📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 মিশর দখলের চিন্তা!

📄 মিশর দখলের চিন্তা!


এই বৈঠকে ক্রুসেডাররা অতি গুরুত্বপূর্ণ এমন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে, যা পরবর্তীকালে অন্যান্য ক্রুসেড অভিযানের পরিকল্পনা নির্ধারণে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল এবং ভবিষ্যৎ ক্রুসেড অভিযানগুলোর গতিপথ কেমন হতে পারে, তার রূপরেখা সুস্পষ্ট করে তুলেছিল।

ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দ এ সময় কায়রোতে আক্রমণ ও মিশর পতনের সম্ভাব্যতা নিয়ে মতবিনিময় করে! (৪২৯)

আজ থেকে নয় শতাব্দীরও অধিক কাল পূর্বে ক্রুসেডারদের চিন্তাধারা কত অগ্রসর ছিল! সে সময়ই ক্রুসেডাররা উপলব্ধি করে যে, বাইতুল মুকাদ্দাসের চাবিকাঠি কায়রোতেই আছে। এর কারণ শুধু এই নয় যে, তখন মিশরের শাসকগোষ্ঠী উবায়দিদের হাতে বাইতুল মুকাদ্দাসের নিয়ন্ত্রণ ছিল। কারণ, ক্রুসেডাররা পুরোপুরি বুঝে ফেলেছিল যে, উবায়দিরা ক্রুসেডার বাহিনীর আগমনে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। ক্রুসেডারদের এই উপলব্ধি ও পর্যালোচনা ছিল বিশাল মিশর রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিস্তৃতির কারণে। মিশর দক্ষিণ ও পশ্চিম দিক থেকে ফিলিস্তিনকে ঘিরে আছে। মিশরের আছে বিশাল জনশক্তি, অত্যুচ্চ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং ফিলিস্তিনের সঙ্গে বিশেষত মসজিদুল আকসার ধারক বাইতুল মুকাদ্দাস নগরীর সঙ্গে স্বভাবজাত নৈকট্য-অনুভূতি। এ কারণেই ক্রুসেডাররা তাদের এই বৈঠকে মিশরে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই দুঃসাহসী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মতো যথেষ্ট শক্তি তাদের ছিল না। বিশেষ করে এ বিষয়টিও তাদের মাথায় ছিল যে, মিশর আক্রমণ করতে হলে তাদের সিনাই মরুভূমির সুকঠিন মরু অঞ্চল পাড়ি দিতে হবে। হতে পারে এই কঠিন বাধা পাড়ি দিতে গিয়ে ক্রুসেড শক্তি সমূলে ধ্বংস হয়ে যাবে। এসব দিক বিবেচনা করে তারা আপাতত এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চিন্তা পরিহার করে এবং সরাসরি বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু এই বৈঠক ছিল অতি সুস্পষ্ট এক চিন্তা-পরিকল্পনা, যা ক্রুসেড অভিযানসমূহের নেতৃবৃন্দ এবং তাদের পরবর্তী উত্তরাধিকারীদের মনমস্তিষ্কে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে পঞ্চম ও সপ্তম ক্রুসেড অভিযানে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়। এ দুটি ক্রুসেড অভিযান সরাসরি মিশরকে টার্গেট করেই পরিচালিত হয়েছিল। (৪৩০)

টিকাঃ
৪২৬. আরসুফ: কায়সারিয়া ও জাফার মধ্যবর্তী শাম সাগরের একটি উপকূলীয় নগরী। ইয়াকুত আল-হামাবি, মুজামুল বুলদান, ১/১৫১।
৪২৭. Albert d' Alex, p. 460.
৪২৮. অজ্ঞাত ঐতিহাসিক, আ'মালুল ফারানজা ওয়া হুজ্জাজি বাইতিল মাকদিস, পৃষ্ঠা: ২৭৭, ফুশিয়া আশ-শারতিরি (Foucher de Chartres), তারীখুল হামলাতি ইলাল কুদস, পৃষ্ঠা: ৭০ ও উইলিয়াম সুরি, তারীখুল আ'মালিল মুনজিযাহ ফী-মা ওয়ারাআল বিহার, ১/৪০০।
৪২৯. Raymond d'Alx, p. 299; Chalandon: p. 267; Grousset: 1, pp. 150-151.
৪৩০. Albert d' Aix, p. 292.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 সুন্নাতুল্লাহ ও শাশ্বত রীতি

📄 সুন্নাতুল্লাহ ও শাশ্বত রীতি


এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যে, ক্রুসেডার বাহিনী যখন এন্টিয়ক থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত সুদীর্ঘ ছয়শ কিলোমিটারেরও অধিক পথ পাড়ি দিয়েছিল, এই সুবিশাল অঞ্চলের মুসলিম সৈন্যদল তখন কোথায় ছিল?! সুবিস্তৃত এসব অঞ্চলে কি একজন বিচক্ষণ ও ন্যায়পরায়ণ নেতাও ছিল না?! বস্তুত ইতিহাসের ওই দুর্যোগপূর্ণ সন্ধিক্ষণে মুসলমানরা জাতিগঠনের মূল ও মৌলিক উপাদানগুলোই হারিয়ে ফেলেছিল। এ কারণেই সমকালীন মুসলিম শক্তিগুলো বাধাপ্রদান দূরে থাক, ক্রুসেডারদের সাদরে স্বাগত জানায় এবং প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইসরা-ভূমি, প্রথম কিবলা, তৃতীয় হারাম শরিফ ও বরকতপূর্ণ ভূখণ্ড বাইতুল মুকাদ্দাসকে অপবিত্র করার ঘটনা দ্বিধাহীন চিত্তে মেনে নেয়। পবিত্র ভূমিতে অপবিত্র পদচারণায় তাদের হৃদয়জগৎ সামান্যও কম্পিত হয়নি; কেউ বাইতুল মুকাদ্দাসের পবিত্রতা রক্ষায় এগিয়ে আসেনি। এ কারণেই ক্রুসেডাররা নির্বিঘ্নে বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছে যায় আর মুসলমানরা হয়ে পড়ে অবরুদ্ধ!

তৎকালীন মুসলিমসমাজ নানাবিধ ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিল।

তারা আক্রান্ত ছিল ধর্ম-বিচ্ছিন্নতার ব্যাধিতে, ইসলামি মমত্ববোধ-শূন্যতার রোগে। বিশুদ্ধ ও শক্তিশালী আকিদার প্রতি সম্বন্ধিত আত্মমর্যাদাবোধ হারিয়ে ফেলার ব্যাধিতেও আক্রান্ত ছিল সমকালীন মুসলিমসমাজ।

তারা আক্রান্ত ছিল বেদনাদায়ক বিভেদ-বিচ্ছিন্নতার ব্যাধিতে। প্রতিটি নগরী একেকটি স্বতন্ত্র ইমারত ও বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। বরং প্রত্যেকেই নিজ মুসলিম প্রতিবেশীর সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত ছিল।

তৎকালীন মুসলিমসমাজ নির্ভেজাল ও নিষ্ঠাবান নেতৃত্বের শূন্যতায় ভুগছিল। এমন কোনো নেতা ছিলেন না, যিনি বিভক্ত জাতিকে একক কাঠামোতে পরিণত করবেন, ব্যক্তিস্বার্থ ও ব্যক্তিলিপ্সার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে জাতির উন্নতি সাধনে সচেষ্ট থাকবেন।

সেকালের মুসলমানগণ প্রভাবিত ছিল যাপিত বাস্তবতার বাহ্যিক দর্শন দ্বারা, প্রভাবিত ছিল চারপাশের ঘটনা-দুর্ঘটনা ও আপদ-বিপদ দ্বারা। তারা আক্রান্ত ছিল রাজনৈতিক প্রজ্ঞাস্বল্পতা ও সামরিক দক্ষতাশূন্যতার রোগে।

নিঃসন্দেহে সমকালীন মুসলিম উম্মাহ জটিল ও যৌগিক সংকটের এক যুগ অতিক্রম করছিল!

আমরা যদি তৎকালীন মুসলিম উম্মাহর এই নতজানু অবস্থান ও পরাভবতায় বিস্ময়বোধ করে থাকি, তাহলে আমাদের তো আরও বেশি বিস্ময়বোধ করা উচিত ক্রুসেডারদের অবস্থানে! কীভাবে তারা সামান্য ভয়-ডর-শঙ্কার শিকার না হয়ে ইসলামি বিশ্বের এতটা গভীরে এত দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দেওয়ার সাহস করল এবং শত্রুভূমির কেন্দ্রমূলে নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারল? তারা ঘন জন-অধ্যুষিত বিভিন্ন অঞ্চল পাড়ি দিয়েছে, সমৃদ্ধ সামরিক শক্তির অধিকারী বিভিন্ন মুসলিম রাজ্যের মাঝে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে, নিজেদের মাতৃভূমি হতে শত শত মাইল দূরত্বে চলে এসেছে। যদি তারা পরাজিত হতো, তাহলে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। তাদের পালাবার বা আশ্রয় নেওয়ার কোনো জায়গা আশেপাশে ছিল না!

কীভাবে তারা মানবিক স্বভাবগত ভয়কে জয় করেছিল? কীভাবে প্রদর্শন করতে পেরেছিল এমন চরম দুঃসাহসিকতা?

উত্তর হলো—আমরা গ্রন্থের শুরুতেই উল্লেখ করে এসেছি যে, ক্রুসেডাররা তৎকালীন ইউরোপের অতি কঠিন ও দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে এসেছিল। ইউরোপে তাদের জীবন ছিল মৃত্যুসম। ইউরোপের যন্ত্রণাদায়ক বাস্তবতা থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রচণ্ড স্পৃহা তাদেরকে অন্য যেকোনো প্রাপ্তির জন্য পাগল করে তুলেছিল। তাদের দৃষ্টিতে ইউরোপে বিরাজমান প্রচণ্ড দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে জীবন কাটানোর চেয়ে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে মৃত্যু বেশি কষ্টদায়ক ছিল না।

অবশ্য কেবল এই চিন্তাধারাই ক্রুসেডার বাহিনীর প্রচণ্ড আগ্রাসী আচরণ, ভয়-ডরহীন মনোভাব ও বেপরোয়া-নিরুদ্বেগ কর্মনীতির একমাত্র কারণ হতে পারে না। কারণ, যত কষ্ট ও ক্ষুধার যন্ত্রণা থাকুক না কেন, নিজের প্রাণ সকলের কাছে অতি প্রিয়। বিশেষত যাদের পরকালে বিশ্বাস নেই, জান্নাতের প্রতি স্বচ্ছ-সঠিক ঈমান নেই এবং জান কোরবান ও প্রাণ বিসর্জনের শক্তিশালী কোনো উদ্দীপক ও অনুপ্রাণিকা নেই, তারা কীভাবে এমন ভয়হীন অভিযান পরিচালনা করতে পারে?!

তাহলে এই সুকঠিন সমীকরণের প্রকৃত তাৎপর্য ও বিশ্লেষণ কী?

কেন-কীসের জোরে ক্রুসেডারদের হৃদয়জগতে এভাবে সুস্পষ্ট ও প্রকাশ্যরূপে বীরত্ব উদ্ভাসিত হলো?!

বিষয়টির সঠিক উপলব্ধি লাভের জন্য আমাদের হজরত ছাওবান রাযি. হতে বর্ণিত একটি হাদিস পাঠ করতে হবে। হাদিসটি আমাদের সামনে চলমান পরিস্থিতিকে এমন সুস্পষ্ট করে তুলবে যে, মনে হবে-আমরা যেন তা দিব্য চোখে দেখতে পাচ্ছি।

নবীজি একদিন ইরশাদ করলেন- «يُوْشِكُ الْأُمَمُ أَنْ تَدَاعَى عَلَيْكُمْ كَمَا تَدَاعَى الْأَكَلَةُ إِلَى قَصْعَتِهَا»

শীঘ্রই এমন এক কাল আসবে, যখন বিভিন্ন জাতিবর্গ তোমাদের বিরুদ্ধে পরস্পরকে আহ্বান করতে থাকবে, যেভাবে একে অন্যকে ডেকে আনে দস্তরখানে।

নবীজি এ কথা বলার পর উপস্থিত জনৈক সাহাবি প্রশ্ন করলেন, 'তখন কি সংখ্যাস্বল্পতার দরুন আমরা এরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হব?'

নবীজি উত্তর দিলেন- بَلْ أَنْتُمْ يَوْمَئِذٍ كَثِيرُ ، وَلَكِنَّكُمْ غُثَاءُ كَغُثَاءِ السَّيْلِ، وَلَيَنْزَعَنَّ اللَّهُ مِنْ صُدُوْرِ عَدُوِّكُمُ الْمَهَابَةَ مِنْكُمْ، وَلَيَقْذِفَنَّ اللَّهُ فِي قُلُوْبِكُمُ الْوَهْنَ»

বরং সেদিন তোমরা সংখ্যায় থাকবে অনেক। কিন্তু তোমরা হবে স্রোতে ভেসে আসা খড়কুটোর মতো। আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তোমাদের শত্রুদের বক্ষ থেকে তোমাদের প্রভাব-ভীতি তুলে নেবেন এবং আল্লাহ অবশ্যই তোমাদের অন্তরে 'ওয়াহন' ঢেলে দেবেন।

জনৈক সাহাবি প্রশ্ন করলেন, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ! ওয়াহন (দ্বারা) কী (উদ্দেশ্য)?'

নবীজি উত্তর দিলেন, «حُبُّ الدُّنْيَا، وَكَرَاهِيَةُ الْمَوْتِ» দুনিয়াপ্রীতি ও মৃত্যুবিরাগ। (৪৩১)

ক্রুসেড অভিযানের সময় ফ্রান্স, ইতালি, ইংল্যান্ড ও জার্মানিসহ পশ্চিমা যেসব অঞ্চলের জাতিবর্গ একে অপরকে আহ্বান করেছিল, তারা এ কারণেই তা করতে পেরেছিল যে, আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তর হতে মুসলমানদের প্রভাব-ভীতি উঠিয়ে নিয়েছিলেন। ফলে তারা মুসলমানদের পরোয়া করেনি, পরোয়া করেনি মুসলমানদের সংখ্যাধিক্য, সুরক্ষিত দুর্গ ও অস্ত্রশস্ত্র কিছুরই। এ কারনেই আমরা ইতিহাসের ধারাবিবরণীতে লক্ষ করেছি—ক্রুসেডার বাহিনীর কাছ থেকে কখনোই দুর্বল আচরণ প্রকাশ পায়নি, মুসলমানদের মোকাবিলায় তারা সামান্য দ্বিধা করেনি। তারা পূর্ণ স্বাধীনতা ও পরিপূর্ণ নির্ভীক চিত্তে বিভিন্ন অঞ্চল অভিমুখে অগ্রসর হয়েছে।

বিপরীতে মুসলমানদের অন্তরে অক্ষমতা, দুর্বলতা ও অবসন্নতা ঢেলে দেওয়া হয়েছিল। আর তাই যদিও ক্রুসেডাররা তাদের তুলনায় জনবল-অস্ত্রবল ও অন্যান্য বৈষয়িক বিবেচনায় দুর্বল ছিল; কিন্তু মুসলমানরা ক্রুসেডারদের নাম শুনতেই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে উঠছিল।

উল্লিখিত হাদিসটিতে দুটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

প্রথম লক্ষণীয় ও ভাবনার বিষয় হলো, আল্লাহ তাআলা আমাদের শত্রুদের অন্তর থেকে আমাদের প্রভাব-ভীতি তুলে নেন এবং তিনিই আবার আমাদের অন্তরে ভীরুতা-কাপুরুষতা ঢেলে দেন! কেউ প্রশ্ন করতে পারে, আমাদের মহান প্রতিপালক কেন এমন করেন? যত কিছুই হোক—শেষ পর্যন্ত তো আমরা ঈমানদার, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী আর আমাদের শত্রুপক্ষ কাফির ও অবিশ্বাসী?!

এর উত্তর হলো—আল্লাহ তাআলা কেবল তখনই মুসলমানদেরকে সম্মান ও মর্যাদা দান করেন যখন তারা নিজেদের ইসলামের সঙ্গে সম্পূর্ণ জড়িয়ে রাখে এবং কুরআন-সুন্নাহর বিধিবিধানকে অপরিহার্য বিষয়রূপে গ্রহণ করে। দ্বীনি বিষয়ে শিথিলতা সত্ত্বেও আল্লাহ যদি মুসলমানদের সাহায্য করতেন, তাহলে বিরাট ফিতনা সৃষ্টি হতো। তখন মানুষ বলত, 'আমাদের ইসলামি অনুশাসন মানার কী প্রয়োজন! ইসলাম না মেনেও তো আমরা সাহায্যপ্রাপ্ত হয়েছি।' আর তাই এ জাতীয় বিস্ময়কর পরিস্থিতি সৃষ্টির মাধ্যমে মুসলমানদের আপন দ্বীনের বিষয়ে মনোযোগী হওয়ার এবং বিজয়ের প্রকৃত চাবিকাঠির ওপর হাত রাখার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়।

দ্বিতীয় লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধরনের বেদনাদায়ক পারস্পরিক আহ্বান সংঘটিত হওয়ার কার্যকারণ। প্রতিটি ট্র্যাজেডি ও দুর্ঘটনার বিবরণে যদিও অনেক শব্দ খরচ হয়; কিন্তু হাদিসে তার কার্যকারণ অতি সংক্ষেপে মাত্র দুই শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে-দুনিয়াপ্রীতি ও মৃত্যুবিরাগ।

মুসলমানরা দুনিয়ার সঙ্গে অননুমোদিত সম্পর্ক গড়েছিল; এমনকি আল্লাহর পথে মৃত্যুবরণকেও অপছন্দ করছিল। আর শাশ্বত রীতি হলো-যে জাতি মৃত্যুকে ভয় করে, তারা অবশ্যই বশীভূত ও পরাভূত হবে। যে জাতি পৃথিবী ও পার্থিব সম্পদের মোহে আক্রান্ত হয়, তারা অবশ্যই লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হবে। নবীজি তো ইরশাদ করেছেন, 'দুনিয়া হলো অভিশপ্ত আর দুনিয়া অবলম্বনকারীর পরিণতি ধ্বংস।' কেবল পার্থিব জীবনের পতন ও ধ্বংসই নয়; তার আখিরাতও বরবাদ হবে।

এই কার্যকারণই আমাদের সামনে সেই উৎকন্ঠাজনক শিথিলতা ও পরাভবতার তাৎপর্য সুস্পষ্ট করে, যা আমরা তৎকালীন মুসলমানদের মাঝে প্রত্যক্ষ করেছি। তারা অতি মূল্যবান উপহারসামগ্রী ও প্রচুর অর্থসম্পদ নিয়ে ক্রুসেডারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিবেদন করছিল—ক্রুসেডাররা যেন তাদেরকে বেঁচে থাকতে দেয়! একটাই চাওয়া-জীবন এবং জীবন! সে জীবন যেমনই হোক না কেন!

আল্লাহর শপথ! নিঃসন্দেহে এরই নাম লাঞ্ছনা ও অপদস্থতা!

এভাবেই পার্থিব মোহে আচ্ছন্ন মুসলমানরা বাইতুল মুকাদ্দাসে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে আর দূরে বসবাসকারী মুসলমানরা পরম নিশ্চিন্তে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। তারা যেন সেদিনের প্রতীক্ষায় বসে আছে যেদিন তাদের পালা আসবে এবং তারাও দুর্যোগের শিকার হবে!

টিকাঃ
৪০১. ইমাম আবু দাউদ, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪২৯৭, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২২৪৫০, আবু দাউদ তায়ালিসি, মুসনাদুত তায়ালিসি, হাদিস নং ৯৯২, ইবনে আবি শাইবা, আল-মুসান্নাফ, ৭/৪৬৩, বায়হাকি, শু'আবুল ঈমান, হাদিস নং ১০৩৭২ ও আবু নুআইম আল-আসবাহানি, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ১/১৮২।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 আল-কুদসের পতন

📄 আল-কুদসের পতন


১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ৬ জুন ক্রুসেডাররা রামলা ত্যাগ করে এবং ৭ জুন বাইতুল মুকাদ্দাসের নগরপ্রাচীরের কাছে পৌঁছায়। ১০৯৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ নভেম্বর (৪৮৮ হিজরি সনের ২৭ জিলকদ) ক্লেরমন্ট সম্মেলনের মাধ্যমে পোপ ২য় আরবান যে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, অবশেষে সাড়ে তিন বছরেরও অধিক সময় পর ক্রুসেডাররা তার চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হয়।

পবিত্র নগরীর সাক্ষাৎ লাভের পর ক্রুসেডার যোদ্ধারা কেমন আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিল, ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ তার বেশ উচ্ছ্বসিত বিবরণ দিয়েছেন। (৪০২) এর একমাত্র উদ্দেশ্য হিংস্র ও বর্বর ক্রুসেড অভিযানের নোংরা রূপটিকে যথাসম্ভব দর্শনযোগ্য করে তোলা। প্রকৃত বাস্তবতা হলো, ক্রুসেডার বাহিনী বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত পৌঁছতেই যথেষ্ট দ্বিধান্বিত ছিল। কারণ, তারা তো পথে অন্যান্য রাজ্যে আগ্রাসন চালিয়েই তুষ্ট ছিল। এই ক্রুসেডার বাহিনীই অর্থকড়ি, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, ভূ-মালিকানা ও নেতৃত্বসহ পার্থিব বিভিন্ন বিষয়ে পরস্পর বিবাদ করে এসেছে; অঙ্গীকার ও শপথ করে তা ভঙ্গ করেছে। অধিকন্তু এর অব্যবহিত পরেই এই ক্রুসেডাররা পবিত্র নগরীর অভ্যন্তরে যা ঘটাতে যাচ্ছে, তা স্মরণ করলে তো সমগ্র মানবতাই লজ্জিত হয়! কাজেই তাদের সম্পর্কে পবিত্র নগরীর দর্শনলাভে আবেগাপ্লুত হওয়ার কাহিনি রচনা কতটা ধোপে টিকবে, তা বলাই বাহুল্য।

১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ৭ জুন আল-কুদস নগরীকে ঘিরে কঠিন অবরোধ শুরু হয়।

ক্রুসেডাররা সময় নষ্ট না করে সঙ্গে করে নিয়ে আসা যথেষ্ট পরিমাণ অবরোধসামগ্রী কাজে লাগায় এবং নগরপ্রাচীর লক্ষ্য করে একটানা গোলাবর্ষণ করতে থাকে। (৪৩৩) আল-কুদসের অভ্যন্তরে অবস্থানরত মুসলমানদের তখন নিস্ফল প্রতিরোধ এবং পতনকে যথাসম্ভব বিলম্বিত করানোর চেষ্টা করা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না।

অবরোধ শুরু হওয়ার সপ্তাহখানেক পর ১৫ জুন অস্ত্রশস্ত্র, রসদপত্র ও কিছু সৈন্য নিয়ে ইতালির জেনোভা থেকে কয়েকটি জাহাজ জাফা (Jaffa) নৌবন্দরে এসে পৌঁছায়। অল্প কয়েকটি জাহাজবিশিষ্ট ক্ষুদ্র নৌবহরটিই অতি সহজে জাফা বন্দরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। কারণ, ক্রুসেডার বাহিনী আরসুফের কাছাকাছি আসার পরই জাফাবাসী শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল! আগত সামরিক সহায়তা ক্রুসেডারদের মনোবল ও শক্তি বৃদ্ধিতে যথেষ্ট প্রভাব ফেলে।(৪০৪) এ কারণেই অবরোধ আরও তীব্র ও শক্তিশালী করা হয়।

একে একে কঠিন ও দুঃসহ দিনগুলো অতিবাহিত হতে থাকে। অবশিষ্ট মুসলিম বিশ্ব নীরবে এই বর্বরতা প্রত্যক্ষ করতে থাকে। এক দিন-দুই দিন করে একে একে কেটে যায় পূর্ণ এক মাস। দিনে দিনে উভয় পক্ষের জন্যই পরিস্থিতি কঠিন হয়ে ওঠে। জুলাই মাসের প্রচণ্ড গরমে উন্মুক্ত স্থানে ক্রুসেডারদের অবস্থান করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে বিভিন্ন সূত্রে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে যে, ইতিমধ্যে উবায়দি বাহিনী অবরুদ্ধ আল-কুদস নগরী উদ্ধারের জন্য মিশর থেকে রওনা হয়েছে। আর তাই এন্টিয়ক অবরোধ চলাকালে ক্রুসেডাররা যেরূপ সংকটের সম্মুখীন হয়েছিল, এবারও তেমন কিছু ঘটার পূর্বেই পবিত্র আল-কুদস নগরীর পতন ঘটানোর জন্য ক্রুসেডাররা দ্রুত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করে।(৪০৫) তারা নগরপ্রাচীরের ওপর নজরদারি করতে কাঠের দুটি টাওয়ার তৈরি করে। বেথেলহাম (Bethlehem) এলাকার ঘরবাড়ি ভেঙে সেগুলোর ছাদের কাঠ দিয়ে টাওয়ারদুটি তৈরি করা হয়। এরপর ক্রুসেডাররা টাওয়ার ব্যবহার করে নগরীর অভ্যন্তরে হামলা শুরু করে। অবরুদ্ধ মুসলমানরা অগ্নিশর নিক্ষেপ করে প্রথম টাওয়ারটি জ্বালিয়ে দেয়।(৪০৬) তবে অপর টাওয়ারটি ব্যবহার করে ক্রুসেডাররা চাপ অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়। এরপর কিছু সৈন্য নগরপ্রাচীরের ওপর দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে(৪০৭) এবং ভেতর থেকে ফটক খুলে দিতে সক্ষম হয়। ক্রুসেডাররা এবার তীব্র গতিতে পবিত্র নগরীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে! সেদিন ছিল ৪৯২ হিজরি সনের ২২ শাবান মোতাবেক ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ জুলাই। বেদনাদায়ক সেই দিনটি উম্মাহর ইতিহাসে চিরদিন অবিস্মৃত হয়ে থাকবে।(৪০৮)

নগরীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করেই 'আবেগাপ্লুত' ক্রুসেডারদের হিংস্র ও বর্বর রূপ প্রকাশ পেতে শুরু করে। আর তাই অবরুদ্ধ মুসলমানদের সামনে ক্রুসেডার সৈন্যদের সামনে থেকে পালানো ছাড়া ভিন্ন কোনো পথ খোলা ছিল না।

টিকাঃ
৪০২. Guillaume de Tyr, p. 318.
৪০৩. Gesta Francorum, p. 195.
৪০৪. অজ্ঞাত ঐতিহাসিক, আ'মালুল ফারানজা ওয়া হুজ্জাজি বাইতিল মাকদিস, পৃষ্ঠা : ২৭৮-২৭৯ ও উইলিয়াম সুরি, তারীখুল আ'মালিল মুনজিযাহ ফী-মা ওয়ারাআল বিহার, ১/৪২১-৪২৪। Heyd: Hist. du Commerce, 1, pp. 134-135 & Cam. Med. Hist. Vol. 5. p.258.
৪০৫. Runciman, op. cit., 1, pp. 283-284.
৪০৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৯।
৪০৭. আবুল মাহাসিন, আন-নুজুমুয যাহিরা, ৫/১৪৮-১৪৯।
৪০৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৯।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

📄 একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন


পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাইতুল মুকাদ্দাস এ সময় উবায়দি সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। প্রশ্ন হলো—নগরীটির অবরোধ ও পতনের সময় সেখানে নিযুক্ত উবায়দি গভর্নর ইফতিখারুদ্দৌলা কোথায় ছিলেন? কোথায় ছিল নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনরত উবায়দি সামরিক রেজিমেন্ট?

উত্তর বড় নির্মম! 'তিনি' এবং 'তারা' জনগণকে অরক্ষিত ফেলে রেখে দাউদের মিহরাবে আশ্রয় নিয়েছিল এবং তিন দিন সেখানেই লুকিয়ে ছিল। এরপরের ঘটনা বেশ রহস্যাবৃত। ক্রুসেডারদের সহায়তায় পূর্ণ নিরাপত্তার সঙ্গে তাদেরকে সেখান থেকে বের করা হয়; তারপর কোনো প্রকার নির্যাতন-নিপীড়ন ব্যতিরেকে সেখান থেকে আসকালান হয়ে মিশরে ফেরত পাঠানো হয়। এর মাধ্যমে বাহ্যত এ ধারণাই দৃঢ়তা লাভ করে যে, তারা নিজেদের নিরাপত্তা লাভের বিনিময়ে গোপনে ক্রুসেডারদের হাতে নগরী তুলে দেওয়ার চুক্তি করেছিল! (৪২৯)

এ কারণেই ক্রুসেডাররা যখন প্রবেশ করে, বাইতুল মুকাদ্দাস তখন সম্পূর্ণ সৈন্যশূন্য!

বর্বর ক্রুসেডাররা জবরদখলকৃত নগরীটিতে নির্মমতা চালানোর জন্য অগ্রসর হতে থাকে। ভীত-সন্ত্রস্ত নাগরিকদের সামনে তখন মসজিদুল আকসায় আশ্রয় নেওয়া ছাড়া মুক্তির আর কোনো পথ ছিল না। তারা আশা করছিল—হয়তো ক্রুসেডাররা স্থানটির পবিত্রতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে কিংবা নিদেনপক্ষে উপাসনালয়ের মর্যাদা রক্ষা করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ক্রুসেডারদের মনমস্তিষ্কে নিকট-দূরবর্তী কোনো সময়েই এ ধরনের চিন্তা-চেতনা ছিল না! (৪৪০)

মসজিদুল আকসায় আশ্রয় গ্রহণকারী নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে সত্তর হাজার মুসলমানকে হত্যা করা হয়। উবায়দি সামরিক রেজিমেন্ট ছাড়া বাকি সবাই নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হয় এবং এক দিনেই পুরো নগরী জনশূন্য হয়ে যায়। (৪৪১)

এই হলো সেই ধর্মীয় অভিযানের চূড়ান্ত রূপ, যার লক্ষ্য 'ঈশ্বর'-এর সন্তুষ্টি এবং 'যিশুখ্রিষ্ট'-এর সেবা!

নিঃসন্দেহে এ ঘটনা ছিল ইউরোপের ললাটের এক কলঙ্ক-দাগ, যা কালের পরিক্রমায় কখনো নিশ্চিহ্ন হবে না!

ক্রুসেড যুদ্ধসংক্রান্ত ঐতিহাসিক উইলিয়াম সুরি (William of Tyre) লিখেছেন-

ক্রুসেডারদের প্রবেশকালে বাইতুল মুকাদ্দাস এক ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করে। মুসলমানদের রক্তে নগরীটি রক্তপ্রান্তরে পরিণত হয়। নগরীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ভীতি ও আতঙ্ক। (৪৪২)

বরং ক্রুসেড যুদ্ধের সমসাময়িক জনৈক ঐতিহাসিক উল্লেখ করেছেন যে, বাইতুল মুকাদ্দাসে ক্রুসেডাররা নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালানোর পরের দিন সকালে তিনি যখন দর্শনার্থী হিসেবে সেখানে প্রবেশ করেন, তখন অনেক কষ্টে মুসলমানদের লাশের মধ্য দিয়ে রাস্তা পাড়ি দিতে সক্ষম হন। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, নিহতদের রক্ত তার হাঁটু পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল! (৪৪৩)

এ তথ্যটিও উল্লেখযোগ্য যে, সেদিন কেবল মুসলমানদেরকেই হত্যা করা হয়নি; বরং বাইতুল মুকাদ্দাসে বসবাসকারী ইহুদিরাও এই হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়। ক্রুসেডাররা ইহুদিদেরকে তাদের উপাসনালয়ে সমবেত করে সেখানে আগুন লাগিয়ে দেয়! (৪৪৪)

আক্ষরিক অর্থেই এটি ছিল জাতিগত নিধনের লক্ষ্যে পরিচালিত এক পরিকল্পিত গণহত্যা।

এই সংবাদ পৌঁছতেই ইসলামি বিশ্বের প্রতিটি ভূখণ্ডে দুঃখ ও বিষণ্ণতার এক বেদনাদায়ক ঢেউ বয়ে যায়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, এই দুঃখ শোক থেকে শক্তি সঞ্চয়ের কার্যকারণ বিবেচিত হয়নি; বরং নেতিবাচক এই দুঃখ-অনুভূতি মুসলিমসমাজকে অক্ষম ও নিশ্চল করে দেয়। আর তাই ইতিহাসের পাতায় আমরা এমন কোনো বিবরণ পাই না যে, বাইতুল মুকাদ্দাসের পতনের পর কোনো মুসলিম বাহিনী মসজিদুল আকসা, আল-কুদস ও ফিলিস্তিন পুনরুদ্ধারের জন্য অগ্রসর হয়েছে কিংবা কোনো অঞ্চলের মুসলিম জনসাধারণ এ বিষয়ে দায়িত্বগ্রহণের জন্য শাসকশ্রেণির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে গণ-আন্দোলন করেছে। (৪৪৫)

নিঃসন্দেহে এটি ছিল চরম ধর্মীয় ও চারিত্রিক বিপর্যয়; শাসক-জনগণ নির্বিশেষে সকলে এর শিকার ছিল।

বিপরীতে ক্রুসেডার বাহিনীর বাইতুল মুকাদ্দাস দখলের সংবাদে খ্রিষ্টান বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়। কারণ, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর রাযি.-এর খিলাফতকালে ষষ্ঠদশ হিজরি সনে (৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে) এ অঞ্চলে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর (এবং নরম্যানরা এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর) থেকে চারশ সত্তর বছরেরও অধিক সময় বাইতুল মুকাদ্দাস কখনোই খ্রিষ্টানদের দ্বারা শাসিত হয়নি। অধিকন্তু বাইতুল মুকাদ্দাস ছিল ক্রুসেড অভিযানের ঘোষিত মূল লক্ষ্য। সুতরাং বাইতুল মুকাদ্দাস দখল মূলত ক্রুসেড অভিযান সফল হওয়ারই নিদর্শন। তদ্রূপ তা অভিযানের পরিকল্পনা প্রণয়নকারী পোপ ২য় আরবানেরও ব্যক্তিগত সাফল্য। অবশ্য এ বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য যে, পোপ আরবানের আল-কুদস পতনের সংবাদ শুনে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। তিনি যদিও আল-কুদস পতনের দুই সপ্তাহ পর ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ জুলাই ইহধাম ত্যাগ করেন; কিন্তু আল-কুদস থেকে বহু দূরে রোমে অনেক দেরিতে এই বিজয়-সংবাদ পৌঁছায়। ফলে নিজ পরিকল্পনার চূড়ান্ত ফলাফল না জেনেই তাকে দুনিয়া ত্যাগ করতে হয়। (৪৪৬)

আমরা এ কথা মনে করি না যে, তার প্রেরিত ক্রুসেড সন্তানরা 'যিশুখ্রিষ্টের' নাম নিয়ে বাইতুল মুকাদ্দাসে যে হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়েছে, তা জানতে পারলে তিনি ব্যথিত হতেন। কারণ, তিনি ইতিপূর্বে এন্টিয়ক ও মাআ'ররাতুন- নোমানের গণহত্যার সংবাদ জেনেও কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। বরং এরও পূর্বে ক্রুসেডাররা হাঙ্গেরির সেমলিন নগরীতে খ্রিষ্টান নাগরিকদের নির্বিচারে হত্যা করলেও তিনি এর কোনো প্রতিবাদ করেননি। আরবানের মৃত্যুর পর যিনি নতুন পোপ নির্বাচিত হন, সেই পোপ ২য় পাসকাল (Pope Paschal II)-ও আল-কুদসের ট্র্যাজেডি সম্পর্কে কোনো ধরনের মন্তব্য করেননি। বরং কালের দীর্ঘ পরিক্রমায় আজ পর্যন্ত কোনো পোপই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য বা ন্যূনতম দুঃখপ্রকাশও করেননি। অথচ সমস্ত ঐতিহাসিক স্বীকার করে যে, এই চরম বর্বর ও অমানবিক ঘটনা হাজার হাজার নিরপরাধ নাগরিকের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। অথচ কোনো কোনো পোপ হিটলারের ইহুদি নিধনের কারণে ইহুদিদের কাছে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। বরং খ্রিষ্টানরা যদিও বিশ্বাস করে যে, 'যিশুখ্রিষ্ট' ইহুদিদের হাতে নিহত হয়েছিলেন, তথাপি তারা ইহুদি জাতির ওপর থেকে মাসিহ-হত্যার পাপের দাবি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। অবশ্য আমাদের নিষ্কম্প বিশ্বাসমতে আল্লাহর নবী হজরত ঈসা মাসিহ আ. নিহতই হননি; বরং মহান আল্লাহ তাআলা তাকে নিরাপদে তুলে নিয়েছেন।

وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينَا بَلْ رَّفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا সত্য কথা হচ্ছে, তারা তাকে হত্যা করেনি। বরং আল্লাহ তাকে নিজের কাছে তুলে নিয়েছেন। বস্তুত আল্লাহ মহা ক্ষমতার অধিকারী, অতি প্রজ্ঞাবান। [সুরা নিসা: ১৫৭-১৫৮]

এই চরম বর্বর ও জঘন্য অপরাধের বিষয়ে নিশ্চুপ থাকাটা স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এ বিষয়ে নীরবতাই যেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বয়ে নিয়ে চলা এক আদর্শ! এই নীরবতার যদি কোনো অর্থ থেকে থাকে, তাহলে তা এটাই যে, ক্রুসেডাররা যে হিংস্র ক্রুসেডীয় চেতনার দাবিতে এ জাতীয় বর্বরতার প্রতি পরিচালিত হয়েছিল, সেই একই চেতনা আজও অনেক রাজনৈতিক, সামরিক ও আদর্শিক নেতৃবৃন্দের দেহ-মনে প্রবাহিত হচ্ছে।

টিকাঃ
৪০৯. প্রাগুক্ত, ৯/১৯।
৪৪০. Gesta Francorum, pp. 203-205.
৪৪১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৯। কেবল ইবনুল আছির-ই নন, প্রাচ্যের বিভিন্ন খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকও এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন। যেমন ইবনুল ইবরি (Bar-Hebraeus) বলেছেন, ফিরিঙ্গিরা নগরীটিতে এক সপ্তাহ অবস্থান করে মুসলমানদের হত্যা করতে থাকে। মসজিদুল আকসার অভ্যন্তরেই নিহত হয় সত্তর হাজারের অধিক মানুষ। দেখুন : ইবনুল ইবরি, তারীখু মুখতাসারিদ দুওয়াল, পৃষ্ঠা: ১৯৭। আর্মেনীয় ঐতিহাসিক ম্যাথিউ ডি এডেসা (Matthieu d' Edesse) উল্লেখ করেছেন, ক্রুসেডাররা যেসব মুসলমানকে হত্যা করেছিল, তাদের সংখ্যা ছিল পয়ষট্টি হাজারের ঊর্ধ্বে। দেখুন: Doc. Arm, 1, p. 45.
৪৪২. Guillaume de Tyr, 1, p. 354.
৪৪৩. Raymond d'Aigles, p. 300.
৪৪৪. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৩৭।
৪৪৫. আবুল মাহাসিন, আন-নুজুমুয যাহিরা, ৫/১৫০।
৪৪৬. কাসিম আবদুহু কাসিম, মাহিয়াতুল হুরূবিস সালীবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১৩১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00