📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [পাঁচ] বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের সুলতান বারকিয়ারুক বিন মালিকশাহ

📄 [পাঁচ] বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের সুলতান বারকিয়ারুক বিন মালিকশাহ


পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, বৃহত্তর সেলজুক দ্বারা সেসব সেলজুক উদ্দেশ্য, যারা পারস্য ও তার আশেপাশের অঞ্চল শাসন করত। তারাই আব্বাসি খিলাফত ও ইরাকে নিজেদের কর্তৃত্ব বিস্তার করেছিল। বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের সুলতানরা ছিল পুরো সেলজুক বংশের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ। সম্ভবত তারাই ছিল সমকালীন সবচেয়ে ক্ষমতাধর ইসলামি শক্তি।

কিন্তু অত্যুচ্চ সামরিক শক্তির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তারা শাম অঞ্চলে চলমান উত্তপ্ত ঘটনাপ্রবাহকে প্রতিরোধ করার জন্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। অবশ্য সেলজুকদের প্রধান সুলতান বারকিয়ারুকের নির্দেশনায় মসুলের আমির কারবুগার নেতৃত্বে একটি দুর্বল ও গুরুত্বহীন বাহিনী ক্রুসেডারদের মোকাবিলায় প্রেরিত হয়েছিল, যার পরিণতি পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো-বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের কর্ণধারগণ এই ভয়াবহ সংকটেও কেন স্পন্দিত হলেন না? অথচ ইতিপূর্বে বিশেষ করে তাদের মহান পিতামহ আলপ আরসালানের শাসনামলসহ বিভিন্ন সময়ে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গনে তাদের উজ্জ্বল ও গৌরবময় অবদানের অনন্য ইতিহাস রয়েছে।

এ প্রশ্নের উত্তর যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে হলে আমাদের কয়েক বছর পেছনে ফিরে গিয়ে ক্রুসেডারদের ইসলামি ভূখণ্ডে প্রবেশকালে পারস্য ও ইরাকের সেলজুক সুলতান বারকিয়ারুক ও রোমান সেলজুকদের মধ্যকার সম্পর্কের ব্যাপারে জানতে হবে।

আলপ আরসালান মৃত্যুর সময় কয়েকজন সন্তান রেখে গিয়েছিলেন। তার বড় পুত্র মালিকশাহ বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্য শাসন করতেন। মালিকশাহর শাসনামলেই বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্য গৌরব ও মর্যাদার সর্বোচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত হয় এবং রাষ্ট্রসীমা পূর্বে চীন সীমান্ত হতে পশ্চিমে শাম অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।(৪৯৮) অপরদিকে আলপ আরসালানের আরেক পুত্র তুতুশ শামের অধিকাংশ এলাকা শাসন করতেন। (৪৯৯) তুতুশ নিজ রাজ্যের সীমা বিস্তারে যথেষ্ট আগ্রহী হলেও তার শক্তিশালী ভাই মালিকশাহকে ভয় ও সমীহ করতেন। ৪৮৪ হিজরি সনে (১০৯২ খ্রিষ্টাব্দে) মালিকশাহ ইন্তেকাল করলে তার পুত্র বারকিয়ারুক তার স্থলাভিষিক্ত হন এবং বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের হাল ধরেন। বারকিয়ারুক ছিলেন একেবারেই নবীন, বয়স তখনও পনেরো হয়নি। এ সময় তুতুশ তার ভাই মালিকশাহর মৃত্যুপরবর্তী অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বারকিয়ারুকের সাম্রাজ্যের প্রতি লালায়িত হয়ে ওঠেন এবং তার বাহিনী নিয়ে আলেপ্পো অভিমুখে রওনা হন। তিনি ভ্রাতুষ্পুত্র বারকিয়ারুকের কাছ থেকে অন্যান্য নগরীও কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। আলেপ্পো তখন হাজিব আক সুনকুরের শাসনাধীন ছিল। আক সুনকুর ছিলেন বারকিয়ারুকের অনুগত মিত্র। কিন্তু নিজ বাহিনীর শিথিলতা ও বারকিয়ারুকের দুর্বলতার কারণে আক সুনকুর তুতুশের সামনে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন এবং বাহ্যিকভাবে তার সঙ্গে মিলিত হন। এরপর তিনি, এন্টিয়কের মুসলিম শাসক ইয়াগিসিয়ান ও এডেসার মুসলিম শাসক বুজান সকলে তুতুশের সঙ্গে মিলে একসঙ্গে রওনা হন। (৫০০) অথচ এই সবগুলো নগরী মৃত্যুর পূর্বে মালিকশাহর কর্তৃত্বাধীন ছিল। সম্মিলিত বাহিনী বারকিয়ারুকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য পারস্যের দক্ষিণাঞ্চল অভিমুখে অগ্রসর হয়। এটি ৪৮৫ হিজরি সনের (১০৯৩ খ্রিষ্টাব্দের) ঘটনা। তুতুশের আশা প্রায় বাস্তবায়িত হয়েই গিয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আক সুনকুর ও ইয়াগিসিয়ান তুতুশকে ছেড়ে তাদের সাবেক সুলতান বারকিয়ারুকের পক্ষে যোগ দেন। ফলে তুতুশের পরিকল্পনা মাঠে মারা যায় এবং তিনি দ্রুত দামেশকে ফিরে আসেন। আক সুনকুরও নিজ এলাকা আলেপ্পোতে এবং বুজান এডেসায় ফিরে আসেন। ৪৮৬ হিজরি সনে (১০৯৬ খ্রিষ্টাব্দে) তুতুশ পুনরায় আলেপ্পোতে আক্রমণ করেন। (৫০১) আক সুনকুর বুজানের সঙ্গে জোট বেঁধে তার মোকাবিলা করলেও এবার তুতুশ জয়লাভ করেন এবং তিনি তৎক্ষণাৎ আক সুনকুর ও বুজানকে হত্যা করেন। ফলে আলেপ্পো, দামেশক ও শামের বৃহত্তর অংশে তুতুশের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। (৫০২)

৪৮৭ হিজরি সনে (১০৯৫ খ্রিষ্টাব্দে) অর্থাৎ ক্রুসেড অভিযান শুরু হওয়ার মাত্র দুই বছর পূর্বে তুতুশ তার বাহিনী নিয়ে নতুন করে ভ্রাতুষ্পুত্র বারকিয়ারুকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পারস্যের রায় অঞ্চলের নিকটে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কিন্তু এবার তুতুশ পরাজিত ও নিহত হন! (৫০৩)

তুতুশ নিহত হলেও বারকিয়ারুক নিজের পারস্য ও ইরাককেন্দ্রিক রাজ্য নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেন। তিনি শাম অঞ্চলকে আপন রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেননি। ফলে তুতুশের রাজত্ব তার দুই পুত্রের মাঝে বিভক্ত হয়ে যায়। রিজওয়ান বিন তুতুশ লাভ করেন আলেপ্পোর দায়িত্ব আর দাক্কাক বিন তুতুশ লাভ করেন দামেশকের দায়িত্ব। (৫০৪)

এ আলোচনা দ্বারা আমাদের সামনে সুস্পষ্ট হয়েছে যে, বারকিয়ারুক ছিলেন আলেপ্পো ও দামেশকের আমিরদ্বয়ের চাচাতো ভাই। তিনি শুধু তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী এবং তাদের শাসনের প্রতি বিতৃষ্ণই ছিলেন না; বরং তাদের পিতা তুতুশের হত্যাকারীও ছিলেন। বারকিয়ারুক মনে করতেন, যেমনটি আমরাও মনে করি যে, তুতুশের লালসা সীমাতিক্রম করেছিল এবং তুতুশ তার ভাই মালিকশাহর পরিবারের ও মহান পিতা আলপ আরসালানের মর্যাদার কোনো পরোয়াই করেননি; পরোয়া করেননি মুসলিম জনগণের মর্যাদার এবং পবিত্র ধর্ম ইসলামের মর্যাদার। তার সাম্রাজ্যবাদী লালসার বলি হয়ে হাজারো মুসলমানের প্রাণ ধ্বংস হয়েছে। আর ইসলাম তো এ ধরনের ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক যুদ্ধকে নিষিদ্ধ করেছে, যা ইসলামি ভূখণ্ডে কেবল ফিতনাই সৃষ্টি করে।

এর মাধ্যমে আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে, সুলতান বারকিয়ারুক কেন ক্রুসেড আগ্রাসনের সময় শাম অঞ্চলের সহায়তায় উদ্দীপ্ত হননি।

এটি হলো একটি দিক।

আরেকটি দিক হলো, পারস্য ও ইরাক অঞ্চলে আরও কিছু বিদ্রোহ ও বড় বড় সমস্যা সংঘটিত হয়েছিল। বারকিয়ারুকের ভাই মুহাম্মাদ বিন মালিকশাহ তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন এবং রাজ্যের একটি অংশের ক্ষমতা দাবি করেছিলেন। (৫০৫) একে কেন্দ্র করে কয়েক বছর ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ সংঘাত চলতে থাকে। নিঃসন্দেহে বারকিয়ারুক ও মুহাম্মাদের মধ্যকার এই দীর্ঘ সংঘাত ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি উভয়ের সামনে শাম ও ফিলিস্তিন অঞ্চলের মুসলমানদের সমস্যার প্রতি উদ্যোগী হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

তৎকালীন মুসলিম উম্মাহর অবস্থা ছিল কুরআনে বর্ণিত সেই নারীর ন্যায়, যে বহু পরিশ্রম করে মজবুত সুতা তৈরি করার পর পাক খুলে তা টুকরো টুকরো করে ফেলেছে। আলপ আরসালানের শাসনামলে শক্তির সর্বোচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর, মালিকশাহর আমলে প্রভাবপূর্ণ বিস্তৃতির পর আমরা এরূপ দুর্বল অবস্থায় উপনীত হয়েছি। অন্য কেউ নয়, এ পরিস্থিতি আমরা নিজেরাই নিজেদের ওপর টেনে এনেছি!

টিকাঃ
৪৯৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৩৯৪-৩৯৫ ও ইবনুল ইবরি, তারীখু মুখতাসারিদ দুওয়াল, পৃষ্ঠা: ১৮৬।
৪৯৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪১৮।
৫০০. প্রাগুক্ত, ৮/৪৮৭।
৫০১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪৮৯ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১০৯-১১০।
৫০২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪৯৪-৪৯৫।
৫০৩. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১১১ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৩০।
৫০৪. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১২০।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [ছয়] কায়রোর উবায়দি (ফাতিমি) খলিফা

📄 [ছয়] কায়রোর উবায়দি (ফাতিমি) খলিফা


সমকালীন উবায়দি সাম্রাজ্যের খলিফা ছিলেন মুসতালি বিল্লাহ। অপরাপর উবায়দি খলিফাদের ন্যায় তিনিও শিয়া ইসমাইলি মতাদর্শী, প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িক ও সুন্নিবিদ্বেষী ছিলেন। সুন্নিদের তিনি তার মূল শত্রু মনে করতেন। সুন্নিদের প্রতি শত্রুতা করতে গিয়ে তিনি ক্রুসেডার বা মুসলিম উম্মাহর অন্য কোনো শত্রুর সঙ্গে হাত মেলাতেও সামান্য দ্বিধা করতেন না। আমরা দেখেছি-তিনি দুবার ক্রুসেডারদের কাছে প্রতিনিধিদল প্রেরণ করেছেন এবং সুন্নি শাম অঞ্চল বণ্টনের জন্য ক্রুসেডারদের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা ও সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছেন। অবশ্য তার এসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। কারণ, ক্রুসেডাররা বিভক্ত শাম নয়, পুরো শাম বিশেষত বাইতুল মুকাদ্দাস দখলের জন্য এসেছিল। অথচ বাইতুল মুকাদ্দাসের ক্ষমতার প্রতি উবায়দি সাম্রাজ্যেরও লোলুপ দৃষ্টি ছিল। আমরা এও দেখেছি যে, কীভাবে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই ক্রুসেডাররা উবায়দিদের বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে বের করে দিয়েছে। (৫০৬)

এতৎসত্ত্বেও উবায়দিরা তখনও আসকালান, আক্কা, বৈরুত ও সিডনসহ শাম ও ফিলিস্তিনের উপকূলীয় অঞ্চলের বিভিন্ন নগরীর কর্তৃত্ব ধরে রেখেছিল। আক্কা ও আসকালানসহ এসব নগরীর কয়েকটি ক্রুসেডারদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেছিল, অন্যরা তখনও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিল।

প্রশ্ন হলো—ফিলিস্তিনের মতো বিরাট একটি ভূখণ্ড হারিয়েও কি উবায়দি সাম্রাজ্য নিশ্চুপ বসে থাকবে এবং নিজেদের সর্বশেষ দুর্গ মিশরের পূর্ব সীমান্তে ক্রুসেডারদের ন্যায় একটি শক্তিশালী শত্রুকে এভাবে ছেড়ে রাখবে? আগামী মাস ও বছরগুলোতে এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া যাবে।

সম্ভবত এ তথ্যটি জানাও জরুরি যে, তৎকালে উবায়দি মিশর রাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতার লাগাম স্বয়ং উবায়দি খলিফার হাতে ছিল না; পুরোপুরি ক্ষমতার লাগাম ছিল শক্তিশালী উজির আফজাল বিন বদর আল-জামালির হাতে। এটিও জেনে রাখা দরকার যে, তৎকালীন মূল উবায়দি সেনাবাহিনী ছিল মাগরিবি সৈন্য-নির্ভর, যারা ৩৫৮ হিজরি সনে (৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) মিশর দখলের সময় প্রথম উবায়দি বাহিনীর সঙ্গে মিশরে এসেছিল। এ ছাড়াও উবায়দি বাহিনীতে সুদান ও দূরবর্তী বিভিন্ন দেশ থেকে আগত সৈন্যদেরও প্রতিনিধিত্ব ছিল। এর বিপরীতে উবায়দি বাহিনীতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মিশরীয় সৈন্যের প্রতিনিধিত্ব ছিল না। কারণ, দীর্ঘকাল ধরে মিশরে শিয়াশাসন চললেও এমনকি তা ক্রুসেড অভিযানের সময়কালকে অতিক্রম করলেও মিশরবাসী ব্যাপকভাবে শিয়া মতাদর্শ গ্রহণ না করে নিজেদের সুন্নিপরিচয় ধরে রেখেছিল। অবশ্য এজন্য তাদের উবায়দিদের পক্ষ থেকে প্রচুর নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে। সম্মুখীনও হতে হয়েছিল।

এভাবেই মিশরের ন্যায় শক্তিশালী একটি ইসলামি দুর্গ চলমান ঘটনাপ্রবাহে ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয় এবং প্রভাবক শক্তিসমূহের সমীকরণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মিশরে তখন যাবতীয় কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ছিল এমন এক প্রশাসনের হাতে, যারা কেবল নিজেদের উন্নতি ও মর্যাদা প্রত্যাশা করে; যারা উম্মাহর স্বপ্ন ও প্রত্যাশাকে নিজেদের বিবেচনায় রাখে না এবং নখ পরিমাণ গুরুত্বও দেয় না!

টিকাঃ
৫০৫. ইবনুল ইবরি, তারীখু মুখতাসারিদ দুওয়াল, পৃষ্ঠা: ১৯৭।
৫০৬. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৩৫।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [সাত] শাম অঞ্চলের মুসলিম আমির ও রাজন্যবর্গ

📄 [সাত] শাম অঞ্চলের মুসলিম আমির ও রাজন্যবর্গ


কোনো প্রকার অতিরঞ্জন ছাড়াই বলা যায় যে, তৎকালে শাম অঞ্চল গোটা দশেক ইমারত ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। প্রতিটি ইমারতের একজন করে নেতা ছিল, যে মনে করত যে, সে-ই পৃথিবীর কেন্দ্রীয় ব্যক্তি! তার অনুসারীরা তাকে এমনভাবে উপস্থাপন করত যে, সে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞাবান নেতা, ইতিহাসের অদ্বিতীয় ব্যক্তি! এ দেশ তার মতো ব্যক্তি না অতীতে জন্ম দিয়েছে, না ভবিষ্যতে কখনো জন্ম দিতে পারবে! এসব নেতা কল্পনার ফানুস উড়িয়ে নিজেদের প্রবঞ্চিত করছিল, প্রতারিত করছিল জনগণকে। এরপর ক্রুসেডার বাহিনী এসে এসব অথর্ব-অযোগ্য নেতাদের মুখোশ সকলের সামনে উন্মোচিত করে দেয়।

এসব আমির ও রাজন্যের একমাত্র লক্ষ্য ছিল নিজেদের ক্ষমতার গদি ও ভূ-মালিকানা টিকিয়ে রাখা। এ কারণেই ক্রুসেডাররা যদি পুরো শাম অঞ্চলও দখল করে নেয় আর তাদের কোনো ক্ষতি না করে, তাহলে ক্রুসেড আগ্রাসনের বিষয়ে তাদের সামান্যও মাথাব্যথা ছিল না। একই কারণে তারা কেবল তখনই ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে উদ্যোগী হয়েছে, যখন নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ হুমকির সম্মুখীন মনে করেছে। আরও পরিতাপের বিষয়—যখনই তারা অগ্রসর হয়েছে, হয়তো লাঞ্ছনাকর চুক্তির পথ অবলম্বন করেছে কিংবা ব্যর্থ যুদ্ধের পর কলঙ্কজনক পলায়নের পথ বেছে নিয়েছে!

তৎকালীন শাম অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী আমির ছিলেন দুজন—দামেশকের অধিপতি দাক্কাক বিন তুতুশ ও আলেপ্পোর অধিপতি রিজওয়ান বিন তুতুশ। দুজনই ছিলেন ইসলামি চেতনা ও মূল্যবোধ-শূন্য স্বার্থবাদী ও সুবিধাবাদী নেতা। শুধু এতটুকুই নয়; তারা দুজন পরস্পর সহোদর হওয়া সত্ত্বেও পরস্পর দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ও অব্যাহত শত্রুতায় লিপ্ত ছিলেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল যে, তারা তাদের পিতা তুতুশ বিন আরসালানের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রেই আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা ও অবিচক্ষণতার বৈশিষ্ট্য লাভ করেছিলেন! এ কারণেই ক্রুসেড আগ্রাসনের মোকাবিলায় দামেশক ও আলেপ্পোর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার কোনো পথ খোলা ছিল না।

এই দুই শাসক ও অন্য শাসকগণ যে লাঞ্ছনাকর পরিস্থিতির মাঝে জীবন কাটাচ্ছিল, তার পাশাপাশি আলেপ্পো-অধিপতি রিজওয়ান বিন তুতুশ আরও নিকৃষ্টতর এক পথ অবলম্বন করেছিলেন। রিজওয়ান মনে করতেন যে, তার আশেপাশের শক্তিগুলো দিনে দিনে শক্তিশালী হয়ে উঠছে আর তিনি দুর্বলই থেকে যাচ্ছেন। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি নিজেকে শক্তিশালী করার জন্য মিশরের উবায়দি সাম্রাজ্যের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময়ের সিদ্ধান্ত নেন। সময়ের পরিক্রমায় কেবল সহযোগিতা বিনিময়ে সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি একসময় শিয়া ইসমাইলি মতাদর্শ গ্রহণ করেন এবং ইসমাইলি মতাদর্শের প্রচারকে পরিণত হন। রিজওয়ান আলেপ্পোতে বিভিন্ন বড় পদে ইসমাইলি প্রচারকদের নিযুক্ত করেন। তার এই নীতির কারণে আলেপ্পোতে ইসমাইলি প্রচারকগণ ব্যাপক ক্ষমতা ও মর্যাদা লাভ করে। আলেপ্পোর বাতিনি ইসমাইলি সম্প্রদায়ের নেতা হাকিম মুনাজজিম রিজওয়ানের অতি আস্থাভাজন ব্যক্তিতে পরিণত হন।

এসব কারণে অন্যান্য অঞ্চলের সেলজুক নেতৃবৃন্দ রিজওয়ানের প্রতি অত্যন্ত বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। কারণ, ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার পর থেকেই সেলজুকরা ছিল বিশুদ্ধ সুন্নি চিন্তাধারার অনুসারী। শুধু তা-ই নয়; সেলজুকরা জীবনের বিভিন্ন অঙ্গনে সুন্নি মতাদর্শের সংরক্ষণ ও প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করত। সেলজুকরাই ইতিপূর্বে ৪৪৭ হিজরি সনে (১০৫৫ খ্রিষ্টাব্দে) আব্বাসি খিলাফতকে শিয়া বুওয়াইহিদের কর্তৃত্বের নাগপাশ থেকে উদ্ধার করেছিল। (৫০৭) এ কারণেই রিজওয়ানের গৃহীত এই আচরণ ও অবস্থান পুরো সেলজুক পরিবারের নিকট এক বিরল ও আশ্চর্য কাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। এর দ্বারা তার সুবিধাভোগী ব্যক্তিত্বই অবশ্যম্ভাবীরূপে ফুটে উঠেছিল। অন্য সব দৃষ্টিকোণ বাদ দিয়ে তার একমাত্র দৃষ্টি ছিল ব্যক্তিস্বার্থ এবং ব্যক্তিলালসার প্রতি। মোটামুটি এমনই ছিল ক্রুসেড শক্তির আগ্রাসন চলাকালে শাম অঞ্চলের রাজন্যবর্গের প্রকৃতি।

টিকাঃ
৫০৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৩২৩।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [আট] কিলিজ আরসালান ও রোমান সেলজুক শক্তি

📄 [আট] কিলিজ আরসালান ও রোমান সেলজুক শক্তি


ইসলামি ভূখণ্ডে প্রবেশ করেই এশিয়া মাইনর অঞ্চলে ক্রুসেডার বাহিনীর প্রচণ্ড লড়াই, কিলিজ আরসালানের নেতৃত্বে সেলজুকদের প্রতিরোধ এবং রোমান সেলজুক রাষ্ট্রের রাজধানী নিকিয়াসহ বিভিন্ন নগরীর পতন ইত্যাদি বিষয়ে আমরা পূর্বেই আলোচনা করে এসেছি। তবে এ তথ্যটি প্রণিধানযোগ্য যে, ক্রুসেডাররা এশিয়া মাইনর অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অভিযান চালায়নি; বরং তাদের লক্ষ্য ছিল শাম অভিমুখে গমনের পথে বিদ্যমান ইসলামি শক্তিগুলোকে ধ্বংস করে পথ পরিষ্কার করা। মূলত এটি ছিল বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোসের একটি দুষ্ট পরিকল্পনা। সম্রাট চেয়েছিলেন, ক্রুসেডাররা এ পথেই অগ্রসর হয়ে তৎকালীন বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের ঐতিহ্যগত শত্রু সেলজুকদের ধ্বংস করবে এবং এর মাধ্যমে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য তার পুরোনো নগরীগুলো পুনরুদ্ধারও করতে পারবে। অথচ বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য চাইলে তার বিশাল ও সমৃদ্ধ নৌবহর ব্যবহার করে ক্রুসেডারদের জাফা, আসকালান বা হাইফার মতো বাইতুল মুকাদ্দাসের নিকটবর্তী শামের উপকূলীয় কোনো অঞ্চলে পৌঁছিয়ে দিতে পারত। কিন্তু এটি সুস্পষ্ট যে, প্রতিটি পক্ষই নিজ স্বার্থ অনুসন্ধান করে ফিরছিল।

এ কারণেই নিকিয়া যুদ্ধ ও দোরিলায়ুমের যুদ্ধের মতো প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী বিভিন্ন যুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ক্রুসেডার শক্তি এশিয়া মাইনর ভূখণ্ডে অবস্থান করতে চায়নি। এ বিষয়টিও লক্ষণীয় যে, এশিয়া মাইনর অঞ্চল ছিল কঠিন ভৌগোলিক প্রকৃতিবিশিষ্ট। এ কারণে এ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা খুব কঠিন কাজ ছিল। তা ছাড়া অঞ্চলটি ছিল চরম সাম্রাজ্যবাদী চেতনার ধারক বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের একেবারে নিকটে। অধিকন্তু এসব যুদ্ধে ও এন্টিয়ক যাওয়ার পথে ক্রুসেডার বাহিনীর প্রচুর জনবল ক্ষয় হয়েছিল। আর তাই এ অঞ্চলে ক্রুসেডার বাহিনীর বেশিদিন অবস্থান ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

এ সবকিছু বিবেচনা করে ক্রুসেডার বাহিনী এশিয়া মাইনর অঞ্চলে সাম্রাজ্য বিস্তারের পরিবর্তে নিজ সামরিক শক্তি এ অঞ্চল থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অবশ্য এশিয়া মাইনর অঞ্চলের নিকটবর্তী এন্টিয়ক ও এডেসা রাজ্যের নগরীগুলোতে কিছু ক্রুসেডার সৈন্য রয়ে গিয়েছিল। একই কারণে ক্রুসেড অভিযানের অল্প কিছুদিন পরই এশিয়া মাইনর অঞ্চল সম্পূর্ণ ক্রুসেডারশূন্য হয়ে পড়ে এবং এ অঞ্চলের কর্তৃত্ব বণ্টিত হয়ে পড়ে দুই শক্তির মাঝে—পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলে বাইজান্টাইন শক্তি এবং পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে রোমান সেলজুক শক্তি।

এই একই কারণে রোমান সেলজুকরা একাধিক যুদ্ধক্ষেত্রে ক্রুসেডারদের কাছে তিক্ত পরাজয়ের শিকার হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের অস্তিত্ব ও সংখ্যা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। সেলজুকদের সর্বোচ্চ এতটুকু ক্ষতি হয়েছিল যে, এশিয়া মাইনরের পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের কিছু দুর্গের কর্তৃত্ব তাদের হাত থেকে ছুটে গিয়েছিল। ক্রুসেড আগ্রাসনের পরও সেলজুক সেনাবাহিনী ও জনগণ এশিয়া মাইনর অঞ্চলের বিস্তৃত ও দুর্গম পাহাড়ি প্রকৃতিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যমান ছিল।

এ অঞ্চলে সেলজুকদের নেতৃত্বে ছিলেন সুলতান কিলিজ আরসালান। তিনি ক্রুসেডারদের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রচুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। কিন্তু এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, শীঘ্রই তিনি হৃত ভূখণ্ড ও বিনষ্ট সম্পদ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে মাঠে নামবেন।

কিলিজ আরসালান ও সেলজুকরাই এশিয়া মাইনর অঞ্চলের একমাত্র ইসলামি শক্তি ছিল না। পূর্বে আমরা যেমন বলে এসেছি, এ অঞ্চলে তুর্কি দানিশমান্দ পরিবারও বসবাস করত। বনু দানিশমান্দ এশিয়া মাইনরের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। দানিশমান্দ পরিবার সর্বদাই সেলজুকদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে থাকত। একমাত্র ক্রুসেডারদের আগ্রাসনের সময় উভয় পক্ষের মধ্যে সাময়িক ঐক্য স্থাপিত হয়েছিল। ক্রুসেডাররা এ অঞ্চল ছেড়ে সামনে অগ্রসর হওয়ার পর প্রত্যাশিতভাবেই আবারও উভয় পক্ষের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক ফিরে আসে।

পরিবর্তিত নতুন পরিস্থিতিতে কিলিজ আরসালান ও দানিশমান্দ পরিবারের প্রতিক্রিয়া কী হবে? এশিয়া মাইনর অঞ্চলের পরিস্থিতিই-বা কী হবে? এসব প্রশ্নের উত্তরও আমাদের জানা প্রয়োজন!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00