📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ক্রুসেডারদের হঠাৎ বিপদ!

📄 ক্রুসেডারদের হঠাৎ বিপদ!


মালাতিয়া দখলের নেশায় আচ্ছন্ন বোহেমন্ড এবার গাজি বিন দানিশমান্দের পাতা ফাঁদে আটকা পড়েন। তার সঙ্গে থাকা পাঁচশ সৈন্যও একই ফাঁদে আটকা পড়ে। (৫৩০) সেনাপতি বোহেমন্ডকে দ্রুত শৃঙ্খলিত করা হয়; তার সৈন্যদের অনেককে হত্যা করা হয় আর বাকিদের বন্দি করা হয়! (৫৩১)

নিঃসন্দেহে ক্রুসেড আগ্রাসনের এই দুর্যোগপূর্ণ সময়ে এটি ছিল অনেক মূল্যবান একটি শিকার। এটি ১১০০ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টের শুরুর দিকের ঘটনা। বোহেমন্ড অবশ্য বন্দি হওয়ার পূর্বেই এডেসার শাসক বল্ডউইনের কাছে সাহায্যবার্তা পাঠাতে সক্ষম হন। বার্তা পেয়েই বল্ডউইন মাত্র একশ চল্লিশজন সৈন্যের একটি ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে বোহেমন্ডের সাহায্যার্থে ছুটে আসেন! স্বাভাবিকভাবেই বল্ডউইনেরও একই পরিণতি বরণ করার কথা ছিল। কিন্তু গাজি বিন দানিশমান্দ তার অতি মূল্যবান শিকার নিয়ে দ্রুত মালাতিয়া থেকে সরে আসেন এবং বন্দি নরম্যান সেনাপতিকে দুর্ভেদ্য নিরাপত্তার মাঝে আটকে রাখার জন্য এশিয়া মাইনর অঞ্চলের একেবারে উত্তর প্রান্তে কৃষ্ণসাগরের উপকূলে নিকসার (Niksar) দুর্গে পৌঁছে যান। (৫৩২)

মালাতিয়ায় প্রবেশের পথ উন্মুক্ত পেয়ে বল্ডউইন তার বাহিনী নিয়ে নগরীটিতে প্রবেশ করেন। নগরবাসী তাকে স্বাগত জানায়; স্বাগত জানান নগর-প্রশাসক জিবরিলও। বল্ডউইন দ্রুত মালাতিয়াকে এডেসা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নিজ রাজ্যপরিধি বিস্তৃত করে নেন। প্রমাণ হয়ে যায়—তিনি নির্ভেজাল আন্তরিকতা নিয়ে বোহেমন্ডকে উদ্ধার করতে আসেননি। দুজনের বিরোধ ও দ্বন্দ্ব তো বেশ পুরোনো। এখন তিনি এই ভেবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন যে, ভবিষ্যতে হয়তো এর মাধ্যমে তার কোনো স্বার্থ রক্ষা হবে। তা ছাড়া এটি তো ছিল সাহায্যপ্রার্থী নগরীকে নিজের রাজ্যপরিধিতে যুক্ত করার এক অপূর্ব সুযোগ!

স্বাভাবিকভাবেই বল্ডউইন নিকসার দুর্গ পর্যন্ত তুর্কি দানিশমান্দ বাহিনীর অনুসরণ করার মতো দুঃসাহস দেখানোর চিন্তা করেননি। মালাতিয়ায় নিজ কর্তৃত্বের প্রমাণ হিসেবে এবং নগরীটিকে বশীভূতকরণের দলিল হিসেবে পঞ্চাশজন সৈন্যকে রেখে তিনি নিজে এডেসায় ফিরে যান। (৫৩৩)

টিকাঃ
৫৩০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৯। অবশ্য ইবনুল আছির বোহেমন্ডের সঙ্গে থাকা সৈন্যসংখ্যা নিয়ে অতিরঞ্জন করেছেন।
৫৩১. Grousset: Hist. des Croisades, 1, p. 378.
৫৩২. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২২৩-২২৪ ও Albert d' Aix, p. 525.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 এন্টিয়ক ও বাইতুল মুকাদ্দাসে যুগপৎ প্রশাসনিক শূন্যতা

📄 এন্টিয়ক ও বাইতুল মুকাদ্দাসে যুগপৎ প্রশাসনিক শূন্যতা


বোহেমন্ড বন্দি হওয়ায় এ অঞ্চলে এক বিরাট প্রশাসনিক ও সামরিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়। কারণ, এন্টিয়ক ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজ্য। এন্টিয়ক দখলে আগ্রহী প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যাও ছিল অনেক। একদিকে আছে এশিয়া মাইনর অঞ্চলের সেলজুক মুসলমানগণ, যাদের নেতৃত্বে ছিলেন কিলিজ আরসালান। আরও আছেন আলেপ্পোর আমির রিজওয়ান, যিনি এন্টিয়ককে নিজের অধিকার ও মিরাছ-সম্পদ মনে করতেন! উচ্চাভিলাষী বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যও দীর্ঘকাল ধরে এন্টিয়কের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি দিয়ে রেখেছিল। ওদিকে ৪র্থ রেমন্ডও নিজের জন্য একটি রাজ্যের সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরছিলেন। ইতিপূর্বেও তিনি এন্টিয়কের একচ্ছত্র শাসনক্ষমতা লাভ, নিদেনপক্ষে বণ্টিত ক্ষমতালাভের প্রচণ্ড আগ্রহও প্রকাশ করেছিলেন। তা ছাড়া তৎকালীন এন্টিয়ক রাজ্যের সীমা কেবল এন্টিয়ক নগরীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন নগর-জনপদ ও দুর্গও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এন্টিয়ক ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ, সচ্ছল ও সুরক্ষিত একটি রাজ্য। এই বিশাল রাজনৈতিক শূন্যতা প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোকে স্বাভাবিকভাবেই এক সংঘাতের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।

নতুন করে সংকট সৃষ্টি হওয়ার পূর্বে এবং বিভিন্ন বাহিনী এন্টিয়কের ওপর উন্মাদের ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ার পূর্বে এন্টিয়কে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকারী নরম্যান বাহিনী এখন কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে?

চলমান খেলার অতি গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান একটি ঘুঁটির মালিক হওয়ার পর মুসলিম দানিশমান্দ রাজপরিবারই-বা এখন কী করবে?

সর্বশেষ এই ইতিবাচক পটপরিবর্তনের সামনে দাঁড়িয়ে সাধারণ মুসলিম জনগণই-বা কী করবে? পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে কোনো পক্ষ কিছু ভাবার পূর্বেই বাইতুল মুকাদ্দাসে ঘটে আরেক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা, যা সকলের হিসাবনিকাশ উল্টে দেয় এবং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে!

আকস্মিকভাবে বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক গডফ্রে মারা যান। ফলে এন্টিয়ক সমস্যার সম-আকৃতির সমস্যা এবার বাইতুল মুকাদ্দাসে সৃষ্টি হয়। বরং সম্ভবত এটি ছিল এন্টিয়ক সমস্যার চেয়েও কঠিন সমস্যা!

নিঃসন্দেহে গডফ্রের প্রয়াণ ছিল আল-কুদস নগরীতে সৃষ্ট নতুন এক প্রশাসনিক শূন্যতা, যাকে কেন্দ্র করে ক্রুসেডারদের মাঝে নতুন করে দুর্যোগ সৃষ্টির আশঙ্কা ছিল। কারণ, বিশেষ করে আল-কুদস নগরী নিয়ে মুসলমানদের বাদে খোদ ক্রুসেডারদের নিজেদের মধ্যেই ছিল চরম সংঘাত।

এই আকস্মিক মৃত্যু-ঘটনার সময় টেনক্রেড ও ডেমবার্ট প্রথমে আক্কা, এরপর হাইফা নগরীর অবরোধে ব্যস্ত ছিলেন। (৫৩৪) আমাদের মনে হয়তো প্রশ্ন জাগতে পারে যে, ধর্মীয় নেতা ও গির্জাধ্যক্ষ ডেমবার্ট একটি সামরিক অবরোধে কী করছেন?! তিনি তখন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি নগরী কিংবা মালিকানার জন্য একটি জনপদ খুঁজে ফিরছিলেন। হাইফার অবরোধ চলাকালে তাদের কাছে গডফ্রের মৃত্যুসংবাদ এসে পৌঁছায়। (৫৩৫) টেনক্রেড যখন জানতে পারেন যে, গডফ্রে মৃত্যুর পূর্বেই গোল্ডমার নামক জনৈক ক্রুসেডার সেনাপতিকে হাইফা নগরী প্রদানের নির্দেশ দিয়ে গেছেন, তখন তিনি তার বাহিনী নিয়ে অবরোধ ছেড়ে সরে যেতে উদ্যত হন। (৫৩৬) কিন্তু ডেমবার্ট হাইফা নগরীর পতনের পর তা টেনক্রেডকে প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে থেকে যেতে আশ্বস্ত করেন। ডেমবার্টের এই প্রতিশ্রুতি প্রদানের মাঝে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল যে, তিনি পুরোপুরি বিশ্বাস করতেন— বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসনভার তার হাতেই আসতে যাচ্ছে। বাস্তবেও সামান্য প্রতিরোধের পর হাইফার পতন ঘটে। (৫৩৭) এরপর সকলে বাইতুল মুকাদ্দাসে ফিরে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মীমাংসা করার জন্য-কে হতে যাচ্ছেন বাইতুল মুকাদ্দাসের পরবর্তী শাসক?!

গডফ্রে মাত্র এক বছর বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্য শাসন করেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন পশ্চিম ইউরোপে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী তিনি এমন কোনো বৈধ উত্তরাধিকারী রেখে যেতে পারেননি, যে তার রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করবে। গডফ্রে ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণকারী সামরিক নেতাদের নীতি ও আগ্রহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজকীয় ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী শাসনব্যবস্থা এবং গির্জার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা-এ দুয়ের মাঝামাঝি পদ্ধতিতে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। তার মৃত্যুর পর বড় দুটি শক্তি বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসনক্ষমতা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়ে। (৫৩৮)

প্রথম পক্ষ অর্থাৎ ধর্মীয় গির্জা-শক্তির প্রতিনিধিত্ব করছিলেন আল-কুদসের বিশপ ডেমবার্ট। প্রচণ্ড উচ্চাভিলাষী ডেমবার্ট ছিলেন আল-কুদস নগরীর অভ্যন্তরে সম্ভাব্য অগ্রবর্তী প্রার্থী, ক্রুসেড অভিযানে ইউরোপীয় বাহিনীসমূহের সমন্বয়ক পোপের প্রতিনিধি এবং পবিত্র নগরীর গির্জাধ্যক্ষ। অধিকন্তু বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রশাসনিক পরিস্থিতি ও ক্রুসেডার বাহিনীর ভারসাম্য সম্পর্কেও তার সম্যক ধারণা ছিল। ডেমবার্ট তৎক্ষণাৎ টেনক্রেডের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করেন এবং টেনক্রেড তাকে বাইতুল মুকাদ্দাসের ক্ষমতালাভে সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন। (৫৩৯) এরপর তিনি তার বন্ধু এন্টিয়কের শাসক বোহেমন্ডের কাছে একটি বার্তা পাঠিয়ে তাকে দ্রুত বাইতুল মুকাদ্দাসে আগমন করতে বলেন এবং তার ক্ষমতালাভের পথ পরিষ্কার করার কাজে সহায়তা করতে উদ্বুদ্ধ করেন। (৫৪০) বোহেমন্ডের বন্দি হওয়ার সংবাদ তখনও আল-কুদসে এসে পৌঁছায়নি।

এই হলো বাইতুল মুকাদ্দাসের ক্ষমতার দাবিদার প্রথম পক্ষ। দ্বিতীয় পক্ষে ছিল ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী রাজন্যশ্রেণি। গডফ্রের সৈন্যরা আল-কুদসেই অবস্থান করছিল। তারা সকলে পুরোহিততন্ত্র ও ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করে এবং পরিশ্রম ও ত্যাগের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পর গির্জার হাতে বাইতুল মুকাদ্দাসের ক্ষমতা ছেড়ে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। অপসারিত বিশপ আরনাল্ফ মালকোরনের অনুসারীরা এই পক্ষের পাশে দাঁড়ায় এবং ডেমবার্টের শাসন প্রত্যাখ্যান করে। অথচ ডেমবার্ট ধর্মীয় শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করছিলেন! এখানে কারণ আর কিছুই নয়—ডেমবার্টের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ! অর্থাৎ কোনো নীতি নয়; সবার মাঝে কাজ করছিল ব্যক্তিসংঘাত ও নিজ নিজ উচ্চাভিলাষ পূরণের লালসা। (৫৪¹)

টিকাঃ
৫৩৩. Albert d' Aix, pp. 525-526.
৫৩৪. Tranlatio Sancti Nicolai Veoetian (Hist Occid, Tome V), pp. 272-275.
৫৩৫. Albert d' Aix, p. 527.
৫৩৬. Setton: op. cit. 1, p. 380.
৫৩৭. Grousset: Hist, des Croisades, 1, p. 290.
৫৩৮. Stevenson: op. cit., p. 42.
৫৩৯. Stevenson: op. cit., p. 42.
৫৪০. Guillaume: de Tyr, p. 406; Albert d' Aix, p. 624.
৫৪¹. Albert d’ Aix, p. 526.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 স্বর্ণের তশতরিতে সাজিয়ে রাখা ‘বাইতুল মুকাদ্দাস’!

📄 স্বর্ণের তশতরিতে সাজিয়ে রাখা ‘বাইতুল মুকাদ্দাস’!


প্রশ্ন হচ্ছে—দ্বিতীয় পক্ষ তথা গডফ্রের সৈন্যরা কাকে ক্ষমতা ও নেতৃত্বের জন্য প্রার্থী মনোনীত করবে?!

যেহেতু তারা ছিল ইউরোপে প্রচলিত উত্তরাধিকারী চিন্তার ধারক, তাই তাদের চিন্তা এই ধারায় প্রবাহিত হয় যে, গডফ্রের সবচেয়ে নিকটাত্মীয় কে? তারা চিন্তা করে দেখে যে, এই বিবেচনায় গডফ্রের ভাই ও এডেসা রাজ্যের শাসক বল্ডউইনই বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক পদে গডফ্রের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত! তাদের চিন্তায় একবারের জন্যও উদিত হয়নি টেনক্রেডের কথা, যিনি অতীতে গডফ্রেকে যথেষ্ট সহায়তা করেছেন; বাইতুল মুকাদ্দাস, জাফা ও হাইফা অঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এবং বিভিন্ন জটিল ও কষ্টসাধ্য বিষয়কে আয়ত্তে আনার ক্ষেত্রে পূর্ণ প্রচেষ্টার মাধ্যমে অবদান রেখেছেন। গডফ্রের শাসনামলে তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসের অধীনস্থ জালিল অঞ্চলে গভর্নরের দায়িত্বও পালন করছিলেন। তাদের মানসপটে ৪র্থ রেমন্ডের নামও উদিত হয়নি, যিনি তখনও নিজের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাজ্য খুঁজে ফিরছিলেন। টেনক্রেড ও রেমন্ডের পরিবর্তে তাদের মনোযোগ নিবদ্ধ হয় সেই বল্ডউইনের প্রতি, যিনি তখন প্রত্যক্ষভাবেই এডেসা রাজ্যের শাসক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। গডফ্রের এই সহোদর বাইতুল মুকাদ্দাস পতনের ক্ষেত্রে সামান্য ভূমিকাও রাখেননি!

গডফ্রের সৈন্যরা দ্রুত এডেসায় বল্ডউইনের কাছে একটি গোপন বার্তা প্রেরণ করে এবং তাকে অতিসত্তর বাইতুল মুকাদ্দাসে উপস্থিত হয়ে ক্ষমতার লাগাম হাতে তুলে নিতে অনুরোধ জানায়। (৫৪²) এমন বিনিময়হীন প্রস্তাব বল্ডউইন প্রত্যাখ্যান করবেন কেন? কোথায় এডেসা রাজ্যের ক্ষমতা আর কোথায় পবিত্র নগরী বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসনক্ষমতা! বল্ডউইন তৎক্ষণাৎ তার চাচাতো ভাই বল্ডউইন ডি বুর্গ (Baldwin of Bourg)-এর হাতে এডেসা রাজ্যের দায়িত্ব ছেড়ে দেন এবং তার সহায়তায় একটি শক্তিশালী রেজিমেন্ট রেখে যান; আর নিজে অন্য একটি রেজিমেন্ট নিয়ে দ্রুত ছুটে যান বাইতুল মুকাদ্দাসে। (৫৪3) দামেশকের অধিপতি দাক্কাক পথে তাকে বাধাপ্রদানের চেষ্টা করেন। (৫৪৪) কিন্তু ত্রিপোলির শিয়া শাসক ইবনে আম্মার বল্ডউইনের সহায়তায় অগ্রসর হন এবং নিজেদের যৌথ শত্রু সুন্নি সেলজুক আমির দাক্কাকের মোকাবিলা করেন। (৫৪৫) বল্ডউইন ইবনে আম্মারের সহায়তায় দাক্কাককে পরাজিত করতে সক্ষম হন এবং প্রচুর পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ লাভ করেন! (৫৪৬)

নিঃসন্দেহে তৎকালীন পরিস্থিতি ছিল এমনই ঘৃণ্য ও বেদনাদায়ক!

১১০০ খ্রিষ্টাব্দের ১০ নভেম্বর বল্ডউইন নিরাপদে বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছতে সক্ষম হন।

গডফ্রের সৈন্যরা এবং প্রাক্তন বিশপ আরনল্ডের অনুসারীরা আগে থেকেই বাইতুল মুকাদ্দাসের জনগণকে প্রস্তুত রেখেছিল। বল্ডউইন নগরীতে প্রবেশ করতেই খ্রিষ্টান জনগণ ও সৈন্যগণ বিশাল শোভাযাত্রাযোগে বল্ডউইনকে স্বাগত জানাতে অগ্রসর হয় এবং তাকে দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানায়। তারা তাকে নিজেদের নেতা হিসেবে বরণ করে নেওয়ার সম্মিলিত আগ্রহ প্রকাশ করে! (৫৪৭)

ডেমবার্টের পক্ষে এই আকস্মিক পরিস্থিতি ও বাইতুল মুকাদ্দাসের খ্রিষ্টান জনসাধারণের সমর্থন মোকাবিলা করার সামর্থ্য ছিল না। বিশেষত প্রয়াত গডফ্রের সৈন্যগণ এবং বল্ডউইনের সঙ্গে আগত সৈন্যগণ গির্জার প্রভাবমুক্ত ধর্মনিরপেক্ষ রাজত্ব প্রতিষ্ঠায় তরবারি ব্যবহার করতেও প্রস্তুত ছিল। সবদিক বিবেচনা করে বিশপ ডেমবার্ট শান্তির দিককেই প্রাধান্য দেন এবং বিশপ পদ নিয়ে তুষ্ট থাকেন। (৫৪৮) এবার বল্ডউইনের মাথায় বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজমুকুট পরিয়ে দেওয়া হয়। বল্ডউইন কিন্তু তার ভাইয়ের মতো ভণিতা করেননি! তিনি তার ভাইয়ের মতো 'বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রহরী' উপাধি ধারণ করেননি, ধারণ করেননি অন্যান্য সেনাপতির ন্যায় শাসক-প্রশাসক উপাধি; নিজের জন্য তিনি পছন্দ করেন 'রাজা' উপাধি। এর অর্থ হচ্ছে, তিনি কারও আনুগত্য করবেন না; বরং সকলে তার আনুগত্য করবে। যদিও এখন বাস্তবে তা কার্যকর হবে না; কিন্তু ভবিষ্যতে হয়তো হবে। কারণ, চলমান প্রেক্ষাপটে তিনিই সবচেয়ে শক্তিশালী ক্রুসেডার নেতা এবং তিনিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নগরীর শাসক। এসব দিক বিবেচনা করে তিনি 'বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা' উপাধি ধারণ করেন। এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয় বাইতুল মুকাদ্দাস সাম্রাজ্য (The Kingdom of Jerusalem) আর বল্ডউইন হন সাম্রাজ্যটির প্রথম রাজা। তিনি পরিচিত হন ১ম বল্ডউইন নামে। ১১০০ খ্রিষ্টাব্দের ১১ নভেম্বর বল্ডউইনের শাসনামলের সূচনা হয়। অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে মুকুট পরিধান করানো হয় একই বছরের ২৫ ডিসেম্বর পশ্চিমা ক্যাথলিকদের বড়দিনে। (৫৪৯)

১ম বল্ডউইন যদিও জানতেন যে, ডেমবার্ট তার ক্ষমতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারেন, তবুও আপন বিচক্ষণতাবলে তিনি উপলব্ধি করেন যে, ডেমবার্টকে এখনই তার দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত করা সমীচীন হবে না। তিনি আশঙ্কা করছিলেন যে, এ মুহূর্তে ডেমবার্টকে অপসারণ করলে গির্জায় যে শূন্যতা সৃষ্টি হবে, তিনি হয়তো তা সহজে পূরণ করতে পারবেন না। তা ছাড়া এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে ডেমবার্ট পিসার নৌবহরকে তার বিরুদ্ধে শত্রুতা করতে প্ররোচিত করতে পারেন। অথচ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বল্ডউইনের পিসা-নৌবহরের সমর্থন ও সহায়তা অনেক বেশি প্রয়োজন। (৫৫০)

টিকাঃ
৫৪². Michaud: op. cit. p. 19.
৫৪³. Cam. Med. Hist. Vol. p. 301.
৫৪⁴. Guillaume: de Tyr, p. 410.
৫৪⁵. Estoire d' Eracles, 1, p. 407 & Gesta Francorum, p. 520.
৫৪৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ১/৪৩। অবশ্য বল্ডউইন ও দাক্কাকের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধের বিবরণে ইবনুল আছির এমন সাদামাটা ইঙ্গিত ব্যবহার করেছেন, যাতে পাঠকের মনে হতে পারে যে, দাক্কাক বল্ডউইনকে পরাজিত করেছিলেন।
৫৪৭. Guillaume: de Tyr, p. 410.
৫৪৮. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/২৩২।
৫৪৯. Stevenson: op. cit., p. 44.
৫৫০. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/২৩২।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ক্রুসেড রাজ্যগুলোর পরিবর্তিত নতুন পরিস্থিতি

📄 ক্রুসেড রাজ্যগুলোর পরিবর্তিত নতুন পরিস্থিতি


১ম বল্ডউইন বাইতুল মুকাদ্দাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার এবং আশেপাশের পথঘাট নিরাপদ রাখার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি তিনি রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল ও কেন্দ্রের দায়িত্ব তার সহযোগী ও নিকটজনদের মাঝে বণ্টন করে দেন। নিঃসন্দেহে এই নতুন পরিস্থিতি ছিল টেনক্রেডের চাহিদার সম্পূর্ণই বিপরীত। টেনক্রেড ভুলে যাননি যে, তিন বছর পূর্বে ক্রুসেড অভিযানের শুরুর দিকে তিনি এই বল্ডউইনের সঙ্গেই তারসুস নগরীর কর্তৃত্ব নিয়ে বিবাদে জড়িয়েছিলেন। তা ছাড়া টেনক্রেড ক্ষমতার লড়াইয়ে ডেমবার্ট নামক এক পরাজিত ঘোড়ার পক্ষে বাজি ধরেছিলেন। তাই তিনি জানতেন যে, বল্ডউইন তাকে বাইতুল মুকাদ্দাসের অধীনস্থ জালিল অঞ্চলের প্রশাসক পদ হতে অপসারণ করতে কিছুতেই দেরি করবেন না। তখন তো বিস্তৃত স্বপ্নের জাল বোনা টেনক্রেড কঠিন সংকটে নিপতিত হবেন। (৫৫১)

তবে চলমান ঘটনাপ্রবাহ আকস্মিকভাবেই টেনক্রেডের জন্য এক অপ্রত্যাশিত শুভ বার্তা বয়ে নিয়ে আসে। আর তা হলো তার মামার বন্দি হওয়ার ঘটনা! কেউ মোটেও ধারণা করবে না যে, টেনক্রেড তার মামার বন্দি হওয়ার সংবাদ শুনে ব্যথিত হয়েছেন। তাদের মতো করে বললে—বোহেমন্ড নরকে যাক! টেনক্রেডের কী আসে যায়! টেনক্রেড তো নিজের স্বার্থ খুঁজে ফিরছেন; মামার স্বার্থ নয়। ইতিপূর্বেও আমরা দেখেছি যে, তিনি তার শক্তিশালী মামার রাজত্ব থেকে দূরে কোথাও নিজের জন্য রাজত্বের সন্ধানে এন্টিয়কে তার মামাকে ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যাওয়াকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। আর তাই যখন তার কাছে মামার বন্দি হওয়ার সংবাদ পৌঁছায় এবং সঙ্গে পৌঁছায় এন্টিয়কের নরম্যান বাহিনীর প্রেরিত একটি বার্তা, যাতে তাকে বোহেমন্ড মুক্ত হওয়া পর্যন্ত এন্টিয়কের অন্তর্বর্তীকালীন শাসকের দায়িত্ব গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে, তখন তিনি কালবিলম্ব না করে তাতে সাড়া দেন। এ তো একদিকে বাইতুল মুকাদ্দাসে সৃষ্ট নতুন পরিস্থিতি হতে দূরে সরে যাওয়ার সুযোগ, অপরদিকে নিজের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুবর্ণ সুযোগ। টেনক্রেড চলে যাওয়ায় ১ম বল্ডউইনও যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন। তিনি তো কোনো ধরনের সমস্যা বা সংঘাত ছাড়াই তার অপছন্দের এক প্রশাসক থেকে রেহাই পেলেন!(৫৫২)

এভাবেই ১১০১ খ্রিষ্টাব্দের শুরুতে ১ম বল্ডউইন নির্বাচিত হন বাইতুল মুকাদ্দাস সাম্রাজ্যের রাজা, টেনক্রেড নির্বাচিত হন এন্টিয়কের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসক আর বল্ডউইন ডি বুর্গ লাভ করেন এডেসার প্রশাসনিক দায়িত্ব। ৪র্থ রেমন্ড তখনও ত্রিপোলি অঞ্চলে কোনো রাজ্য প্রতিষ্ঠার আশায় ঘুরে ফিরছেন। ওদিকে বোহেমন্ড আছেন গাজি বিন দানিশমান্দের হাতে বন্দি।

এসব জটিল ও উত্তেজনাকর ঘটনাপ্রবাহ অধ্যয়নের সময় স্বাভাবিকভাবেই বারংবার আমাদের মনে এই প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, মুসলমানরা তখন কোথায় ছিল?!

নিঃসন্দেহে ক্রুসেডারদের এই চরম সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি ছিল মুসলমানদের আপন ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের এবং ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে পরিণত হয়ে একক লক্ষ্যপানে অগ্রসর হওয়ার এক অপূর্ব সুযোগ। কিন্তু হায় আফসোস! প্রবৃত্তির চাহিদা যে শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত! মুসলমানদের মাঝে এমন কোনো নিষ্ঠাবান নেতা ছিলেন না, যিনি তাদেরকে এক সুতোয় গেঁথে ঐক্যবদ্ধ করবেন এবং শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করবেন। ফলে একের পর এক সুযোগ নষ্ট হতে থাকে; মুসলমানরা লাঞ্ছনা ও হীনতা, তুচ্ছতা ও অপদস্থতার জীবন অতিবাহিত করতে থাকে। যে তিক্ত বাস্তবতাকে সকলে পুরোপুরি অপছন্দ করে, মুসলমানরা তা-ই মেনে নেয়। অন্যায়-অবিচার অপসারণ এবং যাবতীয় অনাচারের মূলোৎপাটনের কোনো ঝোঁক ও প্রবণতাই সমকালীন মুসলিমসমাজের মাঝে স্পন্দিত হয়নি।

এভাবেই কাটতে থাকে দিন, মাস ও বছরের পর বছর। ক্রুসেডাররা দুরারোগ্য ব্যাধির ন্যায় দুর্বল ইসলামি দেহে আরও ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং ক্ষতিসাধন করতে থাকে।

চলমান পরিস্থিতিতে ক্রুসেডাররা যখন দেখতে পায় যে, মুসলমানরা মোটেও উত্তেজিত হচ্ছে না; বরং তাদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আলোচনায় বসতে চাচ্ছে এবং ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার চুক্তি করতে সচেষ্ট হচ্ছে, তখন তারা নিজেদের রাজ্যপরিধি সম্প্রসারণ এবং মুসলমানদের সংকটকে সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজে লাগাতে সচেষ্ট হয়।

বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা ১ম বল্ডউইন নিজের সামরিক শক্তি যাচাই, পথ অনুসন্ধান ও নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজ সৈন্যদের মানিয়ে নিতে আল-কুদস নগরীর আশেপাশে দ্রুত কয়েকটি সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। প্রথমেই তিনি তার বাহিনী নিয়ে আরসুফ অবরোধ করেন। ইতালির জেনোভা হতে আগত একটি নৌবহরের সহায়তায় অল্প কদিনের অবরোধের পরই তার হাতে আরসুফ নগরীর পতন ঘটে। (৫৫৩) এরপর তিনি অবরোধ করেন কায়সারিয়া নগরী। এ নগরীটিরও পতন ঘটে। (৫৫৪) পতনের পরই কায়সারিয়া নির্মম গণহত্যার শিকার হয়; প্রচুর মুসলিম নাগরিক নির্বিচারে নিহত হয়। (৫৫৫) বরং কায়সারিয়ার নাগরিকরা যখন নগরীর মসজিদে আশ্রয় নেয়, তখন ক্রুসেডাররা বল্ডউইনের নেতৃত্বে তাদের পিছু নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করে এবং নারী-পুরুষ-শিশু যাদেরকে পায়, নির্বিচারে হত্যা করে। মুসলিম নারী-পুরুষের রক্তে মসজিদটি এক বিরাট রক্ত-পুকুরে পরিণত হয়! (৫৫৬) হ্যাঁ, এই বল্ডউইনকেই কিছু কিছু ইতিহাসগ্রন্থে 'প্রাজ্ঞ' অভিধায় ভূষিত করা হয়েছে!

নেতা বোহেমন্ডকে হারিয়ে এন্টিয়ক রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়েছে—আশেপাশের কেউ এ ধরনের চিন্তা করার পূর্বেই অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসক টেনক্রেডও তার সম্প্রসারণমূলক তৎপরতার অনুশীলন করতে দ্রুত বের হন। টেনক্রেড হিংস্রতা ও বর্বরতা, শক্তি ও রণদক্ষতা এবং সামরিক অভিজ্ঞতা কোনো দিক থেকেই তার মামা বোহেমন্ডের চেয়ে কম ছিলেন না। (৫৫৭) তিনি অল্প কয়েক মাসের মধ্যে এন্টিয়কের উত্তরে কিলিকিয়া অঞ্চলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি নগরী দখল করতে সক্ষম হন। নগরীগুলো হলো তারসুস (Tarsus), আদানা (Adana) ও মপসুয়েসটিয়া (Mopsuestia)। নগরী-তিনটি ইতিপূর্বে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের দখলে ছিল। এরপরই তিনি এন্টিয়কের দক্ষিণে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দর লাতাকিয়া অবরোধ করেন। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, এক বছরের অধিক সময় পূর্বে বোহেমন্ডও লাতাকিয়া নৌবন্দর অবরোধ করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে মৈত্রী-বন্ধনে আবদ্ধ রেমন্ডের চাপে অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। এখন টেনক্রেড কিছুতেই 'বয়োবৃদ্ধ' বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের লাভ-ক্ষতি বিবেচনায় আনবেন না। তিনি লাতাকিয়ার পতন ঘটাতে নগরীটিকে ঘিরে তার সৈন্যদের নিয়োজিত করেন। (৫৫৮) বাস্তবেও লাতাকিয়ার পতন ঘটে, তবে প্রায় দুই বছর পর!

এডেসা রাজ্যের নতুন প্রশাসক বল্ডউইন ডি বুর্গই-বা বসে থাকবেন কেন?! মুসলিম নগরী সারুজে হামলা চালিয়ে তিনিও তার তৎপরতা শুরু করেন। হাসানকেইফের (Hasankeyf) মুসলিম প্রশাসক সুকমান বিন উরতুক এডেসার প্রাক্তন শাসক ১ম বল্ডউইন বাইতুল মুকাদ্দাসে চলে যাওয়ার পর সারুজ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালিয়েছিলেন। (৫৫৯) তবে পরিতাপের বিষয়, তিনি এ অঞ্চলের অন্যান্য মুসলিম প্রশাসকের কোনো সহযোগিতা পাননি। প্রচণ্ড যুদ্ধের পর বল্ডউইন ডি বুর্গ তার বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন। সারুজে গণহত্যা চালানো হয় এবং প্রচুর সংখ্যক মুসলিম নাগরিককে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয়। (৫৬০)

বাইতুল মুকাদ্দাস সাম্রাজ্য ও দুই ক্রুসেড রাজ্য এন্টিয়ক ও এডেসার যখন এই পরিস্থিতি, আরেক ক্রুসেডার সেনাপতি ৪র্থ রেমন্ড তখন কী করছেন?! রেমন্ড টেনক্রেডকে লাতাকিয়া থেকে অবরোধ তুলে নিতে চাপ প্রয়োগ করেও ব্যর্থ হন। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, রেমন্ড বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের স্বার্থের অনুকূলে লাতাকিয়ায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। টেনক্রেডের কাছে নতি স্বীকার করে রেমন্ড এবার লাতাকিয়া ছেড়ে কনস্টান্টিনোপলে চলে যান এবং সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোসের সঙ্গে লাতাকিয়া পুনরুদ্ধারের পদ্ধতি নিয়ে বৈঠকে বসেন। (৫৬১) তবে এরই মধ্যে আকস্মিকভাবে এমন এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়, যা সকলের হিসাবনিকাশই বদলে দেয় এবং সকলের স্বপ্ন ও পরিকল্পনাই এলোমেলো হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়!

ক্রুসেড অভিযানে যোগ দেওয়ার জন্য পশ্চিম ইউরোপ থেকে নতুন করে বিশাল বিশাল বাহিনী রওনা হতে থাকে। ইউরোপিয়ানরা ইসলামি ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে তিনটি ক্রুসেড রাজ্য প্রতিষ্ঠার সংবাদ জানতে পেরেছিল। তারা শুনেছিল-ক্রুসেডার বাহিনী সেখানে প্রচুর ধনসম্পদ ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ লাভ করেছে। ইউরোপিয়ানরা জানতে পেরেছিল যে, ক্রুসেডারদের হাতে একে একে ইসলামি নৌবন্দরগুলোর পতন ঘটছে এবং ইতালিয়ান বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রের নৌবহরগুলো বাণিজ্যচুক্তির মাধ্যমে ব্যাপক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করছে। সবচেয়ে বড় কথা-তারা জানতে পেরেছিল যে, অপ্রত্যাশিতভাবে মুসলমানরা নতজানু হয়ে পড়েছে এবং পরস্পর বিবাদ-বিসংবাদ ও গৃহদ্বন্দ্বে জড়িয়ে আছে। এ সবকিছু জানতে পেরে অতি সুলভ 'মিরাছ সম্পত্তি' লাভ করার জন্য প্রচুর সংখ্যক ইউরোপীয় জনগণ এ অঞ্চলে ছুটে আসতে প্ররোচিত হয়েছিল!(৫৬২)

টিকাঃ
৫৫১. Setton: op. cit. 1, p. 381.
৫৫২. Albert d' Aix, pp. 537-538.
৫৫০. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৩৯।
৫৫৪. আবুল মাহাসিন, আন-নুজুমুয যাহিরা, ৫/১৬৭।
৫৫৫. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৩৯ ও Foucher de chartres, pp. 389-390.
৫৫৬. Albert d' Aix, pp. 453-454.
৫৫৭. Runciman: op. cit., 11, p. 32.
৫৫৮. Runciman: op. cit., 11, p. 33.
৫৫৯. Grousset: Hist. des Croisades, 1, pp. 363.
৫৬০. Matthieu d' Edesse (Doc. Arm 1), pp. 53-54.
৫৬১. Raoul de Caen, pp. 706-707.
৫৬২. দেখুন: মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখু সালাজিকাতির রূম ফী আসিয়াস সুগরা, পৃষ্ঠা: ৯৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00