📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 এন্টিয়কের গুরুত্ব

📄 এন্টিয়কের গুরুত্ব


এন্টিয়к নগরীকে তৎকালীন শাম অঞ্চল ও এশিয়া মাইনর অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরী বিবেচনা করা হতো। বরং এই দাবি করলে মোটেও অত্যুক্তি হবে না যে, এন্টিয়ক ছিল সেই প্রাচীনকালে সমগ্র বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরী। বেশ কিছু স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্যের কারণে এন্টিয়ক অন্যান্য নগরীর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছিল। যথা-

১. আবহমান কাল ধরে এন্টিয়ক একটি কেন্দ্রীয় নগরী হিসেবে বিবেচিত হতো। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য বিগত দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে নগরীটিকে পুরো শাম অঞ্চলের রাজধানী হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল।

২. এন্টিয়ক প্রথম শ্রেণির ধর্মীয় নগরী হিসেবে বিবেচিত হতো। খ্রিষ্টসমাজ নগরীটিকে বিশেষ সমীহ ও মর্যাদার নজরে দেখে থাকে। এন্টিয়ক নগরীতেই প্রথম ঈসা মাসিহের অনুসারীদের জন্য 'খ্রিষ্টান' নামটি ব্যবহৃত হয়। বাইবেলের শিষ্যচরিত অধ্যায়ে (The Acts of the Apostles) আছে-'এন্টিয়কেই অনুগামীরা প্রথম খ্রিষ্টান নামে অভিহিত হলো।'(২৮৯) অধিকন্তু এন্টিয়কেই সেন্ট পিটার (Saint Peter) তার প্রথম গির্জা প্রতিষ্ঠা করেন।(২৯০)

৩. ইসলামি বিজয়াভিযানের একেবারে শুরুর দিকেই এন্টিয়ক বিজিত হয়। পঞ্চদশ হিজরি সনে (৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দে) বিশিষ্ট মুজাহিদ সাহাবি আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাযি.-এর হাতে নগরীটি বিজিত হয় এবং এরপর একটানা চারশ ষাট বছর ইসলামি শাসনের অধীনে থাকে। (২৯১)

এন্টিয়ককে ইসলামি নিদর্শনসমৃদ্ধ একটি নির্ভেজাল ইসলামি নগরীতে পরিণত করার কৃতিত্ব আরেক মহান সাহাবি হজরত মুয়াবিয়া রাযি.- এর। মুয়াবিয়া রাযি. যখন প্রত্যক্ষ করেন যে, এন্টিয়ক নগরী বারবার বাইজান্টাইন আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে, তখন তিনি নগরীটির অভ্যন্তরে ও আশেপাশে এলাকায় মুসলমানদেরকে বড় বড় জায়গির প্রদান করে সেখানে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নেন। মুয়াবিয়া রাযি.-এর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য দামেশক, হিমস ও লেবানন থেকে এমনকি সুদূর ইরাক অঞ্চল থেকেও মুসলমানরা এ অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করতে থাকে। ফলে এন্টিয়কের নাগরিক বিন্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। পরবর্তী সময়ে মারআশ, তারসুস ও মালাতিয়াসহ এন্টিয়কের উত্তরে অবস্থিত বিভিন্ন নগরীতে মুসলমানদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এন্টিয়ক একটি নিরাপদ- শান্তিপূর্ণ ইসলামি নগরীতে পরিণত হয়। (২৯২)

৪. এন্টিয়ক সুপ্রাচীন ও সুমহান বাণিজ্যিক ঐতিহ্যের অধিকারী একটি নগরী। এন্টিয়ক ছিল এ অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র। বরং যে সময় ইসলামি সাম্রাজ্য ও বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের মাঝে তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজমান ছিল, তখন এন্টিয়ক ছিল উভয় সাম্রাজ্যের পারস্পরিক বাণিজ্য বিনিময়ের অন্যতম প্রসিদ্ধ কেন্দ্র। (২৯৩)

৫. এন্টিয়ক নগরীকে শাম অঞ্চলের বরং তৎকালীন পুরো বিশ্বের অন্যতম সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য নগরী বিবেচনা করা হতো। নিরাপত্তাব্যবস্থার দিক থেকে এন্টিয়ক তুল্য হতো প্রাচীন বিশ্বের (২৯৪) সবচেয়ে সুরক্ষিত নগরী কনস্টান্টিনোপলের সঙ্গে। (২৯৫)

এন্টিয়কের ভৌগোলিক অবস্থানের প্রতি ত্বরিত দৃষ্টি বোলালেই নগরীটির প্রাকৃতিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। আল্লাহ তাআলা প্রাকৃতিকভাবে নগরীটিকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দান করেছিলেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল মানবনির্মিত বিভিন্ন দুর্গ ও প্রাচীর। এন্টিয়ক নগরী দক্ষিণ ও পূর্ব দিক থেকে সুউচ্চ পর্বতমালা দ্বারা বেষ্টিত। পশ্চিমে নগরীটির সীমা ছিল আছি নদী (২৯৬) পর্যন্ত। উত্তর দিক থেকেও এন্টিয়ক নগরী বিভিন্ন জলাভূমি ও বনভূমি দ্বারা বেষ্টিত ছিল। প্রাকৃতিক এই নিরাপত্তার পাশাপাশি নগরীটি সব দিক থেকে সুউচ্চ প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত ছিল। প্রাচীরের ওপর থেকে নজরদারি এবং তীর-বর্শা ও জ্বলন্ত গোলা নিক্ষেপের জন্য ছিল তিনশ ষাটটি বুর্জ বা নিরাপত্তা চৌকি। এ ছাড়াও এন্টিয়কের অভ্যন্তরে ছিল অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি দুর্গ, যেখানে প্রবেশ করা কার্যত অসম্ভব ছিল!

৬. এন্টিয়ক নগরী এশিয়া মাইনর অঞ্চল থেকে শাম অঞ্চলে গমন-পথের একেবারে গোড়ায় অবস্থিত ছিল। (২৯৭) এ কারণে এন্টিয়ক পতনের অর্থ ছিল শামের পথ উন্মুক্ত ও বিজিত হওয়া। তদ্রূপ প্রচুর সৈন্য ও নিরাপত্তারক্ষীতে সমৃদ্ধ এন্টিয়ক জয় না করে সামনে অগ্রসর হলে নিশ্চিত ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা ছিল। এ কারনেই ক্রুসেডারদের জন্য এন্টিয়কে থেমে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা ব্যতীত ভিন্ন কোনো পথ খোলা ছিল না।

৭. এন্টিয়ক যদিও উপকূলীয় নগরী নয়; কিন্তু তা ভূমধ্যসাগর, (২৯৮) সেন্ট সাইমন নৌবন্দর (The ports of Saint Simon) ও লাতাকিয়া (Latakia) নৌবন্দর হতে অতি নিকটে অবস্থিত ছিল। ফলে খ্রিষ্টানবিশ্ব হতে সাগরপথে এন্টিয়কে রসদসামগ্রী পৌঁছানো কেবল সম্ভবই নয়; সহজতর ছিল।

৮. নাগরিক জনবিন্যাসের দিক থেকেও এন্টিয়ক ছিল স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। মুসলমানরা যদিও সেখানে অনেক আগেই বসতি স্থাপন করেছিল, তবে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের কাছে নগরীটির বিশেষ ধর্মীয় মর্যাদা থাকায় সেখানে প্রচুর পরিমাণ অর্থোডক্স খ্রিষ্টান ও আর্মেনীয় খ্রিষ্টান নাগরিকও বসবাস করত। দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে তারা সেখানে মুসলমানদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করছিল। কখনোই সেখানে কোনো প্রকার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা জাতিগত নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি।

৯. এন্টিয়к নগরী ক্রুসেড অভিযান-পূর্ববর্তী নিকট অতীতে এমন কিছু পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করে, যা চলমান ঘটনাপ্রবাহে কিছুটা জটিলতা সৃষ্টি করে। সম্রাট ২য় নিকিফোরস ফোকাস (Nikephoros II Phokas)-এর শাসনামলে ৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ১ নভেম্বর (৩৫৮ হিজরি সনে) বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের হাতে এন্টিয়কের পতন ঘটে। (২৯৯) এ ঘটনা হিলাল ও ছালিব উভয় শিবিরে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। কারণ, পতনের পূর্বে তিনশ বছরেরও অধিক সময় নগরীটি মুসলিম শাসনাধীন ছিল। একই সময় নগরীটি ছিল অর্থোডক্স ও ক্যাথলিক উভয় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়সহ ব্যাপকভাবে পুরো খ্রিষ্টান বিশ্বের কাছে অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন ধর্মীয় নগরী। নগরীটি জয় করার পরই বাইজান্টাইন সৈন্যরা সেখানকার প্রচুর নাগরিককে হত্যা করে, বাকিদের নগরত্যাগে বাধ্য করে। এরপর তারা সেখানে বসবাস করার জন্য প্রচুর সংখ্যক খ্রিষ্টান নাগরিককে নিয়ে আসে। একাদশ শতকের অষ্টম দশক পর্যন্ত অর্থাৎ ৪৬৩ হিজরি সনে (১০৭১ খ্রিষ্টাব্দে) ঐতিহাসিক মানজিকার্টের যুদ্ধের সময় পর্যন্ত পরিস্থিতি এমনই ছিল। এরপর এন্টিয়কে ব্যাপকহারে সেলজুক ও আর্মেনীয়দের আগমন ঘটতে থাকে এবং এর ফলে এন্টিয়কের নাগরিক বিন্যাসে আবারও পরিবর্তন ঘটে। বরং এবার আর্মেনীয়রা নগরীটির সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকে পরিণত হয়। বাইজান্টাইনরা যদিও আর্মেনীয়দের প্রতি ঐতিহ্যগতভাবেই বিরাগভাজন ছিল; কিন্তু এ সময় সেলজুকদের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় বিপর্যস্ত বাইজান্টাইন শক্তি সেলজুকদের মোকাবেলা করার জন্য আর্মেনীয়দের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময়ে উদ্যোগী হয়। ফলে এন্টিয়к অঞ্চলে আর্মেনীয়দের কর্তৃত্ব ও প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং একপর্যায়ে তারা ধৃষ্টতা দেখিয়ে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধীনতা ত্যাগ করে। ফিলারেটোস (Philaretos Brachamios) নামক জনৈক আর্মেনীয় সেনাপতি ১০৭৭ খ্রিষ্টাব্দে (৪৬৯ হিজরি সনে) এডেসা নগরী অবরোধ করেন এবং বাইজান্টাইনদের পরাভূত করে সেখানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এর পরের বছরই অর্থাৎ ১০৭৮ খ্রিষ্টাব্দে (৪৭০ হিজরি সনে) ফিলারেটোস এন্টিয়কের বাইজান্টাইন প্রশাসককে হত্যা করে সেখানেও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। (৩০০)

অবশ্য এন্টিয়কে আর্মেনীয় শাসন মাত্র সাত বছর স্থায়ী হয়েছিল। ১০৮৫ খ্রিষ্টাব্দে (৪৭৭ হিজরি সনে) রোমান সেলজুক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা সুলায়মান বিন কুতুলমিশের হাতে নগরীটির পতন ঘটে (৩০১) এবং একটানা একশ উনিশ বছরের বিচ্ছিন্নতার পর পুনরায় নগরীটিতে ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। নতুন করে আবারও এন্টিয়কে সেলজুক ও অন্যান্য মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। মুসলমানরা এবার বাইজান্টাইন মতাদর্শের অনুসারী অর্থোডক্স খ্রিষ্টান ও বিগত কয়েক বছরে প্রচুর পরিমাণে বসতি স্থাপনকারী আর্মেনীয়দের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করতে থাকে।

এভাবে বিগত কয়েক বছরের ইতিহাস পর্যালোচনায় আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, এন্টিয়к পরিস্থিতি এ সময় তুলনামূলক জটিল আকার ধারণ করেছিল এবং নগরীটি একসঙ্গে তিনটি সম্প্রদায়ের বিরোধের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল—সেলজুক নেতৃত্বাধীন মুসলিম জাতি, বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য ও আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী। এর সঙ্গে এবার নতুন করে যুক্ত হতে যাচ্ছে পশ্চিম ইউরোপ থেকে আগত নতুন শক্তি—ক্রুসেডার বাহিনী!

১০. দশম ও সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্রুসেডার বাহিনীর অন্যতম সেনাপতি এবং হিংস্র ও দুর্বিনীত নরম্যান নেতা বোহেমন্ডের মনমস্তিষ্কজুড়ে এন্টিয়ক একটি বিশেষ স্বপ্নরূপে বিরাজমান ছিল। বোহেমন্ড কখনোই এ বিষয়টি ভুলতে পারেননি যে, এন্টিয়ক ছিল তার পিতা ও বিখ্যাত ইতালিয়ান নরম্যান নেতা রবার্ট গোয়েসকার্ডের স্বপ্নের নগরী। আরও সতেরো বছর পূর্বে ৪৭৩ হিজরি সনে (১০৮১ খ্রিষ্টাব্দে) রবার্ট এন্টিয়к দখলের জন্য একটি বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন এবং স্বয়ং বোহেমন্ডই সেই বাহিনীটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু বোহেমন্ড তখন সুরক্ষিত এন্টিয়কের পতন ঘটাতে ব্যর্থ হন।

এসব দস্যুর অভিধানে ব্যর্থতা অতি লাঞ্ছনাকর ও অপমানজনক একটি বিষয়। কারণ, তারা লুটতরাজ, দস্যুবৃত্তি ও চুরি-ডাকাতিমুক্ত জীবন কল্পনাই করতে পারে না। এ কারণেই বোহেমন্ড এন্টিয়কের কথা কখনোই ভুলতে পারেননি। তার কাছে এন্টিয়к ছিল পুরোনো প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষেত্র। এন্টিয়কের কর্তৃত্ব লাভের জন্য তিনি সবকিছু বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিলেন। বোহেমন্ডের অন্তরে খ্রিষ্টধর্মের প্রতি অনুরাগ, ক্রুশ প্রতীকের প্রতি মর্যাদাবোধ এসব বিষয়ের কোনো স্থান ছিল না; আল-কুদস বা তীর্থযাত্রীদের প্রতি তার হৃদয়ে সামান্য স্পন্দনও ছিল না। যদিও তিনি বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোসের প্রতি বাহ্যত হৃদ্যতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ প্রকাশ করেছিলেন; কিন্তু এন্টিয়к প্রশ্নে তিনি সম্রাট বা অন্যান্য ক্রুসেডার সেনাপতি কারোই তোয়াক্কা করতে রাজি ছিলেন না। এস্টিয়к ছিল তার কাছে সম্পূর্ণই ব্যক্তিগত ইস্যু। সবকিছু বিক্রি করে হলেও তিনি এন্টিয়কের মালিকানা লাভে উন্মুখ ছিলেন।

এই দশটি কারণে এন্টিয়ক পরিস্থিতি তখন অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। এন্টিয়к পরিণত হয়েছিল সকলের লক্ষ্যবস্তুতে। আর তাই এ অঞ্চলটিকে ঘিরে বিদ্যমান সকল শক্তির মধ্যে ঘনীভূত হচ্ছিল এক কঠিন সংঘাত পরিস্থিতি।

টিকাঃ
২৮৯. নববিধান, শিষ্যচরিত অধ্যায়, ১১/২৬।
২৯০. মুহাম্মাদ হামিদ আন-নাসির, আল-জিহাদ ওয়াত-তাজদীদ, পৃষ্ঠা: ৭৯ ও Runciman, op. cit., 1, p. 213.
২৯১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ২/৪৯৪-৯৫, ইবনে খালদুন, আল-ইবার ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খবার, ২/১০৫ ও ইয়াকুত আল-হামাবি, মুজামুল বুলদান, ১/২৬৯।
২৯২, আহমাদ ইবনে ইয়াহইয়া আল-বালাযুরি, ফুতুহুল বুলদান, পৃষ্ঠা: ১৬০।
২৯৩, Runciman, op. cit., 1, p. 213.
২৯৪. ইতালীয় নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস (১৪৫১-১৫০৬ খ্রি.)-এর সুবিখ্যাত অভিযাত্রার পূর্বে অর্থাৎ ইউরোপীয় মধ্যযুগ ও ধ্রুপদি সভ্যতার সময়ে পৃথিবীর যেসব অঞ্চল মানুষের জ্ঞাত ছিল, সেগুলোর পারিভাষিক নাম প্রাচীন বিশ্ব (Old World)। এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশ এবং তৎসংলগ্ন দ্বীপসমূহ এর অন্তর্ভুক্ত। এ অঞ্চলের আরেক নাম আফ্রো-ইউরেশিয়া। পঞ্চদশ শতাব্দীর পূর্বে মানুষের কাছে এই অংশটিই ছিল পৃথিবী। আমেরিকা অঞ্চল, ওশেনিয়া ও অ্যান্টার্কটিকা তখনও আবিষ্কৃত হয়নি। অপরদিকে এর পরবর্তীকালে আবিষ্কৃত দুই মহাদেশ উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার জন্য আধুনিক (নতুন) বিশ্ব (New world) পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়। ওশেনিয়া অঞ্চল ও অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ প্রাচীন বিশ্ব বা আধুনিক বিশ্ব কোনো পরিভাষারই অন্তর্ভুক্ত নয়। [অনুবাদক]
২৯৫. Grousset: Hist. des Croisades, 1, p. 72.
২৯৬. উক্ত অঞ্চলের অন্যান্য নদীর বিপরীতে এ নদীটি দক্ষিণ থেকে উত্তরে প্রবাহিত হওয়ায় এর নামকরণ করা হয়েছিল 'আছি' বা অবাধ্য নদী। ইংরেজিতে নদীটির নাম Orontes (ওরোন্টেস)। [অনুবাদক]
২৯৭. Chalandon: Premiere Croisade, p. 181.
২৯৮. ভূমধ্যসাগরের তীর থেকে এন্টিয়কের দূরত্ব ত্রিশ কিলোমিটার। [অনুবাদক]
২৯৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ২/৪৯৪-৯৫।
৩০০. হামিদ গানিম আবু সাঈদ, আল-জাবহাতুল ইসলামিয়া ফী মুওয়াজাহাতিল মুখাত্তাতাতিস সালিবিয়া, পৃষ্ঠা: ৯১।
০০১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ১০/১৩৮-১৩৯।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 এন্টিয়কের তৎকালীন প্রশাসক

📄 এন্টিয়কের তৎকালীন প্রশাসক


ক্রুসেড অভিযানের অব্যবহিত পূর্বে এন্টিয়কের প্রশাসক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন ইয়াগিসিয়ান (Yağısıyan) নামক জনৈক প্রতাপশালী তুর্কমেন সেনাপতি। ইয়াগিসিয়ানের আলোচনার মাধ্যমে আমরা উপলব্ধি করতে পারব যে, তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত একজন রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা। প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে তিনি অত্যুচ্চ প্রজ্ঞার অধিকারী ছিলেন। অবশ্য তিনি সমুন্নত ইসলামি জীবনধারা ও নীতি-আদর্শের অধিকারী ছিলেন না। তার কোনো নির্দিষ্ট নীতি ছিল না। আজ তিনি যার সঙ্গে মিত্রতা করতেন, আগামীকালই হয়তো স্বার্থের বিরোধের কারণে তার সঙ্গে শত্রুতাপূর্ণ আচরণ করতেন। (৩০২) তিনি আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করার মানসে লড়াই করতেন না; লড়াই করতেন টিকে থাকার জন্য এবং আপন কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য। অর্থাৎ তার সবকিছু জুড়ে ছিল পার্থিব স্বার্থচিন্তা।

এ জাতীয় শাসক-প্রশাসকগণ যতই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সামরিক দক্ষতার অধিকারী হন না কেন, উম্মাহর কল্যাণে এবং জাতির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রক্ষায় তাদের কোনো ভূমিকা থাকে না। আর তাই তাদের স্খলন ও পতনের সঙ্গে সঙ্গে পতন ঘটে তাদের অনুসারী জনগণের, পতন ঘটে তাদের শাসনাধীন নগর, জনপদ ও রাষ্ট্রের। প্রকৃত অর্থে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির নুসরত ও বিজয় একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়। আর আল্লাহ তাকেই বিজয় দান করেন, যে আল্লাহকে সহায়তা করে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
إِنْ تَنْصُرُوا اللَّهَ يَنْصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ
তোমরা যদি আল্লাহ (তাআলার দ্বীন)-এর সাহায্য করো, তবে তিনি তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের কদম অবিচলিত রাখবেন। [সুরা মুহাম্মাদ: ০৭]

আল্লাহ পাক আরও ইরশাদ করেন—
۞ وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ
বিজয় তো অন্য কারও পক্ষ থেকে নয়; কেবল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে লাভ হয়, যিনি ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার মালিক। [সুরা আলে-ইমরান : ১২৬]

আল্লাহর দ্বীনের সহায়তা-চিন্তা যাদের মানসপটে থাকে না, তারা যদি যুগের পর যুগ ক্ষমতার গদি কুক্ষিগত করে রাখে, সামরিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞান অর্জন করে এবং নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক বিষয়ে অসাধারণ ব্যুৎপত্তিও অর্জন করে, তবুও আল্লাহ তাআলা তাদেরকে কক্ষনো সহায়তা করবেন না।

আমরা যদি ইয়াগিসিয়ানের ইতিহাস অধ্যয়ন করি, তাহলে একদিকে যেমন তার স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে ধারণা অর্জন করতে পারব, অপরদিকে এর মধ্য দিয়ে এন্টিয়к অবরোধের পটভূমিও যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে পারব।

ইয়াগিসিয়ান ছিলেন বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের বিখ্যাত সুলতান মালিকশাহ বিন আলপ আরসালানের অন্যতম সুদক্ষ সেনাপতি। ৪৬৪ হিজরি হতে ৪৮৫ হিজরি (১০৭২-১০৯২ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত পারস্য, ইরাক ও শাম অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। মালিকশাহর ভাই তুতুশ বিন আলপ আরসালান তখন শাম শাসন করতেন। দীর্ঘ একশ উনিশ বছর পর যিনি এন্টিয়ককে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের হাত থেকে পুনরুদ্ধার করেছিলেন, সেই রোমান সেলজুক রাষ্ট্রের অধিপতি সুলায়মান বিন কুতুলমিশের সঙ্গে তুতুশের যুদ্ধ সংঘটিত হলে এন্টিয়к পুনরুদ্ধারের পরের বছরই ৪৭৮ হিজরি সনে (১০৮৬ খ্রিষ্টাব্দে) সুলায়মান নিহত হন। এন্টিয়к চলে যায় তুতুশের দখলে। (৩০৩) তবে ৪৭৯ হিজরি সনে (১০৮৭ খ্রিষ্টাব্দে) মালিকশাহ তার ভাইয়ের কাছ থেকে এন্টিয়к কেড়ে নেন এবং ইয়াগিসিয়ানকে নগরীটির প্রশাসনদায়িত্ব প্রদান করেন। (৩০৪) এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই তুতুশ ইয়াগিসিয়ানের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন। তবে ভাই মালিকশাহর সুবিস্তৃত ক্ষমতা ও প্রবল কর্তৃত্বের কারণে তুতুশ ইয়াগিসিয়ানের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেননি।

ইয়াগিসিয়ান এন্টিয়কের দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ বছর পর ৪৮৪ হিজরি সনে (১০৯২ খ্রিষ্টাব্দে) মালিকশাহ ইন্তেকাল করলে স্বাভাবিকভাবেই তুতুশ ও ইয়াগিসিয়ানের মধ্যে এন্টিয়কের কর্তৃত্ব নিয়ে প্রচণ্ড সংঘাত সৃষ্টি হওয়া প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু ইয়াগিসিয়ান এ সময় আপন কূটনৈতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে তুতুশের আস্থাভাজন ব্যক্তিতে পরিণত হতে সক্ষম হন এবং তুতুশ ইয়াগিসিয়ানকে এন্টিয়ক অঞ্চলের প্রশাসক হিসেবে মেনে নেন।

ইয়াগিসিয়ানের উদ্যোগে এরপর থেকে এন্টিয়কে জুমার খুতবায় তুতুশের নাম উচ্চারিত হতে থাকে। (৩০৫) ৪৮৭ হিজরি সনে (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) তুতুশ তার ভ্রাতুষ্পুত্র বারকিয়ারুক বিন মালিকশাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ালে ইয়াগিসিয়ান তুতুশের পক্ষে যুদ্ধ করেন। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালে ইয়াগিসিয়ান হতোদ্যম হয়ে সরে পড়লে তুতুশ পরাজিত ও নিহত হন। (৩০৬) তুতুশের মৃত্যুর ফলে ইয়াগিসিয়ান পুনরায় এন্টিয়কের একচ্ছত্র কর্তৃত্বের অধিকারী হন। ওদিকে তুতুশের শামকেন্দ্রিক সেলজুক রাষ্ট্র তার দুই পুত্রের মাঝে বিভক্ত হয়ে যায়। রিজওয়ান বিন তুতুশ গ্রহণ করেন আলেপ্পোর দায়িত্ব আর দাক্কাক বিন তুতুশ গ্রহণ করেন দামেশকের দায়িত্ব। (৩০৭)

যেন তৎকালীন রীতি মেনেই এরপর রাজ্যবিস্তৃতি ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা নিয়ে শুরু হয় ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত। রিজওয়ান ও দাক্কাক উভয়ে নিজ শাসনাধীন অঞ্চলের পার্শ্ববর্তী নগর-জনপদ দখল করার অভিলাষী হয়ে ওঠেন। আলেপ্পোর শাসক রিজওয়ান নিকটবর্তী এন্টিয়ক নগরী দখলের জন্য মরিয়া হয়ে উঠলে তার সঙ্গে ইয়াগিসিয়ানের বিরোধ ও সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। তবে ইয়াগিসিয়ান রিজওয়ানকে পরাজিত করে এন্টিয়কে নিজ কর্তৃত্ব ধরে রাখতে সক্ষম হন। এরপর ৪৮৯ হিজরি সনে (১০৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) দুই ভাই রিজওয়ান ও দাক্কাকের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। বিস্ময়ের বিষয়—ইয়াগিসিয়ান এবার রিজওয়ানের পক্ষ অবলম্বন করেন! ইয়াগিসিয়ানের সহায়তায় রিজওয়ান দাক্কাকের কাছ থেকে দামেশকের অধিকার কেড়ে নিতে চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। (৩০৮) কিছুদিন পর দাক্কাক রিজওয়ানের কাছ থেকে আলেপ্পোর অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে ইয়াগিসিয়ান এবার রিজওয়ানের বিপক্ষে দাক্কাকের পক্ষে যুদ্ধ করেন! অবশ্য দাক্কাক-ইয়াগিসিয়ান সম্মিলিত বাহিনীও আলেপ্পো জয় করতে ব্যর্থ হয়। (৩০৯)

ইয়াগিসিয়ান মূলত সেসব ভাড়াটে সৈন্যের মতো জীবন কাটাতেন, যারা এক-দুই পয়সা কামাই করার আশায় কোনো বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধ করে; এরপর প্রতিপক্ষ যদি দুই পয়সার জায়গায় চার পয়সা প্রদানের আশ্বাস দেয়, তাহলে দল পাল্টে তাদের পক্ষেই ভিড়ে যায় এবং ভুলে যায় প্রথম দলের সঙ্গে মিত্রতা ও তাদের নিমকভোগের কথা!

এসব ঘটনা আমাদের সামনে কেবল এন্টিয়к প্রশাসক ইয়াগিসিয়ানের চরিত্রই তুলে ধরে না; বরং সামগ্রিকভাবে সে যুগের শাসকগণের স্বভাব-প্রকৃতি সম্পর্কেও ব্যাপক ও বিস্তৃত ধারণা প্রদান করে। আমরা উপলব্ধি করতে পারি-ক্রুসেডার বাহিনী যখন ইসলামি প্রাচ্যে আগ্রাসন চালাচ্ছিল, তখন কারা ছিল শাম অঞ্চলের বিভিন্ন নগরীর প্রশাসক।

তবে সমস্যা কেবল শাসক-প্রশাসকদেরই ছিল না। শাসকগণ তো একা একা যুদ্ধ করেন না। তারা যুদ্ধ করেন নিজ নিজ বাহিনী ও সৈন্যদের নিয়ে আর সৈন্যদের পেছনেই সমর্থন জোগাতে থাকে সাধারণ জনগণ। যে স্থূলবুদ্ধিসম্পন্ন সেনাদল পরিস্থিতি সম্পর্কে বেখবর থাকে এবং যে বিবেকশূন্য জনসাধারণ থাকে চলমান ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে উদাসীন, তারা প্রকৃতপক্ষে এমন দুর্যোগ ও সংকটেরই উপযুক্ত।

১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরে (৪৯০ হিজরি সনে) ক্রুসেডার বাহিনী এন্টিয়কে পৌঁছানোর পূর্বের দশ বছর ধরে ইয়াগিসিয়ানই ছিলেন এন্টিয়কের প্রশাসক। এন্টিয়কের সবচেয়ে নিকটবর্তী ইসলামি নগরী ছিল আলেপ্পো। ক্রুসেডারদের সম্মিলিত বাহিনী যখন প্রবল বিক্রমে এন্টিয়к অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছিল, ইয়াগিসিয়ান তখন সম্পূর্ণই নিঃসঙ্গ ও মিত্রহারা! আলেপ্পোর প্রশাসকের সঙ্গে তো চলছিল চরম বিরোধ ও সংঘাত; আশেপাশের অন্যান্য নগরীর সঙ্গেও তার সম্পর্ক ছিল যথেষ্ট দুর্বল ও সম্পূর্ণই পার্থিব স্বার্থনির্ভর।

ওদিকে ক্রুসেডাররা আসছে অস্ত্রবল ও জনবলে বলীয়ান হয়ে। এন্টিয়কে পৌঁছে তারা নগরীটিকে ঘিরে কঠিন অবরোধ আরোপ করে।

টিকাঃ
০০২. আলি ছাল্লাবি, দাওলাতুস সালাজিকা, পৃষ্ঠা: ৪৬৯।
০০০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৬/৩০০।
৩০৪. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/১৯।
০০০. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১০৮।
০০০. প্রাগুক্ত, ৩/১১১।
০০৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ১০/১৪৪-৪৫ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১২০।
৩০৮. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৩২।
৩০৯. আবুল ফিদা, আল-মুখতাসার ফী তারীখিল বাশার হাওয়াদিছু সানাতা ৪৯১ হি.।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 বোহেমন্ডের চতুরতা

📄 বোহেমন্ডের চতুরতা


বোহেমন্ডের নেতৃত্বে ইতালিয়ান নরম্যান বাহিনী এন্টিয়ক নগরীর উত্তর প্রান্তে পল (Saint Paul's gate) নামক ফটকের কাছে অবস্থান গ্রহণ করে। গডফ্রের বাহিনী অবস্থান গ্রহণ করে উত্তর-পশ্চিম দিকে ডিউক (Duke's gate) ফটকের কাছে। আর রবার্ট, স্টিভেন, হিউ ও ৪র্থ রেমন্ডের নেতৃত্বাধীন অন্যান্য সৈন্য অবস্থান গ্রহণ করে পশ্চিম দিকে ডগ (The dog's gate) ফটকের সামনে। (৩১০) পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, পূর্ব ও দক্ষিণ দিক থেকে নগরীটি সুউচ্চ পর্বতমালা দ্বারা বেষ্টিত ছিল। তাই এই দুই দিকে কোনো সৈন্যদল অবস্থান গ্রহণ করেনি। (৩১১)

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অভিজ্ঞ সেনাপতি ট্যাটিকিয়াসের নেতৃত্বে বাইজান্টাইন বাহিনীর একটি অংশও অবরোধে অংশ নিয়েছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল এন্টিয়কের পতনের পর সেখানে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধিকার ও স্বার্থ নিশ্চিত করা।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, এন্টিয়কে প্রচুর পরিমাণ অর্থোডক্স খ্রিষ্টান ও আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর লোকজন বসবাস করত। ল্যাটিন বর্ণনানুসারে ক্রুসেডার বাহিনী উপস্থিত হতেই এসব খ্রিষ্টান নাগরিক নগরী থেকে বেরিয়ে আসে এবং ক্রুসেডারদের প্রচেষ্টা সহজসাধ্য করার জন্য নগরীর ভেতর-বাইরের বিভিন্ন গোপন তথ্য, প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, রসদ ও সৈন্যের পরিমাণসহ বিভিন্ন তথ্য ক্রুসেডারদের কাছে সরবরাহ করে। (৩১২) ইয়াগিসিয়ান এ জাতীয় পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে যথেষ্ট পরিমাণ রসদ প্রস্তুত রেখেছিলেন। (৩১৩) ক্রুসেডাররাও আসার পথে বিভিন্ন জনপদে লুটপাট চালিয়ে প্রচুর পরিমাণ রসদপত্র সঙ্গে নিয়ে এসেছিল।(৩১৪) এ ছাড়াও এন্টিয়কের অতি নিকটে ওরোন্টেস নদীর মোহনায় অবস্থিত সেন্ট সাইমন নৌবন্দরে ইতিমধ্যে ক্রুসেডারদের জন্য প্রয়োজনীয় রসদপত্র নিয়ে ইতালির জেনোভা থেকে একটি নৌবহর এসে পৌঁছেছিল।(৩১৫)

ওদিকে এন্টিয়কের নিকটবর্তী আরেক নৌবন্দর লাতাকিয়া তখন ছিল বোলোনিয়ান (Boulogne-Billancourt) দস্যু ওয়েনমারের দখলে।(৩১৬) সেও ক্রুসেডারদের প্রয়োজনীয় রসদপত্র দিয়ে সহায়তা করত।

অবরোধ শুরু করার পরই ক্রুসেডাররা এন্টিয়кগামী সকল পথ বন্ধ করে দেয় এবং পশ্চিমের নৌবন্দরগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ফলে অবরুদ্ধ মুসলমানদের জন্য নগরীর অভ্যন্তরে বিদ্যমান অস্ত্রশস্ত্র ও রসদসামগ্রী ব্যতীত বাইরে থেকে কোনো সাহায্যপ্রাপ্তির সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

এন্টিয়কে অবরুদ্ধ ইয়াগিসিয়ান পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন ইসলামি নগরীর প্রশাসক ও নেতৃবৃন্দের কাছে সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন। যেহেতু তিনি কিছুদিন পূর্বেই আলেপ্পোর শাসনকর্তা রিজওয়ানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন এবং তার মিত্রতা পরিত্যাগ করে দাক্কাকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন, তাই স্বাভাবিকভাবেই রিজওয়ানের কাছে সাহায্য চাওয়ার কোনো পথ ইয়াগিসিয়ানের সামনে খোলা ছিল না। বাধ্য হয়ে ইয়াগিসিয়ান দামেশকের অধিপতি দাক্কাক ও হিমসের শাসনকর্তা জানাহুদ্দৌলার কাছে সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন। অথচ দামেশক ও হিমস এন্টিয়к থেকে একশ চল্লিশ কিলোমিটারেরও অধিক দূরত্বে অবস্থিত। এমনকি তিনি সাতশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মসুলের প্রশাসক কারবুগার কাছেও সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন; সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন অনেক অনেক দূরে অবস্থিত পারসিক সেলজুক সাম্রাজ্যের শাসনকর্তা সুলতান বারকিয়ারুকের কাছেও।(৩১৭) কিন্তু এন্টিয়к থেকে ষাট কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে অবস্থিত আলেপ্পোর শাসনকর্তা রিজওয়ানের কাছে সাহায্য চাওয়ার কোনো সুযোগ ইয়াগিসিয়ানের ছিল না!

অবরোধ চলতে থাকে। অতিবাহিত হতে থাকে কঠিন ও ক্লান্তিকর একেকটি দিন। অবরুদ্ধ নগরীতে বাইরে থেকে কোনো সহায়তা না পৌঁছতে পারায় মুসলমানদের অবস্থা যেমন সংকটাপন্ন ছিল, তেমনই ক্রুসেডাররাও সুস্পষ্ট সংকটের মাঝে দিনাতিপাত করছিল। কারণ, বিশাল ক্রুসেডার বাহিনীর জন্য এই সীমিত অঞ্চলে পর্যাপ্ত ও যথেষ্ট পরিমাণ রসদসামগ্রী ছিল না। আবার রসদ সংগ্রহের জন্য তাদের পক্ষে এন্টিয়к থেকে বেশি দূরে যাওয়াও সম্ভব ছিল না। কারণ, সেক্ষেত্রে অবরোধ দুর্বল হয়ে পড়বে এবং অবরুদ্ধ মুসলমানরা বের হওয়ার সুযোগ পেয়ে যাবে। একবার ক্রুসেডার বাহিনীর কিছু সদস্য পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জনপদে হামলা ও লুটতরাজ চালানোর উদ্দেশ্যে এন্টিয়к থেকে দূরে সরে পড়লে ইয়াগিসিয়ান অন্যদের ওপর হামলা চালান এবং বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হন। কিন্তু বোহেমন্ড তার সামরিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে অন্যরা ফিরে আসা পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন। (৩১৮)

এভাবে অবরোধকারী ও অবরুদ্ধ উভয় পক্ষেরই কঠিন সময় অতিবাহিত হতে থাকে। বরং ক্রুসেডারদেরই বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছিল। এ বিষয়টিও বিশেষত লক্ষণীয় যে, অবরোধ শুরু হয় ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ২১ অক্টোবর। তখন যেহেতু শীতের মৌসুম শুরু হয়ে গিয়েছিল, তাই ক্রুসেডার বাহিনীকে ক্ষুধার যন্ত্রণা ভোগ করার পাশাপাশি উন্মুক্ত প্রান্তরে শীতের কষ্টও ভোগ করতে হচ্ছিল।

অবরোধের দুই মাসেরও অধিক সময় অতিবাহিত হওয়ার পর দামেশক থেকে সেলজুক সুলতান দাক্কাকের নেতৃত্বে এবং হিমস থেকে জানাহুদ্দৌলা হুসাইন মালাইবের নেতৃত্বে সাহায্যকারী বাহিনী এসে পৌঁছায়। আগত বাহিনী ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরের শেষ দিকে এন্টিয়কের দক্ষিণাঞ্চলে বারা (৩১৯) নামক এলাকায় খাদ্যজোগানের সন্ধানে বের হওয়া ক্রুসেডার বাহিনীর মুখোমুখি হয়। (৩২০) যুদ্ধে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জিত না হলেও মুসলিম বাহিনীর সুস্পষ্ট প্রাধান্য প্রতিভাত হচ্ছিল। (৩২১) কিন্তু হঠাৎ করেই দাক্কাক দামেশকে ফিরে নিজ রাজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও নতুন করে পরিস্থিতি বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেন! এ সময় ক্রুসেডাররাও বার্তা পাঠিয়ে তাকে প্রভাবিত করে। ক্রুসেডাররা বার্তায় উল্লেখ করে যে, তারা এ অঞ্চলে এসেছে এডেসা ও এন্টিয়কসহ উত্তরের কেবল সেসব নগরী পুনরুদ্ধার করতে, যেগুলো ইতিপূর্বে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের কর্তৃত্বাধীন ছিল। দামেশক যদি তাদের সঙ্গে বিরোধে না জড়ায়, তাহলে তাদের দামেশক নিয়ে কোনো ধরনের চিন্তা-ভাবনা নেই। ক্রুসেডারদের অম্ল-মধুর বার্তায় 'আশ্বস্ত' হয়ে দাক্কাক দামেশকে ফিরে যান আর এন্টিয়ককে রেখে যান আপন পরিণতি বরণের অপেক্ষায়! (৩২২)

দাক্কাকের লাঞ্ছনাকর প্রস্থানে পরিস্থিতি আবারও কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু নতুন খ্রিষ্টাব্দ ও জানুয়ারি মাস শুরু হতেই প্রচণ্ড শীত ও রসদ-স্বল্পতার কারণে ক্রুসেডার শিবির প্রচণ্ড সংকটের মুখোমুখি হয়। সাধারণ সৈন্যদের মধ্যে অসন্তোষ শুরু হয়, জনেজনে ক্ষোভের আওয়াজ ঘনীভূত হয়, এমনকি অবরোধ প্রত্যাহারের দাবিও ওঠে। ক্রুসেডারদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন বাহিনীর সদস্যগণ অবরোধ ছেড়ে এ অঞ্চল থেকে পালাতে শুরু করে। আকস্মিকভাবে এই পলায়নকারীদের নেতৃত্বে ছিলেন ধর্মযাজক পিটার, যিনি ইতিপূর্বে ফ্রান্স থেকে স্বেচ্ছাসেবী সৈন্য সংগ্রহ করেছিলেন! এর মাধ্যমে এ দাবি আরও দৃঢ়তা লাভ করে যে, তার চিন্তা-ভাবনায় মোটেও ধর্মীয় চেতনাবোধ বিদ্যমান ছিল না। অবশ্য বোহেমন্ডের ভাগ্নে টেনক্রেড পিটারের পিছু নেন এবং কনস্টান্টিনোপল অভিমুখে রওনা হওয়া পিটারের নাগাল পেয়ে তাকে ফিরে আসতে বাধ্য করেন। (৩২৩) পিটার লাঞ্ছনাকর ও কলঙ্কজনক অবস্থায় এন্টিয়কে ফিরে আসেন। এর মাধ্যমে ক্রুসেড অভিযানের প্রকৃত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পুরোপুরি সুস্পষ্ট হয়ে যায়।

নরম্যান সেনাপতি বোহেমন্ড এ সবকিছুর ওপর পূর্ণ দৃষ্টি রাখছিলেন। তিনি পরিস্থিতির প্রতিটি পরিবর্তন ও বাঁককে নিজের স্বার্থে এবং এন্টিয়কের একচ্ছত্র অধিপতি হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজে লাগাতে সচেষ্ট ছিলেন। তিনি জানতেন যে, এন্টিয়কের কর্তৃত্ব নিয়ে শীঘ্রই ক্রুসেডার বাহিনীর অন্য সেনাপতিগণ তার সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়বে। অধিকন্তু তার বন্ধু বাইজান্টাইন সম্রাটও তাকে এন্টিয়কে কর্তৃত্ব বিস্তার করার সুযোগ দিতে রাজি হবেন না। (৩২৪) কারণ, এন্টিয়к এ অঞ্চলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অন্যতম কাঙ্ক্ষিত নগরী। সুতরাং এই পরিস্থিতিতে বোহেমন্ড কী করবেন?!

বোহেমন্ড ছিলেন চূড়ান্ত স্তরের চাতুর্য ও প্রতারণা-গুণের অধিকারী! অবরোধের এই কঠিনতর পরিস্থিতিতে এসে বোহেমন্ড ঘোষণা করেন— তার পক্ষে আর অভিযান চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ইতালিতে নিজ রাজ্যে অনিবার্য কিছু ব্যস্ততা ও বাধ্যবাধকতা থাকায় তিনি অচিরেই তার বাহিনীকে নিয়ে অবরোধ প্রত্যাহার করে ইতালিতে ফিরে যাবেন! (৩২৫) নিঃসন্দেহে তার এ ঘোষণা ছিল ক্রুসেডার বাহিনীর জন্য এক বিরাট আঘাত! কারণ, সকলে জানত-সম্মিলিত ক্রুসেডার বাহিনীর মধ্যে বোহেমন্ডের বাহিনীই সবচেয়ে শক্তিশালী আর সেনাপতি বোহেমন্ডও সম্ভবত রণদক্ষতা, সামরিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও যুদ্ধক্ষেত্রে অটল-অবিচল থাকার বিবেচনায় বাহিনীর শ্রেষ্ঠতম সেনাপতি। আর তাই বোহেমন্ডের ইতালিতে ফিরে যাওয়ার অর্থ ক্রুসেড অভিযানই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়া, অর্জিত ও প্রত্যাশিত সকল সাফল্য হারিয়ে যাওয়া এবং এ পর্যন্ত ব্যয় হওয়া জান-মাল ও সময় সবকিছু বিনষ্ট হওয়া।

নিঃসন্দেহে বোহেমন্ডের এই হুমকি ক্রুসেডারদের জন্য ছিল এক চরম দুর্যোগ। ধূর্ত ও প্রতারক সেনাপতি বোহেমন্ড ক্রুসেডার বাহিনীতে নিজের মূল্য সম্পর্কে জানতেন। মুখে যদিও তিনি ফিরে যাওয়ার কথা বলছিলেন; কিন্তু তার মানসপটে মোটেও প্রত্যাবর্তনের চিন্তা ছিল না। তিনি তো এ অঞ্চলে 'প্রভু মাসিহ'-এর সহায়তা কিংবা তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আগমন করেননি; আগমন করেননি বাইজান্টাইন সম্রাটের মিত্রতার দাবিতেও; তিনি এসেছেন এন্টিয়কের জন্য; শুধুই এন্টিয়কের অধিপতি হওয়ার জন্য। সুতরাং তার এই অবস্থান ছিল নিছক একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চালমাত্র। স্বীকার করতেই হবে, রাজনীতির খেলার ময়দানে বোহেমন্ড পেশাদারিত্বের সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠাই প্রদর্শন করছিলেন!

বোহেমন্ডের ঘোষণা শুনে ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দের অন্তরে ভীতি ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। সকলে একত্র হয়ে তাকে তাদের সঙ্গ প্রত্যাহার না করার অনুরোধ করে। এরপর সকলে একমত হয় যে, এন্টিয়কের পতন হলেই তারা সকলে কোনো প্রকার অংশীদারিত্বের দাবি না তুলে এন্টিয়কের পূর্ণ কর্তৃত্ব বোহেমন্ডের হাতে তুলে দেবে! লক্ষ্য বাস্তবায়ন হওয়ায় বোহেমন্ড এবার তাদের অনুরোধ মেনে নিয়ে আপাতত 'ত্যাগ' স্বীকার করার এবং তাদের সঙ্গে থেকে সর্বোচ্চ সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দেন!

এভাবে বোহেমন্ড ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণকারী সেনাপতিদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। (৩২৬)

কিন্তু এখনো একটি সমস্যা রয়ে গেছে। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, ট্যাটিকিয়াসের নেতৃত্বে বাইজান্টাইন বাহিনীর একটি অংশও এন্টিয়к অবরোধে শরিক ছিল। অধিকন্তু অন্যান্য ক্রুসেডার নেতার সঙ্গে বোহেমন্ডও কনস্টান্টিনোপল চুক্তিতে শরিক ছিল, যাতে এন্টিয়к নগরী বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের হাতে তুলে দেওয়ার শর্তের পাশাপাশি বাইজান্টাইন সম্রাটের আনুগত্য ও বশ্যতার শপথও নেওয়া হয়েছিল। (৩২৭) এ সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে?!

বোহেমন্ড এবার বাইজান্টাইন সেনাপতি ট্যাটিকিয়াসকে উত্তেজিত করতে শুরু করেন। তিনি অবরোধে কোনো ধরনের বাইজান্টাইন সহায়তার উপস্থিতি অস্বীকার করেন। বরং এর পরপরই তিনি অতি মারাত্মক ও কঠিন এক চাল চালেন। তিনি প্রচার করতে থাকেন যে, ট্যাটিকিয়াস গোপনে মুসলিম তুর্কিদের সঙ্গে আঁতাঁত করে ক্রুসেডারদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন।

ইতিপূর্বে নিকিয়া পতনের সময়ও বাইজান্টাইনরা বিশ্বাসভঙ্গ করেছিল। এখনো যে তা ঘটছে না, তার নিশ্চয়তা কী?!

বোহেমন্ডের এই অপপ্রচারে ট্যাটিকিয়াস উত্তেজিত ও ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন। তিনি অন্যান্য সেনাপতির কাছে গিয়ে বোহেমন্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানান। কিন্তু তারাও তো বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের আনুগত্য ও দায়ভার থেকে নিষ্কৃতির সুযোগ তালাশ করছিল। তারা তাকে সাফ জানিয়ে দেয় যে, তাদের সংকটের সময় বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য উল্লেখযোগ্য কোনো সহায়তা করেনি। সুতরাং এখন বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের আনুগত্যের জোয়াল কাঁধ থেকে নামিয়ে ফেলার সময় হয়ে গেছে। এর মাধ্যমে ক্রুসেডাররা তাকে বুঝিয়ে দেয় যে, তারা সামনে আর চুক্তির দাবি মেনে চলবে না। এতক্ষণে ট্যাটিকিয়াস নিজের নাজুক অবস্থা উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। রাতের অন্ধকারে তিনি সেন্ট সাইমন বন্দর হয়ে সাইপ্রাসের উদ্দেশ্যে পালিয়ে যান। (৩২৮)

এভাবে বোহেমন্ডের দ্বিতীয় সমস্যারও সমাধান হয়ে যায় এবং অন্তত এন্টিয়к পতনের সময়ে হলেও বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যকে ময়দান থেকে দূরে রাখার লক্ষ্য বাস্তবায়ন হয়। এখন বোহেমন্ড নিশ্চিত যে, এন্টিয়কের পতন ঘটলে এন্টিয়к একান্ত তারই হবে, অন্য কারও নয়। এবার শুধু ধৈর্য ধরে শিকার মুঠোয় পুরে নেওয়ার অপেক্ষা!

বোহেমন্ড নতুন করে ক্রুসেডার বাহিনীকে বিন্যস্ত করেন এবং বিভিন্ন অংশকে আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় খাদ্য ও রসদ সংগ্রহে প্রেরণ করেন। এর পাশাপাশি তিনি ক্রুসেডার বাহিনীর সেনাপতি ও সাধারণ সৈন্যদের অন্তরে বীরত্ব ও উদ্দীপনা জাগাতে শুরু করেন। (৩২৯)

টিকাঃ
Guillaman de tyr 1. pp.174-175.
ইয়াকুত আল-হামাবি, মুজামুল কুলদান, ভুক্তি: আন্তাকিয়া।
Gesta Francorum, p. 69.
Runciman, op. cit., 1, p. 215.
৩১৪. Raymond d’ Agueiler, in peters, pp. 160.ff; William of Tyre, 1, pp. 204-220; Hagenmeyer, "Chronologie", pp. 514-516, 529-530.
৩১৫. Raymond d' Agiles (Hist. Occid, LII), p. 242 & Carfo (Hist., Occid V), p. 50.
৩১৬. Heyd: Hist. du Commerce, 1, p. 133.
৩১৭. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৩৪।
Idem. P. 202.
০১৯. বারা: শামের ইদলিব প্রদেশের আরিহা অঞ্চলের একটি জনপদ। বারা এলাকায় প্রাচীন একটি দুর্গ আছে, যার ভগ্নাবশেষ এখনো তার বিশালতার সাক্ষ্য বহন করে। মুজামুল বুলদান।
০২০. Setevenson: op. cit., p. 26.
০২. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৩২।
০২২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৫।
০২০, Gesta Francorum, pp. 77-79.
৩২৪. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৩৫।
৩২৫. Grousset: Hist, des Croisades, 1, p. 70.
৩২৬. রানচিমান, তারীখুল হুরূবিস সালিবিয়াহ, ১/৩১৬-১৭।
০২৭. Chalandon: Alexis Comnene, p. 201. & Premiere Croisade, p. 193; Brehier: op. cit., p. 213.
৩২৮. Setton: op. cit., pp. 313-314; Runciman, op. cit., 1, p. 224.
৩২৯. Michaud: op. cit., 1, p. 304.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 উবায়দি প্রতিনিধিদল

📄 উবায়দি প্রতিনিধিদল


এরই মাঝে ১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে (৪৯১ হিজরি সনে) এমন এক ঘটনা ঘটে, যা চলমান পরিস্থিতিকে অনেকটা বদলে দেয় এবং ক্রুসেড শিবিরে দৃশ্যমান শক্তি বৃদ্ধি করে। এ সময় মিশর থেকে একটি প্রতিনিধিদল যৌথ স্বার্থ নিশ্চিত করতে ক্রুসেডারদের সঙ্গে মতবিনিময় ও সমঝোতার জন্য আগমন করে!

মিশরে তখন ফাতিমি নামে প্রসিদ্ধ উবায়দিদের শাসন চলছিল। আমরা পূর্বে যেমন বলে এসেছি—তারা ছিল শিয়া ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। সুন্নি সেলজুকদের সঙ্গে শিয়া উবায়দিদের ব্যাপক বিরোধ ছিল।

একইভাবে উবায়দিরা সুন্নি আব্বাসি খিলাফতের সঙ্গেও বিরোধ জিইয়ে রেখেছিল। আর তাই উবায়দিরা এ সময় সুন্নি সেলজুকদের দমন করার জন্য ক্রুসেডারদের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময়ের পরিকল্পনা করে! তৎকালীন উবায়দি সাম্রাজ্যের খলিফা ছিলেন মুসতালি বিল্লাহ। তবে তখন চলছিল উবায়দি সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় স্তর তথা উজিরদের অবাধ কর্তৃত্বের যুগ। ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি ছিল উজির আফজাল বিন বদর আল-জামালির হাতে।

উবায়দি প্রতিনিধিদল ক্রুসেডারদের শাম অঞ্চলে পারস্পরিক বণ্টননীতি গ্রহণের প্রস্তাব দেয়। তাদের প্রস্তাব ছিল—এন্টিয়к ও উত্তরের নগরীগুলো ক্রুসেডাররা লাভ করবে আর বাইতুল মুকাদ্দাসে থাকবে উবায়দিদের কর্তৃত্ব। কদিন পূর্বেই উবায়দিরা বাইতুল মুকাদ্দাসে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। ৪৯১ হিজরি সনে (১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দে) সেলজুকরা যখন এশিয়া মাইনর অঞ্চলে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যস্ত ছিল, তখন সুযোগ কাজে লাগিয়ে উবায়দিরা বাইতুল মুকাদ্দাস দখল করে নিয়েছিল। (৩৩০)

নিঃসন্দেহে উবায়দি প্রতিনিধিদলের আগমন ছিল ক্রুসেড শিবিরের জন্য অনেক বড় এক সুসংবাদ; বিপরীতে তা ছিল মুসলিম উম্মাহর বুকে বরং পৃষ্ঠদেশে এক প্রচণ্ড ছুরিকাঘাত! এর নেতিবাচক প্রভাব ছিল কল্পনারও ঊর্ধ্বে। যেমন:

১. উবায়দি প্রতিনিধিদলের আগমনের ফলে ক্রুসেডার বাহিনীর মনোবল ও আত্মবিশ্বাস অনেক গুণ বেড়ে যায়। কারণ, তারা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে, তাদের প্রতিপক্ষ পারস্পরিক হানাহানিতে ভগ্নপ্রায় এক জাতি। তারা লড়ছে এমন এক জাতির সঙ্গে, যাদের একমাত্র লক্ষ্য সম্পদ ও ভূখণ্ড। তারা নিজেরা একে অপরকে বিক্রি করে দিতে প্রস্তুত আছে; এমনকি ক্রেতা পরম শত্রু ক্রুসেডাররা হলেও!

২. উবায়দিদের এই প্রচেষ্টা পরবর্তীকালে সুন্নি সেলজুকদের বিভক্তি ও অস্থিরতার কারণে পরিণত হয়। উত্তর দিক থেকে ক্রুসেডারদের আগ্রাসন আর দক্ষিণ দিক থেকে শিয়া উবায়দিদের আক্রমণ— একই সঙ্গে দুই শত্রুর মোকাবিলা করার চিন্তা সেলজুকদের ভীষণ উদ্বিগ্ন করে তোলে।

৩. ক্রুসেডাররা আপাতত মিশরের দিক থেকে আক্রমণের আশঙ্কা থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে যায়। মিশর ছিল বিরাট সামরিক শক্তির অধিকারী। কেবল প্রচুর দক্ষ জনবলই নয়; মিশরের ছিল শক্তিশালী নৌবহর। যদি মিশরের সামরিক শক্তি নিষ্ঠাবান মুসলমানদের হাতে থাকত, তাহলে নিশ্চিতভাবেই তা ব্যবহার করে এন্টিয়কের পরিস্থিতি পাল্টে দেওয়া যেত।

৪. এটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, উবায়দি প্রতিনিধিদলের আগমন ছিল প্রকারান্তরে ইসলামি ভূখণ্ডের ওপর এই নতুন ক্রুসেড কাঠামোর অধিকারকে মিশর কর্তৃক স্বীকৃতিদান এবং এই স্বীকারোক্তি যে, ক্রুসেডাররা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এন্টিয়к ভূমির বৈধ হকদার। (৩৩১) আর তাই ভবিষ্যতে মুসলমানদের এই ভূখণ্ড দাবি করার কোনো অধিকার নেই। কারণ, মুসলমানরা তো বাইতুল মুকাদ্দাসের বিনিময়ে এই ভূখণ্ড ক্রুসেডারদের দিয়ে দিয়েছে। কিছুদিন পর মানুষ ভুলেই যাবে যে, এটি কোনো বিনিময় চুক্তি নয়; বরং উভয় ভূখণ্ডই মুসলমানদের ছিল!

নিঃসন্দেহে মিশরের উবায়দি সাম্রাজ্যের এই পদক্ষেপ ছিল সর্ব বিবেচনায়ই সম্পূর্ণ বিশ্বাসঘাতকতা!

ক্রুসেডাররা মনেপ্রাণে বাইতুল মুকাদ্দাস দখলের বিষয়ে পূর্ণ সংকল্পবদ্ধ থাকলেও বাহ্যিকভাবে উবায়দি প্রতিনিধিদলকে সাদরে স্বাগত জানায় এবং সর্বত্র প্রকাশ্যে এই চুক্তির কথা ঘোষণা করতে থাকে। মূলত তারা এ প্রস্তাব সীমিত সময়ের জন্য গ্রহণ করেছিল। (৩৩২) ইতিপূর্বে তারা যেমন বাইজান্টাইন সম্রাটকে প্রদত্ত অঙ্গীকারের কথা ভুলে গিয়েছিল, ভবিষ্যতে ভুলে যাবে উবায়দিদের প্রদত্ত অঙ্গীকারের কথাও! তাদের পরিভাষায় এরই নাম 'রাজনীতি'। যদিও এ ধরনের ছেলে-ভোলানো রাজনীতি কেবল নির্বোধ ও সরল ক্রেতাদের সঙ্গেই কাজে লাগে; কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো তখনকার বেশিরভাগ মুসলিম নেতা এই দুই গুণের কোনো একটি বা যুগপৎ উভয়টির অধিকারী ছিল!

যাই হোক, এন্টিয়к অবরোধ চলাকালে এই ছিল শিয়া উবায়দি সাম্রাজ্যের অবস্থান।

টিকাঃ
৩০০. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৩৫।
০০১. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/১৬৩।
০০২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪১৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00