📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [সাত] শাম অঞ্চলের মুসলিম আমির ও রাজন্যবর্গ

📄 [সাত] শাম অঞ্চলের মুসলিম আমির ও রাজন্যবর্গ


কোনো প্রকার অতিরঞ্জন ছাড়াই বলা যায় যে, তৎকালে শাম অঞ্চল গোটা দশেক ইমারত ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। প্রতিটি ইমারতের একজন করে নেতা ছিল, যে মনে করত যে, সে-ই পৃথিবীর কেন্দ্রীয় ব্যক্তি! তার অনুসারীরা তাকে এমনভাবে উপস্থাপন করত যে, সে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞাবান নেতা, ইতিহাসের অদ্বিতীয় ব্যক্তি! এ দেশ তার মতো ব্যক্তি না অতীতে জন্ম দিয়েছে, না ভবিষ্যতে কখনো জন্ম দিতে পারবে! এসব নেতা কল্পনার ফানুস উড়িয়ে নিজেদের প্রবঞ্চিত করছিল, প্রতারিত করছিল জনগণকে। এরপর ক্রুসেডার বাহিনী এসে এসব অথর্ব-অযোগ্য নেতাদের মুখোশ সকলের সামনে উন্মোচিত করে দেয়।

এসব আমির ও রাজন্যের একমাত্র লক্ষ্য ছিল নিজেদের ক্ষমতার গদি ও ভূ-মালিকানা টিকিয়ে রাখা। এ কারণেই ক্রুসেডাররা যদি পুরো শাম অঞ্চলও দখল করে নেয় আর তাদের কোনো ক্ষতি না করে, তাহলে ক্রুসেড আগ্রাসনের বিষয়ে তাদের সামান্যও মাথাব্যথা ছিল না। একই কারণে তারা কেবল তখনই ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে উদ্যোগী হয়েছে, যখন নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ হুমকির সম্মুখীন মনে করেছে। আরও পরিতাপের বিষয়—যখনই তারা অগ্রসর হয়েছে, হয়তো লাঞ্ছনাকর চুক্তির পথ অবলম্বন করেছে কিংবা ব্যর্থ যুদ্ধের পর কলঙ্কজনক পলায়নের পথ বেছে নিয়েছে!

তৎকালীন শাম অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী আমির ছিলেন দুজন—দামেশকের অধিপতি দাক্কাক বিন তুতুশ ও আলেপ্পোর অধিপতি রিজওয়ান বিন তুতুশ। দুজনই ছিলেন ইসলামি চেতনা ও মূল্যবোধ-শূন্য স্বার্থবাদী ও সুবিধাবাদী নেতা। শুধু এতটুকুই নয়; তারা দুজন পরস্পর সহোদর হওয়া সত্ত্বেও পরস্পর দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ও অব্যাহত শত্রুতায় লিপ্ত ছিলেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল যে, তারা তাদের পিতা তুতুশ বিন আরসালানের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রেই আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা ও অবিচক্ষণতার বৈশিষ্ট্য লাভ করেছিলেন! এ কারণেই ক্রুসেড আগ্রাসনের মোকাবিলায় দামেশক ও আলেপ্পোর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার কোনো পথ খোলা ছিল না।

এই দুই শাসক ও অন্য শাসকগণ যে লাঞ্ছনাকর পরিস্থিতির মাঝে জীবন কাটাচ্ছিল, তার পাশাপাশি আলেপ্পো-অধিপতি রিজওয়ান বিন তুতুশ আরও নিকৃষ্টতর এক পথ অবলম্বন করেছিলেন। রিজওয়ান মনে করতেন যে, তার আশেপাশের শক্তিগুলো দিনে দিনে শক্তিশালী হয়ে উঠছে আর তিনি দুর্বলই থেকে যাচ্ছেন। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি নিজেকে শক্তিশালী করার জন্য মিশরের উবায়দি সাম্রাজ্যের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময়ের সিদ্ধান্ত নেন। সময়ের পরিক্রমায় কেবল সহযোগিতা বিনিময়ে সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি একসময় শিয়া ইসমাইলি মতাদর্শ গ্রহণ করেন এবং ইসমাইলি মতাদর্শের প্রচারকে পরিণত হন। রিজওয়ান আলেপ্পোতে বিভিন্ন বড় পদে ইসমাইলি প্রচারকদের নিযুক্ত করেন। তার এই নীতির কারণে আলেপ্পোতে ইসমাইলি প্রচারকগণ ব্যাপক ক্ষমতা ও মর্যাদা লাভ করে। আলেপ্পোর বাতিনি ইসমাইলি সম্প্রদায়ের নেতা হাকিম মুনাজজিম রিজওয়ানের অতি আস্থাভাজন ব্যক্তিতে পরিণত হন।

এসব কারণে অন্যান্য অঞ্চলের সেলজুক নেতৃবৃন্দ রিজওয়ানের প্রতি অত্যন্ত বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। কারণ, ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার পর থেকেই সেলজুকরা ছিল বিশুদ্ধ সুন্নি চিন্তাধারার অনুসারী। শুধু তা-ই নয়; সেলজুকরা জীবনের বিভিন্ন অঙ্গনে সুন্নি মতাদর্শের সংরক্ষণ ও প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করত। সেলজুকরাই ইতিপূর্বে ৪৪৭ হিজরি সনে (১০৫৫ খ্রিষ্টাব্দে) আব্বাসি খিলাফতকে শিয়া বুওয়াইহিদের কর্তৃত্বের নাগপাশ থেকে উদ্ধার করেছিল। (৫০৭) এ কারণেই রিজওয়ানের গৃহীত এই আচরণ ও অবস্থান পুরো সেলজুক পরিবারের নিকট এক বিরল ও আশ্চর্য কাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। এর দ্বারা তার সুবিধাভোগী ব্যক্তিত্বই অবশ্যম্ভাবীরূপে ফুটে উঠেছিল। অন্য সব দৃষ্টিকোণ বাদ দিয়ে তার একমাত্র দৃষ্টি ছিল ব্যক্তিস্বার্থ এবং ব্যক্তিলালসার প্রতি। মোটামুটি এমনই ছিল ক্রুসেড শক্তির আগ্রাসন চলাকালে শাম অঞ্চলের রাজন্যবর্গের প্রকৃতি।

টিকাঃ
৫০৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৩২৩।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [আট] কিলিজ আরসালান ও রোমান সেলজুক শক্তি

📄 [আট] কিলিজ আরসালান ও রোমান সেলজুক শক্তি


ইসলামি ভূখণ্ডে প্রবেশ করেই এশিয়া মাইনর অঞ্চলে ক্রুসেডার বাহিনীর প্রচণ্ড লড়াই, কিলিজ আরসালানের নেতৃত্বে সেলজুকদের প্রতিরোধ এবং রোমান সেলজুক রাষ্ট্রের রাজধানী নিকিয়াসহ বিভিন্ন নগরীর পতন ইত্যাদি বিষয়ে আমরা পূর্বেই আলোচনা করে এসেছি। তবে এ তথ্যটি প্রণিধানযোগ্য যে, ক্রুসেডাররা এশিয়া মাইনর অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অভিযান চালায়নি; বরং তাদের লক্ষ্য ছিল শাম অভিমুখে গমনের পথে বিদ্যমান ইসলামি শক্তিগুলোকে ধ্বংস করে পথ পরিষ্কার করা। মূলত এটি ছিল বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোসের একটি দুষ্ট পরিকল্পনা। সম্রাট চেয়েছিলেন, ক্রুসেডাররা এ পথেই অগ্রসর হয়ে তৎকালীন বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের ঐতিহ্যগত শত্রু সেলজুকদের ধ্বংস করবে এবং এর মাধ্যমে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য তার পুরোনো নগরীগুলো পুনরুদ্ধারও করতে পারবে। অথচ বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য চাইলে তার বিশাল ও সমৃদ্ধ নৌবহর ব্যবহার করে ক্রুসেডারদের জাফা, আসকালান বা হাইফার মতো বাইতুল মুকাদ্দাসের নিকটবর্তী শামের উপকূলীয় কোনো অঞ্চলে পৌঁছিয়ে দিতে পারত। কিন্তু এটি সুস্পষ্ট যে, প্রতিটি পক্ষই নিজ স্বার্থ অনুসন্ধান করে ফিরছিল।

এ কারণেই নিকিয়া যুদ্ধ ও দোরিলায়ুমের যুদ্ধের মতো প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী বিভিন্ন যুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ক্রুসেডার শক্তি এশিয়া মাইনর ভূখণ্ডে অবস্থান করতে চায়নি। এ বিষয়টিও লক্ষণীয় যে, এশিয়া মাইনর অঞ্চল ছিল কঠিন ভৌগোলিক প্রকৃতিবিশিষ্ট। এ কারণে এ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা খুব কঠিন কাজ ছিল। তা ছাড়া অঞ্চলটি ছিল চরম সাম্রাজ্যবাদী চেতনার ধারক বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের একেবারে নিকটে। অধিকন্তু এসব যুদ্ধে ও এন্টিয়ক যাওয়ার পথে ক্রুসেডার বাহিনীর প্রচুর জনবল ক্ষয় হয়েছিল। আর তাই এ অঞ্চলে ক্রুসেডার বাহিনীর বেশিদিন অবস্থান ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

এ সবকিছু বিবেচনা করে ক্রুসেডার বাহিনী এশিয়া মাইনর অঞ্চলে সাম্রাজ্য বিস্তারের পরিবর্তে নিজ সামরিক শক্তি এ অঞ্চল থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অবশ্য এশিয়া মাইনর অঞ্চলের নিকটবর্তী এন্টিয়ক ও এডেসা রাজ্যের নগরীগুলোতে কিছু ক্রুসেডার সৈন্য রয়ে গিয়েছিল। একই কারণে ক্রুসেড অভিযানের অল্প কিছুদিন পরই এশিয়া মাইনর অঞ্চল সম্পূর্ণ ক্রুসেডারশূন্য হয়ে পড়ে এবং এ অঞ্চলের কর্তৃত্ব বণ্টিত হয়ে পড়ে দুই শক্তির মাঝে—পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলে বাইজান্টাইন শক্তি এবং পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে রোমান সেলজুক শক্তি।

এই একই কারণে রোমান সেলজুকরা একাধিক যুদ্ধক্ষেত্রে ক্রুসেডারদের কাছে তিক্ত পরাজয়ের শিকার হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের অস্তিত্ব ও সংখ্যা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। সেলজুকদের সর্বোচ্চ এতটুকু ক্ষতি হয়েছিল যে, এশিয়া মাইনরের পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের কিছু দুর্গের কর্তৃত্ব তাদের হাত থেকে ছুটে গিয়েছিল। ক্রুসেড আগ্রাসনের পরও সেলজুক সেনাবাহিনী ও জনগণ এশিয়া মাইনর অঞ্চলের বিস্তৃত ও দুর্গম পাহাড়ি প্রকৃতিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যমান ছিল।

এ অঞ্চলে সেলজুকদের নেতৃত্বে ছিলেন সুলতান কিলিজ আরসালান। তিনি ক্রুসেডারদের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রচুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। কিন্তু এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, শীঘ্রই তিনি হৃত ভূখণ্ড ও বিনষ্ট সম্পদ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে মাঠে নামবেন।

কিলিজ আরসালান ও সেলজুকরাই এশিয়া মাইনর অঞ্চলের একমাত্র ইসলামি শক্তি ছিল না। পূর্বে আমরা যেমন বলে এসেছি, এ অঞ্চলে তুর্কি দানিশমান্দ পরিবারও বসবাস করত। বনু দানিশমান্দ এশিয়া মাইনরের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। দানিশমান্দ পরিবার সর্বদাই সেলজুকদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে থাকত। একমাত্র ক্রুসেডারদের আগ্রাসনের সময় উভয় পক্ষের মধ্যে সাময়িক ঐক্য স্থাপিত হয়েছিল। ক্রুসেডাররা এ অঞ্চল ছেড়ে সামনে অগ্রসর হওয়ার পর প্রত্যাশিতভাবেই আবারও উভয় পক্ষের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক ফিরে আসে।

পরিবর্তিত নতুন পরিস্থিতিতে কিলিজ আরসালান ও দানিশমান্দ পরিবারের প্রতিক্রিয়া কী হবে? এশিয়া মাইনর অঞ্চলের পরিস্থিতিই-বা কী হবে? এসব প্রশ্নের উত্তরও আমাদের জানা প্রয়োজন!

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [নয়] শাম ও এশিয়া মাইনর অঞ্চলের খ্রিস্টান জনগণ

📄 [নয়] শাম ও এশিয়া মাইনর অঞ্চলের খ্রিস্টান জনগণ


শাম অঞ্চল ও ফিলিস্তিনে প্রচুর সংখ্যক খ্রিষ্টান নাগরিকের বসবাস ছিল।

এশিয়া মাইনর অঞ্চলেও ছিল প্রচুর সংখ্যক খ্রিষ্টানের উপস্থিতি।

নিঃসন্দেহে এসব অঞ্চলে প্রচুর সংখ্যক খ্রিষ্টান জনসাধারণের উপস্থিতি ইসলামের উদারতা ও ন্যায়পরায়ণতার এক সুস্পষ্ট দলিল। এ অঞ্চলে ইসলামি শাসনের দীর্ঘ পাঁচ শতাব্দী অতিবাহিত হওয়ার পরও ইসলাম-বিরোধী এসব মানুষ কোনো ধরনের নির্যাতন-নিপীড়ন, হত্যা বা বিতাড়নের সম্মুখীন না হয়ে বসবাস করছিল। অথচ একই সময়ে আন্দালুসের অধিকৃত অঞ্চলে ক্রুসেডাররা মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যা ও বিতাড়িত করেছিল। অধিকন্তু কালের পরিক্রমায় যুগে যুগে নিরপেক্ষ বিভিন্ন ব্যক্তি মুসলমানদের এই ন্যায়পরায়ণতার সাক্ষ্যও প্রদান করেছেন।

শাম অঞ্চলের অধিকাংশ খ্রিষ্টান ছিল অর্থোডক্স মতাদর্শী। তারা অর্থোডক্স সম্প্রদায়ের প্রধান কেন্দ্র ও বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলের আনুগত্য করত। এ কারণেই রাজনৈতিক, সামরিক ও ধর্মীয় সকল ক্ষেত্রেই তাদের প্রথম ও প্রধান মিত্রতা ছিল বাইজান্টাইনদের সঙ্গে। অবশ্য মতাদর্শের ভিন্নতা সত্ত্বেও এসব খ্রিষ্টান নাগরিক এ অঞ্চলে ক্যাথলিক ক্রুসেডারদের অভিযানে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিল এবং সম্ভাব্য সকল পন্থায় তাদের পথ সুগম করেছিল। কারণ, মতাদর্শের ভিন্নতা থাকলেও মূল ধর্মবিচারে উভয় পক্ষ ছিল খ্রিষ্টান। তা ছাড়া ক্রুসেডাররা তাদের প্রতিষ্ঠিত রাজ্যগুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব খ্রিষ্টান নাগরিকের ওপরই নির্ভর করত। মুসলমানদের তো কোনো ক্রুসেড রাজ্যের অভ্যন্তরে থাকারই সুযোগ দেওয়া হয়নি। সবকিছু মিলিয়ে চলমান পরিস্থিতি এ অঞ্চলের খ্রিষ্টানদের আপন অবস্থায় থাকতেই উদ্বুদ্ধ করেছিল।

ক্রুসেডাররাও নিজেদের মেধাবলে এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে, আদর্শগত বিরোধ থাকলেও এ অঞ্চলে টিকে থাকার জন্য অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের সঙ্গে বিরোধে না জড়ানোই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। এ কারণেই তারা সর্বোচ্চ বড় বড় গির্জাগুলোকে ক্যাথলিক গির্জায় রূপান্তরিত করেছিল; কিন্তু ব্যাপকভাবে সকল খ্রিষ্টান নাগরিককে আপন আপন মতাদর্শ পালনের সুযোগ দিয়ে রেখেছিল।

অপরদিকে এশিয়া মাইনর অঞ্চলের অধিকাংশ খ্রিষ্টান নাগরিক ছিল আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর। শামের অর্থোডক্স খ্রিষ্টানরা যদিও সচ্ছল জীবন ও অবাধ কর্মক্ষেত্র প্রাপ্তিতেই তুষ্ট ছিল; এশিয়া মাইনর অঞ্চলের আর্মেনীয় খ্রিষ্টানদের স্বপ্ন ছিল আরও বিস্তৃত। তারা নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রক্ষমতার স্বপ্ন দেখত। দীর্ঘদিন তারা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধীনে বসবাস করেছিল, এরপর বসবাস করেছিল সেলজুকদের অধীনে। আর্মেনীয় খ্রিষ্টানগণ স্বতন্ত্র গির্জার অনুসারী হলেও আদর্শগত দিক থেকে ক্যাথলিক গির্জার তুলনামূলক নিকটতর ছিল। আর্মেনীয়রা সংখ্যায় ছিল অনেক, এ অঞ্চলে তাদের ছিল দীর্ঘ ইতিহাস ও নিজস্ব ভাষাপরিচয়-বৈশিষ্ট্য। এসব কারণে তাদের আশা ও স্বপ্ন কারও অধীনতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। একই কারণে আর্মেনীয় খ্রিষ্টানদের বড় একটি অংশ এশিয়া মাইনরের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে বিশেষ করে কিলিকিয়া অঞ্চলে সমবেত হয়েছিল, যেমনটি আমরা পূর্বে উল্লেখ করে এসেছি।

শামের খ্রিষ্টানদের মতোই আর্মেনীয়রাও ক্রুসেডারদের আগমনে অত্যন্ত খুশি হয়েছিল। তাদের দৃষ্টিতে এ অভিযান ছিল প্রথমত মুসলিম সেলজুকদের শাসন থেকে নিষ্কৃতির সুযোগ, দ্বিতীয়ত বিরোধী মতাদর্শী বাইজান্টাইন অর্থোডক্সদের হাত থেকেও নিষ্কৃতির পথ। এ কারণেই তারা ক্রুসেডারদের সাদরে স্বাগত জানিয়েছিল এবং তাদেরকে নিজেদের মুক্তিদাতা বিবেচনা করেছিল। অবশ্য তখনও পর্যন্ত তারা দাসত্বকেন্দ্রিক জায়গিরব্যবস্থা-নির্ভর ইউরোপীয় শাসনপদ্ধতি আস্বাদন করে দেখেনি। আর তাই প্রশ্ন থেকে যায় যে, পরবর্তী সময়ে যখন তাদের সামনে ইউরোপীয় 'মুক্তিদাতা'দের শাসনপদ্ধতি সুস্পষ্ট হবে, তখন তাদের আচরণ কেমন হবে? ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায়ের কাছেই এ প্রশ্নের উত্তর তোলা থাক!

এশিয়া মাইনর অঞ্চলে বিরাজমান রাজনৈতিক মন্দা এবং সেলজুক, বাইজান্টাইন ও ক্রুসেডারদের পারস্পরিক যুদ্ধব্যস্ততার সুযোগ কাজে লাগিয়ে আর্মেনীয়রা বিশেষ করে এশিয়া মাইনরের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত বিভিন্ন নগরীতে স্বাধীন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল। সম্পূর্ণ আর্মেনীয় জনগণ-নির্ভর এসব অঞ্চলকে কাঠামোগত দিক থেকে রাজ্য না বলে উপরাজ্য বলাই সমীচীন। এমনই একজন আর্মেনীয় নেতা ছিলেন কোগ বাসিল। তিনি সম্পূর্ণ আর্মেনীয় নাগরিক অধ্যুষিত একটি শক্তিশালী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। রাজ্যটির মূলকেন্দ্র ছিল কায়সুম ও রাবান নগরী। তার প্রভাব এত বিস্তৃত ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, ক্রুসেডাররাও অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।

এ বিষয়টিও প্রণিধানযোগ্য যে, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এডেসা রাজ্যের অধিকাংশ নাগরিক ছিল আর্মেনীয় খ্রিষ্টান। নিঃসন্দেহে আগামী দিনগুলোতে চলমান ঘটনাপ্রবাহে এ বিষয়টিও অন্যতম প্রভাবক বিবেচিত হবে।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [দশ ও সর্বশেষ] মুসলিম জনসাধারণ!

📄 [দশ ও সর্বশেষ] মুসলিম জনসাধারণ!


ঐতিহাসিকদের অনেকেই সর্বক্ষেত্রে শাসক ও রাজনীতিবিদদের পূর্ণ সমালোচনা করেন এবং প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ কোনোভাবেই তাদের অধীনস্থ জনসাধারণের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেন না। হ্যাঁ, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বিভিন্ন বিষয়ে শাসকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবক। কিন্তু এতেও কোনো সন্দেহ নেই যে, আমাদের আলোচ্য কালে এ অঞ্চলে যে বেদনাদায়ক ঘটনাপ্রবাহ সংঘটিত হয়েছে, তার দায়ভার কিছুটা হলেও জনগণের ওপর বর্তায়।

শাসকগণ তো জনগণেরই আমলনামা! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন—

«كَمَا تَكُوْنُوْنَ يُوَلَّى عَلَيْكُمْ»

তোমরা যেমন প্রকৃতির হবে, তোমাদের দায়িত্ব তেমন প্রকৃতির মানুষকেই প্রদান করা হবে। (৫০৮)

সুতরাং জনগণ সৎ হলে আল্লাহ তাআলা কোনো সৎ ব্যক্তিকেই তাদের দায়িত্বে নিয়োজিত করেন। জনগণ জিহাদি চেতনায় উজ্জীবিত হলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদের জন্য কোনো মুজাহিদ নেতাকেই সুলভ করে দেন। আর জনগণ যদি হয় নতজানু, দুর্বল এবং কোনোমতে দু- মুঠো খাবারের নিশ্চয়তা বা ভালো কোনো চাকুরি পেতে আগ্রহী, আল্লাহ তাদেরকে এমন কোনো জালিম শাসকের শাসনজালে আটকে দেন, যে তাদের দ্বীন-দুনিয়া সবই নষ্ট করে। একজন শাসক তো প্রকৃতপক্ষে তার জনগণ থেকেই শক্তি আহরণ করে। নয়তো বলুন, কোন শাসক জনগণ ছাড়া শাসনকার্য চালাতে পারে? সেনাবাহিনী, মন্ত্রিপরিষদ, রাষ্ট্রদূত, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি, চাকুরিজীবী-ব্যবসায়ী—এককথায় বিভিন্ন স্তরের নাগরিকদের সহায়তা ছাড়া কে দেশ চালাতে পারে? এরা সকলে যদি শাসকের পক্ষ ত্যাগ করে, তাহলে একজন শাসক কীভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করতে পারে?

তা ছাড়া যে শাসক ধর্ম ও মাতৃভূমি শত্রুদের কাছে বিকিয়ে দেয়, আল্লাহর দ্বীনের সমালোচনা করে তাতে বিকৃত সাধনের চেষ্টা করে, জনগণকে তার পেছনে পরিচালিত হতে কে বাধ্য করেছে?! কেবলই তরবারি ও চাবুকের ভয়?! এ সকল জনগণ কি জানে না যে, এই পৃথিবীর কোনো মানুষের 'আজাল' ও চূড়ান্তক্ষণের আগমনে আগ-পিছ হয় না এবং আসমান-জমিনের রব প্রত্যেকের জন্য যে রিজিক নির্দিষ্ট রেখেছেন, তাতে সামান্যও হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে না?!

এগুলো তো একেবারেই স্বতঃসিদ্ধ বিষয়; প্রতিটি মুসলমানের আবশ্যিক আকিদা। কোনো সচেতন-সতর্ক ও বোধসম্পন্ন নাগরিকের চিন্তা-চেতনা থেকে তো এসব বিষয় অদৃশ্য হতে পারে না। ধর্ম ও বিশ্বাসের ভিন্নতা সত্ত্বেও পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডের জনসাধারণ এই স্বতঃসিদ্ধ বিষয়গুলো যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে এবং সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করছে। তাহলে যাদেরকে আল্লাহ তাআলা কুরআন ও সুন্নাহর নিয়ামত দান করেছেন, সেই মুসলিম জাতি কেন তা অনুধাবন করতে পারবে না?!

আর তাই রিজওয়ান বিন তুতুশ বা তার মতো স্থূলবুদ্ধিসম্পন্ন নেতারা যখন দেশ উজাড় করে দিয়েছে, জনগণের প্রতি অন্যায় আচরণ করেছে এবং আমাদের শক্তি ও নিয়তির ওপর কর্তৃত্ব বিস্তারের জন্য উম্মাহর চরম শত্রুদের সামনে পথ উন্মুক্ত ও সহজ করে দিয়েছে, তাদের শাসনে যেসব জনগণ তুষ্ট ও সন্তুষ্ট ছিল, তাদেরকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা আমাদের জন্য আবশ্যক নয়। সেসব জনগণকে ক্ষমা করাও আমাদের দায়িত্ব নয়, যারা সর্বোচ্চ কয়েকদিনের জীবনধারণের অনুমতি লাভের বিনিময়ে ক্রুসেডারদের শাসনকে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিয়েছে। ক্ষমা করতে পারব না সেসব জনগণকেও, যারা এমন শত্রুর সঙ্গে লেনদেন করে গেছে, যারা তাদের নির্বিচারে হত্যা করেছে, মসজিদ জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং ধনসম্পদ লুট করে নিয়েছে। ঠিক তেমনই সেসব জনগণকেও কক্ষনো ক্ষমা করা উচিত নয়, যারা তাদের অভিধান থেকে 'জিহাদ' শব্দটি মুছে দিয়েছে; এমনকি এমন কঠিন ও সঙ্গিন মুহূর্তেও, যখন তাদের ভূখণ্ড জবরদখল হয়ে গিয়েছিল এবং জিহাদ প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজে আইন ও আবশ্যক হয়ে গিয়েছিল। আসমানি হোক বা মানবরচিত—পৃথিবীর প্রতিটি জীবনবিধানই এমন নিপীড়িত জাতিকে প্রতিরোধ, সংগ্রাম ও লড়াইয়ের অনুমতি দেয়, যাদের ভূখণ্ড অন্যায়ভাবে দখল করা হয়েছে। তাহলে যে মুসলিম জনগণের জন্য আল্লাহ তাআলা জিহাদকে তার দ্বীনের শীর্ষ চূড়া গণ্য করেছেন, তারা কীভাবে পরিত্যাগ করতে পারে সংগ্রামী জীবন?!

এটি মোটেও কঠোর কোনো কথা নয়; বরং পুরোপুরি বাস্তব কথা। অচিরেই আমরা এমন একদিনের দেখা পাব, যেদিন জনগণ নিজেদের দায়িত্ব ও ভূমিকা উপলব্ধি করতে পারবে এবং তারা তাদের শাসকদের কাছে এই দাবি জানাতে অগ্রসর হবে যে, হয় অন্যায়-বিচার বিদূরিত করার জন্য লড়াই শুরু করুন, নয়তো পরিস্থিতি সংশোধনের জন্য অন্য কারও হাতে দায়িত্ব ছেড়ে দিন। যখন আমরা সেই দিনের দেখা পাব, তখন পরিবেশ-পরিস্থিতি বদলে যাবে, সমাজ থেকে জুলুম-অত্যাচার দূরীভূত হবে, লাঞ্ছনাকর পরিস্থিতির অবসান ঘটবে এবং জনসাধারণ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হবে।

ক্রুসেডারদের ইসলামি ভূখণ্ডে প্রবেশের দুই বছর পর মোটামুটি এই ছিল পরিস্থিতি। এই পুরো পর্যালোচনাকে আমরা সংক্ষেপে এভাবে উল্লেখ করতে পারি—

১. এডেসা, এন্টিয়ক ও বাইতুল মুকাদ্দাসকেন্দ্রিক তিনটি ক্রুসেডার রাজ্য ইতিমধ্যে গড়ে উঠেছে। আর ৪র্থ রেমন্ড এখনো নিজের জন্য একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হন্যে হয়ে ঘুরছেন।

২. রোমের ক্যাথলিক গির্জা বাইতুল মুকাদ্দাসের ওপর গির্জার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রচেষ্টা চালানোর জন্য পিসার প্রধান বিশপ ডেমবার্টকে ইসলামি ভূখণ্ডে প্রেরণ করেছে।

৩. বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য এশিয়া মাইনর অঞ্চলের পশ্চিম অংশ পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু তারা এডেসা, এন্টিয়ক ও বাইতুল মুকাদ্দাস অধিকার করতে ব্যর্থ হয়েছে। সন্দেহ নেই যে, চলমান পরিস্থিতিতে তারা মোটেও তুষ্ট নয়।

৪. আব্বাসি খলিফার হাল অত্যন্ত করুণ। এই সংকটময় পরিস্থিতির পরিবর্তনে তিনি কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন, এমন আশা করার সুযোগই নেই।

৫. পারস্যের সেলজুক সুলতান বারকিয়ারুক নিজ রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দমনে ব্যস্ত। তা ছাড়া শাম অঞ্চলের প্রশাসকগণের সঙ্গে তার গভীর বিরোধ রয়েছে।

৬. কায়রোর উবায়দি খলিফার বাইতুল মুকাদ্দাস ও ফিলিস্তিন নিয়ে নিজস্ব স্বপ্ন ও লালসা আছে; যদিও ক্রুসেডারদের মোকাবিলা করার পূর্ণ শক্তি-সাহস তার নেই।

৭. শাম অঞ্চলের ইসলামি রাজ্যগুলোর রাজন্যবর্গ ঈমানি চেতনা ও নির্বাহী দায়িত্ব উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত দুর্বল। আর তাই তৎকালে মুসলিম উম্মাহ যে সংকটের শিকার হয়েছিল, তার ভয়াবহতা অনুমান করার শক্তি তাদের ছিল না।

৮. কিলিজ আরসালানের নেতৃত্বে রোমান সেলজুকরা তখনও এশিয়া মাইনর অঞ্চলে টিকে ছিল। তারা যদিও শাম-সমস্যা হতে পুরোপুরি মুক্ত ছিল; কিন্তু নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছিল।

৯. অর্থোডক্স খ্রিষ্টানরা ক্রুসেডারদের সাদরে বরণ করে নিয়েছে। আর্মেনীয়রাও তাদেরকে স্বাগত জানিয়েছে; তবে তারা বিশেষ করে এশিয়া মাইনর অঞ্চলের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে নিজেদের জন্য স্বাধীন ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন লালন করছে।

১০. অধিকৃত অঞ্চলসমূহ ও অন্যান্য অঞ্চলের মুসলিম জনগণ চলমান পরিস্থিতি মেনে নিয়েছে। কারণ, তারা যেকোনো মূল্যে যেকোনোভাবে বেঁচে থাকতে চায়। তাদের প্রত্যাশা ও কামনা তখনও জিহাদ, সংগ্রাম ও ত্যাগের চেতনার স্তরে উন্নীত হয়নি।

বাইতুল মুকাদ্দাস পতনের পর খ্রিষ্টীয় একাদশ শতাব্দীর শেষাংশে (হিজরি পঞ্চম শতকের শেষ দিকে) নির্দিষ্ট করে বললে ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দের জুলাইয়ের শেষে (৪৯২ হিজরির রমজানে) এই হলো এশিয়া মাইনর, শাম ও ফিলিস্তিন অঞ্চলের পরিস্থিতি।

টিকাঃ
৫০৮. আবু আবদুল্লাহ আল-কুযায়ি, মুসনাদুশ শিহাব, হাদিস নং ৫৭৭। ইমাম বায়হাকি রহ. একই অর্থবোধক একটি হাদিস ভিন্ন শব্দে রেওয়ায়েত করেছেন। দেখুন : বায়হাকি, শুআবুল ঈমান, হাদিস নং ৭৩৯১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00