📄 সহায়তাকারী বাহিনীর পরাজয়
এন্টিয়к অবরোধের সময় আলেপ্পোর প্রশাসক রিজওয়ান বিন তুতুশের অবস্থান ও ভূমিকা কী ছিল?!
তার অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও ইয়াগিসিয়ানের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল; কিন্তু তিনি মনে করতেন যে, এন্টিয়к তার নিজস্ব সম্পত্তি, (৩৩৩) যা ইয়াগিসিয়ান জবরদখল করে রেখেছেন। তাই তার বিবেচনায় ক্রুসেডারদের অবরোধ প্রচেষ্টা ছিল তার নিজের সম্পদই ক্রুসেডারদের জবরদখল করার অপচেষ্টা। তা ছাড়া ক্রুসেডারদের অবস্থান তখন আলেপ্পোর খুবই নিকটে। এন্টিয়কের পতন ঘটাতে পারলে তারা নিশ্চিতভাবেই আলেপ্পো অভিমুখে অগ্রসর হবে। আর তাই ইয়াগিসিয়ান যখন দাক্কাক ও অন্যদের কাছ থেকে নিরাশ হয়ে রিজওয়ানের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করেন, তখন রিজওয়ান এ সুযোগকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং ক্রুসেডারদের মোকাবিলা করার জন্য দ্রুত সৈন্যসমাবেশ ঘটান। অভিযানে তার সঙ্গে হামার প্রশাসক ও দিয়ারে বকর অঞ্চলের কিছু সৈন্যও যোগ দেয়। (৩৩৪) সকলে মিলে এন্টিয়к হতে ত্রিশ কিলোমিটার দূরে হারিম এলাকায় সমবেত হয়।
প্রকৃত বাস্তবতা হলো, তারা ইসলাম ও ইসলামি ভূখণ্ডের হেফাজত কিংবা মুসলমানদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার উদ্দেশ্যে বের হয়নি!
তারা বের হয়েছে নিজ নিজ ভূখণ্ড রক্ষার জন্য কিংবা চোখে ধূলো দেওয়ার জন্য! স্বভাবতই এ জাতীয় বাহিনী আল্লাহ তাআলার নুসরত ও সাহায্য লাভ করে না!
রিজওয়ান ও ইয়াগিসিয়ানের মধ্যে চুক্তি হয় যে, উভয়ে একই সময়ে একযোগে হারিম ও এন্টিয়к থেকে ক্রুসেডারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। এর ফলে পূর্ব ও পশ্চিম দু-দিক থেকে ক্রুসেডাররা দুই দলের মাঝে ফাঁদে আটকা পড়বে। (৩৩৫)
পরিকল্পনা ছিল খুবই সুদৃঢ়; কিন্তু পরিকল্পনাকারীদের দেহ-মন যে অসুস্থ ও জরাগ্রস্ত!
আলেপ্পোর খ্রিষ্টানদের মাধ্যমে এই পরিকল্পনার সংবাদ ক্রুসেড শিবিরে পৌঁছে যায়। (৩৩৬) তখন বোহেমন্ড মূল ক্রুসেডার বাহিনীকে এন্টিয়к অবরোধে ব্যস্ত রেখে নিজে মাত্র সাতশ অশ্বারোহী সৈন্যের একটি ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে বের হয়ে আসেন। এরপর তিনি এই ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়েই এন্টিয়к হতে পূর্ব দিকে অবস্থিত আমিক হ্রদের (Lake Amik/the Lake of Antioch) কাছে আলেপ্পো, হামা ও দিয়ারে বকরের সম্মিলিত বাহিনীর মুখোমুখি হন। (৩৩৭) অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, প্রতিপক্ষের তুলনায় সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্ত্বেও রিজওয়ানের বাহিনী প্রতিপক্ষের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়। সাতশ সৈন্যের ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়েই বোহেমন্ড দ্রুত পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। রিজওয়ানের বাহিনীর সৈন্যরা তখন পালাতে শুরু করে। (৩৩৮) ক্রুসেডারদের আক্রমণে প্রচুর মুসলিম সৈন্য নিহত হয়। বোহেমন্ড তাদের মস্তক বিচ্ছিন্ন করে বর্শার শীর্ষদেশে গেঁথে নিয়ে দ্রুত এন্টিয়কে ফিরে আসেন।
এদিকে বোহেমন্ড যখন রিজওয়ানের বাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য এন্টিয়к থেকে দূরে সরে পড়েছিলেন, ইয়াগিসিয়ান তখন ক্রুসেডারদের ওপর হামলা করার লক্ষ্যে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু আক্ষেপ ও পরিতাপের বিষয় — তিনিও পরাজিত হয়ে দ্রুত নিজ দুর্গে ঢুকে পড়েন। এরপর বোহেমন্ড ফিরে এসে কর্তিত মস্তকগুলো এন্টিয়কের নগরপ্রাচীরের অভ্যন্তরে নিক্ষেপ করেন। এটি ছিল তার পক্ষ থেকে ইয়াগিসিয়ান ও এন্টিয়кবাসী মুসলমানদের প্রতি হুমকি-বার্তা। (৩৩৯)
এন্টিয়কের অবরোধ চলতে থাকে। মুসলমানদের ওপর চাপ আরও বৃদ্ধি করতে এন্টিয়কের প্রাচীরে গোলা নিক্ষেপে ব্যবহার করার জন্য এবং মুসলমানদের নিক্ষিপ্ত তির থেকে আত্মরক্ষার জন্য ক্রুসেডাররা এবার নগরপ্রাচীরের নিকটবর্তী একটি টিলার ওপর দুর্গ নির্মাণ শুরু করে। (৩৪০)
দুর্গ নির্মাণ চলাকালে ১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ৪ মার্চ প্রচুর পরিমাণ রসদসামগ্রী, অস্ত্রশস্ত্র ও অবরোধসামগ্রী নিয়ে ইংল্যান্ড থেকে আগত একটি নৌবহর সেন্ট সাইমন বন্দরে এসে পৌঁছায়। এর ফলে ক্রুসেডারদের মনোবল আরও বৃদ্ধি পায়। এর কদিন পরই ১৯ মার্চ দুর্গ নির্মাণ সমাপ্ত হয়। ফলে অবরোধ আরও মজবুত ও কঠিন রূপ ধারণ করে। (৩৪১)
ইয়াগিসিয়ান আবারও পারসিক সেলজুক সাম্রাজ্যের সুলতান বারকিয়ারুক ও তার অধীনস্থ মসুলের প্রশাসক কারবুগার কাছে সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন। (৩৪২) ইয়াগিসিয়ানের আবেদনে সাড়া দিয়ে কারবুগা এবার বিশাল এক বাহিনী প্রস্তুত করেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তিনি এন্টিয়к অভিমুখে আগমনের পূর্বে এডেসা অবরোধ করে সেখানে প্রতিষ্ঠিত ক্রুসেড রাজ্যের পতন ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেন। কারবুগার এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণ হলো, ধূর্ত ক্রুসেডার সেনাপতি বল্ডউইনের প্রতিষ্ঠিত ক্রুসেড রাজ্য এডেসা ছিল মসুলের বেশ কাছে। কারবুগা আশঙ্কা করছিলেন যে, তিনি যদি তার বাহিনী নিয়ে মসুল থেকে সাতশ কিলোমিটারের অধিক দূরে এন্টিয়কে গমন করেন, তাহলে বল্ডউইন হয়তো সামরিক শক্তিশূন্য মসুলে হামলা চালাবেন। তাই এন্টিয়কে গমনের পূর্বেই এডেসার দফারফা করা তার দৃষ্টিতে জরুরি ছিল। বাস্তবতা যাই হোক, কারবুগার এই সিদ্ধান্তের কারণে অতি মূল্যবান কয়েক সপ্তাহ সময় নষ্ট হয়ে যায়। এডেসার পতন ঘটানোর ব্যর্থ চেষ্টা শেষে অবশেষে তিনি মে মাসের শেষ দিকে এন্টিয়к অভিমুখে রওনা হন। (৩৪৩)
কারবুগার এন্টিয়к অভিমুখে আগমনের সংবাদে ক্রুসেড শিবিরে ব্যাপক ভীতি সৃষ্টি হয়। কারণ, তারা জানতে পারে যে, কারবুগা বেশ বড় এক বাহিনী নিয়ে আগমন করছেন। এদিকে দীর্ঘ অবরোধের কারণে ক্রুসেডার বাহিনী তখন অনেকটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সাত মাসেরও অধিক সময় ধরে তারা এন্টিয়কের নগরপ্রাচীরের বাইরে শিবির স্থাপন করে আছে। এই দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্যেই ২ জুন ব্লয়েসের কাউন্ট স্টিভেন এন্টিয়к জয়ের বিষয়ে নিরাশ হয়ে ময়দান ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফরাসি সৈন্যদের বড় একটি অংশ সঙ্গে নিয়ে ফ্রান্সে ফিরে যাওয়ার লক্ষ্যে তিনি ইসকানদারুন (İskenderun) বন্দর অভিমুখে রওনা হন। (৩৪৪) ফলে আবারও উভয় পক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকেই পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল ও সংকটপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
টিকাঃ
*Guillaman: de tyr, 1, p.194.
** Chalandon: Premiere Croisade, pp. 195.
৩০৮. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১২৯ ও Guillaman de tyr 1. p. 196.
* Gesta Francorum, pp. 80-86.
980. Cam. Med. Hist. Vol. 5,p. 291.
৩৪১. Guillaman: de tyr, 1, p. 198.
৩৪২. Michaud: op. cit. 1, pp. 264-267.
৩৪৩. উইলিয়াম সুরি, তারীখুল আ'মালিল মুনজিযাহ ফী-মা ওয়ারাআল বিহার, ১/৩১৮-১৯ ও রানচিমান, তারীখুল হুরূবিস সালীবিয়্যাহ, ১/৩৪৬।
*88. Runciman, op. cit., 1, p. 234.
📄 এন্টিয়কের পতন
এরপর হঠাৎ করেই পটপরিবর্তন ঘটে। মুসলিম শিবিরে আঘাত হানে বিশ্বাসঘাতকতার দুষ্ট ব্যাধি। এন্টিয়কের অধিবাসী আর্মেনীয় বংশোদ্ভূত ফিরোজ নামক জনৈক ব্যক্তি নিজেকে মুসলমান হিসেবে পরিচয় দিত। সে গোপনে ক্রুসেড শিবিরে অবস্থানরত আর্মেনীয়দের সঙ্গে পত্রবিনিময় করতে থাকে। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, এন্টিয়কের অধিবাসী অনেক আর্মেনীয় নাগরিক অবরোধের শুরুতেই এন্টিয়к থেকে বের হয়ে ক্রুসেড শিবিরে যোগ দিয়েছিল। (৩৪৫) ফিরোজ ইয়াগিসিয়ানের অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিল। ইয়াগিসিয়ান তাকে এন্টিয়কের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি চৌকির প্রহরার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সে আর্মেনীয়দের জানায় যে, তার এমন কিছু গোপন তথ্য জানা আছে, যার মাধ্যমে সহজেই এন্টিয়কের দুর্গসমূহ জয় করা যাবে। এ সংবাদ ব্যক্তিগতভাবে বোহেমন্ডের কাছে পৌঁছানো হয়। বোহেমন্ড অন্যান্য ক্রুসেডার সেনাপতির কাছে সবকিছু গোপন রাখেন এবং নিজে ফিরোজের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আর্মেনীয় ফিরোজ তথ্যপ্রদানের বিনিময়ে এন্টিয়к পতনের পর অর্থসম্পদ ও নগরীর অভ্যন্তরে জায়গির লাভের দাবি জানালে বোহেমন্ড তার দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। (৩৪৬) এরপর বোহেমন্ড ক্রুসেডার সেনাপতিদের একত্র করে পুনরায় তাদের সামনে পরিস্থিতির নাজুকতা তুলে ধরেন। তিনি সকলের কাছ থেকে পুনরায় নিশ্চিন্ত হন যে, পতন ঘটার পর সকলে এন্টিয়কের কর্তৃত্ব তার হাতে তুলে দেবে। (৩৪৭) এরপর বোহেমন্ড হামলা শুরুর সময়ক্ষণ নির্ধারণ করেন।
স্টিভেন ও তার সঙ্গী ফরাসিরা চলে যাওয়ার একদিন পর ৩ জুন সকালে মুসলিম বেশধারী আর্মেনীয় খ্রিষ্টান ফিরোজ তার প্রহরাধীন চৌকিগুলোসহ আশেপাশের বিভিন্ন চৌকির দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। কোনো কোনো বর্ণনামতে এই ষড়যন্ত্রের ঘটনা যেন প্রকাশ না পায়, এ উদ্দেশ্যে সে তার এক ভাইকে হত্যা করে। নগরপ্রাচীরের কয়েকটি দ্বার উন্মুক্ত হতেই বিশাল ক্রুসেডার বাহিনী ভোরের প্রথম প্রহরে ঝড়ের গতিতে এন্টিয়কের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে থাকে। নগরীর অভ্যন্তরে অবস্থানরত আর্মেনীয়রাও দ্রুত ক্রুসেডারদের সঙ্গে মিলিত হয়। (৩৪৮) ইয়াগিসিয়ান ষড়যন্ত্রের বিষয়টি উপলব্ধি করতে সক্ষম হলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তিনি এবার একদল তুর্কিকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার মনস্থ করেন। কিন্তু এন্টিয়কের অধিবাসী আর্মেনীয়রা তাকে ঘিরে ফেলে হত্যা করে এবং তার কর্তিত মস্তক নিয়ে ক্রুসেডারদের কাছে পৌঁছায়। (৩৪৯) ইয়াগিসিয়ানের মৃত্যুতে মুসলিম সৈন্য ও সাধারণ জনগণের দৃঢ়তা ভেঙে পড়ে।
ভীতি ও আতঙ্কের এক বিশাল স্রোত এন্টিয়কের অভ্যন্তরে বয়ে যায়। দীর্ঘ অবরোধের পর ক্রুসেডাররা নগরীটি দখল করে নেয় এবং অগণিত নারী-পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে। প্রচুর নারী ও শিশুকে বন্দি করে দাসে পরিণত করা হয়। (৩৫০) এন্টিয়কের নগরপ্রাচীর ও চৌকিসমূহের শীর্ষদেশে নরম্যান সেনাপতি বোহেমন্ডের পতাকা উত্তোলন করা হয়।
এন্টিয়কের ভয়ংকর পতনে পুরো ইসলামি বিশ্ব প্রকম্পিত হয়ে ওঠে; কেঁপে ওঠে খ্রিষ্টান বিশ্বও!
এন্টিয়к অত্যন্ত সুরক্ষিত ও সুপ্রাচীন অনিন্দ্যসুন্দর এক নগরী। এন্টিয়কের আছে দীর্ঘ ইসলামি ও খ্রিষ্ট ইতিহাস। তা ছাড়া এই মর্মান্তিক পতনের ঘটনা ঘটেছে একটানা সাত মাসেরও অধিক সময়ের অবরোধের পর। অধিকন্তু পতনের পরই ঘটেছে হাজার হাজার মুসলমানের নির্মম হত্যাযজ্ঞ। (৩৫১)
মহামারি ছড়িয়ে নিজেরা সমূলে ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কায় ক্রুসেডাররা দ্রুত স্তূপীকৃত লাশগুলো মাটিচাপা দেয়। এরপর তারা দুর্গ ও চৌকিগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে এবং নগরীর ভেতরে-বাইরে পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। (৩৫২)
এদিকে মসুল অধিপতি কারবুগা এডেসা পতনের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে তার বাহিনী নিয়ে এডেসা থেকে এন্টিয়к অভিমুখে রওনা হন। পথিমধ্যে তিনি এন্টিয়к থেকে প্রায় ছয়শ পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে মার্জ-দাবিক এলাকায় যাত্রাবিরতি করেন এবং এন্টিয়к পুনরুদ্ধারের জন্য একটি বৃহৎ বাহিনী গঠনের লক্ষ্যে বিভিন্ন আমির ও প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। কারবুগার নেতৃত্বাধীন এই বাহিনীটি ছিল সেলজুক সুলতান ও তৎকালীন সবচেয়ে শক্তিশালী সেলজুক নেতা সুলতান বারকিয়ারুক কর্তৃক প্রেরিত। এ কারণে দামেশকের প্রশাসক দাক্কাক, সিনজারের প্রশাসক আরসালান তুতুশ, হিমসের প্রশাসক জানাহুদ্দৌলাসহ অনেক প্রশাসক কারবুগার আনুগত্য স্বীকার করে। তবে আলেপ্পোর প্রশাসক রিজওয়ান এমন বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান, যে বাহিনীতে তার সহোদর ও 'পরম শত্রু' দাক্কাক আছেন! (৩৫৩)
টিকাঃ
*84. Gesta Francorum, p. 69.
৩৪৬, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/১৬৮ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৩৪।
৩৪৭. Gesta Francorum, p. 100.
৩৪৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪১৭।
৩৪৯. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৩৪।
৩৫০. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা : ১৩৫।
৩৫১. ক্রুসেডারদের বিভিন্ন সূত্রগ্রন্থের বর্ণনা অনুসারে এন্টিয়কে ক্রুসেডাররা দশ হাজার মুসলমানকে হত্যা করে।
৩৫২. Michaud: op. cit. 1, 292.
০৫০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪১৮ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৫৬।
📄 সাহায্যকারী মুসলিম বাহিনীর এন্টিয়ক অবরোধের ব্যর্থ চেষ্টা
এভাবে কারবুগার উদ্যোগে বিরাট এক মুসলিম বাহিনী এন্টিয়কের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। এন্টিয়ক পতনের প্রায় ছয়দিন পর তারা এন্টিয়কে পৌঁছায়। কারবুগা নগরীর অভ্যন্তরে প্রবেশের চেষ্টা চালালেও সুরক্ষিত নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে ব্যর্থ হন। (৩৫৪) এরপর তিনি এন্টিয়к অবরোধ করেন।
এবার বিপরীত দৃশ্য! ক্রুসেডাররা এন্টিয়কের ভেতরে অবরুদ্ধ আর মুসলমানরা বাইরে অবরোধকারীর ভূমিকায়! ১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ৮ জুন এই অবরোধ শুরু হয়। (৩৫৫)
ক্রুসেডাররা এবার প্রকৃত দুর্ভোগের সম্মুখীন হয়। কারণ, পূর্বের সাত মাসের অধিক সময়ের অবরোধে এন্টিয়к বলতে গেলে সম্পূর্ণই খাদ্যশূন্য হয়ে পড়েছে। পূর্ব দিকে চলে আসায় ক্রুসেডাররা এবার অনুতাপ করতে থাকে। খাদ্যের অভাবে তারা ক্ষুধার চরম পর্যায়ে উপনীত হয় এবং মৃতদেহ ও গাছের পাতা খেতে বাধ্য হয়!(৩৫৬)
এই কঠিন ও দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে কী করবে ক্রুসেডার শক্তি? ক্রুসেডাররা এবার বাইজান্টাইন সম্রাটের কাছে সাহায্যপ্রার্থনার পরিকল্পনা করে। এরই নাম স্বার্থ! এরই নাম স্বার্থের রাজনীতি!
এখন ক্রুসেডারদের বাইজান্টাইন সম্রাটের সাহায্যগ্রহণ ব্যতীত কোনো গত্যন্তর নেই। সুতরাং আবারও চাটুকারিতা, তোষামোদ-খোশামোদ ও কপটতার পথ অবলম্বনে বাধা কীসের!
বাইজান্টাইন সম্রাট দেখতে পান যে, তার সামনে প্রিয় এন্টিয়к নগরীর কর্তৃত্ব লাভের এক পরম সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। তিনি নিজে এবার বিরাট এক বাহিনী নিয়ে এশিয়া মাইনর অতিক্রম করে এন্টিয়к অভিমুখে রওনা হন। কিন্তু পথে থাকতেই তিনি বিভিন্ন ইসলামি রাজ্যের সৈন্যদের সমন্বয়ে সেলজুকদের বিরাট সৈন্যসমাবেশের বিষয়ে জানতে পারেন। এতে সম্রাট নিজের ও বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার বিষয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি তাৎক্ষণিক মন্তব্য করেন, 'এন্টিয়к ও ক্রুসেডারদের নিরাপত্তারক্ষার চেয়ে আমার কাছে কনস্টান্টিনোপল ও বাইজান্টাইনদের নিরাপত্তারক্ষা হাজার গুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।' এরপর বাইজান্টাইন সম্রাট ১ম অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস কনস্টান্টিনোপলে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ক্রুসেডার বাহিনীর প্রতিনিধিগণ শত অনুনয়-বিনয় করেও তার সিদ্ধান্ত বদলাতে ব্যর্থ হয়। (৩৫৭)
আবারও প্রমাণিত হয় যে, ক্রুসেড অভিযান মোটেও ধর্মীয় কোনো ইস্যু ছিল না!
প্রত্যেক নেতা ও সেনাপতির চিন্তাজুড়ে ছিল নিজ নিজ ক্ষমতা ও সিংহাসন!
বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রত্যাবর্তনে ক্রুসেডারদের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে পড়ে। অবরোধ শুরু হওয়ার মাত্র চার দিন পরই ক্লান্ত-অবসন্ন ও ক্ষুধায় কাতর ক্রুসেডার সৈন্যরা নিজ নিজ প্রহরার স্থান ত্যাগ করতে শুরু করে এবং নগরীর অভ্যন্তরে বাড়িঘরে অবস্থান নিতে থাকে। এটি ছিল তাদের ওপর ছেয়ে বসা নিরাশা ও হতাশার সুস্পষ্ট প্রমাণ।
বোহেমন্ড যখন দেখতে পান যে, তার লালিত স্বপ্ন ধূলিসাৎ হতে যাচ্ছে এবং এত পরিশ্রম ও কষ্টের পর অর্জিত অনিন্দ্যসুন্দর নগরী এন্টিয়к তার হাত থেকে ছুটে যেতে বসেছে; বরং তার ও তার সৈন্যদের জীবনই ধ্বংস হতে যাচ্ছে, তখন তিনি বিস্ময়কর কঠোরতার সঙ্গে পরিস্থিতির মোকাবিলা করেন। তিনি নগরীর অভ্যন্তরের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিতে শুরু করেন, যেন সৈন্যরা বাধ্য হয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে নগরীর সম্মুখভাগে নিরাপত্তারক্ষায় ফিরে আসে। এটি ১২ জুনের ঘটনা। (৩৫৮)
বাস্তবেই বোহেমন্ড ছিলেন বড় বিস্ময়কর চরিত্রের এক নেতা!
তবে এ সবকিছুর পরও এন্টিয়কের আশেপাশে মুসলমানদের অবরোধ দৃঢ়তার সঙ্গে চলতে থাকে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল, কেবল বোহেমন্ডের বাহিনী নয়; পুরো ক্রুসেডার বাহিনীই নিশ্চিত ধ্বংসের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
কিন্তু এরই মধ্যে মুসলিম বাহিনীর নিজেদের মধ্যে ঘটে এক দুঃখজনক বিভাজন! আবারও প্রমাণিত হয় সেই শাশ্বত বাস্তবতা- "আমাদের শত্রুরা আমাদের বিরুদ্ধে তাদের শক্তিবলে জয়লাভ করে না; জয়লাভ করে আমাদেরই দুর্বলতার কারণে।”
টিকাঃ
০৫৪. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৩৬।
**". Cam. Med. Hist. vol. 5,p. 292.
৩৫৬. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৩৭ ও Runciman, op. cit., 1, p. 238.
৩৫৭, Gesta Francorum, pp. 147-148.
. Guillaman: de tyr, 1, p. 255.
📄 মুসলিম শিবিরে দুঃখজনক বিভাজন
কারবুগা অনুভব করেন যে, মুসলিম বাহিনী আকারে বেশ বড় হলেও ক্রুসেডার বাহিনী তদাপেক্ষা বিশাল। আর তাই অবরোধ যদি দীর্ঘায়িত হয় আর ক্রুসেডাররা যুদ্ধের জন্য বেরিয়ে আসে, তাহলে পরিস্থিতি মুসলিম বাহিনীর প্রতিকূলে চলে যাবে। তাই কারবুগা চিন্তা করেন যে, মুসলিম বাহিনীকে শক্তিশালী করার সর্বোত্তম পথ হলো আলেপ্পোর প্রশাসক রিজওয়ানের সঙ্গে পুনরায় সমঝোতার চেষ্টা করে তার বাহিনীকেও মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করা। কারণ, আলেপ্পোর বাহিনীতে যেমন প্রচুর সৈন্য ছিল, তেমনই আলেপ্পোর প্রশাসক রিজওয়ান নিজেও ছিলেন খ্যাতিসম্পন্ন সামরিক দক্ষতার অধিকারী। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আলেপ্পো ছিল এন্টিয়কের অতি নিকটে অবস্থিত তুলনামূলক সমৃদ্ধ এক নগরী। ফলে মুসলিম বাহিনী সেখান থেকে অত্যাবশ্যকীয় রসদসামগ্রী, অস্ত্রশস্ত্র ও অবরোধসামগ্রী লাভ করতে পারবে।
এই ছিল কারবুগার পরিকল্পনা। নিঃসন্দেহে তার পরিকল্পনা ছিল সঠিক ও যথাযথ। কিন্তু তা সমকালীন মস্তিষ্কশূন্য নেতৃবৃন্দের জন্য উপযোগী ছিল না। তার এই পরিকল্পনার কথা জেনে দাক্কাক অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং তার প্রতি ক্রুদ্ধ হন। (৩৫৯) একে কেন্দ্র করে মুসলিম বাহিনীতে বিরোধ ও বিভক্তির ঘটনা ঘটে। দাক্কাক অবরোধ ত্যাগ করে দামেশকে ফিরে যাওয়ার মনোভাব প্রকাশ করেন। বিশেষত তিনি শামের দক্ষিণাঞ্চলে উবায়দিদের আগ্রাসনের আশঙ্কা করছিলেন। (৩৬০) দাক্কাকের এই সিদ্ধান্ত মুসলিম বাহিনীর মাঝে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
এদিকে হিমসের প্রশাসক জানাহুদ্দৌলা হুসাইন বিন মালাইব রিজওয়ানের মিত্র এবং রাহবা (Al-Rahba) ও মানবিজ (Manbij) অঞ্চলের প্রশাসক ইউসুফ বিন আবাকের প্রতিশোধমূলক আচরণের আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে ওঠেন। জানাহুদ্দৌলা আশঙ্কা করছিলেন যে, মুসলিম বাহিনীতে তার উপস্থিতি রিজওয়ান ও তার মিত্রদের মাঝে বৈরিতা সৃষ্টি করতে পারে। জানাহুদ্দৌলার এই আশঙ্কা ও উত্তেজনা পুরো বাহিনীর আত্মবিশ্বাস ও মনোবলে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে।(৩৬১)
মুসলমানরা বিগত কয়েকদিন নিজেদের সাময়িক ঐক্যের ফল ভোগ করছিল; ক্রুসেডাররা এন্টিয়কের অভ্যন্তরে সংকীর্ণ হয়ে পড়েছিল এবং নিশ্চিত ধ্বংসের মুখে চলে গিয়েছিল। এখন যখন মুসলমানরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, তখন তো নিজেদের বিভেদ ও বিভক্তির দুর্ভোগ তারা ভোগ করবেই!
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَتُ وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ
এবং তোমরা সে সকল লোকের মতো হয়ো না, যারা তাদের নিকট সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলি আসার পরও পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং পরস্পরে মতভেদ সৃষ্টি করেছিল। এরূপ লোকদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। [সুরা আলে-ইমরান: ১০৫]
এরপর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে পড়ে এবং মুসলিম বাহিনীর মাঝে সাম্প্রদায়িক ফিতনার দুর্যোগ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। বাহিনীর তুর্কি ও আরব অংশের মধ্যে প্রচণ্ড বিরোধ শুরু হয়। তুর্কিদের নেতৃত্বে ছিলেন প্রধান সেনাপতি ও মসুলের অধিপতি কারবুগা আর আরবদের নেতৃত্বে ছিলেন ওয়াছাব বিন মাহমুদ আল-মিরদাসি নামক জনৈক আমির। দূর থেকে আলেপ্পোর আমির রিজওয়ান আরবদের বিরুদ্ধে তুর্কিদের উত্তেজিত করে একের পর এক বার্তা পাঠিয়ে ফিতনাকে আরও উসকে দেন। (৩৬২)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
«إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ قَدْ أَذْهَبَ عَنْكُمْ عُبِّيَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ وَفَخْرَهَا بِالْآبَاءِ، مُؤْمِنٌ تَقِيٌّ، وَفَاجِرُ شَقِيٌّ ، أَنْتُمْ بَنُوْ آدَمَ، وَآدَمُ مِنْ تُرَابٍ، لَيَدَعَنَّ رِجَالٌ فَخْرَهُمْ بِأَقْوَامٍ، إِنَّمَا هُمْ فَحْمٌ مِنْ فَحْمِ جَهَنَّمَ، أَوْ لَيَكُوْنُنَّ أَهْوَنَ عَلَى اللَّهِ مِنَ الْجِعْلَانِ الَّتِي تَدْفَعُ بِأَنْفِهَا النَّيْنَ»
আল্লাহ তাআলা তোমাদের থেকে জাহিলি-যুগের মিথ্যা অহংকার ও বাপ-দাদাদের নিয়ে দাম্ভিকতা প্রদর্শনের ব্যাধি বিদূরিত করেছেন। (মানুষ দু-ধরনের) মুমিন আল্লাহভীরু ও ফাসিক দুর্ভাগা। তোমরা সকলে আদম-সন্তান আর আদম মাটি দ্বারা সৃজিত হয়েছে। কাজেই মানুষের কর্তব্য—তারা যেন নিজেদের বংশ-গোত্র নিয়ে গৌরব করা পরিহার করে। তারা তো জাহান্নামের এক টুকরো কয়লা! কিংবা অবশ্যই তারা আল্লাহ তাআলার নিকট ওই গুবরে পোকার চেয়েও তুচ্ছ, যা তার নাসিকায় মল-ময়লা বহন করে। (৩৬৩)
এই ছিল এন্টিয়к অবরোধকারী মুসলিম বাহিনীর পরিস্থিতি!
আমরা আবারও এন্টিয়к নগরপ্রাচীরের অভ্যন্তরে ফিরে আসছি। বোহেমন্ড আপন একগুঁয়েমি ও গোয়ার্তুমি সত্ত্বেও অনুভব করেন যে, ক্রুসেডারদের পতন ঘনিয়ে আসছে। তাই অবরুদ্ধ হওয়ার উনিশ দিন পর ২৭ জুন তিনি মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি কারবুগার কাছে ধর্মযাজক পিটার ও আরেকজন ব্যক্তিকে দূত হিসেবে প্রেরণ করেন। দূতদ্বয়ের মাধ্যমে বোহেমন্ড প্রস্তাব দেন যে, অবরোধ প্রত্যাহার করে নিরাপদে চলে যাওয়ার সুযোগ করে দিলে ক্রুসেডার বাহিনী নিজ দেশে চলে যাবে। (৩৬৪) যদিও কারবুগার বাহিনীতে অনৈক্যের ভাঙন সৃষ্টি হয়েছিল; কিন্তু তিনি প্রথমত আশঙ্কা করেন যে, প্রস্তাব গ্রহণ করার পর বোহেমন্ড হয়তো প্রতারণা করবেন। আর তার মতো ধূর্ত লোকের কাছ থেকে প্রতারণাই ছিল প্রত্যাশিত আচরণ। দ্বিতীয়ত কারবুগা উপলব্ধি করেন যে, ক্রুসেডাররা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই তিনি তাদের প্রস্তাব মেনে নেওয়ার পরিবর্তে চূড়ান্ত যুদ্ধের মাধ্যমে তাদেরকে পুরোপুরি নিঃশেষ করে ফেলার মনস্থ করেন। সম্ভবত তিনি মুসলিম বাহিনীর নেতৃবৃন্দ ও সৈন্যদের ওপর ছেয়ে বসা দুর্বলতার পরিমাণ আন্দাজ করতে পারেননি। সবমিলিয়ে তিনি দূতদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে বোহেমন্ডের সামনে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যতিরেকে অন্য সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। আর যুদ্ধও শুরু করতে হবে অতি দ্রুত, ক্ষুধার তাড়নায় ক্রুসেডার বাহিনী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পূর্বেই।
বোহেমন্ড নিজ বাহিনীর প্রতি দৃষ্টি বোলান। তিনি দেখতে পান যে, তাদের মানসিক শক্তি একেবারেই নিম্নমুখী। বোহেমন্ড এবার ক্রুসেডার সৈন্যদের মনোবল ও আত্মবিশ্বাস উন্নত করার এবং তাদের অন্তরে আসন্ন যুদ্ধে সুনিশ্চিত বিজয়ের বিশ্বাস ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এক অভিনব কৌশল অবলম্বনের মনস্থ করেন।
কী সেই কৌশল?!
তিনি পিটার বার্থোলোমিউ (Peter Bartholomew) নামক মার্সেই-এর জনৈক পাদরির মাধ্যমে ক্রুসেডারদের মাঝে প্রচার করেন যে, যিশুশিষ্য সেন্ট আন্দ্রে (Andrew the Apostle) তিনবার স্বপ্নযোগে তার কাছে আগমন করেছেন এবং তাকে এন্টিয়কের সেন্ট পিটার চার্চের (The Church of Saint Peter) একটি স্থান দেখিয়ে দিয়ে জানিয়েছেন যে, এখানেই যিশুখ্রিষ্টকে হত্যার সময় ব্যবহৃত বর্শাটি (The Holy Lance) মাটিচাপা দেওয়া আছে। যদি তারা উক্ত স্থানের মাটি খুঁড়ে বর্শাটি বের করে আনে এবং যুদ্ধের সময় তা ক্রুসেডার বাহিনীর সামনে রাখে, তাহলে অবশ্যই এই বাহিনী জয়লাভ করবে!
এরপর বোহেমন্ড উক্ত পাদরি ও আরও কয়েকজন সন্ন্যাসীকে তথাকথিত স্থানটি খনন করে বর্শাটি অনুসন্ধান করার নির্দেশ দেন। তারা উদ্দিষ্ট স্থানটি খনন করে বর্শা বের করে আনে। সকলে সমস্বরে বলে ওঠে—'এ তো অলৌকিক বিষয়; নিশ্চয়ই এই বাহিনী বিজয় লাভ করবে'! (৩৬৫)
স্বভাবতই এ ঘটনা ছিল সৈন্যদের উদ্দীপ্ত করার জন্য সম্পূর্ণই বোহেমন্ড ও তার অনুসারীদের সাজানো নাটক। ব্যাপকভাবে ঐতিহাসিকগণ বোহেমন্ডের এই দাবির সত্যতা স্বীকার করেননি। আর এতে বিস্ময়েরও কিছু নেই। যারা এই নাটক সাজিয়েছিল, তারা তো পাদরি ও যাজক সম্প্রদায়; তারাই তো নিজ হাতে বিধান রচনা করে দাবি করে যে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে! আমরা আমাদের আকিদা ও ধর্মবিশ্বাস অনুসারে এ বিষয়ে সুনিশ্চিত বিশ্বাসী যে, বর্শা, বর্শা-দাফন ও সমাধিস্থ বর্শা আবিষ্কারের সত্যতা তো বহু দূরের বিষয়, হজরত ঈসা আ. নিহতই হননি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ
তারা তাকে হত্যা করেনি এবং শূলে চড়াতে পারেনি; বরং তাদের বিভ্রম হয়েছিল। [সুরা নিসা: ১৫৭]
নিঃসন্দেহে এই বর্শা-নাটক ছিল ক্রুসেডার যোদ্ধাদের মনোবল উন্নত করার জন্য একটি সাজানো ঘটনা। আর তাদের উদ্দেশ্য সফলও হয়েছিল। বর্শা-কাহিনি মঞ্চস্থ হওয়ার পর অনেক সৈন্যের মনোবল ফিরে আসে এবং তারা পরের দিনই মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
টিকাঃ
৩০৫৯. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৩৬।
৩৬০. Runciman, op. cit., 1, p. 249.
৩৬১. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৩৬।
৩৬২, প্রাগুক্ত, ২/১৩৬।
৩৬০. ইমাম আবু দাউদ, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৫১১৬, ইমাম আহমাদ, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৮৭২১ ও বায়হাকি, আস-সুনানুল কুবরা, হাদিস নং ২০৮৫১।
৩৬৪. Chalandon: Premiere Croisade, p. 220.
৩৬৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৫-১৬, যাবুরাফ, আস-সালিবিয়ুন ফিশ-শারকু, পৃষ্ঠা: ৯৩-১০৭। Raymond d' Aguiler, in Peters (ed.), The First Crusades, pp. 166-168, 174-175, 178-185, 189-194.