📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 নিকিয়ার পতন

📄 নিকিয়ার পতন


মূল প্রশ্নে ফিরে আসি। সুবিশাল ক্রুসেডার বাহিনী যখন রোমান সেলজুক রাষ্ট্রের রাজধানী নিকিয়া দখলের জন্য ধেয়ে আসছিল, তখন কোথায় ছিলেন ১ম কিলিজ আরসালান?!

তিনি তখন রাজধানীর বাইরে ছিলেন। কেবল বাইরে নয়; বরং রাজধানী হতে নয়শ কিলোমিটারের অধিক দূরে ছিলেন। তিনি তখন নিকিয়া হতে পূর্ব দিকে অবস্থিত আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত মালাতিয়া নগরী অবরোধে ব্যস্ত ছিলেন। নগরীটির কর্তৃত্ব নিয়ে তার সঙ্গে এ অঞ্চলের আরেক মুসলিম নেতা গাজি বিন দানিশমান্দের বিরাট দ্বন্দ্ব চলছিল। গাজি বিন দানিশমান্দ ছিলেন এশিয়া মাইনর অঞ্চলের উত্তর-পূর্ব অংশ শাসনকারী একজন তুর্কি মুসলিম নেতা। নতুন নতুন অঞ্চলে রাষ্ট্র বিস্তৃতির এই সর্বনাশা নেশার কারণে অত্যন্ত ভয়ানক শত্রু ক্রুসেডারদের বিষয়ে কিলিজ আরসালান বিশেষ মনোযোগী ছিলেন না। বরং তিনি যখন জানতে পারেন যে, ক্রুসেডার বাহিনীগুলো বিলম্ব করে কনস্টান্টিনোপল অভিমুখে রওনা হয়েছে, তখন তিনি ধারণা করেন যে, এ বাহিনীগুলোও পূর্বে আগত বাহিনীগুলোর ন্যায় সাধারণ ও অপেশাদার বাহিনীই হবে। এ কারণেই তিনি আশা করেছিলেন যে, ইতিপূর্বে তিনি যেভাবে অতি সহজে ওয়ালটার ও পিটারের বাহিনীকে পরাভূত করেছিলেন, এবারও তার বাহিনীর ক্ষুদ্র একটি অংশ দিয়েই তাদেরকেও সহজে পরাভূত করতে পারবেন। (২৩৮) এ ছাড়া তিনি ধূর্ত বাইজান্টাইন সম্রাট ১ম অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোসের একটি কৌশল দ্বারাও প্রবঞ্চিত হয়েছিলেন। সম্রাটের প্রেরিত কয়েকজন গুপ্তচর কিলিজ আরসালানকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে, ক্রুসেডার বাহিনীসমূহের সেনাপতিদের সঙ্গে সম্রাটের বিরোধ এমন জটিল পর্যায়ে উপনীত হয়েছে, যার আশু সমাধান সম্ভব নয়। আর তাই সম্রাট কিছুতেই এসব ক্রুসেডারদের বসফরাস পাড়ি দিয়ে এশিয়া মাইনর অঞ্চলে পা রাখার অনুমতি দেবেন না। বাইজান্টাইন সম্রাটের কৌশলে প্রভাবিত হয়ে কিলিজ আরসালান তার বাহিনীর তুলনামূলক ক্ষুদ্র একটি অংশকে রাজধানী নিকিয়ায় রেখে নিজে মূল বাহিনী নিয়ে দূরের মালাতিয়া নগরী অবরোধ করতে রওনা হয়েছিলেন। সুলতান কিলিজ আরসালানের প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনাটি এ কারণেও মজবুত মনে হয় যে, তিনি তার স্ত্রী, দুই সন্তান এবং সমস্ত ধনসম্পদ নিকিয়াতেই রেখে গিয়েছিলেন। তিনি যদি ক্রুসেডারদের তরফ থেকে কোনো প্রকার ক্ষতির আশঙ্কা করতেন, তাহলে নিশ্চয়ই ভুলেও এমনটি করতেন না। (২৩৯)

কিলিজ আরসালান যখন রাজ্য বিস্তারের নেশায় সুদূর মালাতিয়া নগরীতে অবরোধে ব্যস্ত, এদিকে তখন তার রাজধানীই অবরুদ্ধ! ৪৯০ হিজরি সনের ২১ জুমাদাল উলা মোতাবেক ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ৬ মে তারিখে বিশাল ক্রুসেডার বাহিনী নিকিয়া অবরোধ করে। নিকিয়া নগরীর পশ্চিম দিকে বারো মাইল দীর্ঘ একটি হ্রদ ছিল। অথচ ক্রুসেডার বাহিনীর সঙ্গে কোনো নৌশক্তি ছিল না। (২৪০) তাই বাধ্য হয়ে তারা বাকি তিন দিক থেকে নগরী অবরোধ করে। অবরোধের সাত দিন অতিবাহিত হওয়ার পর ক্রুসেডাররা বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রদত্ত কামানের মাধ্যমে নগরপ্রাচীর ও নিরাপত্তা চৌকি লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ শুরু করে। প্রথমদিকে নগরবাসী কঠিন অবরোধের মুখেও দৃঢ়তা ও অবিচলতার পরিচয় দেয়। তারা বিষাক্ত তির নিক্ষেপ করে ক্রুসেডারদের পাল্টা জবাব দিতে থাকে। ক্রুসেডাররা এর ফলে সমূহ ক্ষতির শিকার হলেও সামান্য ঢিল না দিয়ে অবরোধ অব্যাহত রাখে। (২৪১) এরই মধ্যে কিলিজ আরসালানের কাছে রাজধানী আক্রান্ত হওয়ার এবং দ্রুত সাহায্য প্রেরণের বার্তা এসে পৌঁছায়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে কিলিজ আরসালান তৎক্ষণাৎ মালাতিয়ার অবরোধ প্রত্যাহার করে রাজধানী অভিমুখে রওনা হন।

কৃষ্ণসাগর
কনস্টান্টিনোপল সামসুন সিনোপ নিকিয়া ট্রাবজোন • তোকাত • দোরিলায়ুম • আরযুররুম এন্টিয়ক • সিভাস মিসিয়া কায়সারিয়া কোনিয়া এফসুস হিরাক্লিয়া আদানা আনতালিয়া • মালাতিয়া

ভূমধ্যসাগর
মানচিত্র নং-১৩ নিকিয়া অভিমুখে কিলিজ আরসালানের যাত্রাপথ

কিন্তু পথের দূরত্ব ও দুর্গমতা তার দ্রুত প্রত্যাবর্তনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। (২৪২)

এরই মাঝে সুচতুর বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস তৎকালীন বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিশিষ্ট জেনারেল ও সামরিক সচিব ম্যানুয়েল বুটুমিটস (Manuel Boutoumites/ Butumites)-কে তার প্রতিনিধি হিসেবে গোপনে নিকিয়াবাসীর কাছে প্রেরণ করেন। ম্যানুয়েল বুটুমিটস ক্রুসেডারদের হাতে নিকিয়ার পতন হওয়ার পূর্বেই বাইজান্টাইন সম্রাটের কাছে নগরীটির কর্তৃত্ব সমর্পণ করে দেওয়ার জন্য নগরবাসীকে বোঝাতে থাকেন। তিনি তাদেরকে বোঝান যে, ক্রুসেডাররা অত্যন্ত হিংস্র ও বর্বর প্রকৃতির। তাদের হাতে যদি নগরীর পতন ঘটে, তাহলে তারা নগরীর সকল নাগরিককে হত্যা করবে। অবশ্য এই ভীতিপ্রদর্শন বাস্তবেও সঠিক ছিল। পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি, ক্রুসেডারদের হাতে বাইতুল মুকাদ্দাসসহ অন্যান্য যেসব নগরীর পতন ঘটেছিল, সব জায়গায় তারা নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। (২৪৩)

পাঠকমনে প্রশ্ন জাগতে পারে, বাইজান্টাইন সম্রাট ক্রুসেডারদের না জানিয়ে গোপনে কেন মুসলমানদের সঙ্গে সমঝোতা করতে চেষ্টা করছিলেন? এর উত্তর হলো—তিনি ক্রুসেডারদের পক্ষ থেকে বিশ্বাসঘাতকতার আশঙ্কা করছিলেন। তার ধারণা ছিল, ক্রুসেড-নেতৃবৃন্দ কনস্টান্টিনোপল চুক্তির দাবি মোটেও রক্ষা করবে না এবং পূর্বে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের দখলে থাকা ভূখণ্ডগুলো জয় করার পর সম্রাটের হাতে সমর্পণ করবে না।

বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রস্তাব নিকিয়ায় অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীর নেতৃবৃন্দ গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করছিল। বিশেষ করে এ বিষয়টি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল যে, তিনি মুসলমানদের প্রাণরক্ষার, লুটতরাজ না করার এবং ক্রুসেডারদের হাত থেকে নিরাপত্তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

এরপর বাইজান্টাইন সম্রাট আরেকটি প্রতারণাপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং এর মাধ্যমে দু-দিক থেকে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের স্বার্থ বাস্তবায়ন করেন। তিনি অবরুদ্ধ নিকিয়া নগরীর জন্য সাগরপথে বিভিন্ন ইসলামি রাষ্ট্র হতে আগত ত্রাণসাহায্য স্বেচ্ছায় নিকিয়ায় পৌঁছার সুযোগ করে দেন। অথচ তিনি চাইলেই শক্তিশালী বাইজান্টাইন নৌবহরকে ব্যবহার করে এতে বাধা দিতে পারতেন। এর মাধ্যমে একদিকে তিনি ক্রুসেডারদের বুঝিয়ে দেন যে, তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাইজান্টাইন সম্রাটের সহায়তা ছাড়া অগ্রসর হতে পারবে না; অপরদিকে তার এই পদক্ষেপে মুসলিম শিবিরও নিশ্চিন্ত হয় যে, মুসলমানরা যদি তার হাতে নগরীর নিয়ন্ত্রণভার তুলে দেয়, তাহলে তিনি তাদের সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন।

মুসলিম নেতৃবৃন্দ যখন করণীয় নির্ধারণে চিন্তা-ভাবনায় ব্যস্ত, তার মধ্যেই কিলিজ আরসালান তার বাহিনী নিয়ে পৌঁছে যান। সেদিন ছিল ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ২১ মে (৪৯০ হিজরি)। নিকিয়ায় পৌঁছেই তিনি শহরে প্রবেশের জন্য পথ করে নিতে ক্রুসেডার বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় — তার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। কিলিজ আরসালান অনুভব করেন যে, তিনি এই অবরোধ কিছুতেই ভেদ করতে পারবেন না। এক দিনের যুদ্ধেই কিলিজ আরসালান নিরাশ হয়ে পড়েন এবং রাজধানী নিকিয়াকে পরিণতি বরণের জন্য ফেলে রেখে দূরে সরে পড়েন। (২৪৪) মুসলিম নগরী নিকিয়া তখন একদিকে ক্রুসেডার শক্তি, আরেকদিকে বাইজান্টাইন রাষ্ট্র — জাঁতার দুই অংশের ফাঁকে আটকে পরিণতির প্রহর গুনছে!

খেলা শেষ করতে বাইজান্টাইন সম্রাট এবার তার শেষ চাল চালেন। তিনি তার শক্তিশালী নৌবহর প্রেরণ করে সাগরপথে নিকিয়ায় সহায়তা আগমনের পথ বন্ধ করে দেন। ফলে নিকিয়াবাসী কঠিন দুর্দশার শিকার হয়ে আসন্ন ধ্বংসের প্রহর গুনতে থাকে। তাদের প্রতিরোধশক্তিও ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পড়ে। ক্রুসেডাররা আবারও মর্মে মর্মে বাইজান্টাইন সম্রাটের ক্ষমতা ও গুরুত্ব উপলব্ধি করে।

ধূর্ত ও চতুর বাইজান্টাইন সম্রাটের গুরুত্ব উপলব্ধি করে মুসলমানরাও। আর তাই মুসলমানরা ক্রুসেডারদের হাতে নগরীর পতনের পূর্বেই সম্রাটের প্রস্তাব গ্রহণ করে নেয়। অবরোধ শুরুর পাঁচ সপ্তাহ পর ক্রুসেডাররা হঠাৎ করেই একদিন দেখতে পায় — নগরপ্রাচীরের ওপর বাইজান্টাইন পতাকা উড়ছে! সম্রাটের প্রতিনিধি এসে সকলকে জানায় যে, নগরীটি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অঙ্গে পরিণত হয়েছে। লুটতরাজ চালাতে পারে এই আশঙ্কায় ক্রুসেডার বাহিনীকে নগরীতে প্রবেশ করতে নিষেধ করা হয় এবং ম্যানুয়েল বুটুমিটসকে নিকিয়ার সামরিক প্রশাসক নির্বাচিত করা হয়। (২৪৫) সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস তার প্রতিশ্রুতি রক্ষার সিদ্ধান্ত নেন এবং মুসলমানদের নিরাপত্তা প্রদান করেন। বরং তিনি ঘোষণা করেন যে, তিনি কিলিজ আরসালানের স্ত্রী, বোন ও দুই পুত্রকে কোনো বিনিময় ছাড়াই তার কাছে ফিরিয়ে দিতে প্রস্তুত আছেন। (২৪৬)

স্বাভাবিকভাবেই ক্রুসেডাররা এতে প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয়। তারা উপলব্ধি করে যে, তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। নগরবাসীর প্রতি সম্রাটের উদার আচরণে তারা আরও বেশি বিক্ষুব্ধ হয়। ক্রুসেডাররা নিকিয়ায় গণহত্যা চালিয়ে অন্যান্য ইসলামি নগরীর অধিবাসীদের শিক্ষা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা স্পষ্টতই অনুভব করে যে, তারা লেনদেন করছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পোড় খাওয়া এক শক্তিশালী নেতার সঙ্গে, যিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন এক সুপ্রাচীন সাম্রাজ্যের, যার শেকড় ইতিহাসের সুগভীর স্তরে প্রোথিত। ফলে ক্রুসেডারদের চাওয়া আপাতত অপূর্ণই থেকে যায়। (২৪৭)

বাইজান্টাইন সম্রাটও বাস্তবেই তার অঙ্গীকার রক্ষা করেন। তবে আমার বিশ্বাস—কতিপয় ঐতিহাসিকের এই বিশ্লেষণ মোটেও সঠিক নয় যে, তিনি উদার ও উন্নত চরিত্রের দাবিতে এমনটি করেছেন। বরং আমার মনে হয়, তিনি এ ঘটনাকে এশিয়া মাইনরের অন্যান্য ইসলামি নগরীর অধিবাসীদের অন্তরে প্রভাব সৃষ্টির জন্য ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। এমন ব্যাখ্যাই তার অতীত চরিত্র ও সামগ্রিক জীবনেতিহাসের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। ক্রুসেডাররা যেমন ভীতি সঞ্চারের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ জয় করতে চাচ্ছিল, বাইজান্টাইন সম্রাট তেমনই প্রীতি সৃষ্টির মাধ্যমে আগামীর সংগ্রামে জয়ী হতে চাচ্ছিলেন। ক্রুসেডাররা যদি ধর্মপরিচয়ে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আর্মেনীয়দের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময় করতে পারে, তিনি কেন মুসলমানদের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময় করবেন না!

এ তো স্বার্থের যুদ্ধ! জয়ী হওয়ার লড়াই! সাম্রাজ্যবাদের নেশা!

এর আরেকটি প্রমাণ হলো, কিছুদিন পরেই কোনিয়ায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার পর বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস কিলিজ আরসালানের স্ত্রী ও দুই পুত্রকে নিয়ে এশিয়া মাইনরের পশ্চিমাঞ্চলে মিসিয়া (Mysia), ইওনিয়া (Ionia) ও লিদিয়া (Lydia) অভিমুখে চলে যান (২৪৮) এবং বন্দিদের ও এসব অঞ্চলের নাগরিকদের নিরাপত্তা প্রদানের বিনিময়ে অঞ্চলগুলোর কর্তৃত্ব লাভের জন্য দরকষাকষি শুরু করেন। তার এই পরিকল্পনা সফল হয় এবং প্রতিরোধ ব্যতিরেকেই তার হাতে নগরীগুলোর কর্তৃত্ব তুলে দেওয়া হয়। বরং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এশিয়া মাইনরের পশ্চিমাঞ্চলের সবগুলো নগরী বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যায়। এটি একটি সুস্পষ্ট বাস্তবতা যে, সমকালীন মুসলিম উম্মাহ তখন প্রচণ্ড দুর্বলতার কাল অতিক্রম করছিল এবং দ্রুত পতনের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। আর এ সুযোগে ক্রুসেডার বাহিনী ও বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের মাঝে এক উত্তেজনাকর প্রতিযোগিতা চলছিল বিশাল এক পরিত্যাজ্য সম্পত্তির বণ্টন নিয়ে। আর তা হলো মুসলমানদের পরিত্যাজ্য সম্পদ!

টিকাঃ
২০৬. আরবিতে بيقية (নিকিয়া), ইংরেজিতে Nicaea (নিকায়া) এশিয়া মাইনর অঞ্চলের পশ্চিম উপকূলে মর্মর সাগরের নিকটে অবস্থিত সুপ্রাচীন একটি নগরী। আধুনিক তুরস্কের বুরছা প্রদেশে অবস্থিত অঞ্চলটির বর্তমান নাম ইজনিক (İznik)। খ্রিষ্টসমাজের ইতিহাসে নগরীটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, ৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে খ্রিষ্টানদের প্রথম মহাসভা এখানেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। [অনুবাদক]
২০৭. Cam. Msd. Hist., vol. 5, p. 285.
২৩৮. Setton: op. cit 1, p.p. 288-289.
২০৯. Runciman, op. cit. 1. p.p. 176-177.
২৪০. উইলিয়াম সুরি (William of Tyre), তারীখুল আ'মালিল মুনজিযাহ ফী-মা ওয়ারাআল বিহার, ১/২৩১-২৩২ ও রানচিমান (Runciman), তারীখুল হুরূবিস সালীবিয়্যাহ, ১/২৬৪-২৬৫।
২৪১, Grousset: Hist. des Croisades 1, p. 29.
২৪২, Gesta Francorum, p. 37.
২৪০. উইলিয়াম সুরি, তারীখুল আ'মালিল মুনজিযাহ ফী-মা ওয়ারাআল বিহার, ১/২৪২-২৪৩।
২৪৪. Albert d' Aix, p.p. 320-321.
২৪৫. Brehier: op. cit., p. 312.
২৪৬. Runciman, op. cit., p. 180-182; Alexiad: pp 273-275.
২৪৭. Chalandon: Premiere Croisades, p. 167.
২৪৮. Grousset: Hist. des Croisades, 1, p. 31.

মূল প্রশ্নে ফিরে আসি। সুবিশাল ক্রুসেডার বাহিনী যখন রোমান সেলজুক রাষ্ট্রের রাজধানী নিকিয়া দখলের জন্য ধেয়ে আসছিল, তখন কোথায় ছিলেন ১ম কিলিজ আরসালান?!

তিনি তখন রাজধানীর বাইরে ছিলেন। কেবল বাইরে নয়; বরং রাজধানী হতে নয়শ কিলোমিটারের অধিক দূরে ছিলেন। তিনি তখন নিকিয়া হতে পূর্ব দিকে অবস্থিত আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত মালাতিয়া নগরী অবরোধে ব্যস্ত ছিলেন। নগরীটির কর্তৃত্ব নিয়ে তার সঙ্গে এ অঞ্চলের আরেক মুসলিম নেতা গাজি বিন দানিশমান্দের বিরাট দ্বন্দ্ব চলছিল। গাজি বিন দানিশমান্দ ছিলেন এশিয়া মাইনর অঞ্চলের উত্তর-পূর্ব অংশ শাসনকারী একজন তুর্কি মুসলিম নেতা। নতুন নতুন অঞ্চলে রাষ্ট্র বিস্তৃতির এই সর্বনাশা নেশার কারণে অত্যন্ত ভয়ানক শত্রু ক্রুসেডারদের বিষয়ে কিলিজ আরসালান বিশেষ মনোযোগী ছিলেন না। বরং তিনি যখন জানতে পারেন যে, ক্রুসেডার বাহিনীগুলো বিলম্ব করে কনস্টান্টিনোপল অভিমুখে রওনা হয়েছে, তখন তিনি ধারণা করেন যে, এ বাহিনীগুলোও পূর্বে আগত বাহিনীগুলোর ন্যায় সাধারণ ও অপেশাদার বাহিনীই হবে। এ কারণেই তিনি আশা করেছিলেন যে, ইতিপূর্বে তিনি যেভাবে অতি সহজে ওয়ালটার ও পিটারের বাহিনীকে পরাভূত করেছিলেন, এবারও তার বাহিনীর ক্ষুদ্র একটি অংশ দিয়েই তাদেরকেও সহজে পরাভূত করতে পারবেন। (২৩৮) এ ছাড়া তিনি ধূর্ত বাইজান্টাইন সম্রাট ১ম অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোসের একটি কৌশল দ্বারাও প্রবঞ্চিত হয়েছিলেন। সম্রাটের প্রেরিত কয়েকজন গুপ্তচর কিলিজ আরসালানকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে, ক্রুসেডার বাহিনীসমূহের সেনাপতিদের সঙ্গে সম্রাটের বিরোধ এমন জটিল পর্যায়ে উপনীত হয়েছে, যার আশু সমাধান সম্ভব নয়। আর তাই সম্রাট কিছুতেই এসব ক্রুসেডারদের বসফরাস পাড়ি দিয়ে এশিয়া মাইনর অঞ্চলে পা রাখার অনুমতি দেবেন না। বাইজান্টাইন সম্রাটের কৌশলে প্রভাবিত হয়ে কিলিজ আরসালান তার বাহিনীর তুলনামূলক ক্ষুদ্র একটি অংশকে রাজধানী নিকিয়ায় রেখে নিজে মূল বাহিনী নিয়ে দূরের মালাতিয়া নগরী অবরোধ করতে রওনা হয়েছিলেন। সুলতান কিলিজ আরসালানের প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনাটি এ কারণেও মজবুত মনে হয় যে, তিনি তার স্ত্রী, দুই সন্তান এবং সমস্ত ধনসম্পদ নিকিয়াতেই রেখে গিয়েছিলেন। তিনি যদি ক্রুসেডারদের তরফ থেকে কোনো প্রকার ক্ষতির আশঙ্কা করতেন, তাহলে নিশ্চয়ই ভুলেও এমনটি করতেন না। (২৩৯)

কিলিজ আরসালান যখন রাজ্য বিস্তারের নেশায় সুদূর মালাতিয়া নগরীতে অবরোধে ব্যস্ত, এদিকে তখন তার রাজধানীই অবরুদ্ধ! ৪৯০ হিজরি সনের ২১ জুমাদাল উলা মোতাবেক ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ৬ মে তারিখে বিশাল ক্রুসেডার বাহিনী নিকিয়া অবরোধ করে। নিকিয়া নগরীর পশ্চিম দিকে বারো মাইল দীর্ঘ একটি হ্রদ ছিল। অথচ ক্রুসেডার বাহিনীর সঙ্গে কোনো নৌশক্তি ছিল না। (২৪০) তাই বাধ্য হয়ে তারা বাকি তিন দিক থেকে নগরী অবরোধ করে। অবরোধের সাত দিন অতিবাহিত হওয়ার পর ক্রুসেডাররা বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রদত্ত কামানের মাধ্যমে নগরপ্রাচীর ও নিরাপত্তা চৌকি লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ শুরু করে। প্রথমদিকে নগরবাসী কঠিন অবরোধের মুখেও দৃঢ়তা ও অবিচলতার পরিচয় দেয়। তারা বিষাক্ত তির নিক্ষেপ করে ক্রুসেডারদের পাল্টা জবাব দিতে থাকে। ক্রুসেডাররা এর ফলে সমূহ ক্ষতির শিকার হলেও সামান্য ঢিল না দিয়ে অবরোধ অব্যাহত রাখে। (২৪১) এরই মধ্যে কিলিজ আরসালানের কাছে রাজধানী আক্রান্ত হওয়ার এবং দ্রুত সাহায্য প্রেরণের বার্তা এসে পৌঁছায়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে কিলিজ আরসালান তৎক্ষণাৎ মালাতিয়ার অবরোধ প্রত্যাহার করে রাজধানী অভিমুখে রওনা হন।

কৃষ্ণসাগর
কনস্টান্টিনোপল সামসুন সিনোপ নিকিয়া ট্রাবজোন • তোকাত • দোরিলায়ুম • আরযুররুম এন্টিয়ক • সিভাস মিসিয়া কায়সারিয়া কোনিয়া এফসুস হিরাক্লিয়া আদানা আনতালিয়া • মালাতিয়া

ভূমধ্যসাগর
মানচিত্র নং-১৩ নিকিয়া অভিমুখে কিলিজ আরসালানের যাত্রাপথ

কিন্তু পথের দূরত্ব ও দুর্গমতা তার দ্রুত প্রত্যাবর্তনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। (২৪২)

এরই মাঝে সুচতুর বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস তৎকালীন বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিশিষ্ট জেনারেল ও সামরিক সচিব ম্যানুয়েল বুটুমিটস (Manuel Boutoumites/ Butumites)-কে তার প্রতিনিধি হিসেবে গোপনে নিকিয়াবাসীর কাছে প্রেরণ করেন। ম্যানুয়েল বুটুমিটস ক্রুসেডারদের হাতে নিকিয়ার পতন হওয়ার পূর্বেই বাইজান্টাইন সম্রাটের কাছে নগরীটির কর্তৃত্ব সমর্পণ করে দেওয়ার জন্য নগরবাসীকে বোঝাতে থাকেন। তিনি তাদেরকে বোঝান যে, ক্রুসেডাররা অত্যন্ত হিংস্র ও বর্বর প্রকৃতির। তাদের হাতে যদি নগরীর পতন ঘটে, তাহলে তারা নগরীর সকল নাগরিককে হত্যা করবে। অবশ্য এই ভীতিপ্রদর্শন বাস্তবেও সঠিক ছিল। পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি, ক্রুসেডারদের হাতে বাইতুল মুকাদ্দাসসহ অন্যান্য যেসব নগরীর পতন ঘটেছিল, সব জায়গায় তারা নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। (২৪৩)

পাঠকমনে প্রশ্ন জাগতে পারে, বাইজান্টাইন সম্রাট ক্রুসেডারদের না জানিয়ে গোপনে কেন মুসলমানদের সঙ্গে সমঝোতা করতে চেষ্টা করছিলেন? এর উত্তর হলো—তিনি ক্রুসেডারদের পক্ষ থেকে বিশ্বাসঘাতকতার আশঙ্কা করছিলেন। তার ধারণা ছিল, ক্রুসেড-নেতৃবৃন্দ কনস্টান্টিনোপল চুক্তির দাবি মোটেও রক্ষা করবে না এবং পূর্বে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের দখলে থাকা ভূখণ্ডগুলো জয় করার পর সম্রাটের হাতে সমর্পণ করবে না।

বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রস্তাব নিকিয়ায় অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীর নেতৃবৃন্দ গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করছিল। বিশেষ করে এ বিষয়টি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল যে, তিনি মুসলমানদের প্রাণরক্ষার, লুটতরাজ না করার এবং ক্রুসেডারদের হাত থেকে নিরাপত্তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

এরপর বাইজান্টাইন সম্রাট আরেকটি প্রতারণাপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং এর মাধ্যমে দু-দিক থেকে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের স্বার্থ বাস্তবায়ন করেন। তিনি অবরুদ্ধ নিকিয়া নগরীর জন্য সাগরপথে বিভিন্ন ইসলামি রাষ্ট্র হতে আগত ত্রাণসাহায্য স্বেচ্ছায় নিকিয়ায় পৌঁছার সুযোগ করে দেন। অথচ তিনি চাইলেই শক্তিশালী বাইজান্টাইন নৌবহরকে ব্যবহার করে এতে বাধা দিতে পারতেন। এর মাধ্যমে একদিকে তিনি ক্রুসেডারদের বুঝিয়ে দেন যে, তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাইজান্টাইন সম্রাটের সহায়তা ছাড়া অগ্রসর হতে পারবে না; অপরদিকে তার এই পদক্ষেপে মুসলিম শিবিরও নিশ্চিন্ত হয় যে, মুসলমানরা যদি তার হাতে নগরীর নিয়ন্ত্রণভার তুলে দেয়, তাহলে তিনি তাদের সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন।

মুসলিম নেতৃবৃন্দ যখন করণীয় নির্ধারণে চিন্তা-ভাবনায় ব্যস্ত, তার মধ্যেই কিলিজ আরসালান তার বাহিনী নিয়ে পৌঁছে যান। সেদিন ছিল ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ২১ মে (৪৯০ হিজরি)। নিকিয়ায় পৌঁছেই তিনি শহরে প্রবেশের জন্য পথ করে নিতে ক্রুসেডার বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় — তার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। কিলিজ আরসালান অনুভব করেন যে, তিনি এই অবরোধ কিছুতেই ভেদ করতে পারবেন না। এক দিনের যুদ্ধেই কিলিজ আরসালান নিরাশ হয়ে পড়েন এবং রাজধানী নিকিয়াকে পরিণতি বরণের জন্য ফেলে রেখে দূরে সরে পড়েন। (২৪৪) মুসলিম নগরী নিকিয়া তখন একদিকে ক্রুসেডার শক্তি, আরেকদিকে বাইজান্টাইন রাষ্ট্র — জাঁতার দুই অংশের ফাঁকে আটকে পরিণতির প্রহর গুনছে!

খেলা শেষ করতে বাইজান্টাইন সম্রাট এবার তার শেষ চাল চালেন। তিনি তার শক্তিশালী নৌবহর প্রেরণ করে সাগরপথে নিকিয়ায় সহায়তা আগমনের পথ বন্ধ করে দেন। ফলে নিকিয়াবাসী কঠিন দুর্দশার শিকার হয়ে আসন্ন ধ্বংসের প্রহর গুনতে থাকে। তাদের প্রতিরোধশক্তিও ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পড়ে। ক্রুসেডাররা আবারও মর্মে মর্মে বাইজান্টাইন সম্রাটের ক্ষমতা ও গুরুত্ব উপলব্ধি করে।

ধূর্ত ও চতুর বাইজান্টাইন সম্রাটের গুরুত্ব উপলব্ধি করে মুসলমানরাও। আর তাই মুসলমানরা ক্রুসেডারদের হাতে নগরীর পতনের পূর্বেই সম্রাটের প্রস্তাব গ্রহণ করে নেয়। অবরোধ শুরুর পাঁচ সপ্তাহ পর ক্রুসেডাররা হঠাৎ করেই একদিন দেখতে পায় — নগরপ্রাচীরের ওপর বাইজান্টাইন পতাকা উড়ছে! সম্রাটের প্রতিনিধি এসে সকলকে জানায় যে, নগরীটি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অঙ্গে পরিণত হয়েছে। লুটতরাজ চালাতে পারে এই আশঙ্কায় ক্রুসেডার বাহিনীকে নগরীতে প্রবেশ করতে নিষেধ করা হয় এবং ম্যানুয়েল বুটুমিটসকে নিকিয়ার সামরিক প্রশাসক নির্বাচিত করা হয়। (২৪৫) সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস তার প্রতিশ্রুতি রক্ষার সিদ্ধান্ত নেন এবং মুসলমানদের নিরাপত্তা প্রদান করেন। বরং তিনি ঘোষণা করেন যে, তিনি কিলিজ আরসালানের স্ত্রী, বোন ও দুই পুত্রকে কোনো বিনিময় ছাড়াই তার কাছে ফিরিয়ে দিতে প্রস্তুত আছেন। (২৪৬)

স্বাভাবিকভাবেই ক্রুসেডাররা এতে প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয়। তারা উপলব্ধি করে যে, তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। নগরবাসীর প্রতি সম্রাটের উদার আচরণে তারা আরও বেশি বিক্ষুব্ধ হয়। ক্রুসেডাররা নিকিয়ায় গণহত্যা চালিয়ে অন্যান্য ইসলামি নগরীর অধিবাসীদের শিক্ষা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা স্পষ্টতই অনুভব করে যে, তারা লেনদেন করছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পোড় খাওয়া এক শক্তিশালী নেতার সঙ্গে, যিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন এক সুপ্রাচীন সাম্রাজ্যের, যার শেকড় ইতিহাসের সুগভীর স্তরে প্রোথিত। ফলে ক্রুসেডারদের চাওয়া আপাতত অপূর্ণই থেকে যায়। (২৪৭)

বাইজান্টাইন সম্রাটও বাস্তবেই তার অঙ্গীকার রক্ষা করেন। তবে আমার বিশ্বাস—কতিপয় ঐতিহাসিকের এই বিশ্লেষণ মোটেও সঠিক নয় যে, তিনি উদার ও উন্নত চরিত্রের দাবিতে এমনটি করেছেন। বরং আমার মনে হয়, তিনি এ ঘটনাকে এশিয়া মাইনরের অন্যান্য ইসলামি নগরীর অধিবাসীদের অন্তরে প্রভাব সৃষ্টির জন্য ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। এমন ব্যাখ্যাই তার অতীত চরিত্র ও সামগ্রিক জীবনেতিহাসের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। ক্রুসেডাররা যেমন ভীতি সঞ্চারের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ জয় করতে চাচ্ছিল, বাইজান্টাইন সম্রাট তেমনই প্রীতি সৃষ্টির মাধ্যমে আগামীর সংগ্রামে জয়ী হতে চাচ্ছিলেন। ক্রুসেডাররা যদি ধর্মপরিচয়ে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আর্মেনীয়দের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময় করতে পারে, তিনি কেন মুসলমানদের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময় করবেন না!

এ তো স্বার্থের যুদ্ধ! জয়ী হওয়ার লড়াই! সাম্রাজ্যবাদের নেশা!

এর আরেকটি প্রমাণ হলো, কিছুদিন পরেই কোনিয়ায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার পর বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস কিলিজ আরসালানের স্ত্রী ও দুই পুত্রকে নিয়ে এশিয়া মাইনরের পশ্চিমাঞ্চলে মিসিয়া (Mysia), ইওনিয়া (Ionia) ও লিদিয়া (Lydia) অভিমুখে চলে যান (২৪৮) এবং বন্দিদের ও এসব অঞ্চলের নাগরিকদের নিরাপত্তা প্রদানের বিনিময়ে অঞ্চলগুলোর কর্তৃত্ব লাভের জন্য দরকষাকষি শুরু করেন। তার এই পরিকল্পনা সফল হয় এবং প্রতিরোধ ব্যতিরেকেই তার হাতে নগরীগুলোর কর্তৃত্ব তুলে দেওয়া হয়। বরং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এশিয়া মাইনরের পশ্চিমাঞ্চলের সবগুলো নগরী বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যায়। এটি একটি সুস্পষ্ট বাস্তবতা যে, সমকালীন মুসলিম উম্মাহ তখন প্রচণ্ড দুর্বলতার কাল অতিক্রম করছিল এবং দ্রুত পতনের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। আর এ সুযোগে ক্রুসেডার বাহিনী ও বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের মাঝে এক উত্তেজনাকর প্রতিযোগিতা চলছিল বিশাল এক পরিত্যাজ্য সম্পত্তির বণ্টন নিয়ে। আর তা হলো মুসলমানদের পরিত্যাজ্য সম্পদ!

টিকাঃ
২০৬. আরবিতে بيقية (নিকিয়া), ইংরেজিতে Nicaea (নিকায়া) এশিয়া মাইনর অঞ্চলের পশ্চিম উপকূলে মর্মর সাগরের নিকটে অবস্থিত সুপ্রাচীন একটি নগরী। আধুনিক তুরস্কের বুরছা প্রদেশে অবস্থিত অঞ্চলটির বর্তমান নাম ইজনিক (İznik)। খ্রিষ্টসমাজের ইতিহাসে নগরীটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, ৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে খ্রিষ্টানদের প্রথম মহাসভা এখানেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। [অনুবাদক]
২০৭. Cam. Msd. Hist., vol. 5, p. 285.
২৩৮. Setton: op. cit 1, p.p. 288-289.
২০৯. Runciman, op. cit. 1. p.p. 176-177.
২৪০. উইলিয়াম সুরি (William of Tyre), তারীখুল আ'মালিল মুনজিযাহ ফী-মা ওয়ারাআল বিহার, ১/২৩১-২৩২ ও রানচিমান (Runciman), তারীখুল হুরূবিস সালীবিয়্যাহ, ১/২৬৪-২৬৫।
২৪১, Grousset: Hist. des Croisades 1, p. 29.
২৪২, Gesta Francorum, p. 37.
২৪০. উইলিয়াম সুরি, তারীখুল আ'মালিল মুনজিযাহ ফী-মা ওয়ারাআল বিহার, ১/২৪২-২৪৩।
২৪৪. Albert d' Aix, p.p. 320-321.
২৪৫. Brehier: op. cit., p. 312.
২৪৬. Runciman, op. cit., p. 180-182; Alexiad: pp 273-275.
২৪৭. Chalandon: Premiere Croisades, p. 167.
২৪৮. Grousset: Hist. des Croisades, 1, p. 31.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 নিকিয়া পতনের প্রভাবসমূহ

📄 নিকিয়া পতনের প্রভাবসমূহ


স্বাভাবিক দৃষ্টিতে যদিও নিকিয়ার পতন মানে একটি নগরীর পতনমাত্র; কিন্তু এর অবশ্যম্ভাবী প্রভাব ছিল অত্যন্ত ব্যাপক ও বিস্তৃত। যেমন :

১. নিকিয়া পতনের ফলে ক্রুসেডার বাহিনীর মানসিক শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং ধর্মযাজক পিটার ও কাঙাল ওয়ালটারের নেতৃত্বাধীন অপেশাদার বাহিনীর নির্মম পতনের দুঃখ অনেকটাই দূরীভূত হয়ে যায়। এ কারণেই নিকিয়া অবরোধ চলাকালে এবং কিলিজ আরসালানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় ক্রুসেডারদের প্রচুর প্রাণহানি ঘটলেও সেনাপতি ও সাধারণ সৈন্য সকলেই ছিল ইসলামি ভূখণ্ডে অভিযান চালিয়ে যেতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ও সংকল্পবদ্ধ। (২৪৯)

২. অপ্রশিক্ষিত সাধারণ জনতার বাহিনী আক্রান্ত হওয়ার পর ইউরোপজুড়ে যে নিরাশা ও হতাশা ছেয়ে গিয়েছিল, এবার তার পরিবর্তে ইউরোপের জনগণের আত্মবিশ্বাস ও মনোবল অনেক বেড়ে যায়। নবোদ্যমে নতুন নতুন আরও বাহিনী তৈরি হতে থাকে। ইউরোপ থেকে এশিয়া মাইনর ও শাম অঞ্চল অভিমুখে স্রোতের মতো ক্রুসেডার সৈন্যদের আগমন ঘটতে থাকে। ইতালিয়ান নৌবন্দরগুলো সক্রিয়ভাবে ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে শুরু করে। (২৫০)

৩. বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের মনোবলও বৃদ্ধি পায়। কারণ, ৪৬৩ হিজরি সনে সুবিখ্যাত মানজিকার্টের যুদ্ধে পরাজয়ের সাতাশ বছরেরও অধিক সময় পর নিকিয়া পতনের ঘটনা ছিল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের হৃত মর্যাদা পুনরুদ্ধারের প্রথম পদক্ষেপ। নিকিয়া বিজয় ধূর্ত বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোসের কর্তৃত্ব বৃদ্ধিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। (২৫১)

৪. বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাওয়ায় তারা এবার সেলজুকদের বিশৃঙ্খলাকে কাজে লাগাতে প্রবল শক্তিতে অগ্রসর হতে থাকে। এশিয়া মাইনরের পশ্চিমাঞ্চলের অধিকাংশ ভূমি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে। (২৫২) এরপর বাইজান্টাইন বাহিনী এশিয়া মাইনরের উত্তরাঞ্চলে এবং কৃষ্ণসাগরের উপকূলীয় নগরীগুলোতে হামলা চালাতে শুরু করে। নিকিয়ার পতনের পর তিন শতাব্দীরও অধিক সময় এশিয়া মাইনরের পশ্চিমাঞ্চল বাইজান্টাইনদের দখলে ছিল। (২৫৩)

৫. ক্রুসেডার ও বাইজান্টাইনদের যুগপৎ মনোবল বৃদ্ধির বিপরীতে বিভিন্ন এলাকার মুসলিম বাহিনী, সেনাপতিগণ, জনসাধারণ ও নেতৃবৃন্দ নির্বিশেষে সকলের আত্মবিশ্বাসে প্রচণ্ড ধস নামে। কারণ, নিকিয়ার পতন ছিল এশিয়া মাইনর অঞ্চলের সবচেয়ে সুরক্ষিত নগরীর পতন। এর অর্থ হলো, অন্যান্য নগরীর আরও সহজে পতন ঘটবে। তা ছাড়া পশ্চিমের ক্রুসেডার বাহিনী আর প্রাচ্যের বাইজান্টাইন বাহিনী এই দুই বিশাল শক্তির জোট বাঁধার অর্থ হচ্ছে, ইসলামি ভূখণ্ডের জন্য সামনের দিনগুলো অতীতের চেয়ে আরও কঠিন হবে!

৬. নিকিয়া পতনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো, একে কেন্দ্র করে ক্রুসেডার-বাইজান্টাইন সম্পর্কের মাঝে দুষ্ট মনোবৃত্তির প্রতিক্রিয়া আরও বৃদ্ধি পায় এবং তা পরবর্তীকালে ক্রুসেড অভিযানের গতি-প্রকৃতি ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। ক্রুসেডার বাহিনীর সেনাপতিগণ বাইজান্টাইন সম্রাটের ওপর প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি তার প্রতি ভীতি অনুভব করতে থাকে। এটি সুস্পষ্ট যে, ভেতরে ভেতরে পরিস্থিতি তখন উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল এবং ছাইচাপা আগুন জ্বলে ওঠার অপেক্ষায় ছিল। এ কারণেই বাইজান্টাইন সম্রাট নিকিয়া অভিযানের পর সামনে অগ্রসর হওয়ার পূর্বেই ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দকে সমবেত করে তার প্রতি আনুগত্য ও বশ্যতার শপথ নবায়ন করতে চাপ দিতে থাকেন। নিতান্ত নিরুপায় হয়ে সকলে শপথ নবায়ন করে। বোহেমন্ড আগের মতোই সম্রাটের হৃদ্যতা লাভের আশায় বিনা দ্বিধায় দ্রুত শপথ সম্পন্ন করেন আর ৪র্থ রেমন্ড আনুগত্য ও মিত্রতার শপথ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সম্রাটের মর্যাদা রক্ষার শপথ নবায়ন করেন। (২৫৪) এ ছাড়াও বোহেমন্ডের ভাগ্নে টেনক্রেড শপথ করতে অস্বীকৃতি জানান। টেনক্রেড শুরুতে কনস্টান্টিনোপলেও তার মামার শপথের ওপর নির্ভর করে নিজে শপথ করেননি। টেনক্রেডের এই শপথ গ্রহণে অস্বীকৃতি পরবর্তী সময়ে তার বিভিন্ন পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল।

৭. একদিকে সেলজুকদের পরাজয়, অপরদিকে (অর্থোডক্স বাইজান্টাইনদের তুলনায় তুলনামূলক আস্থার পাত্র) ক্যাথলিক মতাদর্শী ক্রুসেডারদের এশিয়া মাইনর অঞ্চলে অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা-এই দুই কারণে আর্মেনীয়দের মাঝেও দৃশ্যমান উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। আগামী ঘটনাপ্রবাহে আমরা লক্ষ করব যে, একে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে আর্মেনীয় ও ক্রুসেডারদের মাঝে উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা বিনিময় প্রকাশ পাবে। নিকিয়া পতনের পর বিশেষ করে এশিয়া মাইনরের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলসহ আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত বিভিন্ন নগরী থেকে ক্রুসেডারদের প্রতি আপন আপন অঞ্চলে আগমনের অনুরোধ আসতে থাকে। আর্মেনীয়দের এসব অনুরোধবার্তা ক্রুসেড অভিযানের পরবর্তী গতিপথ নির্ণয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল।

৮. সামরিক প্রভাব: নিকিয়া পতনের ফলে এশিয়া মাইনর অঞ্চলে প্রবেশের পথ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। নিকিয়াই ছিল এশিয়া মাইনরের ইসলামি ভূখণ্ডে প্রবেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। আর তাই নিকিয়া পতনের পর ক্রুসেডারদের সামনে এশিয়া মাইনরের গভীরে বরং শাম অঞ্চলে পৌঁছার বিরাট সুযোগ এসে যায়। (২৫৫)

৯. নিকিয়া পতনের পর কিলিজ আরসালান দ্রুত কোনিয়া (২৫৬) নগরীতে চলে যান এবং কোনিয়াকে নতুন রাজধানী নির্বাচন করেন। (২৫৭) এভাবেও বলা চলে যে, কোনিয়া পরিণত হয় তার নতুন সামরিক ঘাঁটিতে, যেখান থেকে তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করবেন। কোনিয়া ছিল নিকিয়া থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রায় চারশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। নিকিয়ার মতো না হলেও কোনিয়া নগরীও যথেষ্ট সুরক্ষিত ছিল।

১০. রোমান সেলজুক রাষ্ট্রের নেতা কিলিজ আরসালান ও তুর্কমেনদের নেতা গাজি বিন দানিশমান্দ সিদ্ধান্ত নেন যে, তারা আপাতত কিছু সময়ের জন্য পারস্পরিক বিরোধের কথা ভুলে গিয়ে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে একক ফ্রন্ট গড়ে তুলবেন। (২৫৮) বাহ্যত এই ঐক্য প্রচেষ্টা যদিও একটি ইতিবাচক বিষয় ছিল; কিন্তু বাস্তবে এর উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব ছিল না। এই ঐক্য ছিল দুর্বল ও ভঙ্গুরপ্রায়। কারণ, একদিকে উভয় পক্ষের বিরোধ ও শত্রুতা ছিল গভীর ও সুপ্রাচীন; অপরদিকে একতা ও সম্মিলিত লড়াইয়ের সুস্পষ্ট ইসলামি অনুপ্রাণিকাও উভয় পক্ষের মাঝে অনুপস্থিত ছিল। দ্বীন রক্ষার্থে নয়; বরং তাদের ঐক্য ছিল আপন আপন ভূখণ্ড রক্ষার জন্য।

টিকাঃ
২৪৯. Cam. Med. Hist. vol 5, p. 285.
২৫০. Runciman, op. cit., 1, p.p. 182-183, Setton: op. cit. 1, p. 201.
২৫১. Grousset: Hist. des Croisades, 1, pp 42-43.
২৫২. Grousset: Hist. des Croisades, 1, pp. 41-43.
২৫৩, সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/১৩৯।
২৫৪, Chalandon: Alexis Comnene, p. 193.
২৫৫. Oman: vol 1 p 279.
২৫৬. কোনিয়া: বর্তমান তুরস্কের অন্তর্গত কোনিয়া প্রদেশের রাজধানী নগরী। জগদ্বিখ্যাত সুফি সাধক জালালুদ্দিন রুমি রহ.-এর সমাধি কোনিয়া নগরীতেই অবস্থিত। হাতে-বোনা কার্পেট শিল্পের জন্য কোনিয়ার বিশ্বজুড়ে খ্যাতি রয়েছে। [অনুবাদক]
২৫৭. রানচিমান, তারীখুল হুরূবিস সালীবিয়্যাহ, ১/২৭৮।
২৫৮. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৮/১৮৬, ১৬৪ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৩৪। Gesta Francorum, pp. 19-22; Fulcher de Chartres, pp. 83-87; William of Tyre, 1, pp. 169-173; Runciman, "Constantinople to Antioch", pp. 293-294; Mayer, Crusades, pp. 50-51.

স্বাভাবিক দৃষ্টিতে যদিও নিকিয়ার পতন মানে একটি নগরীর পতনমাত্র; কিন্তু এর অবশ্যম্ভাবী প্রভাব ছিল অত্যন্ত ব্যাপক ও বিস্তৃত। যেমন :

১. নিকিয়া পতনের ফলে ক্রুসেডার বাহিনীর মানসিক শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং ধর্মযাজক পিটার ও কাঙাল ওয়ালটারের নেতৃত্বাধীন অপেশাদার বাহিনীর নির্মম পতনের দুঃখ অনেকটাই দূরীভূত হয়ে যায়। এ কারণেই নিকিয়া অবরোধ চলাকালে এবং কিলিজ আরসালানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় ক্রুসেডারদের প্রচুর প্রাণহানি ঘটলেও সেনাপতি ও সাধারণ সৈন্য সকলেই ছিল ইসলামি ভূখণ্ডে অভিযান চালিয়ে যেতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ও সংকল্পবদ্ধ। (২৪৯)

২. অপ্রশিক্ষিত সাধারণ জনতার বাহিনী আক্রান্ত হওয়ার পর ইউরোপজুড়ে যে নিরাশা ও হতাশা ছেয়ে গিয়েছিল, এবার তার পরিবর্তে ইউরোপের জনগণের আত্মবিশ্বাস ও মনোবল অনেক বেড়ে যায়। নবোদ্যমে নতুন নতুন আরও বাহিনী তৈরি হতে থাকে। ইউরোপ থেকে এশিয়া মাইনর ও শাম অঞ্চল অভিমুখে স্রোতের মতো ক্রুসেডার সৈন্যদের আগমন ঘটতে থাকে। ইতালিয়ান নৌবন্দরগুলো সক্রিয়ভাবে ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে শুরু করে। (২৫০)

৩. বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের মনোবলও বৃদ্ধি পায়। কারণ, ৪৬৩ হিজরি সনে সুবিখ্যাত মানজিকার্টের যুদ্ধে পরাজয়ের সাতাশ বছরেরও অধিক সময় পর নিকিয়া পতনের ঘটনা ছিল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের হৃত মর্যাদা পুনরুদ্ধারের প্রথম পদক্ষেপ। নিকিয়া বিজয় ধূর্ত বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোসের কর্তৃত্ব বৃদ্ধিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। (২৫১)

৪. বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাওয়ায় তারা এবার সেলজুকদের বিশৃঙ্খলাকে কাজে লাগাতে প্রবল শক্তিতে অগ্রসর হতে থাকে। এশিয়া মাইনরের পশ্চিমাঞ্চলের অধিকাংশ ভূমি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে। (২৫২) এরপর বাইজান্টাইন বাহিনী এশিয়া মাইনরের উত্তরাঞ্চলে এবং কৃষ্ণসাগরের উপকূলীয় নগরীগুলোতে হামলা চালাতে শুরু করে। নিকিয়ার পতনের পর তিন শতাব্দীরও অধিক সময় এশিয়া মাইনরের পশ্চিমাঞ্চল বাইজান্টাইনদের দখলে ছিল। (২৫৩)

৫. ক্রুসেডার ও বাইজান্টাইনদের যুগপৎ মনোবল বৃদ্ধির বিপরীতে বিভিন্ন এলাকার মুসলিম বাহিনী, সেনাপতিগণ, জনসাধারণ ও নেতৃবৃন্দ নির্বিশেষে সকলের আত্মবিশ্বাসে প্রচণ্ড ধস নামে। কারণ, নিকিয়ার পতন ছিল এশিয়া মাইনর অঞ্চলের সবচেয়ে সুরক্ষিত নগরীর পতন। এর অর্থ হলো, অন্যান্য নগরীর আরও সহজে পতন ঘটবে। তা ছাড়া পশ্চিমের ক্রুসেডার বাহিনী আর প্রাচ্যের বাইজান্টাইন বাহিনী এই দুই বিশাল শক্তির জোট বাঁধার অর্থ হচ্ছে, ইসলামি ভূখণ্ডের জন্য সামনের দিনগুলো অতীতের চেয়ে আরও কঠিন হবে!

৬. নিকিয়া পতনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো, একে কেন্দ্র করে ক্রুসেডার-বাইজান্টাইন সম্পর্কের মাঝে দুষ্ট মনোবৃত্তির প্রতিক্রিয়া আরও বৃদ্ধি পায় এবং তা পরবর্তীকালে ক্রুসেড অভিযানের গতি-প্রকৃতি ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। ক্রুসেডার বাহিনীর সেনাপতিগণ বাইজান্টাইন সম্রাটের ওপর প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি তার প্রতি ভীতি অনুভব করতে থাকে। এটি সুস্পষ্ট যে, ভেতরে ভেতরে পরিস্থিতি তখন উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল এবং ছাইচাপা আগুন জ্বলে ওঠার অপেক্ষায় ছিল। এ কারণেই বাইজান্টাইন সম্রাট নিকিয়া অভিযানের পর সামনে অগ্রসর হওয়ার পূর্বেই ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দকে সমবেত করে তার প্রতি আনুগত্য ও বশ্যতার শপথ নবায়ন করতে চাপ দিতে থাকেন। নিতান্ত নিরুপায় হয়ে সকলে শপথ নবায়ন করে। বোহেমন্ড আগের মতোই সম্রাটের হৃদ্যতা লাভের আশায় বিনা দ্বিধায় দ্রুত শপথ সম্পন্ন করেন আর ৪র্থ রেমন্ড আনুগত্য ও মিত্রতার শপথ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সম্রাটের মর্যাদা রক্ষার শপথ নবায়ন করেন। (২৫৪) এ ছাড়াও বোহেমন্ডের ভাগ্নে টেনক্রেড শপথ করতে অস্বীকৃতি জানান। টেনক্রেড শুরুতে কনস্টান্টিনোপলেও তার মামার শপথের ওপর নির্ভর করে নিজে শপথ করেননি। টেনক্রেডের এই শপথ গ্রহণে অস্বীকৃতি পরবর্তী সময়ে তার বিভিন্ন পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল।

৭. একদিকে সেলজুকদের পরাজয়, অপরদিকে (অর্থোডক্স বাইজান্টাইনদের তুলনায় তুলনামূলক আস্থার পাত্র) ক্যাথলিক মতাদর্শী ক্রুসেডারদের এশিয়া মাইনর অঞ্চলে অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা-এই দুই কারণে আর্মেনীয়দের মাঝেও দৃশ্যমান উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। আগামী ঘটনাপ্রবাহে আমরা লক্ষ করব যে, একে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে আর্মেনীয় ও ক্রুসেডারদের মাঝে উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা বিনিময় প্রকাশ পাবে। নিকিয়া পতনের পর বিশেষ করে এশিয়া মাইনরের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলসহ আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত বিভিন্ন নগরী থেকে ক্রুসেডারদের প্রতি আপন আপন অঞ্চলে আগমনের অনুরোধ আসতে থাকে। আর্মেনীয়দের এসব অনুরোধবার্তা ক্রুসেড অভিযানের পরবর্তী গতিপথ নির্ণয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল।

৮. সামরিক প্রভাব: নিকিয়া পতনের ফলে এশিয়া মাইনর অঞ্চলে প্রবেশের পথ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। নিকিয়াই ছিল এশিয়া মাইনরের ইসলামি ভূখণ্ডে প্রবেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। আর তাই নিকিয়া পতনের পর ক্রুসেডারদের সামনে এশিয়া মাইনরের গভীরে বরং শাম অঞ্চলে পৌঁছার বিরাট সুযোগ এসে যায়। (২৫৫)

৯. নিকিয়া পতনের পর কিলিজ আরসালান দ্রুত কোনিয়া (২৫৬) নগরীতে চলে যান এবং কোনিয়াকে নতুন রাজধানী নির্বাচন করেন। (২৫৭) এভাবেও বলা চলে যে, কোনিয়া পরিণত হয় তার নতুন সামরিক ঘাঁটিতে, যেখান থেকে তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করবেন। কোনিয়া ছিল নিকিয়া থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রায় চারশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। নিকিয়ার মতো না হলেও কোনিয়া নগরীও যথেষ্ট সুরক্ষিত ছিল।

১০. রোমান সেলজুক রাষ্ট্রের নেতা কিলিজ আরসালান ও তুর্কমেনদের নেতা গাজি বিন দানিশমান্দ সিদ্ধান্ত নেন যে, তারা আপাতত কিছু সময়ের জন্য পারস্পরিক বিরোধের কথা ভুলে গিয়ে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে একক ফ্রন্ট গড়ে তুলবেন। (২৫৮) বাহ্যত এই ঐক্য প্রচেষ্টা যদিও একটি ইতিবাচক বিষয় ছিল; কিন্তু বাস্তবে এর উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব ছিল না। এই ঐক্য ছিল দুর্বল ও ভঙ্গুরপ্রায়। কারণ, একদিকে উভয় পক্ষের বিরোধ ও শত্রুতা ছিল গভীর ও সুপ্রাচীন; অপরদিকে একতা ও সম্মিলিত লড়াইয়ের সুস্পষ্ট ইসলামি অনুপ্রাণিকাও উভয় পক্ষের মাঝে অনুপস্থিত ছিল। দ্বীন রক্ষার্থে নয়; বরং তাদের ঐক্য ছিল আপন আপন ভূখণ্ড রক্ষার জন্য।

টিকাঃ
২৪৯. Cam. Med. Hist. vol 5, p. 285.
২৫০. Runciman, op. cit., 1, p.p. 182-183, Setton: op. cit. 1, p. 201.
২৫১. Grousset: Hist. des Croisades, 1, pp 42-43.
২৫২. Grousset: Hist. des Croisades, 1, pp. 41-43.
২৫৩, সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/১৩৯।
২৫৪, Chalandon: Alexis Comnene, p. 193.
২৫৫. Oman: vol 1 p 279.
২৫৬. কোনিয়া: বর্তমান তুরস্কের অন্তর্গত কোনিয়া প্রদেশের রাজধানী নগরী। জগদ্বিখ্যাত সুফি সাধক জালালুদ্দিন রুমি রহ.-এর সমাধি কোনিয়া নগরীতেই অবস্থিত। হাতে-বোনা কার্পেট শিল্পের জন্য কোনিয়ার বিশ্বজুড়ে খ্যাতি রয়েছে। [অনুবাদক]
২৫৭. রানচিমান, তারীখুল হুরূবিস সালীবিয়্যাহ, ১/২৭৮।
২৫৮. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৮/১৮৬, ১৬৪ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৩৪। Gesta Francorum, pp. 19-22; Fulcher de Chartres, pp. 83-87; William of Tyre, 1, pp. 169-173; Runciman, "Constantinople to Antioch", pp. 293-294; Mayer, Crusades, pp. 50-51.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 নিকিয়া পতনের কার্যকারণসমূহ

📄 নিকিয়া পতনের কার্যকারণসমূহ


আমরা যদি নিকিয়াতে মুসলমানদের এই শোচনীয় পরাজয়ের কারণ ও কার্যকারণ বিশ্লেষণ করি, তাহলে এমন কিছু বিষয় আমাদের সামনে উঠে আসবে, যা ইতিহাসের যুগে যুগে মুসলমানদের পরাজিত হওয়া প্রতিটি যুদ্ধের ক্ষেত্রেই পাওয়া যায়। কারণ, এগুলো সর্বযুগে কার্যকর শাশ্বত কিছু নীতি। আমাদের সামনে যেসব কার্যকারণ প্রকাশিত হয়, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

১. মুসলিম যোদ্ধাদের মাঝে ইসলামি চেতনাবোধ ও দ্বীনি উদ্দীপনার অনুপস্থিতি। নিঃসন্দেহে যারা আল্লাহর দ্বীনকে বুলন্দ করার লক্ষ্যে লড়াই করে আর যারা লড়াই করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কিংবা জীবন রক্ষার জন্য—উভয় দলের মাঝে কত পার্থক্য!

২. মুসলমানদের পারস্পরিক দীর্ঘস্থায়ী বিবাদ-বিভক্তি এবং অধিকাংশ অঞ্চলে ভ্রাতৃঘাতী লড়াই-সংঘাত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
(وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّبِرِينَ)
এবং পরস্পরে কলহ করবে না। অন্যথায় তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব বিলুপ্ত হবে। আর ধৈর্যধারণ করবে। বিশ্বাস রাখো, আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। [সুরা আনফাল: ৪৬]
আয়াতের ভাষ্য দ্বারা সুস্পষ্ট অনুমিত হয় যে, মুসলমানদের পারস্পরিক কলহ-বিবাদ পরাজয়, ব্যর্থতা ও প্রভাব বিলুপ্তির অন্যতম মৌলিক কার্যকারণ।

৩. ঘটনাপ্রবাহের প্রতি শাম অঞ্চল, ইরাক, মিশর ও ইসলামি প্রাচ্যের মুসলমানদের উদাসীনতা এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতির মোকাবিলায় এশিয়া মাইনরের সেলজুক শক্তির নিঃসঙ্গ সংগ্রাম। অথচ পরবর্তী সময়ে তাদের সকলকেই ক্রুসেড অভিযানের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার শিকার হতে হয়েছিল।

৪. উপযুক্ত সামরিক প্রস্তুতির অভাব। সেলজুকদের গোয়েন্দা-তৎপরতা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। তারা যতক্ষণে ক্রুসেডারদের অগ্রযাত্রার বিষয়টি উপলব্ধি করে, ততক্ষণে সময় শেষ হয়ে গেছে। বিপরীতে ক্রুসেডার ও বাইজান্টাইনরা এই দিনটির জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছিল। আর শাশ্বত নীতি হলো, যে-ই চেষ্টা করবে, আপন চেষ্টা ও প্রস্তুতির ফল অবশ্যই লাভ করবে।

মোটামুটি এগুলোই ছিল নিকিয়ার পরাজয় ও পতনের মূল কার্যকারণ। এসব কারণ যখন যেকোনো প্রজন্মের মাঝে পাওয়া যাবে, নিঃসন্দেহে তারাও একই পরিণতির শিকার হবে এবং একই ধরনের সংকট ও সমস্যার সম্মুখীন হবে।

আমরা যদি নিকিয়াতে মুসলমানদের এই শোচনীয় পরাজয়ের কারণ ও কার্যকারণ বিশ্লেষণ করি, তাহলে এমন কিছু বিষয় আমাদের সামনে উঠে আসবে, যা ইতিহাসের যুগে যুগে মুসলমানদের পরাজিত হওয়া প্রতিটি যুদ্ধের ক্ষেত্রেই পাওয়া যায়। কারণ, এগুলো সর্বযুগে কার্যকর শাশ্বত কিছু নীতি। আমাদের সামনে যেসব কার্যকারণ প্রকাশিত হয়, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

১. মুসলিম যোদ্ধাদের মাঝে ইসলামি চেতনাবোধ ও দ্বীনি উদ্দীপনার অনুপস্থিতি। নিঃসন্দেহে যারা আল্লাহর দ্বীনকে বুলন্দ করার লক্ষ্যে লড়াই করে আর যারা লড়াই করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কিংবা জীবন রক্ষার জন্য—উভয় দলের মাঝে কত পার্থক্য!

২. মুসলমানদের পারস্পরিক দীর্ঘস্থায়ী বিবাদ-বিভক্তি এবং অধিকাংশ অঞ্চলে ভ্রাতৃঘাতী লড়াই-সংঘাত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
(وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّبِرِينَ)
এবং পরস্পরে কলহ করবে না। অন্যথায় তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব বিলুপ্ত হবে। আর ধৈর্যধারণ করবে। বিশ্বাস রাখো, আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। [সুরা আনফাল: ৪৬]
আয়াতের ভাষ্য দ্বারা সুস্পষ্ট অনুমিত হয় যে, মুসলমানদের পারস্পরিক কলহ-বিবাদ পরাজয়, ব্যর্থতা ও প্রভাব বিলুপ্তির অন্যতম মৌলিক কার্যকারণ।

৩. ঘটনাপ্রবাহের প্রতি শাম অঞ্চল, ইরাক, মিশর ও ইসলামি প্রাচ্যের মুসলমানদের উদাসীনতা এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতির মোকাবিলায় এশিয়া মাইনরের সেলজুক শক্তির নিঃসঙ্গ সংগ্রাম। অথচ পরবর্তী সময়ে তাদের সকলকেই ক্রুসেড অভিযানের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার শিকার হতে হয়েছিল।

৪. উপযুক্ত সামরিক প্রস্তুতির অভাব। সেলজুকদের গোয়েন্দা-তৎপরতা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। তারা যতক্ষণে ক্রুসেডারদের অগ্রযাত্রার বিষয়টি উপলব্ধি করে, ততক্ষণে সময় শেষ হয়ে গেছে। বিপরীতে ক্রুসেডার ও বাইজান্টাইনরা এই দিনটির জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছিল। আর শাশ্বত নীতি হলো, যে-ই চেষ্টা করবে, আপন চেষ্টা ও প্রস্তুতির ফল অবশ্যই লাভ করবে।

মোটামুটি এগুলোই ছিল নিকিয়ার পরাজয় ও পতনের মূল কার্যকারণ। এসব কারণ যখন যেকোনো প্রজন্মের মাঝে পাওয়া যাবে, নিঃসন্দেহে তারাও একই পরিণতির শিকার হবে এবং একই ধরনের সংকট ও সমস্যার সম্মুখীন হবে।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 নিকিয়া পতনের পর ক্রুসেডারদের পরবর্তী পদক্ষেপ

📄 নিকিয়া পতনের পর ক্রুসেডারদের পরবর্তী পদক্ষেপ


নিকিয়া পতনের পর এক সপ্তাহের বিশ্রাম শেষেই ক্রুসেডাররা সামনে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এবার তারা দক্ষিণ-পূর্বে কিলিজ আরসালানের নতুন রাজধানী কোনিয়ার দিকে অগ্রসর হয়। কোনিয়ার পথে ক্রুসেডাররা নিজেদের দুই ভাগে বিভক্ত করে নিয়েছিল। এক অংশ ছিল সম্পূর্ণ নরম্যানদের নিয়ে গঠিত। বোহেমন্ড ও টেনক্রেডের নেতৃত্বাধীন ইতালিয়ান নরম্যানদের পাশাপাশি রবার্ট ও স্টিফেনের নেতৃত্বাধীন ফ্রেঞ্চ নরম্যানরাও এ অংশে ছিল। এই অংশের সর্বাধিনায়কত্বের দায়িত্ব ছিল বোহেমন্ডের কাঁধে। অভিজ্ঞ সেনাপতি ট্যাটিকিয়াস (Taticius)-এর নেতৃত্বে বাইজান্টাইন বাহিনীর একটি অংশও এই দলের সঙ্গে ছিল। ক্রুসেডার বাহিনীর দ্বিতীয় অংশটি ছিল ৪র্থ রেমন্ডের নেতৃত্বাধীন দক্ষিণ ফ্রান্সের বাহিনী ও গডফ্রের নেতৃত্বাধীন উত্তর ফ্রান্স ও লোরেন অঞ্চলের বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত। এ অংশের সর্বাধিনায়ক ছিলেন ৪র্থ রেমন্ড। উভয় বাহিনী নিজেদের মাঝে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরত্ব রেখে সমান্তরালে অগ্রসর হতে থাকে। সিদ্ধান্ত হয় যে, দোরিলায়ুম (Dorylaeum) নগরীর প্রাচীন ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকায় উভয় বাহিনী পরস্পর মিলিত হবে। (২৫৯) এলাকাটি নিকিয়া থেকে দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় একশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রেখে ক্রুসেডার বাহিনী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে রওনা হয়েছিল। একটি বিষয় হলো, এর ফলে তাদের রসদ ও খাবার- দাবার সংগ্রহ সহজতর হবে। কারণ, খাদ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে তারা পথের বিভিন্ন শস্যক্ষেত্রে বিদ্যমান ফল-ফসলের ওপরই নির্ভর করছিল। অপরদিকে পানির জন্য তারা নির্ভর করছিল এ অঞ্চলে বিদ্যমান বিভিন্ন ঝরনা ও কূপের ওপর। আরেকটি দিক হলো, এর ফলে সৈন্যদের চলার গতি দ্রুত ও সহজতর হবে। কারণ, বিদ্যমান পথঘাট যতই প্রশস্ত হোক না কেন, এই বিশাল বাহিনীর জন্য তা যথেষ্ট ছিল না।

ক্রুসেডার বাহিনীর এভাবে বিভক্ত হয়ে চলার আরেকটি লক্ষ্য ছিল, পথে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সেলজুক সৈন্যদের নিরাপত্তা চৌকিগুলো (pocket of resistance) ধ্বংস করা। (২৬০) সেলজুক গোয়েন্দাদের ধোঁকা দেওয়াও অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। কারণ, সম্ভাবনা ছিল যে, সেলজুক বাহিনী ক্রুসেডার বাহিনীর একটি অংশকেই পূর্ণ বাহিনী মনে করে তাদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। আর এমনটি ঘটলে নিশ্চিত করেই মুসলমানদের যুদ্ধ পরিকল্পনায় বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হবে। বাস্তবেও এই সুবিশাল বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে এমনটিই ঘটেছিল।

টিকাঃ
২৫৯. Alexiad: p. 279; Oman: vol, 1, p.272; Gesta Francorum, pp. 19-22; Fulcher de chartres, pp. 83-87; William of Tyre, 1, pp. 169-1773; Runciman, "Constantinople to Antioch", pp. 293-294; Mayer, Crusades, pp. 50-51.
২৬০. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/১৩৪।

নিকিয়া পতনের পর এক সপ্তাহের বিশ্রাম শেষেই ক্রুসেডাররা সামনে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এবার তারা দক্ষিণ-পূর্বে কিলিজ আরসালানের নতুন রাজধানী কোনিয়ার দিকে অগ্রসর হয়। কোনিয়ার পথে ক্রুসেডাররা নিজেদের দুই ভাগে বিভক্ত করে নিয়েছিল। এক অংশ ছিল সম্পূর্ণ নরম্যানদের নিয়ে গঠিত। বোহেমন্ড ও টেনক্রেডের নেতৃত্বাধীন ইতালিয়ান নরম্যানদের পাশাপাশি রবার্ট ও স্টিফেনের নেতৃত্বাধীন ফ্রেঞ্চ নরম্যানরাও এ অংশে ছিল। এই অংশের সর্বাধিনায়কত্বের দায়িত্ব ছিল বোহেমন্ডের কাঁধে। অভিজ্ঞ সেনাপতি ট্যাটিকিয়াস (Taticius)-এর নেতৃত্বে বাইজান্টাইন বাহিনীর একটি অংশও এই দলের সঙ্গে ছিল। ক্রুসেডার বাহিনীর দ্বিতীয় অংশটি ছিল ৪র্থ রেমন্ডের নেতৃত্বাধীন দক্ষিণ ফ্রান্সের বাহিনী ও গডফ্রের নেতৃত্বাধীন উত্তর ফ্রান্স ও লোরেন অঞ্চলের বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত। এ অংশের সর্বাধিনায়ক ছিলেন ৪র্থ রেমন্ড। উভয় বাহিনী নিজেদের মাঝে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরত্ব রেখে সমান্তরালে অগ্রসর হতে থাকে। সিদ্ধান্ত হয় যে, দোরিলায়ুম (Dorylaeum) নগরীর প্রাচীন ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকায় উভয় বাহিনী পরস্পর মিলিত হবে। (২৫৯) এলাকাটি নিকিয়া থেকে দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় একশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রেখে ক্রুসেডার বাহিনী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে রওনা হয়েছিল। একটি বিষয় হলো, এর ফলে তাদের রসদ ও খাবার- দাবার সংগ্রহ সহজতর হবে। কারণ, খাদ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে তারা পথের বিভিন্ন শস্যক্ষেত্রে বিদ্যমান ফল-ফসলের ওপরই নির্ভর করছিল। অপরদিকে পানির জন্য তারা নির্ভর করছিল এ অঞ্চলে বিদ্যমান বিভিন্ন ঝরনা ও কূপের ওপর। আরেকটি দিক হলো, এর ফলে সৈন্যদের চলার গতি দ্রুত ও সহজতর হবে। কারণ, বিদ্যমান পথঘাট যতই প্রশস্ত হোক না কেন, এই বিশাল বাহিনীর জন্য তা যথেষ্ট ছিল না।

ক্রুসেডার বাহিনীর এভাবে বিভক্ত হয়ে চলার আরেকটি লক্ষ্য ছিল, পথে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সেলজুক সৈন্যদের নিরাপত্তা চৌকিগুলো (pocket of resistance) ধ্বংস করা। (২৬০) সেলজুক গোয়েন্দাদের ধোঁকা দেওয়াও অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। কারণ, সম্ভাবনা ছিল যে, সেলজুক বাহিনী ক্রুসেডার বাহিনীর একটি অংশকেই পূর্ণ বাহিনী মনে করে তাদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। আর এমনটি ঘটলে নিশ্চিত করেই মুসলমানদের যুদ্ধ পরিকল্পনায় বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হবে। বাস্তবেও এই সুবিশাল বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে এমনটিই ঘটেছিল।

টিকাঃ
২৫৯. Alexiad: p. 279; Oman: vol, 1, p.272; Gesta Francorum, pp. 19-22; Fulcher de chartres, pp. 83-87; William of Tyre, 1, pp. 169-1773; Runciman, "Constantinople to Antioch", pp. 293-294; Mayer, Crusades, pp. 50-51.
২৬০. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/১৩৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00