নিজ ঘাঁটি নির্ধারণ করেছিলেন, সেই কিলিজ আরসালানই-বা কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন?
গাজি সঠিক পদক্ষেপই গ্রহণ করেন। তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রোমান সেলজুক সুলতান কিলিজ আরসালানের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করেন। কিলিজ আরসালানও তাকে নিরাশ না করে দ্রুত সৈন্যসমাবেশ ঘটান এবং নিজ বাহিনী নিয়ে গাজির সঙ্গে মিলিত হন। বরং এরপর তাদের দুজনের সঙ্গে আলেপ্পোর অধিপতি রিজওয়ান বিন তুতুশের কিছু সৈন্যও যোগ দেয়! (৫৭৫)
দীর্ঘদিন ধরে যেসব নেতা পরস্পর বিবাদ ও সংঘাতে জড়িয়ে ছিল, তাদের এই হঠাৎ সম্মিলন ছিল নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর ঘটনা। মূলত যখন তারা অনুভব করে যে, অচিরেই এক বিরাট দুর্যোগ তাদের ওপর নেমে আসতে যাচ্ছে, বিশেষত এই বিশাল বাহিনীর সদস্যসংখ্যা দুই লক্ষাধিক, তখন অনেকটা নিরুপায় হয়েই তারা একজোট হতে বাধ্য হয়!
যদিও চলমান ইতিহাস কোনো শুভ বার্তাবাহী ছিল না, যদিও অন্তরগুলো পরিুদ্ধ-পরিচ্ছন্ন ছিল না; কিন্তু ঐক্য এমনই এক কল্যাণকর গুণ, তা যেমনই হোক না কেন নিশ্চিত সুফল বয়ে আনে। ঐক্য ও অবিচ্ছিন্নতা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে না হয়, তাহলে তার সুফল যদিও হয় ক্ষণস্থায়ী ও সাময়িক; কিন্তু তা-ও বিচ্ছিন্নতা ও বিবাদ-বিসংবাদের চেয়ে উত্তম। একই কথা প্রযোজ্য এসব নেতার ক্ষেত্রেও। তারা যদিও এমন কিছু করেননি, যা আমাদের পূর্ণ আশ্বস্ত করতে পারে, তবে তারা কিছু একটা করতে সক্ষম হয়েছেন; বরং উল্লেখযোগ্য একটি কাজই করতে পেরেছেন। আর এই শাশ্বত সোনালি মূলনীতি তো কার্যকর সর্বযুগেই—
يَدُ اللَّهِ مَعَ الْجَمَاعَةِ» আল্লাহ তাআলার নুসরত ও সাহায্য ঐক্যবদ্ধ জামাতের সঙ্গে থাকে। (৫৭৬)
টিকাঃ
৫৭৫. রানচিমান, তারীখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৪৩।
৫৭৬. ইমাম তিরমিজি, সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২১৬৬ (ইমাম তিরমিজি হাদিসটিকে হাসান-গরিব বলেছেন।) ও ইমাম ইবনে হিব্বান আল-বুসতি, সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৪৫৭৭।
📄 ঐক্যবদ্ধ মুসলিম বাহিনীর পদক্ষেপ
কিলিজ আরসালানের বাহিনী ক্রুসেডার বাহিনীর আগে আগে চলতে থাকে। এরপর ক্রুসেডার বাহিনীকে আরও সামনে অগ্রসর হতে প্রলুব্ধ করতে হঠাৎ করেই তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হওয়ার ভান করে এবং পলায়নের মতো করে সরে পড়তে শুরু করে। পলায়নের সময় সেলজুকরা পথের আশেপাশের বিভিন্ন শস্যক্ষেত্রের ফসলে আগুন লাগিয়ে দেয়, পানির কূপগুলো মাটি ফেলে ভরাট করে দেয় এবং খাদ্য বা যেকোনো রসদ সংগ্রহের সকল উৎস নষ্ট করে দেয়। উদ্দেশ্য ক্রুসেডার বাহিনীর যেন কোনো ধরনের রসদপত্র সংগ্রহের সুযোগ না থাকে।
একে তো জুলাই মাসের প্রচণ্ড উত্তপ্ত আবহাওয়া, তার ওপর দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের ভোগান্তিকর পাথুরে পথ; আর তাই দীর্ঘ পথ চলতে চলতে একসময় ক্রুসেডাররা ক্লান্তশ্রান্ত হতে শুরু করে। (৫৭৭) এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেলজুকরা ক্রুসেডার বাহিনীর সঙ্গে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছিল এবং পথ চলাকালেই শত্রুপক্ষের শক্তি ক্ষয় করার উদ্দেশ্যে মাঝেমধ্যেই হামলা করে দ্রুত সটকে পড়ছিল। এর ফলে ক্রুসেডাররা মানসিকভাবেও অস্থির-উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। সেনাপতি রেমন্ড আরও একবার ক্রুসেডারদের বনু দানিশমান্দের ভূখণ্ডের গভীরে প্রবেশ করার সংকল্প থেকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু শাম অঞ্চলের যুদ্ধে বোহেমন্ডকে নিজেদের নেতা হিসেবে পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর ক্রুসেডাররা তাকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা চালানোর সিদ্ধান্তে অটল থাকে!
পথ চলতে চলতে একসময় ক্রুসেডাররা হালিস নদী (The Halys River) পাড়ি দিয়ে বনু দানিশমান্দের শাসনাধীন অঞ্চলে প্রবেশ করে। এরপর তারা পূর্ব দিকে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখে হালিস নদী ও আমাসিয়া নগরীর প্রায় মাঝামাঝি পথে মুরসিফান নগরীতে পৌঁছায়। (৫৭৮) এ সময় তুর্কি গোয়েন্দারা উপলব্ধি করে যে, ক্রুসেডাররা ক্লান্তির সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে। এবার তুর্কিরা ক্রুসেডার বাহিনীর জন্য এক বিপজ্জনক ফাঁদ পাতে। শুরু হয় ভয়াবহ সংঘর্ষ!
কৃষ্ণসাগর কনস্টান্টিনোপল সিনোপ আঙ্কারা আমাসিয়া মুরসিফান ট্রাবজোন নিকিয়া দোরিলায়ুম এন্টিয়ক কোনিয়া তোকাত কায়সারিয়া আরযুররুম সিভাস মালাতিয়া আনতালিয়া হিরাক্লিয়া তারসুস এন্টিয়ক লাতাকিয়া আদানা মপসুয়েসটিয়া মারআশ ইসকানদারুন আলেপ্পো কিননাসরিন ভূমধ্যসাগর মাআ'ররাতুন- নোমান
মানচিত্র নং-২০ মুরসিফানের যুদ্ধ
ক্রুসেডার যোদ্ধারা যদিও সংখ্যায় ছিল প্রচুর, তারপরও লড়াইয়ে দু-পক্ষের মাঝে ভারসাম্য ছিল না। কারণ, ক্রুসেডাররা ক্ষুৎপিপাসা, ভীতি ও প্রচণ্ড গরমের কারণে শোচনীয় অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল। তা ছাড়া তাদের বাহিনীতে ছিল প্রচুর সংখ্যক সামরিক অভিজ্ঞতাহীন কৃষকশ্রেণির জনগণ। আর অভিজ্ঞ-অনভিজ্ঞ সকলেই এ অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি ও পথঘাট সম্পর্কে ছিল অজ্ঞ। আর তাই বলা যায় যে, যুদ্ধ কেবল এক পক্ষ থেকেই হচ্ছিল!
মুসলমানরা মুরসিফানের যুদ্ধে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হয়। ক্রুসেডার বাহিনীর প্রায় চার-পঞ্চমাংশ সৈন্য নিহত হয়, বাকিদের অধিকাংশই বন্দি হয়। ৪র্থ রেমন্ডসহ অল্প কয়েকজন রাজন্য আত্মরক্ষা করতে সমর্থ হয়। তারা যখন দেখতে পায় যে, যুদ্ধপরিস্থিতি ক্রুসেডার বাহিনীর প্রতিকূলে চলে গেছে, তখন রুদ্ধশ্বাসে পালিয়ে একেবারে কনস্টান্টিনোপলে গিয়ে থামে! (৫৭৯)
মুরসিফানের যুদ্ধ ছিল ক্রুসেডার বাহিনীর জন্য এক চরম দুর্যোগ। কেবল এক লক্ষ ষাট হাজারের অধিক যোদ্ধাপুরুষের পতন নয়, তাদের সঙ্গী হয়ে আসা অসংখ্য নারী ও শিশুর মৃত্যু নয়, প্রচুর যুদ্ধাস্ত্র ও সম্পদের হানি নয়;(৫৮০) বরং এই শোচনীয় পরাজয়ের কারণে ক্রুসেডাররা নিজেদের সামরিক খ্যাতি ও প্রভাবও হারিয়ে ফেলে। এটি ১১০১ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টের শুরুর দিকের ঘটনা।
টিকাঃ
৫৭৭. Runciman: op. cit., 11, pp. 22.
৫৭৮. রানচিমান, তারীখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৪৪।
📄 হিরাক্লিয়ার প্রথম ও দ্বিতীয় যুদ্ধ
অবশ্য মুরসিফানের পরাজয়ই চলমান পরিস্থিতিতে ক্রুসেডারদের সর্বশেষ দুর্যোগ ছিল না। এরই মধ্যে কনস্টান্টিনোপলে ক্রুসেডারদের আরেকটি বাহিনী এসে পৌঁছায়। ফ্রান্স থেকে আগত বাহিনীটি ছিল পনেরো হাজার অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্যের সমন্বয়ে গঠিত। বাহিনীটির নেতৃত্বে ছিলেন নেভার্স (Nevers)-এর কাউন্ট ২য় উইলিয়াম (William II) ।(৫৮১) মুরসিফানের যুদ্ধ চলাকালে এই বাহিনী এসে পৌঁছায়। ২য় উইলিয়াম তার বাহিনী নিয়ে এশিয়া মাইনর অঞ্চলে চলে আসেন এবং অতি সহজে আঙ্কারায় পৌঁছে যান। প্রথম ক্রুসেডার বাহিনীটি কোন পথে অগ্রসর হয়েছে, তা ২য় উইলিয়ামের জানা ছিল না। যেহেতু প্রথম বাহিনীটির অধিকাংশ সদস্য ইতিমধ্যে নিহত হয়েছিল, আর যারা বেঁচে পালাতে পেরেছিল, তারাও সোজা উত্তরে রওনা হয়েছিল, তাই কাউন্ট উইলিয়ামের পক্ষে তা জানার সুযোগও ছিল না। (৫৮২) অবশেষে তিনি তার বাহিনী নিয়ে দক্ষিণে হিরাক্লিয়া অভিমুখে অগ্রসর হন। যথাসময়ে নতুন এই ক্রুসেডার বাহিনীর আগমন-সংবাদ জোটবদ্ধ মুসলিম বাহিনীর কাছে পৌঁছে যায়। তারা এবার দ্রুত হিরাক্লিয়া অভিমুখে রওনা হয়। মুরসিফানের যুদ্ধে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করায় মুসলিম বাহিনীর আত্মবিশ্বাস ও মনোবলের পারদ তখন অনেক উঁচুতে।
১১০১ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টের শেষ দিকে হিরাক্লিয়ায় উভয় বাহিনী মুখোমুখি হয়। পূর্বের যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করলে এবারের লড়াই ছিল মুসলিম বাহিনীর জন্য অনেকটা সামরিক অনুশীলন-ভ্রমণের ন্যায়! আর তাই যুদ্ধ শুরু হয়ে অল্প সময় অতিবাহিত না হতেই পুরো ক্রুসেডার বাহিনী নিঃশেষ হয়ে যায়। বাহিনীর সেনাপতি নেভার্সের কাউন্ট ২য় উইলিয়াম ও তার বিশেষ ছয়জন অনুচর বাদে সকলেই এ যুদ্ধে নিহত হয় ! (৫৮৩) যেহেতু এর দুই সপ্তাহেরও কম সময় পর একই স্থানে আরেকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়, তাই পার্থক্যকরণের জন্য ইতিহাসে এ যুদ্ধ 'প্রথম হিরাক্লিয়ার যুদ্ধ' নামে খ্যাত।
হিরাক্লিয়ার দ্বিতীয় যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ শুরু হয় এই দুর্ভাগা ক্রুসেডার বাহিনীর দ্বিতীয় অংশ পৌঁছার মধ্য দিয়ে। কনস্টান্টিনোপলে এবার ফ্রান্স ও জার্মানি থেকে ষাট হাজার যোদ্ধার একটি বাহিনী এসে পৌঁছায়। বাহিনীটির নেতৃত্বে ছিলেন আকুইতিন অঞ্চলের ডিউক ৯ম উইলিয়াম (William IX Duke of Aquitaine) ও ব্যাভারিয়া (Bavaria) অঞ্চলের ডিউক ৪র্থ ওয়াল্ফ। (৫৮৪) বাহিনীটি কোনিয়া অতিক্রম করে সরাসরি হিরাক্লিয়া অভিমুখে অগ্রসর হয়। মুসলিম বাহিনী তাদের সঙ্গে হুবহু প্রথম বাহিনীর সঙ্গে প্রয়োগকৃত কৌশল অবলম্বন করে এবং পথে ফল-ফসল, পানি ও অন্যান্য রসদ সংগ্রহের উৎসগুলো ধ্বংস করে দেওয়ার পর ধীরে ধীরে ক্রুসেডারদের হিরাক্লিয়ার দিকে টেনে আনে। ক্রুসেডার বাহিনী ক্ষুৎপিপাসা ও ক্লান্তির চরম সীমায় পৌঁছে অবশেষে সেপ্টেম্বরের শুরুতে হিরাক্লিয়ায় পৌঁছায়। (৫৮৫) যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কিছুক্ষণ অতিবাহিত না হতেই এ বাহিনীটিও পূর্বের দুই বাহিনীর পরিণতি বরণ করে। পুরো বাহিনীটি ধ্বংস হয়ে যায় আর সেনাপতি ও রাজন্যবর্গ কোনোমতে জান বাঁচিয়ে এন্টিয়কে পালিয়ে যায়! (৫৮৬)
তিনটি যুদ্ধেরই এক অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হলো-বাহিনীগুলোর সেনাপতিগণ অসহায় সৈন্যদের অশুভ ও মন্দ পরিণতি বরণের জন্য ফেলে রেখে নিজেরা পলায়নের পথ খুঁজে নিয়েছিল!
যে বাহিনী অভিযানে বের হয় স্বার্থের খোঁজে, যে বাহিনীর নেতা ও সেনাপতি অগ্রসর হয় প্রবৃত্তির চাহিদা ও সাম্রাজ্যবাদের লালসা পূরণে, যুগে যুগে সর্বযুগে তাদের প্রকৃতি ও পরিণতি এমনই হয়! দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে সংঘটিত এই তিনটি যুদ্ধে ক্রুসেডাররা প্রায় আড়াই লক্ষ যোদ্ধাপুরুষ হারায়। বন্দি হয় প্রচুর, প্রভূত সম্পদহানিও হয়। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা চলমান প্রেক্ষাপটে অসংখ্য প্রভাব সৃষ্টি করে থাকে। আর তাই আমরা এখানে ইতিহাসের ধারাবিবরণী কিছুক্ষণের জন্য স্থগিত রেখে এই গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলোর লাভ-ক্ষতি পর্যালোচনা এবং চলমান ঘটনাপ্রবাহে যুদ্ধগুলোর প্রভাব নিয়ে কিছুটা আলোচনা করা সমীচীন মনে করছি।
১. যুদ্ধতিনটিতে জয়লাভ করায় কেবল এশিয়া মাইনর অঞ্চল নয়; বরং পুরো ইসলামি বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের মুসলমানদের মনোবল বৃদ্ধি পায়। মুসলমানরা এমন একটি বিজয়ের প্রতীক্ষায় ছিল, যার ফলে হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে আসবে এবং ক্রুসেডারদের শক্তিমত্তা তাদের সামনে তুচ্ছ বিবেচিত হবে। এই সমুন্নত মনোবলের যদিও তাৎক্ষণিক কোনো বিশেষ প্রতিক্রিয়া ছিল না; কিন্তু সকলের মনমস্তিষ্কে এই দাবির অসারতা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে, ক্রুসেডাররা অপরাজেয় শক্তি। আর তাই এটি ছিল পরিবর্তনের সূচনার অতি গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ।
২. স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া যায় যে, এই তিনটি যুদ্ধের পর সমকালীন মুসলিম উম্মাহ বিজয়ের কিছু কার্যকারণ উপলব্ধি করতে পেরেছিল। সম্ভবত এসব কার্যকারণের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জিহাদ ও ঐক্য।
কারণ, এটি একটি অনস্বীকার্য বাস্তবতা যে, অত্যাচারী-জবরদখলকারীদের প্রতি আক্রমণাত্মক না হয়ে তাদেরকে তুষ্ট করার চেষ্টার মাধ্যমে কখনোই হৃত অধিকার ফিরে পাওয়া যায় না। অধিকার ফিরে পাওয়া যায় না সমঝোতার গোলটেবিল বৈঠকে কিংবা প্রাচ্য-পশ্চিমের নেতৃবৃন্দের মধ্যস্থতায়; হৃত অধিকার ফিরে পাওয়া যায় একমাত্র দুঃসাহসী প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি দৃঢ়তা ও সহনশীলতা, শ্রেয়তর ধৈর্য ও উপযুক্ত প্রস্তুতি এবং শক্তি ও সামর্থ্যের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে। এই তিনটি যুদ্ধের পদক্ষেপগুলোতে আমাদের সামনে এ সবকিছুই সুষ্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয়।
কিলিজ আরসালান ও গাজি কুমুশতেগিনের মধ্যকার ঐক্যই মুসলিম বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করেছিল, তাদেরকে সঠিক লক্ষ্যপানে পরিচালিত করেছিল, শত্রুদের ভীত-সন্ত্রস্ত করেছিল এবং তাদের অন্তর্জগতে প্রকম্পন সৃষ্টি করেছিল। আর এ সবকিছুর সমন্বয়ে রচিত হয়েছিল এক দৃশ্যমান বিজয়।
৩. পরিতাপের বিষয় হলো, ক্রুসেড আগ্রাসনের একেবারে গোড়ার দিকের মতো এবারও আমরা সেলজুক ও দানিশমান্দ বাহিনীর সদস্যদের মাঝে ইসলামি আদর্শের সুস্পষ্ট কোনো ছাপ অবলোকন করিনি। ইতিহাস গ্রন্থগুলোতেও তাদের শাহাদাত ও জান্নাতলাভের বাসনার কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না। তারা মূলত জাতিগত ও ভূখণ্ডগত দৃষ্টিকোণ থেকেই সবকিছু বিবেচনা করেছিল। তাদের কাছে এসব যুদ্ধ ছিল নিজেদের ভূখণ্ড, ঘরবাড়ি ও সহায়-সম্পত্তি রক্ষার লড়াই। আর এ ধরনের মনোভাব নিয়ে যুদ্ধ করলে যদিও ক্ষেত্রবিশেষে বিজয় অর্জিত হয়; কিন্তু সে বিজয় হয় সাময়িক ও ক্ষণস্থায়ী। কারণ, আল্লাহ তাআলা কেবল তাদেরকেই চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ বিজয় দান করেন, যারা তার পথে লড়াই করে এবং নিজেদের পূর্ণ মনোযোগ একমাত্র আল্লাহর প্রতি নিবদ্ধ রাখে। আলোচ্য যুদ্ধগুলোতে তুর্কিরা যে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করছিল, তার অন্যতম প্রমাণ হচ্ছে, তারা অর্জিত বিজয়কে কাজে লাগিয়ে অধিকৃত ইসলামি নগরীগুলো পুনরুদ্ধারের কোনো চেষ্টাই করেনি। অথচ বিশেষ করে এন্টিয়ক ও এডেসা ক্রুসেড রাজ্য ছিল তাদের ভূখণ্ডের অতি নিকটে।
৪. প্রতিটি বিজয় যদিও অত্যন্ত মহান ছিল, ছিল উজ্জ্বল ও তৃপ্তিদায়ক; কিন্তু শাম অঞ্চলের তৎকালীন মুসলিম নেতৃবৃন্দের চোখে যেন পট্টি বাঁধা ছিল। আর তাই না তারা এই বিজয়ের মাহাত্ম্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে, না বিজয়ের কার্যকারণসমূহ উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছে। ক্রুসেডাররা এত বিপুল সংখ্যক জনবল হারিয়ে কঠিন সংকটে নিপতিত হলেও তারা একে কাজে লাগানোর চিন্তা করেনি এবং নিজেদের মাতৃভূমি ও ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের চেষ্টাও করেনি।
৫. এই যুদ্ধগুলোর পর এশিয়া মাইনর অঞ্চলের তুর্কিরা সেখানকার নগরীগুলোতে কর্তৃত্ব বিস্তারে মনোযোগী হয়। কিলিজ আরসালান এশিয়া মাইনরের মধ্যাঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন এবং কোনিয়াকে নিজের রাজধানী নির্ধারণ করেন। (৫৮৭) অপরদিকে গাজি কুমুশতেগিন বিন দানিশমান্দ পূর্বাঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় জোর দেন এবং মালাতিয়ার পতন ঘটিয়ে নিজের অধিকারে নিয়ে নেন। (৫৮৮)
৬. এই যুদ্ধগুলোর ফলে ক্রুসেডার শক্তির সামনে কনস্টান্টিনোপল থেকে শাম অভিমুখী স্থলপথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এ সময় থেকে নিয়ে খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতকের শেষ দিকে জার্মান সম্রাট ফ্রেডেরিক বারবারোসা (Frederick Barbarossa)-এর আমল পর্যন্ত প্রায় পূর্ণ এক শতাব্দী পথটি তাদের জন্য রুদ্ধ ছিল। (৫৮৯) এর দ্বারাই অনুমান করা যায় যে, জিহাদ ও প্রতিরোধের পতাকা যখন উত্তোলিত হয়, মুসলিম উম্মাহর শত্রুদের অন্তর্জগতে তখন কী পরিমাণ ভয়-ডর-শঙ্কা সৃষ্টি হয়।
৭. শাম অভিমুখী স্থলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কনস্টান্টিনোপলে ও শামের বিভিন্ন নৌবন্দরে রসদপত্র, সামরিক সরঞ্জাম ও সৈন্য সহায়তা পৌঁছানোর জন্য ভূমধ্যসাগরে জাহাজের আনাগোনা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। আর যেহেতু এসব জাহাজের অধিকাংশই ছিল ইতালিয়ান প্রজাতন্ত্রগুলোর মালিকানাধীন, তাই স্বাভাবিকভাবেই আগামী দিনগুলোতে ক্রুসেড যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহে ইতালির প্রজাতন্ত্রগুলোর ভূমিকা যে অত্যন্ত প্রভাবক বিবেচিত হবে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। (৫৯০)
৮. মুসলমানদের এসব বিজয়ের ফলে শামে আগে থেকেই অবস্থানরত ক্রুসেডারদের মাঝে গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়। এ কারণেই তাদের সাম্রাজ্যবাদী অভিযানের ধারা স্থগিত হয়ে পড়ে এবং তারা নিজেদের দখলে থাকা ভূখণ্ড রক্ষা করতে পেরেই তুষ্ট থাকে। বিশেষত ক্রুসেডারদের উপর্যুপরি পরাজয় পশ্চিম ইউরোপে অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং সেখান থেকে যোদ্ধা সংগ্রহ করার গির্জা-প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
৯. পরপর তিন-তিনটি যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের কারণে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য উপলব্ধি করে যে, এশিয়া মাইনরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তুর্কিদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর মতো শক্তি বাইজান্টাইন বাহিনীর নেই। এ কারণেই তখন থেকে নিয়ে ছয় বছর পর কিলিজ আরসালানের মৃত্যু পর্যন্ত তারা এশিয়া মাইনর অঞ্চলে কোনো বাহিনী পাঠানোর চেষ্টা করেনি।
১০. এই বিজয়ের অত্যন্ত দুঃখজনক একটি নেতিবাচক ফল হলো, দুই তুর্কি শাসকপরিবার সেলজুক ও বনু দানিশমান্দ এই বিজয়ের পর পরস্পর প্রচণ্ড সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং উভয় পক্ষই অপর পক্ষের ক্ষতিসাধনে তৎপর হয়ে ওঠে। আল্লাহ তাআলা কিছু সময়ের জন্য তাদেরকে ঐক্যের যে নিয়ামত দান করেছিলেন, তারা তার মূল্য অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়। প্রত্যেক পক্ষ নিজেদের সম্প্রসারণমূলক চাহিদা বাস্তবায়নের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। যেহেতু এশিয়া মাইনর অঞ্চলের পরিধি ছিল সীমিত, তাই এক পক্ষের সম্প্রসারণ নীতি অপর পক্ষের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়াই ছিল অবশ্যম্ভাবী। যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে অর্জিত প্রচুর পরিমাণ সম্পদও উভয় পক্ষকে ইসলামি নীতি-আদর্শের কথা ভুলিয়ে দিয়ে পার্থিব সম্পদ অর্জনের প্রতি প্ররোচিত করতে অন্যতম কার্যকারণের ভূমিকা পালন করেছিল। (৫৯১)
তবে ব্যাপকভাবে এই যুদ্ধগুলোর কারণে এশিয়া মাইনর অঞ্চল ক্রুসেড যুদ্ধের চলমান ঘটনাপ্রবাহ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ক্রুসেডাররা যেমন দীর্ঘ দিনের জন্য তাদের পরিকল্পনা থেকে এ অঞ্চলকে বাদ দিয়ে দেয়, এ অঞ্চলের মুসলিম অধিবাসীগণও অধিকৃত শাম ও ফিলিস্তিন অঞ্চলসহ অন্যান্য ইসলামি ইস্যুকে নিজেদের বিবেচনার বাইরে রেখে দেয়। আল-কুদস ও অধিকৃত অন্যান্য ইসলামি নগরী যেন ফিলিস্তিন ও শাম অঞ্চলের মুসলমানদের একান্ত অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে পরিণত হয়। অন্যান্য অঞ্চলের মুসলমানদের যেন এ বিষয়ে কোনো দায়-দায়িত্বই নেই। নিঃসন্দেহে এটি বোধ ও উপলব্ধির অনেক বড় ঘাটতি ও শিথিলতা এবং দ্বীন ও শরিয়তের স্বভাব-প্রকৃতি হতে বড় ধরনের দূরত্ব!
টিকাঃ
৫৭৯. Albert d' Aix, pp. 569-607 &Foucher de chartres, p. 377.
৫৮০. Albert d' Aix, pp. 571-572. ইবনুল আছির উল্লেখ করেছেন যে, তিন লক্ষ ক্রুসেডারের মধ্য হতে মাত্র তিন হাজার সৈন্য জীবিত ফিরতে পেরেছিল। তারা আহত অবস্থায় পালিয়ে গিয়েছিল। দেখুন: আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৯।
৫৮১. Setton :vol 1, p. 358, Oman: vol 1, p.242.
৫৮২. Albert d' Aix, pp. 576-578.
৫৮৩. Albert d' Aix, pp. 575-578.
৫৮৪. Matthieu d' Edesse(Hist. Arm. 1), p. 59.
৫৮৫. Setton: op. cit. 1, pp. 361-362.
৫৮৬. Foucher de chartres, p. 399 & Guibert de Nogent, p. 243.
৫৮৭. রানচিমান, তারীখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৪৭।
৫৮৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৯, ইবনুল ইবরি, তারীখু মুখতাসারিদ দুওয়াল, পৃষ্ঠা: ১২৬ ও Cahen: La Syrie du Nord: p. 232.
৫৮৯. Grousset: Hist. des Croisades, 1, pp. 332-333.
৫৯০. Runciman; op. cit., 11, p. 30.
৫৯১. Gamb. Hist. of Byzantine Empire vol IV prt, 1, p. 741.
📄 উবায়দিদের ব্যর্থ তৎপরতা
আবারও শাম ও ফিলিস্তিনে প্রতিষ্ঠিত ক্রুসেড রাজ্যগুলোতে ফিরে আসছি। নতুন আগত ক্রুসেডার বাহিনীগুলোর শোচনীয় পরাজয়ের সংবাদ বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছার পূর্বে সেখানকার রাজা ১ম বল্ডউইন তার নতুন রাজ্যের প্রশাসনিক বিন্যাসে ব্যস্ত ছিলেন। এরই মধ্যে দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয় উবায়দি বাহিনী!
পূর্বেই আমরা উল্লেখ করে এসেছি যে, উবায়দি সাম্রাজ্য ক্রুসেডারদের সঙ্গে রাষ্ট্রবণ্টনের সমঝোতায় আগ্রহী ছিল। তাদের চাওয়া ছিল শাম থাকবে ক্রুসেডারদের ভাগে আর ফিলিস্তিন উবায়দি সাম্রাজ্যের ভাগে। কিন্তু ক্রুসেডাররা এ প্রস্তাবে তুষ্ট না হয়ে একের পর এক নগরী দখল করতে করতে পুরো ফিলিস্তিনই নিজেদের অধিকারে নিয়ে নেয়। ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে তারা বাইতুল মুকাদ্দাসের পতন ঘটায়। নিঃসন্দেহে এসব ঘটনা ছিল উবায়দি সাম্রাজ্যের পরিকল্পনা ও লালসার সঙ্গে সম্পূর্ণই সাংঘর্ষিক। অবশ্য স্বাভাবিকভাবেই তাদের ক্রোধ ও অসন্তোষ আল-কুদস নগরী ও মসজিদুল আকসার পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ হওয়ায় বা অন্য কোনো ইসলামি আত্মমর্যাদাবোধের কারণে ছিল না; তাদের অসন্তোষ ছিল নিজেদের সাম্রাজ্যবাদ ও কর্তৃত্ববাদের চাহিদায় বাধা সৃষ্টি হওয়ায় এবং উবায়দি সাম্রাজ্যের সরাসরি পূর্ব সীমান্তসংলগ্ন ফিলিস্তিন অঞ্চলে ক্রুসেডারদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উবায়দি সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হওয়ায়।
এর প্রায় দুই বছর পর ১১০১ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে উবায়দিরা ১ম বল্ডউইনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা করে এবং সাদুদ্দৌলা আল-কাওয়াসির নেতৃত্বে একটি বিরাট বাহিনী ফিলিস্তিনে প্রেরণ করে। সাদুদ্দৌলা ইতিপূর্বে বৈরুতের প্রশাসক ছিলেন। (৫৯২) উবায়দি বাহিনী আসকালানে শিবির স্থাপন করে। পূর্বেও আমরা জেনেছি যে, আসকালান তখন উবায়দিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আসকালানে পৌঁছে উবায়দি বাহিনী ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ লড়াই শুরু করার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। কিন্তু এটি সুস্পষ্ট যে, উবায়দি বাহিনীর পদক্ষেপ অত্যন্ত ধীরগতির ছিল। প্রস্তুতি নিতেই তারা ছয় মাসের বেশি সময় কাটিয়ে দেয়। অবশেষে ১১০১ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বরের শুরুতে তারা ক্রুসেডারদের মোকাবিলা করতে অগ্রসর হয়। এই বিলম্বের ফলে একদিকে যেমন ক্রুসেডাররা আসন্ন যুদ্ধের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়, অপরদিকে উবায়দিরা ইউরোপীয় ক্রুসেডারদের প্রচণ্ড গরমের মৌসুমে যুদ্ধ করতে বাধ্য করার সুযোগ হারিয়ে ফেলে। (৫৯৩)
১১০১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ সেপ্টেম্বর রামলায় উভয় পক্ষ মুখোমুখি হয়। ইতিহাসে এ যুদ্ধ 'রামলার প্রথম যুদ্ধ' নামে খ্যাত। এক পক্ষে বিশাল উবায়দি বাহিনী, আরেক পক্ষে ১ম বল্ডউইনের নেতৃত্বাধীন ক্ষুদ্র কিন্তু সুবিন্যস্ত ক্রুসেডার বাহিনী। উবায়দিরা যদিও জনবল বিবেচনায় ক্রুসেডারদের চেয়ে অনেক বেশি ছিল; কিন্তু দ্রুতই তারা পরাজিত হয় এবং তাদের সেনাপতি সাদুদ্দৌলা আল-কাওয়াসি যুদ্ধক্ষেত্রেই নিহত হন। (৫৯৪) উবায়দি বাহিনীর প্রচুর সৈন্য নিহত হয়; বাকিরা পালিয়ে সুরক্ষিত আসকালানে আশ্রয় নেয়। তাদের অস্ত্রশস্ত্র, রসদসামগ্রী ও অন্যান্য সামগ্রী সবকিছু ক্রুসেডাররা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে লাভ করে। (৫৯৫)
নিঃসন্দেহে রামলার প্রথম যুদ্ধে পরাজয়ের ঘটনা ছিল মিশরের উবায়দি সাম্রাজ্যের জন্য চরম বেদনাদায়ক আঘাত!
টিকাঃ
৫৯২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৬৭।
৫৯৩. Stevenson: op. cit., pp. 44-45.
৫৯৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৬৭-৬৮।
৫৯৫. Albert d' Aix, p. 553 & Guillaume de Tyr, 1, p. 26.