📄 [দুই] রোমের ক্যাথলিক গির্জা
রোমের গির্জাই বাইতুল মুকাদ্দাসকে নিজ কর্তৃত্বভুক্ত করার মানসে ক্রুসেড যুদ্ধের আহ্বান করেছিল। বাইতুল মুকাদ্দাসেই ছিল বিখ্যাত আল-কিয়ামা গির্জা। রোমের গির্জা بোহেমন্ড, বল্ডউইন, গডফ্রে বা ৪র্থ রেমন্ডের ভূসম্পদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে এত আয়োজন করে ক্রুসেডার বাহিনী প্রেরণ করেনি। এ কারণেই গির্জা পুরো বাহিনীর নেতৃত্বদানের জন্য পোপের প্রতিনিধি হিসেবে অ্যাডমারকে বাহিনীর সঙ্গে প্রেরণ করেছিল। অ্যাডমারও তার ভূমিকা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার মাধ্যমে পালন করেছিলেন। ক্রুসেডার বাহিনীর মাঝে তিনি যথেষ্ট সুখ্যাতির অধিকারী ছিলেন। কিন্তু তিনি হঠাৎ করেই ১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টে এন্টিয়কে মারা যান। ফলে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও জটিল সময়ে গির্জা হারায় গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তিকে। এ সংবাদ বেশ দেরি করে রোমে পোপ ২য় আরবানের কাছে পৌঁছায়। সংবাদ পাওয়ার পর তিনি ইতালির পিসা অঞ্চলের প্রধান বিশপ ডেমবার্টকে তার নতুন প্রতিনিধি হিসেবে ক্রুসেডার বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য প্রেরণ করেন। (৪৯২) ডেমবার্টকে কেবল তার অত্যুচ্চ কূটনৈতিক দক্ষতার কারণেই প্রেরণ করা হয়নি; বরং তাকে নির্বাচনের পেছনে এ বিষয়টিও ভূমিকা রেখেছিল যে, তিনি শক্তিশালী পিসা নগরীর প্রতিনিধিত্ব করছেন। পোপের আশা ছিল, এর ফলে সুদীর্ঘ ক্রুসেড পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পিসার শক্তিশালী নৌবহর পোপের পাশে থাকবে। তা ছাড়া ডেমবার্টের এ জাতীয় সামরিক পরিস্থিতিতে বিশেষত মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতাও ছিল। আন্দালুসের মুসলমানদের বিরুদ্ধে খ্রিষ্টান স্প্যানিশ রাজ্য ক্যাস্টোলার শাসক যখন ক্রুসেড যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তখন এই ডেমবার্টই পোপের প্রতিনিধি হিসেবে তাতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এসব দিক বিবেচনা করেই চারিত্রিক স্খলন ও বিপথগামিতার 'খ্যাতি' থাকা সত্ত্বেও ডেমবার্টকেই এ দায়িত্ব পালনের জন্য বাছাই করা হয়। (৪৯৩) অবশ্য কলুষিত চরিত্র-বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তিদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান ইউরোপীয় গির্জাগুলোর একটি ব্যাপক ও সাধারণ রীতি!
একশ বিশটি জাহাজের সমন্বয়ে গঠিত পিসা নগরীর একটি সুবিশাল নৌবহরের নেতৃত্ব দিয়ে ডেমবার্ট ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দের গ্রীষ্মে শাম অঞ্চলের লাতাকিয়া বন্দরে পৌঁছেন। তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস পতনের পূর্বেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে ক্রুসেডার সেনাপতিগণ একমত হওয়ার পূর্বে পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি ইসলামি ভূখণ্ডে পৌঁছতে সক্ষম হন ক্রুসেডারদের বাইতুল মুকাদ্দাস দখল এবং গডফ্রের দায়িত্ব গ্রহণের পর। (৪৯৪) এ কারণেই তিনি লাতাকিয়ার নিকটবর্তী এন্টিয়কের প্রশাসক বোহেমন্ডের কাছে চলে যান। উদ্দেশ্য শাম অঞ্চলের পরিবর্তিত নতুন প্রেক্ষাপটে পারস্পরিক সমঝোতার চেষ্টা করা। (৪৯৫) এ তথ্যটিও এখানে প্রণিধানযোগ্য যে, বাইতুল মুকাদ্দাস পতনের দুই সপ্তাহ পরই পোপ ২য় আরবান মারা গিয়েছিলেন এবং ২য় পাসকাল নতুন পোপ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন; যেমনটি আমরা পূর্বেও উল্লেখ করে এসেছি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—পোপের নেতৃত্বাধীন রোমের গির্জা বাইতুল মুকাদ্দাসের কর্তৃত্বভার গডফ্রের হাতেই ছেড়ে রাখবে, নাকি সেখানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাবে? এ প্রশ্নের উত্তর আগামী দিনগুলোর জন্যই তোলা থাক!
টিকাঃ
৪৯২. Michaud: op. cit. 11, p. 9.
৪৯৩. Runciman: op. cit., 1, p. 299.
৪৯৪. Grousset: op. cit. 1, p. 191.
৪৯৫. Albert d' Aix, p. 500-501.
📄 [তিন] বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য
পশ্চিমা ক্যাথলিকদের কাছে সাহায্যপ্রার্থনার পেছনে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের লক্ষ্য ছিল, ইউরোপিয়ান বাহিনীগুলো ভাড়াটে বাহিনীর ন্যায় মুসলিম সেলজুকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের হৃত নগরীগুলো অধিকার করে তাদেরকে বুঝিয়ে দেবে এবং ভাড়াটে বাহিনীর রীতি অনুযায়ী যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বা অন্যান্য সম্পদ নিয়ে ফিরে যাবে। সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস মোটেও আশা করেননি যে, ইউরোপ থেকে এত বিশাল বাহিনী নিজেদের সামাজ্য বিস্তৃতি ও রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে আসবে। এ কারণেই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাইজান্টাইনরা হতচকিত হয়ে পড়ে এবং নিজেদের স্বার্থের বিপরীত পরিস্থিতির মোকাবিলা শুরু করে। কারণ, এটি অনেকটা সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, এসব বাহিনী যুদ্ধ শেষে ফিরে যাওয়ার জন্য আসেনি; ভূখণ্ড জয় করে সেখানেই থেকে যাওয়ার জন্য এসেছে। প্রথমে এডেসা ও এন্টিয়ক দখলের সময় এবং এরপর বাইতুল মুকাদ্দাস দখলের সময় বিষয়টি একেবারেই সুস্পষ্ট হয়ে যায়। এ কারণেই বাইজান্টাইনরা তাদের নীতি বদলে ফেলে সহায়তা করার পরিবর্তে একের পর এক বিভিন্ন ক্রুসেডার সেনাপতির ক্ষতি করা শুরু করে। বিপরীত দিকে ৪র্থ রেমন্ড বাদে অন্য কোনো ক্রুসেডার সেনাপতি নিজেদের অঙ্গীকার ও হৃদ্যতার ওপর অটল ছিল না। একমাত্র রেমন্ডই অনুভব করছিলেন যে, ইসলামি প্রাচ্যে তার রাজ্যপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হতে শুরু করেছে এবং এখন তার একমাত্র আশা-ভরসা হলো বাইজান্টাইন সম্রাটের সঙ্গে হৃদ্যতা। সম্রাটই হয়তো তাকে নিজস্ব রাজ্য প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবেন।
অবশ্য এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি সত্ত্বেও ক্রুসেড অভিযান থেকে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অর্জন একেবারে শূন্য ছিল না। তখনও পর্যন্ত বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য মর্মর সাগরের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত এশিয়া মাইনরের পশ্চিমাঞ্চলের সবগুলো নগরী দখল করে নিতে সক্ষম হয়েছিল।
তা ছাড়া সেলজুক নেতা কিলিজ আরসালানের রাজধানী ও সুরক্ষিত নগরী নিকিয়াও বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধিকারে এসেছিল। এরপর কোনিয়া ও হিরাক্লিয়াসহ কাছাকাছি অবস্থিত আরও কিছু নগরী বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধিকারে আসে। তবে এ সবকিছুর পরও বৃহত্তর এশিয়া মাইনর অঞ্চলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছিল। কারণ, তারা এশিয়া মাইনরের মধ্যাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা সেলজুকদের কারণে নিশ্চিন্ত ছিল না।
এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, বাইজান্টাইনরা এন্টিয়ক, তারসুস ও লাতাকিয়ার ন্যায় সুপ্রাচীন নগরীগুলো এত সহজে হারাতে রাজি হয়নি। তদ্রূপ এতেও কোনো সন্দেহ নেই যে, ক্রুসেডাররা দখল করার পরও তারা বাইতুল মুকাদ্দাস অধিকারের স্বপ্ন লালন করে যাচ্ছিল। সেই বাইতুল মুকাদ্দাস, যা চারশ সত্তর বছরেরও অধিক সময় পূর্বে হজরত উমর রাযি.-এর যুগে তারা মুসলমানদের কাছে হারিয়েছিল।
📄 [চার] আব্বাসি খলিফা
তৎকালীন আব্বাসি খলিফা ছিলেন নামেই খলিফা। যদিও তিনি খলিফাতুল মুসলিমীন বা মুসলিম সাম্রাজ্যের খলিফা নামক সুমহান উপাধি ধারণ করতেন; কিন্তু বাস্তবে তার কোনো ক্ষমতাই ছিল না। আব্বাসি খলিফা তখন পুরোপুরি সেলজুকদের অধীনস্থ ছিলেন। তার রাজকীয় বাহিনীও ছিল সম্মানসূচক বাহিনী; আক্রমণ প্রতিরোধ, পতাকা উত্তোলন কিংবা কোনো ভূমি পুনরুদ্ধার করার সামর্থ্য তাদের ছিল না। এ কারণেই দুর্বল খলিফার কাছে যখন ইসলামি ভূখণ্ডে ক্রুসেডারদের আগ্রাসন ও দখলদারিত্বের সংবাদ পৌঁছায়, তখন তিনি তা ভাবলেশহীন ও স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেন। তিনি এই বর্বর আগ্রাসনের মোকাবিলা করার জন্য সেলজুক সুলতানকে পরামর্শ প্রদানও নিজ দায়িত্ব মনে করেননি। (৪৯৬) সম্ভবত তিনি ক্রুসেড আগ্রাসনের শিকার শামের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে দূরে বাগদাদের নিরাপদ পরিবেশে নিজের অবস্থানে নিশ্চিন্ত ছিলেন। এ সময় মুসলমানদের খলিফা ছিলেন মুসতাযহির বিল্লাহ। অবশ্য এটি কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নয়। কারণ, তৎকালে খলিফাদের নামের কোনো মূল্য ছিল না! মুসতাযহির বিল্লাহ ৪৮৭ হিজরি হতে ৫১২ হিজরি সন (১০৯৪-১১৮ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত খলিফা পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণের সময় তার বয়স ছিল ষোলো বছর। (৪৯৭)
টিকাঃ
৪৯৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৯-২০ ও ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১২/১৫৬।
৪৯৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৭৩।
📄 [পাঁচ] বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের সুলতান বারকিয়ারুক বিন মালিকশাহ
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, বৃহত্তর সেলজুক দ্বারা সেসব সেলজুক উদ্দেশ্য, যারা পারস্য ও তার আশেপাশের অঞ্চল শাসন করত। তারাই আব্বাসি খিলাফত ও ইরাকে নিজেদের কর্তৃত্ব বিস্তার করেছিল। বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের সুলতানরা ছিল পুরো সেলজুক বংশের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ। সম্ভবত তারাই ছিল সমকালীন সবচেয়ে ক্ষমতাধর ইসলামি শক্তি।
কিন্তু অত্যুচ্চ সামরিক শক্তির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তারা শাম অঞ্চলে চলমান উত্তপ্ত ঘটনাপ্রবাহকে প্রতিরোধ করার জন্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। অবশ্য সেলজুকদের প্রধান সুলতান বারকিয়ারুকের নির্দেশনায় মসুলের আমির কারবুগার নেতৃত্বে একটি দুর্বল ও গুরুত্বহীন বাহিনী ক্রুসেডারদের মোকাবিলায় প্রেরিত হয়েছিল, যার পরিণতি পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে।
প্রশ্ন হলো-বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের কর্ণধারগণ এই ভয়াবহ সংকটেও কেন স্পন্দিত হলেন না? অথচ ইতিপূর্বে বিশেষ করে তাদের মহান পিতামহ আলপ আরসালানের শাসনামলসহ বিভিন্ন সময়ে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গনে তাদের উজ্জ্বল ও গৌরবময় অবদানের অনন্য ইতিহাস রয়েছে।
এ প্রশ্নের উত্তর যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে হলে আমাদের কয়েক বছর পেছনে ফিরে গিয়ে ক্রুসেডারদের ইসলামি ভূখণ্ডে প্রবেশকালে পারস্য ও ইরাকের সেলজুক সুলতান বারকিয়ারুক ও রোমান সেলজুকদের মধ্যকার সম্পর্কের ব্যাপারে জানতে হবে।
আলপ আরসালান মৃত্যুর সময় কয়েকজন সন্তান রেখে গিয়েছিলেন। তার বড় পুত্র মালিকশাহ বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্য শাসন করতেন। মালিকশাহর শাসনামলেই বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্য গৌরব ও মর্যাদার সর্বোচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত হয় এবং রাষ্ট্রসীমা পূর্বে চীন সীমান্ত হতে পশ্চিমে শাম অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।(৪৯৮) অপরদিকে আলপ আরসালানের আরেক পুত্র তুতুশ শামের অধিকাংশ এলাকা শাসন করতেন। (৪৯৯) তুতুশ নিজ রাজ্যের সীমা বিস্তারে যথেষ্ট আগ্রহী হলেও তার শক্তিশালী ভাই মালিকশাহকে ভয় ও সমীহ করতেন। ৪৮৪ হিজরি সনে (১০৯২ খ্রিষ্টাব্দে) মালিকশাহ ইন্তেকাল করলে তার পুত্র বারকিয়ারুক তার স্থলাভিষিক্ত হন এবং বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের হাল ধরেন। বারকিয়ারুক ছিলেন একেবারেই নবীন, বয়স তখনও পনেরো হয়নি। এ সময় তুতুশ তার ভাই মালিকশাহর মৃত্যুপরবর্তী অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বারকিয়ারুকের সাম্রাজ্যের প্রতি লালায়িত হয়ে ওঠেন এবং তার বাহিনী নিয়ে আলেপ্পো অভিমুখে রওনা হন। তিনি ভ্রাতুষ্পুত্র বারকিয়ারুকের কাছ থেকে অন্যান্য নগরীও কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। আলেপ্পো তখন হাজিব আক সুনকুরের শাসনাধীন ছিল। আক সুনকুর ছিলেন বারকিয়ারুকের অনুগত মিত্র। কিন্তু নিজ বাহিনীর শিথিলতা ও বারকিয়ারুকের দুর্বলতার কারণে আক সুনকুর তুতুশের সামনে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন এবং বাহ্যিকভাবে তার সঙ্গে মিলিত হন। এরপর তিনি, এন্টিয়কের মুসলিম শাসক ইয়াগিসিয়ান ও এডেসার মুসলিম শাসক বুজান সকলে তুতুশের সঙ্গে মিলে একসঙ্গে রওনা হন। (৫০০) অথচ এই সবগুলো নগরী মৃত্যুর পূর্বে মালিকশাহর কর্তৃত্বাধীন ছিল। সম্মিলিত বাহিনী বারকিয়ারুকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য পারস্যের দক্ষিণাঞ্চল অভিমুখে অগ্রসর হয়। এটি ৪৮৫ হিজরি সনের (১০৯৩ খ্রিষ্টাব্দের) ঘটনা। তুতুশের আশা প্রায় বাস্তবায়িত হয়েই গিয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আক সুনকুর ও ইয়াগিসিয়ান তুতুশকে ছেড়ে তাদের সাবেক সুলতান বারকিয়ারুকের পক্ষে যোগ দেন। ফলে তুতুশের পরিকল্পনা মাঠে মারা যায় এবং তিনি দ্রুত দামেশকে ফিরে আসেন। আক সুনকুরও নিজ এলাকা আলেপ্পোতে এবং বুজান এডেসায় ফিরে আসেন। ৪৮৬ হিজরি সনে (১০৯৬ খ্রিষ্টাব্দে) তুতুশ পুনরায় আলেপ্পোতে আক্রমণ করেন। (৫০১) আক সুনকুর বুজানের সঙ্গে জোট বেঁধে তার মোকাবিলা করলেও এবার তুতুশ জয়লাভ করেন এবং তিনি তৎক্ষণাৎ আক সুনকুর ও বুজানকে হত্যা করেন। ফলে আলেপ্পো, দামেশক ও শামের বৃহত্তর অংশে তুতুশের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। (৫০২)
৪৮৭ হিজরি সনে (১০৯৫ খ্রিষ্টাব্দে) অর্থাৎ ক্রুসেড অভিযান শুরু হওয়ার মাত্র দুই বছর পূর্বে তুতুশ তার বাহিনী নিয়ে নতুন করে ভ্রাতুষ্পুত্র বারকিয়ারুকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পারস্যের রায় অঞ্চলের নিকটে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কিন্তু এবার তুতুশ পরাজিত ও নিহত হন! (৫০৩)
তুতুশ নিহত হলেও বারকিয়ারুক নিজের পারস্য ও ইরাককেন্দ্রিক রাজ্য নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেন। তিনি শাম অঞ্চলকে আপন রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেননি। ফলে তুতুশের রাজত্ব তার দুই পুত্রের মাঝে বিভক্ত হয়ে যায়। রিজওয়ান বিন তুতুশ লাভ করেন আলেপ্পোর দায়িত্ব আর দাক্কাক বিন তুতুশ লাভ করেন দামেশকের দায়িত্ব। (৫০৪)
এ আলোচনা দ্বারা আমাদের সামনে সুস্পষ্ট হয়েছে যে, বারকিয়ারুক ছিলেন আলেপ্পো ও দামেশকের আমিরদ্বয়ের চাচাতো ভাই। তিনি শুধু তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী এবং তাদের শাসনের প্রতি বিতৃষ্ণই ছিলেন না; বরং তাদের পিতা তুতুশের হত্যাকারীও ছিলেন। বারকিয়ারুক মনে করতেন, যেমনটি আমরাও মনে করি যে, তুতুশের লালসা সীমাতিক্রম করেছিল এবং তুতুশ তার ভাই মালিকশাহর পরিবারের ও মহান পিতা আলপ আরসালানের মর্যাদার কোনো পরোয়াই করেননি; পরোয়া করেননি মুসলিম জনগণের মর্যাদার এবং পবিত্র ধর্ম ইসলামের মর্যাদার। তার সাম্রাজ্যবাদী লালসার বলি হয়ে হাজারো মুসলমানের প্রাণ ধ্বংস হয়েছে। আর ইসলাম তো এ ধরনের ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক যুদ্ধকে নিষিদ্ধ করেছে, যা ইসলামি ভূখণ্ডে কেবল ফিতনাই সৃষ্টি করে।
এর মাধ্যমে আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে, সুলতান বারকিয়ারুক কেন ক্রুসেড আগ্রাসনের সময় শাম অঞ্চলের সহায়তায় উদ্দীপ্ত হননি।
এটি হলো একটি দিক।
আরেকটি দিক হলো, পারস্য ও ইরাক অঞ্চলে আরও কিছু বিদ্রোহ ও বড় বড় সমস্যা সংঘটিত হয়েছিল। বারকিয়ারুকের ভাই মুহাম্মাদ বিন মালিকশাহ তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন এবং রাজ্যের একটি অংশের ক্ষমতা দাবি করেছিলেন। (৫০৫) একে কেন্দ্র করে কয়েক বছর ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ সংঘাত চলতে থাকে। নিঃসন্দেহে বারকিয়ারুক ও মুহাম্মাদের মধ্যকার এই দীর্ঘ সংঘাত ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি উভয়ের সামনে শাম ও ফিলিস্তিন অঞ্চলের মুসলমানদের সমস্যার প্রতি উদ্যোগী হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
তৎকালীন মুসলিম উম্মাহর অবস্থা ছিল কুরআনে বর্ণিত সেই নারীর ন্যায়, যে বহু পরিশ্রম করে মজবুত সুতা তৈরি করার পর পাক খুলে তা টুকরো টুকরো করে ফেলেছে। আলপ আরসালানের শাসনামলে শক্তির সর্বোচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর, মালিকশাহর আমলে প্রভাবপূর্ণ বিস্তৃতির পর আমরা এরূপ দুর্বল অবস্থায় উপনীত হয়েছি। অন্য কেউ নয়, এ পরিস্থিতি আমরা নিজেরাই নিজেদের ওপর টেনে এনেছি!
টিকাঃ
৪৯৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৩৯৪-৩৯৫ ও ইবনুল ইবরি, তারীখু মুখতাসারিদ দুওয়াল, পৃষ্ঠা: ১৮৬।
৪৯৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪১৮।
৫০০. প্রাগুক্ত, ৮/৪৮৭।
৫০১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪৮৯ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১০৯-১১০।
৫০২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪৯৪-৪৯৫।
৫০৩. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১১১ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৩০।
৫০৪. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১২০।