📄 নিকিয়া পতনের কার্যকারণসমূহ
আমরা যদি নিকিয়াতে মুসলমানদের এই শোচনীয় পরাজয়ের কারণ ও কার্যকারণ বিশ্লেষণ করি, তাহলে এমন কিছু বিষয় আমাদের সামনে উঠে আসবে, যা ইতিহাসের যুগে যুগে মুসলমানদের পরাজিত হওয়া প্রতিটি যুদ্ধের ক্ষেত্রেই পাওয়া যায়। কারণ, এগুলো সর্বযুগে কার্যকর শাশ্বত কিছু নীতি। আমাদের সামনে যেসব কার্যকারণ প্রকাশিত হয়, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
১. মুসলিম যোদ্ধাদের মাঝে ইসলামি চেতনাবোধ ও দ্বীনি উদ্দীপনার অনুপস্থিতি। নিঃসন্দেহে যারা আল্লাহর দ্বীনকে বুলন্দ করার লক্ষ্যে লড়াই করে আর যারা লড়াই করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কিংবা জীবন রক্ষার জন্য—উভয় দলের মাঝে কত পার্থক্য!
২. মুসলমানদের পারস্পরিক দীর্ঘস্থায়ী বিবাদ-বিভক্তি এবং অধিকাংশ অঞ্চলে ভ্রাতৃঘাতী লড়াই-সংঘাত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
(وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّبِرِينَ)
এবং পরস্পরে কলহ করবে না। অন্যথায় তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব বিলুপ্ত হবে। আর ধৈর্যধারণ করবে। বিশ্বাস রাখো, আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। [সুরা আনফাল: ৪৬]
আয়াতের ভাষ্য দ্বারা সুস্পষ্ট অনুমিত হয় যে, মুসলমানদের পারস্পরিক কলহ-বিবাদ পরাজয়, ব্যর্থতা ও প্রভাব বিলুপ্তির অন্যতম মৌলিক কার্যকারণ।
৩. ঘটনাপ্রবাহের প্রতি শাম অঞ্চল, ইরাক, মিশর ও ইসলামি প্রাচ্যের মুসলমানদের উদাসীনতা এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতির মোকাবিলায় এশিয়া মাইনরের সেলজুক শক্তির নিঃসঙ্গ সংগ্রাম। অথচ পরবর্তী সময়ে তাদের সকলকেই ক্রুসেড অভিযানের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার শিকার হতে হয়েছিল।
৪. উপযুক্ত সামরিক প্রস্তুতির অভাব। সেলজুকদের গোয়েন্দা-তৎপরতা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। তারা যতক্ষণে ক্রুসেডারদের অগ্রযাত্রার বিষয়টি উপলব্ধি করে, ততক্ষণে সময় শেষ হয়ে গেছে। বিপরীতে ক্রুসেডার ও বাইজান্টাইনরা এই দিনটির জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছিল। আর শাশ্বত নীতি হলো, যে-ই চেষ্টা করবে, আপন চেষ্টা ও প্রস্তুতির ফল অবশ্যই লাভ করবে।
মোটামুটি এগুলোই ছিল নিকিয়ার পরাজয় ও পতনের মূল কার্যকারণ। এসব কারণ যখন যেকোনো প্রজন্মের মাঝে পাওয়া যাবে, নিঃসন্দেহে তারাও একই পরিণতির শিকার হবে এবং একই ধরনের সংকট ও সমস্যার সম্মুখীন হবে।
আমরা যদি নিকিয়াতে মুসলমানদের এই শোচনীয় পরাজয়ের কারণ ও কার্যকারণ বিশ্লেষণ করি, তাহলে এমন কিছু বিষয় আমাদের সামনে উঠে আসবে, যা ইতিহাসের যুগে যুগে মুসলমানদের পরাজিত হওয়া প্রতিটি যুদ্ধের ক্ষেত্রেই পাওয়া যায়। কারণ, এগুলো সর্বযুগে কার্যকর শাশ্বত কিছু নীতি। আমাদের সামনে যেসব কার্যকারণ প্রকাশিত হয়, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
১. মুসলিম যোদ্ধাদের মাঝে ইসলামি চেতনাবোধ ও দ্বীনি উদ্দীপনার অনুপস্থিতি। নিঃসন্দেহে যারা আল্লাহর দ্বীনকে বুলন্দ করার লক্ষ্যে লড়াই করে আর যারা লড়াই করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কিংবা জীবন রক্ষার জন্য—উভয় দলের মাঝে কত পার্থক্য!
২. মুসলমানদের পারস্পরিক দীর্ঘস্থায়ী বিবাদ-বিভক্তি এবং অধিকাংশ অঞ্চলে ভ্রাতৃঘাতী লড়াই-সংঘাত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
(وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّبِرِينَ)
এবং পরস্পরে কলহ করবে না। অন্যথায় তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব বিলুপ্ত হবে। আর ধৈর্যধারণ করবে। বিশ্বাস রাখো, আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। [সুরা আনফাল: ৪৬]
আয়াতের ভাষ্য দ্বারা সুস্পষ্ট অনুমিত হয় যে, মুসলমানদের পারস্পরিক কলহ-বিবাদ পরাজয়, ব্যর্থতা ও প্রভাব বিলুপ্তির অন্যতম মৌলিক কার্যকারণ।
৩. ঘটনাপ্রবাহের প্রতি শাম অঞ্চল, ইরাক, মিশর ও ইসলামি প্রাচ্যের মুসলমানদের উদাসীনতা এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতির মোকাবিলায় এশিয়া মাইনরের সেলজুক শক্তির নিঃসঙ্গ সংগ্রাম। অথচ পরবর্তী সময়ে তাদের সকলকেই ক্রুসেড অভিযানের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার শিকার হতে হয়েছিল।
৪. উপযুক্ত সামরিক প্রস্তুতির অভাব। সেলজুকদের গোয়েন্দা-তৎপরতা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। তারা যতক্ষণে ক্রুসেডারদের অগ্রযাত্রার বিষয়টি উপলব্ধি করে, ততক্ষণে সময় শেষ হয়ে গেছে। বিপরীতে ক্রুসেডার ও বাইজান্টাইনরা এই দিনটির জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছিল। আর শাশ্বত নীতি হলো, যে-ই চেষ্টা করবে, আপন চেষ্টা ও প্রস্তুতির ফল অবশ্যই লাভ করবে।
মোটামুটি এগুলোই ছিল নিকিয়ার পরাজয় ও পতনের মূল কার্যকারণ। এসব কারণ যখন যেকোনো প্রজন্মের মাঝে পাওয়া যাবে, নিঃসন্দেহে তারাও একই পরিণতির শিকার হবে এবং একই ধরনের সংকট ও সমস্যার সম্মুখীন হবে।
📄 নিকিয়া পতনের পর ক্রুসেডারদের পরবর্তী পদক্ষেপ
নিকিয়া পতনের পর এক সপ্তাহের বিশ্রাম শেষেই ক্রুসেডাররা সামনে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এবার তারা দক্ষিণ-পূর্বে কিলিজ আরসালানের নতুন রাজধানী কোনিয়ার দিকে অগ্রসর হয়। কোনিয়ার পথে ক্রুসেডাররা নিজেদের দুই ভাগে বিভক্ত করে নিয়েছিল। এক অংশ ছিল সম্পূর্ণ নরম্যানদের নিয়ে গঠিত। বোহেমন্ড ও টেনক্রেডের নেতৃত্বাধীন ইতালিয়ান নরম্যানদের পাশাপাশি রবার্ট ও স্টিফেনের নেতৃত্বাধীন ফ্রেঞ্চ নরম্যানরাও এ অংশে ছিল। এই অংশের সর্বাধিনায়কত্বের দায়িত্ব ছিল বোহেমন্ডের কাঁধে। অভিজ্ঞ সেনাপতি ট্যাটিকিয়াস (Taticius)-এর নেতৃত্বে বাইজান্টাইন বাহিনীর একটি অংশও এই দলের সঙ্গে ছিল। ক্রুসেডার বাহিনীর দ্বিতীয় অংশটি ছিল ৪র্থ রেমন্ডের নেতৃত্বাধীন দক্ষিণ ফ্রান্সের বাহিনী ও গডফ্রের নেতৃত্বাধীন উত্তর ফ্রান্স ও লোরেন অঞ্চলের বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত। এ অংশের সর্বাধিনায়ক ছিলেন ৪র্থ রেমন্ড। উভয় বাহিনী নিজেদের মাঝে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরত্ব রেখে সমান্তরালে অগ্রসর হতে থাকে। সিদ্ধান্ত হয় যে, দোরিলায়ুম (Dorylaeum) নগরীর প্রাচীন ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকায় উভয় বাহিনী পরস্পর মিলিত হবে। (২৫৯) এলাকাটি নিকিয়া থেকে দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় একশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রেখে ক্রুসেডার বাহিনী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে রওনা হয়েছিল। একটি বিষয় হলো, এর ফলে তাদের রসদ ও খাবার- দাবার সংগ্রহ সহজতর হবে। কারণ, খাদ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে তারা পথের বিভিন্ন শস্যক্ষেত্রে বিদ্যমান ফল-ফসলের ওপরই নির্ভর করছিল। অপরদিকে পানির জন্য তারা নির্ভর করছিল এ অঞ্চলে বিদ্যমান বিভিন্ন ঝরনা ও কূপের ওপর। আরেকটি দিক হলো, এর ফলে সৈন্যদের চলার গতি দ্রুত ও সহজতর হবে। কারণ, বিদ্যমান পথঘাট যতই প্রশস্ত হোক না কেন, এই বিশাল বাহিনীর জন্য তা যথেষ্ট ছিল না।
ক্রুসেডার বাহিনীর এভাবে বিভক্ত হয়ে চলার আরেকটি লক্ষ্য ছিল, পথে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সেলজুক সৈন্যদের নিরাপত্তা চৌকিগুলো (pocket of resistance) ধ্বংস করা। (২৬০) সেলজুক গোয়েন্দাদের ধোঁকা দেওয়াও অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। কারণ, সম্ভাবনা ছিল যে, সেলজুক বাহিনী ক্রুসেডার বাহিনীর একটি অংশকেই পূর্ণ বাহিনী মনে করে তাদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। আর এমনটি ঘটলে নিশ্চিত করেই মুসলমানদের যুদ্ধ পরিকল্পনায় বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হবে। বাস্তবেও এই সুবিশাল বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে এমনটিই ঘটেছিল।
টিকাঃ
২৫৯. Alexiad: p. 279; Oman: vol, 1, p.272; Gesta Francorum, pp. 19-22; Fulcher de chartres, pp. 83-87; William of Tyre, 1, pp. 169-1773; Runciman, "Constantinople to Antioch", pp. 293-294; Mayer, Crusades, pp. 50-51.
২৬০. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/১৩৪।
নিকিয়া পতনের পর এক সপ্তাহের বিশ্রাম শেষেই ক্রুসেডাররা সামনে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এবার তারা দক্ষিণ-পূর্বে কিলিজ আরসালানের নতুন রাজধানী কোনিয়ার দিকে অগ্রসর হয়। কোনিয়ার পথে ক্রুসেডাররা নিজেদের দুই ভাগে বিভক্ত করে নিয়েছিল। এক অংশ ছিল সম্পূর্ণ নরম্যানদের নিয়ে গঠিত। বোহেমন্ড ও টেনক্রেডের নেতৃত্বাধীন ইতালিয়ান নরম্যানদের পাশাপাশি রবার্ট ও স্টিফেনের নেতৃত্বাধীন ফ্রেঞ্চ নরম্যানরাও এ অংশে ছিল। এই অংশের সর্বাধিনায়কত্বের দায়িত্ব ছিল বোহেমন্ডের কাঁধে। অভিজ্ঞ সেনাপতি ট্যাটিকিয়াস (Taticius)-এর নেতৃত্বে বাইজান্টাইন বাহিনীর একটি অংশও এই দলের সঙ্গে ছিল। ক্রুসেডার বাহিনীর দ্বিতীয় অংশটি ছিল ৪র্থ রেমন্ডের নেতৃত্বাধীন দক্ষিণ ফ্রান্সের বাহিনী ও গডফ্রের নেতৃত্বাধীন উত্তর ফ্রান্স ও লোরেন অঞ্চলের বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত। এ অংশের সর্বাধিনায়ক ছিলেন ৪র্থ রেমন্ড। উভয় বাহিনী নিজেদের মাঝে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরত্ব রেখে সমান্তরালে অগ্রসর হতে থাকে। সিদ্ধান্ত হয় যে, দোরিলায়ুম (Dorylaeum) নগরীর প্রাচীন ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকায় উভয় বাহিনী পরস্পর মিলিত হবে। (২৫৯) এলাকাটি নিকিয়া থেকে দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় একশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রেখে ক্রুসেডার বাহিনী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে রওনা হয়েছিল। একটি বিষয় হলো, এর ফলে তাদের রসদ ও খাবার- দাবার সংগ্রহ সহজতর হবে। কারণ, খাদ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে তারা পথের বিভিন্ন শস্যক্ষেত্রে বিদ্যমান ফল-ফসলের ওপরই নির্ভর করছিল। অপরদিকে পানির জন্য তারা নির্ভর করছিল এ অঞ্চলে বিদ্যমান বিভিন্ন ঝরনা ও কূপের ওপর। আরেকটি দিক হলো, এর ফলে সৈন্যদের চলার গতি দ্রুত ও সহজতর হবে। কারণ, বিদ্যমান পথঘাট যতই প্রশস্ত হোক না কেন, এই বিশাল বাহিনীর জন্য তা যথেষ্ট ছিল না।
ক্রুসেডার বাহিনীর এভাবে বিভক্ত হয়ে চলার আরেকটি লক্ষ্য ছিল, পথে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সেলজুক সৈন্যদের নিরাপত্তা চৌকিগুলো (pocket of resistance) ধ্বংস করা। (২৬০) সেলজুক গোয়েন্দাদের ধোঁকা দেওয়াও অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। কারণ, সম্ভাবনা ছিল যে, সেলজুক বাহিনী ক্রুসেডার বাহিনীর একটি অংশকেই পূর্ণ বাহিনী মনে করে তাদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। আর এমনটি ঘটলে নিশ্চিত করেই মুসলমানদের যুদ্ধ পরিকল্পনায় বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হবে। বাস্তবেও এই সুবিশাল বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে এমনটিই ঘটেছিল।
টিকাঃ
২৫৯. Alexiad: p. 279; Oman: vol, 1, p.272; Gesta Francorum, pp. 19-22; Fulcher de chartres, pp. 83-87; William of Tyre, 1, pp. 169-1773; Runciman, "Constantinople to Antioch", pp. 293-294; Mayer, Crusades, pp. 50-51.
২৬০. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/১৩৪।
📄 দোরিলায়ামের যুদ্ধ
বোহেমন্ডের নেতৃত্বাধীন অংশটি দোরিলায়ুম অঞ্চলে পৌঁছে দেখতে পায় যে, সেখানকার সমতলভূমি ও উচ্চভূমিতে মুসলিম বাহিনী তাদের অপেক্ষায় আছে। কিলিজ আরসালান ও গাজি বিন দানিশমান্দ উভয়ের বাহিনী মিলে মুসলিম বাহিনী গঠিত হয়েছিল। ক্রুসেডারদের প্রত্যাশামতোই মুসলিম বাহিনী মনে করেছিল যে, বোহেমন্ডের নেতৃত্বাধীন এই বাহিনীটিই অন্তত এ অঞ্চলের পূর্ণ ক্রুসেডার বাহিনী। ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ১ জুলাই (৪৯০ হিজরি) উভয় বাহিনীর মধ্যে প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। প্রথম দিকে যুদ্ধপরিস্থিতি ক্রুসেডার বাহিনীর প্রতিকূলে চলে যায় এবং উজ্জীবিত মুসলিম বাহিনী প্রত্যাশা করে যে, কিছুক্ষণের মধ্যেই জয় তাদের হাতের মুঠোয় চলে আসবে। কিন্তু এরই মধ্যে আকস্মিকভাবে ৪র্থ রেমন্ড ও গডফ্রের নেতৃত্বাধীন ক্রুসেডার বাহিনীর অপর অংশটি উপস্থিত হয়ে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ফলে যুদ্ধ- পরিস্থিতি উল্টে যায় এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। অবশ্য ক্রুসেডার সেনাপতি বোহেমন্ড এ সময় আহত হন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মুসলিম বাহিনীর দুর্বলতা প্রকাশ পেতে শুরু করে এবং তারা তিক্ত পরাজয়ের শিকার হয়। কিলিজ আরসালান বিপুল পরিমাণ রসদ ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ফেলে দ্রুত পালিয়ে এশিয়া মাইনরের গভীরতম অংশে চলে যান। ইতিহাসে দোরিলায়ুমের যুদ্ধ নামে খ্যাত এ যুদ্ধের মাধ্যমে ক্রুসেডারদের দ্বিতীয় নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জিত হয়। (২৬১)
কৃষ্ণসাগর সিনোপ কনস্টান্টিনোপল সামসুন নিকিয়া ট্রাবজোন তোকাত দোরিলায়ুম সিভাস আরযুররুম এন্টিয়ক মিসিয়া কোনিয়া এফসুস হিরাক্লিয়া আদানা কায়সারিয়া মালাতিয়া আনতালিয়া ভূমধ্যসাগর
মানচিত্র নং-১৪ দোরিলায়ুমের যুদ্ধক্ষেত্র
দোরিলায়ুমের যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের ফলে নিকিয়া পতনের প্রভাব আরও গভীরে পৌঁছায়; ক্রুসেডার, বাইজান্টাইন ও আর্মেনীয়দের মনোবল আরও অনেক অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়, মুসলিম বাহিনীর মনোবল পতনের সর্বনিম্ন স্তরে উপনীত হয়। রোমান সেলজুক নেতা কিলিজ আরসালান এরপর আর সরাসরি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অগ্রসর হননি। তিনি পথের সকল নগরী ও জনপদ অরক্ষিত ফেলে পালিয়ে চলে যান। ফলে ক্রুসেডাররা উল্লেখযোগ্য কোনো সংঘর্ষ ছাড়াই বিস্তৃত অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।
কৃষ্ণসাগর
সিনোপ কনস্টান্টিনোপল সামসুন •নিকিয়া •ট্রাবজোন •দোরিলায়ুম তোকাত •আরযুররুম সিভাস এন্টিয়ক কায়সারিয়া মিসিয়া এফসুস কোনিয়া •মালাতিয়া আনতালিয়া হিরাক্লিয়া আদানা মপসুয়েসটিয়া মারআশ তারসুস
ভূমধ্যসাগর
মানচিত্র নং-১৫ এশিয়া মাইনর অঞ্চলে ক্রুসেডার বাহিনীগুলোর গতিপথ
এর চেয়েও দুঃখজনক বিষয় হলো, নিকিয়া পতনের পর যে কোনিয়া নগরীকে কিলিজ আরসালান তার নতুন রাজধানী নির্বাচিত করেছিলেন, ক্রুসেডাররা সেখানে পৌঁছে নগরীটিকে সম্পূর্ণ জনশূন্য অবস্থায় পায়। অল্প কিছু আর্মেনীয় নাগরিক সেখানে ক্রুসেডারদের স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছিল। (২৬২) ক্রুসেডার বাহিনী অতি সহজে কোনিয়ায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার করার পর সামনে অগ্রসর হয়ে হিরাক্লিয়া (Heraclea) নগরীও দখল করে নেয়। (২৬৩) এরপর তারা উত্তর-পূর্বে অগ্রসর হয়ে কায়সারিয়া (Kayseri) নগরী জয় করে। (২৬৪) কায়সারিয়া জয় করার পর ক্রুসেডার বাহিনী তোরোস পবর্তমালার বিভিন্ন পাহাড় অতিক্রম করে মারআশ নগরীতে পৌঁছায়। মারআশ (২৬৫) নগরীর অধিকাংশ নাগরিক ছিল আর্মেনীয় জাতিগোষ্ঠীর। তারা ক্রুসেডার বাহিনীকে সাদর অভ্যর্থনা জানায়। ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ অক্টোবর (৪৯০ হিজরি) ক্রুসেডাররা নগরীটির কর্তৃত্ব বুঝে নেয়।
এখানে এ বিষয়টি উল্লেখযোগ্য যে, ক্রুসেডার বাহিনী এ সময় পর্যন্ত বিজিত সবগুলো নগরীর কর্তৃত্ব কনস্টান্টিনোপল-চুক্তির দাবি অনুসারে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের হাতে তুলে দেয়। (২৬৬) এটি সুস্পষ্ট বাস্তবতা যে, এই সমর্পণ মোটেও স্বেচ্ছায় ও সন্তুষ্টচিত্তে ছিল না; বরং ক্রুসেডার বাহিনী অভিযান চলাকালে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সমরবিশেষজ্ঞ, পথপ্রদর্শক ও অবরোধসামগ্রীসহ বিভিন্ন সাহায্যের পুরোপুরি মুখাপেক্ষী থাকায় অনেকটা বাধ্য হয়েই বাইজান্টাইন সম্রাটের আনুগত্য করে যাচ্ছিল। এটিও সুস্পষ্ট অনুমানিত হচ্ছিল যে, পরবর্তী সময়ে প্রথম সুযোগেই ক্রুসেডাররা বাইজান্টাইন প্রভাব থেকে বের হয়ে যাবে। কারণ, তারা অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের প্রতি হৃদ্যতার কারণে কিংবা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের হৃত মর্যাদা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়নি এবং নিজেদের জান-মাল বিসর্জন দেয়নি। ক্রুসেড অভিযানের মৌলিক লক্ষ্য হচ্ছে প্রতিটি বাহিনীর সেনাপতিদের সাম্রাজ্যবাদী লালসা বাস্তবায়ন, ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি ও ইসলামি প্রাচ্যের সম্পদ ভোগ করা। ক্রুসেডারদের পরবর্তী পদক্ষেপসমূহে বিষয়টি আরও সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হবে।
টিকাঃ
২৬১. Grousset: Op cit., 1, p. 35.
২৬২. Gesta Francorum, pp. 55-57.
২৬৩. Setton: op. cit., vol. 1, p. 295.
২৬৪, Gesta Francorum, pp. 61.
২৬৫. ইংরেজি নাম Kahramanmaraş। [অনুবাদক]
২৬৬, Cam. Med Hist. vol. 5, p. 287.
বোহেমন্ডের নেতৃত্বাধীন অংশটি দোরিলায়ুম অঞ্চলে পৌঁছে দেখতে পায় যে, সেখানকার সমতলভূমি ও উচ্চভূমিতে মুসলিম বাহিনী তাদের অপেক্ষায় আছে। কিলিজ আরসালান ও গাজি বিন দানিশমান্দ উভয়ের বাহিনী মিলে মুসলিম বাহিনী গঠিত হয়েছিল। ক্রুসেডারদের প্রত্যাশামতোই মুসলিম বাহিনী মনে করেছিল যে, বোহেমন্ডের নেতৃত্বাধীন এই বাহিনীটিই অন্তত এ অঞ্চলের পূর্ণ ক্রুসেডার বাহিনী। ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ১ জুলাই (৪৯০ হিজরি) উভয় বাহিনীর মধ্যে প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। প্রথম দিকে যুদ্ধপরিস্থিতি ক্রুসেডার বাহিনীর প্রতিকূলে চলে যায় এবং উজ্জীবিত মুসলিম বাহিনী প্রত্যাশা করে যে, কিছুক্ষণের মধ্যেই জয় তাদের হাতের মুঠোয় চলে আসবে। কিন্তু এরই মধ্যে আকস্মিকভাবে ৪র্থ রেমন্ড ও গডফ্রের নেতৃত্বাধীন ক্রুসেডার বাহিনীর অপর অংশটি উপস্থিত হয়ে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ফলে যুদ্ধ- পরিস্থিতি উল্টে যায় এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। অবশ্য ক্রুসেডার সেনাপতি বোহেমন্ড এ সময় আহত হন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মুসলিম বাহিনীর দুর্বলতা প্রকাশ পেতে শুরু করে এবং তারা তিক্ত পরাজয়ের শিকার হয়। কিলিজ আরসালান বিপুল পরিমাণ রসদ ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ফেলে দ্রুত পালিয়ে এশিয়া মাইনরের গভীরতম অংশে চলে যান। ইতিহাসে দোরিলায়ুমের যুদ্ধ নামে খ্যাত এ যুদ্ধের মাধ্যমে ক্রুসেডারদের দ্বিতীয় নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জিত হয়। (২৬১)
কৃষ্ণসাগর সিনোপ কনস্টান্টিনোপল সামসুন নিকিয়া ট্রাবজোন তোকাত দোরিলায়ুম সিভাস আরযুররুম এন্টিয়ক মিসিয়া কোনিয়া এফসুস হিরাক্লিয়া আদানা কায়সারিয়া মালাতিয়া আনতালিয়া ভূমধ্যসাগর
মানচিত্র নং-১৪ দোরিলায়ুমের যুদ্ধক্ষেত্র
দোরিলায়ুমের যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের ফলে নিকিয়া পতনের প্রভাব আরও গভীরে পৌঁছায়; ক্রুসেডার, বাইজান্টাইন ও আর্মেনীয়দের মনোবল আরও অনেক অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়, মুসলিম বাহিনীর মনোবল পতনের সর্বনিম্ন স্তরে উপনীত হয়। রোমান সেলজুক নেতা কিলিজ আরসালান এরপর আর সরাসরি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অগ্রসর হননি। তিনি পথের সকল নগরী ও জনপদ অরক্ষিত ফেলে পালিয়ে চলে যান। ফলে ক্রুসেডাররা উল্লেখযোগ্য কোনো সংঘর্ষ ছাড়াই বিস্তৃত অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।
কৃষ্ণসাগর
সিনোপ কনস্টান্টিনোপল সামসুন •নিকিয়া •ট্রাবজোন •দোরিলায়ুম তোকাত •আরযুররুম সিভাস এন্টিয়ক কায়সারিয়া মিসিয়া এফসুস কোনিয়া •মালাতিয়া আনতালিয়া হিরাক্লিয়া আদানা মপসুয়েসটিয়া মারআশ তারসুস
ভূমধ্যসাগর
মানচিত্র নং-১৫ এশিয়া মাইনর অঞ্চলে ক্রুসেডার বাহিনীগুলোর গতিপথ
এর চেয়েও দুঃখজনক বিষয় হলো, নিকিয়া পতনের পর যে কোনিয়া নগরীকে কিলিজ আরসালান তার নতুন রাজধানী নির্বাচিত করেছিলেন, ক্রুসেডাররা সেখানে পৌঁছে নগরীটিকে সম্পূর্ণ জনশূন্য অবস্থায় পায়। অল্প কিছু আর্মেনীয় নাগরিক সেখানে ক্রুসেডারদের স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছিল। (২৬২) ক্রুসেডার বাহিনী অতি সহজে কোনিয়ায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার করার পর সামনে অগ্রসর হয়ে হিরাক্লিয়া (Heraclea) নগরীও দখল করে নেয়। (২৬৩) এরপর তারা উত্তর-পূর্বে অগ্রসর হয়ে কায়সারিয়া (Kayseri) নগরী জয় করে। (২৬৪) কায়সারিয়া জয় করার পর ক্রুসেডার বাহিনী তোরোস পবর্তমালার বিভিন্ন পাহাড় অতিক্রম করে মারআশ নগরীতে পৌঁছায়। মারআশ (২৬৫) নগরীর অধিকাংশ নাগরিক ছিল আর্মেনীয় জাতিগোষ্ঠীর। তারা ক্রুসেডার বাহিনীকে সাদর অভ্যর্থনা জানায়। ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ অক্টোবর (৪৯০ হিজরি) ক্রুসেডাররা নগরীটির কর্তৃত্ব বুঝে নেয়।
এখানে এ বিষয়টি উল্লেখযোগ্য যে, ক্রুসেডার বাহিনী এ সময় পর্যন্ত বিজিত সবগুলো নগরীর কর্তৃত্ব কনস্টান্টিনোপল-চুক্তির দাবি অনুসারে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের হাতে তুলে দেয়। (২৬৬) এটি সুস্পষ্ট বাস্তবতা যে, এই সমর্পণ মোটেও স্বেচ্ছায় ও সন্তুষ্টচিত্তে ছিল না; বরং ক্রুসেডার বাহিনী অভিযান চলাকালে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সমরবিশেষজ্ঞ, পথপ্রদর্শক ও অবরোধসামগ্রীসহ বিভিন্ন সাহায্যের পুরোপুরি মুখাপেক্ষী থাকায় অনেকটা বাধ্য হয়েই বাইজান্টাইন সম্রাটের আনুগত্য করে যাচ্ছিল। এটিও সুস্পষ্ট অনুমানিত হচ্ছিল যে, পরবর্তী সময়ে প্রথম সুযোগেই ক্রুসেডাররা বাইজান্টাইন প্রভাব থেকে বের হয়ে যাবে। কারণ, তারা অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের প্রতি হৃদ্যতার কারণে কিংবা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের হৃত মর্যাদা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়নি এবং নিজেদের জান-মাল বিসর্জন দেয়নি। ক্রুসেড অভিযানের মৌলিক লক্ষ্য হচ্ছে প্রতিটি বাহিনীর সেনাপতিদের সাম্রাজ্যবাদী লালসা বাস্তবায়ন, ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি ও ইসলামি প্রাচ্যের সম্পদ ভোগ করা। ক্রুসেডারদের পরবর্তী পদক্ষেপসমূহে বিষয়টি আরও সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হবে।
টিকাঃ
২৬১. Grousset: Op cit., 1, p. 35.
২৬২. Gesta Francorum, pp. 55-57.
২৬৩. Setton: op. cit., vol. 1, p. 295.
২৬৪, Gesta Francorum, pp. 61.
২৬৫. ইংরেজি নাম Kahramanmaraş। [অনুবাদক]
২৬৬, Cam. Med Hist. vol. 5, p. 287.
📄 ইসলামি প্রাচ্যের বুকে প্রথম ক্রুসেড রাজ্য
সম্ভবত এই সাম্রাজ্যবাদী লালসার প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটে বোহেমন্ডের ভাগ্নে টেনক্রেড ও গডফ্রের ভাই বল্ডউইনের মাধ্যমে। এ সময় তারা দুজন মূল ক্রুসেডার বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত কিলিকিয়া অঞ্চল জয় করার লক্ষ্যে অগ্রসর হয়। (২৬৭) ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ সেপ্টেম্বর (৪৯০ হিজরি) উভয়ের নেতৃত্বাধীন বাহিনী মূল বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং ২১ সেপ্টেম্বর সরাসরি তারসুস (২৬৮) নগরী অভিমুখে রওনা হয়।
টেনক্রেডের বাহিনী দ্রুততম সময়ের মধ্যে তারসুস নগরীর কাছে পৌঁছে যায় এবং নগরীর নিরাপত্তা-দায়িত্ব পালনরত তুর্কি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। তুর্কি বাহিনী ধৈর্যের সঙ্গে প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে থাকলেও হঠাৎ করেই বল্ডউইনের বাহিনীও উপস্থিত হয়। ফলে মুসলিম বাহিনী উপলব্ধি করে যে, প্রতিরোধ প্রচেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। (২৬৯) তাই তারা নগরী ছেড়ে পালিয়ে যায়। প্রথমে টেনক্রেড নগরীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন এবং সেখানে নিজের পতাকা উত্তোলন করেন। টেনক্রেডের যেন মনেই নেই যে, কনস্টান্টিনোপল চুক্তি অনুযায়ী বিজিত প্রতিটি নগরীর অধিকার বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের! তারসুসের আর্মেনীয় নাগরিকরা টেনক্রেডকে উষ্ণ সংবর্ধনা জানায়। (২৭০) কিন্তু বল্ডউইন এতে অসন্তুষ্ট ও ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন। একে কেন্দ্র করে উভয়ের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টির উপক্রম হয়। স্বভাবতই বল্ডউইনের ক্রোধ বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের স্বার্থহানির কারণে ছিল না; তার ক্রোধ ছিল আপন স্বার্থহানির কারণে। তার আশা ছিল টেনক্রেড নয়; তিনিই হবেন তারসুসের অধিপতি। শেষ পর্যন্ত টেনক্রেড নগরীটির কর্তৃত্ব বল্ডউইনের হাতে ছেড়ে দিতে সম্মত হন এবং নিজে মপসুয়েসটিয়া (Mopsuestia) নগরীর দিকে অগ্রসর হন। বল্ডউইন এবার নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার নিদর্শন হিসেবে তারসুস নগরীর শীর্ষদেশে তার পতাকা উত্তোলন করেন। (২৭১)
এরই মধ্যে এমন দুটি ঘটনা ঘটে, যার কারণে তারসুস অঞ্চলের পরিস্থিতি অনেকটা বদলে যায়। প্রথম ঘটনাটি হলো, বোহেমন্ড তার বাহিনীর তিনশ সদস্যের একটি অংশকে ভাগ্নে টেনক্রেডের সহায়তায় প্রেরণ করেছিলেন। তারা রাতের বেলা তারসুসে পৌঁছে জানতে পারে যে, টেনক্রেড ইতিমধ্যে তারসুস ত্যাগ করে চলে গেছেন এবং নগরীটি এখন বল্ডউইনের কর্তৃত্বে আছে। তারা পরদিন সকাল পর্যন্ত নগরীর অভ্যন্তরে রাতযাপনের অনুমতি চাইলে বল্ডউইন তাদেরকে অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং তাদেরকে নগরীর বাইরেই রাত কাটাতে বাধ্য করেন। তিনশ সৈন্য খোলা প্রান্তরে ঘুমিয়ে পড়ার পর আকস্মিকভাবে একদল তুর্কি সৈন্য তাদের ওপর আক্রমণ চালায় এবং তাদেরকে পুরোপুরি নিঃশেষ করে দেয়। (২৭২) এ সংবাদ ক্রুসেডার বাহিনীর কাছে পৌঁছলে সকলে বল্ডউইনের ওপর প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয় এবং তাকেই এই তিনশ সৈন্যের নিহত হওয়ার জন্য দায়ী করে। (২৭৩)
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, বল্ডউইনের আস্থাভাজন জনৈক আর্মেনীয় নাগরিক বল্ডউইনকে সীমিত পরিসরের তারসুস নগরী ছেড়ে ফুরাত নদীর তীরে অবস্থিত এডেসা নগরী অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার পরামর্শ দেয়। এডেসা ছিল তারসুসের তুলনায় বিস্তৃত, উর্বর ও সমৃদ্ধ এক নগরী।
টিকাঃ
২৬৭, Chalandon: premiere Croisades, p. 172.
২৬৮. তারসুস ও তারতুস দুটি ভিন্ন নগরীর নাম। ঐতিহাসিক কিলিকিয়া অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত তারসুস (Tarsus)-এর অবস্থান আধুনিক তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে। জনসংখ্যার বিচারে তারসুস তুরস্কের চতুর্থ বৃহত্তম নগরী। অপরদিকে তারতুস (Tartus)-এর অবস্থান আধুনিক সিরিয়ায়। তারতুস লাতাকিয়ার পর সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বন্দর-নগরী। উভয় নগরীর অবস্থান ভূমধ্যসাগরের তীরে হলেও মাঝের দূরত্ব চারশ কিলোমিটারেরও বেশি। বক্ষ্যমাণ গ্রন্থের বিভিন্ন স্থানে নগরীদুটির আলোচনা আসবে। [অনুবাদক]
২৬৯, ফুশিয়া আশ-শারতিরি, তারীখুল হাম্নাতি ইলাল কুদস, পৃষ্ঠা: ৫১-৫২। Grousset: vol 1 p 46.
২৭০, Grousset: Hist. des Croisades, 1, p. 41.
২৭১, Cam. Med. Hist. vol. 5, p. 288.
২৭২. Albert d' Aix, (Hist Occid) IV, p.p. 346-347.
২৭০. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/১৪৩।
সম্ভবত এই সাম্রাজ্যবাদী লালসার প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটে বোহেমন্ডের ভাগ্নে টেনক্রেড ও গডফ্রের ভাই বল্ডউইনের মাধ্যমে। এ সময় তারা দুজন মূল ক্রুসেডার বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত কিলিকিয়া অঞ্চল জয় করার লক্ষ্যে অগ্রসর হয়। (২৬৭) ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ সেপ্টেম্বর (৪৯০ হিজরি) উভয়ের নেতৃত্বাধীন বাহিনী মূল বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং ২১ সেপ্টেম্বর সরাসরি তারসুস (২৬৮) নগরী অভিমুখে রওনা হয়।
টেনক্রেডের বাহিনী দ্রুততম সময়ের মধ্যে তারসুস নগরীর কাছে পৌঁছে যায় এবং নগরীর নিরাপত্তা-দায়িত্ব পালনরত তুর্কি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। তুর্কি বাহিনী ধৈর্যের সঙ্গে প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে থাকলেও হঠাৎ করেই বল্ডউইনের বাহিনীও উপস্থিত হয়। ফলে মুসলিম বাহিনী উপলব্ধি করে যে, প্রতিরোধ প্রচেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। (২৬৯) তাই তারা নগরী ছেড়ে পালিয়ে যায়। প্রথমে টেনক্রেড নগরীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন এবং সেখানে নিজের পতাকা উত্তোলন করেন। টেনক্রেডের যেন মনেই নেই যে, কনস্টান্টিনোপল চুক্তি অনুযায়ী বিজিত প্রতিটি নগরীর অধিকার বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের! তারসুসের আর্মেনীয় নাগরিকরা টেনক্রেডকে উষ্ণ সংবর্ধনা জানায়। (২৭০) কিন্তু বল্ডউইন এতে অসন্তুষ্ট ও ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন। একে কেন্দ্র করে উভয়ের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টির উপক্রম হয়। স্বভাবতই বল্ডউইনের ক্রোধ বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের স্বার্থহানির কারণে ছিল না; তার ক্রোধ ছিল আপন স্বার্থহানির কারণে। তার আশা ছিল টেনক্রেড নয়; তিনিই হবেন তারসুসের অধিপতি। শেষ পর্যন্ত টেনক্রেড নগরীটির কর্তৃত্ব বল্ডউইনের হাতে ছেড়ে দিতে সম্মত হন এবং নিজে মপসুয়েসটিয়া (Mopsuestia) নগরীর দিকে অগ্রসর হন। বল্ডউইন এবার নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার নিদর্শন হিসেবে তারসুস নগরীর শীর্ষদেশে তার পতাকা উত্তোলন করেন। (২৭১)
এরই মধ্যে এমন দুটি ঘটনা ঘটে, যার কারণে তারসুস অঞ্চলের পরিস্থিতি অনেকটা বদলে যায়। প্রথম ঘটনাটি হলো, বোহেমন্ড তার বাহিনীর তিনশ সদস্যের একটি অংশকে ভাগ্নে টেনক্রেডের সহায়তায় প্রেরণ করেছিলেন। তারা রাতের বেলা তারসুসে পৌঁছে জানতে পারে যে, টেনক্রেড ইতিমধ্যে তারসুস ত্যাগ করে চলে গেছেন এবং নগরীটি এখন বল্ডউইনের কর্তৃত্বে আছে। তারা পরদিন সকাল পর্যন্ত নগরীর অভ্যন্তরে রাতযাপনের অনুমতি চাইলে বল্ডউইন তাদেরকে অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং তাদেরকে নগরীর বাইরেই রাত কাটাতে বাধ্য করেন। তিনশ সৈন্য খোলা প্রান্তরে ঘুমিয়ে পড়ার পর আকস্মিকভাবে একদল তুর্কি সৈন্য তাদের ওপর আক্রমণ চালায় এবং তাদেরকে পুরোপুরি নিঃশেষ করে দেয়। (২৭২) এ সংবাদ ক্রুসেডার বাহিনীর কাছে পৌঁছলে সকলে বল্ডউইনের ওপর প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয় এবং তাকেই এই তিনশ সৈন্যের নিহত হওয়ার জন্য দায়ী করে। (২৭৩)
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, বল্ডউইনের আস্থাভাজন জনৈক আর্মেনীয় নাগরিক বল্ডউইনকে সীমিত পরিসরের তারসুস নগরী ছেড়ে ফুরাত নদীর তীরে অবস্থিত এডেসা নগরী অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার পরামর্শ দেয়। এডেসা ছিল তারসুসের তুলনায় বিস্তৃত, উর্বর ও সমৃদ্ধ এক নগরী।
টিকাঃ
২৬৭, Chalandon: premiere Croisades, p. 172.
২৬৮. তারসুস ও তারতুস দুটি ভিন্ন নগরীর নাম। ঐতিহাসিক কিলিকিয়া অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত তারসুস (Tarsus)-এর অবস্থান আধুনিক তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে। জনসংখ্যার বিচারে তারসুস তুরস্কের চতুর্থ বৃহত্তম নগরী। অপরদিকে তারতুস (Tartus)-এর অবস্থান আধুনিক সিরিয়ায়। তারতুস লাতাকিয়ার পর সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বন্দর-নগরী। উভয় নগরীর অবস্থান ভূমধ্যসাগরের তীরে হলেও মাঝের দূরত্ব চারশ কিলোমিটারেরও বেশি। বক্ষ্যমাণ গ্রন্থের বিভিন্ন স্থানে নগরীদুটির আলোচনা আসবে। [অনুবাদক]
২৬৯, ফুশিয়া আশ-শারতিরি, তারীখুল হাম্নাতি ইলাল কুদস, পৃষ্ঠা: ৫১-৫২। Grousset: vol 1 p 46.
২৭০, Grousset: Hist. des Croisades, 1, p. 41.
২৭১, Cam. Med. Hist. vol. 5, p. 288.
২৭২. Albert d' Aix, (Hist Occid) IV, p.p. 346-347.
২৭০. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/১৪৩।