📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ফিলিস্তিনি নগরীসমূহের পতন

📄 ফিলিস্তিনি নগরীসমূহের পতন


রেমন্ড সরে আসার পর আসকালান অবরোধকারীরা দুর্বল হয়ে পড়ে। রেমন্ড নিজে তৎক্ষণাৎ একই লক্ষ্য ও স্বপ্ন নিয়ে আরসুফ অভিমুখে ছুটে যান। তার স্বপ্ন—আরসুফ হবে তার সেই স্বপ্নের রাজ্য। গডফ্রেও আসকালান ছেড়ে তার পেছনে ছোটেন! এবার আরসুফ নিয়ে রেমন্ড ও গডফ্রের মাঝে একই বিতর্কের পুনরাবৃত্তি! ইউরোপীয় ঐতিহাসিকদের দাবিকৃত 'সৎ-ধার্মিক' নেতা গডফ্রে আরসুফকেও নিজের রাজ্যভুক্ত করতে চান!(৪৭৪)

রেমন্ড যদিও প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হন, কিন্তু তার কিছুই করার ছিল না। অন্যান্য সেনাপতিও উপলব্ধি করে যে, গডফ্রে যেভাবে সাম্রাজ্যবাদের নেশায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছেন, তাতে ভবিষ্যতে তারাও যদি কোনো ধরনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সচেষ্ট হয় কিংবা কোনো ভূখণ্ডের অধিকার লাভের চেষ্টা করে, গডফ্রে অবশ্যই তাদেরকে বাধা দেবেন। বিশেষত তারা তো রেমন্ডের চেয়েও দুর্বল। তাই তারা সকলে গডফ্রের জন্য ময়দান খালি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়!

রেমন্ড নিজে এন্টিয়কের আশেপাশে কোথাও নিজের জন্য রাজত্বের খোঁজে উত্তরে লেবানন ও শামের দিকে অগ্রসর হন। আর নরম্যান সেনাপতি রবার্ট কার্তুজ ও রবার্ট ডি ফ্ল্যান্ডার (Robert I de Flanders)-এর নেতৃত্বে অন্য সেনাপতিরা ফ্রান্সে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। (৪৭৫) এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, তারা গডফ্রে ও তার সৈন্যদের জন্য ময়দান ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে প্রচুর পরিমাণ সম্পদ সঙ্গে নিয়েই প্রত্যাবর্তন করে।

গডফ্রের সঙ্গে ক্রুসেডার সেনাপতিদের মধ্য হতে একমাত্র টেনক্রেড থেকে যান। টেনক্রেড তার মামা বোহেমন্ডের কাছে যাওয়ার পরিবর্তে গডফ্রের সঙ্গে থাকাকেই প্রাধান্য দেন। তার আশা ছিল গডফ্রের অধীনে হলেও ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরে কোথাও নিজের জন্য একটি রাজ্য গড়ে তোলা। বিপরীতে এন্টিয়কের আশেপাশে এমন কোনো রাজ্য গড়ে তুলতে পারলেও সর্বময় ক্ষমতা তার মামার হাতেই থাকবে! মূলত এ জাতীয় ব্যক্তিস্বার্থ-চিন্তাই ক্রুসেড অভিযানের প্রত্যেক সেনাপতির কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণ করছিল!

গডফ্রেও টেনক্রেডকে নিরাশ করেননি। তিনি তাকে জালিল (Galilee) অঞ্চল দখল করার নির্দেশ দেন এবং বলে দেন যে, দখল করতে সক্ষম হলে টেনক্রেডই উক্ত অঞ্চলের প্রশাসক হবেন। দায়িত্ব পেয়ে টেনক্রেড অত্যন্ত উদ্যমী হয়ে ওঠেন। (৪৭৬) তার জন্য অবশ্য এটি কঠিন কোনো বিষয়ও ছিল না। কারণ, যদিও তার সৈন্যসংখ্যা কম ছিল এবং অধিকাংশ সেনাপতি ও সৈন্যরা চলে যাওয়ার পর তার সামর্থ্যও দুর্বল হয়ে পড়েছিল; কিন্তু অঞ্চলটির অধিবাসীগণ ছিল আরও বেশি দুর্বল। ফলে তিনি অল্প সময়েই জালিল অঞ্চল দখল করতে সক্ষম হন। (৪৭৭) এরপর তিনি অতি সহজেই তাবারিয়া (Tiberias) নগরীও দখল করে নেন। তাবারিয়ার নাগরিকরা অবশ্য টেনক্রেড-বাহিনীর আগমনের পূর্বেই পালিয়ে যায়। (৪৭৮) এরপর তিনি জালিল অঞ্চলের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত বায়সান নগরীটিও একইভাবে দখল করে নেন। এভাবে পুরো জালিল অঞ্চল টেনক্রেডের তথা ক্রুসেডারদের দখলে চলে যায়। অবশ্য শর্তানুযায়ী অঞ্চলটি স্বতন্ত্র রাজ্যের পরিবর্তে বাইতুল মুকাদ্দাসের করদরাজ্যে পরিণত হয়। (৪৭৯)

একে একে ফিলিস্তিনের অনেকগুলো নগরী ক্রুসেডারদের কর্তৃত্বে চলে যায়। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নগরী হলো—বাইতুল মুকাদ্দাস, জাফা, রামলা, নাবলুস, বায়সান ও তাবারিয়া। (৪৮০) একই সময়ে অভিযানের এই পর্যায়ে ক্রুসেডাররা আক্কা, আসকালান বা আরসুফ দখল করতে ব্যর্থ হয়; ব্যর্থ হয় লেবাননে প্রবেশেও। ফলে ত্রিপোলি, বৈরুত ও সিডন অঞ্চল মুসলমানদের হাতে থেকে যায়। (৪৮১)

এখানে এ বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য যে, বাইতুল মুকাদ্দাসসহ অধিকৃত প্রতিটি ফিলিস্তিনি নগরীতে ক্রুসেডার শক্তি অত্যন্ত দুর্বল ছিল। কারণ, তাদের সৈন্যগণ অনেকগুলো নগরীতে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। তা ছাড়া সৈন্যদের বড় একটি অংশ ফিলিস্তিন ছেড়ে ফ্রান্সে চলে গিয়েছিল। ওদিকে রেমন্ড তার বাহিনী নিয়ে ফিলিস্তিন ও গডফ্রের কর্তৃত্ব হতে দূরে উত্তরে চলে গিয়েছিলেন। (৪৮২) কিন্তু ক্রুসেডাররা দুর্বল হলে কী হবে, এসব নগরীতে ইসলামি প্রতিরোধ শক্তি ছিল আরও দুর্বল। মূলত তৎকালীন মুসলমানরা সামরিক অঙ্গনে পরাজিত হওয়ার পূর্বেই মানসিকভাবে পরাজিত হয়ে পড়েছিল। মুসলমানরা অনুভব করছিল—ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এককথায় অসম্ভব। মুসলমানদের এই পরাভবতার কারণেই সংখ্যায় অতি অল্প হওয়া সত্ত্বেও ক্রুসেডাররা এ অঞ্চলে স্থিতিশীল হতে সক্ষম হয়েছিল।

বিস্ময়বোধ করার পূর্বে আপনার-আমার চিন্তা করা উচিত যে, আমাদের যাপিত কালে ইহুদিরা সংখ্যায় স্বল্প হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে বিশাল সংখ্যক মুসলিম জনগণবিশিষ্ট রাষ্ট্রসমূহের মধ্যখানে নিশ্চিন্তে বসবাস করছে?! তাহলেই আমরা সকলে উপলব্ধি করতে পারব যে, বিষয়টি সংখ্যা-সরঞ্জামের প্রতুলতা-অপ্রতুলতার সঙ্গে জড়িত নয়; সম্পূর্ণই ধর্ম ও বিশ্বাস, চিন্তা ও চেতনা এবং আদর্শের সঙ্গে জড়িত।

টিকাঃ
৪৭৪. Albert d' Aix, p. 498.
৪৭৫. Stevenson: op. cit., p. 36.
৪৭৬. Raoul de Caen p. 703 &Guillaman: de tyr, 1, p.p. 384.
৪৭৭. Runciman: op. cit., 1, p. 304.
৪৭৮. Albert d' Aix, pp. 217-218.
৪৭৯. Guillaman: de tyr, 1, p. 384.
৪৮০. কাসিম আবদুহু কাসিম, মাহিয়াতুল হুরূবিস সালীবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা : ১৩০।
৪৮১. Grousset: Hist. des Croisades, 1, p. 181 & Albert d' Aix, pp. 507-511.
৪৮২. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/২১২।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 গডফ্রের প্রতারণাপূর্ণ কূটনীতি

📄 গডফ্রের প্রতারণাপূর্ণ কূটনীতি


আবারও একটু বিরতি! সৈন্যসংখ্যার স্বল্পতা ও অধিকৃত অঞ্চলের বিস্তৃতি সত্ত্বেও ফিলিস্তিন-পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গডফ্রে যে নীতি অবলম্বন করেন, এখানে আমরা তা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা গ্রহণ করব। গডফ্রে অধিকৃত অঞ্চলগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। আমাদের কর্তব্য—সেগুলো সম্পর্কে যথেষ্ট চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণে সচেষ্ট হওয়া। কারণ, ইতিহাস বারবার ফিরে ফিরে আসে!

১. গডফ্রে জাফা বন্দরকে দুর্ভেদ্য ও সুরক্ষিত করতে সচেষ্ট হন। (৪৮৩) তখনও পর্যন্ত জাফা বন্দরই ছিল বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের একমাত্র সামুদ্রিক বাতায়ন। বলা ভালো, জাফা বন্দর ছিল বাইতুল মুকাদ্দাসের জীবন-ধমনী (lifeline), যা সর্বদা উন্মুক্ত ও শক্তিশালী রাখা জরুরি ছিল। গডফ্রের তত্ত্বাবধানে জাফার বাণিজ্যিক ও সামরিক অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী করা হয়। ফলে তা মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া ও দিমইয়াত বন্দরসহ আশেপাশের প্রতিটি নৌবন্দরে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। (৪৮৪)

২. গডফ্রে ফিলিস্তিনি উপকূলীয় এলাকার নিরাপত্তার জন্য ইতালিয়ান প্রজাতন্ত্রসমূহের সঙ্গে চুক্তি করেন এবং তাদের কাছ থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের জন্য বাণিজ্যিক ও সামরিক নৌবহর প্রেরণের অঙ্গীকার লাভ করেন। বিশেষ করে পিসা, জেনোভা ও ভেনিসসহ তৎকালীন ইতালিয়ান প্রজাতন্ত্রগুলো ভূমধ্যসাগরের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবহরের অধিকারী ছিল।(৪৮৫) এই চুক্তির ফলে ইতালিয়ানরা চলমান পরিস্থিতিতে কর্তৃত্ব বিস্তারে সক্ষম হয়। অনেকগুলো ইসলামি নৌবন্দরের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যায়।(৪৮৬) বরং এরপর থেকে ইতালিয়ানরা মিশর থেকে আগত জাহাজগুলোতে আক্রমণ করে বাণিজ্যপণ্য নিয়ে যেত এবং বণিকদের হত্যা করত।(৪৮৭) এভাবে কালের পরিক্রমায় একসময় আক্কা, আরসুফ ও অন্যান্য নৌবন্দরও দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ক্রুসেডারদের পক্ষে সেগুলো দখল করাও সহজ হয়ে যায়।

৩. গডফ্রে সন্ত্রাস, আক্রমণ ও নির্দয় গণহত্যার নীতি অবলম্বন করে ব্যাপক ভীতিমূলক প্রভাব সৃষ্টি করেন। উদাহরণ হিসেবে আরসুফ নগরীর একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। কিছু কৃষক একবার নিজেদের কৃষিজমি পরিচর্যার উদ্দেশ্যে আরসুফের দুর্গ থেকে বের হলে ক্রুসেডাররা তাদেরকে ধরে ফেলে; এরপর তাদেরকে হত্যা করেই ক্ষান্ত না হয়ে নাক, হাত-পা কেটে লাশ বিকৃত করে মুসলমানদের মাঝে ভীতি সঞ্চার করে।(৪৮৮)

৪. ক্রুসেডাররা এমন একটি প্রতারণাপূর্ণ দুষ্ট পন্থা অবলম্বন করে, যা দ্বারা একদিকে ফিলিস্তিন অঞ্চলে তাদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে, অপরদিকে প্রশাসন, নাগরিক জীবন, অর্থনীতিসহ যাবতীয় ব্যবস্থাপনাও তাদের কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগিয়ে চলবে। এটি তো অনস্বীকার্য বাস্তবতা যে, শুধু ভীতি সঞ্চার নীতি কিছুতেই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল বয়ে আনে না। ক্রুসেডাররা যদিও ভীতি সঞ্চারের মাধ্যমে আপাতত নিরাপদ পরিস্থিতি সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছিল; কিন্তু তারা অনুভব করছিল যে, এভাবে চলতে থাকলে শীঘ্রই তারা বাণিজ্যিক ও নাগরিক দিক থেকে নেতিবাচক পরিস্থিতির শিকার হবে। কারণ, জনবলের বিবেচনায় ক্রুসেডাররা ছিল নিতান্তই দুর্বল। অধিকৃত অঞ্চলের বিস্তৃত কৃষিভূমিতে চাষাবাদ করার জন্য তাদের যেমন মুসলিম কৃষক প্রয়োজন, বিভিন্ন নির্মাণকাজ ও কৃষিক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্য তেমনই প্রয়োজন মুসলিম শ্রমিক। এমনকি দুর্গ, নিরাপত্তাপ্রাচীর ইত্যাদি নির্মাণের জন্যও প্রচুর মুসলিম কর্মী প্রয়োজন। পাশাপাশি ইতালিয়ান ও পশ্চিমাদের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন বজায় রাখার জন্যেও সেখানে মুসলিম নাগরিকদের উপস্থিতি প্রয়োজন। ক্রেতা না থাকলে তো একসময় বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে এবং ইতালিয়ান জাহাজগুলো এ অঞ্চলে থাকতে না চেয়ে প্রস্থান করবে। যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসেবে বাইতুল মুকাদ্দাসের অর্থনীতিই নয়; সামরিক শক্তিও দুর্বল হয়ে পড়বে।

এ সবকিছু বিবেচনা করে গডফ্রে ক্রুসেডারদের বৃহত্তর স্বার্থ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নতুন এক নীতি অবলম্বন করেন। আর তা হলো বর্তমানে পরিভাষায় 'শান্তি-আলোচনার নীতি'!

গডফ্রে তার এই প্রতারণাপূর্ণ নীতিটি নিয়ে ভাবতে থাকেন। নীতিটি বাস্তবায়ন করতে পারলে বিরাট স্বার্থোদ্ধার তো হবেই, বিনিময়ে কিছুই হারাতে হবে না। আর তাই তখনও পর্যন্ত যেসব ইসলামি নগরীর পতন ঘটেনি, তিনি সেসব নগরীকে তার সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পাদনের প্রস্তাব দেন। তার প্রস্তাব মেনে নিলে নগরীগুলোর শাসনক্ষমতা মুসলিম প্রশাসকদের হাতেই থাকবে এবং সেখানে ক্রুসেডার বাহিনীর কোনো অংশ অনুপ্রবেশ করবে না। এই সার্বভৌম ক্ষমতার ফলে মুসলিম প্রশাসকগণ নিজেদের চাহিদামতো প্রভাবক শক্তি ও সামাজিক অবস্থান লাভ করবে, জনগণও কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা লাভ করবে। কিন্তু এ সবকিছুর বিনিময়ে গডফ্রে কী লাভ করবেন?!

এতে সামান্যও সন্দেহ নেই যে, গডফ্রের সাম্রাজ্যবাদী স্বপ্ন কখনোই স্তিমিত হবে না। তাহলে কেন তিনি এ ধরনের শান্তি-আলোচনার পথ গ্রহণ করবেন?! তিনি তো সেই ব্যক্তি, যিনি তার অভিধান থেকে বহু পূর্বেই 'শান্তি' শব্দটি মুছে ফেলেছেন!

নিঃসন্দেহে এই সিদ্ধান্তের আড়ালে বিশাল ও সুনিশ্চিত স্বার্থ নিহিত ছিল। ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে যিনিই সূক্ষ্মদৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করবেন, তার সামনেই বিষয়টি সুস্পষ্ট হবে। তবে দৃষ্টি যাদের অন্ধ কিংবা যারা জাতি, আত্মমর্যাদাবোধ ও দ্বীনের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে স্বেচ্ছায় দৃষ্টিকে ফিরিয়ে রেখেছে, তাদের কথা ভিন্ন।

যেসব স্বার্থ বাস্তবায়নের জন্য গডফ্রে এই ধূর্ত নীতি অবলম্বন করেন, সংক্ষেপে তার কয়েকটি হলো-

১. এটি সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ। আর তা হলো বাইতুল মুকাদ্দাসকেন্দ্রিক ক্রুসেড রাজ্যের স্বীকৃতি। মুসলিম শাসকগণ যখন গডফ্রের সঙ্গে শান্তি-আলোচনায় সম্মত হবে, তখন স্বভাবতই তা ক্রুসেড রাজ্যের প্রতি তাদের প্রত্যয়ন ও অনুমোদন হিসেবে বিবেচিত হবে। এর ফলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রুসেডারদের এবং বাইজান্টাইনদেরও আইনগত বৈধতা অর্জিত হবে। প্রকারান্তরে যেন এই স্বীকৃতি প্রদান করা হবে যে, বাইতুল মুকাদ্দাস ক্রুসেডারদের; মুসলমানদের কোনো দিনই তা দাবি করার অধিকার নেই।

যদিও এই বৈধতা প্রাথমিক অবস্থায় আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে থাকবে; কিন্তু ভবিষ্যতে এর প্রভাব অত্যন্ত জটিল হবে এবং পরবর্তী প্রজন্মের পক্ষে এমন অধিকার দাবি করা কঠিন হয়ে পড়বে, যা তাদের পূর্বপুরুষগণ প্রত্যাহার করেছিল।

২. ক্রুসেডাররা সংখ্যাস্বল্পতার সমস্যায় জর্জরিত ছিল। যদিও তারা ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপনের জন্য ইউরোপ থেকে খ্রিষ্টান নাগরিকদের নিয়ে আসার চেষ্টা চালাচ্ছিল; তবে তাদের প্রয়োজন ছিল কর্মক্ষম প্রচুর হাত। দক্ষ জনশক্তির স্বল্পতার কারণে ভবিষ্যতে চাষযোগ্য জমিজমা পতিত ও অনুর্বর হয়ে যাওয়ার এবং খাদ্যদ্রব্যের জোগান কমে গিয়ে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির ভয় ছিল। আশঙ্কা ছিল, দক্ষ জনবলের অভাবে ঘরবাড়ি ও দুর্গ নির্মাণের সামর্থ্য হবে না। বিপরীতে, যদি শান্তিপরিস্থিতি বিদ্যমান থাকে, তাহলে সরল মুসলমানরা অবশ্যই ক্রুসেডারদের মালিকানাধীন ভূমিতে কাজ করার জন্য বের হবে। পরবর্তীকালে যখন ইউরোপ থেকে আগত ক্রুসেডারদের সংখ্যা বেড়ে যাবে, তখন মুসলমানদের কাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া যাবে, এমনকি প্রয়োজনে দেশ থেকেই বিতাড়িত করা হবে।

৩. ইতালিয়ান ব্যবসায়ীরা এর ফলে তাদের পণ্যসম্ভারের ক্রেতা এবং পুরো প্রাচ্যের দেশগুলোতে উন্মুক্ত বাজার পেয়ে যাবে। নিঃসন্দেহে গডফ্রের এই সিদ্ধান্ত ছিল ইতালিয়ান প্রজাতন্ত্রগুলোর জন্য বড় ধরনের একটি প্ররোচনা, যা তাদেরকে এ অঞ্চলে টিকে থাকার নিশ্চয়তা দিচ্ছিল। নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইতালিয়ানদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা ক্রুসেডারদের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল।

৪. এই আলোচনার ফলে ফিলিস্তিনবাসীর সঙ্গে অবশিষ্ট ইসলামি বিশ্বের সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। কারণ, কদিন পরই যখন সকলে দেখবে যে, শত্রুপক্ষ ও অধিকৃত জনগণের মাঝে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজমান আছে, তখন তারা মন্তব্য করবে—ফিলিস্তিনবাসীই তো নিজেদের ক্ষয় ও বিনাশে সন্তুষ্ট আছে। সুতরাং এ বিষয়ে আমাদের চিন্তা করার কী প্রয়োজন! সঠিক ইসলামি উপলব্ধিবোধ-শূন্য পরিবেশে বসবাসকারী ইসলামি বিশ্বের মুসলমানগণ কিছুতেই অনুধাবন করতে পারবে না যে, এটি ফিলিস্তিনের আঞ্চলিক ইস্যু নয়; বরং ইসলাম ও মুসলমানদের সর্বজনীন ইস্যু। ফিলিস্তিনবাসী যদি স্বেচ্ছায়ও নিজেদের ভূখণ্ড ইসলামের শত্রুদের হাতে বিক্রি করতে চায়, তাদের কোনোভাবেই সে অধিকার নেই।

৫. শীঘ্রই ফিলিস্তিনি সমাজে মারাত্মক বিভক্তি সংঘটিত হবে। বরং বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হবে পুরো ইসলামি সমাজে। কারণ, স্বাভাবিকভাবেই এমন একটি শ্রেণি পাওয়া যাবে, যারা বেঁচে থাকার মোহে ক্রুসেডারদের সঙ্গে সমঝোতায় রাজি হবে এবং জবরদখলকারী শত্রুর সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে খুশি থাকবে। তারা তিক্ত হলেও বাস্তব পরিস্থিতিকে মেনে নেবে। বিপরীতে আরেকটি শ্রেণি এমন পাওয়া যাবে, যারা আল্লাহর পথে জিহাদের ঝান্ডা উত্তোলন করবে, জুলুম-অবিচার প্রত্যাখ্যান করবে এবং নিজেদের দ্বীন ও ভূখণ্ডকে বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানাবে। আর এটা মোটেও অসম্ভব ও সুদূরপরাহত নয় যে, একসময় উভয় পক্ষ বিবাদ ও হানাহানিতে জড়িয়ে পড়বে; বরং বিষয়টি হয়তো সশস্ত্র যুদ্ধ পর্যন্ত গড়াবে।

আর এটি একটি সুস্পষ্ট বিষয় যে, এ জাতীয় সংঘাতের ঘটনা ঘটলে পরিণতিতে মুসলমানদের মাঝে হতাশা ও ব্যর্থতা সৃষ্টি হবে এবং ইসলামি ভূখণ্ড জবরদখলকারীদের প্রতিপত্তি আরও দৃঢ়তা লাভ করবে।

এটি মোটেও কল্পনানির্ভর অনুমান নয়। বাস্তবে পুরোপুরি এমনটিই ঘটেছিল। কারণ, যারা ক্ষমতার গদি, বাণিজ্য-চুক্তি কিংবা নিরাপত্তাপ্রাপ্তির আশায় প্রতিটি ক্ষেত্রে শিথিলতা করে গেছে, আল্লাহর রাস্তার মুজাহিদদের ওপর কোনো না কোনো সময় তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা অপরিহার্য হয়ে গিয়েছিল।

৬. সম্ভবত এই শান্তি-আলোচনার অন্যতম ভয়াবহ পরিণতি এটিও যে, এর ফলে কালের পরিক্রমায় একসময় দখলদার ক্রুসেডারদের প্রতি মুসলমানদের প্রতিশোধমূলক চেতনাও বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কয়েক বছর বা কয়েক প্রজন্ম অতিবাহিত হওয়ার পর কিছুতেই উভয় পক্ষের মাঝে জালিম-মজলুম বা ডাকাত-গৃহস্থের সম্পর্ক বিরাজমান থাকবে না এবং ক্রুসেডারদের কেউ অত্যাচারী শত্রু বিবেচনা করবে না। বরং অচিরেই উভয় পক্ষের সম্পর্ক হৃদ্যতা ও নৈকট্য, প্রীতি ও সম্প্রীতির সম্পর্কে রূপ নেবে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পরবর্তী প্রজন্মের হৃদয়জগৎ হতে জিহাদ ও সংগ্রামের চেতনা বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং মুসলমানরা ক্রুসেডার রক্তপিপাসুদের শান্তিপ্রিয় উদার-সহনশীল ব্যক্তি হিসেবে দেখবে। শান্তি-আলোচনায় আগ্রহী মুসলিম নেতৃবৃন্দকে শান্তিপ্রিয়, অন্তরঙ্গ-সুহৃদ অভিধায় ভূষিত করা হবে আর যারা এই ক্ষতিকর ও দ্বীনি চেতনা-পরিপন্থী প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করবে, তাদেরকে পরিচিত করা হবে সন্ত্রাসী-বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে। বলা হবে, এসব লোক এ অঞ্চলের স্থিতিশীল-শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিনষ্ট করার চেষ্টা চালাচ্ছে; এদের দৃষ্টি ও চিন্তা-চেতনা বড় সংকীর্ণ; এরা ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত না করে তাকিয়ে থাকে পায়ের দিকে ইত্যাদি ইত্যাদি।

৭. শান্তি-আলোচনা চলাকালে মুসলমানরা সব ধরনের সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ থেকে বঞ্চিত থাকবে, তাদের পদচারণা শৃঙ্খলিত হয়ে পড়বে এবং তাদেরকে কিছুতেই কোনো বাহিনী গঠনের অনুমতি দেওয়া হবে না। মুসলমানরা হয়তো সর্বোচ্চ নিজেদের নাগরিক ব্যবস্থাপনা সুশৃঙ্খল রাখতে স্থানীয় পুলিশ বাহিনী গঠন করে নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষা করবে; ক্রুসেডার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতো শক্তি তাদের থাকবে না। ফলে ক্রুসেডাররা প্রতিটি কেন্দ্রে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হবে। ক্রুসেডারদের অনুমতি ছাড়া কোনো মুসলিম নাগরিক নিজ অঞ্চল থেকে বের হতে পারবে না; অন্য কোনো ইসলামি ভূখণ্ডে প্রবেশও করতে পারবে না। এভাবে বছরের পর বছর অতিবাহিত হতে থাকবে, এ অঞ্চলের মুসলমানরা লড়াই ও সশস্ত্র প্রতিরোধের সকল পদ্ধতি ভুলে যাবে এবং ক্রুসেডার ও মুসলমানদের মধ্যবর্তী ফাঁকটি দিনে দিনে বিস্তৃত হবে।

৮. শান্তি-আলোচনা সফল হওয়ার পর এ অঞ্চলের মুসলমানগণ শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য ক্রুসেডারদের বার্ষিক জিজিয়া প্রদান করবে। এর ফলে একদিকে ইসলামি শক্তি নিঃশেষ ও অপরদিকে ক্রুসেড শক্তি চাঙা তো হবেই, এর পাশাপাশি ইসলামি ভূখণ্ডের অধিবাসীরা মানসিকভাবেও দিনে দিনে দুর্বল হয়ে যাবে। তারা সর্বদাই নিজেদের ক্রুসেড শক্তির বশীভূত বিবেচনা করে পরাধীনতার চেতনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়বে।

ফিলিস্তিনি মুসলমানদের সঙ্গে শান্তি-আলোচনা সফল হলে ক্রুসেডাররা যেসব স্বার্থ বাস্তবায়ন হবে বলে আশা করছিল, তার কয়েকটি উল্লেখ করা হলো। আমরা দেখতে পাচ্ছি, এগুলো অনেক বড় ও সুবিস্তৃত প্রভাবক স্বার্থ। আর তাই যে রক্তপিপাসু গডফ্রে কয়েক দিন বা কয়েক মাস পূর্বে সত্তর হাজার মুসলমানকে হত্যায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, এখন যদি তিনি গণহত্যার শিকার না হওয়া অবশিষ্ট মুসলমানদের প্রতি শান্তির হাত বাড়িয়ে দেন, তা মোটেও বিরল বা সুদূরপরাহত নয়!

হায়! যুগে যুগে এভাবেই রক্তপিপাসু খুনীরা শান্তির হাত বাড়িয়ে দেয় আর আমরা তাদের উদারতায় মুগ্ধ হয়ে ...!

আলোচ্য চিত্রটির পূর্ণরূপ সামনে আসার জন্য এ বিষয়টিও আমাদের মনে রাখা আবশ্যক যে, শান্তি-আলোচনা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নামে ক্রুসেডাররা যা কিছু করছিল, তা সবই ছিল সাময়িক ও একটি সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য। যেদিনই ক্রুসেডাররা নিজেদেরকে এই অঙ্গীকার ভঙ্গ করে ইসলামি ভূখণ্ড দখল করার মতো শক্তিশালী মনে করবে, সেদিনই তারা দ্বিধাহীন চিত্তে সবকিছু ছুড়ে ফেলবে। তখন এই সমঝোতা চুক্তির মূল্য কাগজের পাতায় মূল্যহীন কালির চেয়ে বেশি কিছু হবে না। তরবারি সেদিন যায়তুন ডালের স্থান দখল করবে। গোপনে নয়; পুরো বিশ্বকে দেখিয়ে-জানিয়ে সেদিন মুসলমানদেরকে খড়গধারী জল্লাদের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে আর মুসলমানরা নিজেদের চোখে বেঁধে রাখা পট্টির মূল্য পরিশোধ করবে!

অবশেষে আসকালান, আরসুফ, আক্কা ও কায়সারিয়াসহ বিভিন্ন ফিলিস্তিনি নগরীর সঙ্গে ক্রুসেডারদের সেই প্রতারণামূলক আলোচনাপর্ব সমাপ্ত হয়; আদর করে যার নামকরণ করা হয় 'শান্তি-আলোচনা'! (৪৮৯) এসব নগরীর অধিবাসীরা পরবর্তী সুযোগে নতুন কোনো ক্রুসেড আগ্রাসন দেখার প্রত্যাশায় আরও কিছুদিনের জন্য বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা লাভ করে!

টিকাঃ
৪৮৩. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৪৩।
৪৮৪. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/২১৫।
৪৮৫. Heyd: op. cit., 1, pp. 134-136.
৪৮৬. Grousset: Hist. des Croisades, 1, p. 183 & Heyd: op. cit., 1, p. 136.
৪৮৭. Albert d' Aix, p. 516.
৪৮৮. Grousset: Hist. des Croisades, 1, p. 182.
৪৮৯. Albert d' Aix, p. 507-515.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00