📄 উবায়দি প্রতিনিধিদলের দাবি ও প্রস্তাব
উবায়দি প্রতিনিধিদল ক্রুসেডার বাহিনীর প্রত্যেক সেনাপতির জন্য প্রচুর পরিমাণ নগদ অর্থ ও বহুমূল্য উপহারসামগ্রী সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। তারা উবায়দি সাম্রাজ্যের পক্ষ থেকে ক্রুসেডারদের প্রস্তাব দেয় যে, উবায়দি প্রশাসন সহজে ক্রুসেডারদেরসহ খ্রিষ্টানসমাজের সদস্যদের (তখনও পর্যন্ত উবায়দি সাম্রাজ্যের কর্তৃত্বাধীন) বাইতুল মুকাদ্দাস পরিদর্শনের ব্যবস্থা করে দেবে। তবে তীর্থযাত্রীদের সেখানে অস্ত্র ব্যতীত প্রবেশ করতে হবে। (৪১৫) শুধু এতটুকুই নয়; এশিয়া মাইনর অঞ্চল, সিরিয়া ও লেবাননের যেসব এলাকা ক্রুসেডাররা ইতিমধ্যে জয় করে নিয়েছে, উবায়দিরা সেসব স্থানে ক্রুসেডারদের দখলদারিত্বের বৈধতা ও স্বীকৃতি প্রদান করবে।
এভাবে?! এতটা উদারতা?!
কিন্তু উবায়দি প্রতিনিধিদলকে অপ্রস্তুত করে ক্রুসেডাররা কড়া ভাষায় উত্তর দেয় যে, তারা যেভাবে ইচ্ছা তীর্থযাত্রা ও বাইতুল মুকাদ্দাস পরিদর্শন সম্পন্ন করবে; কিন্তু কোনোভাবেই উবায়দি সাম্রাজ্যের সহায়তায় নয়!
এর মাধ্যমে মূলত সরাসরি যুদ্ধেরই ঘোষণা করা হয়েছিল। (৪১৬) কারণ, শাসকের অনুমতি ব্যতীত ক্রুসেডাররা কীভাবে আল-কুদসে প্রবেশ করবে?!
নিঃসন্দেহে অত্যন্ত জটিল ও গভীর পর্যবেক্ষণযোগ্য পরিস্থিতি। পরিস্থিতিটি যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে আমাদের সামান্য পেছনে ফিরে যেতে হবে এবং উবায়দি সাম্রাজ্য ও তৎকালীন বাইতুল মুকাদ্দাসের ইতিহাস সম্বন্ধে কিছুটা ধারণা নিতে হবে।
অতীত ও বর্তমানের বিভিন্ন ইতিহাসবিদ ক্রুসেড অভিযান ইস্যুতে উবায়দি সাম্রাজ্যের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া, আচরণ-উচ্চারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অপরিপক্ব কর্মনীতি এবং সর্ববিচারেই লাঞ্ছনাকর ও কলঙ্কজনক অবস্থান গ্রহণে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। (৪১৭) কিন্তু ইতিহাসের নিবিষ্ট পাঠক ও গভীর পর্যবেক্ষকমাত্রই উপলব্ধি করতে পারবেন যে, ক্রুসেডারদের প্রতি উবায়দি সাম্রাজ্যের যে প্রতিক্রিয়া আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, তাতে মোটেও বিস্ময়ের কিছু নেই।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই উবায়দি সাম্রাজ্যের মূল লক্ষ্য ছিল সর্বত্র সুন্নি মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করা। সেই ২৯৭ হিজরি সনে (৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে) নিজেদের আবির্ভাবকালেই তারা মাগরিবে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং অসংখ্য আলিম-আবিদকে হত্যা করে। এরপর তারা আন্দালুসের সুন্নি রাষ্ট্রকে টার্গেট করে। আন্দালুসে তারা কেবল সুন্নি সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধই করেনি; আবদুর রহমান আননাসির রহ.-এর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উত্তর আন্দালুসের ক্রুসেডারদের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময়ও করেছিল। এরপর তারা উত্তর আফ্রিকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং ৩৫৮ হিজরি সনে (৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) মিশর দখল করে নেয়। মাগরিবের মতো মিশরেও তারা সুন্নি উলামায়ে কেরামকে নির্বিচারে হত্যা করে। একই বছর তারা শাম অঞ্চলেও নিজেদের রাজ্য বিস্তার করে এবং বাইতুল মুকাদ্দাস ও দামেশক দখল করে নেয়। (৪১৮)
পরবর্তী একশ বছরেরও অধিক সময় বাইতুল মুকাদ্দাস উবায়দিদের দখলে ছিল। অবশেষে ৪৬৩ হিজরি সনে (১০৭১ খ্রিষ্টাব্দে) বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের সুলতান আলপ আরসালান রহ. তার সেনাপতি আতসিজ-এর মাধ্যমে বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধার করেন। (৪১৯) আলপ আরসালানের মৃত্যুপরবর্তী সময়ে ৪৭১ হিজরি সনে (১০৭৯ খ্রিষ্টাব্দে) বাইতুল মুকাদ্দাস চলে যায় তার পুত্র ও শামীয় সেলজুক রাষ্ট্রের অধিপতি তুতুশ বিন আলপ আরসালানের কর্তৃত্বে। (৪২০) তুতুশ তার তুর্কমেন সেনাপতি উরতুক বিন আকসাবকে বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রশাসকের দায়িত্ব প্রদান করেন। উরতুকের মৃত্যুর পর ৪৮৫ হিজরি সনে (১০৯১ খ্রিষ্টাব্দে) বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রশাসকের দায়িত্ব লাভ করেন তার পুত্র সুকমান বিন উরতুক। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, ৪৮৭ হিজরি সনে (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) তুতুশ তার ভ্রাতুষ্পুত্র বারকিয়ারুক বিন মালিকশাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন এবং তার শামীয় সেলজুক রাষ্ট্র আলেপ্পো ও দামেশক দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এ সময় বাইতুল মুকাদ্দাস চলে যায় দামেশকের অধিপতি দাক্কাক বিন তুতুশের নিয়ন্ত্রণে। (৪২১) দাক্কাক সুকমান বিন উরতুককে বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রশাসক পদে বহাল রাখেন।
সেলজুকদের কাছে বাইতুল মুকাদ্দাসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও উবায়দিরা কিন্তু বাইতুল মুকাদ্দাস ও ফিলিস্তিন ভূখণ্ড থেকে নিজেদের হাত গুটিয়ে নেয়নি। এ কারণেই তারা এশিয়া মাইনর ও শাম অঞ্চলে ক্রুসেডারদের অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছিল। উবায়দি প্রশাসনের পরিকল্পনা ছিল, ক্রুসেডাররা যখন এশিয়া মাইনর ও শাম অঞ্চলে সুন্নি তুর্কিদের ব্যস্ত রাখবে, তখন তারা সুযোগ বুঝে বাইতুল মুকাদ্দাস ও ফিলিস্তিনে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে। (৪২২) বাস্তবেও সেলজুকরা যখন ক্রুসেডারদের আগ্রাসন সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তার ফাঁকে উবায়দিরা ৪৯০ হিজরি সনে (১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দে) বাহিনী প্রেরণ করে বাইতুল মুকাদ্দাসে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়। (৪২৩) এমনকি তারা ফিলিস্তিনে নিজেদের অধিকারের স্বীকৃতি লাভের বিনিময়ে শাম অঞ্চলে ক্রুসেডারদের অধিকারের স্বীকৃতি দানের প্রস্তাব দিয়ে ক্রুসেডারদের সঙ্গে সমঝোতা প্রচেষ্টা চালাতেও দ্বিধা করেনি।
পেছনে আমরা এ বিষয়ে আলোচনা করেছি। (৪২৪) প্রতারণা, দালালি ও সুন্নি মুসলমানদের পিঠে ছুরিকাঘাতের এ এক দীর্ঘ ইতিহাস।
এখন ক্রুসেডাররা বিশেষ করে বাইতুল মুকাদ্দাসসহ ফিলিস্তিন অঞ্চলেও অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সুতরাং তাদের সামনে উবায়দিদের সঙ্গে সমঝোতার কোনো অবকাশই নেই। এ কারণেই প্রতিনিধিদলের প্রস্তাবের প্রত্যুত্তরে তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত কঠোর।
হিরাক্লিয়া আদানা মপসুয়েসটিয়া ভূমধ্যসাগর 'ইসকানদারুন •মাআ'ররাতুন-নোমান এন্টিয়ক লাতাকিয়া জাবালা • হামা বানিয়াস তারতুস • হিমস ইরকা ত্রিপোলি ব্যাবলস বালাবাকু বৈরুত সিডন সুর • দামেশক আক্কা হাইফা কায়সারিয়া • আম্মান আরসুফ জাফা আসকালান গাজা আল-কুদস শামের মরুঅঞ্চল রামলা • মারআশ
মানচিত্র নং-১৬ বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে ক্রুসেডারদের যাত্রাপথ মূল ধারাবর্ণনায় ফিরে আসি। ক্রুসেডাররা ত্রিপোলি অবরোধ প্রত্যাহার করে বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে রওনা হয় এবং প্রথমে বৈরুতে পৌঁছায়; এরপর সেখান থেকে সিডন হয়ে সুর (Tyre) অঞ্চলে। প্রতিটি অঞ্চলের মুসলমানরা ক্রুসেডারদের আগ্রাসন থেকে রক্ষা পেতে তাদেরকে প্রচুর উপঢৌকন প্রদান করে। এরপর ক্রুসেডার বাহিনী লেবাননের সীমানা পেরিয়ে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে পা রাখে এবং কালব নদী (The Nahr al-Kalb) পাড়ি দেয়। কালব নদী ছিল তৎকালীন সেলজুক সাম্রাজ্য ও উবায়দি সাম্রাজ্যের পার্থক্যরেখা। এরপর ক্রুসেডাররা আক্কা (Acre/Akka) অতিক্রম করে। আক্কায় নিযুক্ত উবায়দি প্রশাসক ক্রুসেডার বাহিনীকে খাদ্যদ্রব্য ও রসদপত্র সরবরাহ করেন এবং বাইতুল মুকাদ্দাস পতনের পর ক্রুসেডারদের আনুগত্য করার অঙ্গীকার করেন।(৪২৫)
টিকাঃ
৪১৫. Michaud: op. cit. 1, pp. 362-363.
৪১৬. Guillaume de Tyr, 1, pp. 305-306.
৪১৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৩-১৪।
৪১৮. প্রাগুক্ত, ৭/৩০৯ ও ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১১/২৬৬-২৬৭।
৪১৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৩৯০।
৪২০. প্রাগুক্ত, ৮/৪১৮।
৪২১. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৩৫।
৪২২. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/১৯১।
৪২৩. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৩৫।
৪২৪. Setton: op. cit. vol. 1, p. 316.
৪২৫. টোডিবো, তারীখুর-রিহলাতি ইলা বাইতিল মাকদিস, পৃষ্ঠা: ২৯৪-২৯৯, উইলিয়াম সুরি, তারীখুল আ'মালিল মুনজিযাহ ফী-মা ওয়ারাআল বিহার, ১/৩৫৮ ও অজ্ঞাত ঐতিহাসিক, আ'মালুল ফারানজা ওয়া হুজ্জাজি বাইতিল মাকদিস, পৃষ্ঠা: ২৭৭।
📄 মিশর দখলের চিন্তা!
এই বৈঠকে ক্রুসেডাররা অতি গুরুত্বপূর্ণ এমন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে, যা পরবর্তীকালে অন্যান্য ক্রুসেড অভিযানের পরিকল্পনা নির্ধারণে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল এবং ভবিষ্যৎ ক্রুসেড অভিযানগুলোর গতিপথ কেমন হতে পারে, তার রূপরেখা সুস্পষ্ট করে তুলেছিল।
ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দ এ সময় কায়রোতে আক্রমণ ও মিশর পতনের সম্ভাব্যতা নিয়ে মতবিনিময় করে! (৪২৯)
আজ থেকে নয় শতাব্দীরও অধিক কাল পূর্বে ক্রুসেডারদের চিন্তাধারা কত অগ্রসর ছিল! সে সময়ই ক্রুসেডাররা উপলব্ধি করে যে, বাইতুল মুকাদ্দাসের চাবিকাঠি কায়রোতেই আছে। এর কারণ শুধু এই নয় যে, তখন মিশরের শাসকগোষ্ঠী উবায়দিদের হাতে বাইতুল মুকাদ্দাসের নিয়ন্ত্রণ ছিল। কারণ, ক্রুসেডাররা পুরোপুরি বুঝে ফেলেছিল যে, উবায়দিরা ক্রুসেডার বাহিনীর আগমনে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। ক্রুসেডারদের এই উপলব্ধি ও পর্যালোচনা ছিল বিশাল মিশর রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিস্তৃতির কারণে। মিশর দক্ষিণ ও পশ্চিম দিক থেকে ফিলিস্তিনকে ঘিরে আছে। মিশরের আছে বিশাল জনশক্তি, অত্যুচ্চ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং ফিলিস্তিনের সঙ্গে বিশেষত মসজিদুল আকসার ধারক বাইতুল মুকাদ্দাস নগরীর সঙ্গে স্বভাবজাত নৈকট্য-অনুভূতি। এ কারণেই ক্রুসেডাররা তাদের এই বৈঠকে মিশরে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই দুঃসাহসী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মতো যথেষ্ট শক্তি তাদের ছিল না। বিশেষ করে এ বিষয়টিও তাদের মাথায় ছিল যে, মিশর আক্রমণ করতে হলে তাদের সিনাই মরুভূমির সুকঠিন মরু অঞ্চল পাড়ি দিতে হবে। হতে পারে এই কঠিন বাধা পাড়ি দিতে গিয়ে ক্রুসেড শক্তি সমূলে ধ্বংস হয়ে যাবে। এসব দিক বিবেচনা করে তারা আপাতত এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চিন্তা পরিহার করে এবং সরাসরি বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু এই বৈঠক ছিল অতি সুস্পষ্ট এক চিন্তা-পরিকল্পনা, যা ক্রুসেড অভিযানসমূহের নেতৃবৃন্দ এবং তাদের পরবর্তী উত্তরাধিকারীদের মনমস্তিষ্কে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে পঞ্চম ও সপ্তম ক্রুসেড অভিযানে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়। এ দুটি ক্রুসেড অভিযান সরাসরি মিশরকে টার্গেট করেই পরিচালিত হয়েছিল। (৪৩০)
টিকাঃ
৪২৬. আরসুফ: কায়সারিয়া ও জাফার মধ্যবর্তী শাম সাগরের একটি উপকূলীয় নগরী। ইয়াকুত আল-হামাবি, মুজামুল বুলদান, ১/১৫১।
৪২৭. Albert d' Alex, p. 460.
৪২৮. অজ্ঞাত ঐতিহাসিক, আ'মালুল ফারানজা ওয়া হুজ্জাজি বাইতিল মাকদিস, পৃষ্ঠা: ২৭৭, ফুশিয়া আশ-শারতিরি (Foucher de Chartres), তারীখুল হামলাতি ইলাল কুদস, পৃষ্ঠা: ৭০ ও উইলিয়াম সুরি, তারীখুল আ'মালিল মুনজিযাহ ফী-মা ওয়ারাআল বিহার, ১/৪০০।
৪২৯. Raymond d'Alx, p. 299; Chalandon: p. 267; Grousset: 1, pp. 150-151.
৪৩০. Albert d' Aix, p. 292.
📄 সুন্নাতুল্লাহ ও শাশ্বত রীতি
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যে, ক্রুসেডার বাহিনী যখন এন্টিয়ক থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত সুদীর্ঘ ছয়শ কিলোমিটারেরও অধিক পথ পাড়ি দিয়েছিল, এই সুবিশাল অঞ্চলের মুসলিম সৈন্যদল তখন কোথায় ছিল?! সুবিস্তৃত এসব অঞ্চলে কি একজন বিচক্ষণ ও ন্যায়পরায়ণ নেতাও ছিল না?! বস্তুত ইতিহাসের ওই দুর্যোগপূর্ণ সন্ধিক্ষণে মুসলমানরা জাতিগঠনের মূল ও মৌলিক উপাদানগুলোই হারিয়ে ফেলেছিল। এ কারণেই সমকালীন মুসলিম শক্তিগুলো বাধাপ্রদান দূরে থাক, ক্রুসেডারদের সাদরে স্বাগত জানায় এবং প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইসরা-ভূমি, প্রথম কিবলা, তৃতীয় হারাম শরিফ ও বরকতপূর্ণ ভূখণ্ড বাইতুল মুকাদ্দাসকে অপবিত্র করার ঘটনা দ্বিধাহীন চিত্তে মেনে নেয়। পবিত্র ভূমিতে অপবিত্র পদচারণায় তাদের হৃদয়জগৎ সামান্যও কম্পিত হয়নি; কেউ বাইতুল মুকাদ্দাসের পবিত্রতা রক্ষায় এগিয়ে আসেনি। এ কারণেই ক্রুসেডাররা নির্বিঘ্নে বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছে যায় আর মুসলমানরা হয়ে পড়ে অবরুদ্ধ!
তৎকালীন মুসলিমসমাজ নানাবিধ ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিল।
তারা আক্রান্ত ছিল ধর্ম-বিচ্ছিন্নতার ব্যাধিতে, ইসলামি মমত্ববোধ-শূন্যতার রোগে। বিশুদ্ধ ও শক্তিশালী আকিদার প্রতি সম্বন্ধিত আত্মমর্যাদাবোধ হারিয়ে ফেলার ব্যাধিতেও আক্রান্ত ছিল সমকালীন মুসলিমসমাজ।
তারা আক্রান্ত ছিল বেদনাদায়ক বিভেদ-বিচ্ছিন্নতার ব্যাধিতে। প্রতিটি নগরী একেকটি স্বতন্ত্র ইমারত ও বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। বরং প্রত্যেকেই নিজ মুসলিম প্রতিবেশীর সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত ছিল।
তৎকালীন মুসলিমসমাজ নির্ভেজাল ও নিষ্ঠাবান নেতৃত্বের শূন্যতায় ভুগছিল। এমন কোনো নেতা ছিলেন না, যিনি বিভক্ত জাতিকে একক কাঠামোতে পরিণত করবেন, ব্যক্তিস্বার্থ ও ব্যক্তিলিপ্সার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে জাতির উন্নতি সাধনে সচেষ্ট থাকবেন।
সেকালের মুসলমানগণ প্রভাবিত ছিল যাপিত বাস্তবতার বাহ্যিক দর্শন দ্বারা, প্রভাবিত ছিল চারপাশের ঘটনা-দুর্ঘটনা ও আপদ-বিপদ দ্বারা। তারা আক্রান্ত ছিল রাজনৈতিক প্রজ্ঞাস্বল্পতা ও সামরিক দক্ষতাশূন্যতার রোগে।
নিঃসন্দেহে সমকালীন মুসলিম উম্মাহ জটিল ও যৌগিক সংকটের এক যুগ অতিক্রম করছিল!
আমরা যদি তৎকালীন মুসলিম উম্মাহর এই নতজানু অবস্থান ও পরাভবতায় বিস্ময়বোধ করে থাকি, তাহলে আমাদের তো আরও বেশি বিস্ময়বোধ করা উচিত ক্রুসেডারদের অবস্থানে! কীভাবে তারা সামান্য ভয়-ডর-শঙ্কার শিকার না হয়ে ইসলামি বিশ্বের এতটা গভীরে এত দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দেওয়ার সাহস করল এবং শত্রুভূমির কেন্দ্রমূলে নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারল? তারা ঘন জন-অধ্যুষিত বিভিন্ন অঞ্চল পাড়ি দিয়েছে, সমৃদ্ধ সামরিক শক্তির অধিকারী বিভিন্ন মুসলিম রাজ্যের মাঝে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে, নিজেদের মাতৃভূমি হতে শত শত মাইল দূরত্বে চলে এসেছে। যদি তারা পরাজিত হতো, তাহলে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। তাদের পালাবার বা আশ্রয় নেওয়ার কোনো জায়গা আশেপাশে ছিল না!
কীভাবে তারা মানবিক স্বভাবগত ভয়কে জয় করেছিল? কীভাবে প্রদর্শন করতে পেরেছিল এমন চরম দুঃসাহসিকতা?
উত্তর হলো—আমরা গ্রন্থের শুরুতেই উল্লেখ করে এসেছি যে, ক্রুসেডাররা তৎকালীন ইউরোপের অতি কঠিন ও দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে এসেছিল। ইউরোপে তাদের জীবন ছিল মৃত্যুসম। ইউরোপের যন্ত্রণাদায়ক বাস্তবতা থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রচণ্ড স্পৃহা তাদেরকে অন্য যেকোনো প্রাপ্তির জন্য পাগল করে তুলেছিল। তাদের দৃষ্টিতে ইউরোপে বিরাজমান প্রচণ্ড দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে জীবন কাটানোর চেয়ে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে মৃত্যু বেশি কষ্টদায়ক ছিল না।
অবশ্য কেবল এই চিন্তাধারাই ক্রুসেডার বাহিনীর প্রচণ্ড আগ্রাসী আচরণ, ভয়-ডরহীন মনোভাব ও বেপরোয়া-নিরুদ্বেগ কর্মনীতির একমাত্র কারণ হতে পারে না। কারণ, যত কষ্ট ও ক্ষুধার যন্ত্রণা থাকুক না কেন, নিজের প্রাণ সকলের কাছে অতি প্রিয়। বিশেষত যাদের পরকালে বিশ্বাস নেই, জান্নাতের প্রতি স্বচ্ছ-সঠিক ঈমান নেই এবং জান কোরবান ও প্রাণ বিসর্জনের শক্তিশালী কোনো উদ্দীপক ও অনুপ্রাণিকা নেই, তারা কীভাবে এমন ভয়হীন অভিযান পরিচালনা করতে পারে?!
তাহলে এই সুকঠিন সমীকরণের প্রকৃত তাৎপর্য ও বিশ্লেষণ কী?
কেন-কীসের জোরে ক্রুসেডারদের হৃদয়জগতে এভাবে সুস্পষ্ট ও প্রকাশ্যরূপে বীরত্ব উদ্ভাসিত হলো?!
বিষয়টির সঠিক উপলব্ধি লাভের জন্য আমাদের হজরত ছাওবান রাযি. হতে বর্ণিত একটি হাদিস পাঠ করতে হবে। হাদিসটি আমাদের সামনে চলমান পরিস্থিতিকে এমন সুস্পষ্ট করে তুলবে যে, মনে হবে-আমরা যেন তা দিব্য চোখে দেখতে পাচ্ছি।
নবীজি একদিন ইরশাদ করলেন- «يُوْشِكُ الْأُمَمُ أَنْ تَدَاعَى عَلَيْكُمْ كَمَا تَدَاعَى الْأَكَلَةُ إِلَى قَصْعَتِهَا»
শীঘ্রই এমন এক কাল আসবে, যখন বিভিন্ন জাতিবর্গ তোমাদের বিরুদ্ধে পরস্পরকে আহ্বান করতে থাকবে, যেভাবে একে অন্যকে ডেকে আনে দস্তরখানে।
নবীজি এ কথা বলার পর উপস্থিত জনৈক সাহাবি প্রশ্ন করলেন, 'তখন কি সংখ্যাস্বল্পতার দরুন আমরা এরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হব?'
নবীজি উত্তর দিলেন- بَلْ أَنْتُمْ يَوْمَئِذٍ كَثِيرُ ، وَلَكِنَّكُمْ غُثَاءُ كَغُثَاءِ السَّيْلِ، وَلَيَنْزَعَنَّ اللَّهُ مِنْ صُدُوْرِ عَدُوِّكُمُ الْمَهَابَةَ مِنْكُمْ، وَلَيَقْذِفَنَّ اللَّهُ فِي قُلُوْبِكُمُ الْوَهْنَ»
বরং সেদিন তোমরা সংখ্যায় থাকবে অনেক। কিন্তু তোমরা হবে স্রোতে ভেসে আসা খড়কুটোর মতো। আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তোমাদের শত্রুদের বক্ষ থেকে তোমাদের প্রভাব-ভীতি তুলে নেবেন এবং আল্লাহ অবশ্যই তোমাদের অন্তরে 'ওয়াহন' ঢেলে দেবেন।
জনৈক সাহাবি প্রশ্ন করলেন, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ! ওয়াহন (দ্বারা) কী (উদ্দেশ্য)?'
নবীজি উত্তর দিলেন, «حُبُّ الدُّنْيَا، وَكَرَاهِيَةُ الْمَوْتِ» দুনিয়াপ্রীতি ও মৃত্যুবিরাগ। (৪৩১)
ক্রুসেড অভিযানের সময় ফ্রান্স, ইতালি, ইংল্যান্ড ও জার্মানিসহ পশ্চিমা যেসব অঞ্চলের জাতিবর্গ একে অপরকে আহ্বান করেছিল, তারা এ কারণেই তা করতে পেরেছিল যে, আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তর হতে মুসলমানদের প্রভাব-ভীতি উঠিয়ে নিয়েছিলেন। ফলে তারা মুসলমানদের পরোয়া করেনি, পরোয়া করেনি মুসলমানদের সংখ্যাধিক্য, সুরক্ষিত দুর্গ ও অস্ত্রশস্ত্র কিছুরই। এ কারনেই আমরা ইতিহাসের ধারাবিবরণীতে লক্ষ করেছি—ক্রুসেডার বাহিনীর কাছ থেকে কখনোই দুর্বল আচরণ প্রকাশ পায়নি, মুসলমানদের মোকাবিলায় তারা সামান্য দ্বিধা করেনি। তারা পূর্ণ স্বাধীনতা ও পরিপূর্ণ নির্ভীক চিত্তে বিভিন্ন অঞ্চল অভিমুখে অগ্রসর হয়েছে।
বিপরীতে মুসলমানদের অন্তরে অক্ষমতা, দুর্বলতা ও অবসন্নতা ঢেলে দেওয়া হয়েছিল। আর তাই যদিও ক্রুসেডাররা তাদের তুলনায় জনবল-অস্ত্রবল ও অন্যান্য বৈষয়িক বিবেচনায় দুর্বল ছিল; কিন্তু মুসলমানরা ক্রুসেডারদের নাম শুনতেই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে উঠছিল।
উল্লিখিত হাদিসটিতে দুটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
প্রথম লক্ষণীয় ও ভাবনার বিষয় হলো, আল্লাহ তাআলা আমাদের শত্রুদের অন্তর থেকে আমাদের প্রভাব-ভীতি তুলে নেন এবং তিনিই আবার আমাদের অন্তরে ভীরুতা-কাপুরুষতা ঢেলে দেন! কেউ প্রশ্ন করতে পারে, আমাদের মহান প্রতিপালক কেন এমন করেন? যত কিছুই হোক—শেষ পর্যন্ত তো আমরা ঈমানদার, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী আর আমাদের শত্রুপক্ষ কাফির ও অবিশ্বাসী?!
এর উত্তর হলো—আল্লাহ তাআলা কেবল তখনই মুসলমানদেরকে সম্মান ও মর্যাদা দান করেন যখন তারা নিজেদের ইসলামের সঙ্গে সম্পূর্ণ জড়িয়ে রাখে এবং কুরআন-সুন্নাহর বিধিবিধানকে অপরিহার্য বিষয়রূপে গ্রহণ করে। দ্বীনি বিষয়ে শিথিলতা সত্ত্বেও আল্লাহ যদি মুসলমানদের সাহায্য করতেন, তাহলে বিরাট ফিতনা সৃষ্টি হতো। তখন মানুষ বলত, 'আমাদের ইসলামি অনুশাসন মানার কী প্রয়োজন! ইসলাম না মেনেও তো আমরা সাহায্যপ্রাপ্ত হয়েছি।' আর তাই এ জাতীয় বিস্ময়কর পরিস্থিতি সৃষ্টির মাধ্যমে মুসলমানদের আপন দ্বীনের বিষয়ে মনোযোগী হওয়ার এবং বিজয়ের প্রকৃত চাবিকাঠির ওপর হাত রাখার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়।
দ্বিতীয় লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধরনের বেদনাদায়ক পারস্পরিক আহ্বান সংঘটিত হওয়ার কার্যকারণ। প্রতিটি ট্র্যাজেডি ও দুর্ঘটনার বিবরণে যদিও অনেক শব্দ খরচ হয়; কিন্তু হাদিসে তার কার্যকারণ অতি সংক্ষেপে মাত্র দুই শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে-দুনিয়াপ্রীতি ও মৃত্যুবিরাগ।
মুসলমানরা দুনিয়ার সঙ্গে অননুমোদিত সম্পর্ক গড়েছিল; এমনকি আল্লাহর পথে মৃত্যুবরণকেও অপছন্দ করছিল। আর শাশ্বত রীতি হলো-যে জাতি মৃত্যুকে ভয় করে, তারা অবশ্যই বশীভূত ও পরাভূত হবে। যে জাতি পৃথিবী ও পার্থিব সম্পদের মোহে আক্রান্ত হয়, তারা অবশ্যই লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হবে। নবীজি তো ইরশাদ করেছেন, 'দুনিয়া হলো অভিশপ্ত আর দুনিয়া অবলম্বনকারীর পরিণতি ধ্বংস।' কেবল পার্থিব জীবনের পতন ও ধ্বংসই নয়; তার আখিরাতও বরবাদ হবে।
এই কার্যকারণই আমাদের সামনে সেই উৎকন্ঠাজনক শিথিলতা ও পরাভবতার তাৎপর্য সুস্পষ্ট করে, যা আমরা তৎকালীন মুসলমানদের মাঝে প্রত্যক্ষ করেছি। তারা অতি মূল্যবান উপহারসামগ্রী ও প্রচুর অর্থসম্পদ নিয়ে ক্রুসেডারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিবেদন করছিল—ক্রুসেডাররা যেন তাদেরকে বেঁচে থাকতে দেয়! একটাই চাওয়া-জীবন এবং জীবন! সে জীবন যেমনই হোক না কেন!
আল্লাহর শপথ! নিঃসন্দেহে এরই নাম লাঞ্ছনা ও অপদস্থতা!
এভাবেই পার্থিব মোহে আচ্ছন্ন মুসলমানরা বাইতুল মুকাদ্দাসে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে আর দূরে বসবাসকারী মুসলমানরা পরম নিশ্চিন্তে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। তারা যেন সেদিনের প্রতীক্ষায় বসে আছে যেদিন তাদের পালা আসবে এবং তারাও দুর্যোগের শিকার হবে!
টিকাঃ
৪০১. ইমাম আবু দাউদ, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪২৯৭, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২২৪৫০, আবু দাউদ তায়ালিসি, মুসনাদুত তায়ালিসি, হাদিস নং ৯৯২, ইবনে আবি শাইবা, আল-মুসান্নাফ, ৭/৪৬৩, বায়হাকি, শু'আবুল ঈমান, হাদিস নং ১০৩৭২ ও আবু নুআইম আল-আসবাহানি, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ১/১৮২।
📄 আল-কুদসের পতন
১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ৬ জুন ক্রুসেডাররা রামলা ত্যাগ করে এবং ৭ জুন বাইতুল মুকাদ্দাসের নগরপ্রাচীরের কাছে পৌঁছায়। ১০৯৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ নভেম্বর (৪৮৮ হিজরি সনের ২৭ জিলকদ) ক্লেরমন্ট সম্মেলনের মাধ্যমে পোপ ২য় আরবান যে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, অবশেষে সাড়ে তিন বছরেরও অধিক সময় পর ক্রুসেডাররা তার চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হয়।
পবিত্র নগরীর সাক্ষাৎ লাভের পর ক্রুসেডার যোদ্ধারা কেমন আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিল, ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ তার বেশ উচ্ছ্বসিত বিবরণ দিয়েছেন। (৪০২) এর একমাত্র উদ্দেশ্য হিংস্র ও বর্বর ক্রুসেড অভিযানের নোংরা রূপটিকে যথাসম্ভব দর্শনযোগ্য করে তোলা। প্রকৃত বাস্তবতা হলো, ক্রুসেডার বাহিনী বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত পৌঁছতেই যথেষ্ট দ্বিধান্বিত ছিল। কারণ, তারা তো পথে অন্যান্য রাজ্যে আগ্রাসন চালিয়েই তুষ্ট ছিল। এই ক্রুসেডার বাহিনীই অর্থকড়ি, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, ভূ-মালিকানা ও নেতৃত্বসহ পার্থিব বিভিন্ন বিষয়ে পরস্পর বিবাদ করে এসেছে; অঙ্গীকার ও শপথ করে তা ভঙ্গ করেছে। অধিকন্তু এর অব্যবহিত পরেই এই ক্রুসেডাররা পবিত্র নগরীর অভ্যন্তরে যা ঘটাতে যাচ্ছে, তা স্মরণ করলে তো সমগ্র মানবতাই লজ্জিত হয়! কাজেই তাদের সম্পর্কে পবিত্র নগরীর দর্শনলাভে আবেগাপ্লুত হওয়ার কাহিনি রচনা কতটা ধোপে টিকবে, তা বলাই বাহুল্য।
১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ৭ জুন আল-কুদস নগরীকে ঘিরে কঠিন অবরোধ শুরু হয়।
ক্রুসেডাররা সময় নষ্ট না করে সঙ্গে করে নিয়ে আসা যথেষ্ট পরিমাণ অবরোধসামগ্রী কাজে লাগায় এবং নগরপ্রাচীর লক্ষ্য করে একটানা গোলাবর্ষণ করতে থাকে। (৪৩৩) আল-কুদসের অভ্যন্তরে অবস্থানরত মুসলমানদের তখন নিস্ফল প্রতিরোধ এবং পতনকে যথাসম্ভব বিলম্বিত করানোর চেষ্টা করা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না।
অবরোধ শুরু হওয়ার সপ্তাহখানেক পর ১৫ জুন অস্ত্রশস্ত্র, রসদপত্র ও কিছু সৈন্য নিয়ে ইতালির জেনোভা থেকে কয়েকটি জাহাজ জাফা (Jaffa) নৌবন্দরে এসে পৌঁছায়। অল্প কয়েকটি জাহাজবিশিষ্ট ক্ষুদ্র নৌবহরটিই অতি সহজে জাফা বন্দরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। কারণ, ক্রুসেডার বাহিনী আরসুফের কাছাকাছি আসার পরই জাফাবাসী শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল! আগত সামরিক সহায়তা ক্রুসেডারদের মনোবল ও শক্তি বৃদ্ধিতে যথেষ্ট প্রভাব ফেলে।(৪০৪) এ কারণেই অবরোধ আরও তীব্র ও শক্তিশালী করা হয়।
একে একে কঠিন ও দুঃসহ দিনগুলো অতিবাহিত হতে থাকে। অবশিষ্ট মুসলিম বিশ্ব নীরবে এই বর্বরতা প্রত্যক্ষ করতে থাকে। এক দিন-দুই দিন করে একে একে কেটে যায় পূর্ণ এক মাস। দিনে দিনে উভয় পক্ষের জন্যই পরিস্থিতি কঠিন হয়ে ওঠে। জুলাই মাসের প্রচণ্ড গরমে উন্মুক্ত স্থানে ক্রুসেডারদের অবস্থান করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে বিভিন্ন সূত্রে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে যে, ইতিমধ্যে উবায়দি বাহিনী অবরুদ্ধ আল-কুদস নগরী উদ্ধারের জন্য মিশর থেকে রওনা হয়েছে। আর তাই এন্টিয়ক অবরোধ চলাকালে ক্রুসেডাররা যেরূপ সংকটের সম্মুখীন হয়েছিল, এবারও তেমন কিছু ঘটার পূর্বেই পবিত্র আল-কুদস নগরীর পতন ঘটানোর জন্য ক্রুসেডাররা দ্রুত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করে।(৪০৫) তারা নগরপ্রাচীরের ওপর নজরদারি করতে কাঠের দুটি টাওয়ার তৈরি করে। বেথেলহাম (Bethlehem) এলাকার ঘরবাড়ি ভেঙে সেগুলোর ছাদের কাঠ দিয়ে টাওয়ারদুটি তৈরি করা হয়। এরপর ক্রুসেডাররা টাওয়ার ব্যবহার করে নগরীর অভ্যন্তরে হামলা শুরু করে। অবরুদ্ধ মুসলমানরা অগ্নিশর নিক্ষেপ করে প্রথম টাওয়ারটি জ্বালিয়ে দেয়।(৪০৬) তবে অপর টাওয়ারটি ব্যবহার করে ক্রুসেডাররা চাপ অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়। এরপর কিছু সৈন্য নগরপ্রাচীরের ওপর দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে(৪০৭) এবং ভেতর থেকে ফটক খুলে দিতে সক্ষম হয়। ক্রুসেডাররা এবার তীব্র গতিতে পবিত্র নগরীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে! সেদিন ছিল ৪৯২ হিজরি সনের ২২ শাবান মোতাবেক ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ জুলাই। বেদনাদায়ক সেই দিনটি উম্মাহর ইতিহাসে চিরদিন অবিস্মৃত হয়ে থাকবে।(৪০৮)
নগরীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করেই 'আবেগাপ্লুত' ক্রুসেডারদের হিংস্র ও বর্বর রূপ প্রকাশ পেতে শুরু করে। আর তাই অবরুদ্ধ মুসলমানদের সামনে ক্রুসেডার সৈন্যদের সামনে থেকে পালানো ছাড়া ভিন্ন কোনো পথ খোলা ছিল না।
টিকাঃ
৪০২. Guillaume de Tyr, p. 318.
৪০৩. Gesta Francorum, p. 195.
৪০৪. অজ্ঞাত ঐতিহাসিক, আ'মালুল ফারানজা ওয়া হুজ্জাজি বাইতিল মাকদিস, পৃষ্ঠা : ২৭৮-২৭৯ ও উইলিয়াম সুরি, তারীখুল আ'মালিল মুনজিযাহ ফী-মা ওয়ারাআল বিহার, ১/৪২১-৪২৪। Heyd: Hist. du Commerce, 1, pp. 134-135 & Cam. Med. Hist. Vol. 5. p.258.
৪০৫. Runciman, op. cit., 1, pp. 283-284.
৪০৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৯।
৪০৭. আবুল মাহাসিন, আন-নুজুমুয যাহিরা, ৫/১৪৮-১৪৯।
৪০৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৯।