📄 কেন বিশেষ করে লাতাকিয়া বন্দর?
বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য ৪র্থ রেমন্ডের সহায়তায় লাতাকিয়া বন্দরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। (৫১০) যেহেতু বন্দরটির অবস্থান ছিল এন্টিয়ক রাজ্যের দক্ষিণে অনেকটা কাছে, তাই বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সুস্পষ্ট শত্রুতে পরিণত হওয়া বোহেমন্ডের জন্য তা ছিল বিরাট শঙ্কার বিষয়। এ কারণেই বোহেমন্ড ডেমবার্টকে পিসার শক্তিশালী নৌবহর ব্যবহার করে লাতাকিয়া অবরোধ ও পতন ঘটানোর প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন। বিশপ ডেমবার্টও আগ-পিছ না ভেবে তাতে সম্মতি প্রকাশ করেন। (৫১১) তিনি আশঙ্কা করছিলেন যে, কালের পরিক্রমায় সামনে হয়তো দখল করার মতো উপযুক্ত কোনো নগরীই এ অঞ্চলে বাকি থাকবে না। ডেমবার্টের নির্দেশনা অনুযায়ী পিসার নৌবহর লাতাকিয়া অবরোধ করে। প্রচণ্ড অবরোধে নগরীটি যখন পতনপ্রায়; ঠিক তখনই ঘটে এমন এক ঘটনা, যা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে দেয়!
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ফিলিস্তিনে নিজের জন্য রাজ্য প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়ে রেমন্ড শাম অঞ্চলে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন এবং হন্যে হয়ে কাঙ্ক্ষিত ভূখণ্ড খুঁজে ফিরছিলেন। এ অঞ্চলে পৌঁছে হঠাৎ করেই তিনি জানতে পারেন যে, বোহেমন্ড ও ডেমবার্ট মিলে লাতাকিয়া বন্দর অবরোধ করেছে। তিনি দ্রুত এতে হস্তক্ষেপ করেন এবং বোহেমন্ডকে শাসাতে থাকেন। পাশাপাশি তিনি ডেমবার্টকে বোঝাতে চেষ্টা করেন যে, এখন এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা মোটেও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় হবে না, যার কারণে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে ক্রুসেডারদের শত্রুতা সৃষ্টি হবে। (৫১২) তা ছাড়া এর ফলে রোমের পোপের নেতৃত্বে ক্যাথলিক ও অর্থোডক্স উভয় গির্জাকে ঐক্যবদ্ধ করার স্বপ্নও ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। (৫১৩) ডেমবার্টের জন্য ফিলিস্তিনে আরও বড় সুযোগ রয়েছে। কারণ, সেখানেই আছে পবিত্র ভূখণ্ড আল-কুদস নগরী!
রেমন্ডের দাবি যুক্তিপূর্ণ ও সন্তোষজনক মনে হওয়ায় বোহেমন্ডের অনিচ্ছা সত্ত্বেও ডেমবার্ট অবরোধ প্রত্যাহার করে নেন। রেমন্ড এবার নগরীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করে বাইজান্টাইন পতাকার পাশে নিজের পতাকা উত্তোলন করেন। (৫১৪)
এরপর বিশপ ডেমবার্ট এন্টিয়কের শাসক বোহেমন্ড ও এডেসার শাসক বল্ডউইনকে সঙ্গে নিয়ে আল-কুদস অভিমুখে রওনা হন। বোহেমন্ড ও বল্ডউইনের লক্ষ্য ডেমবার্টকে আল-কুদসের বিশপ পদে আসীন করা এবং এর মাধ্যমে ডেমবার্টের ওপর প্রকারান্তরে পোপের ওপর অনুগ্রহ-অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা। (৫১৫)
টিকাঃ
৫০৯. Grousset: op. cit. 1, p. 191.
৫১০. Heyd: op. cit., 1, pp. 135.
৫১১. Albert d' Aix, pp. 500-501.
📄 ক্ষমতার গদি নিয়ে পালাবদলের খেলা!
বিশপ ডেমবার্ট, বোহেমন্ড ও বল্ডউইনের বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত বিশাল এক কাফেলা বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে রওনা হয়। পথে যৎসামান্য দুর্ভোগের সম্মুখীন হলেও ত্রিপোলির শিয়া শাসক ইবনে আম্মারের কাছ থেকে তারা পূর্ণ সমাদর লাভ করে। তিনি তাদের জন্য রসদপত্রের ব্যবস্থা করেন। অবশ্য ক্রুসেডাররা তার রাজধানী নগরী দখল করতে পারে এই আশঙ্কায় তিনি তার নগরদ্বার উন্মুক্ত করেননি। (৫১৬)
সম্মিলিত বাহিনী বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছতেই এত অধিক সংখ্যক ক্রুসেডারদের আগমনে বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক গডফ্রে অত্যন্ত খুশি হন। তার তো এখন অনেক জনবল প্রয়োজন। (৫১৭) কিন্তু ডেমবার্টের নেতৃত্বে এই বিশাল বাহিনী তো তাকে সহায়তা করার লক্ষ্যে নয়; একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে আগমন করেছে। তারা চায় নগরীটির বর্তমান বিশপ আরনাল্ফ মালকোরনকে বরখাস্ত করে ডেমবার্টকে তার স্থলাভিষিক্ত করতে। সম্মিলিত বাহিনীর দাবি শোনার পর গডফ্রে চিন্তা করে দেখেন যে, তাদের এ দাবি মেনে নিলে তার নিজেরই লাভ হবে আর তিনি তা মেনে নিতে বাধ্যও বটে। কারণ, বাইতুল মুকাদ্দাসে একচ্ছত্র আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে গডফ্রের পিসার শক্তিশালী নৌবহরের সহায়তা যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন পোপের সমর্থন লাভ। অবশেষে পুরোনো বিশপের জন্য দ্রুত ট্রাইবুনালের আয়োজন করা হয়; সেখানে 'প্রমাণিত' হয় যে, তার নির্বাচন সঠিক ছিল না। এরপর তাকে বরখাস্ত করা হয় এবং ডেমবার্টকে নতুন বিশপ নির্বাচিত করা হয় ! (৫১৮)
কিন্তু এতটুকুতেই ডেমবার্টের চাহিদা পূরণ হলে তো ভালোই ছিল! বিশপ পদে আসীন হয়েই ডেমবার্ট এবার বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রশাসনিক বিষয়াদিতেও হস্তক্ষেপ করতে আরম্ভ করেন। কারণ, তিনি শুধু ধর্মীয় আচার পালন ও রীতি-নীতির চর্চা করার জন্য এই পদ দাবি করেননি; তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসের গির্জাধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত হতে চেয়েছেন রাজ্যের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের মূল হর্তাকর্তায় পরিণত হয়ে পুরো প্রশাসন নিজের হাতে নিয়ে আসতে! (৫১৯)
ধীরে ধীরে বিষয়টি জটিল আকার ধারণ করে। ১১০০ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে (৪৯৩ হিজরি সনে) গডফ্রে ও ডেমবার্টের মধ্যে অধিকৃত বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের মালিকানা নিয়ে প্রকাশ্যে বিরোধ শুরু হয়। ডেমবার্ট জাফা ও বাইতুল মুকাদ্দাসে নিজের জন্য স্বতন্ত্র রাজত্ব দাবি করেন। (৫২০) চাপের মুখে নিরুপায় গডফ্রে ডেমবার্টকে সরাসরি এ প্রস্তাবও দেন যে, তার মৃত্যুর পর ডেমবার্টই উভয় নগরীর রাজত্ব লাভ করবেন। কিন্তু ডেমবার্ট তো বাকিতে রাজি নন, তার চাই নগদ প্রাপ্তি! এরপর গডফ্রে প্রস্তাব দেন, মুসলমানদের অন্য দুটি নগরী দখল করার পর তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস ও জাফা ডেমবার্টের হাতে তুলে দেবেন। তিনি যেন অন্তত ততদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। কিন্তু এ প্রস্তাবও ডেমবার্টকে তুষ্ট করতে ব্যর্থ হয়। তিনি তো অপেক্ষা করতেও রাজি নন! (৫২১) এভাবে কোনো সমাধানে পৌঁছা ব্যতিরেকেই বাইতুল মুকাদ্দাসের নেতা ও গির্জার নেতার মাঝে বিরোধ ও সংঘাত চলতে থাকে।
এ তো লোভ ও লালসার সংঘাত! কামনা ও চাহিদা পূরণের লড়াই! সাম্রাজ্যবাদ ও দখলদারিত্বের যুদ্ধ! ধর্ম বা ক্রুশের কোনো জায়গা এখানে নেই!
ধর্মীয় নেতা ডেমবার্ট যখন উঠে-পড়ে লেগেছেন, নরম্যান সেনাপতি ও এন্টিয়কের শাসক বোহেমন্ড কেন বসে থাকবেন! তিনিও এবার নতুন করে শুরু করেন সাম্রাজ্য বিস্তারের অভিযান!
টিকাঃ
৫১২. Chalandon: Alexis Comnene, p. 218.
৫১৩. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/২১৮।
৫১৪. Runciman: op. cit., 1, p. 301.
৫১৫. Setton: op. cit. 1, p. 377.
৫১৬. Archer: The Crusades, pp. 98-99.
৫১৭. Runciman: op. cit., 1, p. 303.
৫১৮. Setton: op. cit. 1, p. 377.
📄 অনিঃশেষ লালসা
ডেমবার্টকে আল-কুদসের বিশপ নির্বাচিত করার পর বোহেমন্ড আবারও তার সাম্রাজ্যবাদী লালসা চরিতার্থ করতে এন্টিয়কে ফিরে আসেন। এবার আর এক ফ্রন্ট নয়; একই সঙ্গে তিনি চারটি ফ্রন্টে যুদ্ধ শুরু করেন! এরই নাম সাম্রাজ্যবাদের লালসা!
বোহেমন্ড প্রথমে ওরোন্টেস নদীর অববাহিকায় অবস্থিত ফামিয়া দুর্গ ও আরব আমির সাইফুদ্দৌলা খাল্ফ বিন মালাইবের রাজ্য দখল করার চেষ্টা করেন। সাইফুদ্দৌলা ছিলেন হিমসের আমির জানাহুদ্দৌলা হুসাইন বিন মালাইবের সহোদর। কিন্তু বোহেমন্ড সুরক্ষিত ফামিয়া দুর্গ দখল করতে ব্যর্থ হন। ক্রুদ্ধ হয়ে তিনি দুর্গের আশেপাশের কৃষিক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দেন। (৫২২) এরপর তিনি ছোটেন দ্বিতীয় ফ্রন্ট আলেপ্পো অভিমুখে। ১১০০ খ্রিষ্টাব্দের ৫ জুলাই তিনি আলেপ্পোর শাসক রিজওয়ান বিন তুতুশের বিরুদ্ধে এক প্রচণ্ড যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। বোহেমন্ড রিজওয়ানকে কঠিন পরাজয়ের স্বাদ গ্রহণে বাধ্য করেন এবং প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি পাঁচশর অধিক মুসলমানকে বন্দি করেন। (৫২৩)
নিরুপায় রিজওয়ান হিমসের আমির জানাহুদ্দৌলা হুসাইন বিন মালাইবের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করেন। সেলজুক নেতা রিজওয়ানের জন্য এটি ছিল চরম অবমাননা ও মর্যাদাহানিকর বিষয়। কারণ, দীর্ঘদিন ধরেই সেলজুকরা এ অঞ্চলে আরবদের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত ছিল আর হুসাইন বিন মালাইব ছিলেন অন্যতম আরব নেতা। (৫২৪) অধিকন্তু হুসাইন বয়সেও রিজওয়ানের তুলনায় নবীন ছিলেন এবং হিমসের আমির হিসেবে তার অবস্থান আলেপ্পোর আমিরের তুলনায় নিম্নতর ছিল। এসব দিক চিন্তা করেই রিজওয়ান এর পরপরই একটি ভুল করে বসেন।
জানাহুদ্দৌলা যখন রিজওয়ানকে সহায়তা করার জন্য আগমন করেন, তখন রিজওয়ান তাকে স্বাগত জানানোর পরিবর্তে অসদাচরণ করেন। অথচ তিনিই জানাহুদ্দৌলাকে আগমন করতে অনুরোধ করেছিলেন। রিজওয়ানের অসৌজন্যমূলক আচরণ জানাহুদ্দৌলা হুসাইনের অন্তরে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। (৫২৫)
বোহেমন্ড তখন কঠিন অবরোধের মাধ্যমে সুপ্রাচীন নগরী আলেপ্পোর পতন ঘটিয়ে নগরীটিকে নিজ রাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করার স্বপ্নে বিভোর। আলেপ্পো জয় করতে পারলে এন্টিয়কবাসী ও নরম্যানদের জন্য আরও সুবিস্তৃত বসবাস ও স্থানান্তরের ব্যবস্থা হবে।(৫২৬) তবে আলেপ্পোর পতন ঘটানোর পূর্বেই অতি লোভী বোহেমন্ড হঠাৎ করেই উত্তরের মারআশ (Kahramanmaraş) নগরী অবরোধ করার লক্ষ্যে আলেপ্পো অবরোধ ত্যাগ করে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন! নগরীটি বছর-দুই পূর্বে ক্রুসেডারদের কর্তৃত্বভুক্ত হলেও এ সময় তা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধিভুক্ত ছিল। সম্ভবত এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে বোহেমন্ডের মনে এই চিন্তা কাজ করছিল যে, সুরক্ষিত আলেপ্পো নগরীর অবরোধ বেশ দীর্ঘমেয়াদি হবে। তা ছাড়া তিনি এ বিষয়টিও অনুভব করছিলেন যে, মারআশ নগরীর পতন ঘটানোর সুযোগ তুলনামূলক অনেক বেশি। কারণ, নগরীটির প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত বাইজান্টাইন বাহিনীটি ছিল ক্ষুদ্র আকৃতির। এ কারণেই বোহেমন্ড আলেপ্পো ফ্রন্ট ছেড়ে তৃতীয় ফ্রন্ট মারআশে চলে যান এবং কয়েকদিন নগরীটি অবরোধ করে রাখেন। কিন্তু মারআশের পতন ঘটানো তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বোহেমন্ড যখন মারআশের পতন ঘটানোর চেষ্টায় ব্যস্ত, এরই মধ্যে তার কাছে মালাতিয়ার প্রশাসকের কাছ থেকে সাহায্যপ্রার্থনার বার্তা এসে পৌঁছায়। (৫২৭) মারআশ থেকে উত্তরে অবস্থিত মালাতিয়া নগরীর সিংহভাগ নাগরিক ছিল আর্মেনীয়। বনু দানিশমান্দের শাসক গাজি কুমুশতেগিন বিন দানিশমান্দ কর্তৃক অবরুদ্ধ হওয়ায় (৫২৮) নগরীটির আর্মেনীয় শাসক জিবরিল বোহেমন্ডের কাছে সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন। (৫২৯) বোহেমন্ড একে সুবর্ণ সুযোগ বিবেচনা করে মারআশ ছেড়ে পাঁচশ সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে রওনা হন তার চতুর্থ ফ্রন্টে গাজির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এবং মালাতিয়া দখল করতে!
মালাতিয়া এডেসা সুমাইসাত কায়সুম আদানা মপসুয়েসটিয়া মারআশ আলবেরা ইসকানদারুন তিল-বাশির এন্টিয়ক • আলেপ্পো লাতাকিয়া ফামিয়া কিননাসরিন জাবালা বানিয়াস তারতুস মাআ'ররাতুন-নোমান হামা
মানচিত্র নং-১৮ বোহেমন্ডের সাম্রাজ্যবাদী অভিযান
এভাবেই অলীক আশায় প্রবঞ্চিত হয়ে বোহেমন্ড একই সঙ্গে নিজের জন্য চারটি ফ্রন্ট উন্মুক্ত করেন-ফামিয়া দুর্গ, আলেপ্পো, মারআশ ও মালাতিয়া। এসব ফ্রন্টে তিনি যুদ্ধ করছিলেন যথাক্রমে আরব, সেলজুক, বাইজান্টাইন ও বনু দানিশমান্দের বিরুদ্ধে। মূলত এরই নাম প্রবঞ্চনা, যা দৃষ্টিকে অন্ধ করে দেয়। তিনি তার বাহিনীকে এখানে-সেখানে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রেখেছেন আর নিজে মাত্র পাঁচশ সৈন্য নিয়ে এশিয়া মাইনরের গভীরতম অংশে প্রবেশ করেছেন!
প্রবঞ্চিত-দাম্ভিক নেতা ভুলের শিকার হবেই।
নেপোলিয়ান বোনাপার্টের (Napoléon Bonaparte) ইতিহাস এবং রাশিয়ায় তার পতনের ইতিহাস অধ্যয়ন করে দেখুন। পাঠ করে দেখুন হিটলারের ইতিহাস এবং ফ্রান্স ও রাশিয়ায় তার পতনের ইতিহাস।
বরং আরেকবার পাঠ করুন ফেরাউনের পতন-ইতিহাস। দরিয়া বিদীর্ণ হতে দেখে আজব প্রবঞ্চনার শিকার ফেরাউন এতটা হতবুদ্ধি ও অন্ধ হয়ে গিয়েছিল যে, নিজ বাহিনী নিয়ে দরিয়ায় নেমে পড়েছিল এবং সমূলে ধ্বংস হয়েছিল!
টিকাঃ
৫১৯. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/২২১।
৫২০. Michaud: op. cit. 11, p. 10.
৫২১. Guillaume: de tyr, pp. 388-390.
৫২২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২২৩।
৫২৩. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ১/৩৫৬-৩৫৭ ও আলি বিন মুহাম্মাদ তানুখি, তারীখুল উযায়মি, পৃষ্ঠা: ৩৬০।
৫২৪. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ১/৩৫৫।
৫২৫. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ১/৩৫৭ ও Grousset: Hist, des Croisades, 1, p. 277.
৫২৬. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ১/৩৫৭।
৫২৭. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/৩১৩।
৫২৮. Michel Le Syrin (ed. Chabol) 111. P. 187.
৫২৯. Matthieu d' Edesse, p. 51.
📄 ক্রুসেডারদের হঠাৎ বিপদ!
মালাতিয়া দখলের নেশায় আচ্ছন্ন বোহেমন্ড এবার গাজি বিন দানিশমান্দের পাতা ফাঁদে আটকা পড়েন। তার সঙ্গে থাকা পাঁচশ সৈন্যও একই ফাঁদে আটকা পড়ে। (৫৩০) সেনাপতি বোহেমন্ডকে দ্রুত শৃঙ্খলিত করা হয়; তার সৈন্যদের অনেককে হত্যা করা হয় আর বাকিদের বন্দি করা হয়! (৫৩১)
নিঃসন্দেহে ক্রুসেড আগ্রাসনের এই দুর্যোগপূর্ণ সময়ে এটি ছিল অনেক মূল্যবান একটি শিকার। এটি ১১০০ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টের শুরুর দিকের ঘটনা। বোহেমন্ড অবশ্য বন্দি হওয়ার পূর্বেই এডেসার শাসক বল্ডউইনের কাছে সাহায্যবার্তা পাঠাতে সক্ষম হন। বার্তা পেয়েই বল্ডউইন মাত্র একশ চল্লিশজন সৈন্যের একটি ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে বোহেমন্ডের সাহায্যার্থে ছুটে আসেন! স্বাভাবিকভাবেই বল্ডউইনেরও একই পরিণতি বরণ করার কথা ছিল। কিন্তু গাজি বিন দানিশমান্দ তার অতি মূল্যবান শিকার নিয়ে দ্রুত মালাতিয়া থেকে সরে আসেন এবং বন্দি নরম্যান সেনাপতিকে দুর্ভেদ্য নিরাপত্তার মাঝে আটকে রাখার জন্য এশিয়া মাইনর অঞ্চলের একেবারে উত্তর প্রান্তে কৃষ্ণসাগরের উপকূলে নিকসার (Niksar) দুর্গে পৌঁছে যান। (৫৩২)
মালাতিয়ায় প্রবেশের পথ উন্মুক্ত পেয়ে বল্ডউইন তার বাহিনী নিয়ে নগরীটিতে প্রবেশ করেন। নগরবাসী তাকে স্বাগত জানায়; স্বাগত জানান নগর-প্রশাসক জিবরিলও। বল্ডউইন দ্রুত মালাতিয়াকে এডেসা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নিজ রাজ্যপরিধি বিস্তৃত করে নেন। প্রমাণ হয়ে যায়—তিনি নির্ভেজাল আন্তরিকতা নিয়ে বোহেমন্ডকে উদ্ধার করতে আসেননি। দুজনের বিরোধ ও দ্বন্দ্ব তো বেশ পুরোনো। এখন তিনি এই ভেবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন যে, ভবিষ্যতে হয়তো এর মাধ্যমে তার কোনো স্বার্থ রক্ষা হবে। তা ছাড়া এটি তো ছিল সাহায্যপ্রার্থী নগরীকে নিজের রাজ্যপরিধিতে যুক্ত করার এক অপূর্ব সুযোগ!
স্বাভাবিকভাবেই বল্ডউইন নিকসার দুর্গ পর্যন্ত তুর্কি দানিশমান্দ বাহিনীর অনুসরণ করার মতো দুঃসাহস দেখানোর চিন্তা করেননি। মালাতিয়ায় নিজ কর্তৃত্বের প্রমাণ হিসেবে এবং নগরীটিকে বশীভূতকরণের দলিল হিসেবে পঞ্চাশজন সৈন্যকে রেখে তিনি নিজে এডেসায় ফিরে যান। (৫৩৩)
টিকাঃ
৫৩০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৯। অবশ্য ইবনুল আছির বোহেমন্ডের সঙ্গে থাকা সৈন্যসংখ্যা নিয়ে অতিরঞ্জন করেছেন।
৫৩১. Grousset: Hist. des Croisades, 1, p. 378.
৫৩২. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২২৩-২২৪ ও Albert d' Aix, p. 525.