📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 এন্টিয়কের পতন

📄 এন্টিয়কের পতন


এরপর হঠাৎ করেই পটপরিবর্তন ঘটে। মুসলিম শিবিরে আঘাত হানে বিশ্বাসঘাতকতার দুষ্ট ব্যাধি। এন্টিয়কের অধিবাসী আর্মেনীয় বংশোদ্ভূত ফিরোজ নামক জনৈক ব্যক্তি নিজেকে মুসলমান হিসেবে পরিচয় দিত। সে গোপনে ক্রুসেড শিবিরে অবস্থানরত আর্মেনীয়দের সঙ্গে পত্রবিনিময় করতে থাকে। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, এন্টিয়কের অধিবাসী অনেক আর্মেনীয় নাগরিক অবরোধের শুরুতেই এন্টিয়к থেকে বের হয়ে ক্রুসেড শিবিরে যোগ দিয়েছিল। (৩৪৫) ফিরোজ ইয়াগিসিয়ানের অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিল। ইয়াগিসিয়ান তাকে এন্টিয়কের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি চৌকির প্রহরার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সে আর্মেনীয়দের জানায় যে, তার এমন কিছু গোপন তথ্য জানা আছে, যার মাধ্যমে সহজেই এন্টিয়কের দুর্গসমূহ জয় করা যাবে। এ সংবাদ ব্যক্তিগতভাবে বোহেমন্ডের কাছে পৌঁছানো হয়। বোহেমন্ড অন্যান্য ক্রুসেডার সেনাপতির কাছে সবকিছু গোপন রাখেন এবং নিজে ফিরোজের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আর্মেনীয় ফিরোজ তথ্যপ্রদানের বিনিময়ে এন্টিয়к পতনের পর অর্থসম্পদ ও নগরীর অভ্যন্তরে জায়গির লাভের দাবি জানালে বোহেমন্ড তার দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। (৩৪৬) এরপর বোহেমন্ড ক্রুসেডার সেনাপতিদের একত্র করে পুনরায় তাদের সামনে পরিস্থিতির নাজুকতা তুলে ধরেন। তিনি সকলের কাছ থেকে পুনরায় নিশ্চিন্ত হন যে, পতন ঘটার পর সকলে এন্টিয়কের কর্তৃত্ব তার হাতে তুলে দেবে। (৩৪৭) এরপর বোহেমন্ড হামলা শুরুর সময়ক্ষণ নির্ধারণ করেন।

স্টিভেন ও তার সঙ্গী ফরাসিরা চলে যাওয়ার একদিন পর ৩ জুন সকালে মুসলিম বেশধারী আর্মেনীয় খ্রিষ্টান ফিরোজ তার প্রহরাধীন চৌকিগুলোসহ আশেপাশের বিভিন্ন চৌকির দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। কোনো কোনো বর্ণনামতে এই ষড়যন্ত্রের ঘটনা যেন প্রকাশ না পায়, এ উদ্দেশ্যে সে তার এক ভাইকে হত্যা করে। নগরপ্রাচীরের কয়েকটি দ্বার উন্মুক্ত হতেই বিশাল ক্রুসেডার বাহিনী ভোরের প্রথম প্রহরে ঝড়ের গতিতে এন্টিয়কের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে থাকে। নগরীর অভ্যন্তরে অবস্থানরত আর্মেনীয়রাও দ্রুত ক্রুসেডারদের সঙ্গে মিলিত হয়। (৩৪৮) ইয়াগিসিয়ান ষড়যন্ত্রের বিষয়টি উপলব্ধি করতে সক্ষম হলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তিনি এবার একদল তুর্কিকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার মনস্থ করেন। কিন্তু এন্টিয়কের অধিবাসী আর্মেনীয়রা তাকে ঘিরে ফেলে হত্যা করে এবং তার কর্তিত মস্তক নিয়ে ক্রুসেডারদের কাছে পৌঁছায়। (৩৪৯) ইয়াগিসিয়ানের মৃত্যুতে মুসলিম সৈন্য ও সাধারণ জনগণের দৃঢ়তা ভেঙে পড়ে।

ভীতি ও আতঙ্কের এক বিশাল স্রোত এন্টিয়কের অভ্যন্তরে বয়ে যায়। দীর্ঘ অবরোধের পর ক্রুসেডাররা নগরীটি দখল করে নেয় এবং অগণিত নারী-পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে। প্রচুর নারী ও শিশুকে বন্দি করে দাসে পরিণত করা হয়। (৩৫০) এন্টিয়কের নগরপ্রাচীর ও চৌকিসমূহের শীর্ষদেশে নরম্যান সেনাপতি বোহেমন্ডের পতাকা উত্তোলন করা হয়।

এন্টিয়কের ভয়ংকর পতনে পুরো ইসলামি বিশ্ব প্রকম্পিত হয়ে ওঠে; কেঁপে ওঠে খ্রিষ্টান বিশ্বও!

এন্টিয়к অত্যন্ত সুরক্ষিত ও সুপ্রাচীন অনিন্দ্যসুন্দর এক নগরী। এন্টিয়কের আছে দীর্ঘ ইসলামি ও খ্রিষ্ট ইতিহাস। তা ছাড়া এই মর্মান্তিক পতনের ঘটনা ঘটেছে একটানা সাত মাসেরও অধিক সময়ের অবরোধের পর। অধিকন্তু পতনের পরই ঘটেছে হাজার হাজার মুসলমানের নির্মম হত্যাযজ্ঞ। (৩৫১)

মহামারি ছড়িয়ে নিজেরা সমূলে ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কায় ক্রুসেডাররা দ্রুত স্তূপীকৃত লাশগুলো মাটিচাপা দেয়। এরপর তারা দুর্গ ও চৌকিগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে এবং নগরীর ভেতরে-বাইরে পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। (৩৫২)

এদিকে মসুল অধিপতি কারবুগা এডেসা পতনের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে তার বাহিনী নিয়ে এডেসা থেকে এন্টিয়к অভিমুখে রওনা হন। পথিমধ্যে তিনি এন্টিয়к থেকে প্রায় ছয়শ পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে মার্জ-দাবিক এলাকায় যাত্রাবিরতি করেন এবং এন্টিয়к পুনরুদ্ধারের জন্য একটি বৃহৎ বাহিনী গঠনের লক্ষ্যে বিভিন্ন আমির ও প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। কারবুগার নেতৃত্বাধীন এই বাহিনীটি ছিল সেলজুক সুলতান ও তৎকালীন সবচেয়ে শক্তিশালী সেলজুক নেতা সুলতান বারকিয়ারুক কর্তৃক প্রেরিত। এ কারণে দামেশকের প্রশাসক দাক্কাক, সিনজারের প্রশাসক আরসালান তুতুশ, হিমসের প্রশাসক জানাহুদ্দৌলাসহ অনেক প্রশাসক কারবুগার আনুগত্য স্বীকার করে। তবে আলেপ্পোর প্রশাসক রিজওয়ান এমন বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান, যে বাহিনীতে তার সহোদর ও 'পরম শত্রু' দাক্কাক আছেন! (৩৫৩)

টিকাঃ
*84. Gesta Francorum, p. 69.
৩৪৬, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/১৬৮ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৩৪।
৩৪৭. Gesta Francorum, p. 100.
৩৪৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪১৭।
৩৪৯. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৩৪।
৩৫০. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা : ১৩৫।
৩৫১. ক্রুসেডারদের বিভিন্ন সূত্রগ্রন্থের বর্ণনা অনুসারে এন্টিয়কে ক্রুসেডাররা দশ হাজার মুসলমানকে হত্যা করে।
৩৫২. Michaud: op. cit. 1, 292.
০৫০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪১৮ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৫৬।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 সাহায্যকারী মুসলিম বাহিনীর এন্টিয়ক অবরোধের ব্যর্থ চেষ্টা

📄 সাহায্যকারী মুসলিম বাহিনীর এন্টিয়ক অবরোধের ব্যর্থ চেষ্টা


এভাবে কারবুগার উদ্যোগে বিরাট এক মুসলিম বাহিনী এন্টিয়কের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। এন্টিয়ক পতনের প্রায় ছয়দিন পর তারা এন্টিয়কে পৌঁছায়। কারবুগা নগরীর অভ্যন্তরে প্রবেশের চেষ্টা চালালেও সুরক্ষিত নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে ব্যর্থ হন। (৩৫৪) এরপর তিনি এন্টিয়к অবরোধ করেন।

এবার বিপরীত দৃশ্য! ক্রুসেডাররা এন্টিয়কের ভেতরে অবরুদ্ধ আর মুসলমানরা বাইরে অবরোধকারীর ভূমিকায়! ১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ৮ জুন এই অবরোধ শুরু হয়। (৩৫৫)

ক্রুসেডাররা এবার প্রকৃত দুর্ভোগের সম্মুখীন হয়। কারণ, পূর্বের সাত মাসের অধিক সময়ের অবরোধে এন্টিয়к বলতে গেলে সম্পূর্ণই খাদ্যশূন্য হয়ে পড়েছে। পূর্ব দিকে চলে আসায় ক্রুসেডাররা এবার অনুতাপ করতে থাকে। খাদ্যের অভাবে তারা ক্ষুধার চরম পর্যায়ে উপনীত হয় এবং মৃতদেহ ও গাছের পাতা খেতে বাধ্য হয়!(৩৫৬)

এই কঠিন ও দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে কী করবে ক্রুসেডার শক্তি? ক্রুসেডাররা এবার বাইজান্টাইন সম্রাটের কাছে সাহায্যপ্রার্থনার পরিকল্পনা করে। এরই নাম স্বার্থ! এরই নাম স্বার্থের রাজনীতি!

এখন ক্রুসেডারদের বাইজান্টাইন সম্রাটের সাহায্যগ্রহণ ব্যতীত কোনো গত্যন্তর নেই। সুতরাং আবারও চাটুকারিতা, তোষামোদ-খোশামোদ ও কপটতার পথ অবলম্বনে বাধা কীসের!

বাইজান্টাইন সম্রাট দেখতে পান যে, তার সামনে প্রিয় এন্টিয়к নগরীর কর্তৃত্ব লাভের এক পরম সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। তিনি নিজে এবার বিরাট এক বাহিনী নিয়ে এশিয়া মাইনর অতিক্রম করে এন্টিয়к অভিমুখে রওনা হন। কিন্তু পথে থাকতেই তিনি বিভিন্ন ইসলামি রাজ্যের সৈন্যদের সমন্বয়ে সেলজুকদের বিরাট সৈন্যসমাবেশের বিষয়ে জানতে পারেন। এতে সম্রাট নিজের ও বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার বিষয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি তাৎক্ষণিক মন্তব্য করেন, 'এন্টিয়к ও ক্রুসেডারদের নিরাপত্তারক্ষার চেয়ে আমার কাছে কনস্টান্টিনোপল ও বাইজান্টাইনদের নিরাপত্তারক্ষা হাজার গুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।' এরপর বাইজান্টাইন সম্রাট ১ম অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস কনস্টান্টিনোপলে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ক্রুসেডার বাহিনীর প্রতিনিধিগণ শত অনুনয়-বিনয় করেও তার সিদ্ধান্ত বদলাতে ব্যর্থ হয়। (৩৫৭)

আবারও প্রমাণিত হয় যে, ক্রুসেড অভিযান মোটেও ধর্মীয় কোনো ইস্যু ছিল না!
প্রত্যেক নেতা ও সেনাপতির চিন্তাজুড়ে ছিল নিজ নিজ ক্ষমতা ও সিংহাসন!
বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রত্যাবর্তনে ক্রুসেডারদের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে পড়ে। অবরোধ শুরু হওয়ার মাত্র চার দিন পরই ক্লান্ত-অবসন্ন ও ক্ষুধায় কাতর ক্রুসেডার সৈন্যরা নিজ নিজ প্রহরার স্থান ত্যাগ করতে শুরু করে এবং নগরীর অভ্যন্তরে বাড়িঘরে অবস্থান নিতে থাকে। এটি ছিল তাদের ওপর ছেয়ে বসা নিরাশা ও হতাশার সুস্পষ্ট প্রমাণ।

বোহেমন্ড যখন দেখতে পান যে, তার লালিত স্বপ্ন ধূলিসাৎ হতে যাচ্ছে এবং এত পরিশ্রম ও কষ্টের পর অর্জিত অনিন্দ্যসুন্দর নগরী এন্টিয়к তার হাত থেকে ছুটে যেতে বসেছে; বরং তার ও তার সৈন্যদের জীবনই ধ্বংস হতে যাচ্ছে, তখন তিনি বিস্ময়কর কঠোরতার সঙ্গে পরিস্থিতির মোকাবিলা করেন। তিনি নগরীর অভ্যন্তরের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিতে শুরু করেন, যেন সৈন্যরা বাধ্য হয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে নগরীর সম্মুখভাগে নিরাপত্তারক্ষায় ফিরে আসে। এটি ১২ জুনের ঘটনা। (৩৫৮)

বাস্তবেই বোহেমন্ড ছিলেন বড় বিস্ময়কর চরিত্রের এক নেতা!
তবে এ সবকিছুর পরও এন্টিয়কের আশেপাশে মুসলমানদের অবরোধ দৃঢ়তার সঙ্গে চলতে থাকে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল, কেবল বোহেমন্ডের বাহিনী নয়; পুরো ক্রুসেডার বাহিনীই নিশ্চিত ধ্বংসের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।

কিন্তু এরই মধ্যে মুসলিম বাহিনীর নিজেদের মধ্যে ঘটে এক দুঃখজনক বিভাজন! আবারও প্রমাণিত হয় সেই শাশ্বত বাস্তবতা- "আমাদের শত্রুরা আমাদের বিরুদ্ধে তাদের শক্তিবলে জয়লাভ করে না; জয়লাভ করে আমাদেরই দুর্বলতার কারণে।”

টিকাঃ
০৫৪. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৩৬।
**". Cam. Med. Hist. vol. 5,p. 292.
৩৫৬. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৩৭ ও Runciman, op. cit., 1, p. 238.
৩৫৭, Gesta Francorum, pp. 147-148.
. Guillaman: de tyr, 1, p. 255.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 মুসলিম শিবিরে দুঃখজনক বিভাজন

📄 মুসলিম শিবিরে দুঃখজনক বিভাজন


কারবুগা অনুভব করেন যে, মুসলিম বাহিনী আকারে বেশ বড় হলেও ক্রুসেডার বাহিনী তদাপেক্ষা বিশাল। আর তাই অবরোধ যদি দীর্ঘায়িত হয় আর ক্রুসেডাররা যুদ্ধের জন্য বেরিয়ে আসে, তাহলে পরিস্থিতি মুসলিম বাহিনীর প্রতিকূলে চলে যাবে। তাই কারবুগা চিন্তা করেন যে, মুসলিম বাহিনীকে শক্তিশালী করার সর্বোত্তম পথ হলো আলেপ্পোর প্রশাসক রিজওয়ানের সঙ্গে পুনরায় সমঝোতার চেষ্টা করে তার বাহিনীকেও মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করা। কারণ, আলেপ্পোর বাহিনীতে যেমন প্রচুর সৈন্য ছিল, তেমনই আলেপ্পোর প্রশাসক রিজওয়ান নিজেও ছিলেন খ্যাতিসম্পন্ন সামরিক দক্ষতার অধিকারী। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আলেপ্পো ছিল এন্টিয়কের অতি নিকটে অবস্থিত তুলনামূলক সমৃদ্ধ এক নগরী। ফলে মুসলিম বাহিনী সেখান থেকে অত্যাবশ্যকীয় রসদসামগ্রী, অস্ত্রশস্ত্র ও অবরোধসামগ্রী লাভ করতে পারবে।

এই ছিল কারবুগার পরিকল্পনা। নিঃসন্দেহে তার পরিকল্পনা ছিল সঠিক ও যথাযথ। কিন্তু তা সমকালীন মস্তিষ্কশূন্য নেতৃবৃন্দের জন্য উপযোগী ছিল না। তার এই পরিকল্পনার কথা জেনে দাক্কাক অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং তার প্রতি ক্রুদ্ধ হন। (৩৫৯) একে কেন্দ্র করে মুসলিম বাহিনীতে বিরোধ ও বিভক্তির ঘটনা ঘটে। দাক্কাক অবরোধ ত্যাগ করে দামেশকে ফিরে যাওয়ার মনোভাব প্রকাশ করেন। বিশেষত তিনি শামের দক্ষিণাঞ্চলে উবায়দিদের আগ্রাসনের আশঙ্কা করছিলেন। (৩৬০) দাক্কাকের এই সিদ্ধান্ত মুসলিম বাহিনীর মাঝে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।

এদিকে হিমসের প্রশাসক জানাহুদ্দৌলা হুসাইন বিন মালাইব রিজওয়ানের মিত্র এবং রাহবা (Al-Rahba) ও মানবিজ (Manbij) অঞ্চলের প্রশাসক ইউসুফ বিন আবাকের প্রতিশোধমূলক আচরণের আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে ওঠেন। জানাহুদ্দৌলা আশঙ্কা করছিলেন যে, মুসলিম বাহিনীতে তার উপস্থিতি রিজওয়ান ও তার মিত্রদের মাঝে বৈরিতা সৃষ্টি করতে পারে। জানাহুদ্দৌলার এই আশঙ্কা ও উত্তেজনা পুরো বাহিনীর আত্মবিশ্বাস ও মনোবলে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে।(৩৬১)

মুসলমানরা বিগত কয়েকদিন নিজেদের সাময়িক ঐক্যের ফল ভোগ করছিল; ক্রুসেডাররা এন্টিয়কের অভ্যন্তরে সংকীর্ণ হয়ে পড়েছিল এবং নিশ্চিত ধ্বংসের মুখে চলে গিয়েছিল। এখন যখন মুসলমানরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, তখন তো নিজেদের বিভেদ ও বিভক্তির দুর্ভোগ তারা ভোগ করবেই!

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَتُ وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ
এবং তোমরা সে সকল লোকের মতো হয়ো না, যারা তাদের নিকট সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলি আসার পরও পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং পরস্পরে মতভেদ সৃষ্টি করেছিল। এরূপ লোকদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। [সুরা আলে-ইমরান: ১০৫]

এরপর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে পড়ে এবং মুসলিম বাহিনীর মাঝে সাম্প্রদায়িক ফিতনার দুর্যোগ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। বাহিনীর তুর্কি ও আরব অংশের মধ্যে প্রচণ্ড বিরোধ শুরু হয়। তুর্কিদের নেতৃত্বে ছিলেন প্রধান সেনাপতি ও মসুলের অধিপতি কারবুগা আর আরবদের নেতৃত্বে ছিলেন ওয়াছাব বিন মাহমুদ আল-মিরদাসি নামক জনৈক আমির। দূর থেকে আলেপ্পোর আমির রিজওয়ান আরবদের বিরুদ্ধে তুর্কিদের উত্তেজিত করে একের পর এক বার্তা পাঠিয়ে ফিতনাকে আরও উসকে দেন। (৩৬২)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
«إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ قَدْ أَذْهَبَ عَنْكُمْ عُبِّيَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ وَفَخْرَهَا بِالْآبَاءِ، مُؤْمِنٌ تَقِيٌّ، وَفَاجِرُ شَقِيٌّ ، أَنْتُمْ بَنُوْ آدَمَ، وَآدَمُ مِنْ تُرَابٍ، لَيَدَعَنَّ رِجَالٌ فَخْرَهُمْ بِأَقْوَامٍ، إِنَّمَا هُمْ فَحْمٌ مِنْ فَحْمِ جَهَنَّمَ، أَوْ لَيَكُوْنُنَّ أَهْوَنَ عَلَى اللَّهِ مِنَ الْجِعْلَانِ الَّتِي تَدْفَعُ بِأَنْفِهَا النَّيْنَ»
আল্লাহ তাআলা তোমাদের থেকে জাহিলি-যুগের মিথ্যা অহংকার ও বাপ-দাদাদের নিয়ে দাম্ভিকতা প্রদর্শনের ব্যাধি বিদূরিত করেছেন। (মানুষ দু-ধরনের) মুমিন আল্লাহভীরু ও ফাসিক দুর্ভাগা। তোমরা সকলে আদম-সন্তান আর আদম মাটি দ্বারা সৃজিত হয়েছে। কাজেই মানুষের কর্তব্য—তারা যেন নিজেদের বংশ-গোত্র নিয়ে গৌরব করা পরিহার করে। তারা তো জাহান্নামের এক টুকরো কয়লা! কিংবা অবশ্যই তারা আল্লাহ তাআলার নিকট ওই গুবরে পোকার চেয়েও তুচ্ছ, যা তার নাসিকায় মল-ময়লা বহন করে। (৩৬৩)

এই ছিল এন্টিয়к অবরোধকারী মুসলিম বাহিনীর পরিস্থিতি!

আমরা আবারও এন্টিয়к নগরপ্রাচীরের অভ্যন্তরে ফিরে আসছি। বোহেমন্ড আপন একগুঁয়েমি ও গোয়ার্তুমি সত্ত্বেও অনুভব করেন যে, ক্রুসেডারদের পতন ঘনিয়ে আসছে। তাই অবরুদ্ধ হওয়ার উনিশ দিন পর ২৭ জুন তিনি মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি কারবুগার কাছে ধর্মযাজক পিটার ও আরেকজন ব্যক্তিকে দূত হিসেবে প্রেরণ করেন। দূতদ্বয়ের মাধ্যমে বোহেমন্ড প্রস্তাব দেন যে, অবরোধ প্রত্যাহার করে নিরাপদে চলে যাওয়ার সুযোগ করে দিলে ক্রুসেডার বাহিনী নিজ দেশে চলে যাবে। (৩৬৪) যদিও কারবুগার বাহিনীতে অনৈক্যের ভাঙন সৃষ্টি হয়েছিল; কিন্তু তিনি প্রথমত আশঙ্কা করেন যে, প্রস্তাব গ্রহণ করার পর বোহেমন্ড হয়তো প্রতারণা করবেন। আর তার মতো ধূর্ত লোকের কাছ থেকে প্রতারণাই ছিল প্রত্যাশিত আচরণ। দ্বিতীয়ত কারবুগা উপলব্ধি করেন যে, ক্রুসেডাররা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই তিনি তাদের প্রস্তাব মেনে নেওয়ার পরিবর্তে চূড়ান্ত যুদ্ধের মাধ্যমে তাদেরকে পুরোপুরি নিঃশেষ করে ফেলার মনস্থ করেন। সম্ভবত তিনি মুসলিম বাহিনীর নেতৃবৃন্দ ও সৈন্যদের ওপর ছেয়ে বসা দুর্বলতার পরিমাণ আন্দাজ করতে পারেননি। সবমিলিয়ে তিনি দূতদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে বোহেমন্ডের সামনে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যতিরেকে অন্য সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। আর যুদ্ধও শুরু করতে হবে অতি দ্রুত, ক্ষুধার তাড়নায় ক্রুসেডার বাহিনী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পূর্বেই।

বোহেমন্ড নিজ বাহিনীর প্রতি দৃষ্টি বোলান। তিনি দেখতে পান যে, তাদের মানসিক শক্তি একেবারেই নিম্নমুখী। বোহেমন্ড এবার ক্রুসেডার সৈন্যদের মনোবল ও আত্মবিশ্বাস উন্নত করার এবং তাদের অন্তরে আসন্ন যুদ্ধে সুনিশ্চিত বিজয়ের বিশ্বাস ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এক অভিনব কৌশল অবলম্বনের মনস্থ করেন।

কী সেই কৌশল?!
তিনি পিটার বার্থোলোমিউ (Peter Bartholomew) নামক মার্সেই-এর জনৈক পাদরির মাধ্যমে ক্রুসেডারদের মাঝে প্রচার করেন যে, যিশুশিষ্য সেন্ট আন্দ্রে (Andrew the Apostle) তিনবার স্বপ্নযোগে তার কাছে আগমন করেছেন এবং তাকে এন্টিয়কের সেন্ট পিটার চার্চের (The Church of Saint Peter) একটি স্থান দেখিয়ে দিয়ে জানিয়েছেন যে, এখানেই যিশুখ্রিষ্টকে হত্যার সময় ব্যবহৃত বর্শাটি (The Holy Lance) মাটিচাপা দেওয়া আছে। যদি তারা উক্ত স্থানের মাটি খুঁড়ে বর্শাটি বের করে আনে এবং যুদ্ধের সময় তা ক্রুসেডার বাহিনীর সামনে রাখে, তাহলে অবশ্যই এই বাহিনী জয়লাভ করবে!

এরপর বোহেমন্ড উক্ত পাদরি ও আরও কয়েকজন সন্ন্যাসীকে তথাকথিত স্থানটি খনন করে বর্শাটি অনুসন্ধান করার নির্দেশ দেন। তারা উদ্দিষ্ট স্থানটি খনন করে বর্শা বের করে আনে। সকলে সমস্বরে বলে ওঠে—'এ তো অলৌকিক বিষয়; নিশ্চয়ই এই বাহিনী বিজয় লাভ করবে'! (৩৬৫)

স্বভাবতই এ ঘটনা ছিল সৈন্যদের উদ্দীপ্ত করার জন্য সম্পূর্ণই বোহেমন্ড ও তার অনুসারীদের সাজানো নাটক। ব্যাপকভাবে ঐতিহাসিকগণ বোহেমন্ডের এই দাবির সত্যতা স্বীকার করেননি। আর এতে বিস্ময়েরও কিছু নেই। যারা এই নাটক সাজিয়েছিল, তারা তো পাদরি ও যাজক সম্প্রদায়; তারাই তো নিজ হাতে বিধান রচনা করে দাবি করে যে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে! আমরা আমাদের আকিদা ও ধর্মবিশ্বাস অনুসারে এ বিষয়ে সুনিশ্চিত বিশ্বাসী যে, বর্শা, বর্শা-দাফন ও সমাধিস্থ বর্শা আবিষ্কারের সত্যতা তো বহু দূরের বিষয়, হজরত ঈসা আ. নিহতই হননি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ
তারা তাকে হত্যা করেনি এবং শূলে চড়াতে পারেনি; বরং তাদের বিভ্রম হয়েছিল। [সুরা নিসা: ১৫৭]

নিঃসন্দেহে এই বর্শা-নাটক ছিল ক্রুসেডার যোদ্ধাদের মনোবল উন্নত করার জন্য একটি সাজানো ঘটনা। আর তাদের উদ্দেশ্য সফলও হয়েছিল। বর্শা-কাহিনি মঞ্চস্থ হওয়ার পর অনেক সৈন্যের মনোবল ফিরে আসে এবং তারা পরের দিনই মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

টিকাঃ
৩০৫৯. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৩৬।
৩৬০. Runciman, op. cit., 1, p. 249.
৩৬১. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৩৬।
৩৬২, প্রাগুক্ত, ২/১৩৬।
৩৬০. ইমাম আবু দাউদ, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৫১১৬, ইমাম আহমাদ, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৮৭২১ ও বায়হাকি, আস-সুনানুল কুবরা, হাদিস নং ২০৮৫১।
৩৬৪. Chalandon: Premiere Croisade, p. 220.
৩৬৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৫-১৬, যাবুরাফ, আস-সালিবিয়ুন ফিশ-শারকু, পৃষ্ঠা: ৯৩-১০৭। Raymond d' Aguiler, in Peters (ed.), The First Crusades, pp. 166-168, 174-175, 178-185, 189-194.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 নিকৃষ্টতর পরাজয়!

📄 নিকৃষ্টতর পরাজয়!


পরের দিন ২৮ জুন সকালে ক্রুসেডাররা যুদ্ধের জন্য এন্টিয়ক নগরী হতে বের হতে শুরু করে। মুসলিম সৈন্যগণ কারবুগাকে সকল ক্রুসেডার সৈন্য বের হওয়ার পূর্বেই যুদ্ধ শুরু করার পরামর্শ দেয়। কারণ, তারা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বের হচ্ছিল। কিন্তু কারবুগা এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সব ক্রুসেডার সৈন্য বের হওয়ার পর যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। কতিপয় ঐতিহাসিকের মতে এর মাধ্যমে কারবুগা এক সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করেন। কারণ, তাদেরকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পরাস্ত করা সহজ ছিল। তবে সম্ভবত কারবুগা চেয়েছিলেন যে, ক্রুসেডাররা সকলে বের হয়ে আসুক, যেন নগরীর অভ্যন্তরে সুরক্ষিত অবস্থায় একজনও বাকি না থাকে। তিনি আশঙ্কা করছিলেন যে, তিনি যদি বের হওয়া ক্ষুদ্র দলগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন, তাহলে হয়তো বাকিরা আর বের হবে না। (৩৬৬) এতে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, কারবুগা আত্মবিশ্বাস ও নিজ বাহিনীর সংখ্যাধিক্যের গৌরবে প্রবঞ্চিত ছিলেন। দীর্ঘ অবরোধের পর ক্রুসেডার বাহিনীর দুর্ভোগ ও দুরবস্থা এবং তার কাছে অবরোধ তুলে নেওয়ার আবেদন ইত্যাদি বিষয়ও তাকে বিভ্রান্ত করেছিল।

কারবুগা ক্রুসেডারদের সবাইকে বের হওয়ার সুযোগ দেন। ক্রুসেডার বাহিনীর সকল সৈন্য বের হয়ে নিজ নিজ সেনাপতির অধীনে সারি বিন্যস্ত করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। ৪র্থ রেমন্ড সকলের সামনে তথাকথিত পবিত্র বর্শাটি নিয়ে অবস্থান গ্রহণ করেন।

এন্টিয়к নগরপ্রাচীরের সামনে প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। শুরুতে জয়ের পাল্লা মুসলমানদের দিকে হেলে ছিল। কিন্তু উভয় পক্ষের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে ছিল বিরাট পার্থক্য। ক্রুসেডাররা যুদ্ধ করছিল নিজেদের জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নির্ধারণের জন্য আর মুসলমানরা যুদ্ধ করছিল নিজেদের ভূখণ্ড ও ধনসম্পদ রক্ষা করার জন্য। ভূখণ্ড ও সম্পদ রক্ষার লক্ষ্যে যারা যুদ্ধ করে, তারা কখনো মরতে চায় না। বিজয়ের প্রত্যাশী মুসলিম বাহিনীর জন্য এ জাতীয় লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কখনোই উপযোগী নয়। বদর যুদ্ধের আগের রাতে নবীজি যখন সাহাবায়ে কেরামকে পরের দিন ভোরে যুদ্ধ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করছিলেন, তখন কত মর্যাদাপূর্ণ এক উক্তি করেছিলেন! নবীজি তাদেরকে বলেছিলেন—
وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَا يُقَاتِلُهُمُ الْيَوْمَ رَجُلٌ فَيُقْتَلُ صَابِرًا مُحْتَسِبًا مُقْبِلًا غَيْرَ مُدْبِرٍ إِلَّا أَدْخَلَهُ اللَّهُ الْجَنَّةَ»
ওই মহান সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মাদের জীবন! আজ যে ব্যক্তিই সাওয়াবের আশায় সবরের সঙ্গে (পিছু না হটে) সম্মুখপানে অগ্রসর হয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে এবং শাহাদাত বরণ করবে, আল্লাহ পাক তাকে জান্নাত দান করবেন। (৩৬৭)

এই পরিস্থিতিতে নবীজি তাদেরকে জীবনরক্ষার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেননি, তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছেন আল্লাহর রাস্তায় জীবন উৎসর্গ করার প্রতি। নবীজি শত্রুপক্ষের সম্পদ বা ভূখণ্ডের প্রতি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেননি; যদিও তা হোক চির সম্মানিত মক্কা ভূমি। বরং নবীজি জান্নাত অর্জনের প্রতি সাহাবায়ে কেরামের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বদরের রাতে নবীজির কর্মপন্থা আর ১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ঘটনার মাঝে কত পার্থক্য!

আর তাই কিছুক্ষণ পরই মুসলিম বাহিনীর নেতৃবৃন্দ প্রবলভাবে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে এবং প্রত্যেকে নিজেকে ও নিজ সৈন্যদের লড়াই থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে। সবার আগে পলায়ন করে তুর্কমেনরা, যাদের মাঝে দামেশকের আমির দাক্কাকও ছিলেন। কিছুক্ষণ অবিচলতার সঙ্গে যুদ্ধ করার পর জানাহুদ্দৌলাও পলায়নের পথ ধরেন। সবশেষে সেনাপতি কারবুগাও পলায়ন করেন। (৩৬৮) মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করে। ক্রুসেডার বাহিনীর সেনাপতিগণ আপন আপন সৈন্যদের যুদ্ধলব্ধ সম্পদের প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে পলায়নরত মুসলিম সৈন্যদের পশ্চাদ্ধাবনের নির্দেশ দেয়। ক্রুসেডার সৈন্যরা এন্টিয়к হতে পূর্ব দিকে তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হারিম দুর্গ পর্যন্ত মুসলিম সৈন্যদের তাড়া করে। (৩৬১) ক্রুসেডারদের আক্রমণে প্রচুর মুসলিম সৈন্য নিহত হয়। এরপর ক্রুসেডাররা ফিরে এসে পড়ে থাকা গণনাতীত পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, রসদসামগ্রী ও অস্ত্রশস্ত্র কুড়িয়ে নেয়। কারবুগা পালিয়ে মসুলে চলে যান, দাক্কাক চলে যান দামেশকে।

নিঃসন্দেহে এটি ছিল মুসলিম বাহিনীর কঠিন ও দুঃখজনক এক পরিণতি! কত মিল এই ব্যর্থ সৈন্যসমাবেশ ও ফিলিস্তিনে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে (১০৬৭ হিজরি সনে) ইহুদিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আরবদের সৈন্যসমাবেশে! এন্টিয়কের ন্যায় সেদিনও মুসলিম সৈন্যরা আল্লাহর জন্য বের হয়নি, আল্লাহর দ্বীনকে বুলন্দ করার জন্য বের হয়নি। তারা কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত ছিল না। তারা বের হয়েছিল চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য, ক্ষণস্থায়ী রাজত্বকে রক্ষার জন্য অথবা একখণ্ড ভূমি লাভ করার জন্য। যাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও চিন্তাজগৎজুড়ে এসব বিষয় কার্যকর থাকে, তাদের কপালে কখনো বিজয় জোটে না।

নিঃসন্দেহে ইতিহাসের পরতে পরতে আমাদের জন্য নিহিত আছে উপদেশ ও শিক্ষা!

টিকাঃ
৩৬৬. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৩৭।
৩৬৭. ইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/৬২৭, ইবনু সায়্যিদিন-নাস, উয়ূনুল আছার, ১/৩৩৮, ইবনে কাছির, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ২/৪২০ ও সুহায়লি, আর-রাওযুল উনিফ, ৩/৭১।
৩৬৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৬।
"Gesta Francorum, p. 159.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00