📄 বল্ডউইনের লালসা এবং বাইজান্টাইনদের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ
আর্মেনীয় বন্ধুর পরামর্শ শুনে বল্ডউইনের লোভাতুর চোখ চকচক করে ওঠে। তিনি এবার তারসুস ত্যাগ করে পূর্ব দিকে অগ্রসর হন। পথে মপসুয়েসটিয়া নগরীর প্রবেশদ্বারে তার টেনক্রেডের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে যায়। তারসুসের নগরপ্রাচীরের বাইরে নিঃশেষ হওয়া ইতালিয়ান সৈন্যদের ইস্যুকে কেন্দ্র করে উভয়ের মধ্যে এ সময় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। (২৭৪) শেষ পর্যন্ত উভয়ে সমঝোতায় উপনীত হন এবং মূল ক্রুসেডার বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার লক্ষ্যে এন্টিয়ক অভিমুখে রওনা হন।
বিচ্ছিন্ন বাহিনীদুটি মূল বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হতেই বল্ডউইনের ভাই গডফ্রেসহ সকল সেনাপতি বল্ডউইনকে তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করতে থাকে। সকলের সম্মিলিত আগ্রাসী আচরণে বল্ডউইন বিক্ষুব্ধ হয়ে তার বাহিনী নিয়ে আবারও মূল বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান এবং পূর্বে এডেসা অভিমুখে রওনা হন। (২৭৫) তিনি যেন বাইতুল মুকাদ্দাস দখল, 'নিপীড়িত' খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তাবিধান ইত্যাদি সব লক্ষ্য ভুলেই গেছেন! আবারও সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, তার একমাত্র লক্ষ্য হলো নিজের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা; যদিও তা হোক বাইতুল মুকাদ্দাস ও তীর্থযাত্রীদের যাতায়াতের পথ থেকে অনেক দূরে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো অঞ্চলে।
বল্ডউইনের বাহিনী এডেসা অভিমুখে রওনা হওয়ার পর পথের প্রতিটি নগরী যুদ্ধ ছাড়াই তার কাছে আত্মসমর্পণ করে। এসব নগরীর অধিকাংশ নাগরিক ছিল আর্মেনীয়। একে একে বিভিন্ন নগরী জয় করে অবশেষে বল্ডউইন এডেসায় পৌঁছান। এডেসার আর্মেনীয় নাগরিকরাও বল্ডউইনকে স্বাগত জানায়। থোরোস (Thoros) নামক জনৈক গ্রিক সেনাপতি নগরীটির প্রশাসক ছিলেন। থোরোস ইতিপূর্বে মুসলমানদের জিজিয়া প্রদান করে আসছিলেন। (২৭৬) তার আশা ছিল—তিনি যদি কোনোদিন নগরীটির একক কর্তৃত্বের অধিকারী হতে পারেন, তাহলে তৎক্ষণাৎ বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধীনতা স্বীকার করে নেবেন। বল্ডউইনের বশ্যতা স্বীকারের ইচ্ছা তার মোটেও ছিল না। স্বভাবতই বল্ডউইনের প্রতি আর্মেনীয় নাগরিকদের উচ্ছ্বাস আচরণও তার মনঃপূত হচ্ছিল না। কিন্তু বাস্তবতা মেনে নেওয়া ছাড়া তার সামনে ভিন্ন কোনো পথও খোলা ছিল না। তাই থোরোস এমন একটি মধ্যবর্তী সমাধান গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন, যাতে নিজ স্বার্থও রক্ষা পায়, বল্ডউইনও তুষ্ট থাকে। প্রৌঢ় থোরোস বল্ডউইনকে তার পোষ্য পুত্র হওয়ার প্রস্তাব দেন এবং তাকে বোঝান যে, এর ফলে বল্ডউইন ভবিষ্যতে এডেসা নগরীসহ আশেপাশের উর্বর ও সমৃদ্ধ জনপদসমূহের বৈধ উত্তরাধিকারীতে পরিণত হবেন। (২৭৭) বল্ডউইন থোরোসের প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়ে এডেসায় প্রবেশ করেন। এরপর তিনি থোরোসের দফারফার জন্য এডেসার অধিবাসী কয়েকজন আর্মেনীয় নাগরিকের সঙ্গে গোপনে আঁতাঁত করেন। কদিন পরই সকলে মিলে থোরোসকে হত্যা করে এবং নগরীর কর্তৃত্ব চলে আসে বল্ডউইনের হাতে। এর মাধ্যমে বল্ডউইনের হাত ধরে ৪৯১ হিজরি সনে (১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে) ইসলামি বিশ্বের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠে প্রথম ক্রুসেড রাজ্য—এডেসা রাজ্য। (২৭৮)
রাজ্য প্রতিষ্ঠার পরই বল্ডউইন অনুভব করেন যে, তার সঙ্গে থাকা সৈন্যসংখ্যা নিতান্তই অল্প, বিপরীতে এ অঞ্চলের অধিকাংশ নাগরিক আর্মেনীয়। তাই নবগঠিত রাজ্যের ভিত্তি মজবুত করতে এবং যেকোনো প্রকার অস্থিরতা বা আন্দোলন সৃষ্টির সুযোগ বন্ধ করে দিতে বল্ডউইন বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
বল্ডউইনের গৃহীত পদক্ষেপসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পশ্চিমা ক্রুসেডার ও আর্মেনীয়দের মাঝে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন। বল্ডউইন নিজেই এর সূচনা করেন এবং জনৈক আর্মেনীয় নেতার কন্যা আরডা (Arda)-কে বিয়ে করেন। (২৭৯)
তার গৃহীত আরেকটি পদক্ষেপ হলো এডেসা রাজ্যের পরিধি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা। এডেসা অঞ্চলের আশেপাশে ছিল আর্মেনীয়দের পরম শত্রু তুর্কিদের কর্তৃত্ব। বল্ডউইন তার নিজস্ব সৈন্য এবং আর্মেনীয় সৈন্যদের সমন্বয়ে যৌথ বাহিনী গঠন করে এডেসা থেকে একদিনের দূরত্বে (পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার পূর্ব দিকে) অবস্থিত সুমাইসাত (Samosata) অভিমুখে অগ্রসর হন। সুমাইসাতের কর্তৃত্ব ছিল জনৈক তুর্কি-সেলজুক সেনাপতির হাতে। বল্ডউইন-বাহিনীর আগমন সংবাদ পেয়ে মুসলিম সেনাপতি প্রথমেই এই চিন্তা করেন যে, বিশেষত এশিয়া মাইনর অঞ্চলে সেলজুকদের ধারাবাহিক পরাজয় এবং পারসিক সেলজুক ও শামীয় সেলজুকদের এখনো পর্যন্ত এ বিষয়ে নীরবতা অবলম্বনের পর তার পক্ষে ক্রুসেডার-আর্মেনীয় সম্মিলিত বাহিনীর মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। হতাশা ও নিরাশায় আচ্ছন্ন হয়ে সুমাইসাত নগরীর মুসলিম প্রশাসক এক নিন্দনীয় কাজ করে বসেন। তিনি প্রতিরোধ যুদ্ধের পরিবর্তে বল্ডউইনকে অর্থের বিনিময়ে নগরীটি কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেন। তুর্কি প্রশাসক জনগণসহ নগরীটির কর্তৃত্ব সমর্পণের বিনিময়ে বল্ডউইনের কাছে দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা দাবি করেন। বল্ডউইন সামান্য দ্বিধা না করে এ প্রস্তাবে সম্মত হন। কারণ, ইতিমধ্যেই তিনি এডেসার প্রয়াত গ্রিক প্রশাসক থোরোসের রেখে যাওয়া বিশাল সম্পদভান্ডারের অধিকারী হয়েছেন। বল্ডউইন দাবিকৃত অর্থ পরিশোধ করে যুদ্ধ ব্যতীতই ইসলামি নগরীটির কর্তৃত্ব বুঝে নেন!(২৮০)
ইসলামি ভূখণ্ডে বর্বর ক্রুসেড আগ্রাসন ও চলমান ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাখ্যা যারা খুঁজছেন, তারা আশা করি এর ব্যাখ্যা পেয়ে গেছেন! নিঃসন্দেহে জাতীয় স্বার্থের প্রতি উদাসীন এবং অর্থের বিনিময়ে সবকিছু বিক্রি করতে আগ্রহী এ ধরনের নেতার অস্তিত্বই একটি ভূখণ্ডের ধ্বংস টেনে আনে।
সুমাইসাত অধিকার করেই তুষ্ট না হয়ে বল্ডউইন এরপর সামনে অগ্রসর হন এবং রাজ্যপরিধি সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখে একে একে সারুজ ও আলবেরা (Birecik) নগরী অধিকার করেন। (২৮১) এভাবে পর্যায়ক্রমে একের পর এক নগরী ফরাসি সেনাপতি বল্ডউইনের লালসার শিকার হতে থাকে।
এডেসা অঞ্চলে নিজ কর্তৃত্ব সুদৃঢ় করার জন্য বল্ডউইনের গৃহীত আরেকটি পদক্ষেপ হলো, তিনি বিশেষ করে সুমাইসাতসহ প্রতিটি ইসলামি নগরীকে নিজের রাজ্যে যুক্ত করার সময় সেখানে তুর্কি কারাগারে বন্দি আর্মেনীয়দের মুক্ত করে দেন এবং তাদেরকে কোনো প্রকার বিনিময় ছাড়াই নিজ নিজ পরিবারে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেন। বল্ডউইন এর মাধ্যমে এ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ আর্মেনীয় নাগরিকদের হৃদ্যতা ও সমর্থন লাভ করতে চাচ্ছিলেন।
তার গৃহীত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক পদক্ষেপ হলো, তিনি বাইজান্টাইন সম্রাটের আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করেন এবং সুস্পষ্ট ভাষায় কনস্টান্টিনোপল চুক্তি হতে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করেন। (২৮২) তিনি মূলত এর মাধ্যমে এক ঢিলে দুই পাখি শিকার করেন। একদিকে তিনি কারও আনুগত্য ব্যতিরেকে নিজের একক নেতৃত্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেন; অপরদিকে এ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ আর্মেনীয় নাগরিকদেরকেও তুষ্ট করতে সক্ষম হন। চরম সাম্প্রদায়িক আর্মেনীয়রা অর্থোডক্স মতাদর্শীদের প্রতি প্রচণ্ড বিক্ষুব্ধ ছিল। অপরদিকে আর্মেনীয়দের মতাদর্শ ক্যাথলিক মতাদর্শের সঙ্গে পুরোপুরি সাদৃশ্যপূর্ণ না হলেও অর্থোডক্সদের তুলনায় তুলনামূলক অধিক নিকটতর ছিল।
বল্ডউইন তার নবগঠিত রাষ্ট্রে ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করেন। তিনি পশ্চিমা ক্যাথলিক মতাদর্শ গ্রহণ করতে আর্মেনীয়দের ওপর মোটেও চাপ সৃষ্টি করেননি। তার এই নীতি আর্মেনীয় জনসাধারণের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। (২৮৩)
বল্ডউইন সুস্পষ্ট ভাষায় বিদ্রোহ করলেও বাইজান্টাইন সম্রাট তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হন। কারণ, এডেসা ছিল বাইজান্টাইনদের কর্তৃত্বপূর্ণ অঞ্চল থেকে বেশ দূরে অবস্থিত। বাইজান্টাইন সম্রাটের মূল শক্তি কেন্দ্রীভূত ছিল এশিয়া মাইনরের পশ্চিমাঞ্চলে এবং কিলিকিয়া অঞ্চলের নগরীগুলোতে; বিশেষ করে তারসুস, আদানা (Adana) ও মপসুয়েসটিয়া নগরীতে। অধিকন্তু তিনি তখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নগরী এন্টিয়ক নিয়ে খুব ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। মূল ক্রুসেডার বাহিনীও তখন এন্টিয়ক অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছিল। (২৮৪)
একজন ঝানু ও দূরদর্শী নেতা হিসেবে বল্ডউইন আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর প্রীতি আচরণে মোটেও প্রবঞ্চিত হননি। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, তারা আজ তাকে সাদরে বরণ করে নিয়েছে কেবল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বশ্যতা ও তুর্কিদের প্রভাব থেকে আত্মরক্ষার জন্য। পর্যাপ্ত শক্তি সঞ্চয় হলেই তারা তাকে ও তার সৈন্যদেরকে গলাধাক্কা মেরে তাড়িয়ে দিয়ে নিজেরাই স্বতন্ত্র রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবে। এ কারণেই বল্ডউইন ক্রুসেডারদের স্বার্থ রক্ষায় এডেসা রাজ্যের নাগরিক বিন্যাসেও পরিবর্তন আনতে সচেষ্ট হন। বর্তমানে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে যে নীতি অবলম্বন করেছে, বল্ডউইন এডেসা রাজ্যে ঠিক একই নীতি অবলম্বন করেন। তিনি ইউরোপে বিশেষ করে ফ্রান্সে বার্তা পাঠিয়ে সেখানকার জনসাধারণকে তার প্রতিষ্ঠিত ক্রুসেড রাজ্য এডেসায় এসে স্থায়ী বসতি স্থাপনের অনুরোধ জানান। বল্ডউইন ভাড়াটে সৈন্য পাঠাতে বলেননি; বরং ইউরোপীয় পরিবারগুলোকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এডেসায় চলে আসতে বলেছিলেন। পাশাপাশি তিনি প্রচুর অর্থসম্পদ প্রদান ও এডেসা নগরপ্রাচীরের বাইরে বড় বড় এলাকাজুড়ে জায়গির প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইউরোপের প্রভাবশালী ও প্রতিপত্তিসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ এবং জায়গির মালিকদের এডেসায় চলে আসতে প্ররোচিত করেন। বল্ডউইনের এই নীতির ফলে এডেসা রাজ্য একখণ্ড পশ্চিম ইউরোপিয়ান ভূখণ্ডে রূপান্তরিত হয়। ইউরোপের ন্যায় এডেসায়ও সামন্তব্যবস্থা চালু করা হয়। ক্রুসেডার যোদ্ধারা বড় বড় জায়গির-ভূমি লাভ করে। আর ভূমিহারা আর্মেনীয় জনসাধারণ ক্রুসেডারদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে কৃষিকর্ম ও বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে থাকে। (২৮৫)
স্বাভাবিকভাবেই এই পরিস্থিতি কিছু আর্মেনীয়কে উত্তেজিত করে তোলে। তারা বিভিন্ন সময় বল্ডউইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চেষ্টাও চালায়। কিন্তু বল্ডউইন অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ ও দমননীতি প্রয়োগের মাধ্যমে সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করেন। এর ফলে পরবর্তী সময়ে পুরো রাজ্যজুড়ে বিশৃঙ্খলামুক্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। (২৮৬)
এভাবে ভীতি ও প্রীতি সঞ্চার, আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা ও পশ্চিম ইউরোপের খ্রিষ্টানদের সঙ্গে সুদৃঢ় সহযোগিতা বিনিময় ইত্যাদির মাধ্যমে বল্ডউইন ইসলামি বিশ্বের বক্ষস্থলে প্রতিষ্ঠিত ক্রুসেড রাজ্য এডেসার শাসনক্ষমতা মজবুত করতে সক্ষম হন।
এডেসা রাজ্যের একদিকে ছিল পারসিক সেলজুক রাষ্ট্র ও ইসলামি প্রাচ্য অঞ্চল, অপরদিকে ছিল শাম অঞ্চল ও বাইতুল মুকাদ্দাস। আর তাই পরবর্তী সময়ে যখন শাম ও বাইতুল মুকাদ্দাসে আরও কিছু ক্রুসেড রাজ্য ও সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সেসব ক্রুসেড রাজ্যের বিরুদ্ধে পারসিক সেলজুক ও ইসলামি প্রাচ্যের আক্রমণ প্রতিরোধে এডেসা রাজ্য প্রথম প্রাচীর হিসেবে বিবেচিত হয়। অধিকন্তু এডেসা রাজ্যের অবস্থান ছিল নাগরিক বিন্যাসের বিচারে সম্পূর্ণ ইসলামি রাষ্ট্র মসুল, দিয়ারে বকর ও জাযিরা অঞ্চলের অতি নিকটে। আর তাই এডেসা রাজ্য পরিণত হয় মুসলমানদের ক্ষতিসাধনে সবচেয়ে অগ্রবর্তী ক্রুসেড রাজ্যে।
আরেক দিক থেকে বিবেচনা করলে এডেসা ছিল সবচেয়ে দুর্বল ক্রুসেড রাজ্য। কারণ, এরপর শাম অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য ক্রুসেড রাজ্য হতে এডেসার ভৌগোলিক অবস্থান ছিল বেশ দূরে। ওদিকে ভূমধ্যসাগর হয়ে আগত ইতালিয়ান নৌবহরগুলোর কাছ থেকে সাহায্য লাভের সুযোগও এডেসা রাজ্যের ছিল না। (২৮৭) তা ছাড়া পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এডেসায় প্রচুর আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী বসবাস করত; যাদের ছিল নিজস্ব স্বার্থচিন্তা ও অভিলাষ। অধিকন্তু এডেসা ছিল মসুল নগরী থেকে বেশ নিকটে, আর মসুল থেকেই পরবর্তী সময়ে এক ইসলামি জাগরণ সূচিত হয়, যা এডেসা রাজ্যের শক্তি ও অস্তিত্বে ব্যাপক আঘাত হানে।
এডেসা ও তৎপার্শ্ববর্তী অঞ্চল সম্পর্কে এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষে আমরা আবারও মূল ধারাবর্ণনায় ফিরে আসছি। বল্ডউইন চলে যাওয়ার পর মূল ক্রুসেডার বাহিনী এশিয়া মাইনর অঞ্চলের দুর্গম বিভিন্ন অঞ্চল পাড়ি দেয়। পথে তারা অতিক্রম করে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, ক্ষেত্রবিশেষে মোকাবিলা করে পানির প্রচণ্ড অভাব। পথের বিভিন্ন স্থানে তুর্কিদের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে, যাকে আমরা নামকরণ করতে পারি ‘গেরিলা যুদ্ধ’ নামে। তবে শেষ পর্যন্ত সব প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়ে ক্রুসেডার বাহিনী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক নগরীর কাছে পৌঁছতে সক্ষম হয়। ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ২১ অক্টোবর (৪৯০ হিজরি সনে) তারা পৌঁছে যায় এন্টিয়ক নগরীর কাছে। (২৮৮)
টিকাঃ
২৭৪. Cam. Med. Hist. vol. 5, p. 288.
২৭৫. Albert d' Aix, (Hist Occid) III XX VII.
২৭৬. Guibert de Nogent. 111. p. 156.
২৭৭. Matthieu d' Edesse (Doc ar.) 1, p. 35; Runciman, op. cit., 1, p. 204.
২৭৮. Matthieu d' Edesse (Doc ar.) 1, pp. 37-38.
২৭৯. Guillaume de Tyr, p. 402.
২৮০. Guillaume de Tyr, p. 159.
২৮১. Albert d' Aix, (Hist Occid) 1V, pp. 356-357. 445-446; Grousset : L'Empire. du Levant, p. 402.
২৮২. Runciman, op. cit., 1, p. 206.
২৮০. Runciman, op. cit., 1, p. 211.
২৮৪. Setton: op. cit., 1, p. 304.
২৮৫. Michaud: op. Cit. 1, p. 235; Runciman, op. cit., 1, p. 211.
২৮৬. Albert d' Aix, p. 443, & Guillaman de tyr. 285.
২৮৭. মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখু সালাজিকাতির রূম ফী আসিয়াস সুগরা, পৃষ্ঠা: ৯২।
২৮৮. Raymond d' Agueiler, in peters, pp. 160.ff; William of Tyre, 1, pp. 204-220.
আর্মেনীয় বন্ধুর পরামর্শ শুনে বল্ডউইনের লোভাতুর চোখ চকচক করে ওঠে। তিনি এবার তারসুস ত্যাগ করে পূর্ব দিকে অগ্রসর হন। পথে মপসুয়েসটিয়া নগরীর প্রবেশদ্বারে তার টেনক্রেডের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে যায়। তারসুসের নগরপ্রাচীরের বাইরে নিঃশেষ হওয়া ইতালিয়ান সৈন্যদের ইস্যুকে কেন্দ্র করে উভয়ের মধ্যে এ সময় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। (২৭৪) শেষ পর্যন্ত উভয়ে সমঝোতায় উপনীত হন এবং মূল ক্রুসেডার বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার লক্ষ্যে এন্টিয়ক অভিমুখে রওনা হন।
বিচ্ছিন্ন বাহিনীদুটি মূল বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হতেই বল্ডউইনের ভাই গডফ্রেসহ সকল সেনাপতি বল্ডউইনকে তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করতে থাকে। সকলের সম্মিলিত আগ্রাসী আচরণে বল্ডউইন বিক্ষুব্ধ হয়ে তার বাহিনী নিয়ে আবারও মূল বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান এবং পূর্বে এডেসা অভিমুখে রওনা হন। (২৭৫) তিনি যেন বাইতুল মুকাদ্দাস দখল, 'নিপীড়িত' খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তাবিধান ইত্যাদি সব লক্ষ্য ভুলেই গেছেন! আবারও সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, তার একমাত্র লক্ষ্য হলো নিজের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা; যদিও তা হোক বাইতুল মুকাদ্দাস ও তীর্থযাত্রীদের যাতায়াতের পথ থেকে অনেক দূরে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো অঞ্চলে।
বল্ডউইনের বাহিনী এডেসা অভিমুখে রওনা হওয়ার পর পথের প্রতিটি নগরী যুদ্ধ ছাড়াই তার কাছে আত্মসমর্পণ করে। এসব নগরীর অধিকাংশ নাগরিক ছিল আর্মেনীয়। একে একে বিভিন্ন নগরী জয় করে অবশেষে বল্ডউইন এডেসায় পৌঁছান। এডেসার আর্মেনীয় নাগরিকরাও বল্ডউইনকে স্বাগত জানায়। থোরোস (Thoros) নামক জনৈক গ্রিক সেনাপতি নগরীটির প্রশাসক ছিলেন। থোরোস ইতিপূর্বে মুসলমানদের জিজিয়া প্রদান করে আসছিলেন। (২৭৬) তার আশা ছিল—তিনি যদি কোনোদিন নগরীটির একক কর্তৃত্বের অধিকারী হতে পারেন, তাহলে তৎক্ষণাৎ বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধীনতা স্বীকার করে নেবেন। বল্ডউইনের বশ্যতা স্বীকারের ইচ্ছা তার মোটেও ছিল না। স্বভাবতই বল্ডউইনের প্রতি আর্মেনীয় নাগরিকদের উচ্ছ্বাস আচরণও তার মনঃপূত হচ্ছিল না। কিন্তু বাস্তবতা মেনে নেওয়া ছাড়া তার সামনে ভিন্ন কোনো পথও খোলা ছিল না। তাই থোরোস এমন একটি মধ্যবর্তী সমাধান গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন, যাতে নিজ স্বার্থও রক্ষা পায়, বল্ডউইনও তুষ্ট থাকে। প্রৌঢ় থোরোস বল্ডউইনকে তার পোষ্য পুত্র হওয়ার প্রস্তাব দেন এবং তাকে বোঝান যে, এর ফলে বল্ডউইন ভবিষ্যতে এডেসা নগরীসহ আশেপাশের উর্বর ও সমৃদ্ধ জনপদসমূহের বৈধ উত্তরাধিকারীতে পরিণত হবেন। (২৭৭) বল্ডউইন থোরোসের প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়ে এডেসায় প্রবেশ করেন। এরপর তিনি থোরোসের দফারফার জন্য এডেসার অধিবাসী কয়েকজন আর্মেনীয় নাগরিকের সঙ্গে গোপনে আঁতাঁত করেন। কদিন পরই সকলে মিলে থোরোসকে হত্যা করে এবং নগরীর কর্তৃত্ব চলে আসে বল্ডউইনের হাতে। এর মাধ্যমে বল্ডউইনের হাত ধরে ৪৯১ হিজরি সনে (১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে) ইসলামি বিশ্বের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠে প্রথম ক্রুসেড রাজ্য—এডেসা রাজ্য। (২৭৮)
রাজ্য প্রতিষ্ঠার পরই বল্ডউইন অনুভব করেন যে, তার সঙ্গে থাকা সৈন্যসংখ্যা নিতান্তই অল্প, বিপরীতে এ অঞ্চলের অধিকাংশ নাগরিক আর্মেনীয়। তাই নবগঠিত রাজ্যের ভিত্তি মজবুত করতে এবং যেকোনো প্রকার অস্থিরতা বা আন্দোলন সৃষ্টির সুযোগ বন্ধ করে দিতে বল্ডউইন বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
বল্ডউইনের গৃহীত পদক্ষেপসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পশ্চিমা ক্রুসেডার ও আর্মেনীয়দের মাঝে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন। বল্ডউইন নিজেই এর সূচনা করেন এবং জনৈক আর্মেনীয় নেতার কন্যা আরডা (Arda)-কে বিয়ে করেন। (২৭৯)
তার গৃহীত আরেকটি পদক্ষেপ হলো এডেসা রাজ্যের পরিধি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা। এডেসা অঞ্চলের আশেপাশে ছিল আর্মেনীয়দের পরম শত্রু তুর্কিদের কর্তৃত্ব। বল্ডউইন তার নিজস্ব সৈন্য এবং আর্মেনীয় সৈন্যদের সমন্বয়ে যৌথ বাহিনী গঠন করে এডেসা থেকে একদিনের দূরত্বে (পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার পূর্ব দিকে) অবস্থিত সুমাইসাত (Samosata) অভিমুখে অগ্রসর হন। সুমাইসাতের কর্তৃত্ব ছিল জনৈক তুর্কি-সেলজুক সেনাপতির হাতে। বল্ডউইন-বাহিনীর আগমন সংবাদ পেয়ে মুসলিম সেনাপতি প্রথমেই এই চিন্তা করেন যে, বিশেষত এশিয়া মাইনর অঞ্চলে সেলজুকদের ধারাবাহিক পরাজয় এবং পারসিক সেলজুক ও শামীয় সেলজুকদের এখনো পর্যন্ত এ বিষয়ে নীরবতা অবলম্বনের পর তার পক্ষে ক্রুসেডার-আর্মেনীয় সম্মিলিত বাহিনীর মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। হতাশা ও নিরাশায় আচ্ছন্ন হয়ে সুমাইসাত নগরীর মুসলিম প্রশাসক এক নিন্দনীয় কাজ করে বসেন। তিনি প্রতিরোধ যুদ্ধের পরিবর্তে বল্ডউইনকে অর্থের বিনিময়ে নগরীটি কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেন। তুর্কি প্রশাসক জনগণসহ নগরীটির কর্তৃত্ব সমর্পণের বিনিময়ে বল্ডউইনের কাছে দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা দাবি করেন। বল্ডউইন সামান্য দ্বিধা না করে এ প্রস্তাবে সম্মত হন। কারণ, ইতিমধ্যেই তিনি এডেসার প্রয়াত গ্রিক প্রশাসক থোরোসের রেখে যাওয়া বিশাল সম্পদভান্ডারের অধিকারী হয়েছেন। বল্ডউইন দাবিকৃত অর্থ পরিশোধ করে যুদ্ধ ব্যতীতই ইসলামি নগরীটির কর্তৃত্ব বুঝে নেন!(২৮০)
ইসলামি ভূখণ্ডে বর্বর ক্রুসেড আগ্রাসন ও চলমান ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাখ্যা যারা খুঁজছেন, তারা আশা করি এর ব্যাখ্যা পেয়ে গেছেন! নিঃসন্দেহে জাতীয় স্বার্থের প্রতি উদাসীন এবং অর্থের বিনিময়ে সবকিছু বিক্রি করতে আগ্রহী এ ধরনের নেতার অস্তিত্বই একটি ভূখণ্ডের ধ্বংস টেনে আনে।
সুমাইসাত অধিকার করেই তুষ্ট না হয়ে বল্ডউইন এরপর সামনে অগ্রসর হন এবং রাজ্যপরিধি সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখে একে একে সারুজ ও আলবেরা (Birecik) নগরী অধিকার করেন। (২৮১) এভাবে পর্যায়ক্রমে একের পর এক নগরী ফরাসি সেনাপতি বল্ডউইনের লালসার শিকার হতে থাকে।
এডেসা অঞ্চলে নিজ কর্তৃত্ব সুদৃঢ় করার জন্য বল্ডউইনের গৃহীত আরেকটি পদক্ষেপ হলো, তিনি বিশেষ করে সুমাইসাতসহ প্রতিটি ইসলামি নগরীকে নিজের রাজ্যে যুক্ত করার সময় সেখানে তুর্কি কারাগারে বন্দি আর্মেনীয়দের মুক্ত করে দেন এবং তাদেরকে কোনো প্রকার বিনিময় ছাড়াই নিজ নিজ পরিবারে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেন। বল্ডউইন এর মাধ্যমে এ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ আর্মেনীয় নাগরিকদের হৃদ্যতা ও সমর্থন লাভ করতে চাচ্ছিলেন।
তার গৃহীত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক পদক্ষেপ হলো, তিনি বাইজান্টাইন সম্রাটের আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করেন এবং সুস্পষ্ট ভাষায় কনস্টান্টিনোপল চুক্তি হতে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করেন। (২৮২) তিনি মূলত এর মাধ্যমে এক ঢিলে দুই পাখি শিকার করেন। একদিকে তিনি কারও আনুগত্য ব্যতিরেকে নিজের একক নেতৃত্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেন; অপরদিকে এ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ আর্মেনীয় নাগরিকদেরকেও তুষ্ট করতে সক্ষম হন। চরম সাম্প্রদায়িক আর্মেনীয়রা অর্থোডক্স মতাদর্শীদের প্রতি প্রচণ্ড বিক্ষুব্ধ ছিল। অপরদিকে আর্মেনীয়দের মতাদর্শ ক্যাথলিক মতাদর্শের সঙ্গে পুরোপুরি সাদৃশ্যপূর্ণ না হলেও অর্থোডক্সদের তুলনায় তুলনামূলক অধিক নিকটতর ছিল।
বল্ডউইন তার নবগঠিত রাষ্ট্রে ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করেন। তিনি পশ্চিমা ক্যাথলিক মতাদর্শ গ্রহণ করতে আর্মেনীয়দের ওপর মোটেও চাপ সৃষ্টি করেননি। তার এই নীতি আর্মেনীয় জনসাধারণের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। (২৮৩)
বল্ডউইন সুস্পষ্ট ভাষায় বিদ্রোহ করলেও বাইজান্টাইন সম্রাট তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হন। কারণ, এডেসা ছিল বাইজান্টাইনদের কর্তৃত্বপূর্ণ অঞ্চল থেকে বেশ দূরে অবস্থিত। বাইজান্টাইন সম্রাটের মূল শক্তি কেন্দ্রীভূত ছিল এশিয়া মাইনরের পশ্চিমাঞ্চলে এবং কিলিকিয়া অঞ্চলের নগরীগুলোতে; বিশেষ করে তারসুস, আদানা (Adana) ও মপসুয়েসটিয়া নগরীতে। অধিকন্তু তিনি তখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নগরী এন্টিয়ক নিয়ে খুব ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। মূল ক্রুসেডার বাহিনীও তখন এন্টিয়ক অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছিল। (২৮৪)
একজন ঝানু ও দূরদর্শী নেতা হিসেবে বল্ডউইন আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর প্রীতি আচরণে মোটেও প্রবঞ্চিত হননি। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, তারা আজ তাকে সাদরে বরণ করে নিয়েছে কেবল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বশ্যতা ও তুর্কিদের প্রভাব থেকে আত্মরক্ষার জন্য। পর্যাপ্ত শক্তি সঞ্চয় হলেই তারা তাকে ও তার সৈন্যদেরকে গলাধাক্কা মেরে তাড়িয়ে দিয়ে নিজেরাই স্বতন্ত্র রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবে। এ কারণেই বল্ডউইন ক্রুসেডারদের স্বার্থ রক্ষায় এডেসা রাজ্যের নাগরিক বিন্যাসেও পরিবর্তন আনতে সচেষ্ট হন। বর্তমানে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে যে নীতি অবলম্বন করেছে, বল্ডউইন এডেসা রাজ্যে ঠিক একই নীতি অবলম্বন করেন। তিনি ইউরোপে বিশেষ করে ফ্রান্সে বার্তা পাঠিয়ে সেখানকার জনসাধারণকে তার প্রতিষ্ঠিত ক্রুসেড রাজ্য এডেসায় এসে স্থায়ী বসতি স্থাপনের অনুরোধ জানান। বল্ডউইন ভাড়াটে সৈন্য পাঠাতে বলেননি; বরং ইউরোপীয় পরিবারগুলোকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এডেসায় চলে আসতে বলেছিলেন। পাশাপাশি তিনি প্রচুর অর্থসম্পদ প্রদান ও এডেসা নগরপ্রাচীরের বাইরে বড় বড় এলাকাজুড়ে জায়গির প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইউরোপের প্রভাবশালী ও প্রতিপত্তিসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ এবং জায়গির মালিকদের এডেসায় চলে আসতে প্ররোচিত করেন। বল্ডউইনের এই নীতির ফলে এডেসা রাজ্য একখণ্ড পশ্চিম ইউরোপিয়ান ভূখণ্ডে রূপান্তরিত হয়। ইউরোপের ন্যায় এডেসায়ও সামন্তব্যবস্থা চালু করা হয়। ক্রুসেডার যোদ্ধারা বড় বড় জায়গির-ভূমি লাভ করে। আর ভূমিহারা আর্মেনীয় জনসাধারণ ক্রুসেডারদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে কৃষিকর্ম ও বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে থাকে। (২৮৫)
স্বাভাবিকভাবেই এই পরিস্থিতি কিছু আর্মেনীয়কে উত্তেজিত করে তোলে। তারা বিভিন্ন সময় বল্ডউইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চেষ্টাও চালায়। কিন্তু বল্ডউইন অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ ও দমননীতি প্রয়োগের মাধ্যমে সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করেন। এর ফলে পরবর্তী সময়ে পুরো রাজ্যজুড়ে বিশৃঙ্খলামুক্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। (২৮৬)
এভাবে ভীতি ও প্রীতি সঞ্চার, আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা ও পশ্চিম ইউরোপের খ্রিষ্টানদের সঙ্গে সুদৃঢ় সহযোগিতা বিনিময় ইত্যাদির মাধ্যমে বল্ডউইন ইসলামি বিশ্বের বক্ষস্থলে প্রতিষ্ঠিত ক্রুসেড রাজ্য এডেসার শাসনক্ষমতা মজবুত করতে সক্ষম হন।
এডেসা রাজ্যের একদিকে ছিল পারসিক সেলজুক রাষ্ট্র ও ইসলামি প্রাচ্য অঞ্চল, অপরদিকে ছিল শাম অঞ্চল ও বাইতুল মুকাদ্দাস। আর তাই পরবর্তী সময়ে যখন শাম ও বাইতুল মুকাদ্দাসে আরও কিছু ক্রুসেড রাজ্য ও সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সেসব ক্রুসেড রাজ্যের বিরুদ্ধে পারসিক সেলজুক ও ইসলামি প্রাচ্যের আক্রমণ প্রতিরোধে এডেসা রাজ্য প্রথম প্রাচীর হিসেবে বিবেচিত হয়। অধিকন্তু এডেসা রাজ্যের অবস্থান ছিল নাগরিক বিন্যাসের বিচারে সম্পূর্ণ ইসলামি রাষ্ট্র মসুল, দিয়ারে বকর ও জাযিরা অঞ্চলের অতি নিকটে। আর তাই এডেসা রাজ্য পরিণত হয় মুসলমানদের ক্ষতিসাধনে সবচেয়ে অগ্রবর্তী ক্রুসেড রাজ্যে।
আরেক দিক থেকে বিবেচনা করলে এডেসা ছিল সবচেয়ে দুর্বল ক্রুসেড রাজ্য। কারণ, এরপর শাম অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য ক্রুসেড রাজ্য হতে এডেসার ভৌগোলিক অবস্থান ছিল বেশ দূরে। ওদিকে ভূমধ্যসাগর হয়ে আগত ইতালিয়ান নৌবহরগুলোর কাছ থেকে সাহায্য লাভের সুযোগও এডেসা রাজ্যের ছিল না। (২৮৭) তা ছাড়া পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এডেসায় প্রচুর আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী বসবাস করত; যাদের ছিল নিজস্ব স্বার্থচিন্তা ও অভিলাষ। অধিকন্তু এডেসা ছিল মসুল নগরী থেকে বেশ নিকটে, আর মসুল থেকেই পরবর্তী সময়ে এক ইসলামি জাগরণ সূচিত হয়, যা এডেসা রাজ্যের শক্তি ও অস্তিত্বে ব্যাপক আঘাত হানে।
এডেসা ও তৎপার্শ্ববর্তী অঞ্চল সম্পর্কে এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষে আমরা আবারও মূল ধারাবর্ণনায় ফিরে আসছি। বল্ডউইন চলে যাওয়ার পর মূল ক্রুসেডার বাহিনী এশিয়া মাইনর অঞ্চলের দুর্গম বিভিন্ন অঞ্চল পাড়ি দেয়। পথে তারা অতিক্রম করে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, ক্ষেত্রবিশেষে মোকাবিলা করে পানির প্রচণ্ড অভাব। পথের বিভিন্ন স্থানে তুর্কিদের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে, যাকে আমরা নামকরণ করতে পারি ‘গেরিলা যুদ্ধ’ নামে। তবে শেষ পর্যন্ত সব প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়ে ক্রুসেডার বাহিনী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক নগরীর কাছে পৌঁছতে সক্ষম হয়। ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ২১ অক্টোবর (৪৯০ হিজরি সনে) তারা পৌঁছে যায় এন্টিয়ক নগরীর কাছে। (২৮৮)
টিকাঃ
২৭৪. Cam. Med. Hist. vol. 5, p. 288.
২৭৫. Albert d' Aix, (Hist Occid) III XX VII.
২৭৬. Guibert de Nogent. 111. p. 156.
২৭৭. Matthieu d' Edesse (Doc ar.) 1, p. 35; Runciman, op. cit., 1, p. 204.
২৭৮. Matthieu d' Edesse (Doc ar.) 1, pp. 37-38.
২৭৯. Guillaume de Tyr, p. 402.
২৮০. Guillaume de Tyr, p. 159.
২৮১. Albert d' Aix, (Hist Occid) 1V, pp. 356-357. 445-446; Grousset : L'Empire. du Levant, p. 402.
২৮২. Runciman, op. cit., 1, p. 206.
২৮০. Runciman, op. cit., 1, p. 211.
২৮৪. Setton: op. cit., 1, p. 304.
২৮৫. Michaud: op. Cit. 1, p. 235; Runciman, op. cit., 1, p. 211.
২৮৬. Albert d' Aix, p. 443, & Guillaman de tyr. 285.
২৮৭. মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখু সালাজিকাতির রূম ফী আসিয়াস সুগরা, পৃষ্ঠা: ৯২।
২৮৮. Raymond d' Agueiler, in peters, pp. 160.ff; William of Tyre, 1, pp. 204-220.