📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ক্রুসেড রাজ্যগুলোর পরিবর্তিত নতুন পরিস্থিতি

📄 ক্রুসেড রাজ্যগুলোর পরিবর্তিত নতুন পরিস্থিতি


১ম বল্ডউইন বাইতুল মুকাদ্দাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার এবং আশেপাশের পথঘাট নিরাপদ রাখার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি তিনি রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল ও কেন্দ্রের দায়িত্ব তার সহযোগী ও নিকটজনদের মাঝে বণ্টন করে দেন। নিঃসন্দেহে এই নতুন পরিস্থিতি ছিল টেনক্রেডের চাহিদার সম্পূর্ণই বিপরীত। টেনক্রেড ভুলে যাননি যে, তিন বছর পূর্বে ক্রুসেড অভিযানের শুরুর দিকে তিনি এই বল্ডউইনের সঙ্গেই তারসুস নগরীর কর্তৃত্ব নিয়ে বিবাদে জড়িয়েছিলেন। তা ছাড়া টেনক্রেড ক্ষমতার লড়াইয়ে ডেমবার্ট নামক এক পরাজিত ঘোড়ার পক্ষে বাজি ধরেছিলেন। তাই তিনি জানতেন যে, বল্ডউইন তাকে বাইতুল মুকাদ্দাসের অধীনস্থ জালিল অঞ্চলের প্রশাসক পদ হতে অপসারণ করতে কিছুতেই দেরি করবেন না। তখন তো বিস্তৃত স্বপ্নের জাল বোনা টেনক্রেড কঠিন সংকটে নিপতিত হবেন। (৫৫১)

তবে চলমান ঘটনাপ্রবাহ আকস্মিকভাবেই টেনক্রেডের জন্য এক অপ্রত্যাশিত শুভ বার্তা বয়ে নিয়ে আসে। আর তা হলো তার মামার বন্দি হওয়ার ঘটনা! কেউ মোটেও ধারণা করবে না যে, টেনক্রেড তার মামার বন্দি হওয়ার সংবাদ শুনে ব্যথিত হয়েছেন। তাদের মতো করে বললে—বোহেমন্ড নরকে যাক! টেনক্রেডের কী আসে যায়! টেনক্রেড তো নিজের স্বার্থ খুঁজে ফিরছেন; মামার স্বার্থ নয়। ইতিপূর্বেও আমরা দেখেছি যে, তিনি তার শক্তিশালী মামার রাজত্ব থেকে দূরে কোথাও নিজের জন্য রাজত্বের সন্ধানে এন্টিয়কে তার মামাকে ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যাওয়াকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। আর তাই যখন তার কাছে মামার বন্দি হওয়ার সংবাদ পৌঁছায় এবং সঙ্গে পৌঁছায় এন্টিয়কের নরম্যান বাহিনীর প্রেরিত একটি বার্তা, যাতে তাকে বোহেমন্ড মুক্ত হওয়া পর্যন্ত এন্টিয়কের অন্তর্বর্তীকালীন শাসকের দায়িত্ব গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে, তখন তিনি কালবিলম্ব না করে তাতে সাড়া দেন। এ তো একদিকে বাইতুল মুকাদ্দাসে সৃষ্ট নতুন পরিস্থিতি হতে দূরে সরে যাওয়ার সুযোগ, অপরদিকে নিজের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুবর্ণ সুযোগ। টেনক্রেড চলে যাওয়ায় ১ম বল্ডউইনও যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন। তিনি তো কোনো ধরনের সমস্যা বা সংঘাত ছাড়াই তার অপছন্দের এক প্রশাসক থেকে রেহাই পেলেন!(৫৫২)

এভাবেই ১১০১ খ্রিষ্টাব্দের শুরুতে ১ম বল্ডউইন নির্বাচিত হন বাইতুল মুকাদ্দাস সাম্রাজ্যের রাজা, টেনক্রেড নির্বাচিত হন এন্টিয়কের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসক আর বল্ডউইন ডি বুর্গ লাভ করেন এডেসার প্রশাসনিক দায়িত্ব। ৪র্থ রেমন্ড তখনও ত্রিপোলি অঞ্চলে কোনো রাজ্য প্রতিষ্ঠার আশায় ঘুরে ফিরছেন। ওদিকে বোহেমন্ড আছেন গাজি বিন দানিশমান্দের হাতে বন্দি।

এসব জটিল ও উত্তেজনাকর ঘটনাপ্রবাহ অধ্যয়নের সময় স্বাভাবিকভাবেই বারংবার আমাদের মনে এই প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, মুসলমানরা তখন কোথায় ছিল?!

নিঃসন্দেহে ক্রুসেডারদের এই চরম সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি ছিল মুসলমানদের আপন ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের এবং ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে পরিণত হয়ে একক লক্ষ্যপানে অগ্রসর হওয়ার এক অপূর্ব সুযোগ। কিন্তু হায় আফসোস! প্রবৃত্তির চাহিদা যে শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত! মুসলমানদের মাঝে এমন কোনো নিষ্ঠাবান নেতা ছিলেন না, যিনি তাদেরকে এক সুতোয় গেঁথে ঐক্যবদ্ধ করবেন এবং শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করবেন। ফলে একের পর এক সুযোগ নষ্ট হতে থাকে; মুসলমানরা লাঞ্ছনা ও হীনতা, তুচ্ছতা ও অপদস্থতার জীবন অতিবাহিত করতে থাকে। যে তিক্ত বাস্তবতাকে সকলে পুরোপুরি অপছন্দ করে, মুসলমানরা তা-ই মেনে নেয়। অন্যায়-অবিচার অপসারণ এবং যাবতীয় অনাচারের মূলোৎপাটনের কোনো ঝোঁক ও প্রবণতাই সমকালীন মুসলিমসমাজের মাঝে স্পন্দিত হয়নি।

এভাবেই কাটতে থাকে দিন, মাস ও বছরের পর বছর। ক্রুসেডাররা দুরারোগ্য ব্যাধির ন্যায় দুর্বল ইসলামি দেহে আরও ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং ক্ষতিসাধন করতে থাকে।

চলমান পরিস্থিতিতে ক্রুসেডাররা যখন দেখতে পায় যে, মুসলমানরা মোটেও উত্তেজিত হচ্ছে না; বরং তাদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আলোচনায় বসতে চাচ্ছে এবং ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার চুক্তি করতে সচেষ্ট হচ্ছে, তখন তারা নিজেদের রাজ্যপরিধি সম্প্রসারণ এবং মুসলমানদের সংকটকে সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজে লাগাতে সচেষ্ট হয়।

বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা ১ম বল্ডউইন নিজের সামরিক শক্তি যাচাই, পথ অনুসন্ধান ও নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজ সৈন্যদের মানিয়ে নিতে আল-কুদস নগরীর আশেপাশে দ্রুত কয়েকটি সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। প্রথমেই তিনি তার বাহিনী নিয়ে আরসুফ অবরোধ করেন। ইতালির জেনোভা হতে আগত একটি নৌবহরের সহায়তায় অল্প কদিনের অবরোধের পরই তার হাতে আরসুফ নগরীর পতন ঘটে। (৫৫৩) এরপর তিনি অবরোধ করেন কায়সারিয়া নগরী। এ নগরীটিরও পতন ঘটে। (৫৫৪) পতনের পরই কায়সারিয়া নির্মম গণহত্যার শিকার হয়; প্রচুর মুসলিম নাগরিক নির্বিচারে নিহত হয়। (৫৫৫) বরং কায়সারিয়ার নাগরিকরা যখন নগরীর মসজিদে আশ্রয় নেয়, তখন ক্রুসেডাররা বল্ডউইনের নেতৃত্বে তাদের পিছু নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করে এবং নারী-পুরুষ-শিশু যাদেরকে পায়, নির্বিচারে হত্যা করে। মুসলিম নারী-পুরুষের রক্তে মসজিদটি এক বিরাট রক্ত-পুকুরে পরিণত হয়! (৫৫৬) হ্যাঁ, এই বল্ডউইনকেই কিছু কিছু ইতিহাসগ্রন্থে 'প্রাজ্ঞ' অভিধায় ভূষিত করা হয়েছে!

নেতা বোহেমন্ডকে হারিয়ে এন্টিয়ক রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়েছে—আশেপাশের কেউ এ ধরনের চিন্তা করার পূর্বেই অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসক টেনক্রেডও তার সম্প্রসারণমূলক তৎপরতার অনুশীলন করতে দ্রুত বের হন। টেনক্রেড হিংস্রতা ও বর্বরতা, শক্তি ও রণদক্ষতা এবং সামরিক অভিজ্ঞতা কোনো দিক থেকেই তার মামা বোহেমন্ডের চেয়ে কম ছিলেন না। (৫৫৭) তিনি অল্প কয়েক মাসের মধ্যে এন্টিয়কের উত্তরে কিলিকিয়া অঞ্চলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি নগরী দখল করতে সক্ষম হন। নগরীগুলো হলো তারসুস (Tarsus), আদানা (Adana) ও মপসুয়েসটিয়া (Mopsuestia)। নগরী-তিনটি ইতিপূর্বে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের দখলে ছিল। এরপরই তিনি এন্টিয়কের দক্ষিণে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দর লাতাকিয়া অবরোধ করেন। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, এক বছরের অধিক সময় পূর্বে বোহেমন্ডও লাতাকিয়া নৌবন্দর অবরোধ করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে মৈত্রী-বন্ধনে আবদ্ধ রেমন্ডের চাপে অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। এখন টেনক্রেড কিছুতেই 'বয়োবৃদ্ধ' বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের লাভ-ক্ষতি বিবেচনায় আনবেন না। তিনি লাতাকিয়ার পতন ঘটাতে নগরীটিকে ঘিরে তার সৈন্যদের নিয়োজিত করেন। (৫৫৮) বাস্তবেও লাতাকিয়ার পতন ঘটে, তবে প্রায় দুই বছর পর!

এডেসা রাজ্যের নতুন প্রশাসক বল্ডউইন ডি বুর্গই-বা বসে থাকবেন কেন?! মুসলিম নগরী সারুজে হামলা চালিয়ে তিনিও তার তৎপরতা শুরু করেন। হাসানকেইফের (Hasankeyf) মুসলিম প্রশাসক সুকমান বিন উরতুক এডেসার প্রাক্তন শাসক ১ম বল্ডউইন বাইতুল মুকাদ্দাসে চলে যাওয়ার পর সারুজ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালিয়েছিলেন। (৫৫৯) তবে পরিতাপের বিষয়, তিনি এ অঞ্চলের অন্যান্য মুসলিম প্রশাসকের কোনো সহযোগিতা পাননি। প্রচণ্ড যুদ্ধের পর বল্ডউইন ডি বুর্গ তার বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন। সারুজে গণহত্যা চালানো হয় এবং প্রচুর সংখ্যক মুসলিম নাগরিককে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয়। (৫৬০)

বাইতুল মুকাদ্দাস সাম্রাজ্য ও দুই ক্রুসেড রাজ্য এন্টিয়ক ও এডেসার যখন এই পরিস্থিতি, আরেক ক্রুসেডার সেনাপতি ৪র্থ রেমন্ড তখন কী করছেন?! রেমন্ড টেনক্রেডকে লাতাকিয়া থেকে অবরোধ তুলে নিতে চাপ প্রয়োগ করেও ব্যর্থ হন। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, রেমন্ড বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের স্বার্থের অনুকূলে লাতাকিয়ায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। টেনক্রেডের কাছে নতি স্বীকার করে রেমন্ড এবার লাতাকিয়া ছেড়ে কনস্টান্টিনোপলে চলে যান এবং সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোসের সঙ্গে লাতাকিয়া পুনরুদ্ধারের পদ্ধতি নিয়ে বৈঠকে বসেন। (৫৬১) তবে এরই মধ্যে আকস্মিকভাবে এমন এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়, যা সকলের হিসাবনিকাশই বদলে দেয় এবং সকলের স্বপ্ন ও পরিকল্পনাই এলোমেলো হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়!

ক্রুসেড অভিযানে যোগ দেওয়ার জন্য পশ্চিম ইউরোপ থেকে নতুন করে বিশাল বিশাল বাহিনী রওনা হতে থাকে। ইউরোপিয়ানরা ইসলামি ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে তিনটি ক্রুসেড রাজ্য প্রতিষ্ঠার সংবাদ জানতে পেরেছিল। তারা শুনেছিল-ক্রুসেডার বাহিনী সেখানে প্রচুর ধনসম্পদ ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ লাভ করেছে। ইউরোপিয়ানরা জানতে পেরেছিল যে, ক্রুসেডারদের হাতে একে একে ইসলামি নৌবন্দরগুলোর পতন ঘটছে এবং ইতালিয়ান বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রের নৌবহরগুলো বাণিজ্যচুক্তির মাধ্যমে ব্যাপক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করছে। সবচেয়ে বড় কথা-তারা জানতে পেরেছিল যে, অপ্রত্যাশিতভাবে মুসলমানরা নতজানু হয়ে পড়েছে এবং পরস্পর বিবাদ-বিসংবাদ ও গৃহদ্বন্দ্বে জড়িয়ে আছে। এ সবকিছু জানতে পেরে অতি সুলভ 'মিরাছ সম্পত্তি' লাভ করার জন্য প্রচুর সংখ্যক ইউরোপীয় জনগণ এ অঞ্চলে ছুটে আসতে প্ররোচিত হয়েছিল!(৫৬২)

টিকাঃ
৫৫১. Setton: op. cit. 1, p. 381.
৫৫২. Albert d' Aix, pp. 537-538.
৫৫০. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৩৯।
৫৫৪. আবুল মাহাসিন, আন-নুজুমুয যাহিরা, ৫/১৬৭।
৫৫৫. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৩৯ ও Foucher de chartres, pp. 389-390.
৫৫৬. Albert d' Aix, pp. 453-454.
৫৫৭. Runciman: op. cit., 11, p. 32.
৫৫৮. Runciman: op. cit., 11, p. 33.
৫৫৯. Grousset: Hist. des Croisades, 1, pp. 363.
৫৬০. Matthieu d' Edesse (Doc. Arm 1), pp. 53-54.
৫৬১. Raoul de Caen, pp. 706-707.
৫৬২. দেখুন: মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখু সালাজিকাতির রূম ফী আসিয়াস সুগরা, পৃষ্ঠা: ৯৬।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ইউরোপের নতুন জাগরণ

📄 ইউরোপের নতুন জাগরণ


১১০১ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে বিশাল এক কাফেলা কনস্টান্টিনোপলে এসে পৌঁছায়।(৫৬৩) প্রথমে কনস্টান্টিনোপলে উপস্থিত হয় ইতালির উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত লোমবারদি (Lombardy) অঞ্চলের একটি বাহিনী। বাহিনীটির নেতৃত্বে ছিলেন মিলান নগরীর প্রধান বিশপ আনসেল্ম (Anselm)।

জার্মানি ফ্রান্স ইতালি কৃষ্ণসাগর কনস্টান্টিনোপল ভূমধ্যসাগর

মানচিত্র নং-১৯ ৪৯৪ হিজরি সনে/১১০১ খ্রিষ্টাব্দে আগত নতুন ক্রুসেডার বাহিনীসমূহ

বাহিনীটির সঙ্গে যদিও আলবার্ট, জিওবার্ট ও হিউম্যানসহ ইতালিয়ান রাজন্য ও সামন্তদের একটি দলও ছিল, (৫৬৪) তবে অধিকাংশ সদস্যই ছিল কৃষক ও সাধারণ জনগণ। প্রচুর নারী ও শিশুও বাহিনীটিতে ছিল।

বাহিনীটিকে তুলনা করা যেতে পারে ধর্মযাজক পিটার ও কাঙাল ওয়ালটারের বাহিনীর সঙ্গে। (৫৬৫) আমাদের নিশ্চয়ই স্মরণ আছে যে, ইসলামি ভূখণ্ড অভিমুখে প্রথম সামরিক বাহিনীটি প্রেরিত হয়েছিল পোপের প্রতিনিধি ও ফ্রান্সের লি-পিউ অঞ্চলের বিশপ অ্যাডমারের নেতৃত্বে। এরপর দ্বিতীয় একটি বাহিনী প্রেরণ করা হয়েছিল পিসার প্রধান বিশপ ডেমবার্টের নেতৃত্বে। এবার মিলানের প্রধান বিশপ আনসেল্মের নেতৃত্বে প্রেরিত হচ্ছে বর্তমান সহায়ক বাহিনীটি। এ তথ্য দ্বারা আমাদের সামনে ইসলামি ভূখণ্ডে বাহিনী প্রেরণে গির্জার নীতি ও ভূমিকা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়।

আনসেল্মের নেতৃত্বাধীন বাহিনীটি কনস্টান্টিনোপল পৌঁছেই তৎকালীন ইউরোপীয় জনগণের অভ্যাস অনুযায়ী ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও রাহাজানি শুরু করে দেয়। বাধ্য হয়ে সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস কালবিলম্ব না করে তাদেরকে বসফরাস প্রণালি পার করিয়ে এশিয়া মাইনর অঞ্চলে পাঠিয়ে দেন। অন্যান্য বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করতে লোমবারদি অঞ্চলের বাহিনীটি নিকিয়া অভিমুখে অগ্রসর হয়। (৫৬৬) এরপর সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস রেমন্ডের সঙ্গে এ বিষয়ে একমত হন যে, এ অঞ্চলে দীর্ঘদিনের অবস্থান এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থাকায় রেমন্ডই নতুন এই বাহিনীটির নেতৃত্ব দেবেন। (৫৬৭) এর মাধ্যমে সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যে, নতুন বাহিনীটি যেন টেনক্রেড, ১ ম বল্ডউইন বা অন্য কারও স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়ে বাইজান্টাইনদের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়!

এক মাস বা সামান্য বেশি সময় অতিবাহিত হওয়ার পর ক্রুসেডারদের আরেকটি দল এসে পৌঁছায়। এ দলটি বিশেষ করে ফ্রান্স ও জার্মানি থেকে এসেছিল। (৫৬৮) তারা নিকিয়ায় পৌঁছে প্রথম দলটির সঙ্গে মিলিত হয়। এই সম্মিলিত ক্রুসেডার বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ছিল সর্বনিম্ন অনুমান অনুসারে দুই লক্ষ! ঐতিহাসিক ইবনুল আছিরের ভাষ্যমতে তাদের সংখ্যা ছিল তিন লক্ষ! (৫৬৯)

৪র্থ রেমন্ডের নেতৃত্বে সুবিশাল বাহিনীটি শামে অবস্থানরত ক্রুসেডারদের সঙ্গে মিলিত হতে দোরিলায়ুম অভিমুখে অগ্রসর হয়। সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোসের আগ্রহও এমনই ছিল। তিনি এ অঞ্চলের যেসব নগরীতে বাইজান্টাইনদের কর্তৃত্ব ছুটে গিয়েছিল, সেগুলোতে পুনঃকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছিলেন। (৫৭০) ওদিকে রেমন্ড চাচ্ছিলেন এই বিশাল বাহিনীর সহায়তায় ত্রিপোলির পতন ঘটিয়ে সেখানে নিজের স্বপ্নের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে। তবে লোমবারদি হতে আগত বাহিনীটি রেমন্ডের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং পুরো বাহিনীকে নিয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে দানিশমান্দ পরিবারের শাসিত অঞ্চলে যুদ্ধ করার মনস্থ করে। তাদের লক্ষ্য ছিল বিখ্যাত নরম্যান সেনাপতি বোহেমন্ডকে মুক্ত করে আনা। (৫৭১) আমরা এ তথ্যটি হয়তো ভুলে যাইনি যে, লোমবারদির এই বাহিনীটি ছিল বন্দি বোহেমন্ডের দেশ ইতালি থেকে আগত। রেমন্ড যখন তাদেরকে অবগত করেন যে, কৃষ্ণসাগরের উপকূলে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত সুরক্ষিত নিকসার দুর্গে বন্দি বোহেমন্ডকে মুক্ত করা বেশ কঠিনসাধ্য হবে, (৫৭২) তখন বিশপ আনসেল্মের নেতৃত্বাধীন লোমবারদির বাহিনী তা প্রত্যাখ্যান করে রেমন্ডকে জানিয়ে দেয় যে, তারা যদি বোহেমন্ডকে মুক্ত করতে ব্যর্থ হয়, তবুও অন্তত বনু দানিশমান্দের শাসিত অঞ্চলের অতি গুরুত্বপূর্ণ দুই নগরী আমাসিয়া (Amasya) ও সিভাস (Sivas)-এর ধ্বংস সাধন তো করতে পারবে। (৫৭৩) সম্মিলিত বাহিনীটির বৃহৎ অংশের পীড়াপীড়ির সামনে রেমন্ড নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন এবং গতিপথ পরিবর্তন করে উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হন। ১১০১ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসের শেষ দিকে ক্রুসেডার বাহিনী আঙ্কারায় (Ankara) পৌঁছায় এবং অতি সহজে নগরীটি দখল করে নেয়। এরপর তারা আরও উত্তরে অগ্রসর হয়ে কাস্তামনু (Kastamonu) নগরীতে পৌঁছায়। (৫৭৪)

টিকাঃ
৫৬৩. Setton: vol.pp. 343-367.
৫৬৪. Albert d' Aix, p. 559.
৫৬৫. যাবুরূফ, আসসালিবিয়ুনা ফিশ-শারক্ব, পৃষ্ঠা: ১২৭-১২৯ ও Anna Comnena, pp. 355-356.
৫৬৬. Albert d' Aix, pp. 561-562.
৫৬৭. রানচিমান, তারীখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৩৯-৪০।
৫৬৮. Albert d' Aix, pp. 562-563.
৫৬৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৯।
৫৭০. Albert d' Aix, pp. 560-562.
৫৭১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৯।
৫৭২. Setton: op. cit. 1, pp. 35.
৫৭৩. Grousset: Hist. des Croisades, 1, pp. 324-325.
৫৭৪. Runciman: op. cit., 11, pp. 22.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ক্রুসেডারদের দুর্যোগ

📄 ক্রুসেডারদের দুর্যোগ


রেমন্ডের নেতৃত্বে নবগঠিত ক্রুসেডার বাহিনীটি এখন মুসলিম তুর্কিদের রাজ্যের গভীরতম অংশে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। সুতরাং দেখার বিষয় — এ অঞ্চলের মুসলিম শাসক গাজি কুমুশতেগিনের প্রতিক্রিয়া কী হয়? আর যিনি কোনিয়া নগরীকে নিজ ঘাঁটি নির্ধারণ করেছিলেন, সেই কিলিজ আরসালানই-বা কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন?

গাজি সঠিক পদক্ষেপই গ্রহণ করেন। তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রোমান সেলজুক সুলতান কিলিজ আরসালানের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করেন। কিলিজ আরসালানও তাকে নিরাশ না করে দ্রুত সৈন্যসমাবেশ ঘটান এবং নিজ বাহিনী নিয়ে গাজির সঙ্গে মিলিত হন। বরং এরপর তাদের দুজনের সঙ্গে আলেপ্পোর অধিপতি রিজওয়ান বিন তুতুশের কিছু সৈন্যও যোগ দেয়! (৫৭৫)

দীর্ঘদিন ধরে যেসব নেতা পরস্পর বিবাদ ও সংঘাতে জড়িয়ে ছিল, তাদের এই হঠাৎ সম্মিলন ছিল নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর ঘটনা। মূলত যখন তারা অনুভব করে যে, অচিরেই এক বিরাট দুর্যোগ তাদের ওপর নেমে আসতে যাচ্ছে, বিশেষত এই বিশাল বাহিনীর সদস্যসংখ্যা দুই লক্ষাধিক, তখন অনেকটা নিরুপায় হয়েই তারা একজোট হতে বাধ্য হয়!

যদিও চলমান ইতিহাস কোনো শুভ বার্তাবাহী ছিল না, যদিও অন্তরগুলো পরিুদ্ধ-পরিচ্ছন্ন ছিল না; কিন্তু ঐক্য এমনই এক কল্যাণকর গুণ, তা যেমনই হোক না কেন নিশ্চিত সুফল বয়ে আনে। ঐক্য ও অবিচ্ছিন্নতা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে না হয়, তাহলে তার সুফল যদিও হয় ক্ষণস্থায়ী ও সাময়িক; কিন্তু তা-ও বিচ্ছিন্নতা ও বিবাদ-বিসংবাদের চেয়ে উত্তম। একই কথা প্রযোজ্য এসব নেতার ক্ষেত্রেও। তারা যদিও এমন কিছু করেননি, যা আমাদের পূর্ণ আশ্বস্ত করতে পারে, তবে তারা কিছু একটা করতে সক্ষম হয়েছেন; বরং উল্লেখযোগ্য একটি কাজই করতে পেরেছেন। আর এই শাশ্বত সোনালি মূলনীতি তো কার্যকর সর্বযুগেই—

يَدُ اللَّهِ مَعَ الْجَمَاعَةِ» আল্লাহ তাআলার নুসরত ও সাহায্য ঐক্যবদ্ধ জামাতের সঙ্গে থাকে। (৫৭৬)

টিকাঃ
৫৭৫. রানচিমান, তারীখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৪৩।
৫৭৬. ইমাম তিরমিজি, সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২১৬৬ (ইমাম তিরমিজি হাদিসটিকে হাসান-গরিব বলেছেন।) ও ইমাম ইবনে হিব্বান আল-বুসতি, সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৪৫৭৭।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ঐক্যবদ্ধ মুসলিম বাহিনীর পদক্ষেপ

📄 ঐক্যবদ্ধ মুসলিম বাহিনীর পদক্ষেপ


কিলিজ আরসালানের বাহিনী ক্রুসেডার বাহিনীর আগে আগে চলতে থাকে। এরপর ক্রুসেডার বাহিনীকে আরও সামনে অগ্রসর হতে প্রলুব্ধ করতে হঠাৎ করেই তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হওয়ার ভান করে এবং পলায়নের মতো করে সরে পড়তে শুরু করে। পলায়নের সময় সেলজুকরা পথের আশেপাশের বিভিন্ন শস্যক্ষেত্রের ফসলে আগুন লাগিয়ে দেয়, পানির কূপগুলো মাটি ফেলে ভরাট করে দেয় এবং খাদ্য বা যেকোনো রসদ সংগ্রহের সকল উৎস নষ্ট করে দেয়। উদ্দেশ্য ক্রুসেডার বাহিনীর যেন কোনো ধরনের রসদপত্র সংগ্রহের সুযোগ না থাকে।

একে তো জুলাই মাসের প্রচণ্ড উত্তপ্ত আবহাওয়া, তার ওপর দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের ভোগান্তিকর পাথুরে পথ; আর তাই দীর্ঘ পথ চলতে চলতে একসময় ক্রুসেডাররা ক্লান্তশ্রান্ত হতে শুরু করে। (৫৭৭) এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেলজুকরা ক্রুসেডার বাহিনীর সঙ্গে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছিল এবং পথ চলাকালেই শত্রুপক্ষের শক্তি ক্ষয় করার উদ্দেশ্যে মাঝেমধ্যেই হামলা করে দ্রুত সটকে পড়ছিল। এর ফলে ক্রুসেডাররা মানসিকভাবেও অস্থির-উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। সেনাপতি রেমন্ড আরও একবার ক্রুসেডারদের বনু দানিশমান্দের ভূখণ্ডের গভীরে প্রবেশ করার সংকল্প থেকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু শাম অঞ্চলের যুদ্ধে বোহেমন্ডকে নিজেদের নেতা হিসেবে পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর ক্রুসেডাররা তাকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা চালানোর সিদ্ধান্তে অটল থাকে!

পথ চলতে চলতে একসময় ক্রুসেডাররা হালিস নদী (The Halys River) পাড়ি দিয়ে বনু দানিশমান্দের শাসনাধীন অঞ্চলে প্রবেশ করে। এরপর তারা পূর্ব দিকে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখে হালিস নদী ও আমাসিয়া নগরীর প্রায় মাঝামাঝি পথে মুরসিফান নগরীতে পৌঁছায়। (৫৭৮) এ সময় তুর্কি গোয়েন্দারা উপলব্ধি করে যে, ক্রুসেডাররা ক্লান্তির সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে। এবার তুর্কিরা ক্রুসেডার বাহিনীর জন্য এক বিপজ্জনক ফাঁদ পাতে। শুরু হয় ভয়াবহ সংঘর্ষ!

কৃষ্ণসাগর কনস্টান্টিনোপল সিনোপ আঙ্কারা আমাসিয়া মুরসিফান ট্রাবজোন নিকিয়া দোরিলায়ুম এন্টিয়ক কোনিয়া তোকাত কায়সারিয়া আরযুররুম সিভাস মালাতিয়া আনতালিয়া হিরাক্লিয়া তারসুস এন্টিয়ক লাতাকিয়া আদানা মপসুয়েসটিয়া মারআশ ইসকানদারুন আলেপ্পো কিননাসরিন ভূমধ্যসাগর মাআ'ররাতুন- নোমান

মানচিত্র নং-২০ মুরসিফানের যুদ্ধ

ক্রুসেডার যোদ্ধারা যদিও সংখ্যায় ছিল প্রচুর, তারপরও লড়াইয়ে দু-পক্ষের মাঝে ভারসাম্য ছিল না। কারণ, ক্রুসেডাররা ক্ষুৎপিপাসা, ভীতি ও প্রচণ্ড গরমের কারণে শোচনীয় অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল। তা ছাড়া তাদের বাহিনীতে ছিল প্রচুর সংখ্যক সামরিক অভিজ্ঞতাহীন কৃষকশ্রেণির জনগণ। আর অভিজ্ঞ-অনভিজ্ঞ সকলেই এ অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি ও পথঘাট সম্পর্কে ছিল অজ্ঞ। আর তাই বলা যায় যে, যুদ্ধ কেবল এক পক্ষ থেকেই হচ্ছিল!

মুসলমানরা মুরসিফানের যুদ্ধে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হয়। ক্রুসেডার বাহিনীর প্রায় চার-পঞ্চমাংশ সৈন্য নিহত হয়, বাকিদের অধিকাংশই বন্দি হয়। ৪র্থ রেমন্ডসহ অল্প কয়েকজন রাজন্য আত্মরক্ষা করতে সমর্থ হয়। তারা যখন দেখতে পায় যে, যুদ্ধপরিস্থিতি ক্রুসেডার বাহিনীর প্রতিকূলে চলে গেছে, তখন রুদ্ধশ্বাসে পালিয়ে একেবারে কনস্টান্টিনোপলে গিয়ে থামে! (৫৭৯)

মুরসিফানের যুদ্ধ ছিল ক্রুসেডার বাহিনীর জন্য এক চরম দুর্যোগ। কেবল এক লক্ষ ষাট হাজারের অধিক যোদ্ধাপুরুষের পতন নয়, তাদের সঙ্গী হয়ে আসা অসংখ্য নারী ও শিশুর মৃত্যু নয়, প্রচুর যুদ্ধাস্ত্র ও সম্পদের হানি নয়;(৫৮০) বরং এই শোচনীয় পরাজয়ের কারণে ক্রুসেডাররা নিজেদের সামরিক খ্যাতি ও প্রভাবও হারিয়ে ফেলে। এটি ১১০১ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টের শুরুর দিকের ঘটনা।

টিকাঃ
৫৭৭. Runciman: op. cit., 11, pp. 22.
৫৭৮. রানচিমান, তারীখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৪৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00