📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 মুসলিম শিবিরে দুঃখজনক বিভাজন

📄 মুসলিম শিবিরে দুঃখজনক বিভাজন


কারবুগা অনুভব করেন যে, মুসলিম বাহিনী আকারে বেশ বড় হলেও ক্রুসেডার বাহিনী তদাপেক্ষা বিশাল। আর তাই অবরোধ যদি দীর্ঘায়িত হয় আর ক্রুসেডাররা যুদ্ধের জন্য বেরিয়ে আসে, তাহলে পরিস্থিতি মুসলিম বাহিনীর প্রতিকূলে চলে যাবে। তাই কারবুগা চিন্তা করেন যে, মুসলিম বাহিনীকে শক্তিশালী করার সর্বোত্তম পথ হলো আলেপ্পোর প্রশাসক রিজওয়ানের সঙ্গে পুনরায় সমঝোতার চেষ্টা করে তার বাহিনীকেও মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করা। কারণ, আলেপ্পোর বাহিনীতে যেমন প্রচুর সৈন্য ছিল, তেমনই আলেপ্পোর প্রশাসক রিজওয়ান নিজেও ছিলেন খ্যাতিসম্পন্ন সামরিক দক্ষতার অধিকারী। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আলেপ্পো ছিল এন্টিয়কের অতি নিকটে অবস্থিত তুলনামূলক সমৃদ্ধ এক নগরী। ফলে মুসলিম বাহিনী সেখান থেকে অত্যাবশ্যকীয় রসদসামগ্রী, অস্ত্রশস্ত্র ও অবরোধসামগ্রী লাভ করতে পারবে।

এই ছিল কারবুগার পরিকল্পনা। নিঃসন্দেহে তার পরিকল্পনা ছিল সঠিক ও যথাযথ। কিন্তু তা সমকালীন মস্তিষ্কশূন্য নেতৃবৃন্দের জন্য উপযোগী ছিল না। তার এই পরিকল্পনার কথা জেনে দাক্কাক অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং তার প্রতি ক্রুদ্ধ হন। (৩৫৯) একে কেন্দ্র করে মুসলিম বাহিনীতে বিরোধ ও বিভক্তির ঘটনা ঘটে। দাক্কাক অবরোধ ত্যাগ করে দামেশকে ফিরে যাওয়ার মনোভাব প্রকাশ করেন। বিশেষত তিনি শামের দক্ষিণাঞ্চলে উবায়দিদের আগ্রাসনের আশঙ্কা করছিলেন। (৩৬০) দাক্কাকের এই সিদ্ধান্ত মুসলিম বাহিনীর মাঝে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।

এদিকে হিমসের প্রশাসক জানাহুদ্দৌলা হুসাইন বিন মালাইব রিজওয়ানের মিত্র এবং রাহবা (Al-Rahba) ও মানবিজ (Manbij) অঞ্চলের প্রশাসক ইউসুফ বিন আবাকের প্রতিশোধমূলক আচরণের আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে ওঠেন। জানাহুদ্দৌলা আশঙ্কা করছিলেন যে, মুসলিম বাহিনীতে তার উপস্থিতি রিজওয়ান ও তার মিত্রদের মাঝে বৈরিতা সৃষ্টি করতে পারে। জানাহুদ্দৌলার এই আশঙ্কা ও উত্তেজনা পুরো বাহিনীর আত্মবিশ্বাস ও মনোবলে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে।(৩৬১)

মুসলমানরা বিগত কয়েকদিন নিজেদের সাময়িক ঐক্যের ফল ভোগ করছিল; ক্রুসেডাররা এন্টিয়কের অভ্যন্তরে সংকীর্ণ হয়ে পড়েছিল এবং নিশ্চিত ধ্বংসের মুখে চলে গিয়েছিল। এখন যখন মুসলমানরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, তখন তো নিজেদের বিভেদ ও বিভক্তির দুর্ভোগ তারা ভোগ করবেই!

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَتُ وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ
এবং তোমরা সে সকল লোকের মতো হয়ো না, যারা তাদের নিকট সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলি আসার পরও পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং পরস্পরে মতভেদ সৃষ্টি করেছিল। এরূপ লোকদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। [সুরা আলে-ইমরান: ১০৫]

এরপর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে পড়ে এবং মুসলিম বাহিনীর মাঝে সাম্প্রদায়িক ফিতনার দুর্যোগ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। বাহিনীর তুর্কি ও আরব অংশের মধ্যে প্রচণ্ড বিরোধ শুরু হয়। তুর্কিদের নেতৃত্বে ছিলেন প্রধান সেনাপতি ও মসুলের অধিপতি কারবুগা আর আরবদের নেতৃত্বে ছিলেন ওয়াছাব বিন মাহমুদ আল-মিরদাসি নামক জনৈক আমির। দূর থেকে আলেপ্পোর আমির রিজওয়ান আরবদের বিরুদ্ধে তুর্কিদের উত্তেজিত করে একের পর এক বার্তা পাঠিয়ে ফিতনাকে আরও উসকে দেন। (৩৬২)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
«إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ قَدْ أَذْهَبَ عَنْكُمْ عُبِّيَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ وَفَخْرَهَا بِالْآبَاءِ، مُؤْمِنٌ تَقِيٌّ، وَفَاجِرُ شَقِيٌّ ، أَنْتُمْ بَنُوْ آدَمَ، وَآدَمُ مِنْ تُرَابٍ، لَيَدَعَنَّ رِجَالٌ فَخْرَهُمْ بِأَقْوَامٍ، إِنَّمَا هُمْ فَحْمٌ مِنْ فَحْمِ جَهَنَّمَ، أَوْ لَيَكُوْنُنَّ أَهْوَنَ عَلَى اللَّهِ مِنَ الْجِعْلَانِ الَّتِي تَدْفَعُ بِأَنْفِهَا النَّيْنَ»
আল্লাহ তাআলা তোমাদের থেকে জাহিলি-যুগের মিথ্যা অহংকার ও বাপ-দাদাদের নিয়ে দাম্ভিকতা প্রদর্শনের ব্যাধি বিদূরিত করেছেন। (মানুষ দু-ধরনের) মুমিন আল্লাহভীরু ও ফাসিক দুর্ভাগা। তোমরা সকলে আদম-সন্তান আর আদম মাটি দ্বারা সৃজিত হয়েছে। কাজেই মানুষের কর্তব্য—তারা যেন নিজেদের বংশ-গোত্র নিয়ে গৌরব করা পরিহার করে। তারা তো জাহান্নামের এক টুকরো কয়লা! কিংবা অবশ্যই তারা আল্লাহ তাআলার নিকট ওই গুবরে পোকার চেয়েও তুচ্ছ, যা তার নাসিকায় মল-ময়লা বহন করে। (৩৬৩)

এই ছিল এন্টিয়к অবরোধকারী মুসলিম বাহিনীর পরিস্থিতি!

আমরা আবারও এন্টিয়к নগরপ্রাচীরের অভ্যন্তরে ফিরে আসছি। বোহেমন্ড আপন একগুঁয়েমি ও গোয়ার্তুমি সত্ত্বেও অনুভব করেন যে, ক্রুসেডারদের পতন ঘনিয়ে আসছে। তাই অবরুদ্ধ হওয়ার উনিশ দিন পর ২৭ জুন তিনি মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি কারবুগার কাছে ধর্মযাজক পিটার ও আরেকজন ব্যক্তিকে দূত হিসেবে প্রেরণ করেন। দূতদ্বয়ের মাধ্যমে বোহেমন্ড প্রস্তাব দেন যে, অবরোধ প্রত্যাহার করে নিরাপদে চলে যাওয়ার সুযোগ করে দিলে ক্রুসেডার বাহিনী নিজ দেশে চলে যাবে। (৩৬৪) যদিও কারবুগার বাহিনীতে অনৈক্যের ভাঙন সৃষ্টি হয়েছিল; কিন্তু তিনি প্রথমত আশঙ্কা করেন যে, প্রস্তাব গ্রহণ করার পর বোহেমন্ড হয়তো প্রতারণা করবেন। আর তার মতো ধূর্ত লোকের কাছ থেকে প্রতারণাই ছিল প্রত্যাশিত আচরণ। দ্বিতীয়ত কারবুগা উপলব্ধি করেন যে, ক্রুসেডাররা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই তিনি তাদের প্রস্তাব মেনে নেওয়ার পরিবর্তে চূড়ান্ত যুদ্ধের মাধ্যমে তাদেরকে পুরোপুরি নিঃশেষ করে ফেলার মনস্থ করেন। সম্ভবত তিনি মুসলিম বাহিনীর নেতৃবৃন্দ ও সৈন্যদের ওপর ছেয়ে বসা দুর্বলতার পরিমাণ আন্দাজ করতে পারেননি। সবমিলিয়ে তিনি দূতদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে বোহেমন্ডের সামনে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যতিরেকে অন্য সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। আর যুদ্ধও শুরু করতে হবে অতি দ্রুত, ক্ষুধার তাড়নায় ক্রুসেডার বাহিনী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পূর্বেই।

বোহেমন্ড নিজ বাহিনীর প্রতি দৃষ্টি বোলান। তিনি দেখতে পান যে, তাদের মানসিক শক্তি একেবারেই নিম্নমুখী। বোহেমন্ড এবার ক্রুসেডার সৈন্যদের মনোবল ও আত্মবিশ্বাস উন্নত করার এবং তাদের অন্তরে আসন্ন যুদ্ধে সুনিশ্চিত বিজয়ের বিশ্বাস ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এক অভিনব কৌশল অবলম্বনের মনস্থ করেন।

কী সেই কৌশল?!
তিনি পিটার বার্থোলোমিউ (Peter Bartholomew) নামক মার্সেই-এর জনৈক পাদরির মাধ্যমে ক্রুসেডারদের মাঝে প্রচার করেন যে, যিশুশিষ্য সেন্ট আন্দ্রে (Andrew the Apostle) তিনবার স্বপ্নযোগে তার কাছে আগমন করেছেন এবং তাকে এন্টিয়কের সেন্ট পিটার চার্চের (The Church of Saint Peter) একটি স্থান দেখিয়ে দিয়ে জানিয়েছেন যে, এখানেই যিশুখ্রিষ্টকে হত্যার সময় ব্যবহৃত বর্শাটি (The Holy Lance) মাটিচাপা দেওয়া আছে। যদি তারা উক্ত স্থানের মাটি খুঁড়ে বর্শাটি বের করে আনে এবং যুদ্ধের সময় তা ক্রুসেডার বাহিনীর সামনে রাখে, তাহলে অবশ্যই এই বাহিনী জয়লাভ করবে!

এরপর বোহেমন্ড উক্ত পাদরি ও আরও কয়েকজন সন্ন্যাসীকে তথাকথিত স্থানটি খনন করে বর্শাটি অনুসন্ধান করার নির্দেশ দেন। তারা উদ্দিষ্ট স্থানটি খনন করে বর্শা বের করে আনে। সকলে সমস্বরে বলে ওঠে—'এ তো অলৌকিক বিষয়; নিশ্চয়ই এই বাহিনী বিজয় লাভ করবে'! (৩৬৫)

স্বভাবতই এ ঘটনা ছিল সৈন্যদের উদ্দীপ্ত করার জন্য সম্পূর্ণই বোহেমন্ড ও তার অনুসারীদের সাজানো নাটক। ব্যাপকভাবে ঐতিহাসিকগণ বোহেমন্ডের এই দাবির সত্যতা স্বীকার করেননি। আর এতে বিস্ময়েরও কিছু নেই। যারা এই নাটক সাজিয়েছিল, তারা তো পাদরি ও যাজক সম্প্রদায়; তারাই তো নিজ হাতে বিধান রচনা করে দাবি করে যে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে! আমরা আমাদের আকিদা ও ধর্মবিশ্বাস অনুসারে এ বিষয়ে সুনিশ্চিত বিশ্বাসী যে, বর্শা, বর্শা-দাফন ও সমাধিস্থ বর্শা আবিষ্কারের সত্যতা তো বহু দূরের বিষয়, হজরত ঈসা আ. নিহতই হননি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ
তারা তাকে হত্যা করেনি এবং শূলে চড়াতে পারেনি; বরং তাদের বিভ্রম হয়েছিল। [সুরা নিসা: ১৫৭]

নিঃসন্দেহে এই বর্শা-নাটক ছিল ক্রুসেডার যোদ্ধাদের মনোবল উন্নত করার জন্য একটি সাজানো ঘটনা। আর তাদের উদ্দেশ্য সফলও হয়েছিল। বর্শা-কাহিনি মঞ্চস্থ হওয়ার পর অনেক সৈন্যের মনোবল ফিরে আসে এবং তারা পরের দিনই মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

টিকাঃ
৩০৫৯. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৩৬।
৩৬০. Runciman, op. cit., 1, p. 249.
৩৬১. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৩৬।
৩৬২, প্রাগুক্ত, ২/১৩৬।
৩৬০. ইমাম আবু দাউদ, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৫১১৬, ইমাম আহমাদ, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৮৭২১ ও বায়হাকি, আস-সুনানুল কুবরা, হাদিস নং ২০৮৫১।
৩৬৪. Chalandon: Premiere Croisade, p. 220.
৩৬৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৫-১৬, যাবুরাফ, আস-সালিবিয়ুন ফিশ-শারকু, পৃষ্ঠা: ৯৩-১০৭। Raymond d' Aguiler, in Peters (ed.), The First Crusades, pp. 166-168, 174-175, 178-185, 189-194.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 নিকৃষ্টতর পরাজয়!

📄 নিকৃষ্টতর পরাজয়!


পরের দিন ২৮ জুন সকালে ক্রুসেডাররা যুদ্ধের জন্য এন্টিয়ক নগরী হতে বের হতে শুরু করে। মুসলিম সৈন্যগণ কারবুগাকে সকল ক্রুসেডার সৈন্য বের হওয়ার পূর্বেই যুদ্ধ শুরু করার পরামর্শ দেয়। কারণ, তারা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বের হচ্ছিল। কিন্তু কারবুগা এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সব ক্রুসেডার সৈন্য বের হওয়ার পর যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। কতিপয় ঐতিহাসিকের মতে এর মাধ্যমে কারবুগা এক সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করেন। কারণ, তাদেরকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পরাস্ত করা সহজ ছিল। তবে সম্ভবত কারবুগা চেয়েছিলেন যে, ক্রুসেডাররা সকলে বের হয়ে আসুক, যেন নগরীর অভ্যন্তরে সুরক্ষিত অবস্থায় একজনও বাকি না থাকে। তিনি আশঙ্কা করছিলেন যে, তিনি যদি বের হওয়া ক্ষুদ্র দলগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন, তাহলে হয়তো বাকিরা আর বের হবে না। (৩৬৬) এতে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, কারবুগা আত্মবিশ্বাস ও নিজ বাহিনীর সংখ্যাধিক্যের গৌরবে প্রবঞ্চিত ছিলেন। দীর্ঘ অবরোধের পর ক্রুসেডার বাহিনীর দুর্ভোগ ও দুরবস্থা এবং তার কাছে অবরোধ তুলে নেওয়ার আবেদন ইত্যাদি বিষয়ও তাকে বিভ্রান্ত করেছিল।

কারবুগা ক্রুসেডারদের সবাইকে বের হওয়ার সুযোগ দেন। ক্রুসেডার বাহিনীর সকল সৈন্য বের হয়ে নিজ নিজ সেনাপতির অধীনে সারি বিন্যস্ত করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। ৪র্থ রেমন্ড সকলের সামনে তথাকথিত পবিত্র বর্শাটি নিয়ে অবস্থান গ্রহণ করেন।

এন্টিয়к নগরপ্রাচীরের সামনে প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। শুরুতে জয়ের পাল্লা মুসলমানদের দিকে হেলে ছিল। কিন্তু উভয় পক্ষের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে ছিল বিরাট পার্থক্য। ক্রুসেডাররা যুদ্ধ করছিল নিজেদের জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নির্ধারণের জন্য আর মুসলমানরা যুদ্ধ করছিল নিজেদের ভূখণ্ড ও ধনসম্পদ রক্ষা করার জন্য। ভূখণ্ড ও সম্পদ রক্ষার লক্ষ্যে যারা যুদ্ধ করে, তারা কখনো মরতে চায় না। বিজয়ের প্রত্যাশী মুসলিম বাহিনীর জন্য এ জাতীয় লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কখনোই উপযোগী নয়। বদর যুদ্ধের আগের রাতে নবীজি যখন সাহাবায়ে কেরামকে পরের দিন ভোরে যুদ্ধ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করছিলেন, তখন কত মর্যাদাপূর্ণ এক উক্তি করেছিলেন! নবীজি তাদেরকে বলেছিলেন—
وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَا يُقَاتِلُهُمُ الْيَوْمَ رَجُلٌ فَيُقْتَلُ صَابِرًا مُحْتَسِبًا مُقْبِلًا غَيْرَ مُدْبِرٍ إِلَّا أَدْخَلَهُ اللَّهُ الْجَنَّةَ»
ওই মহান সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মাদের জীবন! আজ যে ব্যক্তিই সাওয়াবের আশায় সবরের সঙ্গে (পিছু না হটে) সম্মুখপানে অগ্রসর হয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে এবং শাহাদাত বরণ করবে, আল্লাহ পাক তাকে জান্নাত দান করবেন। (৩৬৭)

এই পরিস্থিতিতে নবীজি তাদেরকে জীবনরক্ষার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেননি, তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছেন আল্লাহর রাস্তায় জীবন উৎসর্গ করার প্রতি। নবীজি শত্রুপক্ষের সম্পদ বা ভূখণ্ডের প্রতি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেননি; যদিও তা হোক চির সম্মানিত মক্কা ভূমি। বরং নবীজি জান্নাত অর্জনের প্রতি সাহাবায়ে কেরামের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বদরের রাতে নবীজির কর্মপন্থা আর ১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ঘটনার মাঝে কত পার্থক্য!

আর তাই কিছুক্ষণ পরই মুসলিম বাহিনীর নেতৃবৃন্দ প্রবলভাবে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে এবং প্রত্যেকে নিজেকে ও নিজ সৈন্যদের লড়াই থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে। সবার আগে পলায়ন করে তুর্কমেনরা, যাদের মাঝে দামেশকের আমির দাক্কাকও ছিলেন। কিছুক্ষণ অবিচলতার সঙ্গে যুদ্ধ করার পর জানাহুদ্দৌলাও পলায়নের পথ ধরেন। সবশেষে সেনাপতি কারবুগাও পলায়ন করেন। (৩৬৮) মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করে। ক্রুসেডার বাহিনীর সেনাপতিগণ আপন আপন সৈন্যদের যুদ্ধলব্ধ সম্পদের প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে পলায়নরত মুসলিম সৈন্যদের পশ্চাদ্ধাবনের নির্দেশ দেয়। ক্রুসেডার সৈন্যরা এন্টিয়к হতে পূর্ব দিকে তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হারিম দুর্গ পর্যন্ত মুসলিম সৈন্যদের তাড়া করে। (৩৬১) ক্রুসেডারদের আক্রমণে প্রচুর মুসলিম সৈন্য নিহত হয়। এরপর ক্রুসেডাররা ফিরে এসে পড়ে থাকা গণনাতীত পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, রসদসামগ্রী ও অস্ত্রশস্ত্র কুড়িয়ে নেয়। কারবুগা পালিয়ে মসুলে চলে যান, দাক্কাক চলে যান দামেশকে।

নিঃসন্দেহে এটি ছিল মুসলিম বাহিনীর কঠিন ও দুঃখজনক এক পরিণতি! কত মিল এই ব্যর্থ সৈন্যসমাবেশ ও ফিলিস্তিনে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে (১০৬৭ হিজরি সনে) ইহুদিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আরবদের সৈন্যসমাবেশে! এন্টিয়কের ন্যায় সেদিনও মুসলিম সৈন্যরা আল্লাহর জন্য বের হয়নি, আল্লাহর দ্বীনকে বুলন্দ করার জন্য বের হয়নি। তারা কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত ছিল না। তারা বের হয়েছিল চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য, ক্ষণস্থায়ী রাজত্বকে রক্ষার জন্য অথবা একখণ্ড ভূমি লাভ করার জন্য। যাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও চিন্তাজগৎজুড়ে এসব বিষয় কার্যকর থাকে, তাদের কপালে কখনো বিজয় জোটে না।

নিঃসন্দেহে ইতিহাসের পরতে পরতে আমাদের জন্য নিহিত আছে উপদেশ ও শিক্ষা!

টিকাঃ
৩৬৬. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৩৭।
৩৬৭. ইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/৬২৭, ইবনু সায়্যিদিন-নাস, উয়ূনুল আছার, ১/৩৩৮, ইবনে কাছির, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ২/৪২০ ও সুহায়লি, আর-রাওযুল উনিফ, ৩/৭১।
৩৬৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৬।
"Gesta Francorum, p. 159.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 বাইতুল মুকাদ্দাসের পথে বিভিন্ন বাধা

📄 বাইতুল মুকাদ্দাসের পথে বিভিন্ন বাধা


কারবুগার বাহিনীর পলায়নের মধ্য দিয়ে এন্টিয়к পুরোপুরি খ্রিষ্টান নগরীতে পরিণত হয়। তৎকালীন মুসলিমসমাজ এন্টিয়к পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে পড়ে। তবে বিজয়ী ক্রুসেডাররা এন্টিয়কে বড় কিছু সমস্যার সম্মুখীন হয়। এসব সমস্যা তাদের এই অভিযানের মূল লক্ষ্য বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে সরাসরি অগ্রযাত্রার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যথা-

১. উল্লেখযোগ্য অন্যতম বড় সমস্যা ছিল ক্রুসেডারদের আশঙ্কাজনক সংখ্যাহ্রাস। ক্রুসেডাররা এশিয়া মাইনরে অবতরণ করার পরই সেলজুকদের মুখোমুখি হয়েছিল। ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে নিকিয়া যুদ্ধ হতে এক বছরের বেশি সময়ে বিভিন্ন যুদ্ধে নিহত হয়েছিল প্রচুর সংখ্যক ক্রুসেডার যোদ্ধা। এরপর তাদের অনেকে বিশাল দূরত্বের পথ পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য ও পানীয় ছাড়াই পাড়ি দিতে গিয়ে মারা যায়। দীর্ঘদিন এন্টিয়к অবরোধ চলার সময়ও প্রথম স্তরে ক্রুসেডাররা মুসলমানদের অবরোধ করার সময় এবং দ্বিতীয় স্তরে মুসলমানরা ক্রুসেডারদের অবরোধ করে রাখার সময় মারা যায় বহু সৈন্য। এরপর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সৈন্য নিহত হয় কারবুগার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে। সবশেষে ব্যাপক প্রাণহানির কারণে এন্টিয়কে ছড়িয়ে পড়া মহামারিতেও মারা যায় প্রচুর সংখ্যক ক্রুসেডার সৈন্য।

এভাবে ক্রুসেডারদের সৈন্যসংখ্যা এত হ্রাস পায় যে, তাদের পক্ষে এন্টিয়কের সুদীর্ঘ প্রাচীরের প্রতিটি চৌকিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। (৩৭০) তাহলে কীভাবে বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে অগ্রযাত্রার প্রস্তুতি গ্রহণ করা হবে?! তা ছাড়া বেঁচে থাকা সৈন্যরা ক্লান্তি ও দুর্বলতার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে। এন্টিয়к থেকে প্রায় ছয়শ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাইতুল মুকাদ্দাসের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার মতো শক্তি তখন তাদের নেই। অধিকন্তু সেখানে তাদের লড়তে হবে তৎকালীন মিশরের পূর্ণ সামরিক শক্তির অধিকারী উবায়দি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে।

এসব সংকট বিবেচনা করে ক্রুসেডাররা বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার বিষয়ে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এই অবসাদ অল্প কদিনের ছিল না; পুরো ছয় মাস এভাবেই কেটে যায়। (৩৭১)

২. এই সংকটের কারণেই ক্রুসেডাররা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সরাসরি বিরোধিতার ঘোষণা প্রদান হতে বিরত থাকে। যদিও ক্রুসেডাররা শুরু থেকেই বাইজান্টাইন সম্রাটকে অপছন্দ করে আসছিল, যিনি তাদের বিরোধী মতাদর্শী হওয়া সত্ত্বেও নিজ সিদ্ধান্ত তাদের ওপর চাপিয়ে যাচ্ছিলেন; যদিও তারা অনুভব করছিল যে, সম্রাট তাদের সঙ্গে এন্টিয়к অবরোধে নিষ্ঠাপূর্ণ অংশীদারিত্ব ও সহায়তা প্রদান করেননি এবং যদিও কারবুগার বিরুদ্ধে যুদ্ধে সম্রাট তাদেরকে সহায়তা না করায় তারা তার প্রতি প্রচণ্ড রকম বিক্ষুব্ধ ছিল; কিন্তু তারা উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে, আগামী দিনগুলোতে যেকোনো মুহূর্তে তাদের বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের শক্তি ও সহায়তার প্রয়োজন পড়তে পারে। (৩৭২)

এই উপলব্ধির কারণেই এন্টিয়к জয়ের পর মুখোমুখি হওয়া আরেকটি বড় সমস্যার মোকাবিলা করতে করণীয় নির্ধারণে ক্রুসেডারদের ভেবে-চিন্তে অগ্রসর হতে হচ্ছিল। এন্টিয়к জয়ের পর ক্রুসেডাররা দেখতে পায় যে, নগরীটির অভ্যন্তরে বিপুল সংখ্যক অর্থোডক্স খ্রিষ্টান নাগরিক বসবাস করে। ক্রুসেডাররা তাদের মোটেও বিশ্বাস করত না; বরং তারা জানত যে, এসব অর্থোডক্স খ্রিষ্টান মনেপ্রাণে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের প্রতি আনুগত্য পোষণ করে এবং সুযোগ পেলেই বাইজান্টাইন স্বার্থ বাস্তবায়নে কাজ করতে পারে। কিন্তু ক্রুসেডাররা অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের সম্পর্কে এই আশঙ্কার কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে সক্ষম হয়নি। (৩৭৩) বরং তারা বাহ্যত তাদের সঙ্গে সদাচরণ করতে থাকে। ক্রুসেডাররা এন্টিয়কের অর্থোডক্স বিশপ ৪র্থ জন-কে যথেষ্ট মর্যাদা প্রদান করে এবং তাকে এন্টিয়к চার্চের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত করে। তারা অর্থোডক্স পাদরিদের বরখাস্ত করার পরিবর্তে আপন আপন পদে বহাল রাখে এবং যেসব গির্জায় শূন্য পদ সৃষ্টি হয়েছিল, কেবল সেখানেই ক্যাথলিক পাদরিদের দায়িত্ব প্রদান করে। (৩৭৪) এ সবকিছুই করা হচ্ছিল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের নৈকট্য অর্জন এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের হৃদ্যতা ক্রয়ের প্রচেষ্টা হিসেবে।

৩. ক্রুসেডাররা আরেকটি বড় সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল। আর তা হলো ক্রুসেডারদের প্রত্যাশার বিপরীতে এন্টিয়к নগরীর শস্যভান্ডার ও রসদভান্ডার শূন্য হয়ে গিয়েছিল। (৩৭৫) দীর্ঘদিনের অবরোধ ও সকলের যুদ্ধব্যস্ততায় নগরীর সঞ্চিত সম্পদ শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং গুদামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কিছুই ছিল না। ক্রুসেডাররা উপলব্ধি করছিল যে, আগামী দিনগুলোতে তাদের নিজেদের করণীয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। যদি ইউরোপ বা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য থেকে সাহায্য আসে, তাহলে তো ভালো, নয়তো নিজেদেরই পার্শ্ববর্তী জনপদগুলোতে হামলা চালিয়ে প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় অচিরেই ক্রুসেডার বাহিনী ভীষণ খাদ্যসংকট ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে।

অবশ্য এসব সমস্যার চেয়েও বড় যে সমস্যা ও প্রশ্নের মুখোমুখি ক্রুসেডাররা হয়েছিল, তা হলো-কে হবে এন্টিয়কের নতুন শাসক?!(৩৭৬)

টিকাঃ
৩৭০. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/১৭৩।
৩৩. Gesta Francorum, p. 74-82; William of Tyre, pp. 298-315.
৩৭২. Brehier, op. cit., 314.
৩৭০. Runciman, op. cit., 1, p. 236.
৩৭৪. Albert d' Aix, p. 433.
৩৭৫. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/১৭৪।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 এন্টিয়কের নতুন শাসক

📄 এন্টিয়কের নতুন শাসক


পূর্বের আলোচনায় আমরা জেনেছি যে, বোহেমন্ড শুরু থেকেই এন্টিয়к অভিযানকে নিজের ভাগ্যনির্ধারক লড়াই হিসেবে বিবেচনা করে আসছিলেন। ইতালি ত্যাগ করার পর থেকে এন্টিয়কে প্রবেশ করা পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্যও তার মনমস্তিষ্ক এই লক্ষ্যের কথা বিস্মৃত হয়নি। তিনি সুস্পষ্ট ভাষায় অন্যান্য সেনাপতিকে এ শর্ত জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, যদি তিনি তাদের সঙ্গে অভিযানের শেষ পর্যন্ত শরিক থাকেন, তাহলে অবশ্যই তারা তাকে এন্টিয়কের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব বুঝিয়ে দেবে।(৩৭৭)

এন্টিয়кই ছিল বোহেমন্ডের স্বপ্ন!
প্রশ্ন হলো-এন্টিয়ককে ঘিরে স্বপ্ন দেখা কি কেবল একজনের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল?!
উত্তর হলো-'না!'

বোহেমন্ডের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে প্রবল বাধারূপে বিবেচিত হচ্ছিলেন আরেক অতি উচ্চাভিলাষী ক্রুসেডার সেনাপতি তুলুজের কাউন্ট ৪র্থ রেমন্ড। ঘটনাপ্রবাহের শুরুতে রেমন্ড যদিও আপন ধার্মিকতা ও পোপের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন এবং ঘোষণা করেছিলেন যে, মাসিহের অনুসারী হওয়ায় তিনি বাইজান্টাইন সম্রাটের আনুগত্যের শপথ করতে পারবেন না, এরপর তিনি কথিত পবিত্র বর্শা বহন করে ক্রুসেডার বাহিনীর অগ্রভাগে থেকে লড়াই করেছিলেন; কিন্তু এন্টিয়к পতনের পর তিনি সম্পূর্ণ বিপরীত চেতনা প্রকাশ করতে থাকেন। রেমন্ড বোহেমন্ডের প্রতি উত্তেজিত হয়ে দাবি করেন যে, বোহেমন্ড অন্যান্য সেনাপতির চেয়ে অতিরিক্ত কোনো অধিকার বা ক্ষমতা লাভ করতে পারেন না। ইতিপূর্বে যদিও রেমন্ড এন্টিয়к পতনের পর তা বোহেমন্ডকে দিয়ে দেওয়ার বিষয়ে অন্যান্য সেনাপতির সঙ্গে সম্মতি প্রকাশ করেছিলেন; কিন্তু এখন তিনি তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। রেমন্ডের বিদ্রোহ কেবল মৌখিক আপত্তিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তিনি অস্ত্রের ভাষায়ও আপত্তি ও প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন! তার সৈন্যরা এন্টিয়কের বিভিন্ন ফটক ও চৌকির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে এবং বোহেমন্ডের হাতে কর্তৃত্ব সমর্পণে অস্বীকৃতি জানায়। এন্টিয়কে এবার শুরু হয় বোহেমন্ড-সমর্থক ও বোহেমন্ডবিরোধী শিবিরের সংঘাত। (৩৭৮)

এন্টিয়কের ক্ষমতা নিয়ে একমাত্র রেমন্ডই বোহেমন্ডের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন না; বাইজান্টাইন সম্রাটও এন্টিয়ককে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় অধিকার মনে করতেন। তা ছাড়া ক্রুসেড অভিযান শুরু হওয়ার অব্যবহিত পূর্বেই সম্পাদিত কনস্টান্টিনোপল চুক্তি অনুসারে ক্রুসেডার সেনাপতিগণ বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের প্রাচীন অধিকারভুক্ত নগরীগুলো বাইজান্টাইন সম্রাটের হাতে তুলে দিতে বাধ্য ছিল। এন্টিয়к ছিল এই তালিকার সর্ব শীর্ষে। (৩৭৯)

সুতরাং এক কঠিন প্রশ্ন সকলের সামনে সৃষ্টি হয় যে, কে লাভ করবে এন্টিয়কের শাসনক্ষমতা?!

এন্টিয়কের ক্ষমতা নিয়ে খ্রিষ্টান নেতৃবৃন্দের এই পারস্পরিক সংঘাত আমাদের সামনে আবারও সুস্পষ্টরূপে প্রমাণ করে যে, এসব নেতা মোটেও ধর্মের সেবা, ক্রুশের মর্যাদা রক্ষা বা মাসিহের সন্তুষ্টিলাভের প্রত্যাশায় অভিযানে বের হয়নি; বরং তাদের প্রায় সকলের ক্ষেত্রেই আমরা প্রত্যক্ষ করেছি যে, তারা আপন আপন মর্যাদা ও ক্ষমতা অর্জনে সর্বোচ্চ সচেষ্ট ছিল। যে ধর্মীয় দায়িত্বের কথা বলে তারা অভিযানে বের হয়েছিল, সেদিকে তাদের মোটেও দৃষ্টি ছিল না।

যে বাইজান্টাইন সম্রাট পোপের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করেছিলেন এবং খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের অবস্থা চরম শোচনীয়রূপে তুলে ধরেছিলেন, তার চিন্তা-চেতনাজুড়ে একমাত্র লক্ষ্য ছিল সেলজুকরা ইতিপূর্বে যেসব জনপদ কেড়ে নিয়েছে, সেগুলোতে নিজের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং আপন সাম্রাজ্যের সীমানা বিস্তৃত করা। এন্টিয়к অবরোধের সময় যখন প্রথমবারের মতো তার বীরত্ব ও আত্মনিবেদনের বাস্তব পরীক্ষার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তখনই তিনি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে দূরে সরে পড়েন এবং পতন পরিস্থিতির মুখোমুখি ক্রুসেডারদের সহায়তা করতে অস্বীকার করে প্রত্যাবর্তন করেন। অথচ বাহ্যত ক্রুসেডাররা তাকে সহায়তা করার জন্যই অভিযানে বের হয়েছিল!

এদিকে অন্যতম ক্রুসেডার সেনাপতি বল্ডউইন মূল বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন এবং এডেসায় রাজ্য ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেই তুষ্ট হয়ে গেছেন। বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত অভিযান পূর্ণ করার কোনো চিন্তাই তার নেই!

বোহেমন্ডও এখন এন্টিয়к জয় করেই তুষ্ট। তিনি ধূর্ততার আশ্রয় নিয়ে এন্টিয়কের একক কর্তৃত্ব তার হাতে তুলে দিতে সকলকে বাধ্য করছেন। আল-কুদস ইস্যু এবং অন্যদের অধিকার ও স্বপ্নের প্রতি তার মোটেও ভ্রূক্ষেপ নেই।

ধর্মযাজক পিটার দীর্ঘস্থায়ী এন্টিয়к অবরোধের কষ্ট থেকে আত্মরক্ষার জন্য পালিয়ে গিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত টেনক্রেড তাকে অনেকটা জোর করে লাঞ্ছিত-অপমানিত অবস্থায় ফিরিয়ে আনেন।

টেনক্রেড নিজে ইতিপূর্বে তারসুসের অধিকার নিয়ে বল্ডউইনের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং তারা একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র উত্তোলনও করেছিলেন!

আরেক সেনাপতি স্টিভেনও হতাশ হয়ে লাগাম ছেড়ে দিয়েছেন। এন্টিয়к অবরোধের একেবারে শেষ মুহূর্তে যখন তিনি অনুভব করেন যে, তার রাজ্যজয়ের স্বপ্ন নিঃশেষ হতে চলেছে, তখন তিনি নিজ বাহিনী নিয়ে ফ্রান্সে ফিরে যান!

যুগে যুগে আগ্রাসী ও জবরদখলকারী সকল নেতাই নিজেদের জনগণ ও সৈন্যদের মনমস্তিস্কে প্রভাব বিস্তার করার জন্য এবং অধিকৃত অঞ্চলের জনগণকে ভীত ও নিশ্চুপ করানোর জন্য প্রতারণামূলক চকচকে বিভিন্ন আওয়াজ তুলে থাকে। কারও মুখে থাকে মাসিহের মর্যাদা রক্ষার দাবি, কারও মুখে তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বুলি! কারও কণ্ঠে কূটনৈতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার গান; আবার কারও কণ্ঠে মানবাধিকার রক্ষার শ্লোগান! তারা যুদ্ধ করে বিভিন্ন মুখরোচক দাবি ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার জন্য। অথচ বাস্তবতা হলো—তাদের যুদ্ধ ও লড়াই এবং রাজনীতি ও কূটনীতি সবকিছু শুধুই ব্যক্তিস্বার্থ নিশ্চিতকরণ এবং ব্যক্তিলালসা চরিতার্থ করার জন্য!

এখন এই মহাসমস্যার প্রতিকার বিধানে ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দ কী করবে?! ১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দের জুলাইয়ের শুরুতে ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দ অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈঠকে মিলিত হয়। সেখানে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ, এন্টিয়কের ভবিষ্যৎ ও বাইতুল মুকাদ্দাসের ভবিষ্যৎ বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করে। আলোচনার মাধ্যমে সকলের সামনে সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, এখন তাদের বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছার মতো শক্তি নেই। বিশেষত সেখানে তাদের যুদ্ধ করতে হবে পূর্ণ শক্তিশালী ও তাজাদম এক বাহিনীর বিরুদ্ধে। আর আসন্ন সেই যুদ্ধে সফলতার জন্য তাদের অবশ্যই বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সহায়তা প্রয়োজন হবে। সুতরাং তারা সুস্পষ্ট ভাষায়ই বাইজান্টাইন সম্রাটের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করবে। কিন্তু এন্টিয়কের কর্তৃত্ব লাভ করা ব্যতিরেকে বাইজান্টাইন সম্রাট কিছুতেই তাদেরকে সাহায্য করতে রাজি হবেন না। এ কারণেই বোহেমন্ড ও রেমন্ডসহ সকল ক্রুসেডার নেতা একমত হয়—তারা এই শর্তে এন্টিয়কের অধিকার বাইজান্টাইন সম্রাটকে বুঝিয়ে দেবে যে, তিনি নিজে বিশাল একটি বাহিনী নিয়ে ক্রুসেডার বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেবেন এবং বাইতুল মুকাদ্দাস অভিযানে শরিক হবেন। বোহেমন্ডও এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করা হতে বিরত থাকেন। কারণ, তিনি জানতেন যে, এই দুর্বল ও অবসন্ন অবস্থায় তাদের পক্ষে আসন্ন গুরুত্বপূর্ণ অভিযান সফলতার সঙ্গে সম্পাদন করা সম্ভব নয়।

বাইজান্টাইন সম্রাট যদি ক্রুসেডারদের শর্ত মেনে নিয়ে আগমন করেন, তাহলে তাদের এই বিস্তৃত স্বপ্ন বাস্তবায়ন সহজ হবে। আর যদি তিনি না আসেন, তাহলে তারাও তাকে এন্টিয়কের কর্তৃত্ব বুঝিয়ে দেবে না। তখন তারা নতুন করে বসবে এবং এন্টিয়к প্রসঙ্গে নতুন করে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে যে, কে এন্টিয়কের শাসনক্ষমতা লাভের অধিক দাবিদার। (৩৮০)

সকল ক্রুসেডার নেতা এ বিষয়ে একমত হয়ে বাইজান্টাইন সম্রাটের কাছে বার্তা প্রেরণ করে এবং তার কাছে দাবি জানায় যে, তিনি যেন বাইতুল মুকাদ্দাস অভিযানে তাদেরকে সাহায্য করার শর্তে এন্টিয়কের ক্ষমতা বুঝে নিতে আগমন করেন।

ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দ যেন ভুলেই গিয়েছিল যে, তারা কার সঙ্গে খেলার ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছে?!

নতুন প্রশ্ন-ক্রুসেডারদের বার্তার প্রত্যুত্তরে কী ছিল বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রতিক্রিয়া?!

বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস ছিলেন চরম পর্যায়ের ধূর্ত ও স্বার্থবাদী। তিনি চাচ্ছিলেন কোনো ত্যাগ স্বীকার না করেই সব ফল ভোগ করতে। কূটনীতির ময়দানের পাকা খেলোয়াড় অ্যালেক্সিয়াস খেলার প্রতিটি দিকের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে চাচ্ছিলেন। কোনো শত্রুর সঙ্গে মিত্রতা করতে বা কোনো বন্ধুর সঙ্গে প্রতারণা করতে সামান্য দ্বিধা বা বাধা তার নীতিতে ছিল না!

বাইজান্টাইন সম্রাট চাচ্ছিলেন ক্রুসেডার বাহিনীকে মুসলিম শক্তির প্রতিরোধ ভেঙে দেওয়ার কাজে ব্যবহার করতে; কিন্তু তাদেরকে বিনিময়ে কিছুই না দিতে। তিনি তাদেরকে এশিয়া মাইনর অঞ্চলে পরীক্ষা করেছেন এবং দেখেছেন যে, তারা বিজিত সকল নগরী তার হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছে। তারা যদিও এখন এন্টিয়কের বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে; কিন্তু তারা বেশিদিন নিজেদের দেশ থেকে দূরে অটল-অবিচল থাকতে পারবে না। আর তাই বাইজান্টাইন সম্রাট এবার নতুন চাল চালেন। তিনি ক্রুসেডারদের পুরোপুরি উত্তেজিত করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ার মনস্থ করেন। উত্তেজিত ক্রুসেডাররা মুসলমানদের হত্যা করবে, মুসলমানরাও তাদের হত্যা করবে। এভাবে যখন পুরো অঞ্চল শক্তিশালী সকল পক্ষ-শূন্য হয়ে যাবে, তখন তিনি দৃশ্যপটে আগমন করে অল্প কষ্টে বা বিনা কষ্টে নিজের পাওনা বুঝে নেবেন!

এটি অত্যন্ত নিকৃষ্ট একটি পরিকল্পনা। ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সাম্রাজ্যবাদী বিভিন্ন রাষ্ট্র এ পদ্ধতিটি কাজে লাগিয়ে থাকে। তারা দুটি পক্ষকে পরস্পর যুদ্ধে ঠেলে দেয়; প্রত্যেক পক্ষকে অপর পক্ষের দুর্বল জায়গাগুলো জানিয়ে দেয়। যখন মেরে-মরে উভয় পক্ষ সাফ হয়ে যায়, তখন তারা সব ফল সংগ্রহ করার জন্য ময়দানে উপস্থিত হয়।

এই নীতির কারণেই ক্রুসেডারদের পত্র পাওয়ার পর বাইজান্টাইন সম্রাট সিদ্ধান্ত নেন যে, সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে তিনি ক্রুসেডারদের তার প্রতি বিরাগভাজন করবেন না; আবার দ্রুত কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে বাইতুল মুকাদ্দাসের বর্তমান শাসক উবায়দিদেরও উত্তেজিত করবেন না। বাইজান্টাইন সম্রাট সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি উত্তর দিতে ভুলে যাওয়ার ভান করবেন। এর ফলে কিছু সময় চলে যাবে এবং সংকট আরও ঘনীভূত হবে! (৩৮১)

এদিকে বাইজান্টাইন সম্রাটের উত্তর আগমনে দেরি হলেও ক্রুসেডাররা তাদের অভিযান শেষ না করে দীর্ঘ সময় এন্টিয়কে অবস্থান করতেও পারছিল না। তাই তারা উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে নতুন করে বৈঠকে মিলিত হয়ে বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে অগ্রযাত্রা শুরুর সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্ত হয় ১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে তারা বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে যাত্রা শুরু করবে। ততদিনে গরমের প্রচণ্ডতাও অনেকটা কমে যাবে। (৩৮২)

বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস শুধু ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দের সঙ্গে খেলেই নিশ্চিন্ত বসে ছিলেন না। তিনি এবার অপর পক্ষের সঙ্গেও খেলা শুরু করার মনস্থ করেন। সম্রাট মিশরের উবায়দি প্রশাসনের কাছে পত্র প্রেরণ করেন এবং তাদেরকে এক ধরনের পারস্পরিক সহায়তা বিনিময়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু ঘটনাক্রমে উবায়দিদের কাছে প্রেরিত পত্রটি ক্রুসেডাররা করায়ত্ত করে ফেলে। এবার তারা উপলব্ধি করতে পারে যে, বাইজান্টাইন সম্রাট তাদের নিয়ে খেলছেন। (৩৮৩)

পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ক্রুসেড অভিযানের সেনাপতিগণ সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা নিজেরাই বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে রওনা হয়ে যাবে। তবে রদসপত্র সংগ্রহ এবং এন্টিয়к ও আশেপাশের অঞ্চলে মজবুত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার পরই তারা বের হবে। এ উদ্দেশ্যেই তারা আগস্ট ও অক্টোবর দুই মাস এন্টিয়কের চারপাশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা চালায়। (৩৮৪) এ সময় বোহেমন্ড সর্বদা নিজেকে এন্টিয়কের একমাত্র শাসক হিসেবে জাহির করতে সচেষ্ট থাকেন। (৩৮৫)

নভেম্বরের ৫ তারিখে ক্রুসেডাররা আবারও বৈঠকে মিলিত হয় এবং বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে রওনা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। (৩৮৬) ফলে নতুন করে আবারও এন্টিয়কের শাসক নির্ধারণের প্রশ্ন সামনে আসে।

বোহেমন্ড ও রেমন্ড পুনরায় এ বিষয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। বোহেমন্ড সরাসরি বাইজান্টাইন সম্রাটের অবাধ্যতার কথা ঘোষণা করেন এবং দৃঢ়তার সঙ্গে অর্থোডক্স চার্চ থেকে ৪র্থ জন-কে বরখাস্ত করার দাবি তোলেন। তিনি এর মাধ্যমে এন্টিয়কের একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হতে এবং কনস্টান্টিনোপলের কর্তৃত্ব থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে চাচ্ছিলেন। (৩৮৭) কিন্তু রেমন্ডের চিন্তা ছিল—বোহেমন্ডকে পরাভূত করে এন্টিয়কের অধিকার লাভ করতে চাইলে তার বাইজান্টাইন সম্রাটের সঙ্গে মিত্রতা রক্ষার প্রয়োজন হবে। এভাবে স্বার্থের সংঘাত এবার মিত্রতার সংঘাতে রূপ নেয়! যে বোহেমন্ড ছিলেন বাইজান্টাইন সম্রাটের সবচেয়ে নিকটভাজন, তিনি এখন এন্টিয়কের কর্তৃত্ব লাভের জন্য তার অবাধ্যতা ঘোষণা করছেন। তিনি ভুলে গেছেন যে, ইতিপূর্বে তিনি সম্রাটের আনুগত্যের শপথ করেছিলেন! আর যে রেমন্ড সম্রাটের আনুগত্যের শপথ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, তিনিই এখন উচ্চৈঃস্বরে তার পাশে থাকার কথা ঘোষণা করছেন! (৩৮৮)

স্বার্থের সংঘাতে বিবাদমান উভয় পক্ষের স্বর উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আসন্ন লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত দুই ক্রুসেডার সেনাপতি এবার অস্ত্র উত্তোলন করে! তাদের দুজনের আচরণে অন্যান্য সেনাপতি ও সৈন্যরা চরম বিরক্ত হয়ে ওঠে। একে কেন্দ্র করে এন্টিয়কে ঘটে এক বিরল ও বিস্ময়কর বিদ্রোহ। অন্যান্য সেনাপতি ও সৈন্যরা হুমকি দেয় যে, তারা দুজন যদি নিজেদের মধ্যকার বিরোধ নিরসন না করে, তাহলে সকলে মিলে এন্টিয়কের নগরপ্রাচীর ভেঙে ফেলবে; এরপর নির্ধারিত সময়ে পুরো বাহিনী বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে রওনা হয়ে যাবে আর তাদের দুজনের বাহিনীকে বাইজান্টাইন শক্তি ও মুসলিম শক্তির সামনে অরক্ষিত ও উন্মুক্ত ফেলে রেখে যাবে। (৩৮৯)

বোহেমন্ড ও রেমন্ড যখন উপলব্ধি করে যে, ক্রুসেডাররা বাস্তবেই তাদের হুমকি বাস্তবায়ন করবে, তখন তারা প্রচণ্ড ভীত হয়ে পড়ে। এরপর সকলে শান্ত হয়ে সমস্যার সমাধানের জন্য বৈঠকে বসে। ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দ সিদ্ধান্ত নেয় যে, সমাধানে পৌঁছা পর্যন্ত সময়টুকু কাজে লাগাতে এবং সকলকে ব্যস্ত রাখতে আপাতত তারা সকলে মিলে মাআ'ররাতুন-নোমান (Ma`arrat al-Nu`man) নগরীতে অভিযান চালাবে। এন্টিয়к হতে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত নগরীটি ছিল আলেপ্পো রাজ্যের কর্তৃত্বাধীন। (৩৯০) ক্রুসেডাররা নগরীটি অবরোধ করলে সেখানকার অধিবাসীরা আলেপ্পোর আমির রিজওয়ানের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করে। কিন্তু তিনি তাদের আবেদনে উল্লেখযোগ্য কোনো গুরুত্ব প্রদান না করায় (৩৯১) নিরুপায় নগরবাসী ক্রুসেডারদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। পূর্বে নগরবাসীকে নিরাপত্তাদানের প্রতিশ্রুতি দিলেও (৩৯২) নগরীতে প্রবেশের পর ক্রুসেডাররা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার পরিবর্তে নগরজুড়ে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও লুটপাট চালায় এবং পুরো নগরীতে আগুন লাগিয়ে দেয়। (৩৯৩)

১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ১১ ডিসেম্বর মাআ'ররাতুন-নোমান নগরীর পতন ঘটে। মাআ'ররাতুন-নোমানের অভিযান শেষে ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দ নতুন করে আবারও বোহেমন্ড ও রেমন্ডের কর্তৃত্ব-বিরোধ নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। রেমন্ড যখন দেখতে পান যে, অধিকাংশ সেনাপতি বোহেমন্ডের দাবিকেই সমর্থন করছে, (৩৯৪) তখন তিনি একেবারে বঞ্চিত না হয়ে কিছু পাওয়ার আশায় চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার মনস্থ করেন। তিনি প্রস্তাব দেন যে, তাকে যদি আসন্ন বাইতুল মুকাদ্দাস অভিযানে ক্রুসেডার বাহিনীর পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়, ভিন্নভাবে বললে সর্বাধিনায়ক নির্বাচিত করা হয়, তাহলে তিনি এন্টিয়কের দাবি ছেড়ে দেবেন। সমস্যার সমাধানের জন্য সবাই তার দাবি মেনে নেয়। এর ফলে বোহেমন্ড একদিকে এন্টিয়কের একক কর্তৃত্ব লাভ করেন, অপরদিকে বাইতুল মুকাদ্দাস অভিযান থেকে দূরে থাকার সুযোগও পেয়ে যান। নিজের পুরোনো স্বপ্ন এন্টিয়к রাজ্যের ক্ষমতা হাতে পেয়ে তিনি ভুলে যান তীর্থযাত্রীদের 'নিপীড়িত' হওয়ার ইতিহাস! (৩৯৫)

বাইতুল মুকাদ্দাস অভিযানে সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব লাভ করেই রেমন্ড প্রথমে তীর্থযাত্রীদের পোশাক পরিধান করেন। এরপর তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস দখলের ধর্মীয় অভিযানে বাহিনীকে নেতৃত্ব দিতে নগ্নপদে যাত্রা শুরু করেন। (৩৯৬) এন্টিয়к পতনের সাত মাসেরও অধিক সময় পর ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ জানুয়ারি শুরু হয় বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে ক্রুসেডারদের যাত্রা। রেমন্ড সকলকে আশ্বস্ত করতে চাচ্ছিলেন যে, তিনি একমাত্র মাসিহের সন্তুষ্টি লাভের আশায়ই অগ্রসর হচ্ছেন। কিন্তু অচিরেই তার এই মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যাবে। কেবল রেমন্ডের নয়; একে একে উন্মোচিত হবে অভিযানে শরিক সকল স্বার্থবাদী নেতা ও সেনাপতির অভিনয়ের মুখোশ!

টিকাঃ
৩৭৬, Cam. Med. Hist. Vol. 2, pp. 294-295.
৩৭৭, Chalandon: Alexis Comnene, p.p. 201 & Premiere Croisade, p. 193.
৩৭৮. Guillaman: de tyr, p. 274.
৩৭৯. Chalandon: Alexis Comnene, p. 201 & Premiere Croisade, p. 203-205.
*৮০. Gesta Francorum, p. 161, Guillaman: de tyr, p. 277.
৩৮১. Grousset: Alexis Comnene, pp. 204-205.
৩৮২. Runciman, op. cit., 1, p. 250.
৩৮৩. Chalandon: Alexis Comnene, p. 207.
৩৮৪. Cam. Med. Hist. Vol. 5, p. 295. And Michaud: op. Cit. 1, p. 333 & Gesta Francorum, pp. 162-165.
৩৮৫. Heyd: op. cit., Tome 1, p. 134.
৩৮৬. Michaud: op. cit. 1, pp. 346-347.
৩৮৭. Grousset: Hist. des Croisades 1, p. 250.
৩৮৮. Brehier, op. cit., p. 314.
৩৮৯. Gesta Francorum, p. 171.
৩৯০. Stevensos: op. cit., p. 30.
৩৯১. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৪১-৪৩।
৩৯২. Albert d' Aix, p. 268 & Gesta Francorum, p. 175.
৩৯৩. Chalandon: Premiere Croisade, p. 249.
৩৯৪. Gesta Francorum, p. 279.
৩৯৫. Michaud: op. cit. 1, pp. 345-347.
৩৯৬. Mayer, The Crusades, pp. 58-59.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00