📄 উবায়দি প্রতিনিধিদল
এরই মাঝে ১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে (৪৯১ হিজরি সনে) এমন এক ঘটনা ঘটে, যা চলমান পরিস্থিতিকে অনেকটা বদলে দেয় এবং ক্রুসেড শিবিরে দৃশ্যমান শক্তি বৃদ্ধি করে। এ সময় মিশর থেকে একটি প্রতিনিধিদল যৌথ স্বার্থ নিশ্চিত করতে ক্রুসেডারদের সঙ্গে মতবিনিময় ও সমঝোতার জন্য আগমন করে!
মিশরে তখন ফাতিমি নামে প্রসিদ্ধ উবায়দিদের শাসন চলছিল। আমরা পূর্বে যেমন বলে এসেছি—তারা ছিল শিয়া ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। সুন্নি সেলজুকদের সঙ্গে শিয়া উবায়দিদের ব্যাপক বিরোধ ছিল।
একইভাবে উবায়দিরা সুন্নি আব্বাসি খিলাফতের সঙ্গেও বিরোধ জিইয়ে রেখেছিল। আর তাই উবায়দিরা এ সময় সুন্নি সেলজুকদের দমন করার জন্য ক্রুসেডারদের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময়ের পরিকল্পনা করে! তৎকালীন উবায়দি সাম্রাজ্যের খলিফা ছিলেন মুসতালি বিল্লাহ। তবে তখন চলছিল উবায়দি সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় স্তর তথা উজিরদের অবাধ কর্তৃত্বের যুগ। ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি ছিল উজির আফজাল বিন বদর আল-জামালির হাতে।
উবায়দি প্রতিনিধিদল ক্রুসেডারদের শাম অঞ্চলে পারস্পরিক বণ্টননীতি গ্রহণের প্রস্তাব দেয়। তাদের প্রস্তাব ছিল—এন্টিয়к ও উত্তরের নগরীগুলো ক্রুসেডাররা লাভ করবে আর বাইতুল মুকাদ্দাসে থাকবে উবায়দিদের কর্তৃত্ব। কদিন পূর্বেই উবায়দিরা বাইতুল মুকাদ্দাসে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। ৪৯১ হিজরি সনে (১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দে) সেলজুকরা যখন এশিয়া মাইনর অঞ্চলে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যস্ত ছিল, তখন সুযোগ কাজে লাগিয়ে উবায়দিরা বাইতুল মুকাদ্দাস দখল করে নিয়েছিল। (৩৩০)
নিঃসন্দেহে উবায়দি প্রতিনিধিদলের আগমন ছিল ক্রুসেড শিবিরের জন্য অনেক বড় এক সুসংবাদ; বিপরীতে তা ছিল মুসলিম উম্মাহর বুকে বরং পৃষ্ঠদেশে এক প্রচণ্ড ছুরিকাঘাত! এর নেতিবাচক প্রভাব ছিল কল্পনারও ঊর্ধ্বে। যেমন:
১. উবায়দি প্রতিনিধিদলের আগমনের ফলে ক্রুসেডার বাহিনীর মনোবল ও আত্মবিশ্বাস অনেক গুণ বেড়ে যায়। কারণ, তারা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে, তাদের প্রতিপক্ষ পারস্পরিক হানাহানিতে ভগ্নপ্রায় এক জাতি। তারা লড়ছে এমন এক জাতির সঙ্গে, যাদের একমাত্র লক্ষ্য সম্পদ ও ভূখণ্ড। তারা নিজেরা একে অপরকে বিক্রি করে দিতে প্রস্তুত আছে; এমনকি ক্রেতা পরম শত্রু ক্রুসেডাররা হলেও!
২. উবায়দিদের এই প্রচেষ্টা পরবর্তীকালে সুন্নি সেলজুকদের বিভক্তি ও অস্থিরতার কারণে পরিণত হয়। উত্তর দিক থেকে ক্রুসেডারদের আগ্রাসন আর দক্ষিণ দিক থেকে শিয়া উবায়দিদের আক্রমণ— একই সঙ্গে দুই শত্রুর মোকাবিলা করার চিন্তা সেলজুকদের ভীষণ উদ্বিগ্ন করে তোলে।
৩. ক্রুসেডাররা আপাতত মিশরের দিক থেকে আক্রমণের আশঙ্কা থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে যায়। মিশর ছিল বিরাট সামরিক শক্তির অধিকারী। কেবল প্রচুর দক্ষ জনবলই নয়; মিশরের ছিল শক্তিশালী নৌবহর। যদি মিশরের সামরিক শক্তি নিষ্ঠাবান মুসলমানদের হাতে থাকত, তাহলে নিশ্চিতভাবেই তা ব্যবহার করে এন্টিয়কের পরিস্থিতি পাল্টে দেওয়া যেত।
৪. এটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, উবায়দি প্রতিনিধিদলের আগমন ছিল প্রকারান্তরে ইসলামি ভূখণ্ডের ওপর এই নতুন ক্রুসেড কাঠামোর অধিকারকে মিশর কর্তৃক স্বীকৃতিদান এবং এই স্বীকারোক্তি যে, ক্রুসেডাররা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এন্টিয়к ভূমির বৈধ হকদার। (৩৩১) আর তাই ভবিষ্যতে মুসলমানদের এই ভূখণ্ড দাবি করার কোনো অধিকার নেই। কারণ, মুসলমানরা তো বাইতুল মুকাদ্দাসের বিনিময়ে এই ভূখণ্ড ক্রুসেডারদের দিয়ে দিয়েছে। কিছুদিন পর মানুষ ভুলেই যাবে যে, এটি কোনো বিনিময় চুক্তি নয়; বরং উভয় ভূখণ্ডই মুসলমানদের ছিল!
নিঃসন্দেহে মিশরের উবায়দি সাম্রাজ্যের এই পদক্ষেপ ছিল সর্ব বিবেচনায়ই সম্পূর্ণ বিশ্বাসঘাতকতা!
ক্রুসেডাররা মনেপ্রাণে বাইতুল মুকাদ্দাস দখলের বিষয়ে পূর্ণ সংকল্পবদ্ধ থাকলেও বাহ্যিকভাবে উবায়দি প্রতিনিধিদলকে সাদরে স্বাগত জানায় এবং সর্বত্র প্রকাশ্যে এই চুক্তির কথা ঘোষণা করতে থাকে। মূলত তারা এ প্রস্তাব সীমিত সময়ের জন্য গ্রহণ করেছিল। (৩৩২) ইতিপূর্বে তারা যেমন বাইজান্টাইন সম্রাটকে প্রদত্ত অঙ্গীকারের কথা ভুলে গিয়েছিল, ভবিষ্যতে ভুলে যাবে উবায়দিদের প্রদত্ত অঙ্গীকারের কথাও! তাদের পরিভাষায় এরই নাম 'রাজনীতি'। যদিও এ ধরনের ছেলে-ভোলানো রাজনীতি কেবল নির্বোধ ও সরল ক্রেতাদের সঙ্গেই কাজে লাগে; কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো তখনকার বেশিরভাগ মুসলিম নেতা এই দুই গুণের কোনো একটি বা যুগপৎ উভয়টির অধিকারী ছিল!
যাই হোক, এন্টিয়к অবরোধ চলাকালে এই ছিল শিয়া উবায়দি সাম্রাজ্যের অবস্থান।
টিকাঃ
৩০০. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৩৫।
০০১. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/১৬৩।
০০২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪১৮।
📄 সহায়তাকারী বাহিনীর পরাজয়
এন্টিয়к অবরোধের সময় আলেপ্পোর প্রশাসক রিজওয়ান বিন তুতুশের অবস্থান ও ভূমিকা কী ছিল?!
তার অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও ইয়াগিসিয়ানের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল; কিন্তু তিনি মনে করতেন যে, এন্টিয়к তার নিজস্ব সম্পত্তি, (৩৩৩) যা ইয়াগিসিয়ান জবরদখল করে রেখেছেন। তাই তার বিবেচনায় ক্রুসেডারদের অবরোধ প্রচেষ্টা ছিল তার নিজের সম্পদই ক্রুসেডারদের জবরদখল করার অপচেষ্টা। তা ছাড়া ক্রুসেডারদের অবস্থান তখন আলেপ্পোর খুবই নিকটে। এন্টিয়কের পতন ঘটাতে পারলে তারা নিশ্চিতভাবেই আলেপ্পো অভিমুখে অগ্রসর হবে। আর তাই ইয়াগিসিয়ান যখন দাক্কাক ও অন্যদের কাছ থেকে নিরাশ হয়ে রিজওয়ানের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করেন, তখন রিজওয়ান এ সুযোগকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং ক্রুসেডারদের মোকাবিলা করার জন্য দ্রুত সৈন্যসমাবেশ ঘটান। অভিযানে তার সঙ্গে হামার প্রশাসক ও দিয়ারে বকর অঞ্চলের কিছু সৈন্যও যোগ দেয়। (৩৩৪) সকলে মিলে এন্টিয়к হতে ত্রিশ কিলোমিটার দূরে হারিম এলাকায় সমবেত হয়।
প্রকৃত বাস্তবতা হলো, তারা ইসলাম ও ইসলামি ভূখণ্ডের হেফাজত কিংবা মুসলমানদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার উদ্দেশ্যে বের হয়নি!
তারা বের হয়েছে নিজ নিজ ভূখণ্ড রক্ষার জন্য কিংবা চোখে ধূলো দেওয়ার জন্য! স্বভাবতই এ জাতীয় বাহিনী আল্লাহ তাআলার নুসরত ও সাহায্য লাভ করে না!
রিজওয়ান ও ইয়াগিসিয়ানের মধ্যে চুক্তি হয় যে, উভয়ে একই সময়ে একযোগে হারিম ও এন্টিয়к থেকে ক্রুসেডারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। এর ফলে পূর্ব ও পশ্চিম দু-দিক থেকে ক্রুসেডাররা দুই দলের মাঝে ফাঁদে আটকা পড়বে। (৩৩৫)
পরিকল্পনা ছিল খুবই সুদৃঢ়; কিন্তু পরিকল্পনাকারীদের দেহ-মন যে অসুস্থ ও জরাগ্রস্ত!
আলেপ্পোর খ্রিষ্টানদের মাধ্যমে এই পরিকল্পনার সংবাদ ক্রুসেড শিবিরে পৌঁছে যায়। (৩৩৬) তখন বোহেমন্ড মূল ক্রুসেডার বাহিনীকে এন্টিয়к অবরোধে ব্যস্ত রেখে নিজে মাত্র সাতশ অশ্বারোহী সৈন্যের একটি ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে বের হয়ে আসেন। এরপর তিনি এই ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়েই এন্টিয়к হতে পূর্ব দিকে অবস্থিত আমিক হ্রদের (Lake Amik/the Lake of Antioch) কাছে আলেপ্পো, হামা ও দিয়ারে বকরের সম্মিলিত বাহিনীর মুখোমুখি হন। (৩৩৭) অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, প্রতিপক্ষের তুলনায় সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্ত্বেও রিজওয়ানের বাহিনী প্রতিপক্ষের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়। সাতশ সৈন্যের ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়েই বোহেমন্ড দ্রুত পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। রিজওয়ানের বাহিনীর সৈন্যরা তখন পালাতে শুরু করে। (৩৩৮) ক্রুসেডারদের আক্রমণে প্রচুর মুসলিম সৈন্য নিহত হয়। বোহেমন্ড তাদের মস্তক বিচ্ছিন্ন করে বর্শার শীর্ষদেশে গেঁথে নিয়ে দ্রুত এন্টিয়কে ফিরে আসেন।
এদিকে বোহেমন্ড যখন রিজওয়ানের বাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য এন্টিয়к থেকে দূরে সরে পড়েছিলেন, ইয়াগিসিয়ান তখন ক্রুসেডারদের ওপর হামলা করার লক্ষ্যে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু আক্ষেপ ও পরিতাপের বিষয় — তিনিও পরাজিত হয়ে দ্রুত নিজ দুর্গে ঢুকে পড়েন। এরপর বোহেমন্ড ফিরে এসে কর্তিত মস্তকগুলো এন্টিয়কের নগরপ্রাচীরের অভ্যন্তরে নিক্ষেপ করেন। এটি ছিল তার পক্ষ থেকে ইয়াগিসিয়ান ও এন্টিয়кবাসী মুসলমানদের প্রতি হুমকি-বার্তা। (৩৩৯)
এন্টিয়কের অবরোধ চলতে থাকে। মুসলমানদের ওপর চাপ আরও বৃদ্ধি করতে এন্টিয়কের প্রাচীরে গোলা নিক্ষেপে ব্যবহার করার জন্য এবং মুসলমানদের নিক্ষিপ্ত তির থেকে আত্মরক্ষার জন্য ক্রুসেডাররা এবার নগরপ্রাচীরের নিকটবর্তী একটি টিলার ওপর দুর্গ নির্মাণ শুরু করে। (৩৪০)
দুর্গ নির্মাণ চলাকালে ১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ৪ মার্চ প্রচুর পরিমাণ রসদসামগ্রী, অস্ত্রশস্ত্র ও অবরোধসামগ্রী নিয়ে ইংল্যান্ড থেকে আগত একটি নৌবহর সেন্ট সাইমন বন্দরে এসে পৌঁছায়। এর ফলে ক্রুসেডারদের মনোবল আরও বৃদ্ধি পায়। এর কদিন পরই ১৯ মার্চ দুর্গ নির্মাণ সমাপ্ত হয়। ফলে অবরোধ আরও মজবুত ও কঠিন রূপ ধারণ করে। (৩৪১)
ইয়াগিসিয়ান আবারও পারসিক সেলজুক সাম্রাজ্যের সুলতান বারকিয়ারুক ও তার অধীনস্থ মসুলের প্রশাসক কারবুগার কাছে সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন। (৩৪২) ইয়াগিসিয়ানের আবেদনে সাড়া দিয়ে কারবুগা এবার বিশাল এক বাহিনী প্রস্তুত করেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তিনি এন্টিয়к অভিমুখে আগমনের পূর্বে এডেসা অবরোধ করে সেখানে প্রতিষ্ঠিত ক্রুসেড রাজ্যের পতন ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেন। কারবুগার এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণ হলো, ধূর্ত ক্রুসেডার সেনাপতি বল্ডউইনের প্রতিষ্ঠিত ক্রুসেড রাজ্য এডেসা ছিল মসুলের বেশ কাছে। কারবুগা আশঙ্কা করছিলেন যে, তিনি যদি তার বাহিনী নিয়ে মসুল থেকে সাতশ কিলোমিটারের অধিক দূরে এন্টিয়কে গমন করেন, তাহলে বল্ডউইন হয়তো সামরিক শক্তিশূন্য মসুলে হামলা চালাবেন। তাই এন্টিয়কে গমনের পূর্বেই এডেসার দফারফা করা তার দৃষ্টিতে জরুরি ছিল। বাস্তবতা যাই হোক, কারবুগার এই সিদ্ধান্তের কারণে অতি মূল্যবান কয়েক সপ্তাহ সময় নষ্ট হয়ে যায়। এডেসার পতন ঘটানোর ব্যর্থ চেষ্টা শেষে অবশেষে তিনি মে মাসের শেষ দিকে এন্টিয়к অভিমুখে রওনা হন। (৩৪৩)
কারবুগার এন্টিয়к অভিমুখে আগমনের সংবাদে ক্রুসেড শিবিরে ব্যাপক ভীতি সৃষ্টি হয়। কারণ, তারা জানতে পারে যে, কারবুগা বেশ বড় এক বাহিনী নিয়ে আগমন করছেন। এদিকে দীর্ঘ অবরোধের কারণে ক্রুসেডার বাহিনী তখন অনেকটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সাত মাসেরও অধিক সময় ধরে তারা এন্টিয়কের নগরপ্রাচীরের বাইরে শিবির স্থাপন করে আছে। এই দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্যেই ২ জুন ব্লয়েসের কাউন্ট স্টিভেন এন্টিয়к জয়ের বিষয়ে নিরাশ হয়ে ময়দান ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফরাসি সৈন্যদের বড় একটি অংশ সঙ্গে নিয়ে ফ্রান্সে ফিরে যাওয়ার লক্ষ্যে তিনি ইসকানদারুন (İskenderun) বন্দর অভিমুখে রওনা হন। (৩৪৪) ফলে আবারও উভয় পক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকেই পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল ও সংকটপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
টিকাঃ
*Guillaman: de tyr, 1, p.194.
** Chalandon: Premiere Croisade, pp. 195.
৩০৮. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১২৯ ও Guillaman de tyr 1. p. 196.
* Gesta Francorum, pp. 80-86.
980. Cam. Med. Hist. Vol. 5,p. 291.
৩৪১. Guillaman: de tyr, 1, p. 198.
৩৪২. Michaud: op. cit. 1, pp. 264-267.
৩৪৩. উইলিয়াম সুরি, তারীখুল আ'মালিল মুনজিযাহ ফী-মা ওয়ারাআল বিহার, ১/৩১৮-১৯ ও রানচিমান, তারীখুল হুরূবিস সালীবিয়্যাহ, ১/৩৪৬।
*88. Runciman, op. cit., 1, p. 234.
📄 এন্টিয়কের পতন
এরপর হঠাৎ করেই পটপরিবর্তন ঘটে। মুসলিম শিবিরে আঘাত হানে বিশ্বাসঘাতকতার দুষ্ট ব্যাধি। এন্টিয়কের অধিবাসী আর্মেনীয় বংশোদ্ভূত ফিরোজ নামক জনৈক ব্যক্তি নিজেকে মুসলমান হিসেবে পরিচয় দিত। সে গোপনে ক্রুসেড শিবিরে অবস্থানরত আর্মেনীয়দের সঙ্গে পত্রবিনিময় করতে থাকে। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, এন্টিয়কের অধিবাসী অনেক আর্মেনীয় নাগরিক অবরোধের শুরুতেই এন্টিয়к থেকে বের হয়ে ক্রুসেড শিবিরে যোগ দিয়েছিল। (৩৪৫) ফিরোজ ইয়াগিসিয়ানের অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিল। ইয়াগিসিয়ান তাকে এন্টিয়কের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি চৌকির প্রহরার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সে আর্মেনীয়দের জানায় যে, তার এমন কিছু গোপন তথ্য জানা আছে, যার মাধ্যমে সহজেই এন্টিয়কের দুর্গসমূহ জয় করা যাবে। এ সংবাদ ব্যক্তিগতভাবে বোহেমন্ডের কাছে পৌঁছানো হয়। বোহেমন্ড অন্যান্য ক্রুসেডার সেনাপতির কাছে সবকিছু গোপন রাখেন এবং নিজে ফিরোজের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আর্মেনীয় ফিরোজ তথ্যপ্রদানের বিনিময়ে এন্টিয়к পতনের পর অর্থসম্পদ ও নগরীর অভ্যন্তরে জায়গির লাভের দাবি জানালে বোহেমন্ড তার দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। (৩৪৬) এরপর বোহেমন্ড ক্রুসেডার সেনাপতিদের একত্র করে পুনরায় তাদের সামনে পরিস্থিতির নাজুকতা তুলে ধরেন। তিনি সকলের কাছ থেকে পুনরায় নিশ্চিন্ত হন যে, পতন ঘটার পর সকলে এন্টিয়কের কর্তৃত্ব তার হাতে তুলে দেবে। (৩৪৭) এরপর বোহেমন্ড হামলা শুরুর সময়ক্ষণ নির্ধারণ করেন।
স্টিভেন ও তার সঙ্গী ফরাসিরা চলে যাওয়ার একদিন পর ৩ জুন সকালে মুসলিম বেশধারী আর্মেনীয় খ্রিষ্টান ফিরোজ তার প্রহরাধীন চৌকিগুলোসহ আশেপাশের বিভিন্ন চৌকির দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। কোনো কোনো বর্ণনামতে এই ষড়যন্ত্রের ঘটনা যেন প্রকাশ না পায়, এ উদ্দেশ্যে সে তার এক ভাইকে হত্যা করে। নগরপ্রাচীরের কয়েকটি দ্বার উন্মুক্ত হতেই বিশাল ক্রুসেডার বাহিনী ভোরের প্রথম প্রহরে ঝড়ের গতিতে এন্টিয়কের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে থাকে। নগরীর অভ্যন্তরে অবস্থানরত আর্মেনীয়রাও দ্রুত ক্রুসেডারদের সঙ্গে মিলিত হয়। (৩৪৮) ইয়াগিসিয়ান ষড়যন্ত্রের বিষয়টি উপলব্ধি করতে সক্ষম হলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তিনি এবার একদল তুর্কিকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার মনস্থ করেন। কিন্তু এন্টিয়কের অধিবাসী আর্মেনীয়রা তাকে ঘিরে ফেলে হত্যা করে এবং তার কর্তিত মস্তক নিয়ে ক্রুসেডারদের কাছে পৌঁছায়। (৩৪৯) ইয়াগিসিয়ানের মৃত্যুতে মুসলিম সৈন্য ও সাধারণ জনগণের দৃঢ়তা ভেঙে পড়ে।
ভীতি ও আতঙ্কের এক বিশাল স্রোত এন্টিয়কের অভ্যন্তরে বয়ে যায়। দীর্ঘ অবরোধের পর ক্রুসেডাররা নগরীটি দখল করে নেয় এবং অগণিত নারী-পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে। প্রচুর নারী ও শিশুকে বন্দি করে দাসে পরিণত করা হয়। (৩৫০) এন্টিয়কের নগরপ্রাচীর ও চৌকিসমূহের শীর্ষদেশে নরম্যান সেনাপতি বোহেমন্ডের পতাকা উত্তোলন করা হয়।
এন্টিয়কের ভয়ংকর পতনে পুরো ইসলামি বিশ্ব প্রকম্পিত হয়ে ওঠে; কেঁপে ওঠে খ্রিষ্টান বিশ্বও!
এন্টিয়к অত্যন্ত সুরক্ষিত ও সুপ্রাচীন অনিন্দ্যসুন্দর এক নগরী। এন্টিয়কের আছে দীর্ঘ ইসলামি ও খ্রিষ্ট ইতিহাস। তা ছাড়া এই মর্মান্তিক পতনের ঘটনা ঘটেছে একটানা সাত মাসেরও অধিক সময়ের অবরোধের পর। অধিকন্তু পতনের পরই ঘটেছে হাজার হাজার মুসলমানের নির্মম হত্যাযজ্ঞ। (৩৫১)
মহামারি ছড়িয়ে নিজেরা সমূলে ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কায় ক্রুসেডাররা দ্রুত স্তূপীকৃত লাশগুলো মাটিচাপা দেয়। এরপর তারা দুর্গ ও চৌকিগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে এবং নগরীর ভেতরে-বাইরে পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। (৩৫২)
এদিকে মসুল অধিপতি কারবুগা এডেসা পতনের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে তার বাহিনী নিয়ে এডেসা থেকে এন্টিয়к অভিমুখে রওনা হন। পথিমধ্যে তিনি এন্টিয়к থেকে প্রায় ছয়শ পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে মার্জ-দাবিক এলাকায় যাত্রাবিরতি করেন এবং এন্টিয়к পুনরুদ্ধারের জন্য একটি বৃহৎ বাহিনী গঠনের লক্ষ্যে বিভিন্ন আমির ও প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। কারবুগার নেতৃত্বাধীন এই বাহিনীটি ছিল সেলজুক সুলতান ও তৎকালীন সবচেয়ে শক্তিশালী সেলজুক নেতা সুলতান বারকিয়ারুক কর্তৃক প্রেরিত। এ কারণে দামেশকের প্রশাসক দাক্কাক, সিনজারের প্রশাসক আরসালান তুতুশ, হিমসের প্রশাসক জানাহুদ্দৌলাসহ অনেক প্রশাসক কারবুগার আনুগত্য স্বীকার করে। তবে আলেপ্পোর প্রশাসক রিজওয়ান এমন বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান, যে বাহিনীতে তার সহোদর ও 'পরম শত্রু' দাক্কাক আছেন! (৩৫৩)
টিকাঃ
*84. Gesta Francorum, p. 69.
৩৪৬, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/১৬৮ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৩৪।
৩৪৭. Gesta Francorum, p. 100.
৩৪৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪১৭।
৩৪৯. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৩৪।
৩৫০. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা : ১৩৫।
৩৫১. ক্রুসেডারদের বিভিন্ন সূত্রগ্রন্থের বর্ণনা অনুসারে এন্টিয়কে ক্রুসেডাররা দশ হাজার মুসলমানকে হত্যা করে।
৩৫২. Michaud: op. cit. 1, 292.
০৫০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪১৮ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৫৬।
📄 সাহায্যকারী মুসলিম বাহিনীর এন্টিয়ক অবরোধের ব্যর্থ চেষ্টা
এভাবে কারবুগার উদ্যোগে বিরাট এক মুসলিম বাহিনী এন্টিয়কের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। এন্টিয়ক পতনের প্রায় ছয়দিন পর তারা এন্টিয়কে পৌঁছায়। কারবুগা নগরীর অভ্যন্তরে প্রবেশের চেষ্টা চালালেও সুরক্ষিত নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে ব্যর্থ হন। (৩৫৪) এরপর তিনি এন্টিয়к অবরোধ করেন।
এবার বিপরীত দৃশ্য! ক্রুসেডাররা এন্টিয়কের ভেতরে অবরুদ্ধ আর মুসলমানরা বাইরে অবরোধকারীর ভূমিকায়! ১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ৮ জুন এই অবরোধ শুরু হয়। (৩৫৫)
ক্রুসেডাররা এবার প্রকৃত দুর্ভোগের সম্মুখীন হয়। কারণ, পূর্বের সাত মাসের অধিক সময়ের অবরোধে এন্টিয়к বলতে গেলে সম্পূর্ণই খাদ্যশূন্য হয়ে পড়েছে। পূর্ব দিকে চলে আসায় ক্রুসেডাররা এবার অনুতাপ করতে থাকে। খাদ্যের অভাবে তারা ক্ষুধার চরম পর্যায়ে উপনীত হয় এবং মৃতদেহ ও গাছের পাতা খেতে বাধ্য হয়!(৩৫৬)
এই কঠিন ও দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে কী করবে ক্রুসেডার শক্তি? ক্রুসেডাররা এবার বাইজান্টাইন সম্রাটের কাছে সাহায্যপ্রার্থনার পরিকল্পনা করে। এরই নাম স্বার্থ! এরই নাম স্বার্থের রাজনীতি!
এখন ক্রুসেডারদের বাইজান্টাইন সম্রাটের সাহায্যগ্রহণ ব্যতীত কোনো গত্যন্তর নেই। সুতরাং আবারও চাটুকারিতা, তোষামোদ-খোশামোদ ও কপটতার পথ অবলম্বনে বাধা কীসের!
বাইজান্টাইন সম্রাট দেখতে পান যে, তার সামনে প্রিয় এন্টিয়к নগরীর কর্তৃত্ব লাভের এক পরম সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। তিনি নিজে এবার বিরাট এক বাহিনী নিয়ে এশিয়া মাইনর অতিক্রম করে এন্টিয়к অভিমুখে রওনা হন। কিন্তু পথে থাকতেই তিনি বিভিন্ন ইসলামি রাজ্যের সৈন্যদের সমন্বয়ে সেলজুকদের বিরাট সৈন্যসমাবেশের বিষয়ে জানতে পারেন। এতে সম্রাট নিজের ও বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার বিষয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি তাৎক্ষণিক মন্তব্য করেন, 'এন্টিয়к ও ক্রুসেডারদের নিরাপত্তারক্ষার চেয়ে আমার কাছে কনস্টান্টিনোপল ও বাইজান্টাইনদের নিরাপত্তারক্ষা হাজার গুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।' এরপর বাইজান্টাইন সম্রাট ১ম অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস কনস্টান্টিনোপলে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ক্রুসেডার বাহিনীর প্রতিনিধিগণ শত অনুনয়-বিনয় করেও তার সিদ্ধান্ত বদলাতে ব্যর্থ হয়। (৩৫৭)
আবারও প্রমাণিত হয় যে, ক্রুসেড অভিযান মোটেও ধর্মীয় কোনো ইস্যু ছিল না!
প্রত্যেক নেতা ও সেনাপতির চিন্তাজুড়ে ছিল নিজ নিজ ক্ষমতা ও সিংহাসন!
বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রত্যাবর্তনে ক্রুসেডারদের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে পড়ে। অবরোধ শুরু হওয়ার মাত্র চার দিন পরই ক্লান্ত-অবসন্ন ও ক্ষুধায় কাতর ক্রুসেডার সৈন্যরা নিজ নিজ প্রহরার স্থান ত্যাগ করতে শুরু করে এবং নগরীর অভ্যন্তরে বাড়িঘরে অবস্থান নিতে থাকে। এটি ছিল তাদের ওপর ছেয়ে বসা নিরাশা ও হতাশার সুস্পষ্ট প্রমাণ।
বোহেমন্ড যখন দেখতে পান যে, তার লালিত স্বপ্ন ধূলিসাৎ হতে যাচ্ছে এবং এত পরিশ্রম ও কষ্টের পর অর্জিত অনিন্দ্যসুন্দর নগরী এন্টিয়к তার হাত থেকে ছুটে যেতে বসেছে; বরং তার ও তার সৈন্যদের জীবনই ধ্বংস হতে যাচ্ছে, তখন তিনি বিস্ময়কর কঠোরতার সঙ্গে পরিস্থিতির মোকাবিলা করেন। তিনি নগরীর অভ্যন্তরের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিতে শুরু করেন, যেন সৈন্যরা বাধ্য হয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে নগরীর সম্মুখভাগে নিরাপত্তারক্ষায় ফিরে আসে। এটি ১২ জুনের ঘটনা। (৩৫৮)
বাস্তবেই বোহেমন্ড ছিলেন বড় বিস্ময়কর চরিত্রের এক নেতা!
তবে এ সবকিছুর পরও এন্টিয়কের আশেপাশে মুসলমানদের অবরোধ দৃঢ়তার সঙ্গে চলতে থাকে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল, কেবল বোহেমন্ডের বাহিনী নয়; পুরো ক্রুসেডার বাহিনীই নিশ্চিত ধ্বংসের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
কিন্তু এরই মধ্যে মুসলিম বাহিনীর নিজেদের মধ্যে ঘটে এক দুঃখজনক বিভাজন! আবারও প্রমাণিত হয় সেই শাশ্বত বাস্তবতা- "আমাদের শত্রুরা আমাদের বিরুদ্ধে তাদের শক্তিবলে জয়লাভ করে না; জয়লাভ করে আমাদেরই দুর্বলতার কারণে।”
টিকাঃ
০৫৪. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৩৬।
**". Cam. Med. Hist. vol. 5,p. 292.
৩৫৬. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৩৭ ও Runciman, op. cit., 1, p. 238.
৩৫৭, Gesta Francorum, pp. 147-148.
. Guillaman: de tyr, 1, p. 255.