📄 একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাইতুল মুকাদ্দাস এ সময় উবায়দি সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। প্রশ্ন হলো—নগরীটির অবরোধ ও পতনের সময় সেখানে নিযুক্ত উবায়দি গভর্নর ইফতিখারুদ্দৌলা কোথায় ছিলেন? কোথায় ছিল নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনরত উবায়দি সামরিক রেজিমেন্ট?
উত্তর বড় নির্মম! 'তিনি' এবং 'তারা' জনগণকে অরক্ষিত ফেলে রেখে দাউদের মিহরাবে আশ্রয় নিয়েছিল এবং তিন দিন সেখানেই লুকিয়ে ছিল। এরপরের ঘটনা বেশ রহস্যাবৃত। ক্রুসেডারদের সহায়তায় পূর্ণ নিরাপত্তার সঙ্গে তাদেরকে সেখান থেকে বের করা হয়; তারপর কোনো প্রকার নির্যাতন-নিপীড়ন ব্যতিরেকে সেখান থেকে আসকালান হয়ে মিশরে ফেরত পাঠানো হয়। এর মাধ্যমে বাহ্যত এ ধারণাই দৃঢ়তা লাভ করে যে, তারা নিজেদের নিরাপত্তা লাভের বিনিময়ে গোপনে ক্রুসেডারদের হাতে নগরী তুলে দেওয়ার চুক্তি করেছিল! (৪২৯)
এ কারণেই ক্রুসেডাররা যখন প্রবেশ করে, বাইতুল মুকাদ্দাস তখন সম্পূর্ণ সৈন্যশূন্য!
বর্বর ক্রুসেডাররা জবরদখলকৃত নগরীটিতে নির্মমতা চালানোর জন্য অগ্রসর হতে থাকে। ভীত-সন্ত্রস্ত নাগরিকদের সামনে তখন মসজিদুল আকসায় আশ্রয় নেওয়া ছাড়া মুক্তির আর কোনো পথ ছিল না। তারা আশা করছিল—হয়তো ক্রুসেডাররা স্থানটির পবিত্রতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে কিংবা নিদেনপক্ষে উপাসনালয়ের মর্যাদা রক্ষা করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ক্রুসেডারদের মনমস্তিষ্কে নিকট-দূরবর্তী কোনো সময়েই এ ধরনের চিন্তা-চেতনা ছিল না! (৪৪০)
মসজিদুল আকসায় আশ্রয় গ্রহণকারী নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে সত্তর হাজার মুসলমানকে হত্যা করা হয়। উবায়দি সামরিক রেজিমেন্ট ছাড়া বাকি সবাই নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হয় এবং এক দিনেই পুরো নগরী জনশূন্য হয়ে যায়। (৪৪১)
এই হলো সেই ধর্মীয় অভিযানের চূড়ান্ত রূপ, যার লক্ষ্য 'ঈশ্বর'-এর সন্তুষ্টি এবং 'যিশুখ্রিষ্ট'-এর সেবা!
নিঃসন্দেহে এ ঘটনা ছিল ইউরোপের ললাটের এক কলঙ্ক-দাগ, যা কালের পরিক্রমায় কখনো নিশ্চিহ্ন হবে না!
ক্রুসেড যুদ্ধসংক্রান্ত ঐতিহাসিক উইলিয়াম সুরি (William of Tyre) লিখেছেন-
ক্রুসেডারদের প্রবেশকালে বাইতুল মুকাদ্দাস এক ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করে। মুসলমানদের রক্তে নগরীটি রক্তপ্রান্তরে পরিণত হয়। নগরীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ভীতি ও আতঙ্ক। (৪৪২)
বরং ক্রুসেড যুদ্ধের সমসাময়িক জনৈক ঐতিহাসিক উল্লেখ করেছেন যে, বাইতুল মুকাদ্দাসে ক্রুসেডাররা নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালানোর পরের দিন সকালে তিনি যখন দর্শনার্থী হিসেবে সেখানে প্রবেশ করেন, তখন অনেক কষ্টে মুসলমানদের লাশের মধ্য দিয়ে রাস্তা পাড়ি দিতে সক্ষম হন। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, নিহতদের রক্ত তার হাঁটু পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল! (৪৪৩)
এ তথ্যটিও উল্লেখযোগ্য যে, সেদিন কেবল মুসলমানদেরকেই হত্যা করা হয়নি; বরং বাইতুল মুকাদ্দাসে বসবাসকারী ইহুদিরাও এই হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়। ক্রুসেডাররা ইহুদিদেরকে তাদের উপাসনালয়ে সমবেত করে সেখানে আগুন লাগিয়ে দেয়! (৪৪৪)
আক্ষরিক অর্থেই এটি ছিল জাতিগত নিধনের লক্ষ্যে পরিচালিত এক পরিকল্পিত গণহত্যা।
এই সংবাদ পৌঁছতেই ইসলামি বিশ্বের প্রতিটি ভূখণ্ডে দুঃখ ও বিষণ্ণতার এক বেদনাদায়ক ঢেউ বয়ে যায়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, এই দুঃখ শোক থেকে শক্তি সঞ্চয়ের কার্যকারণ বিবেচিত হয়নি; বরং নেতিবাচক এই দুঃখ-অনুভূতি মুসলিমসমাজকে অক্ষম ও নিশ্চল করে দেয়। আর তাই ইতিহাসের পাতায় আমরা এমন কোনো বিবরণ পাই না যে, বাইতুল মুকাদ্দাসের পতনের পর কোনো মুসলিম বাহিনী মসজিদুল আকসা, আল-কুদস ও ফিলিস্তিন পুনরুদ্ধারের জন্য অগ্রসর হয়েছে কিংবা কোনো অঞ্চলের মুসলিম জনসাধারণ এ বিষয়ে দায়িত্বগ্রহণের জন্য শাসকশ্রেণির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে গণ-আন্দোলন করেছে। (৪৪৫)
নিঃসন্দেহে এটি ছিল চরম ধর্মীয় ও চারিত্রিক বিপর্যয়; শাসক-জনগণ নির্বিশেষে সকলে এর শিকার ছিল।
বিপরীতে ক্রুসেডার বাহিনীর বাইতুল মুকাদ্দাস দখলের সংবাদে খ্রিষ্টান বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়। কারণ, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর রাযি.-এর খিলাফতকালে ষষ্ঠদশ হিজরি সনে (৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে) এ অঞ্চলে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর (এবং নরম্যানরা এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর) থেকে চারশ সত্তর বছরেরও অধিক সময় বাইতুল মুকাদ্দাস কখনোই খ্রিষ্টানদের দ্বারা শাসিত হয়নি। অধিকন্তু বাইতুল মুকাদ্দাস ছিল ক্রুসেড অভিযানের ঘোষিত মূল লক্ষ্য। সুতরাং বাইতুল মুকাদ্দাস দখল মূলত ক্রুসেড অভিযান সফল হওয়ারই নিদর্শন। তদ্রূপ তা অভিযানের পরিকল্পনা প্রণয়নকারী পোপ ২য় আরবানেরও ব্যক্তিগত সাফল্য। অবশ্য এ বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য যে, পোপ আরবানের আল-কুদস পতনের সংবাদ শুনে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। তিনি যদিও আল-কুদস পতনের দুই সপ্তাহ পর ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ জুলাই ইহধাম ত্যাগ করেন; কিন্তু আল-কুদস থেকে বহু দূরে রোমে অনেক দেরিতে এই বিজয়-সংবাদ পৌঁছায়। ফলে নিজ পরিকল্পনার চূড়ান্ত ফলাফল না জেনেই তাকে দুনিয়া ত্যাগ করতে হয়। (৪৪৬)
আমরা এ কথা মনে করি না যে, তার প্রেরিত ক্রুসেড সন্তানরা 'যিশুখ্রিষ্টের' নাম নিয়ে বাইতুল মুকাদ্দাসে যে হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়েছে, তা জানতে পারলে তিনি ব্যথিত হতেন। কারণ, তিনি ইতিপূর্বে এন্টিয়ক ও মাআ'ররাতুন- নোমানের গণহত্যার সংবাদ জেনেও কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। বরং এরও পূর্বে ক্রুসেডাররা হাঙ্গেরির সেমলিন নগরীতে খ্রিষ্টান নাগরিকদের নির্বিচারে হত্যা করলেও তিনি এর কোনো প্রতিবাদ করেননি। আরবানের মৃত্যুর পর যিনি নতুন পোপ নির্বাচিত হন, সেই পোপ ২য় পাসকাল (Pope Paschal II)-ও আল-কুদসের ট্র্যাজেডি সম্পর্কে কোনো ধরনের মন্তব্য করেননি। বরং কালের দীর্ঘ পরিক্রমায় আজ পর্যন্ত কোনো পোপই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য বা ন্যূনতম দুঃখপ্রকাশও করেননি। অথচ সমস্ত ঐতিহাসিক স্বীকার করে যে, এই চরম বর্বর ও অমানবিক ঘটনা হাজার হাজার নিরপরাধ নাগরিকের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। অথচ কোনো কোনো পোপ হিটলারের ইহুদি নিধনের কারণে ইহুদিদের কাছে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। বরং খ্রিষ্টানরা যদিও বিশ্বাস করে যে, 'যিশুখ্রিষ্ট' ইহুদিদের হাতে নিহত হয়েছিলেন, তথাপি তারা ইহুদি জাতির ওপর থেকে মাসিহ-হত্যার পাপের দাবি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। অবশ্য আমাদের নিষ্কম্প বিশ্বাসমতে আল্লাহর নবী হজরত ঈসা মাসিহ আ. নিহতই হননি; বরং মহান আল্লাহ তাআলা তাকে নিরাপদে তুলে নিয়েছেন।
وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينَا بَلْ رَّفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا সত্য কথা হচ্ছে, তারা তাকে হত্যা করেনি। বরং আল্লাহ তাকে নিজের কাছে তুলে নিয়েছেন। বস্তুত আল্লাহ মহা ক্ষমতার অধিকারী, অতি প্রজ্ঞাবান। [সুরা নিসা: ১৫৭-১৫৮]
এই চরম বর্বর ও জঘন্য অপরাধের বিষয়ে নিশ্চুপ থাকাটা স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এ বিষয়ে নীরবতাই যেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বয়ে নিয়ে চলা এক আদর্শ! এই নীরবতার যদি কোনো অর্থ থেকে থাকে, তাহলে তা এটাই যে, ক্রুসেডাররা যে হিংস্র ক্রুসেডীয় চেতনার দাবিতে এ জাতীয় বর্বরতার প্রতি পরিচালিত হয়েছিল, সেই একই চেতনা আজও অনেক রাজনৈতিক, সামরিক ও আদর্শিক নেতৃবৃন্দের দেহ-মনে প্রবাহিত হচ্ছে।
টিকাঃ
৪০৯. প্রাগুক্ত, ৯/১৯।
৪৪০. Gesta Francorum, pp. 203-205.
৪৪১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৯। কেবল ইবনুল আছির-ই নন, প্রাচ্যের বিভিন্ন খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকও এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন। যেমন ইবনুল ইবরি (Bar-Hebraeus) বলেছেন, ফিরিঙ্গিরা নগরীটিতে এক সপ্তাহ অবস্থান করে মুসলমানদের হত্যা করতে থাকে। মসজিদুল আকসার অভ্যন্তরেই নিহত হয় সত্তর হাজারের অধিক মানুষ। দেখুন : ইবনুল ইবরি, তারীখু মুখতাসারিদ দুওয়াল, পৃষ্ঠা: ১৯৭। আর্মেনীয় ঐতিহাসিক ম্যাথিউ ডি এডেসা (Matthieu d' Edesse) উল্লেখ করেছেন, ক্রুসেডাররা যেসব মুসলমানকে হত্যা করেছিল, তাদের সংখ্যা ছিল পয়ষট্টি হাজারের ঊর্ধ্বে। দেখুন: Doc. Arm, 1, p. 45.
৪৪২. Guillaume de Tyr, 1, p. 354.
৪৪৩. Raymond d'Aigles, p. 300.
৪৪৪. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৩৭।
৪৪৫. আবুল মাহাসিন, আন-নুজুমুয যাহিরা, ৫/১৫০।
৪৪৬. কাসিম আবদুহু কাসিম, মাহিয়াতুল হুরূবিস সালীবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১৩১।
📄 ‘গডফ্রে’ বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রহরী!
কে লাভ করবে বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসনক্ষমতা?
বিষয়টি যেমন অত্যন্ত জটিল ছিল, তেমনই বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসনক্ষমতা নিয়ে বিবাদমান পক্ষও ছিল অনেক। বাইতুল মুকাদ্দাসের ক্ষমতার প্রতি আকর্ষণ কেবল সম্পদ ও ভূখণ্ডের মোহেই ছিল না; এটি ছিল সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। কারণ, যিনি বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক পদে অধিষ্ঠিত হবেন, তিনি প্রাচ্য-প্রতীচ্যের সকল খ্রিষ্টানের কাছে অনন্য মর্যাদার পাত্রে পরিণত হবেন। রোমান গির্জা, ইস্টার্ন গির্জা ও আর্মেনীয় গির্জাসহ নির্বিশেষে বৈশ্বিক গির্জায় তার বিশেষ অবস্থান-মর্যাদা সৃষ্টি হবে। তার নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে। কারণ, আল-কুদস সকল ধর্মের কাছেই মর্যাদার স্থান। মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদি সকল জাতির কাছেই আল-কুদসের রয়েছে অত্যুচ্চ মর্যাদা।
আল-কুদস ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত এক নগরী। সম্ভবত পৃথিবীর আর কোনো নগরী এক্ষেত্রে আল-কুদসের সঙ্গে তুল্য নয়।
বাইতুল মুকাদ্দাসের ক্ষমতা নিয়ে বিবাদমান পক্ষগুলো কারা?
প্রথমেই আসবে ক্রুসেড যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সেসব সেনাপতির নাম, যারা তখন পর্যন্ত কোনো ভূখণ্ডের অধিকার লাভ করেননি। অর্থাৎ এডেসা রাজ্যের শাসক বল্ডউইন এবং এন্টিয়ক রাজ্যের অধিপতি বোহেমন্ড বাদে সকল সেনাপতি।
তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দাবিদার হলেন উত্তর ফ্রান্স, লোরেন ও জার্মানি থেকে আগত বাহিনীর প্রধান গডফ্রে। অভিযানের শুরু থেকেই গডফ্রে এমন কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন, যা তাকে অন্যান্য সেনাপতির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছিল। তার বাহিনীতে এমন অনেক সামন্ত ও যুবরাজ শরিক ছিল, যাদের অধিকাংশই ছিল গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তির অধিকারী। এমনকি এডেসায় আলাদা রাজ্য প্রতিষ্ঠাকারী বল্ডউইনও তার অধীনে ছিলেন। গডফ্রে জার্মানির প্রতাপশালী সম্রাট ৪র্থ হেনরির সঙ্গে মিত্রতা বজায় রাখতেন। এতেও তার শক্তি প্রচুর বৃদ্ধি পেয়েছিল। তৃতীয়ত তিনি অন্যান্য ক্রুসেডার সেনাপতির কাছে জনপ্রিয় ও আস্থাভাজন ছিলেন। তিনি উদার চিত্তে তাদের মতামত গ্রহণ করতেন। অধিকন্তু অভিযানের বিভিন্ন পর্যায়ে এবং বিভিন্ন যুদ্ধে গডফ্রের প্রজ্ঞাপূর্ণ মতামত ও ভূমিকাও সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। (৪৪৯) এ সবকিছু মিলিয়ে বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসনক্ষমতা লাভের ক্ষেত্রে গডফ্রের যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল।
ক্ষমতার আরেক দাবিদার ছিলেন ৪র্থ রেমন্ড। অভিযানের শুরু থেকেই তিনি নিজেকে স্বতন্ত্র ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যধারী ও পুরো ক্রুসেডার বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে জাহির করতে সচেষ্ট ছিলেন। তিনি ছিলেন পোপ ২য় আরবানের বন্ধু। তিনি কথায় কথায় যিশুখ্রিষ্ট ও ক্রুশের উদ্ধৃতি দিতেন। এ সবকিছু মিলিয়ে তিনি নিজেকে এই পবিত্র ভূমির নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত বিবেচনা করছিলেন। তবে রেমন্ড নিজের সামর্থ্য ও যোগ্যতাকে বাস্তবতার চেয়ে উন্নতরূপে উপস্থাপনের চেষ্টা করতেন এবং তার এ প্রচেষ্টা অনেক সময় দাম্ভিকতার রূপে প্রকাশ পেত। ফলে অন্যান্য সেনাপতির কাছে তার অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছিল। (৪৫০) এজন্যই অনেক সময় উপযুক্ত কোনো কারণ ছাড়াই কেবল নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে এবং তার আনুগত্যের প্রতি নিজেদের অনাগ্রহ প্রকাশ করতে তারা তার বিরোধিতা করত।
অন্যান্য সেনাপতিও আল-কুদসের ক্ষমতার অভিলাষী ছিল। যদিও তাদের সুযোগ ও সম্ভাবনা ছিল উল্লিখিত দুজনের চেয়ে কম। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে বোহেমন্ডের ভাগ্নে নরম্যান সেনাপতি টেনক্রেডের কথা। এন্টিয়ক পতনের পর তিনি তার মামার সঙ্গে এন্টিয়কে থাকতে এজন্যই অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন যে, তিনি কারও অধীনে না থেকে নিজের জন্য আলাদা কিছু করার এবং একটি স্বতন্ত্র রাজ্যের শাসক হওয়ার স্বপ্ন লালন করতেন। এশিয়া মাইনর অঞ্চলে ক্রুসেড অভিযান শুরুর একদম গোড়ার দিকে তারসুস ও আশেপাশের অঞ্চলের ক্ষমতা নিয়ে যখন তিনি বল্ডউইনের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছিলেন, তখনই তার এই লালসা প্রকাশ পেয়ে গিয়েছিল।
অপরদিকে পশ্চিম ফ্রান্সের নরমান্দে অঞ্চলের ডিউক রবার্ট কার্তুজ অন্যদের তুলনায় নিজের সামর্থ্য স্বল্পতার বিষয়টি অনুভব করতেন। এ কারণেই তিনি স্বতন্ত্র কিছু লাভ করার পরিবর্তে অন্যের অধীনে একজন সেনাপতি হিসেবে থাকাকেই যথেষ্ট বিবেচনা করছিলেন।
মোটামুটি এরাই হলো ক্রুসেড অভিযানের সেনাপতি এবং বাইতুল মুকাদ্দাসের গুরুত্বপূর্ণ সিংহাসন লাভের সম্ভাব্য প্রার্থী।
কিন্তু বাইতুল মুকাদ্দাসের সিংহাসন লাভের অভিলাষ কি কেবল তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল?!
এ বিষয়ে সামান্যও সন্দেহ নেই যে, ক্যাথলিক গির্জারও বাইতুল মুকাদ্দাসের ক্ষমতার প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিল। কারণ, ক্রুসেড অভিযান মূলত পোপ ২য় আরবানের নির্দেশনায়ই শুরু হয়েছিল আর আমরা পূর্বেও উল্লেখ করে এসেছি যে, তৎকালে গির্জা কেবল ধর্মীয় সম্মানসূচক প্রতিষ্ঠানই ছিল না; গির্জা ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী এক শক্তি, যার নিজস্ব জায়গির, সেনাবাহিনী, ধন-সম্পদ সবই ছিল। স্বয়ং পোপেরও সাধারণ শাসক-প্রশাসকদের ন্যায় বরং তাদের চেয়েও বেশি ক্ষমতার অভিলাষ ছিল। আর এ তো বাইতুল মুকাদ্দাস! এই পবিত্র ভূমির ওপর তো গির্জার অধিকার সম্পূর্ণই যৌক্তিক।
তবে শেষ কয়েকদিনে ক্যাথলিক গির্জা বড় দুটি আঘাতের সম্মুখীন হয়েছিল। প্রথমটি হলো ক্রুসেড অভিযানে শরিক পোপের প্রতিনিধি অ্যাডমারের মৃত্যু। তিনি বছরখানেক পূর্বে এন্টিয়কে মারা গেছেন। (৪৫১) তিনি ক্রুসেডার বাহিনীর সঙ্গে থাকলে তার বাইতুল মুকাদ্দাসের দায়িত্ব গ্রহণ সম্পূর্ণই যৌক্তিক বিষয় হতো। (৪৫২) দ্বিতীয় আঘাতটি ছিল ক্রুসেড অভিযানের প্রধান পরিকল্পক, সমন্বয়ক ও উদ্দীপক স্বয়ং পোপ আরবানের মৃত্যু। স্বভাবতই এ বিষয়ে তার আগ্রহ ও উদ্দীপনা নতুন পোপ ২য় পাসকালের চেয়ে বেশি ছিল। (৪৫৩) এ কারণেই পরিবর্তিত নতুন পরিস্থিতিতে ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দের স্বাধীন কর্মতৎপরতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হওয়াই স্বাভাবিক ছিল।
ইউরোপে নাস্তিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের প্রতিনিধিত্বকারী রাজন্যবর্গের সঙ্গে ধর্ম ও গির্জার প্রতিনিধিত্বকারী পোপ, বিশপ ও পাদরিদের বিবাদের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। আমাদের বর্ণিত প্রেক্ষাপটে বাইতুল মুকাদ্দাসের ক্ষমতা লাভের সুযোগ ও সম্ভাবনা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের বেশি ছিল। (৪৫৪)
অবশ্য আরও একটি শক্তি বাইতুল মুকাদ্দাসের ক্ষমতা লাভে অভিলাষী ছিল। আর তা হলো বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য। নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোসের সাম্রাজ্যবাদী লালসা এশিয়া মাইনরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এটিও সুনিশ্চিত যে, বাইজান্টাইনরা তাদের এই অতীত ভুলে যায়নি যে, তারা একসময় বাইতুল মুকাদ্দাসসহ পুরো ফিলিস্তিন অঞ্চল শাসন করত। এখন তো বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য এ অঞ্চলে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামি শক্তিকে বিধ্বস্তপ্রায় দেখতে পাচ্ছে। সুতরাং এখনই সুযোগ নিজেদের পুরোনো মালিকানাধীন ভূখণ্ডগুলোকে পুনরুদ্ধার করার। অধিকন্তু ক্রুসেড অভিযানের শুরুতে একমাত্র রেমন্ড বাদে সকল সেনাপতি বাইজান্টাইন সম্রাটের আনুগত্যের শপথ করেছিল। এমনকি স্বয়ং রেমন্ডও সম্রাটের মর্যাদারক্ষার শপথ করেছিলেন। অধিকন্তু রেমন্ড পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে ত্রিপোলি অবরোধের সময়সহ ক্রুসেড অভিযানের শেষ দিনগুলোতে সম্রাটের ভূমিকাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলে ধরতে যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন। (৪৫৫)
এ সবকিছুর অর্থ হচ্ছে, বাইতুল মুকাদ্দাসে ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় বাইজান্টাইন সম্রাটের নিশ্চুপ না থাকাই প্রত্যাশিত। এ কারণেই ক্রুসেডারদের জন্য জরুরি ছিল দ্রুত একজন নেতা নির্বাচন করা, যিনি পরিস্থিতি পুনঃবিন্যাস করবেন, সেনাবাহিনীকে বিন্যস্ত করবেন এবং আগামী দিনগুলোর জন্য কার্যকর প্রস্তুতি গ্রহণ করবেন। বিশেষত এ বিষয়টিও তাদের ভাবনায় ছিল যে, উবায়দি সাম্রাজ্যের প্রতি তাদের আগ্রহ সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হওয়ায় উবায়দিরাও নিশ্চয়ই বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাবে। তা ছাড়া আগামী দিনগুলোতে প্রাচ্যের মুসলমান ও আব্বাসি খিলাফতের ভূমিকা কেমন হবে এবং তা মোকাবিলার পদ্ধতি কী হবে, তা নিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণও জরুরি ছিল।
পূর্ববর্তী বিশ্লেষণে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত গডফ্রে ও রেমন্ড এই দুই সামরিক নেতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আর তাই এই দুই নেতার মাঝে যেন কোনো ধরনের বিবাদ-বিসংবাদের ঘটনা না ঘটে, এ উদ্দেশ্যে সাধারণ ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দ ১৭ জুলাই বাইতুল মুকাদ্দাসের নেতৃত্ব নির্ধারণী সভায় মিলিত হয়। (৪৫৬)
যদিও ধনসম্পদের বিচারে রেমন্ড অধিক উপযুক্ত ছিলেন এবং ক্ষমতার প্রতি তার লালসা ও আগ্রহও ছিল অধিক; (৪৫৭) কিন্তু সেনাপতিগণ গডফ্রেকেই বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক হিসেবে নির্বাচনের বিষয়ে একমত হয়। কারণ, সেনাপতিগণ বিবেচনা করে দেখে যে, গডফ্রের উপস্থিতিতে তাদের মতপ্রকাশ ও অভিপ্রায় বাস্তবায়নের সুযোগ থাকবে। বিপরীতে রেমন্ড ছিলেন নিজ সিদ্ধান্তে প্রচণ্ড রকম অনমনীয় ও একগুঁয়ে। তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণে কারও মতের তোয়াক্কা করতেন না। (৪৫৮)
এভাবেই গডফ্রে বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক ও নেতায় পরিণত হন!
বাইতুল মুকাদ্দাসের দায়িত্ব গ্রহণের সময় গডফ্রে এমন কিছু বিনম্র আচরণ প্রকাশের চেষ্টা করেন, যা দ্বারা এ বিষয়টি প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয় যে, ক্রুসেড অভিযান মূলত বাইতুল মুকাদ্দাসে খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই পরিচালিত হয়েছিল। প্রথমেই তিনি দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন যে, তিনি এই মহান দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত নন। এর মাধ্যমে তিনি এই মিথ্যা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে চাচ্ছিলেন যে, তিনি কোনো প্রকার ক্ষমতা বা নেতৃত্বের লোভে এ অঞ্চলে আসেননি! এরপর অন্যান্য সেনাপতির পীড়াপীড়ির পর স্বভাবতই তিনি দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হন। তবে তিনি রাজা বা শাসক উপাধি ধারণে অস্বীকৃতি জানান এবং এমন একটি ধর্মীয় উপাধি ধারণ করেন, যা দ্বারা তার বিনয় প্রকাশ পায়। তিনি নিজেকে পরিচিত করেন 'বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রহরী' (Defender of the Holy Sepulchre) উপাধিতে। (৪৫৯) পাশাপাশি 'যিশুখ্রিষ্ট' যে অঞ্চলে কণ্টক-মুকুট (crown of thorns) পরিধান করেছেন, তিনি সেখানে স্বর্ণ ও মনি-মুক্তাখচিত মুকুট পরিধানে অস্বীকৃতি জানান!(৪৬০)
এই কুশলী অভিনয়ের মাধ্যমে মূলত বিশ্ববাসীকে এই বিষয়ে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করা হয় যে, ক্রুসেডাররা বাইতুল মুকাদ্দাসে কেবল ধর্মের সহায়তায়ই আগমন করেছে এবং অভিযানে অংশগ্রহণকারী সেনাপতিগণ ছিল সৎ, নিষ্ঠাবান ও বিনয়ী!
যখন এমন কিছু মুসলিম লেখকের লেখা পাঠ করি, যারা বিভিন্ন পশ্চিমা-খ্রিষ্ট উৎসের ওপর নির্ভর করে ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস লিখেছেন, তখন বড় বিস্ময় জাগে। তাদের লেখায়ও পাওয়া যায় যে, গডফ্রেকে সচ্চরিত্র, বিনয়-নির্মোহতা ও ধার্মিকতার কারণেই বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক নির্বাচিত করা হয়েছিল!
এসব ঐতিহাসিকের যেন মনেই থাকে না যে, গডফ্রে বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক নির্বাচিত হয়েছিলেন জুলাইয়ের ১৭ তারিখে অর্থাৎ সত্তর হাজার নারী-পুরুষ-শিশু মুসলিম নাগরিককে হত্যা করার মাত্র দুদিন পর। (৪৬১) আর এর পূর্বে একই রকম গণহত্যা চালানো হয়েছিল এন্টিয়ক ও মাআররাতুন-নোমান নগরীতেও।
এরই নাম বিবেক-বুদ্ধিকে কোনো ধরনের চিন্তা-ভাবনা ও উপলব্ধির সুযোগ না দিয়ে পশ্চিমা ঐতিহাসিকগণ হতে অক্ষরে অক্ষরে ইতিহাস বর্ণনার সংকট!
গডফ্রে ডি বোলোনের এসব আচরণের যৌক্তিক ব্যাখ্যা হলো, এর মাধ্যমে তিনি অন্যান্য সেনাপতির হৃদ্যতা ও সহানুভূতি অর্জনের এবং ক্রুসেড বাহিনীর অভ্যন্তরে বিবাদমান দলগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। আর বাইতুল মুকাদ্দাসের রক্ষক বা প্রহরী উপাধি ধারণ করা ছিল এক ধরনের তোষণনীতি! এর মাধ্যমে তিনি গির্জার নৈকট্য অর্জন এবং গির্জা কর্তৃক বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক পদে স্বীকৃতি লাভ করতে চেয়েছিলেন। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ব্যাপকভাবে ইউরোপজুড়ে পদ-পদবি, জায়গির ও ক্ষমতা নিয়ে সম্রাট, শাসক ও রাজন্যবর্গের সঙ্গে গির্জার সংঘাত বেশ প্রসিদ্ধ ছিল। এর সঙ্গে এ বিষয়টিও যোগ করুন যে, চলমান সংঘাতের বিষয় হলো পবিত্র আল-কুদস নগরী আর ক্রুসেড অভিযানের মূল আহ্বায়ক ও পুরো অভিযানের যাবতীয় বিষয়ের সমন্বয়ক হলেন ইউরোপীয় ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পোপ ২য় আরবান।
এসব বিষয়কে একসঙ্গে মনে রাখলে আমরা সহজেই উপলব্ধি করতে পারি যে, সকলেই বাইতুল মুকাদ্দাসের গির্জার নেতৃত্ব প্রত্যাশা করছিল। সুতরাং এটি সুস্পষ্ট যে, হঠাৎ করেই নিজেকে অতি ধার্মিক পরিচয়ে পরিচিত করার চেষ্টা করে গডফ্রে মূলত বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক-পদ ও বিশপ-পদ উভয়টি একসঙ্গে বাগাতে চেয়েছিলেন!
পরবর্তী সময়ে আল-কুদস নগরীর নতুন বিশপ বা গির্জাধ্যক্ষ নির্বাচনের সময় স্বয়ং গডফ্রেসহ ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দ যে আচরণ করেছিল, তা দ্বারা উপরের দাবি আরও দৃঢ়তা ও সমর্থন লাভ করে। তারা সকলে মিলে এমন একজন দুর্বল ও তুলনামূলক অখ্যাত ব্যক্তিকে বিশপ নির্বাচিত করে, যার কোনো গৌরবময় অতীত তো নেই-ই; বরং ব্যাপকভাবে তার চরিত্র নিয়ে এবং বিশেষ করে ক্রুসেড অভিযান চলাকালে তার আচরণ নিয়ে প্রচুর আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। তিনি হলেন আরনাল্ফ মালকোরন (Arnulf Malcorone)। এমন দুর্বল চরিত্রের একজন ব্যক্তিকে এজন্যই গির্জাধ্যক্ষ নির্বাচিত করা হয়েছিল, যেন সে বাইতুল মুকাদ্দাসের নেতৃত্ব ও ক্ষমতার লালসা করতে না পারে। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে আমরা দেখব যে, যখনই কোনো শক্তিশালী ব্যক্তি গির্জার নেতৃত্ব লাভ করেছে, সে-ই এই পবিত্র নগরীর ক্ষমতা লাভের জন্য সুস্পষ্ট আগ্রহ প্রকাশ করেছে। (৪৬২)
ক্রুসেড অভিযাত্রীদের নেতা গডফ্রের বিনয় সম্পর্কে এতটুকু বিশ্লেষণই সম্ভব!
বাইতুল মুকাদ্দাসের গির্জা সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে এ তথ্যটিও প্রণিধানযোগ্য যে, কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পরই ক্রুসেডাররা নগর-পরিস্থিতি পুরো বদলে দেয়। তারা আল-কিয়ামা গির্জা হতে অর্থোডক্স পাদরিদের তাড়িয়ে দেয়। এতে স্থানীয় খ্রিষ্টানরা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেও বাধাদানের কোনো শক্তি তাদের ছিল না। (৪৬৩) নতুন শাসক গডফ্রে অর্থোডক্স পাদরিদেরকে 'সত্য ক্রুশ' ফিরিয়ে দিতে বাধ্য করেন। তারা ক্রুশটি লুকিয়ে রেখেছিল। খ্রিষ্টানদের মিথ্যা ধারণামতে যে কাষ্ঠখণ্ডে হজরত ঈসা মাসিহ আ.-কে চড়ানো হয়েছিল, তার নাম 'সত্য ক্রুশ'। (৪৬৪)
অর্থোডক্স বিশপ নির্ধারণের আশা হারিয়ে ফেলার পর বাইতুল মুকাদ্দাসে বসবাসকারী অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের সামনে এই পরিস্থিতি মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। ইতিপূর্বে ইসলামি শাসনের ছায়ায় প্রাচ্যের খ্রিষ্টানরা যে ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করত, ক্রুসেডাররা এ অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর তারা তার অনেকটাই হারিয়ে ফেলে। (৪৬৫)
টিকাঃ
৪৪৭. Guillaume de Tyr, 1, p. 357.
৪৪৮. Michaud: op. cit. 1, p. 428-429.
৪৪৯. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/২০৪।
৪৫০. প্রাগুক্ত, ১/২০৩।
৪৫১. Runciman, op. cit., 1, p. 289.
৪৫২. Setton: op. cit. 1, p. 338.
৪৫৩. কাসিম আবদুহু কাসিম, মাহিয়াতুল হুরূবিস সালীবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১৩১।
৪৫৪. মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখুস সালাজিকা ফি বিলাদিশ শাম, পৃষ্ঠা: ২৪৬।
৪৫৫. Grousset: Hist. des Croisades 1, p. 138.
৪৫৬. উইলিয়াম সুরি, তারীখুল আ'মালিল মুনজিযাহ ফী-মা ওয়ারাআল বিহার, ১/৪৪৪-৪৪৬ Chalandon: pp. 278-279; Grousset: 1, p. 165-168.
৪৫৭. Runciman: op. cit., 1, p. 291.
৪৫৮. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/২০৪।
৪৫৯. Runciman: op. cit., 1, p. 292-293.
৪৬০. Michaud: op. cit. 1, p. 436.
৪৬১. ইবনুল ইবরি, তারীখু মুখতাসারিদ দুওয়াল, পৃষ্ঠা: ১৯৯ ও আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৯।
৪৬২. Raymond d' Aigles: p. 302.
৪৬৩. Runciman: op. cit., 1, p. 294.
৪৬৪. Raymond d' Aigles: p. 302. প্রচলিত খ্রিষ্টধর্মের অনুসারীদের বিশ্বাস অনুযায়ী যে কাষ্ঠখণ্ডে হজরত ঈসা আ.-কে শূলে চড়ানো হয়, তার ভগ্নাবশেষকে 'সত্য ক্রুশ' (The True Cross) বলা হয়। খ্রিষ্টানদের মহাসভার সিদ্ধান্ত ও খ্রিষ্টান চার্চের ঐতিহাসিক সক্রেটিস (Socrates Scholasticus)-এর দাবি অনুযায়ী ৩২৬-৩২৮ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন রোমান সম্রাট কনস্টান্টাইনের মা হেলেনা সত্য ক্রুশ আবিষ্কার করেন। [অনুবাদক]
৪৬৫. Michaud: op. cit. 1, p. 438.
📄 ব্যর্থ পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা
এখন বাইতুল মুকাদ্দাস পতনের পর কি ক্রুসেডারদের স্বপ্ন ও লক্ষ্য পূরণ হয়েছে? এবার কি তারা সাম্রাজ্যবাদ, রাজ্যবিস্তৃতি ও দখলদারিত্বের প্রচেষ্টা হতে নিবৃত্ত হবে?
মানবপ্রবৃত্তি সর্বদাই কামনা করে আরও বেশি মালিকানা, আরও সম্পদ-আধিক্য।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
اَلْهٰكُمُ التَّكَاثُرُ
(পার্থিব ভোগসামগ্রীতে) একে অন্যের ওপর আধিক্যলাভের বাসনা তোমাদের উদাসীন করে রাখে। [সূরা তাকাছুর : ০১]
নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন—
لَوْ كَانَ لِابْنِ آدَمَ وَادِيَانِ مِنْ مَّالٍ لَّابْتَغٰى وَادِيًا ثَالِثًا ۖ وَّلَا يَمْلَأُ جَوْفَ ابْنِ آدَمَ إِلَّا التُّرَابُ
আদমসন্তানের যদি দুই উপত্যকা ভরা সম্পদ থাকে, তাহলে সে তৃতীয় উপত্যকা কামনা করবে। একমাত্র মাটিই আদমসন্তানের উদর পূর্ণ করতে পারবে!(৪৬৬)
ব্যাপকভাবে সাধারণ মানুষের প্রবৃত্তিচাহিদা এমনই হয়ে থাকে। তাহলে পশ্চিম ইউরোপ থেকে আগমনকারী এসব বর্বর, কঠোর হৃদয় ও কঠিন প্রকৃতির মানুষের চাহিদা ও লালসা কেমন হতে পারে?!
আর তাই বাইতুল মুকাদ্দাসে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পরই ক্রুসেডাররা নিজেদের রাজ্য আরও বিস্তৃত করতে আশেপাশের নগর ও জনপদগুলোর দিকে নজর দিতে শুরু করে। যুক্তি ছিল পবিত্র নগরী ও পবিত্র নগরীর পথের নিরাপত্তাবিধান!
যে বেদনাদায়ক বাস্তবতার মাঝে সমকালীন মুসলিম উম্মাহ বসবাস করছিল, তার কারণে ক্রুসেডারদের এই সাম্রাজ্যবাদী স্বপ্ন মুসলমানদের জন্য আরও করুণতর পরিণতি টেনে নিয়ে আসে। কারণ, আশেপাশের এলাকাগুলোর মুসলমানরা তখন এমন একজন নিষ্ঠাপূর্ণ নেতার অভাবে ভুগছিল, যিনি তাদেরকে কুরআন-সুন্নাহর পথে সমবেত করবেন; মুসলমানরা এমন একতার অভাবে ভুগছিল, যা তাদের বিচ্ছিন্নতাকে দূর করে এক সুতোয় গাঁথতে সক্ষম হবে। তারা ভুগছিল জিহাদি চেতনা ও আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাতের মৃত্যুর চেতনাসংকটে। ফলে আল-কুদসের গণহত্যা তাদেরকে হতবুদ্ধি করে দেয়। মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্য তারা যেকোনো কিছু করার সিদ্ধান্ত নেয়। আর এ চিন্তা থেকেই ফিলিস্তিনে ক্রুসেডারদের অবাধে কর্তৃত্ব ফলানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়।
আল-কুদসের পর ফিলিস্তিনে প্রথম পতন ঘটে নাবলুস (Nablus) নগরীর। নাবলুস আল-কুদস থেকে মাত্র পঞ্চাশ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। নাবলুসের পতনঘটনা ছিল বড় লাঞ্ছনাকর। নগরীটির মুসলিম অধিবাসীরা নিজেরাই এসে ক্রুসেডারদের হাতে নগরভার তুলে দেয়! ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দের জুলাইয়ের শেষ দিকে টেনক্রেড নাবলুসের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। (৪৬৭)
আগস্টের চার তারিখে অর্থাৎ বাইতুল মুকাদ্দাস পতনের বিশ দিন পর উবায়দি বাহিনী ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আসকালান (Ashkelon) বন্দরে পৌঁছায়। (৪৬৮) উবায়দি বাহিনী বন্দর ত্যাগ করার পূর্বেই ক্রুসেডাররা তাদের আগমন সম্পর্কে অবগত হয় এবং তৎক্ষণাৎ প্রতিটি স্থান থেকে দ্রুত অগ্রসর হয়ে তাদের মোকাবিলা করার জন্য সমবেত হয়। উভয় বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল নিজ নিজ সর্বোচ্চ নেতা। ক্রুসেডার বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন 'বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রহরী' গডফ্রে আর উবায়দি বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন প্রধান উজির ও যাবতীয় বিষয়ের একচ্ছত্র কর্তৃত্বের অধিকারী আফজাল শাহানশাহ বিন বদর আল- জামালি। (৪৬৯) স্বয়ং উবায়দি খলিফার চেয়েও উজির আফজালের ক্ষমতা- প্রভাব ও সম্মান-মর্যাদা অধিক ছিল।
১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১২ আগস্ট আসকালানে উভয় বাহিনীর মধ্যে এক বিরাট যুদ্ধ সংঘটিত হয়। অল্প সময় না যেতেই উবায়দি বাহিনী বিভক্ত ও ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যায় এবং তাদের প্রচুর সৈন্য নিহত হয়। আফজাল আল-জামালি কয়েকজন আস্থাভাজন ও বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে একটি জাহাজে করে মিশরে পালিয়ে যান। এই একটি অভিযানের মাধ্যমেই ফিলিস্তিন ভূখণ্ড হতে হৃত অংশ পুনরুদ্ধারের জন্য উবায়দি সাম্রাজ্যের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার সূচনা ও সমাপ্তি ঘটে।(৪৭০)
টিকাঃ
৪৬৬. ইমাম বুখারি, সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬০৭২, ইমাম মুসলিম, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১০৪৮, ইমাম তিরমিজি, সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২৩৩৭, ইমাম আহমাদ, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১২২৫০ ও ইমাম দারিমি, মুসনাদুদ-দারিমি, হাদিস নং ২৭৭৮।
📄 আসকালান ও সংকটময় পরিস্থিতি
পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের বিবরণে যাওয়ার পূর্বে আমরা এখানে একটু থেমে ক্রুসেডাররা ইসলামি নগরী আসকালানের প্রতি কী আচরণ করেছিল, তা সামান্য আলোচনা করতে চাচ্ছি। এর ফলে আমরা ক্রুসেডার বাহিনীর নেতৃবৃন্দের পারস্পরিক সম্পর্কের প্রকৃতি এবং তাদের যুদ্ধ ও বিজয়ের লক্ষ্য সম্পর্কে ধারণা অর্জন করতে পারব; জানতে পারব তৎকালীন মুসলমানদের স্বভাব-প্রকৃতি সম্পর্কেও।
সৈন্যদের সুউচ্চ মনোবলকে কাজে লাগিয়ে ক্রুসেডাররা তৎক্ষণাৎ আসকালান নগরী অবরোধ করে। নিরাশা ও হতাশায় আচ্ছন্ন কিংকর্তব্যবিমূঢ় মুসলমানদের পক্ষে তখন গডফ্রে ও তার বাহিনীর মোকাবিলা করার শক্তি ছিল না। তাই তারা প্রতিরোধের পরিবর্তে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
আসকালান নগরপ্রাচীরের অভ্যন্তরে এ কথা ছড়িয়ে পড়েছিল যে, ক্রুসেডার সেনাপতি রেমন্ড ইতিপূর্বে যেমন বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রহরারত উবায়দি রেজিমেন্টকে নিরাপত্তা প্রদান করে বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে নিরাপদে বেরিয়ে যেতে দিয়েছেন, তিনিই এখন আসকালানবাসীকেও নিরাপত্তা-অঙ্গীকার প্রদান করেছেন।(৪৭১) সম্ভবত তাদের কাছে এ সংবাদও পৌঁছেছিল যে, গডফ্রে ও রেমন্ডের মধ্যে ক্রুসেডার বাহিনীর নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ চলছে। ইতিপূর্বে রেমন্ড গডফ্রের প্রতি প্রতিশোধবশত এবং ক্রুসেডার বাহিনীর মাঝে নিজের উপস্থিতির প্রমাণ দিতে উবায়দি প্রহরীদের নিরাপত্তা প্রদান করেছিলেন। এ কারণে আসকালানবাসী বিবেচনা করে যে, তারা যদি গডফ্রের পরিবর্তে রেমন্ডের কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনা করে, তাহলে তুলনামূলক ভালো হবে।(৪৭২) কারণ, তখন রেমন্ড গডফ্রের বিরোধিতা করার এবং আসকালানবাসীর কাছে জনপ্রিয়তা অর্জনের উৎসাহ দেখাবেন। কারণ, রেমন্ড তো নিজের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাজ্য খুঁজে ফিরছেন। যদি তিনি তাদেরকে জীবনের প্রতিশ্রুতি দেন, তাহলে আসকালান কেন তার সেই স্বপ্নের রাজ্য হতে পারে না?!
বড় বিস্ময়কর ছিল আসকালানবাসীর চিন্তা!
বাস্তবেও তাদের অনুমান সত্য হয়েছিল!
আসকালানবাসীর সাড়া পেয়ে রেমন্ড উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠেন এবং তৎক্ষণাৎ আসকালান থেকে অবরোধ প্রত্যাহারের জন্য গডফ্রের সঙ্গে বিতর্ক শুরু করেন। কিন্তু গডফ্রে নিশ্চিত ছিলেন যে, রেমন্ড আসকালানবাসীর প্রতি দয়াবশত কিংবা সচ্চরিত্রের বহিঃপ্রকাশের জন্য অবরোধ তুলতে চাচ্ছেন না; তিনি আসকালানকে নিজের রাজ্য বানাতে চাচ্ছেন। এটি ছিল স্বয়ং গডফ্রের লক্ষ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, তিনি তো চাচ্ছেন আসকালান বন্দরকে বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে ভূমধ্যসাগরের দিকে একটি বৃহৎ বহিঃগমন পথ তৈরি করতে এবং তুলনামূলক অভ্যন্তরীণ নগরী আল-কুদসের জন্য বহিঃবিশ্ব হতে আগত জনশক্তি, সামরিক সহায়তা ও রসদ সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। পাশাপাশি তিনি এমন কিছু বাণিজ্যিক বন্দরের নিয়ন্ত্রণও লাভ করতে চাচ্ছিলেন, যা বাইতুল মুকাদ্দাসের অর্থনীতিকে চাঙা ও প্রাণবন্ত করে রাখবে।
এ কারণেই গডফ্রে সুস্পষ্ট ভাষায় রেমন্ডের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন এবং রেমন্ডকে আসকালানের কর্তৃত্ব প্রদান করতে অস্বীকৃতি জানান। এতে রেমন্ড এত বেশি ক্রুদ্ধ হন যে, তিনি তার সৈন্যদের নিয়ে অবরোধ ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং প্রকারান্তরে গডফ্রেকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন যে, পারলে তিনি যেন রেমন্ডকে ছাড়াই আসকালান অধিকার করেন!(৪৭৩) আর বাস্তবেও গডফ্রে আসকালান অধিকার করতে ব্যর্থ হন!
টিকাঃ
৪৬৭. Gesta Francorum, pp. 209 & Guibert de Nogent, p 304.
৪৬৮. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৩৭।
৪৬৯. Gesta Francorum, pp. 209.
৪৭০. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা : ১৩৭।
৪৭১. Setton: op. cit. 1, p. 837.
৪৭২. Runciman: op. cit., 1, p. 297.
৪৭৩. Raoul de cam (Hist. Occid 111), p. 703.