📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ক্ষমতার গদি নিয়ে পালাবদলের খেলা!

📄 ক্ষমতার গদি নিয়ে পালাবদলের খেলা!


বিশপ ডেমবার্ট, বোহেমন্ড ও বল্ডউইনের বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত বিশাল এক কাফেলা বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে রওনা হয়। পথে যৎসামান্য দুর্ভোগের সম্মুখীন হলেও ত্রিপোলির শিয়া শাসক ইবনে আম্মারের কাছ থেকে তারা পূর্ণ সমাদর লাভ করে। তিনি তাদের জন্য রসদপত্রের ব্যবস্থা করেন। অবশ্য ক্রুসেডাররা তার রাজধানী নগরী দখল করতে পারে এই আশঙ্কায় তিনি তার নগরদ্বার উন্মুক্ত করেননি। (৫১৬)

সম্মিলিত বাহিনী বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছতেই এত অধিক সংখ্যক ক্রুসেডারদের আগমনে বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক গডফ্রে অত্যন্ত খুশি হন। তার তো এখন অনেক জনবল প্রয়োজন। (৫১৭) কিন্তু ডেমবার্টের নেতৃত্বে এই বিশাল বাহিনী তো তাকে সহায়তা করার লক্ষ্যে নয়; একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে আগমন করেছে। তারা চায় নগরীটির বর্তমান বিশপ আরনাল্ফ মালকোরনকে বরখাস্ত করে ডেমবার্টকে তার স্থলাভিষিক্ত করতে। সম্মিলিত বাহিনীর দাবি শোনার পর গডফ্রে চিন্তা করে দেখেন যে, তাদের এ দাবি মেনে নিলে তার নিজেরই লাভ হবে আর তিনি তা মেনে নিতে বাধ্যও বটে। কারণ, বাইতুল মুকাদ্দাসে একচ্ছত্র আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে গডফ্রের পিসার শক্তিশালী নৌবহরের সহায়তা যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন পোপের সমর্থন লাভ। অবশেষে পুরোনো বিশপের জন্য দ্রুত ট্রাইবুনালের আয়োজন করা হয়; সেখানে 'প্রমাণিত' হয় যে, তার নির্বাচন সঠিক ছিল না। এরপর তাকে বরখাস্ত করা হয় এবং ডেমবার্টকে নতুন বিশপ নির্বাচিত করা হয় ! (৫১৮)

কিন্তু এতটুকুতেই ডেমবার্টের চাহিদা পূরণ হলে তো ভালোই ছিল! বিশপ পদে আসীন হয়েই ডেমবার্ট এবার বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রশাসনিক বিষয়াদিতেও হস্তক্ষেপ করতে আরম্ভ করেন। কারণ, তিনি শুধু ধর্মীয় আচার পালন ও রীতি-নীতির চর্চা করার জন্য এই পদ দাবি করেননি; তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসের গির্জাধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত হতে চেয়েছেন রাজ্যের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের মূল হর্তাকর্তায় পরিণত হয়ে পুরো প্রশাসন নিজের হাতে নিয়ে আসতে! (৫১৯)

ধীরে ধীরে বিষয়টি জটিল আকার ধারণ করে। ১১০০ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে (৪৯৩ হিজরি সনে) গডফ্রে ও ডেমবার্টের মধ্যে অধিকৃত বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের মালিকানা নিয়ে প্রকাশ্যে বিরোধ শুরু হয়। ডেমবার্ট জাফা ও বাইতুল মুকাদ্দাসে নিজের জন্য স্বতন্ত্র রাজত্ব দাবি করেন। (৫২০) চাপের মুখে নিরুপায় গডফ্রে ডেমবার্টকে সরাসরি এ প্রস্তাবও দেন যে, তার মৃত্যুর পর ডেমবার্টই উভয় নগরীর রাজত্ব লাভ করবেন। কিন্তু ডেমবার্ট তো বাকিতে রাজি নন, তার চাই নগদ প্রাপ্তি! এরপর গডফ্রে প্রস্তাব দেন, মুসলমানদের অন্য দুটি নগরী দখল করার পর তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস ও জাফা ডেমবার্টের হাতে তুলে দেবেন। তিনি যেন অন্তত ততদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। কিন্তু এ প্রস্তাবও ডেমবার্টকে তুষ্ট করতে ব্যর্থ হয়। তিনি তো অপেক্ষা করতেও রাজি নন! (৫২১) এভাবে কোনো সমাধানে পৌঁছা ব্যতিরেকেই বাইতুল মুকাদ্দাসের নেতা ও গির্জার নেতার মাঝে বিরোধ ও সংঘাত চলতে থাকে।

এ তো লোভ ও লালসার সংঘাত! কামনা ও চাহিদা পূরণের লড়াই! সাম্রাজ্যবাদ ও দখলদারিত্বের যুদ্ধ! ধর্ম বা ক্রুশের কোনো জায়গা এখানে নেই!

ধর্মীয় নেতা ডেমবার্ট যখন উঠে-পড়ে লেগেছেন, নরম্যান সেনাপতি ও এন্টিয়কের শাসক বোহেমন্ড কেন বসে থাকবেন! তিনিও এবার নতুন করে শুরু করেন সাম্রাজ্য বিস্তারের অভিযান!

টিকাঃ
৫১২. Chalandon: Alexis Comnene, p. 218.
৫১৩. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/২১৮।
৫১৪. Runciman: op. cit., 1, p. 301.
৫১৫. Setton: op. cit. 1, p. 377.
৫১৬. Archer: The Crusades, pp. 98-99.
৫১৭. Runciman: op. cit., 1, p. 303.
৫১৮. Setton: op. cit. 1, p. 377.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 অনিঃশেষ লালসা

📄 অনিঃশেষ লালসা


ডেমবার্টকে আল-কুদসের বিশপ নির্বাচিত করার পর বোহেমন্ড আবারও তার সাম্রাজ্যবাদী লালসা চরিতার্থ করতে এন্টিয়কে ফিরে আসেন। এবার আর এক ফ্রন্ট নয়; একই সঙ্গে তিনি চারটি ফ্রন্টে যুদ্ধ শুরু করেন! এরই নাম সাম্রাজ্যবাদের লালসা!

বোহেমন্ড প্রথমে ওরোন্টেস নদীর অববাহিকায় অবস্থিত ফামিয়া দুর্গ ও আরব আমির সাইফুদ্দৌলা খাল্ফ বিন মালাইবের রাজ্য দখল করার চেষ্টা করেন। সাইফুদ্দৌলা ছিলেন হিমসের আমির জানাহুদ্দৌলা হুসাইন বিন মালাইবের সহোদর। কিন্তু বোহেমন্ড সুরক্ষিত ফামিয়া দুর্গ দখল করতে ব্যর্থ হন। ক্রুদ্ধ হয়ে তিনি দুর্গের আশেপাশের কৃষিক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দেন। (৫২২) এরপর তিনি ছোটেন দ্বিতীয় ফ্রন্ট আলেপ্পো অভিমুখে। ১১০০ খ্রিষ্টাব্দের ৫ জুলাই তিনি আলেপ্পোর শাসক রিজওয়ান বিন তুতুশের বিরুদ্ধে এক প্রচণ্ড যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। বোহেমন্ড রিজওয়ানকে কঠিন পরাজয়ের স্বাদ গ্রহণে বাধ্য করেন এবং প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি পাঁচশর অধিক মুসলমানকে বন্দি করেন। (৫২৩)

নিরুপায় রিজওয়ান হিমসের আমির জানাহুদ্দৌলা হুসাইন বিন মালাইবের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করেন। সেলজুক নেতা রিজওয়ানের জন্য এটি ছিল চরম অবমাননা ও মর্যাদাহানিকর বিষয়। কারণ, দীর্ঘদিন ধরেই সেলজুকরা এ অঞ্চলে আরবদের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত ছিল আর হুসাইন বিন মালাইব ছিলেন অন্যতম আরব নেতা। (৫২৪) অধিকন্তু হুসাইন বয়সেও রিজওয়ানের তুলনায় নবীন ছিলেন এবং হিমসের আমির হিসেবে তার অবস্থান আলেপ্পোর আমিরের তুলনায় নিম্নতর ছিল। এসব দিক চিন্তা করেই রিজওয়ান এর পরপরই একটি ভুল করে বসেন।

জানাহুদ্দৌলা যখন রিজওয়ানকে সহায়তা করার জন্য আগমন করেন, তখন রিজওয়ান তাকে স্বাগত জানানোর পরিবর্তে অসদাচরণ করেন। অথচ তিনিই জানাহুদ্দৌলাকে আগমন করতে অনুরোধ করেছিলেন। রিজওয়ানের অসৌজন্যমূলক আচরণ জানাহুদ্দৌলা হুসাইনের অন্তরে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। (৫২৫)

বোহেমন্ড তখন কঠিন অবরোধের মাধ্যমে সুপ্রাচীন নগরী আলেপ্পোর পতন ঘটিয়ে নগরীটিকে নিজ রাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করার স্বপ্নে বিভোর। আলেপ্পো জয় করতে পারলে এন্টিয়কবাসী ও নরম্যানদের জন্য আরও সুবিস্তৃত বসবাস ও স্থানান্তরের ব্যবস্থা হবে।(৫২৬) তবে আলেপ্পোর পতন ঘটানোর পূর্বেই অতি লোভী বোহেমন্ড হঠাৎ করেই উত্তরের মারআশ (Kahramanmaraş) নগরী অবরোধ করার লক্ষ্যে আলেপ্পো অবরোধ ত্যাগ করে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন! নগরীটি বছর-দুই পূর্বে ক্রুসেডারদের কর্তৃত্বভুক্ত হলেও এ সময় তা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধিভুক্ত ছিল। সম্ভবত এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে বোহেমন্ডের মনে এই চিন্তা কাজ করছিল যে, সুরক্ষিত আলেপ্পো নগরীর অবরোধ বেশ দীর্ঘমেয়াদি হবে। তা ছাড়া তিনি এ বিষয়টিও অনুভব করছিলেন যে, মারআশ নগরীর পতন ঘটানোর সুযোগ তুলনামূলক অনেক বেশি। কারণ, নগরীটির প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত বাইজান্টাইন বাহিনীটি ছিল ক্ষুদ্র আকৃতির। এ কারণেই বোহেমন্ড আলেপ্পো ফ্রন্ট ছেড়ে তৃতীয় ফ্রন্ট মারআশে চলে যান এবং কয়েকদিন নগরীটি অবরোধ করে রাখেন। কিন্তু মারআশের পতন ঘটানো তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বোহেমন্ড যখন মারআশের পতন ঘটানোর চেষ্টায় ব্যস্ত, এরই মধ্যে তার কাছে মালাতিয়ার প্রশাসকের কাছ থেকে সাহায্যপ্রার্থনার বার্তা এসে পৌঁছায়। (৫২৭) মারআশ থেকে উত্তরে অবস্থিত মালাতিয়া নগরীর সিংহভাগ নাগরিক ছিল আর্মেনীয়। বনু দানিশমান্দের শাসক গাজি কুমুশতেগিন বিন দানিশমান্দ কর্তৃক অবরুদ্ধ হওয়ায় (৫২৮) নগরীটির আর্মেনীয় শাসক জিবরিল বোহেমন্ডের কাছে সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন। (৫২৯) বোহেমন্ড একে সুবর্ণ সুযোগ বিবেচনা করে মারআশ ছেড়ে পাঁচশ সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে রওনা হন তার চতুর্থ ফ্রন্টে গাজির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এবং মালাতিয়া দখল করতে!

মালাতিয়া এডেসা সুমাইসাত কায়সুম আদানা মপসুয়েসটিয়া মারআশ আলবেরা ইসকানদারুন তিল-বাশির এন্টিয়ক • আলেপ্পো লাতাকিয়া ফামিয়া কিননাসরিন জাবালা বানিয়াস তারতুস মাআ'ররাতুন-নোমান হামা

মানচিত্র নং-১৮ বোহেমন্ডের সাম্রাজ্যবাদী অভিযান

এভাবেই অলীক আশায় প্রবঞ্চিত হয়ে বোহেমন্ড একই সঙ্গে নিজের জন্য চারটি ফ্রন্ট উন্মুক্ত করেন-ফামিয়া দুর্গ, আলেপ্পো, মারআশ ও মালাতিয়া। এসব ফ্রন্টে তিনি যুদ্ধ করছিলেন যথাক্রমে আরব, সেলজুক, বাইজান্টাইন ও বনু দানিশমান্দের বিরুদ্ধে। মূলত এরই নাম প্রবঞ্চনা, যা দৃষ্টিকে অন্ধ করে দেয়। তিনি তার বাহিনীকে এখানে-সেখানে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রেখেছেন আর নিজে মাত্র পাঁচশ সৈন্য নিয়ে এশিয়া মাইনরের গভীরতম অংশে প্রবেশ করেছেন!

প্রবঞ্চিত-দাম্ভিক নেতা ভুলের শিকার হবেই।

নেপোলিয়ান বোনাপার্টের (Napoléon Bonaparte) ইতিহাস এবং রাশিয়ায় তার পতনের ইতিহাস অধ্যয়ন করে দেখুন। পাঠ করে দেখুন হিটলারের ইতিহাস এবং ফ্রান্স ও রাশিয়ায় তার পতনের ইতিহাস।

বরং আরেকবার পাঠ করুন ফেরাউনের পতন-ইতিহাস। দরিয়া বিদীর্ণ হতে দেখে আজব প্রবঞ্চনার শিকার ফেরাউন এতটা হতবুদ্ধি ও অন্ধ হয়ে গিয়েছিল যে, নিজ বাহিনী নিয়ে দরিয়ায় নেমে পড়েছিল এবং সমূলে ধ্বংস হয়েছিল!

টিকাঃ
৫১৯. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/২২১।
৫২০. Michaud: op. cit. 11, p. 10.
৫২১. Guillaume: de tyr, pp. 388-390.
৫২২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২২৩।
৫২৩. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ১/৩৫৬-৩৫৭ ও আলি বিন মুহাম্মাদ তানুখি, তারীখুল উযায়মি, পৃষ্ঠা: ৩৬০।
৫২৪. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ১/৩৫৫।
৫২৫. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ১/৩৫৭ ও Grousset: Hist, des Croisades, 1, p. 277.
৫২৬. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ১/৩৫৭।
৫২৭. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/৩১৩।
৫২৮. Michel Le Syrin (ed. Chabol) 111. P. 187.
৫২৯. Matthieu d' Edesse, p. 51.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ক্রুসেডারদের হঠাৎ বিপদ!

📄 ক্রুসেডারদের হঠাৎ বিপদ!


মালাতিয়া দখলের নেশায় আচ্ছন্ন বোহেমন্ড এবার গাজি বিন দানিশমান্দের পাতা ফাঁদে আটকা পড়েন। তার সঙ্গে থাকা পাঁচশ সৈন্যও একই ফাঁদে আটকা পড়ে। (৫৩০) সেনাপতি বোহেমন্ডকে দ্রুত শৃঙ্খলিত করা হয়; তার সৈন্যদের অনেককে হত্যা করা হয় আর বাকিদের বন্দি করা হয়! (৫৩১)

নিঃসন্দেহে ক্রুসেড আগ্রাসনের এই দুর্যোগপূর্ণ সময়ে এটি ছিল অনেক মূল্যবান একটি শিকার। এটি ১১০০ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টের শুরুর দিকের ঘটনা। বোহেমন্ড অবশ্য বন্দি হওয়ার পূর্বেই এডেসার শাসক বল্ডউইনের কাছে সাহায্যবার্তা পাঠাতে সক্ষম হন। বার্তা পেয়েই বল্ডউইন মাত্র একশ চল্লিশজন সৈন্যের একটি ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে বোহেমন্ডের সাহায্যার্থে ছুটে আসেন! স্বাভাবিকভাবেই বল্ডউইনেরও একই পরিণতি বরণ করার কথা ছিল। কিন্তু গাজি বিন দানিশমান্দ তার অতি মূল্যবান শিকার নিয়ে দ্রুত মালাতিয়া থেকে সরে আসেন এবং বন্দি নরম্যান সেনাপতিকে দুর্ভেদ্য নিরাপত্তার মাঝে আটকে রাখার জন্য এশিয়া মাইনর অঞ্চলের একেবারে উত্তর প্রান্তে কৃষ্ণসাগরের উপকূলে নিকসার (Niksar) দুর্গে পৌঁছে যান। (৫৩২)

মালাতিয়ায় প্রবেশের পথ উন্মুক্ত পেয়ে বল্ডউইন তার বাহিনী নিয়ে নগরীটিতে প্রবেশ করেন। নগরবাসী তাকে স্বাগত জানায়; স্বাগত জানান নগর-প্রশাসক জিবরিলও। বল্ডউইন দ্রুত মালাতিয়াকে এডেসা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নিজ রাজ্যপরিধি বিস্তৃত করে নেন। প্রমাণ হয়ে যায়—তিনি নির্ভেজাল আন্তরিকতা নিয়ে বোহেমন্ডকে উদ্ধার করতে আসেননি। দুজনের বিরোধ ও দ্বন্দ্ব তো বেশ পুরোনো। এখন তিনি এই ভেবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন যে, ভবিষ্যতে হয়তো এর মাধ্যমে তার কোনো স্বার্থ রক্ষা হবে। তা ছাড়া এটি তো ছিল সাহায্যপ্রার্থী নগরীকে নিজের রাজ্যপরিধিতে যুক্ত করার এক অপূর্ব সুযোগ!

স্বাভাবিকভাবেই বল্ডউইন নিকসার দুর্গ পর্যন্ত তুর্কি দানিশমান্দ বাহিনীর অনুসরণ করার মতো দুঃসাহস দেখানোর চিন্তা করেননি। মালাতিয়ায় নিজ কর্তৃত্বের প্রমাণ হিসেবে এবং নগরীটিকে বশীভূতকরণের দলিল হিসেবে পঞ্চাশজন সৈন্যকে রেখে তিনি নিজে এডেসায় ফিরে যান। (৫৩৩)

টিকাঃ
৫৩০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৯। অবশ্য ইবনুল আছির বোহেমন্ডের সঙ্গে থাকা সৈন্যসংখ্যা নিয়ে অতিরঞ্জন করেছেন।
৫৩১. Grousset: Hist. des Croisades, 1, p. 378.
৫৩২. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২২৩-২২৪ ও Albert d' Aix, p. 525.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 এন্টিয়ক ও বাইতুল মুকাদ্দাসে যুগপৎ প্রশাসনিক শূন্যতা

📄 এন্টিয়ক ও বাইতুল মুকাদ্দাসে যুগপৎ প্রশাসনিক শূন্যতা


বোহেমন্ড বন্দি হওয়ায় এ অঞ্চলে এক বিরাট প্রশাসনিক ও সামরিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়। কারণ, এন্টিয়ক ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজ্য। এন্টিয়ক দখলে আগ্রহী প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যাও ছিল অনেক। একদিকে আছে এশিয়া মাইনর অঞ্চলের সেলজুক মুসলমানগণ, যাদের নেতৃত্বে ছিলেন কিলিজ আরসালান। আরও আছেন আলেপ্পোর আমির রিজওয়ান, যিনি এন্টিয়ককে নিজের অধিকার ও মিরাছ-সম্পদ মনে করতেন! উচ্চাভিলাষী বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যও দীর্ঘকাল ধরে এন্টিয়কের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি দিয়ে রেখেছিল। ওদিকে ৪র্থ রেমন্ডও নিজের জন্য একটি রাজ্যের সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরছিলেন। ইতিপূর্বেও তিনি এন্টিয়কের একচ্ছত্র শাসনক্ষমতা লাভ, নিদেনপক্ষে বণ্টিত ক্ষমতালাভের প্রচণ্ড আগ্রহও প্রকাশ করেছিলেন। তা ছাড়া তৎকালীন এন্টিয়ক রাজ্যের সীমা কেবল এন্টিয়ক নগরীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন নগর-জনপদ ও দুর্গও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এন্টিয়ক ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ, সচ্ছল ও সুরক্ষিত একটি রাজ্য। এই বিশাল রাজনৈতিক শূন্যতা প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোকে স্বাভাবিকভাবেই এক সংঘাতের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।

নতুন করে সংকট সৃষ্টি হওয়ার পূর্বে এবং বিভিন্ন বাহিনী এন্টিয়কের ওপর উন্মাদের ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ার পূর্বে এন্টিয়কে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকারী নরম্যান বাহিনী এখন কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে?

চলমান খেলার অতি গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান একটি ঘুঁটির মালিক হওয়ার পর মুসলিম দানিশমান্দ রাজপরিবারই-বা এখন কী করবে?

সর্বশেষ এই ইতিবাচক পটপরিবর্তনের সামনে দাঁড়িয়ে সাধারণ মুসলিম জনগণই-বা কী করবে? পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে কোনো পক্ষ কিছু ভাবার পূর্বেই বাইতুল মুকাদ্দাসে ঘটে আরেক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা, যা সকলের হিসাবনিকাশ উল্টে দেয় এবং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে!

আকস্মিকভাবে বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক গডফ্রে মারা যান। ফলে এন্টিয়ক সমস্যার সম-আকৃতির সমস্যা এবার বাইতুল মুকাদ্দাসে সৃষ্টি হয়। বরং সম্ভবত এটি ছিল এন্টিয়ক সমস্যার চেয়েও কঠিন সমস্যা!

নিঃসন্দেহে গডফ্রের প্রয়াণ ছিল আল-কুদস নগরীতে সৃষ্ট নতুন এক প্রশাসনিক শূন্যতা, যাকে কেন্দ্র করে ক্রুসেডারদের মাঝে নতুন করে দুর্যোগ সৃষ্টির আশঙ্কা ছিল। কারণ, বিশেষ করে আল-কুদস নগরী নিয়ে মুসলমানদের বাদে খোদ ক্রুসেডারদের নিজেদের মধ্যেই ছিল চরম সংঘাত।

এই আকস্মিক মৃত্যু-ঘটনার সময় টেনক্রেড ও ডেমবার্ট প্রথমে আক্কা, এরপর হাইফা নগরীর অবরোধে ব্যস্ত ছিলেন। (৫৩৪) আমাদের মনে হয়তো প্রশ্ন জাগতে পারে যে, ধর্মীয় নেতা ও গির্জাধ্যক্ষ ডেমবার্ট একটি সামরিক অবরোধে কী করছেন?! তিনি তখন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি নগরী কিংবা মালিকানার জন্য একটি জনপদ খুঁজে ফিরছিলেন। হাইফার অবরোধ চলাকালে তাদের কাছে গডফ্রের মৃত্যুসংবাদ এসে পৌঁছায়। (৫৩৫) টেনক্রেড যখন জানতে পারেন যে, গডফ্রে মৃত্যুর পূর্বেই গোল্ডমার নামক জনৈক ক্রুসেডার সেনাপতিকে হাইফা নগরী প্রদানের নির্দেশ দিয়ে গেছেন, তখন তিনি তার বাহিনী নিয়ে অবরোধ ছেড়ে সরে যেতে উদ্যত হন। (৫৩৬) কিন্তু ডেমবার্ট হাইফা নগরীর পতনের পর তা টেনক্রেডকে প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে থেকে যেতে আশ্বস্ত করেন। ডেমবার্টের এই প্রতিশ্রুতি প্রদানের মাঝে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল যে, তিনি পুরোপুরি বিশ্বাস করতেন— বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসনভার তার হাতেই আসতে যাচ্ছে। বাস্তবেও সামান্য প্রতিরোধের পর হাইফার পতন ঘটে। (৫৩৭) এরপর সকলে বাইতুল মুকাদ্দাসে ফিরে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মীমাংসা করার জন্য-কে হতে যাচ্ছেন বাইতুল মুকাদ্দাসের পরবর্তী শাসক?!

গডফ্রে মাত্র এক বছর বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্য শাসন করেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন পশ্চিম ইউরোপে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী তিনি এমন কোনো বৈধ উত্তরাধিকারী রেখে যেতে পারেননি, যে তার রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করবে। গডফ্রে ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণকারী সামরিক নেতাদের নীতি ও আগ্রহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজকীয় ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী শাসনব্যবস্থা এবং গির্জার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা-এ দুয়ের মাঝামাঝি পদ্ধতিতে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। তার মৃত্যুর পর বড় দুটি শক্তি বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসনক্ষমতা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়ে। (৫৩৮)

প্রথম পক্ষ অর্থাৎ ধর্মীয় গির্জা-শক্তির প্রতিনিধিত্ব করছিলেন আল-কুদসের বিশপ ডেমবার্ট। প্রচণ্ড উচ্চাভিলাষী ডেমবার্ট ছিলেন আল-কুদস নগরীর অভ্যন্তরে সম্ভাব্য অগ্রবর্তী প্রার্থী, ক্রুসেড অভিযানে ইউরোপীয় বাহিনীসমূহের সমন্বয়ক পোপের প্রতিনিধি এবং পবিত্র নগরীর গির্জাধ্যক্ষ। অধিকন্তু বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রশাসনিক পরিস্থিতি ও ক্রুসেডার বাহিনীর ভারসাম্য সম্পর্কেও তার সম্যক ধারণা ছিল। ডেমবার্ট তৎক্ষণাৎ টেনক্রেডের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করেন এবং টেনক্রেড তাকে বাইতুল মুকাদ্দাসের ক্ষমতালাভে সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন। (৫৩৯) এরপর তিনি তার বন্ধু এন্টিয়কের শাসক বোহেমন্ডের কাছে একটি বার্তা পাঠিয়ে তাকে দ্রুত বাইতুল মুকাদ্দাসে আগমন করতে বলেন এবং তার ক্ষমতালাভের পথ পরিষ্কার করার কাজে সহায়তা করতে উদ্বুদ্ধ করেন। (৫৪০) বোহেমন্ডের বন্দি হওয়ার সংবাদ তখনও আল-কুদসে এসে পৌঁছায়নি।

এই হলো বাইতুল মুকাদ্দাসের ক্ষমতার দাবিদার প্রথম পক্ষ। দ্বিতীয় পক্ষে ছিল ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী রাজন্যশ্রেণি। গডফ্রের সৈন্যরা আল-কুদসেই অবস্থান করছিল। তারা সকলে পুরোহিততন্ত্র ও ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করে এবং পরিশ্রম ও ত্যাগের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পর গির্জার হাতে বাইতুল মুকাদ্দাসের ক্ষমতা ছেড়ে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। অপসারিত বিশপ আরনাল্ফ মালকোরনের অনুসারীরা এই পক্ষের পাশে দাঁড়ায় এবং ডেমবার্টের শাসন প্রত্যাখ্যান করে। অথচ ডেমবার্ট ধর্মীয় শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করছিলেন! এখানে কারণ আর কিছুই নয়—ডেমবার্টের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ! অর্থাৎ কোনো নীতি নয়; সবার মাঝে কাজ করছিল ব্যক্তিসংঘাত ও নিজ নিজ উচ্চাভিলাষ পূরণের লালসা। (৫৪¹)

টিকাঃ
৫৩৩. Albert d' Aix, pp. 525-526.
৫৩৪. Tranlatio Sancti Nicolai Veoetian (Hist Occid, Tome V), pp. 272-275.
৫৩৫. Albert d' Aix, p. 527.
৫৩৬. Setton: op. cit. 1, p. 380.
৫৩৭. Grousset: Hist, des Croisades, 1, p. 290.
৫৩৮. Stevenson: op. cit., p. 42.
৫৩৯. Stevenson: op. cit., p. 42.
৫৪০. Guillaume: de Tyr, p. 406; Albert d' Aix, p. 624.
৫৪¹. Albert d’ Aix, p. 526.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00