📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 রেমন্ডের লালসা, বাইজান্টাইন সম্রাটের নতুন চাল

📄 রেমন্ডের লালসা, বাইজান্টাইন সম্রাটের নতুন চাল


এরপর ক্রুসেডার বাহিনী লেবাননের ত্রিপোলি নগরী অতিক্রম করে। বনু আম্মার নামক জনৈক শিয়া-পরিবার তখন ত্রিপোলি শাসন করত। ক্রুসেডারদের অভিযানের সময় সেখানকার শাসক ছিলেন ফখরুল মালিক আবু আলি। শিয়া মতাদর্শী হলেও তিনি মিশরের উবায়দি সাম্রাজ্য হতে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। ত্রিপোলিকেন্দ্রিক রাজ্যটির শাসক আবু আলি আশেপাশের বিভিন্ন নগর ও জনপদেও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং লেবানন ও শামের বিভিন্ন অঞ্চলজুড়ে ব্যাপ্ত তুলনামূলক বিস্তৃত একটি রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন।

ক্রুসেডারদের অগ্রযাত্রার সংবাদ পেয়ে ফখরুল মালিক আবু আলি বিন আম্মার তাদের সঙ্গে সন্ধি করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ক্রুসেডারদের বশ্যতা স্বীকার ও আনুগত্য প্রকাশের নিদর্শন হিসেবে নগরপ্রাচীরের ওপর ক্রুসেডারদের পতাকা উত্তোলন করেন এবং তাদেরকে জিজিয়া প্রদানের অঙ্গীকার করেন। ৪র্থ রেমন্ড তার সঙ্গে সমঝোতা করার জন্য কয়েকজন দূত প্রেরণ করলে তারা ফিরে এসে রেমন্ডকে জানায় যে, অনিন্দ্যসুন্দর নগরীটি যথেষ্ট সমৃদ্ধ ও সম্পদে টইটম্বুর। (৪০২) দূতদের মুখে ত্রিপোলি নগরীর বিবরণ শুনে রেমন্ডের লোভাতুর দৃষ্টি চকচক করে ওঠে। তিনি ভুলে যান আল-কুদসের কথা, ভুলে যান তীর্থযাত্রীদের বেশ ধারণের কথা। ফিলিস্তিনের আল-কুদসের কথা ভুলে গিয়ে লেবাননের ত্রিপোলির মাঝেই তিনি তার নিজস্ব রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ দেখতে পান!

রেমন্ড ও তার সঙ্গী ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দ ত্রিপোলি নগরী বা তৎসংলগ্ন কোনো এলাকার ওপর সামরিক চাপ সৃষ্টির পরিকল্পনা করে। তাদের আশা ছিল, এর মাধ্যমে নিদেনপক্ষে প্রস্তাবিত জিজিয়ার পরিমাণ আরও বাড়িয়ে নেওয়া যাবে। আর যদি কোনো নগরীর পতন ঘটানো যায়, তাহলে তো সোনায় সোহাগা! (৪০৩)

রেমন্ড ত্রিপোলির পূর্ব দিকে অবস্থিত ইরকা নামক একটি নগরী অবরোধ করার জন্য অগ্রসর হন। ত্রিপোলি রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত নগরীটি পর্যাপ্ত পানিব্যবস্থা ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ ছিল। অপরদিকে গডফ্রে ও রবার্ট অগ্রসর হন লাতাকিয়ার দক্ষিণে অবস্থিত সিরিয়ান উপকূলীয় নগরী জাবালা (Jableh) অবরোধ করার জন্য। জাবালাও ত্রিপোলি রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

টিকাঃ
৪০২. Raymond: op. cit., p. 31.
৪০৩. Grousset: Hist. des Croisades 1, pp. 132-133.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দের সিদ্ধান্ত

📄 ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দের সিদ্ধান্ত


পরামর্শ বৈঠকে ৪র্থ রেমন্ড বাইজান্টাইন সম্রাটের জন্য অপেক্ষা করার পক্ষে মত ব্যক্ত করেন। স্বাভাবিকভাবেই তার এ মত ছিল ব্যক্তিস্বার্থ চিন্তা করে; ক্রুসেডার বাহিনীর স্বার্থ বিবেচনা করে নয়। কারণ, সম্রাটের জন্য দেরি করার সুযোগে রেমন্ড ত্রিপোলিতে তার নিজস্ব রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময়-সুযোগ লাভ করবেন। হতে পারে এক্ষেত্রে তিনি বাইজান্টাইন শক্তির সহায়তাও পাবেন। প্রতাপশালী বাইজান্টাইন সম্রাট যখন জানবেন যে, রেমন্ড তার সহায়তায় কাজ করছেন, তখন তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অবশ্যই রেমন্ডকে সহায়তা করবেন। (৪০৯)

অপরদিকে গডফ্রে এর বিপরীত মত প্রদান করেন। তিনি মত প্রকাশ করেন যে, সম্রাটের জন্য অপেক্ষা করার অর্থ সময় ও প্রচেষ্টা নষ্ট করা এবং কল্পনার বালু-প্রাসাদ তৈরি করা। বিলম্ব না করে এখনই সরাসরি বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে অগ্রসর হওয়া হবে ক্রুসেডার বাহিনীর জন্য উপযোগী ও যথোপযুক্ত সিদ্ধান্ত। (৪১০) বিশেষত এ বিষয়টিও লক্ষণীয় যে, এখনো পর্যন্ত এ অঞ্চলে মুসলমানদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের প্রতিরোধ-প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়নি বললেই চলে।

এভাবে উভয় ক্রুসেডার নেতা করণীয় নির্ণয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। দুজনের মধ্যে শুরু হয় প্রচণ্ড বিরোধ। আবারও প্রমাণিত হয়—নির্ভেজাল প্রভু-সেবা নয়; ক্রুসেড অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল নেতৃবৃন্দের আপন আপন স্বার্থ উদ্ধার। এদিকে রেমন্ডের স্বপ্ন ত্রিপোলিকেন্দ্রিক, ওদিকে গডফ্রের অভিলাষ বাইতুল মুকাদ্দাসকেন্দ্রিক। বাহিনী যদিও অভিন্ন; লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, স্বপ্ন ও অভিলাষ যে ভিন্ন ভিন্ন!

অন্যান্য সেনাপতি গডফ্রের মতকে সমর্থন করলে বাহিনীতে গডফ্রের প্রভাব-প্রতিপত্তি অনেক বেড়ে যায় এবং গডফ্রেই ক্রুসেডার বাহিনীর অঘোষিত সর্বাধিনায়কে পরিণত হন। (৪১১) রেমন্ড এরপরও তার জেদ ধরে রেখে ইরকা অবরোধ অব্যাহত রাখেন। অথচ কোনো ফলাফল ছাড়াই ইরকা অবরোধে ইতিমধ্যে কেটে গেছে দুই মাস সময়। (৪১২) দিনের পর দিন কাটতে থাকে, পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হয়ে ওঠে!

সাড়ে তিন মাসের অবরোধের পরও ক্ষুদ্র ইরকা নগরীর পতন ঘটাতে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে মে মাসের ১৩ তারিখে রেমন্ড অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য হন। (৪১৩) ইরকার পরিবর্তে রাজধানী নগরী ত্রিপোলির পতন ঘটানোর চেষ্টা করা হলে নিঃসন্দেহে তা আরও অনেক কঠিন বিবেচিত হতো। রেমন্ড শেষ পর্যন্ত গডফ্রে ও অন্যান্য নেতার মত মেনে নিয়ে ফখরুল মালিক ইবনে আম্মারের জিজিয়া-প্রস্তাব মেনে নেন। (৪১৪) অতি মূল্যবান কিছু সময় নষ্ট করে ক্রুসেডার বাহিনী আবারও বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে যাত্রার প্রস্তুতি শুরু করে। মূল্যবান সময়ই কেবল নষ্ট হয়নি; প্রচণ্ড গরমের মৌসুমও কাছে চলে এসেছে।

ক্রুসেডাররা যখন নতুন করে বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে যাত্রার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখনই হঠাৎ তাদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ত্রিপোলি নগরপ্রাচীরের কাছে উপস্থিত হয় মিশর থেকে আগত উবায়দি প্রতিনিধিদল!

টিকাঃ
৪০৪. Gesta Francorum, p. 187 & Albert d' Aix, p. 453.
৪০৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৬।
৪০৬. Gesta Francorum, p. 187 & Albert d' Aix, p. 453.
৪০৭. Guillaume de Tyr, p. 307.
৪০৮. Chalandon: Alexis Comnene, pp. 214-215.
৪০৯. Grousset: Hist. des Croisades 1, p. 138.
৪১০. Michaud: op. cit. 1, p. 361.
৪১১. Albert d' Alix, pp. 455 & Raymond d' Agiles, p. 289.
৪১২. অজ্ঞাত ঐতিহাসিক, আ'মালুল ফারানজা ওয়া হুজ্জাজি বাইতিল মাকদিস, পৃষ্ঠা: ২৭৬। ইবনুল আছির উল্লেখ করেছেন, ইরকা নগরীর অবরোধ চার মাস স্থায়ী হয়েছিল। দেখুন: আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৬।
৪১৩. Stevenson: op. cit., p. 32.
৪১৪. Raymond d' Agiles, p. 285 & Guilaume de Tyr, pp. 308-309 ও অজ্ঞাত ঐতিহাসিক, আ'মালুল ফারানজা ওয়া হুজ্জাজি বাইতিল মাকদিস, পৃষ্ঠা: ২৭৭।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 উবায়দি প্রতিনিধিদলের দাবি ও প্রস্তাব

📄 উবায়দি প্রতিনিধিদলের দাবি ও প্রস্তাব


উবায়দি প্রতিনিধিদল ক্রুসেডার বাহিনীর প্রত্যেক সেনাপতির জন্য প্রচুর পরিমাণ নগদ অর্থ ও বহুমূল্য উপহারসামগ্রী সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। তারা উবায়দি সাম্রাজ্যের পক্ষ থেকে ক্রুসেডারদের প্রস্তাব দেয় যে, উবায়দি প্রশাসন সহজে ক্রুসেডারদেরসহ খ্রিষ্টানসমাজের সদস্যদের (তখনও পর্যন্ত উবায়দি সাম্রাজ্যের কর্তৃত্বাধীন) বাইতুল মুকাদ্দাস পরিদর্শনের ব্যবস্থা করে দেবে। তবে তীর্থযাত্রীদের সেখানে অস্ত্র ব্যতীত প্রবেশ করতে হবে। (৪১৫) শুধু এতটুকুই নয়; এশিয়া মাইনর অঞ্চল, সিরিয়া ও লেবাননের যেসব এলাকা ক্রুসেডাররা ইতিমধ্যে জয় করে নিয়েছে, উবায়দিরা সেসব স্থানে ক্রুসেডারদের দখলদারিত্বের বৈধতা ও স্বীকৃতি প্রদান করবে।

এভাবে?! এতটা উদারতা?!

কিন্তু উবায়দি প্রতিনিধিদলকে অপ্রস্তুত করে ক্রুসেডাররা কড়া ভাষায় উত্তর দেয় যে, তারা যেভাবে ইচ্ছা তীর্থযাত্রা ও বাইতুল মুকাদ্দাস পরিদর্শন সম্পন্ন করবে; কিন্তু কোনোভাবেই উবায়দি সাম্রাজ্যের সহায়তায় নয়!

এর মাধ্যমে মূলত সরাসরি যুদ্ধেরই ঘোষণা করা হয়েছিল। (৪১৬) কারণ, শাসকের অনুমতি ব্যতীত ক্রুসেডাররা কীভাবে আল-কুদসে প্রবেশ করবে?!

নিঃসন্দেহে অত্যন্ত জটিল ও গভীর পর্যবেক্ষণযোগ্য পরিস্থিতি। পরিস্থিতিটি যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে আমাদের সামান্য পেছনে ফিরে যেতে হবে এবং উবায়দি সাম্রাজ্য ও তৎকালীন বাইতুল মুকাদ্দাসের ইতিহাস সম্বন্ধে কিছুটা ধারণা নিতে হবে।

অতীত ও বর্তমানের বিভিন্ন ইতিহাসবিদ ক্রুসেড অভিযান ইস্যুতে উবায়দি সাম্রাজ্যের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া, আচরণ-উচ্চারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অপরিপক্ব কর্মনীতি এবং সর্ববিচারেই লাঞ্ছনাকর ও কলঙ্কজনক অবস্থান গ্রহণে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। (৪১৭) কিন্তু ইতিহাসের নিবিষ্ট পাঠক ও গভীর পর্যবেক্ষকমাত্রই উপলব্ধি করতে পারবেন যে, ক্রুসেডারদের প্রতি উবায়দি সাম্রাজ্যের যে প্রতিক্রিয়া আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, তাতে মোটেও বিস্ময়ের কিছু নেই।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই উবায়দি সাম্রাজ্যের মূল লক্ষ্য ছিল সর্বত্র সুন্নি মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করা। সেই ২৯৭ হিজরি সনে (৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে) নিজেদের আবির্ভাবকালেই তারা মাগরিবে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং অসংখ্য আলিম-আবিদকে হত্যা করে। এরপর তারা আন্দালুসের সুন্নি রাষ্ট্রকে টার্গেট করে। আন্দালুসে তারা কেবল সুন্নি সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধই করেনি; আবদুর রহমান আননাসির রহ.-এর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উত্তর আন্দালুসের ক্রুসেডারদের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময়ও করেছিল। এরপর তারা উত্তর আফ্রিকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং ৩৫৮ হিজরি সনে (৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) মিশর দখল করে নেয়। মাগরিবের মতো মিশরেও তারা সুন্নি উলামায়ে কেরামকে নির্বিচারে হত্যা করে। একই বছর তারা শাম অঞ্চলেও নিজেদের রাজ্য বিস্তার করে এবং বাইতুল মুকাদ্দাস ও দামেশক দখল করে নেয়। (৪১৮)

পরবর্তী একশ বছরেরও অধিক সময় বাইতুল মুকাদ্দাস উবায়দিদের দখলে ছিল। অবশেষে ৪৬৩ হিজরি সনে (১০৭১ খ্রিষ্টাব্দে) বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের সুলতান আলপ আরসালান রহ. তার সেনাপতি আতসিজ-এর মাধ্যমে বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধার করেন। (৪১৯) আলপ আরসালানের মৃত্যুপরবর্তী সময়ে ৪৭১ হিজরি সনে (১০৭৯ খ্রিষ্টাব্দে) বাইতুল মুকাদ্দাস চলে যায় তার পুত্র ও শামীয় সেলজুক রাষ্ট্রের অধিপতি তুতুশ বিন আলপ আরসালানের কর্তৃত্বে। (৪২০) তুতুশ তার তুর্কমেন সেনাপতি উরতুক বিন আকসাবকে বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রশাসকের দায়িত্ব প্রদান করেন। উরতুকের মৃত্যুর পর ৪৮৫ হিজরি সনে (১০৯১ খ্রিষ্টাব্দে) বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রশাসকের দায়িত্ব লাভ করেন তার পুত্র সুকমান বিন উরতুক। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, ৪৮৭ হিজরি সনে (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) তুতুশ তার ভ্রাতুষ্পুত্র বারকিয়ারুক বিন মালিকশাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন এবং তার শামীয় সেলজুক রাষ্ট্র আলেপ্পো ও দামেশক দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এ সময় বাইতুল মুকাদ্দাস চলে যায় দামেশকের অধিপতি দাক্কাক বিন তুতুশের নিয়ন্ত্রণে। (৪২১) দাক্কাক সুকমান বিন উরতুককে বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রশাসক পদে বহাল রাখেন।

সেলজুকদের কাছে বাইতুল মুকাদ্দাসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও উবায়দিরা কিন্তু বাইতুল মুকাদ্দাস ও ফিলিস্তিন ভূখণ্ড থেকে নিজেদের হাত গুটিয়ে নেয়নি। এ কারণেই তারা এশিয়া মাইনর ও শাম অঞ্চলে ক্রুসেডারদের অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছিল। উবায়দি প্রশাসনের পরিকল্পনা ছিল, ক্রুসেডাররা যখন এশিয়া মাইনর ও শাম অঞ্চলে সুন্নি তুর্কিদের ব্যস্ত রাখবে, তখন তারা সুযোগ বুঝে বাইতুল মুকাদ্দাস ও ফিলিস্তিনে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে। (৪২২) বাস্তবেও সেলজুকরা যখন ক্রুসেডারদের আগ্রাসন সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তার ফাঁকে উবায়দিরা ৪৯০ হিজরি সনে (১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দে) বাহিনী প্রেরণ করে বাইতুল মুকাদ্দাসে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়। (৪২৩) এমনকি তারা ফিলিস্তিনে নিজেদের অধিকারের স্বীকৃতি লাভের বিনিময়ে শাম অঞ্চলে ক্রুসেডারদের অধিকারের স্বীকৃতি দানের প্রস্তাব দিয়ে ক্রুসেডারদের সঙ্গে সমঝোতা প্রচেষ্টা চালাতেও দ্বিধা করেনি।

পেছনে আমরা এ বিষয়ে আলোচনা করেছি। (৪২৪) প্রতারণা, দালালি ও সুন্নি মুসলমানদের পিঠে ছুরিকাঘাতের এ এক দীর্ঘ ইতিহাস।

এখন ক্রুসেডাররা বিশেষ করে বাইতুল মুকাদ্দাসসহ ফিলিস্তিন অঞ্চলেও অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সুতরাং তাদের সামনে উবায়দিদের সঙ্গে সমঝোতার কোনো অবকাশই নেই। এ কারণেই প্রতিনিধিদলের প্রস্তাবের প্রত্যুত্তরে তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত কঠোর।

হিরাক্লিয়া আদানা মপসুয়েসটিয়া ভূমধ্যসাগর 'ইসকানদারুন •মাআ'ররাতুন-নোমান এন্টিয়ক লাতাকিয়া জাবালা • হামা বানিয়াস তারতুস • হিমস ইরকা ত্রিপোলি ব্যাবলস বালাবাকু বৈরুত সিডন সুর • দামেশক আক্কা হাইফা কায়সারিয়া • আম্মান আরসুফ জাফা আসকালান গাজা আল-কুদস শামের মরুঅঞ্চল রামলা • মারআশ

মানচিত্র নং-১৬ বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে ক্রুসেডারদের যাত্রাপথ মূল ধারাবর্ণনায় ফিরে আসি। ক্রুসেডাররা ত্রিপোলি অবরোধ প্রত্যাহার করে বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে রওনা হয় এবং প্রথমে বৈরুতে পৌঁছায়; এরপর সেখান থেকে সিডন হয়ে সুর (Tyre) অঞ্চলে। প্রতিটি অঞ্চলের মুসলমানরা ক্রুসেডারদের আগ্রাসন থেকে রক্ষা পেতে তাদেরকে প্রচুর উপঢৌকন প্রদান করে। এরপর ক্রুসেডার বাহিনী লেবাননের সীমানা পেরিয়ে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে পা রাখে এবং কালব নদী (The Nahr al-Kalb) পাড়ি দেয়। কালব নদী ছিল তৎকালীন সেলজুক সাম্রাজ্য ও উবায়দি সাম্রাজ্যের পার্থক্যরেখা। এরপর ক্রুসেডাররা আক্কা (Acre/Akka) অতিক্রম করে। আক্কায় নিযুক্ত উবায়দি প্রশাসক ক্রুসেডার বাহিনীকে খাদ্যদ্রব্য ও রসদপত্র সরবরাহ করেন এবং বাইতুল মুকাদ্দাস পতনের পর ক্রুসেডারদের আনুগত্য করার অঙ্গীকার করেন।(৪২৫)


টিকাঃ
৪১৫. Michaud: op. cit. 1, pp. 362-363.
৪১৬. Guillaume de Tyr, 1, pp. 305-306.
৪১৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৩-১৪।
৪১৮. প্রাগুক্ত, ৭/৩০৯ ও ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১১/২৬৬-২৬৭।
৪১৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৩৯০।
৪২০. প্রাগুক্ত, ৮/৪১৮।
৪২১. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৩৫।
৪২২. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/১৯১।
৪২৩. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৩৫।
৪২৪. Setton: op. cit. vol. 1, p. 316.
৪২৫. টোডিবো, তারীখুর-রিহলাতি ইলা বাইতিল মাকদিস, পৃষ্ঠা: ২৯৪-২৯৯, উইলিয়াম সুরি, তারীখুল আ'মালিল মুনজিযাহ ফী-মা ওয়ারাআল বিহার, ১/৩৫৮ ও অজ্ঞাত ঐতিহাসিক, আ'মালুল ফারানজা ওয়া হুজ্জাজি বাইতিল মাকদিস, পৃষ্ঠা: ২৭৭।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 মিশর দখলের চিন্তা!

📄 মিশর দখলের চিন্তা!


এই বৈঠকে ক্রুসেডাররা অতি গুরুত্বপূর্ণ এমন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে, যা পরবর্তীকালে অন্যান্য ক্রুসেড অভিযানের পরিকল্পনা নির্ধারণে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল এবং ভবিষ্যৎ ক্রুসেড অভিযানগুলোর গতিপথ কেমন হতে পারে, তার রূপরেখা সুস্পষ্ট করে তুলেছিল।

ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দ এ সময় কায়রোতে আক্রমণ ও মিশর পতনের সম্ভাব্যতা নিয়ে মতবিনিময় করে! (৪২৯)

আজ থেকে নয় শতাব্দীরও অধিক কাল পূর্বে ক্রুসেডারদের চিন্তাধারা কত অগ্রসর ছিল! সে সময়ই ক্রুসেডাররা উপলব্ধি করে যে, বাইতুল মুকাদ্দাসের চাবিকাঠি কায়রোতেই আছে। এর কারণ শুধু এই নয় যে, তখন মিশরের শাসকগোষ্ঠী উবায়দিদের হাতে বাইতুল মুকাদ্দাসের নিয়ন্ত্রণ ছিল। কারণ, ক্রুসেডাররা পুরোপুরি বুঝে ফেলেছিল যে, উবায়দিরা ক্রুসেডার বাহিনীর আগমনে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। ক্রুসেডারদের এই উপলব্ধি ও পর্যালোচনা ছিল বিশাল মিশর রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিস্তৃতির কারণে। মিশর দক্ষিণ ও পশ্চিম দিক থেকে ফিলিস্তিনকে ঘিরে আছে। মিশরের আছে বিশাল জনশক্তি, অত্যুচ্চ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং ফিলিস্তিনের সঙ্গে বিশেষত মসজিদুল আকসার ধারক বাইতুল মুকাদ্দাস নগরীর সঙ্গে স্বভাবজাত নৈকট্য-অনুভূতি। এ কারণেই ক্রুসেডাররা তাদের এই বৈঠকে মিশরে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই দুঃসাহসী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মতো যথেষ্ট শক্তি তাদের ছিল না। বিশেষ করে এ বিষয়টিও তাদের মাথায় ছিল যে, মিশর আক্রমণ করতে হলে তাদের সিনাই মরুভূমির সুকঠিন মরু অঞ্চল পাড়ি দিতে হবে। হতে পারে এই কঠিন বাধা পাড়ি দিতে গিয়ে ক্রুসেড শক্তি সমূলে ধ্বংস হয়ে যাবে। এসব দিক বিবেচনা করে তারা আপাতত এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চিন্তা পরিহার করে এবং সরাসরি বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু এই বৈঠক ছিল অতি সুস্পষ্ট এক চিন্তা-পরিকল্পনা, যা ক্রুসেড অভিযানসমূহের নেতৃবৃন্দ এবং তাদের পরবর্তী উত্তরাধিকারীদের মনমস্তিষ্কে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে পঞ্চম ও সপ্তম ক্রুসেড অভিযানে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়। এ দুটি ক্রুসেড অভিযান সরাসরি মিশরকে টার্গেট করেই পরিচালিত হয়েছিল। (৪৩০)

টিকাঃ
৪২৬. আরসুফ: কায়সারিয়া ও জাফার মধ্যবর্তী শাম সাগরের একটি উপকূলীয় নগরী। ইয়াকুত আল-হামাবি, মুজামুল বুলদান, ১/১৫১।
৪২৭. Albert d' Alex, p. 460.
৪২৮. অজ্ঞাত ঐতিহাসিক, আ'মালুল ফারানজা ওয়া হুজ্জাজি বাইতিল মাকদিস, পৃষ্ঠা: ২৭৭, ফুশিয়া আশ-শারতিরি (Foucher de Chartres), তারীখুল হামলাতি ইলাল কুদস, পৃষ্ঠা: ৭০ ও উইলিয়াম সুরি, তারীখুল আ'মালিল মুনজিযাহ ফী-মা ওয়ারাআল বিহার, ১/৪০০।
৪২৯. Raymond d'Alx, p. 299; Chalandon: p. 267; Grousset: 1, pp. 150-151.
৪৩০. Albert d' Aix, p. 292.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00