📄 [এক] ইসলামি ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা ক্রুসেড রাজ্যসমূহ এবং সাম্রাজ্যবাদী স্বপ্ন বাস্তবায়নে সুদূর পথ অতিক্রমকারী ক্রুসেডার নেতৃত্ববৃন্দ
ইসলামি ভূখণ্ডে গড়ে ওঠা প্রথম খ্রিষ্টরাজ্য ছিল এডেসা। এডেসার শাসনক্ষমতা ছিল গডফ্রের ভাই বল্ডউইনের হাতে। এডেসা রাজ্যের মূল ঘাঁটি ছিল ফুরাতের পশ্চিমে অবস্থিত এডেসা নগরী। বল্ডউইন সুমাইসাত ও সারুজ নগরীকেও তার রাজ্যপরিসরে অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এর ফলে রাজ্যটির অবস্থান দাঁড়ায় ফুরাতের পশ্চিমে দজলা ও ফুরাতের মধ্যবর্তী অংশে তথা জাযিরা অঞ্চলের উত্তরে। তৎকালীন এডেসা রাজ্যের বিভিন্ন অংশ আধুনিক রাষ্ট্রসীমায় ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্কে অবস্থিত। এডেসা রাজ্যের অধিকাংশ নাগরিক ছিল আর্মেনীয় খ্রিষ্টান। তখন পর্যন্ত এডেসা রাজ্য অন্যান্য ক্রুসেডার শক্তি বা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য কারোই অধীনতা স্বীকার করেনি; বরং রাজ্যটি ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র একটি রাজ্য। এর মাধ্যমে বল্ডউইনের একক রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্নও বাস্তবায়িত হয়েছিল। (৪৯০)
দ্বিতীয় খ্রিষ্টরাজ্য হিসেবে গড়ে উঠেছিল এন্টিয়ক রাজ্য। মূলত এন্টিয়ক নগরীকে কেন্দ্র করেই রাজ্যটি গড়ে উঠেছিল। অবশ্য এন্টিয়কের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব পাশের ছোট ছোট কিছু জনপদও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এন্টিয়ক রাজ্যের ক্ষমতার লাগাম ছিল নরম্যান সেনাপতি বোহেমন্ডের হাতে। এন্টিয়কে নিয়োজিত অধিকাংশ সৈন্যও ছিল নরম্যান। বোহেমন্ড তুলুজের কাউন্ট ৪র্থ রেমন্ডের সঙ্গে সংঘাতের পর এন্টিয়কে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। এন্টিয়কের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক ছিল বোহেমন্ডের বাহিনীর ক্যাথলিক খ্রিষ্টান, অর্থোডক্স খ্রিষ্টান ও দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাসকারী আর্মেনীয় খ্রিষ্টান। নগরীটির মুসলিম নাগরিকদের অধিকাংশকে হত্যা করা হয়েছিল। হাতেগোনা যারা বেঁচে গিয়েছিল, তারা পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে বিতাড়িত হয়েছিল।
এন্টিয়ক রাজ্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বল্ডউইনের পর আরেক ক্রুসেডার সেনাপতি বোহেমন্ডের স্বপ্নও পূরণ হয়েছিল। তিনি বৃহত্তর ক্রুসেডার বাহিনীর প্রভাবমুক্ত স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। একই সঙ্গে বোহেমন্ড বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোসের সঙ্গে স্থাপিত হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কও অস্বীকার করেছিলেন। ফলে এন্টিয়ক রাজ্য মুসলমানদের পাশাপাশি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যেরও শত্রুতে পরিণত হয়েছিল। (৪৯১)
যদিও উল্লিখিত রাজ্যদুটি বাইতুল মুকাদ্দাসগামী মূল ক্রুসেডার শক্তি হতে সম্পূর্ণই বিচ্ছিন্ন ছিল; কিন্তু রাজ্যদুটির অস্তিত্ব দখলদার ক্রুসেডার শক্তির জন্য যথেষ্ট সহায়ক বিবেচিত হচ্ছিল। এডেসা ও এন্টিয়ক রাজ্য ক্রুসেডার বাহিনী থেকে সেলজুক বাহিনীগুলোকে বিচ্ছিন্ন রাখার দায়িত্ব পালন করছিল। রাজ্যদুটির অস্তিত্বের কারণেই বাইতুল মুকাদ্দাস অভিযান চলাকালে ক্রুসেডার বাহিনীর পৃষ্ঠদেশ ছিল সম্পূর্ণ নিরাপদ। এই দুটি রাষ্ট্র বিশেষত এডেসা রাজ্য পরবর্তী বছরগুলোতেও ইসলামি বিশ্বের পূর্ব অংশ হতে আগত আক্রমণসমূহের প্রতিরোধের দায়িত্ব পালন করে।
ইসলামি ভূখণ্ডে গঠিত তৃতীয় রাজ্যটি ছিল বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্য। সামনের আলোচনায় আমরা দেখব যে, রাজ্যটি পরবর্তীকালে অল্প সময়ের মধ্যেই একটি পরিপূর্ণ সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের তুলনামূলক বিস্তৃত পরিসরের ওপর বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্য গড়ে উঠেছিল। মূল আল-কুদস নগরী ছাড়াও জাফা, রামলা ও লুদ (Lod) নগরী এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। তা ছাড়া আক্কা, কায়সারিয়া, আরসুফ ও আসকালানের সঙ্গে রাজ্যটি শান্তিচুক্তি করেছিল। এই নতুন রাজ্যটির ক্ষমতা ছিল আরেক ক্রুসেডার সেনাপতি গডফ্রের হাতে। প্রতিষ্ঠিত রাজ্যগুলোর মধ্যে বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্য ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, খ্রিষ্টানবিশ্বের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নগরী আল-কুদস ছিল এই রাজ্যটির অধীনে। এ কারণেই রাজ্যটির শাসক গডফ্রে নিজেকে একই সঙ্গে সমকালীন খ্রিষ্টান শাসক-প্রশাসকদের বৈশিষ্ট্য ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ এবং পাদরি ও সন্ন্যাসীদের বৈশিষ্ট্য ধর্মবাদ- বিপরীতমুখী উভয় গুণে নিজেকে উপস্থাপনে সচেষ্ট ছিলেন। আর এ কারণেই তিনি গভর্নর বা রাজা ইত্যাদির পরিবর্তে ধারণ করেছিলেন 'বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রহরী' উপাধি।
এ বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য যে, ইতালিয়ান জাহাজগুলোর মাধ্যমে সাগর পথে সহায়ক বাহিনীর আগমন সত্ত্বেও ক্রুসেডারদের সংখ্যা যথেষ্ট কমে গিয়েছিল। আর তাই অধিকৃত প্রতিটি নগরীর নিরাপত্তায় অতি সীমিত সংখ্যক সৈন্য নিয়োজিত ছিল। অবশ্য ব্যাপকভাবে ক্রুসেডারদের প্রতি মুসলিম সমাজে সৃষ্ট ভীতি ও আতঙ্কের কারণে ক্রুসেডারদের খুব কমই মুসলমানদের আক্রমণ মোকাবিলা করতে হচ্ছিল।
অপরদিকে ফরাসি সেনাপতি ৪র্থ রেমন্ড তখনও পর্যন্ত নিজের জন্য কোনো রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। প্রথমে এন্টিয়কে, এরপর পর্যায়ক্রমে লেবাননের ইরকায়, ফিলিস্তিনের বাইতুল মুকাদ্দাসে এবং সবশেষে আসকালানে তার নিজস্ব রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এ কারণেই প্রচণ্ড বিক্ষুব্ধ রেমন্ড পুরো ফিলিস্তিন অঞ্চল ত্যাগ করে ত্রিপোলি নগরীর আশেপাশে কোথাও রাজ্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে তার সৈন্যদের নিয়ে লেবাননের দিকে অগ্রসর হন।
মোটামুটি এই ছিল চলমান পরিস্থিতিতে ক্রুসেডার বাহিনীর অবস্থা। যদিও তাদের প্রচুর সৈন্য নিহত ও নিঃশেষ হয়েছিল; কিন্তু এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইসলামি ভূখণ্ডে অবতরণের মাত্র দুই বছরের মধ্যে ইসলামি বিশ্বের অভ্যন্তরে তিন-তিনটি খ্রিষ্টরাজ্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তারা দৃশ্যমান সাফল্য বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছিল। আর এরপরও অব্যাহত ছিল তাদের সাম্রাজ্যবাদী লালসা ও রাজ্যপরিধি বৃদ্ধির চাহিদা।
মানচিত্র নং-১৭ ৪৯২ হিজরি সনে/১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ক্রুসেড রাজ্যসমূহ
টিকাঃ
৪৯০. দেখুন: কাসিম আবদুহু কাসিম, মাহিয়াতুল হুরূবিস সালীবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১২২-১২৩।
৪৯১. দেখুন: সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/১৬০-১৬১।
📄 [দুই] রোমের ক্যাথলিক গির্জা
রোমের গির্জাই বাইতুল মুকাদ্দাসকে নিজ কর্তৃত্বভুক্ত করার মানসে ক্রুসেড যুদ্ধের আহ্বান করেছিল। বাইতুল মুকাদ্দাসেই ছিল বিখ্যাত আল-কিয়ামা গির্জা। রোমের গির্জা بোহেমন্ড, বল্ডউইন, গডফ্রে বা ৪র্থ রেমন্ডের ভূসম্পদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে এত আয়োজন করে ক্রুসেডার বাহিনী প্রেরণ করেনি। এ কারণেই গির্জা পুরো বাহিনীর নেতৃত্বদানের জন্য পোপের প্রতিনিধি হিসেবে অ্যাডমারকে বাহিনীর সঙ্গে প্রেরণ করেছিল। অ্যাডমারও তার ভূমিকা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার মাধ্যমে পালন করেছিলেন। ক্রুসেডার বাহিনীর মাঝে তিনি যথেষ্ট সুখ্যাতির অধিকারী ছিলেন। কিন্তু তিনি হঠাৎ করেই ১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টে এন্টিয়কে মারা যান। ফলে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও জটিল সময়ে গির্জা হারায় গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তিকে। এ সংবাদ বেশ দেরি করে রোমে পোপ ২য় আরবানের কাছে পৌঁছায়। সংবাদ পাওয়ার পর তিনি ইতালির পিসা অঞ্চলের প্রধান বিশপ ডেমবার্টকে তার নতুন প্রতিনিধি হিসেবে ক্রুসেডার বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য প্রেরণ করেন। (৪৯২) ডেমবার্টকে কেবল তার অত্যুচ্চ কূটনৈতিক দক্ষতার কারণেই প্রেরণ করা হয়নি; বরং তাকে নির্বাচনের পেছনে এ বিষয়টিও ভূমিকা রেখেছিল যে, তিনি শক্তিশালী পিসা নগরীর প্রতিনিধিত্ব করছেন। পোপের আশা ছিল, এর ফলে সুদীর্ঘ ক্রুসেড পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পিসার শক্তিশালী নৌবহর পোপের পাশে থাকবে। তা ছাড়া ডেমবার্টের এ জাতীয় সামরিক পরিস্থিতিতে বিশেষত মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতাও ছিল। আন্দালুসের মুসলমানদের বিরুদ্ধে খ্রিষ্টান স্প্যানিশ রাজ্য ক্যাস্টোলার শাসক যখন ক্রুসেড যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তখন এই ডেমবার্টই পোপের প্রতিনিধি হিসেবে তাতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এসব দিক বিবেচনা করেই চারিত্রিক স্খলন ও বিপথগামিতার 'খ্যাতি' থাকা সত্ত্বেও ডেমবার্টকেই এ দায়িত্ব পালনের জন্য বাছাই করা হয়। (৪৯৩) অবশ্য কলুষিত চরিত্র-বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তিদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান ইউরোপীয় গির্জাগুলোর একটি ব্যাপক ও সাধারণ রীতি!
একশ বিশটি জাহাজের সমন্বয়ে গঠিত পিসা নগরীর একটি সুবিশাল নৌবহরের নেতৃত্ব দিয়ে ডেমবার্ট ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দের গ্রীষ্মে শাম অঞ্চলের লাতাকিয়া বন্দরে পৌঁছেন। তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস পতনের পূর্বেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে ক্রুসেডার সেনাপতিগণ একমত হওয়ার পূর্বে পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি ইসলামি ভূখণ্ডে পৌঁছতে সক্ষম হন ক্রুসেডারদের বাইতুল মুকাদ্দাস দখল এবং গডফ্রের দায়িত্ব গ্রহণের পর। (৪৯৪) এ কারণেই তিনি লাতাকিয়ার নিকটবর্তী এন্টিয়কের প্রশাসক বোহেমন্ডের কাছে চলে যান। উদ্দেশ্য শাম অঞ্চলের পরিবর্তিত নতুন প্রেক্ষাপটে পারস্পরিক সমঝোতার চেষ্টা করা। (৪৯৫) এ তথ্যটিও এখানে প্রণিধানযোগ্য যে, বাইতুল মুকাদ্দাস পতনের দুই সপ্তাহ পরই পোপ ২য় আরবান মারা গিয়েছিলেন এবং ২য় পাসকাল নতুন পোপ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন; যেমনটি আমরা পূর্বেও উল্লেখ করে এসেছি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—পোপের নেতৃত্বাধীন রোমের গির্জা বাইতুল মুকাদ্দাসের কর্তৃত্বভার গডফ্রের হাতেই ছেড়ে রাখবে, নাকি সেখানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাবে? এ প্রশ্নের উত্তর আগামী দিনগুলোর জন্যই তোলা থাক!
টিকাঃ
৪৯২. Michaud: op. cit. 11, p. 9.
৪৯৩. Runciman: op. cit., 1, p. 299.
৪৯৪. Grousset: op. cit. 1, p. 191.
৪৯৫. Albert d' Aix, p. 500-501.
📄 [তিন] বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য
পশ্চিমা ক্যাথলিকদের কাছে সাহায্যপ্রার্থনার পেছনে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের লক্ষ্য ছিল, ইউরোপিয়ান বাহিনীগুলো ভাড়াটে বাহিনীর ন্যায় মুসলিম সেলজুকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের হৃত নগরীগুলো অধিকার করে তাদেরকে বুঝিয়ে দেবে এবং ভাড়াটে বাহিনীর রীতি অনুযায়ী যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বা অন্যান্য সম্পদ নিয়ে ফিরে যাবে। সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস মোটেও আশা করেননি যে, ইউরোপ থেকে এত বিশাল বাহিনী নিজেদের সামাজ্য বিস্তৃতি ও রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে আসবে। এ কারণেই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাইজান্টাইনরা হতচকিত হয়ে পড়ে এবং নিজেদের স্বার্থের বিপরীত পরিস্থিতির মোকাবিলা শুরু করে। কারণ, এটি অনেকটা সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, এসব বাহিনী যুদ্ধ শেষে ফিরে যাওয়ার জন্য আসেনি; ভূখণ্ড জয় করে সেখানেই থেকে যাওয়ার জন্য এসেছে। প্রথমে এডেসা ও এন্টিয়ক দখলের সময় এবং এরপর বাইতুল মুকাদ্দাস দখলের সময় বিষয়টি একেবারেই সুস্পষ্ট হয়ে যায়। এ কারণেই বাইজান্টাইনরা তাদের নীতি বদলে ফেলে সহায়তা করার পরিবর্তে একের পর এক বিভিন্ন ক্রুসেডার সেনাপতির ক্ষতি করা শুরু করে। বিপরীত দিকে ৪র্থ রেমন্ড বাদে অন্য কোনো ক্রুসেডার সেনাপতি নিজেদের অঙ্গীকার ও হৃদ্যতার ওপর অটল ছিল না। একমাত্র রেমন্ডই অনুভব করছিলেন যে, ইসলামি প্রাচ্যে তার রাজ্যপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হতে শুরু করেছে এবং এখন তার একমাত্র আশা-ভরসা হলো বাইজান্টাইন সম্রাটের সঙ্গে হৃদ্যতা। সম্রাটই হয়তো তাকে নিজস্ব রাজ্য প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবেন।
অবশ্য এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি সত্ত্বেও ক্রুসেড অভিযান থেকে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অর্জন একেবারে শূন্য ছিল না। তখনও পর্যন্ত বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য মর্মর সাগরের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত এশিয়া মাইনরের পশ্চিমাঞ্চলের সবগুলো নগরী দখল করে নিতে সক্ষম হয়েছিল।
তা ছাড়া সেলজুক নেতা কিলিজ আরসালানের রাজধানী ও সুরক্ষিত নগরী নিকিয়াও বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধিকারে এসেছিল। এরপর কোনিয়া ও হিরাক্লিয়াসহ কাছাকাছি অবস্থিত আরও কিছু নগরী বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধিকারে আসে। তবে এ সবকিছুর পরও বৃহত্তর এশিয়া মাইনর অঞ্চলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছিল। কারণ, তারা এশিয়া মাইনরের মধ্যাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা সেলজুকদের কারণে নিশ্চিন্ত ছিল না।
এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, বাইজান্টাইনরা এন্টিয়ক, তারসুস ও লাতাকিয়ার ন্যায় সুপ্রাচীন নগরীগুলো এত সহজে হারাতে রাজি হয়নি। তদ্রূপ এতেও কোনো সন্দেহ নেই যে, ক্রুসেডাররা দখল করার পরও তারা বাইতুল মুকাদ্দাস অধিকারের স্বপ্ন লালন করে যাচ্ছিল। সেই বাইতুল মুকাদ্দাস, যা চারশ সত্তর বছরেরও অধিক সময় পূর্বে হজরত উমর রাযি.-এর যুগে তারা মুসলমানদের কাছে হারিয়েছিল।
📄 [চার] আব্বাসি খলিফা
তৎকালীন আব্বাসি খলিফা ছিলেন নামেই খলিফা। যদিও তিনি খলিফাতুল মুসলিমীন বা মুসলিম সাম্রাজ্যের খলিফা নামক সুমহান উপাধি ধারণ করতেন; কিন্তু বাস্তবে তার কোনো ক্ষমতাই ছিল না। আব্বাসি খলিফা তখন পুরোপুরি সেলজুকদের অধীনস্থ ছিলেন। তার রাজকীয় বাহিনীও ছিল সম্মানসূচক বাহিনী; আক্রমণ প্রতিরোধ, পতাকা উত্তোলন কিংবা কোনো ভূমি পুনরুদ্ধার করার সামর্থ্য তাদের ছিল না। এ কারণেই দুর্বল খলিফার কাছে যখন ইসলামি ভূখণ্ডে ক্রুসেডারদের আগ্রাসন ও দখলদারিত্বের সংবাদ পৌঁছায়, তখন তিনি তা ভাবলেশহীন ও স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেন। তিনি এই বর্বর আগ্রাসনের মোকাবিলা করার জন্য সেলজুক সুলতানকে পরামর্শ প্রদানও নিজ দায়িত্ব মনে করেননি। (৪৯৬) সম্ভবত তিনি ক্রুসেড আগ্রাসনের শিকার শামের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে দূরে বাগদাদের নিরাপদ পরিবেশে নিজের অবস্থানে নিশ্চিন্ত ছিলেন। এ সময় মুসলমানদের খলিফা ছিলেন মুসতাযহির বিল্লাহ। অবশ্য এটি কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নয়। কারণ, তৎকালে খলিফাদের নামের কোনো মূল্য ছিল না! মুসতাযহির বিল্লাহ ৪৮৭ হিজরি হতে ৫১২ হিজরি সন (১০৯৪-১১৮ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত খলিফা পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণের সময় তার বয়স ছিল ষোলো বছর। (৪৯৭)
টিকাঃ
৪৯৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৯-২০ ও ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১২/১৫৬।
৪৯৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৭৩।