📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 নিকিয়া পতনের প্রভাবসমূহ

📄 নিকিয়া পতনের প্রভাবসমূহ


স্বাভাবিক দৃষ্টিতে যদিও নিকিয়ার পতন মানে একটি নগরীর পতনমাত্র; কিন্তু এর অবশ্যম্ভাবী প্রভাব ছিল অত্যন্ত ব্যাপক ও বিস্তৃত। যেমন :

১. নিকিয়া পতনের ফলে ক্রুসেডার বাহিনীর মানসিক শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং ধর্মযাজক পিটার ও কাঙাল ওয়ালটারের নেতৃত্বাধীন অপেশাদার বাহিনীর নির্মম পতনের দুঃখ অনেকটাই দূরীভূত হয়ে যায়। এ কারণেই নিকিয়া অবরোধ চলাকালে এবং কিলিজ আরসালানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় ক্রুসেডারদের প্রচুর প্রাণহানি ঘটলেও সেনাপতি ও সাধারণ সৈন্য সকলেই ছিল ইসলামি ভূখণ্ডে অভিযান চালিয়ে যেতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ও সংকল্পবদ্ধ। (২৪৯)

২. অপ্রশিক্ষিত সাধারণ জনতার বাহিনী আক্রান্ত হওয়ার পর ইউরোপজুড়ে যে নিরাশা ও হতাশা ছেয়ে গিয়েছিল, এবার তার পরিবর্তে ইউরোপের জনগণের আত্মবিশ্বাস ও মনোবল অনেক বেড়ে যায়। নবোদ্যমে নতুন নতুন আরও বাহিনী তৈরি হতে থাকে। ইউরোপ থেকে এশিয়া মাইনর ও শাম অঞ্চল অভিমুখে স্রোতের মতো ক্রুসেডার সৈন্যদের আগমন ঘটতে থাকে। ইতালিয়ান নৌবন্দরগুলো সক্রিয়ভাবে ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে শুরু করে। (২৫০)

৩. বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের মনোবলও বৃদ্ধি পায়। কারণ, ৪৬৩ হিজরি সনে সুবিখ্যাত মানজিকার্টের যুদ্ধে পরাজয়ের সাতাশ বছরেরও অধিক সময় পর নিকিয়া পতনের ঘটনা ছিল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের হৃত মর্যাদা পুনরুদ্ধারের প্রথম পদক্ষেপ। নিকিয়া বিজয় ধূর্ত বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোসের কর্তৃত্ব বৃদ্ধিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। (২৫১)

৪. বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাওয়ায় তারা এবার সেলজুকদের বিশৃঙ্খলাকে কাজে লাগাতে প্রবল শক্তিতে অগ্রসর হতে থাকে। এশিয়া মাইনরের পশ্চিমাঞ্চলের অধিকাংশ ভূমি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে। (২৫২) এরপর বাইজান্টাইন বাহিনী এশিয়া মাইনরের উত্তরাঞ্চলে এবং কৃষ্ণসাগরের উপকূলীয় নগরীগুলোতে হামলা চালাতে শুরু করে। নিকিয়ার পতনের পর তিন শতাব্দীরও অধিক সময় এশিয়া মাইনরের পশ্চিমাঞ্চল বাইজান্টাইনদের দখলে ছিল। (২৫৩)

৫. ক্রুসেডার ও বাইজান্টাইনদের যুগপৎ মনোবল বৃদ্ধির বিপরীতে বিভিন্ন এলাকার মুসলিম বাহিনী, সেনাপতিগণ, জনসাধারণ ও নেতৃবৃন্দ নির্বিশেষে সকলের আত্মবিশ্বাসে প্রচণ্ড ধস নামে। কারণ, নিকিয়ার পতন ছিল এশিয়া মাইনর অঞ্চলের সবচেয়ে সুরক্ষিত নগরীর পতন। এর অর্থ হলো, অন্যান্য নগরীর আরও সহজে পতন ঘটবে। তা ছাড়া পশ্চিমের ক্রুসেডার বাহিনী আর প্রাচ্যের বাইজান্টাইন বাহিনী এই দুই বিশাল শক্তির জোট বাঁধার অর্থ হচ্ছে, ইসলামি ভূখণ্ডের জন্য সামনের দিনগুলো অতীতের চেয়ে আরও কঠিন হবে!

৬. নিকিয়া পতনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো, একে কেন্দ্র করে ক্রুসেডার-বাইজান্টাইন সম্পর্কের মাঝে দুষ্ট মনোবৃত্তির প্রতিক্রিয়া আরও বৃদ্ধি পায় এবং তা পরবর্তীকালে ক্রুসেড অভিযানের গতি-প্রকৃতি ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। ক্রুসেডার বাহিনীর সেনাপতিগণ বাইজান্টাইন সম্রাটের ওপর প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি তার প্রতি ভীতি অনুভব করতে থাকে। এটি সুস্পষ্ট যে, ভেতরে ভেতরে পরিস্থিতি তখন উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল এবং ছাইচাপা আগুন জ্বলে ওঠার অপেক্ষায় ছিল। এ কারণেই বাইজান্টাইন সম্রাট নিকিয়া অভিযানের পর সামনে অগ্রসর হওয়ার পূর্বেই ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দকে সমবেত করে তার প্রতি আনুগত্য ও বশ্যতার শপথ নবায়ন করতে চাপ দিতে থাকেন। নিতান্ত নিরুপায় হয়ে সকলে শপথ নবায়ন করে। বোহেমন্ড আগের মতোই সম্রাটের হৃদ্যতা লাভের আশায় বিনা দ্বিধায় দ্রুত শপথ সম্পন্ন করেন আর ৪র্থ রেমন্ড আনুগত্য ও মিত্রতার শপথ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সম্রাটের মর্যাদা রক্ষার শপথ নবায়ন করেন। (২৫৪) এ ছাড়াও বোহেমন্ডের ভাগ্নে টেনক্রেড শপথ করতে অস্বীকৃতি জানান। টেনক্রেড শুরুতে কনস্টান্টিনোপলেও তার মামার শপথের ওপর নির্ভর করে নিজে শপথ করেননি। টেনক্রেডের এই শপথ গ্রহণে অস্বীকৃতি পরবর্তী সময়ে তার বিভিন্ন পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল।

৭. একদিকে সেলজুকদের পরাজয়, অপরদিকে (অর্থোডক্স বাইজান্টাইনদের তুলনায় তুলনামূলক আস্থার পাত্র) ক্যাথলিক মতাদর্শী ক্রুসেডারদের এশিয়া মাইনর অঞ্চলে অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা-এই দুই কারণে আর্মেনীয়দের মাঝেও দৃশ্যমান উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। আগামী ঘটনাপ্রবাহে আমরা লক্ষ করব যে, একে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে আর্মেনীয় ও ক্রুসেডারদের মাঝে উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা বিনিময় প্রকাশ পাবে। নিকিয়া পতনের পর বিশেষ করে এশিয়া মাইনরের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলসহ আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত বিভিন্ন নগরী থেকে ক্রুসেডারদের প্রতি আপন আপন অঞ্চলে আগমনের অনুরোধ আসতে থাকে। আর্মেনীয়দের এসব অনুরোধবার্তা ক্রুসেড অভিযানের পরবর্তী গতিপথ নির্ণয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল।

৮. সামরিক প্রভাব: নিকিয়া পতনের ফলে এশিয়া মাইনর অঞ্চলে প্রবেশের পথ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। নিকিয়াই ছিল এশিয়া মাইনরের ইসলামি ভূখণ্ডে প্রবেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। আর তাই নিকিয়া পতনের পর ক্রুসেডারদের সামনে এশিয়া মাইনরের গভীরে বরং শাম অঞ্চলে পৌঁছার বিরাট সুযোগ এসে যায়। (২৫৫)

৯. নিকিয়া পতনের পর কিলিজ আরসালান দ্রুত কোনিয়া (২৫৬) নগরীতে চলে যান এবং কোনিয়াকে নতুন রাজধানী নির্বাচন করেন। (২৫৭) এভাবেও বলা চলে যে, কোনিয়া পরিণত হয় তার নতুন সামরিক ঘাঁটিতে, যেখান থেকে তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করবেন। কোনিয়া ছিল নিকিয়া থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রায় চারশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। নিকিয়ার মতো না হলেও কোনিয়া নগরীও যথেষ্ট সুরক্ষিত ছিল।

১০. রোমান সেলজুক রাষ্ট্রের নেতা কিলিজ আরসালান ও তুর্কমেনদের নেতা গাজি বিন দানিশমান্দ সিদ্ধান্ত নেন যে, তারা আপাতত কিছু সময়ের জন্য পারস্পরিক বিরোধের কথা ভুলে গিয়ে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে একক ফ্রন্ট গড়ে তুলবেন। (২৫৮) বাহ্যত এই ঐক্য প্রচেষ্টা যদিও একটি ইতিবাচক বিষয় ছিল; কিন্তু বাস্তবে এর উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব ছিল না। এই ঐক্য ছিল দুর্বল ও ভঙ্গুরপ্রায়। কারণ, একদিকে উভয় পক্ষের বিরোধ ও শত্রুতা ছিল গভীর ও সুপ্রাচীন; অপরদিকে একতা ও সম্মিলিত লড়াইয়ের সুস্পষ্ট ইসলামি অনুপ্রাণিকাও উভয় পক্ষের মাঝে অনুপস্থিত ছিল। দ্বীন রক্ষার্থে নয়; বরং তাদের ঐক্য ছিল আপন আপন ভূখণ্ড রক্ষার জন্য।

টিকাঃ
২৪৯. Cam. Med. Hist. vol 5, p. 285.
২৫০. Runciman, op. cit., 1, p.p. 182-183, Setton: op. cit. 1, p. 201.
২৫১. Grousset: Hist. des Croisades, 1, pp 42-43.
২৫২. Grousset: Hist. des Croisades, 1, pp. 41-43.
২৫৩, সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/১৩৯।
২৫৪, Chalandon: Alexis Comnene, p. 193.
২৫৫. Oman: vol 1 p 279.
২৫৬. কোনিয়া: বর্তমান তুরস্কের অন্তর্গত কোনিয়া প্রদেশের রাজধানী নগরী। জগদ্বিখ্যাত সুফি সাধক জালালুদ্দিন রুমি রহ.-এর সমাধি কোনিয়া নগরীতেই অবস্থিত। হাতে-বোনা কার্পেট শিল্পের জন্য কোনিয়ার বিশ্বজুড়ে খ্যাতি রয়েছে। [অনুবাদক]
২৫৭. রানচিমান, তারীখুল হুরূবিস সালীবিয়্যাহ, ১/২৭৮।
২৫৮. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৮/১৮৬, ১৬৪ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৩৪। Gesta Francorum, pp. 19-22; Fulcher de Chartres, pp. 83-87; William of Tyre, 1, pp. 169-173; Runciman, "Constantinople to Antioch", pp. 293-294; Mayer, Crusades, pp. 50-51.

স্বাভাবিক দৃষ্টিতে যদিও নিকিয়ার পতন মানে একটি নগরীর পতনমাত্র; কিন্তু এর অবশ্যম্ভাবী প্রভাব ছিল অত্যন্ত ব্যাপক ও বিস্তৃত। যেমন :

১. নিকিয়া পতনের ফলে ক্রুসেডার বাহিনীর মানসিক শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং ধর্মযাজক পিটার ও কাঙাল ওয়ালটারের নেতৃত্বাধীন অপেশাদার বাহিনীর নির্মম পতনের দুঃখ অনেকটাই দূরীভূত হয়ে যায়। এ কারণেই নিকিয়া অবরোধ চলাকালে এবং কিলিজ আরসালানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় ক্রুসেডারদের প্রচুর প্রাণহানি ঘটলেও সেনাপতি ও সাধারণ সৈন্য সকলেই ছিল ইসলামি ভূখণ্ডে অভিযান চালিয়ে যেতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ও সংকল্পবদ্ধ। (২৪৯)

২. অপ্রশিক্ষিত সাধারণ জনতার বাহিনী আক্রান্ত হওয়ার পর ইউরোপজুড়ে যে নিরাশা ও হতাশা ছেয়ে গিয়েছিল, এবার তার পরিবর্তে ইউরোপের জনগণের আত্মবিশ্বাস ও মনোবল অনেক বেড়ে যায়। নবোদ্যমে নতুন নতুন আরও বাহিনী তৈরি হতে থাকে। ইউরোপ থেকে এশিয়া মাইনর ও শাম অঞ্চল অভিমুখে স্রোতের মতো ক্রুসেডার সৈন্যদের আগমন ঘটতে থাকে। ইতালিয়ান নৌবন্দরগুলো সক্রিয়ভাবে ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে শুরু করে। (২৫০)

৩. বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের মনোবলও বৃদ্ধি পায়। কারণ, ৪৬৩ হিজরি সনে সুবিখ্যাত মানজিকার্টের যুদ্ধে পরাজয়ের সাতাশ বছরেরও অধিক সময় পর নিকিয়া পতনের ঘটনা ছিল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের হৃত মর্যাদা পুনরুদ্ধারের প্রথম পদক্ষেপ। নিকিয়া বিজয় ধূর্ত বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোসের কর্তৃত্ব বৃদ্ধিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। (২৫১)

৪. বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাওয়ায় তারা এবার সেলজুকদের বিশৃঙ্খলাকে কাজে লাগাতে প্রবল শক্তিতে অগ্রসর হতে থাকে। এশিয়া মাইনরের পশ্চিমাঞ্চলের অধিকাংশ ভূমি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে। (২৫২) এরপর বাইজান্টাইন বাহিনী এশিয়া মাইনরের উত্তরাঞ্চলে এবং কৃষ্ণসাগরের উপকূলীয় নগরীগুলোতে হামলা চালাতে শুরু করে। নিকিয়ার পতনের পর তিন শতাব্দীরও অধিক সময় এশিয়া মাইনরের পশ্চিমাঞ্চল বাইজান্টাইনদের দখলে ছিল। (২৫৩)

৫. ক্রুসেডার ও বাইজান্টাইনদের যুগপৎ মনোবল বৃদ্ধির বিপরীতে বিভিন্ন এলাকার মুসলিম বাহিনী, সেনাপতিগণ, জনসাধারণ ও নেতৃবৃন্দ নির্বিশেষে সকলের আত্মবিশ্বাসে প্রচণ্ড ধস নামে। কারণ, নিকিয়ার পতন ছিল এশিয়া মাইনর অঞ্চলের সবচেয়ে সুরক্ষিত নগরীর পতন। এর অর্থ হলো, অন্যান্য নগরীর আরও সহজে পতন ঘটবে। তা ছাড়া পশ্চিমের ক্রুসেডার বাহিনী আর প্রাচ্যের বাইজান্টাইন বাহিনী এই দুই বিশাল শক্তির জোট বাঁধার অর্থ হচ্ছে, ইসলামি ভূখণ্ডের জন্য সামনের দিনগুলো অতীতের চেয়ে আরও কঠিন হবে!

৬. নিকিয়া পতনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো, একে কেন্দ্র করে ক্রুসেডার-বাইজান্টাইন সম্পর্কের মাঝে দুষ্ট মনোবৃত্তির প্রতিক্রিয়া আরও বৃদ্ধি পায় এবং তা পরবর্তীকালে ক্রুসেড অভিযানের গতি-প্রকৃতি ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। ক্রুসেডার বাহিনীর সেনাপতিগণ বাইজান্টাইন সম্রাটের ওপর প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি তার প্রতি ভীতি অনুভব করতে থাকে। এটি সুস্পষ্ট যে, ভেতরে ভেতরে পরিস্থিতি তখন উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল এবং ছাইচাপা আগুন জ্বলে ওঠার অপেক্ষায় ছিল। এ কারণেই বাইজান্টাইন সম্রাট নিকিয়া অভিযানের পর সামনে অগ্রসর হওয়ার পূর্বেই ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দকে সমবেত করে তার প্রতি আনুগত্য ও বশ্যতার শপথ নবায়ন করতে চাপ দিতে থাকেন। নিতান্ত নিরুপায় হয়ে সকলে শপথ নবায়ন করে। বোহেমন্ড আগের মতোই সম্রাটের হৃদ্যতা লাভের আশায় বিনা দ্বিধায় দ্রুত শপথ সম্পন্ন করেন আর ৪র্থ রেমন্ড আনুগত্য ও মিত্রতার শপথ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সম্রাটের মর্যাদা রক্ষার শপথ নবায়ন করেন। (২৫৪) এ ছাড়াও বোহেমন্ডের ভাগ্নে টেনক্রেড শপথ করতে অস্বীকৃতি জানান। টেনক্রেড শুরুতে কনস্টান্টিনোপলেও তার মামার শপথের ওপর নির্ভর করে নিজে শপথ করেননি। টেনক্রেডের এই শপথ গ্রহণে অস্বীকৃতি পরবর্তী সময়ে তার বিভিন্ন পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল।

৭. একদিকে সেলজুকদের পরাজয়, অপরদিকে (অর্থোডক্স বাইজান্টাইনদের তুলনায় তুলনামূলক আস্থার পাত্র) ক্যাথলিক মতাদর্শী ক্রুসেডারদের এশিয়া মাইনর অঞ্চলে অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা-এই দুই কারণে আর্মেনীয়দের মাঝেও দৃশ্যমান উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। আগামী ঘটনাপ্রবাহে আমরা লক্ষ করব যে, একে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে আর্মেনীয় ও ক্রুসেডারদের মাঝে উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা বিনিময় প্রকাশ পাবে। নিকিয়া পতনের পর বিশেষ করে এশিয়া মাইনরের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলসহ আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত বিভিন্ন নগরী থেকে ক্রুসেডারদের প্রতি আপন আপন অঞ্চলে আগমনের অনুরোধ আসতে থাকে। আর্মেনীয়দের এসব অনুরোধবার্তা ক্রুসেড অভিযানের পরবর্তী গতিপথ নির্ণয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল।

৮. সামরিক প্রভাব: নিকিয়া পতনের ফলে এশিয়া মাইনর অঞ্চলে প্রবেশের পথ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। নিকিয়াই ছিল এশিয়া মাইনরের ইসলামি ভূখণ্ডে প্রবেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। আর তাই নিকিয়া পতনের পর ক্রুসেডারদের সামনে এশিয়া মাইনরের গভীরে বরং শাম অঞ্চলে পৌঁছার বিরাট সুযোগ এসে যায়। (২৫৫)

৯. নিকিয়া পতনের পর কিলিজ আরসালান দ্রুত কোনিয়া (২৫৬) নগরীতে চলে যান এবং কোনিয়াকে নতুন রাজধানী নির্বাচন করেন। (২৫৭) এভাবেও বলা চলে যে, কোনিয়া পরিণত হয় তার নতুন সামরিক ঘাঁটিতে, যেখান থেকে তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করবেন। কোনিয়া ছিল নিকিয়া থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রায় চারশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। নিকিয়ার মতো না হলেও কোনিয়া নগরীও যথেষ্ট সুরক্ষিত ছিল।

১০. রোমান সেলজুক রাষ্ট্রের নেতা কিলিজ আরসালান ও তুর্কমেনদের নেতা গাজি বিন দানিশমান্দ সিদ্ধান্ত নেন যে, তারা আপাতত কিছু সময়ের জন্য পারস্পরিক বিরোধের কথা ভুলে গিয়ে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে একক ফ্রন্ট গড়ে তুলবেন। (২৫৮) বাহ্যত এই ঐক্য প্রচেষ্টা যদিও একটি ইতিবাচক বিষয় ছিল; কিন্তু বাস্তবে এর উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব ছিল না। এই ঐক্য ছিল দুর্বল ও ভঙ্গুরপ্রায়। কারণ, একদিকে উভয় পক্ষের বিরোধ ও শত্রুতা ছিল গভীর ও সুপ্রাচীন; অপরদিকে একতা ও সম্মিলিত লড়াইয়ের সুস্পষ্ট ইসলামি অনুপ্রাণিকাও উভয় পক্ষের মাঝে অনুপস্থিত ছিল। দ্বীন রক্ষার্থে নয়; বরং তাদের ঐক্য ছিল আপন আপন ভূখণ্ড রক্ষার জন্য।

টিকাঃ
২৪৯. Cam. Med. Hist. vol 5, p. 285.
২৫০. Runciman, op. cit., 1, p.p. 182-183, Setton: op. cit. 1, p. 201.
২৫১. Grousset: Hist. des Croisades, 1, pp 42-43.
২৫২. Grousset: Hist. des Croisades, 1, pp. 41-43.
২৫৩, সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/১৩৯।
২৫৪, Chalandon: Alexis Comnene, p. 193.
২৫৫. Oman: vol 1 p 279.
২৫৬. কোনিয়া: বর্তমান তুরস্কের অন্তর্গত কোনিয়া প্রদেশের রাজধানী নগরী। জগদ্বিখ্যাত সুফি সাধক জালালুদ্দিন রুমি রহ.-এর সমাধি কোনিয়া নগরীতেই অবস্থিত। হাতে-বোনা কার্পেট শিল্পের জন্য কোনিয়ার বিশ্বজুড়ে খ্যাতি রয়েছে। [অনুবাদক]
২৫৭. রানচিমান, তারীখুল হুরূবিস সালীবিয়্যাহ, ১/২৭৮।
২৫৮. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৮/১৮৬, ১৬৪ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৩৪। Gesta Francorum, pp. 19-22; Fulcher de Chartres, pp. 83-87; William of Tyre, 1, pp. 169-173; Runciman, "Constantinople to Antioch", pp. 293-294; Mayer, Crusades, pp. 50-51.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 নিকিয়া পতনের কার্যকারণসমূহ

📄 নিকিয়া পতনের কার্যকারণসমূহ


আমরা যদি নিকিয়াতে মুসলমানদের এই শোচনীয় পরাজয়ের কারণ ও কার্যকারণ বিশ্লেষণ করি, তাহলে এমন কিছু বিষয় আমাদের সামনে উঠে আসবে, যা ইতিহাসের যুগে যুগে মুসলমানদের পরাজিত হওয়া প্রতিটি যুদ্ধের ক্ষেত্রেই পাওয়া যায়। কারণ, এগুলো সর্বযুগে কার্যকর শাশ্বত কিছু নীতি। আমাদের সামনে যেসব কার্যকারণ প্রকাশিত হয়, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

১. মুসলিম যোদ্ধাদের মাঝে ইসলামি চেতনাবোধ ও দ্বীনি উদ্দীপনার অনুপস্থিতি। নিঃসন্দেহে যারা আল্লাহর দ্বীনকে বুলন্দ করার লক্ষ্যে লড়াই করে আর যারা লড়াই করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কিংবা জীবন রক্ষার জন্য—উভয় দলের মাঝে কত পার্থক্য!

২. মুসলমানদের পারস্পরিক দীর্ঘস্থায়ী বিবাদ-বিভক্তি এবং অধিকাংশ অঞ্চলে ভ্রাতৃঘাতী লড়াই-সংঘাত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
(وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّبِرِينَ)
এবং পরস্পরে কলহ করবে না। অন্যথায় তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব বিলুপ্ত হবে। আর ধৈর্যধারণ করবে। বিশ্বাস রাখো, আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। [সুরা আনফাল: ৪৬]
আয়াতের ভাষ্য দ্বারা সুস্পষ্ট অনুমিত হয় যে, মুসলমানদের পারস্পরিক কলহ-বিবাদ পরাজয়, ব্যর্থতা ও প্রভাব বিলুপ্তির অন্যতম মৌলিক কার্যকারণ।

৩. ঘটনাপ্রবাহের প্রতি শাম অঞ্চল, ইরাক, মিশর ও ইসলামি প্রাচ্যের মুসলমানদের উদাসীনতা এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতির মোকাবিলায় এশিয়া মাইনরের সেলজুক শক্তির নিঃসঙ্গ সংগ্রাম। অথচ পরবর্তী সময়ে তাদের সকলকেই ক্রুসেড অভিযানের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার শিকার হতে হয়েছিল।

৪. উপযুক্ত সামরিক প্রস্তুতির অভাব। সেলজুকদের গোয়েন্দা-তৎপরতা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। তারা যতক্ষণে ক্রুসেডারদের অগ্রযাত্রার বিষয়টি উপলব্ধি করে, ততক্ষণে সময় শেষ হয়ে গেছে। বিপরীতে ক্রুসেডার ও বাইজান্টাইনরা এই দিনটির জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছিল। আর শাশ্বত নীতি হলো, যে-ই চেষ্টা করবে, আপন চেষ্টা ও প্রস্তুতির ফল অবশ্যই লাভ করবে।

মোটামুটি এগুলোই ছিল নিকিয়ার পরাজয় ও পতনের মূল কার্যকারণ। এসব কারণ যখন যেকোনো প্রজন্মের মাঝে পাওয়া যাবে, নিঃসন্দেহে তারাও একই পরিণতির শিকার হবে এবং একই ধরনের সংকট ও সমস্যার সম্মুখীন হবে।

আমরা যদি নিকিয়াতে মুসলমানদের এই শোচনীয় পরাজয়ের কারণ ও কার্যকারণ বিশ্লেষণ করি, তাহলে এমন কিছু বিষয় আমাদের সামনে উঠে আসবে, যা ইতিহাসের যুগে যুগে মুসলমানদের পরাজিত হওয়া প্রতিটি যুদ্ধের ক্ষেত্রেই পাওয়া যায়। কারণ, এগুলো সর্বযুগে কার্যকর শাশ্বত কিছু নীতি। আমাদের সামনে যেসব কার্যকারণ প্রকাশিত হয়, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

১. মুসলিম যোদ্ধাদের মাঝে ইসলামি চেতনাবোধ ও দ্বীনি উদ্দীপনার অনুপস্থিতি। নিঃসন্দেহে যারা আল্লাহর দ্বীনকে বুলন্দ করার লক্ষ্যে লড়াই করে আর যারা লড়াই করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কিংবা জীবন রক্ষার জন্য—উভয় দলের মাঝে কত পার্থক্য!

২. মুসলমানদের পারস্পরিক দীর্ঘস্থায়ী বিবাদ-বিভক্তি এবং অধিকাংশ অঞ্চলে ভ্রাতৃঘাতী লড়াই-সংঘাত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
(وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّبِرِينَ)
এবং পরস্পরে কলহ করবে না। অন্যথায় তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব বিলুপ্ত হবে। আর ধৈর্যধারণ করবে। বিশ্বাস রাখো, আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। [সুরা আনফাল: ৪৬]
আয়াতের ভাষ্য দ্বারা সুস্পষ্ট অনুমিত হয় যে, মুসলমানদের পারস্পরিক কলহ-বিবাদ পরাজয়, ব্যর্থতা ও প্রভাব বিলুপ্তির অন্যতম মৌলিক কার্যকারণ।

৩. ঘটনাপ্রবাহের প্রতি শাম অঞ্চল, ইরাক, মিশর ও ইসলামি প্রাচ্যের মুসলমানদের উদাসীনতা এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতির মোকাবিলায় এশিয়া মাইনরের সেলজুক শক্তির নিঃসঙ্গ সংগ্রাম। অথচ পরবর্তী সময়ে তাদের সকলকেই ক্রুসেড অভিযানের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার শিকার হতে হয়েছিল।

৪. উপযুক্ত সামরিক প্রস্তুতির অভাব। সেলজুকদের গোয়েন্দা-তৎপরতা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। তারা যতক্ষণে ক্রুসেডারদের অগ্রযাত্রার বিষয়টি উপলব্ধি করে, ততক্ষণে সময় শেষ হয়ে গেছে। বিপরীতে ক্রুসেডার ও বাইজান্টাইনরা এই দিনটির জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছিল। আর শাশ্বত নীতি হলো, যে-ই চেষ্টা করবে, আপন চেষ্টা ও প্রস্তুতির ফল অবশ্যই লাভ করবে।

মোটামুটি এগুলোই ছিল নিকিয়ার পরাজয় ও পতনের মূল কার্যকারণ। এসব কারণ যখন যেকোনো প্রজন্মের মাঝে পাওয়া যাবে, নিঃসন্দেহে তারাও একই পরিণতির শিকার হবে এবং একই ধরনের সংকট ও সমস্যার সম্মুখীন হবে।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 নিকিয়া পতনের পর ক্রুসেডারদের পরবর্তী পদক্ষেপ

📄 নিকিয়া পতনের পর ক্রুসেডারদের পরবর্তী পদক্ষেপ


নিকিয়া পতনের পর এক সপ্তাহের বিশ্রাম শেষেই ক্রুসেডাররা সামনে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এবার তারা দক্ষিণ-পূর্বে কিলিজ আরসালানের নতুন রাজধানী কোনিয়ার দিকে অগ্রসর হয়। কোনিয়ার পথে ক্রুসেডাররা নিজেদের দুই ভাগে বিভক্ত করে নিয়েছিল। এক অংশ ছিল সম্পূর্ণ নরম্যানদের নিয়ে গঠিত। বোহেমন্ড ও টেনক্রেডের নেতৃত্বাধীন ইতালিয়ান নরম্যানদের পাশাপাশি রবার্ট ও স্টিফেনের নেতৃত্বাধীন ফ্রেঞ্চ নরম্যানরাও এ অংশে ছিল। এই অংশের সর্বাধিনায়কত্বের দায়িত্ব ছিল বোহেমন্ডের কাঁধে। অভিজ্ঞ সেনাপতি ট্যাটিকিয়াস (Taticius)-এর নেতৃত্বে বাইজান্টাইন বাহিনীর একটি অংশও এই দলের সঙ্গে ছিল। ক্রুসেডার বাহিনীর দ্বিতীয় অংশটি ছিল ৪র্থ রেমন্ডের নেতৃত্বাধীন দক্ষিণ ফ্রান্সের বাহিনী ও গডফ্রের নেতৃত্বাধীন উত্তর ফ্রান্স ও লোরেন অঞ্চলের বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত। এ অংশের সর্বাধিনায়ক ছিলেন ৪র্থ রেমন্ড। উভয় বাহিনী নিজেদের মাঝে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরত্ব রেখে সমান্তরালে অগ্রসর হতে থাকে। সিদ্ধান্ত হয় যে, দোরিলায়ুম (Dorylaeum) নগরীর প্রাচীন ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকায় উভয় বাহিনী পরস্পর মিলিত হবে। (২৫৯) এলাকাটি নিকিয়া থেকে দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় একশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রেখে ক্রুসেডার বাহিনী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে রওনা হয়েছিল। একটি বিষয় হলো, এর ফলে তাদের রসদ ও খাবার- দাবার সংগ্রহ সহজতর হবে। কারণ, খাদ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে তারা পথের বিভিন্ন শস্যক্ষেত্রে বিদ্যমান ফল-ফসলের ওপরই নির্ভর করছিল। অপরদিকে পানির জন্য তারা নির্ভর করছিল এ অঞ্চলে বিদ্যমান বিভিন্ন ঝরনা ও কূপের ওপর। আরেকটি দিক হলো, এর ফলে সৈন্যদের চলার গতি দ্রুত ও সহজতর হবে। কারণ, বিদ্যমান পথঘাট যতই প্রশস্ত হোক না কেন, এই বিশাল বাহিনীর জন্য তা যথেষ্ট ছিল না।

ক্রুসেডার বাহিনীর এভাবে বিভক্ত হয়ে চলার আরেকটি লক্ষ্য ছিল, পথে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সেলজুক সৈন্যদের নিরাপত্তা চৌকিগুলো (pocket of resistance) ধ্বংস করা। (২৬০) সেলজুক গোয়েন্দাদের ধোঁকা দেওয়াও অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। কারণ, সম্ভাবনা ছিল যে, সেলজুক বাহিনী ক্রুসেডার বাহিনীর একটি অংশকেই পূর্ণ বাহিনী মনে করে তাদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। আর এমনটি ঘটলে নিশ্চিত করেই মুসলমানদের যুদ্ধ পরিকল্পনায় বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হবে। বাস্তবেও এই সুবিশাল বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে এমনটিই ঘটেছিল।

টিকাঃ
২৫৯. Alexiad: p. 279; Oman: vol, 1, p.272; Gesta Francorum, pp. 19-22; Fulcher de chartres, pp. 83-87; William of Tyre, 1, pp. 169-1773; Runciman, "Constantinople to Antioch", pp. 293-294; Mayer, Crusades, pp. 50-51.
২৬০. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/১৩৪।

নিকিয়া পতনের পর এক সপ্তাহের বিশ্রাম শেষেই ক্রুসেডাররা সামনে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এবার তারা দক্ষিণ-পূর্বে কিলিজ আরসালানের নতুন রাজধানী কোনিয়ার দিকে অগ্রসর হয়। কোনিয়ার পথে ক্রুসেডাররা নিজেদের দুই ভাগে বিভক্ত করে নিয়েছিল। এক অংশ ছিল সম্পূর্ণ নরম্যানদের নিয়ে গঠিত। বোহেমন্ড ও টেনক্রেডের নেতৃত্বাধীন ইতালিয়ান নরম্যানদের পাশাপাশি রবার্ট ও স্টিফেনের নেতৃত্বাধীন ফ্রেঞ্চ নরম্যানরাও এ অংশে ছিল। এই অংশের সর্বাধিনায়কত্বের দায়িত্ব ছিল বোহেমন্ডের কাঁধে। অভিজ্ঞ সেনাপতি ট্যাটিকিয়াস (Taticius)-এর নেতৃত্বে বাইজান্টাইন বাহিনীর একটি অংশও এই দলের সঙ্গে ছিল। ক্রুসেডার বাহিনীর দ্বিতীয় অংশটি ছিল ৪র্থ রেমন্ডের নেতৃত্বাধীন দক্ষিণ ফ্রান্সের বাহিনী ও গডফ্রের নেতৃত্বাধীন উত্তর ফ্রান্স ও লোরেন অঞ্চলের বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত। এ অংশের সর্বাধিনায়ক ছিলেন ৪র্থ রেমন্ড। উভয় বাহিনী নিজেদের মাঝে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরত্ব রেখে সমান্তরালে অগ্রসর হতে থাকে। সিদ্ধান্ত হয় যে, দোরিলায়ুম (Dorylaeum) নগরীর প্রাচীন ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকায় উভয় বাহিনী পরস্পর মিলিত হবে। (২৫৯) এলাকাটি নিকিয়া থেকে দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় একশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রেখে ক্রুসেডার বাহিনী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে রওনা হয়েছিল। একটি বিষয় হলো, এর ফলে তাদের রসদ ও খাবার- দাবার সংগ্রহ সহজতর হবে। কারণ, খাদ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে তারা পথের বিভিন্ন শস্যক্ষেত্রে বিদ্যমান ফল-ফসলের ওপরই নির্ভর করছিল। অপরদিকে পানির জন্য তারা নির্ভর করছিল এ অঞ্চলে বিদ্যমান বিভিন্ন ঝরনা ও কূপের ওপর। আরেকটি দিক হলো, এর ফলে সৈন্যদের চলার গতি দ্রুত ও সহজতর হবে। কারণ, বিদ্যমান পথঘাট যতই প্রশস্ত হোক না কেন, এই বিশাল বাহিনীর জন্য তা যথেষ্ট ছিল না।

ক্রুসেডার বাহিনীর এভাবে বিভক্ত হয়ে চলার আরেকটি লক্ষ্য ছিল, পথে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সেলজুক সৈন্যদের নিরাপত্তা চৌকিগুলো (pocket of resistance) ধ্বংস করা। (২৬০) সেলজুক গোয়েন্দাদের ধোঁকা দেওয়াও অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। কারণ, সম্ভাবনা ছিল যে, সেলজুক বাহিনী ক্রুসেডার বাহিনীর একটি অংশকেই পূর্ণ বাহিনী মনে করে তাদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। আর এমনটি ঘটলে নিশ্চিত করেই মুসলমানদের যুদ্ধ পরিকল্পনায় বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হবে। বাস্তবেও এই সুবিশাল বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে এমনটিই ঘটেছিল।

টিকাঃ
২৫৯. Alexiad: p. 279; Oman: vol, 1, p.272; Gesta Francorum, pp. 19-22; Fulcher de chartres, pp. 83-87; William of Tyre, 1, pp. 169-1773; Runciman, "Constantinople to Antioch", pp. 293-294; Mayer, Crusades, pp. 50-51.
২৬০. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/১৩৪।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 দোরিলায়ামের যুদ্ধ

📄 দোরিলায়ামের যুদ্ধ


বোহেমন্ডের নেতৃত্বাধীন অংশটি দোরিলায়ুম অঞ্চলে পৌঁছে দেখতে পায় যে, সেখানকার সমতলভূমি ও উচ্চভূমিতে মুসলিম বাহিনী তাদের অপেক্ষায় আছে। কিলিজ আরসালান ও গাজি বিন দানিশমান্দ উভয়ের বাহিনী মিলে মুসলিম বাহিনী গঠিত হয়েছিল। ক্রুসেডারদের প্রত্যাশামতোই মুসলিম বাহিনী মনে করেছিল যে, বোহেমন্ডের নেতৃত্বাধীন এই বাহিনীটিই অন্তত এ অঞ্চলের পূর্ণ ক্রুসেডার বাহিনী। ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ১ জুলাই (৪৯০ হিজরি) উভয় বাহিনীর মধ্যে প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। প্রথম দিকে যুদ্ধপরিস্থিতি ক্রুসেডার বাহিনীর প্রতিকূলে চলে যায় এবং উজ্জীবিত মুসলিম বাহিনী প্রত্যাশা করে যে, কিছুক্ষণের মধ্যেই জয় তাদের হাতের মুঠোয় চলে আসবে। কিন্তু এরই মধ্যে আকস্মিকভাবে ৪র্থ রেমন্ড ও গডফ্রের নেতৃত্বাধীন ক্রুসেডার বাহিনীর অপর অংশটি উপস্থিত হয়ে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ফলে যুদ্ধ- পরিস্থিতি উল্টে যায় এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। অবশ্য ক্রুসেডার সেনাপতি বোহেমন্ড এ সময় আহত হন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই মুসলিম বাহিনীর দুর্বলতা প্রকাশ পেতে শুরু করে এবং তারা তিক্ত পরাজয়ের শিকার হয়। কিলিজ আরসালান বিপুল পরিমাণ রসদ ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ফেলে দ্রুত পালিয়ে এশিয়া মাইনরের গভীরতম অংশে চলে যান। ইতিহাসে দোরিলায়ুমের যুদ্ধ নামে খ্যাত এ যুদ্ধের মাধ্যমে ক্রুসেডারদের দ্বিতীয় নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জিত হয়। (২৬১)

কৃষ্ণসাগর সিনোপ কনস্টান্টিনোপল সামসুন নিকিয়া ট্রাবজোন তোকাত দোরিলায়ুম সিভাস আরযুররুম এন্টিয়ক মিসিয়া কোনিয়া এফসুস হিরাক্লিয়া আদানা কায়সারিয়া মালাতিয়া আনতালিয়া ভূমধ্যসাগর
মানচিত্র নং-১৪ দোরিলায়ুমের যুদ্ধক্ষেত্র
দোরিলায়ুমের যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের ফলে নিকিয়া পতনের প্রভাব আরও গভীরে পৌঁছায়; ক্রুসেডার, বাইজান্টাইন ও আর্মেনীয়দের মনোবল আরও অনেক অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়, মুসলিম বাহিনীর মনোবল পতনের সর্বনিম্ন স্তরে উপনীত হয়। রোমান সেলজুক নেতা কিলিজ আরসালান এরপর আর সরাসরি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অগ্রসর হননি। তিনি পথের সকল নগরী ও জনপদ অরক্ষিত ফেলে পালিয়ে চলে যান। ফলে ক্রুসেডাররা উল্লেখযোগ্য কোনো সংঘর্ষ ছাড়াই বিস্তৃত অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

কৃষ্ণসাগর
সিনোপ কনস্টান্টিনোপল সামসুন •নিকিয়া •ট্রাবজোন •দোরিলায়ুম তোকাত •আরযুররুম সিভাস এন্টিয়ক কায়সারিয়া মিসিয়া এফসুস কোনিয়া •মালাতিয়া আনতালিয়া হিরাক্লিয়া আদানা মপসুয়েসটিয়া মারআশ তারসুস
ভূমধ্যসাগর
মানচিত্র নং-১৫ এশিয়া মাইনর অঞ্চলে ক্রুসেডার বাহিনীগুলোর গতিপথ
এর চেয়েও দুঃখজনক বিষয় হলো, নিকিয়া পতনের পর যে কোনিয়া নগরীকে কিলিজ আরসালান তার নতুন রাজধানী নির্বাচিত করেছিলেন, ক্রুসেডাররা সেখানে পৌঁছে নগরীটিকে সম্পূর্ণ জনশূন্য অবস্থায় পায়। অল্প কিছু আর্মেনীয় নাগরিক সেখানে ক্রুসেডারদের স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছিল। (২৬২) ক্রুসেডার বাহিনী অতি সহজে কোনিয়ায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার করার পর সামনে অগ্রসর হয়ে হিরাক্লিয়া (Heraclea) নগরীও দখল করে নেয়। (২৬৩) এরপর তারা উত্তর-পূর্বে অগ্রসর হয়ে কায়সারিয়া (Kayseri) নগরী জয় করে। (২৬৪) কায়সারিয়া জয় করার পর ক্রুসেডার বাহিনী তোরোস পবর্তমালার বিভিন্ন পাহাড় অতিক্রম করে মারআশ নগরীতে পৌঁছায়। মারআশ (২৬৫) নগরীর অধিকাংশ নাগরিক ছিল আর্মেনীয় জাতিগোষ্ঠীর। তারা ক্রুসেডার বাহিনীকে সাদর অভ্যর্থনা জানায়। ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ অক্টোবর (৪৯০ হিজরি) ক্রুসেডাররা নগরীটির কর্তৃত্ব বুঝে নেয়।

এখানে এ বিষয়টি উল্লেখযোগ্য যে, ক্রুসেডার বাহিনী এ সময় পর্যন্ত বিজিত সবগুলো নগরীর কর্তৃত্ব কনস্টান্টিনোপল-চুক্তির দাবি অনুসারে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের হাতে তুলে দেয়। (২৬৬) এটি সুস্পষ্ট বাস্তবতা যে, এই সমর্পণ মোটেও স্বেচ্ছায় ও সন্তুষ্টচিত্তে ছিল না; বরং ক্রুসেডার বাহিনী অভিযান চলাকালে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সমরবিশেষজ্ঞ, পথপ্রদর্শক ও অবরোধসামগ্রীসহ বিভিন্ন সাহায্যের পুরোপুরি মুখাপেক্ষী থাকায় অনেকটা বাধ্য হয়েই বাইজান্টাইন সম্রাটের আনুগত্য করে যাচ্ছিল। এটিও সুস্পষ্ট অনুমানিত হচ্ছিল যে, পরবর্তী সময়ে প্রথম সুযোগেই ক্রুসেডাররা বাইজান্টাইন প্রভাব থেকে বের হয়ে যাবে। কারণ, তারা অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের প্রতি হৃদ্যতার কারণে কিংবা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের হৃত মর্যাদা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়নি এবং নিজেদের জান-মাল বিসর্জন দেয়নি। ক্রুসেড অভিযানের মৌলিক লক্ষ্য হচ্ছে প্রতিটি বাহিনীর সেনাপতিদের সাম্রাজ্যবাদী লালসা বাস্তবায়ন, ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি ও ইসলামি প্রাচ্যের সম্পদ ভোগ করা। ক্রুসেডারদের পরবর্তী পদক্ষেপসমূহে বিষয়টি আরও সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হবে।

টিকাঃ
২৬১. Grousset: Op cit., 1, p. 35.
২৬২. Gesta Francorum, pp. 55-57.
২৬৩. Setton: op. cit., vol. 1, p. 295.
২৬৪, Gesta Francorum, pp. 61.
২৬৫. ইংরেজি নাম Kahramanmaraş। [অনুবাদক]
২৬৬, Cam. Med Hist. vol. 5, p. 287.

বোহেমন্ডের নেতৃত্বাধীন অংশটি দোরিলায়ুম অঞ্চলে পৌঁছে দেখতে পায় যে, সেখানকার সমতলভূমি ও উচ্চভূমিতে মুসলিম বাহিনী তাদের অপেক্ষায় আছে। কিলিজ আরসালান ও গাজি বিন দানিশমান্দ উভয়ের বাহিনী মিলে মুসলিম বাহিনী গঠিত হয়েছিল। ক্রুসেডারদের প্রত্যাশামতোই মুসলিম বাহিনী মনে করেছিল যে, বোহেমন্ডের নেতৃত্বাধীন এই বাহিনীটিই অন্তত এ অঞ্চলের পূর্ণ ক্রুসেডার বাহিনী। ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ১ জুলাই (৪৯০ হিজরি) উভয় বাহিনীর মধ্যে প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। প্রথম দিকে যুদ্ধপরিস্থিতি ক্রুসেডার বাহিনীর প্রতিকূলে চলে যায় এবং উজ্জীবিত মুসলিম বাহিনী প্রত্যাশা করে যে, কিছুক্ষণের মধ্যেই জয় তাদের হাতের মুঠোয় চলে আসবে। কিন্তু এরই মধ্যে আকস্মিকভাবে ৪র্থ রেমন্ড ও গডফ্রের নেতৃত্বাধীন ক্রুসেডার বাহিনীর অপর অংশটি উপস্থিত হয়ে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ফলে যুদ্ধ- পরিস্থিতি উল্টে যায় এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। অবশ্য ক্রুসেডার সেনাপতি বোহেমন্ড এ সময় আহত হন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই মুসলিম বাহিনীর দুর্বলতা প্রকাশ পেতে শুরু করে এবং তারা তিক্ত পরাজয়ের শিকার হয়। কিলিজ আরসালান বিপুল পরিমাণ রসদ ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ফেলে দ্রুত পালিয়ে এশিয়া মাইনরের গভীরতম অংশে চলে যান। ইতিহাসে দোরিলায়ুমের যুদ্ধ নামে খ্যাত এ যুদ্ধের মাধ্যমে ক্রুসেডারদের দ্বিতীয় নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জিত হয়। (২৬১)

কৃষ্ণসাগর সিনোপ কনস্টান্টিনোপল সামসুন নিকিয়া ট্রাবজোন তোকাত দোরিলায়ুম সিভাস আরযুররুম এন্টিয়ক মিসিয়া কোনিয়া এফসুস হিরাক্লিয়া আদানা কায়সারিয়া মালাতিয়া আনতালিয়া ভূমধ্যসাগর
মানচিত্র নং-১৪ দোরিলায়ুমের যুদ্ধক্ষেত্র
দোরিলায়ুমের যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের ফলে নিকিয়া পতনের প্রভাব আরও গভীরে পৌঁছায়; ক্রুসেডার, বাইজান্টাইন ও আর্মেনীয়দের মনোবল আরও অনেক অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়, মুসলিম বাহিনীর মনোবল পতনের সর্বনিম্ন স্তরে উপনীত হয়। রোমান সেলজুক নেতা কিলিজ আরসালান এরপর আর সরাসরি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অগ্রসর হননি। তিনি পথের সকল নগরী ও জনপদ অরক্ষিত ফেলে পালিয়ে চলে যান। ফলে ক্রুসেডাররা উল্লেখযোগ্য কোনো সংঘর্ষ ছাড়াই বিস্তৃত অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

কৃষ্ণসাগর
সিনোপ কনস্টান্টিনোপল সামসুন •নিকিয়া •ট্রাবজোন •দোরিলায়ুম তোকাত •আরযুররুম সিভাস এন্টিয়ক কায়সারিয়া মিসিয়া এফসুস কোনিয়া •মালাতিয়া আনতালিয়া হিরাক্লিয়া আদানা মপসুয়েসটিয়া মারআশ তারসুস
ভূমধ্যসাগর
মানচিত্র নং-১৫ এশিয়া মাইনর অঞ্চলে ক্রুসেডার বাহিনীগুলোর গতিপথ
এর চেয়েও দুঃখজনক বিষয় হলো, নিকিয়া পতনের পর যে কোনিয়া নগরীকে কিলিজ আরসালান তার নতুন রাজধানী নির্বাচিত করেছিলেন, ক্রুসেডাররা সেখানে পৌঁছে নগরীটিকে সম্পূর্ণ জনশূন্য অবস্থায় পায়। অল্প কিছু আর্মেনীয় নাগরিক সেখানে ক্রুসেডারদের স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছিল। (২৬২) ক্রুসেডার বাহিনী অতি সহজে কোনিয়ায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার করার পর সামনে অগ্রসর হয়ে হিরাক্লিয়া (Heraclea) নগরীও দখল করে নেয়। (২৬৩) এরপর তারা উত্তর-পূর্বে অগ্রসর হয়ে কায়সারিয়া (Kayseri) নগরী জয় করে। (২৬৪) কায়সারিয়া জয় করার পর ক্রুসেডার বাহিনী তোরোস পবর্তমালার বিভিন্ন পাহাড় অতিক্রম করে মারআশ নগরীতে পৌঁছায়। মারআশ (২৬৫) নগরীর অধিকাংশ নাগরিক ছিল আর্মেনীয় জাতিগোষ্ঠীর। তারা ক্রুসেডার বাহিনীকে সাদর অভ্যর্থনা জানায়। ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ অক্টোবর (৪৯০ হিজরি) ক্রুসেডাররা নগরীটির কর্তৃত্ব বুঝে নেয়।

এখানে এ বিষয়টি উল্লেখযোগ্য যে, ক্রুসেডার বাহিনী এ সময় পর্যন্ত বিজিত সবগুলো নগরীর কর্তৃত্ব কনস্টান্টিনোপল-চুক্তির দাবি অনুসারে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের হাতে তুলে দেয়। (২৬৬) এটি সুস্পষ্ট বাস্তবতা যে, এই সমর্পণ মোটেও স্বেচ্ছায় ও সন্তুষ্টচিত্তে ছিল না; বরং ক্রুসেডার বাহিনী অভিযান চলাকালে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সমরবিশেষজ্ঞ, পথপ্রদর্শক ও অবরোধসামগ্রীসহ বিভিন্ন সাহায্যের পুরোপুরি মুখাপেক্ষী থাকায় অনেকটা বাধ্য হয়েই বাইজান্টাইন সম্রাটের আনুগত্য করে যাচ্ছিল। এটিও সুস্পষ্ট অনুমানিত হচ্ছিল যে, পরবর্তী সময়ে প্রথম সুযোগেই ক্রুসেডাররা বাইজান্টাইন প্রভাব থেকে বের হয়ে যাবে। কারণ, তারা অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের প্রতি হৃদ্যতার কারণে কিংবা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের হৃত মর্যাদা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়নি এবং নিজেদের জান-মাল বিসর্জন দেয়নি। ক্রুসেড অভিযানের মৌলিক লক্ষ্য হচ্ছে প্রতিটি বাহিনীর সেনাপতিদের সাম্রাজ্যবাদী লালসা বাস্তবায়ন, ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি ও ইসলামি প্রাচ্যের সম্পদ ভোগ করা। ক্রুসেডারদের পরবর্তী পদক্ষেপসমূহে বিষয়টি আরও সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হবে।

টিকাঃ
২৬১. Grousset: Op cit., 1, p. 35.
২৬২. Gesta Francorum, pp. 55-57.
২৬৩. Setton: op. cit., vol. 1, p. 295.
২৬৪, Gesta Francorum, pp. 61.
২৬৫. ইংরেজি নাম Kahramanmaraş। [অনুবাদক]
২৬৬, Cam. Med Hist. vol. 5, p. 287.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00